লজ্জায় মাথা নিচু করে সদানন্দ আবার তার বাড়ির পথ ধরলে। অন্য দিন হলে সে কুকুরটাকে তাড়া করতো। কিম্বা তাকে লক্ষ্য করে একটা ঢিলও ছুঁড়তো। কিন্তু আজ তার মনে হলো কুকুরটার কোনও অপরাধ নেই। সে কোনও অন্যায় করেনি। নবাব গঞ্জের মানুষও যে তাকে এতদিন এমনি করে কামড়াতে আসে নি এই-ই যেন তার পরম সৌভাগ্য!
প্রকাশ মামাই প্রথমে তাকে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েই চেঁচিয়ে উঠেছে–ও দিদি এই যে, এতক্ষণে তোমার খোকা এসে গেছে
গৌরী পিসীও রান্নাবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। সকলকেই বলা ছিল বউমা যে বাড়িতে এসেছে এ কথা কেউ যেন খোকাকে না জানায়! সদানন্দ সকলের মুখের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। এমন করে তো অন্যদিন কেউ চায় না তার দিকে। অন্তত কেউ এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখে না।
মা বললে–আয় খেতে বোস–
সদানন্দ কুয়োতলা থেকে হাত-পা ধুয়ে এসে যথারীতি খেতে বসলো। প্রতিদিনকার নিয়ম বাঁধা কাজ। সেই সকালবেলা খেয়ে দেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া আর রাত্রে এসে খেয়ে নিজের ঘরটাতে শুয়ে পড়া। আর তাও খাওয়া-না-খাওয়া। কোনও রকমে গলা দিয়ে ভাত সেঁধিয়ে দেওয়া।
মা বললে–হ্যাঁ রে, সারাদিন কোথায় থাকিস? তোর কি ক্ষিধেও পেতে নেই রে? না কারো বাড়িতে খেয়ে নিস?
এ অভিযোগ নিত্য-নৈমিত্তিক। এতে কান দেওয়ার মত ছেলে সদানন্দ নয়।
গৌরী পিসী এসে ভাতের থালা রেখে দিয়ে গেল সামনে।
মা বললে–ওরে খাবার আগে এইটে চুমুক দিয়ে খেয়ে নে বাবা–যেন পায়ে না ঠেকে–বলে ছোট পাথরের একটা বাটি সামনে এগিয়ে দিলে।
–কী এটা?
–পূজোর চন্নোমেত্তর! পূজো হয়েছিল তারই পেসাদ।
সদানন্দ বললে–এ আমি খাবো না–
–কেন, খাবি নে কেন? পেসাদ খেতে দোষ কী তোর?
সদানন্দ বললে–এ খেয়ে কী হবে?
মা বললে–খেলে তোর ভালো হবে। তোর মতিগতি ফিরবে—
সদানন্দ বললে–আমার মতিগতি কি খারাপ যে ফেরাতে হবে?
মা বললে–অত তক্কো করিস নি তুই, আমি বলছি খেয়ে নে, মার কথা শুনতে হয়, খা, খেয়ে নে–
সদানন্দ হাত দিয়ে বাটিটা ঠেলে দিতেই বাটিটা উল্টে জল পড়ে গেল।
মা বললে–ও কী করলি? ঠাকুরের পেসাদ ফেলে দিলি? ওতে যে পাপ হয় রে–
–হোক পাপ। পাপ হলে আমার হবে। আমার পাপ হলে তোমাদের কী? তোমরা আমার কথা কেউ ভাবো?
বলে সদানন্দ থালা থেকে ভাত তুলে মুখে পুরতে লাগলো। যেন কোনও রকমে ভাত গিলে মার সামনে থেকে উঠে যেতে পারলে সে বাঁচে। তারপর যা পারলে খেয়ে নিয়ে কুয়োতলায় গিয়ে মুখ ধুয়ে তার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়লো।
প্রকাশ মামা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ততক্ষণ আড়ালে ওৎ পেতে ছিল। সদানন্দ ঘরে গিয়ে ঢুকতেই বাইরে থেকে দরজায় শেকল তুলে দিয়েছে।
সদানন্দর তখন আর কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাড়াতাড়ি গায়ের জামাটা খুলেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলে। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন সাপের ছোবল খেয়ে দাঁড়িয়ে উঠে পড়লো। মনে হলো পাশে যেন কে শুয়ে রয়েছে। একটা কী যেন সন্দেহ হলো তার। তারপর জানলাটা খুলে দিলে। ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গে চাঁদের আলো এসে বিছানাতে পড়তেই দেখলে নয়নতারা। নয়নতারা বিছানার একপাশে সরে গিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে।
কিন্তু এমন করে তার বউ যে হঠাৎ এসে পড়বে তা সদানন্দ কল্পনা করতে পারে নি। নয়নতারার মা মারা যাওয়ার খবর পেয়ে সে সেখানে চলে গিয়েছিল এই খবরটাই সে জানতো। কিন্তু ফিরে আসার খবরটা তো তাকে কেউই দেয় নি।
কী করবে সে বুঝতে পারলে না। ঘটনার আকস্মিকতায় একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল প্রথমে। তার পরে সোজা ঘর থেকে বাইরে যেতে গিয়েই বুঝলে বাইরে থেকে শেকল বন্ধ।
সদানন্দ দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলোমা, মা, দরজা খোল, দরজা বন্ধ করে দিলে কেন? দরজা খোল মা–
প্রকাশ মামা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল মজা দেখবার জন্যে। দিদির দিকে চেয়ে বললে– খবরদার, দরজা খুলে দিও না যেন–ওই রকম বন্ধ থাকুক–
প্রীতির তখনও সন্দেহ হচ্ছিল। বললে–কিন্তু শেষে যদি খোকা কিছু করে বসে?
–কী করে বসবে? করলে তখন তো আমি আছি। আমার কাছে তো তারও ওষুধ আছে।
সদানন্দ ভেতর থেকে তখনও দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে–মা, দরজা খোল মা–
চৌধুরী মশাইও বাবাজীকে রেখে দেখতে এসেছিলেন। বললেন–সেই চন্নোমেত্তরটা খাইয়েছে তো?
প্রীতি বললে–খোকা কি তোমার সেই ছেলে যে খাবে? আমি পাথর বাটিটা দিতেই সে ঠেলে ফেলে দিলে।
চৌধুরী মশাই রেগে গেলেন। বললেন–তা এই সামান্য কাজটুকুও তোমাদের দিয়ে হবে না? এখন বাবাজীকে আমি কী বলি বলো তো?
প্রীতি বললে–তুমি আর কথা বলো না। এতই যদি তোমার ক্ষমতা তো তুমি নিজেই খাওয়াবার ভার নিলে পারতে, দেখতুম তোমার ছেলে কী রকম বাধ্য তোমার! তুমি কি মনে করেছ আমি ওকে খাওয়াবার চেষ্টা করিনি?
প্রকাশ মামা চৌধুরী মশাইকে ঠেলে সেখান থেকে সরিয়ে দিলে। বললে–আপনি যান তো জামাইবাবু এখান থেকে, আপনি যান। আপনি গিয়ে বাবাজীকে দেখুন গে। আমরা এ-দিকটা সামলাচ্ছি, আপনি যান–
চৌধুরী মশাই আর দাঁড়ালেন না। কিন্তু মন থেকে তাঁর দুর্ভাবনাও গেল না। এত সাধ্য সাধনা, এত হোমব্রত, এত পূজো-আস্রা, এত টাকা খরচান্ত, সবই কি তাহলে ব্যর্থ হলো? তাহলে কি ভগবান বলে কেউ নেই?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ রে প্রকাশ, শেষকালে হিতে বিপরীত হবে না তো?
