-আমি আপনার কথা বুঝি কিন্তু। বিদুর আশার দৃষ্টি মেলে কপোতাক্ষ দিকে তাকাল, সবাই এখন কিছু কাজের বিনিময়ে প্রাপ্তিযোগ আশা করে। আমাদের দল তাদের কিছু পাইয়ে দিতে পারবে না। সমস্যাটা এখানে বেশি দেখা দিচ্ছে।
–আমি তোমার সমস্যাটা বুঝতে পারছি। কপোতাক্ষ থমথমে গলায় বললেন, পাইয়ে দেবার দল করলে সেই দলের আয়ু বেশি দিন হয় না। আমরা ওপথে হাঁটব না। আমাদের পথ ভিন্ন।
লাবণি বলল, আমি আপনার কথাকে সমর্থন করি। আমরা কাকে কী দিতে পারব, আমাদের সামর্থ্য বা কোথায়? তবু আমরা খাসজমি দখলের লড়াইয়ে নেমেছি। পুলিশ প্রশাসন আমাদের সমর্থন করেনি। ওরা আমাদের গ্রেফতার করেছে, চালান দিয়েছে। শারীরিক অত্যাচার সত্ত্বেও আমাদের আন্দোলন থেমে নেই। আমরা মালিকপক্ষকে টলিয়ে দিতে পেরেছি–এটাই আমাদের সফলতা। এটাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়।
আলোচনার মাঝখানে সূর্য উঠে গেল মাথার উপর। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন কপোতাক্ষ, এবার আমাকে উঠতে হবে। বেলা অনেক হল।
-সে কী এই দুপুরবেলায় আপনি কোথায় যাবেন? লাবণি আন্তরিকতার সঙ্গে বলল, আজ দুটো ডাল-ভাত এখানেই খেয়ে নেবেন। আমি আপনাকে আসতে দেখে হাঁড়িতে চাল দিয়ে দিয়েছি।
-সেই ভালো, অনেকদিন আপনি এই গরীব বাড়িতে খাননি। বিদুরের হাসির মধ্যে সূক্ষ্ম রসিকতা মিশে ছিল।
কপোতাক্ষ বললেন, খাওয়ার দিন কি পালিয়ে যাচ্ছে? আসা-যাওয়া চলতেই থাকবে। আজ আমাকে যেতে দাও। তোমাদের বৌদি সকালে খুব মাথা গরম করল। আজ আমি যাই, পরে একদিন শান্তিমতো খাবো।
লাবণি আশাহত হলেও তার ব্যবহারে তা প্রকাশ পায় না। কপোতাক্ষর মতো মানুষ এ গ্রামে পাওয়া খুব দুষ্কর। তিনি গরীব মানুষদের কাছে জ্যান্ত ভগবান। তাঁর ব্যবহার ধনী-দরিদ্র সবার জন্য একরকম।
লাবণি এই মানুষটার কাছে চির ঋণী। সে দিনের ঘটনাটা লাবণি কি এই জীবনে ভুলতে পারবে নাকি তা ভোলা সম্ভব? কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে ফিরতে সেদিন দেরী হয়েছিল অনেকটা। লালগোলা ট্রেন লেট করল দেবগ্রাম পৌঁছাতে। শেষ বাস চলে গিয়েছে কালীগঞ্জে। চৌমাথার কাছে চলে এসে দিশেহারা লাবণি কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। এদিকে আকাশের অবস্থা ভালো নয়। মহিষবর্ণ মেঘের ভেতর বিদ্যুৎ-এর সাপ ফণা তুলে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে।
দু’বছর কলেজ যাতাযাত হল লাবণির কোনোদিন সে এমন বিপদে পড়ে নি। বাবা বেঁচে থাকলে ঠিক সাইকেল নিয়ে দেবগ্রামে হাজির হত। সেদিন বাবার অনুপস্থিতি সে মর্মে মর্মে টের পায়।
দেবগ্রামে থেকে যাবে তেমন কোনো জানাশোনা নেই। এত বড়ো শীতের রাত সে পার করবে কীভাবে? এদিকে আকাশের হুঙ্কারে বিদ্যুৎ-এর মধ্যে ঝরে যাচ্ছে অহঙ্কার। বৃষ্টি আজ পাগল হয়ে নাচবে। তার উন্মাদ নৃত্যে ছারখার হয়ে যাবে এ অঞ্চল। এখন একটাই উপায় দেবগ্রাম স্টেশনে গিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া। স্টেশনমাস্টার তার মুখ চেনা। নিশ্চয়ই তিনি সাহায্য করবেন এই বিপদের কথা শুনে।
ভূত আর অন্ধকারকে ভয় পেত না লাবণি। তার ভয় শুধু বদমানুষকে। হেন কাজ নেই যা মানুষ পারে না।
লাবণি স্টেশনে যাবে কী না ভাবছিল, ঠিক তখনই একটা ভ্যান-রিকশা এসে দাঁড়াল তার সামনে। পাকা দাড়ির বয়স্ক মানুষটাকে লাবণি চিনত আগে থেকে।
ফকির মোল্লা কালীগঞ্জের পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলল, দিদিমণি, যাবে নাকি?
-যাব তো, কিন্তু ভাড়া কত দিতে হবে?
–তুমার কাচ থিকে বেশি লিব না গো। যা সবাই দেয় তুমিও তাই দিও।
-কাকা, অত টাকা তো আমার কাছে নেই। এখন যা আছে দিয়ে দেব, বাদবাকিটা পরে দিয়ে দেব।
-ও তুমি উঠো তো, ভাড়া নিয়ে ভেবো না। ফকির মোলা অভিভাবকের গলায় বলল, তুমি আমার বড় মেয়ের মতুন গো। তুমাকে আগে ভালো মতুন পৌঁছে দিই, ওতে আমার ধর্ম হবে।
রাত বেশি হয়নি। অন্ধকার চিরে এগিয়ে যাচ্ছিল ফকির মোল্লার ভ্যান-রিকশাটা। হাটগাছা ছাড়িয়ে ভ্যান-রিকশাটা কামারীর দিকে চলেছে, হঠাৎ বাঁ-দিকের আখখেত চিরে যমদুতের মতো উঠে এল দু’জন যুবক। ওদের নেশায় জড়ানো চোখ, পেশিবহুল শরীরে কামরস টগবগ করে ফুটছিল।
ভ্যান-রিকশার সামনে দাঁড়িয়ে ওরা ফকির মোল্লাকে খিস্তি দিয়ে বলল, এ রাস্তা কি তোমার বাপের রাস্তা? যখন খুশি আসবে-যাবে অথচ ট্যাকসো দেবে না–এ হতে পারে না। নামো শালা, আজ হিসাব সব চুকিয়ে নেব।
ফকির মোল্লা কাতর হয়ে বলেছিল, ছেড়ে দাও গো, মেয়েটারে পৌঁছে আসি। আহা দেখছ না–বেচারির মুখ কেমুন শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছে!
আমসি! আ হা-হা! এই আমসিই আমরা চুষে খাবো। ভ্যানের উপর ঝুঁকে পড়েছিল একজন। তার মুখে ভকভকানো দেশি মদের গন্ধ পেল লাবণি। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে সে কী করবে ভাবছিল। তখনই দ্বিতীয়জন তার মুখের উপর তিন ব্যাটারির টর্চ মারল, বাঃ, মালটা তো খাসা! কই এর আগে লায়লাকে কোথাও দেখিনি তো।
-আজ ফিস্টি হবে। বলল অন্যজন।
ফকির মোল্লা বুঝতে পেরেছে ছেলে দুটির মতিগতি ভালো নয়। এতদিন রাত-বেরাতে রিকশা নিয়ে যায় আসে কই এমন ইবলিশের দেখা তো সে পায়নি। তবে এরা কারা? ওরা যে-ই হোক ফকির মোল্লা এদের ছেড়ে দেবে না। জান থাকতে এদের হাতে লাবণিকে সে তুলে দিতে পারে না।
লাবণি ভয়ে কাঁপছিল। টর্চের আলোটা চোখে অসহ্য লাগতেই সে প্রতিবাদ করে বলল, অভদ্রের মতো মুখে লাইট মারছো কেন? তোমরা কে, কি চাও?
