একটু দম নিলেন এসিজি। চায়ের কাপ খালি হয়ে গিয়েছিল। সেটা টেবিলে আলতো করে নামিয়ে রেখে উদাস চোখে তাকালেন জানলার বাইরে। সেখানে দূরের ঘরবাড়ি, টিভি অ্যান্টেনা, পাম গাছের পাতা, নীল আকাশ আর চড়া রোদ্দুর। জানলার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। শান্ত স্বরে শেষ কয়েকটা কথা বললেন, লাস্ট এবং পাঁচ নম্বর ইনফরমেশন হল, কাল রাতে হয়তো সেই বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে দেবারতির একটা মোকাবিলা হয়েছিল। হয়তো এই ঘরেই। তারপর…তারপর নটে গাছটি মুড়োল।
ঘরের সবাই চুপ। শুধু কারও কারও চায়ের কাপে শেষ চুমুকের শব্দ।
কিছুক্ষণ পর অশোকচন্দ্র পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালেন। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সিগারেট এবং চুরুট ধরালেন উৎপলেন্দু এবং ভাস্কর। ওঁদের দুজনের কপালেই চিন্তার ছাপ। নাকি দুশ্চিন্তার ছাপ?
কুলকুল করে ধোঁয়া ছাড়লেন অশোকচন্দ্র। কাশির দমক এল হঠাৎ। কাশলেন কয়েকবার। ঊর্মিলা সামনে থাকলে নির্ঘাত হাত থেকে সিগারেটটা ছিনিয়ে নিত। ওর মায়ের স্বভাব পেয়েছে। ওর মা চলে গেছে প্রায় নবছর। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে ঊর্মিলা সেই শূন্যস্থানটা বুঝতে দেয়নি। অথচ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট না থাকলে কি থিঙ্কিং মেশিন কখনও কাজ করতে পারে।
অনেকক্ষণ পর অশোকচন্দ্র গুপ্ত কথা বললেন আবার, আমাদের যা বলার মোটামুটি বললাম। এবার আপনাদের পালা। ভাস্করবাবু, আপনাকে দিয়ে কি আমরা এখনই শুরু করতে পারি?
ঘরের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় একেবারে ডুবে ছিলেন ভাস্কর রাহা। এসিজির কথায় চমকে উঠে ফিরে তাকালেন তার দিকে। দুচোখে প্রশ্ন।
এসিজি আবার কথাটা বললেন।
অদ্ভুত হতাশার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন ভাস্কর রাহা। ক্লান্ত স্বরে বললেন, বলুন, কী জানতে চান।
ঘটনার সবচেয়ে নোংরা অস্বস্তিকর অংশ শুরু হল তাহলে এইবার। ভাবলেন রত্নাবলী। কিন্তু মিস্টার গুপ্ত কি আমাদের সামনেই ভাস্করবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন? আলাদাভাবে হলে কি ব্যাপারটা ভালো হত না।
অশোকচন্দ্র একটা সোফা টেনে নিলেন বিছানার দিকে, ভাস্কর রাহার কাছাকাছি। মেঝেতে কার্পেট থাকায় কোনওরকম শব্দ হল না। সোফায় আরাম করে বসে পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেটে টান দিলেন। চোখ থেকে সরু ফ্রেমের চশমাটা খুলে শূন্যে উঁচু করে ধরে অদৃশ্য কিছু একটা দেখার চেষ্টা করলেন। তারপর চশমাটা আবার ঠিকঠাক করে বসালেন নাকের ওপরে। বারকয়েক নাক কুঁচকে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ধীরে-ধীরে বললেন, ভাস্করবাবু, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আবেগ আছে। একটু আগে উৎপলেন্দুবাবু সে-প্রমাণ দিয়েছেন। তা সেই আবেগগুলো হল ইলেকট্রিক পোটেনশিয়ালের মতো। দুটো মানুষের মধ্যে যখন সম্পর্ক তৈরি হয় তখন তাদের আচরণ কীরকম হবে সেটা নির্ভর করে তাদের পোটেনশিয়াল বা আবেগের ওপরে। অর্থাৎ, কোনও কন্ডাক্টরের দুটো পয়েন্টের মধ্যে পোটেনশিয়াল ডিফারেন্সের মান অনুযায়ী যেমন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় অনেকটা সেইরকম আর কী! আপনারা, লেখকরা, সাধারণত আবেগপ্রবণ মানুষ। আপনাদের প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে তীব্র আবেগ–হাই পোটেনশিয়াল। এই তীব্র আবেগ থেকেই হয়তো ঘটে গেছে দেবারতি মানির খুনের ঘটনা। ঘটনার পর খুনি হয়তো অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে, অনুতাপে সে হয়তো মর্মাহত, কিন্তু… একটু থামলেন এসিজি। তারপর ও কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। রঘুপতি যাদব অনেক আশা নিয়ে আমাকে ডেকে এনেছে।
ভাস্কর রাহা নীরবে চুরুটে টান দিচ্ছিলেন। এসিজি তাকে এখনও কোনও প্রশ্ন করেননি। গল্পে-উপন্যাসে আর্মচেয়ার ডিটেকটিভরা প্রচুর প্রশ্ন করে থাকেন, অনেক জবানবন্দী আদায় করেন গোপনে। কিন্তু এই অহঙ্কারী পলিতকেশ বৃদ্ধ কোন পথে হাঁটতে চাইছেন?
ভাস্করবাবু, আপনারা লেখক মানুষ আবার কথা শুরু করেছেন অশোকচন্দ্র, খুন খারাপি আপনাদের রোজকার অভ্যাসের ব্যাপার মানে, কাগজে কলমে। সুতরাং আপনারাই ভালো বুঝবেন, কোনও খুনের ঘটনায় কোন-কোন তথ্য তদন্তের পক্ষে জরুরি। আমি সেই তথ্যগুলোই আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছি। পরে যদি নিতান্ত দরকার হয়, তখন দু-চারটে প্রশ্ন-টশ্ন করা যাবে।
ভাস্কর রাহা নিজেকে গুছিয়ে নিলেন মনে-মনে। চুরুটে কয়েকবার ঘনঘন টান দিলেন। তারপর বললেন, মিস্টার গুপ্ত, আপনার স্টাইলেই কয়েকটা বেসিক ইনফরমেশন আপনাকে দিই। কনফারেন্সের প্রথম দিন আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে দেবারতি বলে, ও একটা টপ সিক্রেট জানতে পেরেছে। সেটা জানাজানি হলে কনফারেন্স মাটি হয়ে যাবে, খবরের কাগজে ফ্রন্টপেজ নিউজ হবে। তবে দেবারতি তখন মদ খেয়েছিল, একটু টিপসি অবস্থায় ছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, কনফারেন্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও যেন কিছু না করে। যাই হোক, ও আমার কথায় রাজি হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে, ওর সেই সিক্রেট ফাস হলে বাংলা ক্রাইম ফিকশনের মারাত্মক ক্ষতি হবে, একটা বিরাট সেটব্যাক হবে। ষাটের দশক থেকে এই সাহিত্য নিয়ে কম লড়াই হয়নি। দেবারতি সেদিনের মেয়ে ও সে-সব লড়াইয়ের কী জানে! সুতরাং, আমি ভেবেছিলাম, পরে ওকে বুঝিয়ে নিরস্ত করব। কিন্তু সে সুযোগ আর পেলাম কোথায়!
ওর এই সিক্রেট জেনে ফেলার খবরটা আপনি ছাড়া আর কে কে জানতেন? এসিজি প্রশ্ন করলেন।
