প্রকাশ মামা নির্ভয় দিলে। বললে–হিতে-বিপরীত কী হবেটা শুনি? হবেটা কী?
প্রীতি বললে–যদি খোকা বিবাগী হয়ে বেরিয়ে যায়? এখন তো তবু বাড়িতে আসছিল রাত্তিরবেলাটা, এর পর যদি বাড়ি আসাও ছেড়ে দেয়?
–পাগল হয়েছ? বাড়িতে না এলে খাবে কোথায় শুনি? ঘুমোনো যেখানে-সেখানে চলতে পারে, কিন্তু খাওয়া? সেটা কে দেবে ওকে? তোমার ছেলের তো সে ক্ষমতাও নেই যে নিজে রোজগার করে খাবে! তাহলে বাড়ি আসবে না তো যাবে কোথায়? তুমি অত ভাবছো কেন দিদি, আমি তো আছি। এতে ফয়সালা না হয় তো অন্য পথও তো আছে–
–অন্য কী পথ?
প্রকাশ মামা বললে–সে একরকম মাদুলি আছে, সে একেবারে অব্যর্থ–
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, মাদুলি পরতে বয়ে গেছে তোর ভাগ্নের। বলে চন্নোমেত্তোরই ফেলে দিলে, সে আবার পরবে মাদুলি!
প্রকাশ মামা বললে–আরে সদা মাদুলি পরবে কেন। মাদুলি পরিয়ে দেব বউমাকে। দেখবে সেই মাদুলি পরিয়ে দিলে সদা একেবারে বউমার পা চাটতে চাটতে পায়ের চামড়া ক্ষইয়ে ফেলবে তবে ছাড়বে-তুমি যদি ফুলশয্যের দিনের ব্যাপারটা আগে বলতে আমি তো সেই ব্যবস্থাই করতুম। তাহলে এই বাবাজীর পেছনে এত খরচান্ত করতেও হতো না—
ভেতর থেকে সদা তখনও দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে আর বলছে–মা, দরজা খুলে দাও, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, দরজা খোল মা…
প্রকাশ মামার মুখ দিয়ে তখন হাসি বেরোচ্ছে। জয়ের হাসি। বাহাদুরি দেখাবার এমন সুযোগ তার বহুদিন আসে নি। যেন সদানন্দর সব রোগের অব্যর্থ ওষুধ সে প্রয়োগ করেছে। এবার রোগী বাঁচবেই।
প্রকাশ দিদির মুখের কাছে মুখ এনে চুপি চুপি বললে–তুমি এবার নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমোওগে। আর কোনও ভয় নেই। তোমার শরীর খারাপ, তুমি কেন আর কষ্ট করবে–
কিন্তু প্রীতি যেন তখনও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। বললে–শেষকালে উল্টো ফল হবে না তো রে? আমার বাপু ভয় করছে কিন্তু–
–ভয়? প্রকাশ অবাক হয়ে গেল। বললে–আমি রয়েছি তবু তোমার ভয়? তুমি জানো আমি এর চেয়ে বড় বড় কেস মিটিয়ে দিয়েছি, আর তুমি এখনও সন্দেহ করছো?
প্রীতি বললে–আমি বউমার কথা ভেবে ভয় পাচ্ছি। হাজার হোক বেচারি তো নতুন এসেছে আজ। এই সবে মা মারা গিয়েছে। আর তা ছাড়া বউমাকে তো আগে থেকে সাবধান করে রাখা হয়নি।
প্রকাশ বললে–বর বউ এক ঘরে শোবে তাতে আবার সাবধান করে দেওয়ার কী আছে? মেয়েমানুষের চরিত্র তুমি আমাকে শেখাচ্ছো? তুমি ভাবছো আমি মেয়েদের স্বভাব জানি না? সদা যদি একটু চালাক হয় তো আজকে এই চান্স আর ছাড়বে না। প্রথম দিন যা করেছে তা করেছে, আজকে যদি আবার এ চান্স হাতছাড়া করে তো ওর কপালে অনেক দুঃখু আছে, এই তোমাকে বলে রাখলুম–
প্রীতি বললে–আর কতক্ষণ দরজায় এমনি করে শেকল দিয়ে রাখবি?
প্রকাশ হাসলো। বললে–ঘি যখন গলে যাবে তখনই দরজা খুলে দেব–
–তার মানে?
–তার মানে বুঝলে না তুমি! আগুনের পাশে ঘি রাখলেই তো গলে যায়। আর একটু সবুর করো না, তখন ওই সদা নিজেই ভেতর থেকে দরজায় খিল বন্ধ করে দেবে–আমাকে আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না–
প্রীতি বললে–কী জানি বাপু তোর কী মতলব, তুই থাক, আমি যাই, আমার ঘুম পেয়ে গেছে, আমি আর পারছি নে–
বলে প্রীতি তার নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। চৌধুরী মশাই তার আগেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। তিনিও তখন হাঁ করে ছিলেন সব শোনবার জন্যে। গৃহিণীকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন–কী হলো? ওদিকের কী খবর?
প্রীতি বললে–প্রকাশ রইলো আমি চলে এলুম। আমার ঘুম পেয়ে গেছে–
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–তা এখনও কি প্রকাশ সেই রকম শেকল দিয়ে রেখেছে নাকি?
–রেখেছে।
–কখন খুলবে?
প্রীতি বললে–কে জানে কখন খুলবে! ছেলের যেমন কাণ্ড! এত ছেলের বিয়ে দেখেছি, এমন কাণ্ড বাপের জন্মে কখনও কারো দেখি নি–এও আমার কপাল!
চৌধুরী মশাই এ-কথার কিছু জবাব দিলেন না। আর কী জবাবই বা তাঁর দেবার ছিল। এমনধারা কাণ্ড তিনিও জীবনে দেখেন নি! লোকের বিয়ে হয়, বর-কনে ফুলশয্যার রাত থেকে এক বিছানায় শোয়, পরের দিন সারা রাত জাগার দরুণ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। তার পরদিন থেকে লোকে কখন রাত হবে কখন আবার বউএর সঙ্গে দেখা হবে সেই আশায় সারাদিন ছটফট করে। তাঁর নিজেরও একদিন বিয়ে হয়েছিল। তিনিও বিয়ের পর তাই-ই করেছেন। এই-ই হলো নিয়ম। এইটেই তো স্বাভাবিক ব্যাপার। সকলের জীবনে এই-ই তো ঘটে! তা নয়, এ কী অসম্ভব কাণ্ড! এ কথা লোকে জানলে তারাই বা কী ভাববে! বউমার বাবার কানে গেলে তিনিই বা কী ভাববেন! কোথাও কিছু নেই, ঠাকুরদাদা কী দোষ করলো, বাবা কী অপরাধ করলো তাই নিয়ে কোনও ছেলে এমন পাগলামি করেছে এ-কথা কখনও কেউ শুনেছে?
চৌধুরী মশাই গৃহিণীর দিকে ফিরে বললেন–ওগো, শুনছো!
গৃহিণী জেগেই ছিলেন। বললেন–কী?
–বউমাকে বলে দিয়েছ তো যে এ-সব কথা যেন বেয়াই মশাইকে না বলে?
প্রীতি বললে–বলেছি তো। আগেই বলেছি, বার বার এ-সব কথা বলতেও আমার লজ্জা করে। শাশুড়ী হয়ে এসব কথা বউকে বার বার বলতে ভালো লাগে?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা আমারই কি বলতে ভালো লাগে মনে করো? কিন্তু কী করবো বলো? ছেলে যদি এমন বেয়াড়া না হতো আমিই কি ভাবছো এসব নিয়ে আলোচনা করতুম?
প্রীতি বললে–তা তোমাদেরই তো যত দোষ!
–কেন? আমরা আবার কি দোষ করলুম? আমরা মানে কারা?
