প্রীতি বললে–তুমি আর তোমার বাবা! তোমরা কাকে ঠকিয়ে টাকা কড়ি-জমি-জমা করবে, কাকে খুন করবে তা ওর মনে লাগবে না? সত্যিই তো, কালীগঞ্জের বউ যেমন মানুষই হোক, জলজ্যান্ত মানুষটা যাবেই বা কোথায়? দারোগা পুলিস এল, তারাই বা কিছু কূল-কিনারা করতে পারলে না কেন? তাদেরও তোমরা টাকা খাইয়ে হাত করবে! তা এখন আমার কী, তোমরাই সামলাও–
চৌধুরী মশাই কথাটাকে চাপা দেবার চেষ্টা করতে গেলেন। বললেন–তুমি আর ও সব নিয়ে মাথা ঘামাতে যেও না।
প্রীতি বললে–কেন? মাথা ঘামাবো না কেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–তোমরা মেয়েমানুষ বাড়ির ভেতরে থাকো, বাড়ির বাইরের ব্যাপারে তোমাদের মাথা ঘামাবার দরকারটা কী! জমিদারি-জোতদারির কথায় তোমাদের মেয়েমানুষদের না-থাকাই ভালো।
প্রীতি বললে–ওই মাথা ঘামাতে দাও না বলেই তো আজকে আমার বউমার এই হেনস্থা! মাথা ঘামাতে দিলে আর বাড়ির ভেতরে এই অবস্থা হতো না–
কথাটা চৌধুরী মশাই-এর পছন্দ হলো না। বললেন–তা হলে বলো জমি-জমা বেচে দিয়ে সন্নিসী হয়ে যাই, সন্নিসী হয়ে সংসার-ধর্ম ছেড়ে বনে চলে যাই। তাও তো পারবে না। তাতেও তো তোমার কষ্ট হবে।
প্রীতি বললে–তা সংসার-ধর্ম ছাড়বার কথা আমি কি একবারও বলিচি? রাত-দুপুরে কী যে তুমি সব আজেবাজে কথা বলো–
চৌধুরী মশাই বললেন–এ-সব বাজে কথা হলো? তোমার সঙ্গে দেখছি এসব কথা বলাও পাপ–
প্রীতি বললে–তা বাজে কথা না তো কী! আমি তোমায় সংসার ছেড়ে বনে চলে যেতে একবারও বলিচি?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা হলে কালীগঞ্জের বউ-এর কথা তুমি তুললে কেন? কালীগঞ্জের বউকে কি আমরা খুন করেছি? আর যদি খুনই করতুম তো দারোগা-পুলিস কি তার কোনও কিনারা করতে পারতো না? তারা কি সবাই ঘাস খায়?
তারপর একটু থেমে আবার গলা চড়িয়ে বললেন–আর তা ছাড়া জমিদারির তুমি কী বোঝ শুনি? জমি-জমা করতে গেলে খুন-খারাবি না করলে চলে? তাহলে কাল থেকে তুমিই চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে বসলে পারো, আমি রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকি! দেখি কীরকম জমিদারি চালাও তুমি!
প্রীতি বললে–যাও, তুমি আর কিছু তো পারো না, কেবল ঝগড়া করতেই পারো–
চৌধুরী মশাই বললেন–আমি ভালো কথাই বলছি, আর তোমার কাছে এটা ঝগড়া করা হলো?
–ঝগড়া না তো কী! কোথায় আমি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কথা বলতে এলাম আর তুমি এলে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে! তুমি ঘুমোও না। তোমার কি ঘুমও পায় না? তোমায় কে জেগে থাকতে বলেছে?
চৌধুরী মশাই বললেন বাড়ির মধ্যে ছেলের এই কাণ্ড, এতে কারো ঘুম আসে?
–তা তুমি ঘুমোও আর না-ঘুমোও আমাকে ঘুমোতে দাও। সারা দিন সংসারে খেটে খেটে আমার হাড়-মাস কালো হয়ে গেছে, আমি একটু ঘুমোব, কাল সকালে উঠেই তো আবার আমাকে সংসারের পিণ্ডি রাঁধবার ব্যবস্থা করতে হবে। তখন দানা-পানি না পেলে তো আবার তোমরাই চেঁচাবে
চৌধুরী মশাই বললেন–তোমার শরীর খারাপ, তুমি অত খাটোই বা কেন? তুমি ছাড়া কি আর লোক নেই? গৌরী সারা দিন কী করে? ও তো কেবল নেচে নেচে বেড়ায় দেখেছি। ওকে দিয়ে কিছু করিয়ে নিতে পারো না? গৌরী রয়েছে, বিষ্টুর মা রয়েছে, লোকের তো তোমার আমি কমতি রাখি নি। তাদের কি কেবল বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবার জন্যে রেখেছি! তারা যদি কিছু কাজই না করে তো তাদের ছাড়িয়ে দাও না। আপদ বিদেয় হোক–
প্রীতি আর পারলে না। বললে–দেখ, যা জানো না তা নিয়ে কথা বলতে এসো না। বাইরে থেকে ও-সব অনেক কথা বলা যায়, কথা বলতে তো কারো ট্যাক্স লাগে না, হাতে কলমে করলে তবে ঠ্যালা বুঝবে!
চৌধুরী মশাই বললেন–তা তুমি একদিন রান্নাঘরে না-গিয়েই দেখ না, কাজ ঠিক হয় কি না, কেউ খেতে পায় কি না–
প্রীতি বললে–সে আমি যখন মরে যাবো তখন তোমরাই দেখো। আমি তখন আর দেখতে আসছি নে–
–ওই তো! ওই তোমার এক কথা। যখন তর্কে হেরে যাবে তখন ওই মরার কথা বলা ছাড়া তোমার উপায় নেই–
–তুমি থামো দিকি! তুমি থামো।
বলে রেগে চেঁচিয়ে উঠলো প্রীতি। বললে–আমার সঙ্গে যদি কথা বলতে তোমার এতই খারাপ লাগে তো আমার ঘরে আসো কেন? এখানে না শুয়ে চণ্ডীমণ্ডপে শুলেই পারো। কাল থেকে আমি তোমার সেই ব্যবস্থাই করে দেব–
বলে উল্টো দিকে পাশ ফিরে শুলো। তারপর বললে–আমার এখন কিছু ভাল লাগছে না, আমার ঘুম পেয়ে গেছে, আমি ঘুমোব–
বলে প্রীতি পাশ বালিশটা জড়িয়ে ধরে দু চোখ বুঁজে ঘুমোবার চেষ্টা করলে। চারদিকে নিঝুম। কোথাও কোন শব্দ নেই। নবাবগঞ্জ এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। এই সব অন্ধকার রাত্রে বারোয়ারিতলা থেকে মাঝে মাঝে যাত্রার গানের শব্দ আসে, এবার পূজোর সময় তাদের ‘পাষাণী’ পালা হবে। প্রকাশ বলে গেছে। নিশ্চয় অনেক রাত হয়েছে। প্রীতি দু চোখের পাতা জোর করে খুঁজে ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগলো। খানিক পরে একসময়ে পাশ থেকে চৌধুরী মশাইএরও নাক ডাকার শব্দ শুরু হলো। অদ্ভুত মানুষটা। বেশ চট করে কথা বলতে বলতে ঘুমোতে পারে। কাজের মধ্যেও মানুষ যে কেমন করে এমন নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারে সেইটেই আশ্চর্য। তার মানে মনে কোনও দাগ লাগে না মানুষটার। যেমন সারাদিন নাকে দড়ি দিয়ে খাটবে, তেমনি আবার রাত্রে বিছানায় পড়েই ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমোবে। প্রীতিরও যদি ওই রকম হতো তো ভালো হতো। জীবনে কোনও দিন বিছানায় শোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এলো না। এও এক রকমের রোগ! রোগ বই কি! নইলে সারাদিন তো ধকল কম যায় নি। যত রাত বাড়বে ততই হাই উঠবে। কিন্তু চোখ দুটো বোঁজার সঙ্গে সঙ্গে যত ঘুম সব যে কোথায় পালিয়ে যাবে ঠিক পাওয়া যাবে না।
