ভাস্কর রাহা মাথা ঝুঁকিয়ে বসে ছিলেন, মুখ তুলে বললেন, বোধহয় সবাই জেনে ফেলেছিল। কারণ, ও খুব একটা রাখো-ঢাকো মেয়ে ছিল না। তা ছাড়া ওর ভয়ডরও কম ছিল। যেমন, কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনে-মানে, কালও একরকম হাটের মাঝে ওর সেই সিক্রেট নিয়ে প্রেমময় চৌধুরিকে একটু হিন্ট দিয়েছিল। ভারি অদ্ভুত হিন্টস –।
কৌতূহল ফুটে উঠল অশোকচন্দ্রের উজ্জ্বল চোখে? কী হিল্স? শুধু দুজন লেখকের নাম–পাঁচকড়ি দে আর এডগার ওয়ালেস।
এসিজি রঘুপতি যাদবের দিকে তাকালেন। রঘুপতি প্যাড আর পেন নিয়ে নোট নিতে ব্যস্ত ছিল। মুখ তুলে এসিজির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মাথা হেলিয়ে জানাল, সে লিখে নিয়েছে।
এই হিন্টসের মানে?
কী জানি! বলতে পারব না। দেবারতি কখন যে সিরিয়াসলি কথা বলত আর কখন ঠাট্টা করত, সেটা বোঝা মুশকিল ছিল।
আচ্ছা, এই কনফারেন্সের শুরুর দিন থেকে দেবারতি মানিকে যেভাবে দেখেছেন, যা যা ও করেছে, বলেছে–সেগুলো একটু গুছিয়ে বলুন তো।
চুরুট নিভে গিয়েছিল। ছাই ঝেড়ে ফেলে সেটাকে পকেটে রেখে দিলেন রাহা। ছোট্ট করে গলাখাঁকারি দিয়ে নীচু গলায় অত্যন্ত ধীরে সব বলে গেলেন। অশরীরী দেবারতি মানি আবার চলেফিরে বেড়াতে লাগল ঘরের মধ্যে–অন্তত ভাস্কর রাহার চোখের সামনে।
ভাস্কর রাহার কথা শুনতে শুনতে উঠে দাঁড়িয়েছেন এসিজি। ফুরিয়ে আসা সিগারেটটা খুঁজে দিয়েছেন টেবিলের অ্যাশট্রেতে। তারপর মাথা নীচু করে একমনে শুনে গেছেন ভাস্করের কথা।
রাহার কথা শেষ হল একসময়। রত্নাবলী চোখ ঢেকে বসে রইলেন। রূপেন মজুমদার দাঁত দিয়ে নখ কাটছিলেন। আর উৎপলেন্দু কেমন এক অস্বস্তি অনুভব করছিলেন।
মিস মানি আপনার কোনও ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন?
প্রশ্নটা করেছে রঘুপতি যাদব। দেবারতির শেষ লেখায় ইন্টারভিউর ব্যাপারে একটা ইঙ্গিত ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, রঘুপতির সন্দেহভাজনের তালিকায় প্রথম স্থানটি এখনও পর্যন্ত কে দখল করে রয়েছে।
রাহা মুখ তুলে রঘুপতিকে দেখলেন। দেখে যতটা আই কিউ.র মালিক বলে মনে হয় আসলে তার চেয়ে বেশি।
শান্ত স্বরে ভাস্কর রাহা বললেন, হ্যাঁ, কাল লাঞ্চের সময় ও আমার একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিল। তখন আমরা একেবারেই মামুলি কথাবার্তা বলেছি। কারণ, দেবারতি সময়-সুযোগ পেলেই আমার ইন্টারভিউ নিত। একটু থেমে আবার মুখ খুললেন? তবে দেবারতি আমার একার ইনটারভিউ নেয়নি। ও আমাকে বলেছিল, আমাদের দশজন লেখক-লেখিকার ইন্টারভিউ ও নেবে। তারপর সবগুলো মিলিয়ে একটা স্টোরি করবে ওর কাগজে।
সহযোগিতা করার জন্যে ধন্যবাদ, ভাস্করবাবু, এসিজি বললেন, তবে এবার আপনাকে লাস্ট একটা রিকোয়েস্ট করব। আপনারা গোয়েন্দা কাহিনির লেখক সুতরাং, বলতে গেলে আপনারা নিজেরাই এক-একজন গোয়েন্দা। যেমন, আপনার গোয়েন্দা সুরজিৎ সেন। দেবারতি মানিকে কেমন করে খুন করা হয়েছে সেটা আমি সুরজিৎ সেনের কাছে জানতে চাই। আশা করি আপনি এ-আর্জিটুকু মঞ্জুর করবেন।
অশোকচন্দ্র গুপ্তের কথা বলার ঢঙে কৌতুক ছিল বটে, কিন্তু ঠাট্টা অথবা ব্যঙ্গ ছিল না।
সুতরাং রাহার চওড়া কপালে চিন্তায় ভাঁজ পড়ল। সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে কয়েক মিনিট সময় নিলেন। সচেতনভাবেই তিনি ইয়ান ফ্লেমিং-এর জেমস বন্ড আর ড্যাশিয়েল হ্যাঁমেটের গোয়েন্দা স্যাম স্পেডের আদলে সৃষ্টি করেছেন সুরজিৎ সেনকে। অধ্যাপক অশোকচন্দ্র গুপ্ত যে সুরজিৎ সেনকে মনে রেখেছেন সেটা লেখকের পক্ষে যথেষ্ট শ্লাঘার বিষয়। সামান্য হেসে ক্রাইম কাহিনির অসামান্য লেখক থেমে-থেমে পেশ করলেন সুরজিৎ সেনের সমাধান।
সুরজিতের মনে প্রথম যে-প্রশ্নটা জাগত সেটা হল : এ-হোটেলের সব ঘরের লক একই চাবি দিয়ে খোলা যায় না তো! কারণ–।
সরি, জনাব, রাহাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠেছে ইন্সপেক্টর যাদব, এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারের কাছ থেকে আমরা ইনফরমেশন নিয়েছি। নো মাস্টার কি। আপনার কেতাবি জাসুসকে অওর একবার কৌশিশ করতে হবে, মিস্টার রাহা।
রাহা রঘুপতি যাদবের দিকে একবার তাকিয়েছেন, তারপর ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বজায় রেখেই বলেছেন, তা হলে সুরজিতের প্রথম অনুমান ভুল হল। দ্বিতীয় চেষ্টা হিসেবে বলা যেতে পারে, খুনি কাজ সেরে বাইরে বেরিয়ে এসে শক্ত কোনও তার বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে তিনশো আট নম্বরের দরজা লক করে দেয়।
মাথা নাড়লেন এসিজি ও সরি, ভাস্করবাবু। কাল রাতে আমি আর রঘুপতি হাতেকলমে সে-চেষ্টা করে দেখেছি, পারিনি। তা ছাড়া আতসকাঁচ দিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমরা দেবারতি মানির দরজার লকের গায়ে সন্দেহজনক কোনও আঁচড়ের দাগ দেখতে পাইনি।
ভাস্কর রাহা একটু অপ্রস্তুত হলেন। তাঁর গালে রক্তের উচ্ছ্বাসের ছোঁওয়া লাগল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, ধরা যাক, দেবারতিকে খুন করার পর খুনি দরজার চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর দরজা লক করে চাবিটা…বাইরের টেরাস থেকে ছুঁড়ে দিয়েছিল দেবারতির ঘরের জানলা দিয়ে। তখনই চাবিটা গিয়ে পড়ে জানলার কাছে রাখা টেবিলের ওপরে।
কিন্তু কথা শেষ করেই আপনমনে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন ভাস্কর রাহা। বললেন, নাঃ, এই সলিউশনটা বড্ড কষ্টকল্পিত…
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, রত্নাবলী বলে উঠলেন তড়িঘড়ি করে, নীচের টেরাস থেকে পাঁচতলার ঘরের জানলা দিয়ে চাবি ছুঁড়ে দেওয়াটা হয়তো অসম্ভব নয়, তবে অবাস্তব। তা ছাড়া কেউ দেখে ফেলার ভয়ও রয়েছে। বিশেষ করে মেয়েটা নীচে পড়ার সময় যখন অমন সাঙ্ঘাতিক একটা শব্দ হয়েছে।
