• বইয়ের নামঃ অনন্ত দ্রাঘিমা
  • লেখকের নামঃ অনিল ঘড়াই
  • প্রকাশনাঃ দে’জ পাবলিশিং (ভারত)
  • বিভাগসমূহঃ উপন্যাস

খাটো ধুতি

অনন্ত দ্রাঘিমা – আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

০১.

খাটো ধুতি হাঁটুর উপর চড়ানো, চুনারাম বাঁধের উপর উঠে এসে পিছন ফিরে তাকাল। যার হড়বড়িয়ে চনমনে ফড়িংয়ের মতো উড়ে বেড়ানোর কথা সেই রঘুনাথ হাঁপু ধরা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে চুনারামের দিকে। আজকালকার ছেলেপুলেদের গায়ে তেমন জোর নেই, বালিছাতুর চেয়ে পলকা ওদের গতর, চুনারাম মোটা ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে কিছুটা নেমে এসে হাত বাড়িয়ে দিল, ধর দাদু, উঠে আয়। হা-দেখ, বেলা কেমন বাড়ছে। কখুন পৌঁছাব ক’ তো? চিন্তাটা চুনারামের একার নয়, এর সঙ্গে দুর্গামণির ভাবনাটাও দুধে-ঘোলে মিশে আছে। গুয়ারাম মাসের উপর ঘরছাড়া। গাঙ পেরিয়ে সে চলে গিয়েছে চাষের কাজে। প্রথম বর্ষায় এই ঝুঁকি নিয়ে ঘর ছাড়া তার উচিত হয়নি। শুধু দুর্গামণি নয়–চুনারামও বুঝিয়েছিল, যাসনি বেটা। মাটি হারালে দুঃখু বাড়ে। কথাটা মনে রাখিস। গরিবের কথা বাসি হলে কাজে লাগবে। বরাবরই একগুয়ে গুয়ারাম। নিজে যা বুঝবে সেটাই মক্কা-মদিনা, ছোট বড়কে তত বিশেষ পাত্তা দেয় না। দুর্গামণি অভিমান করে-মুখ ফোলায়, অত জেদ ভালো নয় গো, জেদ বুনো-মানুষকে ঝোড়-জঙ্গলে খেদিয়ে নিয়ে যায়। মাথা সামলাও, না হলে ঠকবে।

–মেলা খ্যাচরম্যাচর করো না তো, ভাল লাগে না। গুয়ারামের সব কথাতেই বিরক্তি। এই সংসারের কোনো কিছুই বুঝি তার ভালো লাগে না। মন মতো কথা না হলে বিরক্তিতে সে চাপানদী। মুখটা কুয়াশার গভীরে ঢুকে যায়। ধুতি সামলে পানসে হেসে চুনারাম রঘুনাথের দিকে তাকাল, কিরে, উঠে আয় দাদু। বেলা চড়ছে, সে খেয়াল কি তুর আচে। সময়ে ঘর না গেলে তুর মা কি বলবে বল তো!

কি আর বলবে, খেতে টুকে দেরি হবে। চোখ নাচিয়ে রঘুনাথ রগড় করে হাসল। ওর সারা গায়ে ধুলোভর্তি, তবু রোদ যেন পিছলে যায় ওর মাগুর মাছের গতর থেকে। ঝাঁকড়া মাথায় কুঁকড়ে আছে ওর মোটা মোটা কুচকুচে চুলগুলো। একেবারে দুর্গামণির মুখটা যেন বসানো, হাসিটাও ছাঁচের সন্দেশের মতো! চুনারাম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, হতাশায় প্যানপেনিয়ে উঠল গলা, তুর জন্যি আর পারি না, আমারই ভুল হয়েচে তুরে সাথে করে নিয়ে আসা। এবার রাগে ফেস করে উঠল রঘুনাথ, নিয়ে এসেচো মানে? আমি কি তুমার ঘাড়ে চেপে এসেচি নাকি? আমি এসেচি-নিজের পায়ে। চরণবাবুর ট্যাকসি বোঝো? কিছু বোঝো না তুমি! বুড়া মানুষ…ছ্যা…!

হ অ। আমি বুঝিনি, তুই সব বুঝিস? তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বেঁকে গেল চুনারামের, তবু বেশ ভালো লাগছিল তার। একমাত্র নাতি বলে কথা। লোকে বলে আসলের চাইতে সুদ মিষ্টি। কথাটা মন্দ বলে না। কত মানত করার পর রঘু এল। গুয়ারামের খুশি আর ধরে না। দৌড়ে এসে খবর দিল, খোকা হয়েছে বাবা, যাক এবার আটকুড়া অপবাদটা ঘুচল! চুনারামও খুশি হয়েছিল সে দিন। দোক্তা পান মুখে পুরে সে বিভোর হয়ে গিয়েছিল সুখে। ছেলের সুখ মানে তো তার সুখ। এই বয়সে এর চেয়ে আর কি চাই? শুধু লজ্জাবতীর জন্য দুঃখ হয়। সে এসব দেখে যেতে পারল না। তার ভাগ্যটাই ফোপরা, পোকায় কাটা, খরার আকাশ। রঘুর সাথে লড়তে খারাপ লাগে না চুনারামের। আর রঘুও সব সময় ওর পেছনে লেগে আছে। দাদু, এটা করে দাও, সেটা করে দাও। হেন-তেন সাত-সতেরো ফরমাশ। ঘরটা আলো করে আছে ছেলেটা। চুনারামের মান-অভিমান সব কিছু এখন এই নাতির উপর। রঘু সেটা বোঝে কিনা কে জানে। চুনারাম বাঁধের ঢালু পথ বেয়ে নেমে গেল সরসরিয়ে, রঘুনাথের হাত ধরে বলল, আর খুপড়িটা তেতিয়ে দিস নে, এবার চল। হা-দেখ কেমন চড়া রোদ উঠেচে, মনে হচ্ছে মাথার ঘিলু শুকিয়ে দেবে। চুনারাম খটখটে আকাশের দিকে তাকাল। চারদিকে কড়া রোদের হিলহিলানো সাপ নাচছে। গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়া ফোঁসফোঁসানী হাওয়া! সেই বিষে চড়বড় করে চামড়া, গলা শুকায়, টান ধরে পেটে।

আর জেদ ধরে থাকা উচিত নয়! রঘুনাথ দু’হাতে ধুলো জেবড়ে উঠে দাঁড়ায়। এই সামান্য চড়াই উঠতে তার কিছু যায় আসে না। শুধু বুড়াটাকে তাতানোর জন্য তার এই মনগড়া নাটক। রঘুনাথ চুনারামকে খুশি করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ধরো গো! আর পারচি নে। বয়স হল, মাজা পড়লো-আর কতকাল এই শরীলটাকে ঠেলব?

মারব দুই থাপ্পড়, ইরকি হচ্ছে? চুনারামও নাটকে ওস্তাদ, ডান হাত উঠিয়ে সে ভঙ্গি করে দাঁড়ায়। রঘু তার ভঙ্গি দেখে বাঁধের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগাঙের মতো খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। এক দমে জগৎখালি বাঁধের উপর উঠে এসে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে ঠাট্টা করে বলে, দেখলে তুমারে কেমন ঘাবড়ে দিলাম। আমার সাথে লড়তে এসো না, হেরে যাবে।

হঅ, হঅ। হারবা তো হারবা। চুনারাম বুক হালকা করে শ্বাস ছাড়ল, এবার চল দেখি ঝটপট। নালফুল তুলতে হবে। তুই পারবি তো দাদু?

–পারব না মানে, ঢের পারব।

–আমি কিন্তু জলে নামবনি। কাল আমার ঘুসঘুসিয়া জ্বর এয়েছিল। রাতভর জ্বরের ঠেলায় কুঁকড়ে-মুকড়ে পড়ে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটতে শরীরটা টুকে হালকা হল। চুনারাম রঘুনাথের পাশাপাশি হাঁটছিল। নাতির মন পাওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু অন্যপ্রান্ত অসাড় দেখে তার কথা বলার ইচ্ছেটাই শ্মশানমুখো হয়ে গেল।

এ সময় বাঁধের ধারটা বেশ জমজমাট, ধুলো মেখে ঝোপঝাড়গুলো বেশ স্ফুর্তিবাজ, সেই সঙ্গে রোদের সাথে মালাম লড়ায় ব্যস্ত। চাপড়াঘাসের শেষ যেখানে সেখান থেকে শুরু হয়েছে টলটলে জল, এখন স্রোতহীন বুড়িগাঙ লম্বা-দিঘির গতর নিয়ে চিতিয়ে-কেতিয়ে আকাশ দেখে হরদম। অথচ বর্ষার মাঝামাঝি এর দাপট, চোটপাট, গতি-গর্জন দেখলে শুকিয়ে যায় কলজে, ভয়-তরাসে বুকটা গেছো ব্যাঙের মতো লাফায়। এই বুড়িগাঙ তখন দশ গুণ চেহারা নিয়ে ভাঙতে আসে ঘর, শুধু ঘর ভাঙে না জলের তোড়ে কাঁদিয়ে ছাড়ে চারপাশ। এখন গো-বেচারা, বুঝি ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।

বুনো পাড়ার মুড়োতে ঝাঁকড়া অশোত্থ গাছের ছায়া। গেল বছর এখানে একটা সবজে রঙের টিউকল বসিয়েছে সরকার। তার আগে বেশির ভাগ বুনো পাড়ার লোকে জল খেত বুড়িগাঙের, যাদের ভাগ্য ভালো তারা যেত গাঁয়ের বারোয়ারি কুয়োটায় জল আনতে। দড়ি-বালতি সেখানে ধপাস করে ফেলে দিয়ে জল তোল। খ্যাচাকলের ঘটাং ঘটাং শব্দ, পেশির টানে জলভরা বালতি উঠবে উপরপানে, কষ্ট বলতে চরম কষ্ট। তবু দুর্গামণি যেত মাটির কলসী নিয়ে, লাইন দিয়ে জল আনত। পাড়ার বউ-ঝিউড়িদের টীকা-টিপ্পনী কানে আসত তার। ভালো লাগত না পরনিন্দা পরচর্চা শুনতে। বেশি বয়সে মা-হওয়ার সুখ যেমন জ্বালাও কম নয়। দু-চার শব্দ কানে বোলতার হুল ঢোকায়। তা-ও নেই নেই করে দেখতে-দেখতে রঘুর বয়স ষোল ছাড়াল। চুনারাম সেবার কথায় কথায় বলছিল, আমাদের ঘরের রঘুটা তো গায়ে-গতরে হয়েছে, এবার ওর বিয়ে-থা দিয়ে লেটা চুকিয়ে দাও। আমারও বয়স হচ্ছে, কবে ফুট করে চলে যাব শিবের বাপও টের পাবে না। যেতে তো হবেই, তার আগে মনের বাসনা মিটিয়ে যাই না হলে যে সঙ্গে গিয়েও সুখ পাব না।

দুর্গামণি বুড়োর কথা শুনে অবাক হয়নি, এ বংশের এমনই ধারা। এর মধ্যেই ছেলেটার জন্য মেয়েঘর থেকে লোক আসতে শুরু করেছে। রঘুর এতে ঘোর আপত্তি। বিয়ে মানে বে মতলব জড়িয়ে যাওয়া। হাঁড়িকাঠে গলা বাড়িয়ে দেওয়া। রঘু চোটপাট করেছে দমতক। তাতেও কাজ হয়নি দেখে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে দুদিন। শেষে আবার গুয়ারাম তাকে খুঁজে আনল দেবগ্রাম স্টেশন থেকে।

সকাল থেকে ঘরে আজ আনাজ বাড়ন্ত। শাক-লতায় মন ভরতে চায় না দাদু-নাতি কারোরই। জলখাবারের মুড়ির বাটি দিতে এসে দুর্গামণি মনে করিয়ে দিয়েছিল কথাগুলো, আজ কিন্তু ভাতের সাথে তরকারি দিতে পারব না। ঘরে কিছু নেই। যা ছিল সব সাঁঝবেলায় করে ফেলেছি।

-কেনে কচুর ডাঁটি, সেগুলো কি সব ফুরিয়ে গেল? চুনারামের জিজ্ঞাসায় দুর্গামণি ঘাবড়ায়নি, না, ফুরোবে কেনে? কিন্তু হররোজ কি কচু মুখে সুয়োদ লাগে? তাছাড়া বুনো কচু কুটকুটায়। তেঁতুল দিয়ে ঠিক করে জব্দ না করলে ওরা দাঁত বসাতে ছাড়ে না।

–তাহলে কি করতে হবে? চুনারামের ফাপড়ে পড়া চোখ-মুখ।

দুর্গামণি তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, তাহলে যাও না কেনে বামুন পুকুরে। ওদিকে কাঠ-কুড়োতে গিয়ে দেখেছিলাম নালফুলে ভরে আছে পুকুরের জল। আজ কচুডাঁটির বদলে নালফুলের ডাঁটা-চচ্চড়ি রেঁধে দেব।

প্রস্তাবটা মন্দ নয়। গুয়ারাম যতদিন ঘর না ধরছে ততদিন এ সংসারের দায়-দায়িত্ব তো সব ওর। ছেলেটার সব কাজে হড়বড়ানো। দু-চার দিন বৃষ্টি দেখেই সে চাষ কাজে চলে গেল। তার এই যাওয়াটা উচিত হয়নি। আষাঢ়ের মেঘ সবসময় যে ঢালবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দিতে পারে না। হলও তাই। দুদিন ঝরেই ঝোর বন্ধ করে দিল মেঘ দেবতা। কিন্তু তার আগে বাবুর পুটলি বাঁধা সারা। ধার-উধার করে ছেলেটা দলের সঙ্গে গাঙ পেরিয়ে চলে গেছে। এদিকে কে কি খাবে পরবে সে চিন্তা তার নেই।

অশোথতলা ছাড়িয়ে এলেই হাঁপু লাগে চুনারামের, গা ভিজিয়ে ঘাম নামে দরদরিয়ে। একটু যে জিরিয়ে নেবে তার জো নেই। রঘুর মুখ চলবে ক্ষুরের মতো। খড়খড়ে হাতে ঘাম মুছে চুনারাম রঘুর দিকে তাকাল, বুঝলি কিনা, তোর বাপের দুড়ুম করে চলে যাওয়াটা উচিত হয়নি।

রঘুনাথ ঢোঁক গিলল। সামান্য বিরক্তি ওর চোখে-মুখে, না গেলে ঘর চলবে কি দিয়ে? এ গায়ে কাজ কুথায়? এখানে তো খরা চলচে।

-যা বলেছিস। হাজার কথার এক কথা। চুনারাম উৎসাহিত হল, সেইজন্যিই তো বলছিলাম ওর এভাবে যাওয়াটা বিবেচকের কাজ হয়নি। আরে যাবি যখন তখন ধার-উধার করে কিছু টাকা ঘরে দিয়ে যা। তা না, কেবল ফক্কা!

-থাকলে তো দেবে। বাপের নিন্দে সহ্য হয় না রঘুর, শুধু মুখ দেখে কেউ টাকা উধার দেয় না। থালা-গেলাস তো সব গিয়েছে। বন্ধকের মাল ফেরত পাওয়া ঝামেলার।

-তা যা বলেছিস। সুদের সুদ বেড়ে ন’ মাসের পোয়াতি হয়ে যায়। চুনারাম হতাশ গলায় বলল, ছেলেটারে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ঠা-ঠা খরায় দেশ-গাঁ জ্বলচে। সবখানে পাতা পোড়ার বদঘ্রাণ। চোত-বোশেখের মতো ধুলো এখন দামাল। কে বলবে আষাঢ় মাস পেরিয়ে গেল। কবে যে শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে যাবে বুড়িগাঙ? তখন সারা বুনোপাড়া জুড়ে জলকষ্ট। দল বেঁধে যেতে হবে সেই অশোথ তলার চাপা কলে। সে চরমদিন আসার আগে হড়হড়িয়ে ছেরাক মেঘ। আর ভাল লাগে না। সারা গায়ে বিজবিজানো ঘামাচি ফুটেছে চুনারামের, গা-গতর গোসাপের চামের মতো খসখসে। রাতে ঘুম নেই, দুপুরেও তাই। এভাবে চললে বর্ষা খুন হয়ে যাবে, বীজতলা ঝাঁকিয়ে কাঁদবে। বিধবার সাদা শাড়ির মতো দেখাবে মাঠঘাট।

সাবধানে নামবু। সামনে ধুলো চুবানো ঢালুপথ। রঘুকে সতর্ক করে চুনারাম। শুধু চ্যাটচেটে কাদা নয়, ধুলোও পেছল কাটায় ওস্তাদ। বেকায়দায় ব্যাঙ ঠিকানো ঠিকরে গেলে ধুলো ঢুকে যাবে চোখে-মুখে। এ ধুলো ভূত সাজাতে ভালোবাসে। রঘু নিজে সতর্ক হয়ে বুড়ো মানুষটাকে হুঁশে ফেরায়, আমার জন্যি ভাবতে হবেনি। তুমি ঠিকঠাক নামো তো।

-নামছি রে, নামছি। গলা ঘড়ঘড় করল চুনারামের। ঘর থেকে বেরনোর সময় হড়বড়িতে ভুল হয়ে গিয়েছে। হাতের লাঠিটা ভুলে ফেলে এসেছে সে। লাঠি থাকলে শুধু পায়ের নয় মনেরও জোর বাড়ে। ঢালুপথে লাঠি, সাইকেলের ব্রেকের মতো কাজ করে। এখন নিজের ভুলের জন্য নিজেই আফসোস করে চুনারাম। কিন্তু মুখ ফুটিয়ে রঘুকে সে কিছু বলে না, রঘুই তার নড়বড়ে চেহারা দেখে খিঁচিয়ে ওঠে, সেদিন যে বেবুর ডালার লাঠিটা এনে দিলাম, সেটা কুথায়?

-ঘরে আচে। চুনারাম হালকা করতে চাইল প্রসঙ্গ।

রঘু রাগে লাল হয়ে বলল, ঘরে থাকলে চলবে? লাঠি দিয়ে কি ঘরে ঠেকো দেওয়া হবে?

-বললাম তো ভুল হয়ে গিয়েছে। চুনারামকে অসহায় দেখাল, বয়স হলে সব কথা কী ঠিকঠাক মনে থাকে রে। তাছাড়া আমার হাজার চিন্তা। তোর বাপ যে কুথায় গিয়েছে কে জানে। সে না ফেরা তক আমার চোখে নিদ আসবে নি।

–ফি-বছর তো যায়, এবারের ক্ষেপটা নিয়ে এত ভাবছো কেন?

–ও তুই বুঝবি নে, বয়স হোক, তারপর সব বুঝবি! চুনারামের কথাটায় রঘুর ভেতরটা ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল। সে এখন যা বুঝতে পারে না ঠিকঠাক-বয়স হলে কি সব বুঝতে পারবে সে? তার তো ঢের বয়স হয়েছে, গোঁফের রেখা ফুটেছে তাহলে সে কেন বুঝতে পারবে না। চুনারামের কথাগুলোই রহস্যে মোড়া। এই হেঁয়ালি সে প্রায়ই বুড়োধুড়োদের মধ্যে লক্ষ্য করে। তার ভালো লাগে না। তার মনে হয়-এরা বুঝি কিছু লুকোতে চায় যা ওদের অক্ষমতা, কমজোরি।

বাঁধের গাঁ-ছোঁয়া ঢালুপথ সাপের চেরা জিভের মতো দুফাঁক হয়ে দুদিকে চলে গিয়েছে। একদিকে জমজমাট গ্রাম, অন্যদিকে বামুন পুকুরয়াড়। ছায়ায় ছায়ায় পথটা বেশ আরামদায়ক। খুব বড়ো-সড়ো গাছ চোখে পড়ে না, মাঝারি মাপের গাছগুলোই এখানকার শাসনকর্তা। কতবার যে এখানে ছুতোনাতায় পালিয়ে এসেছে তা রঘুনাথ নিজেও জানে না। পথের ধুলোয় ভরে আছে চুনারামের গোড়ালির নিচটা, ধুলো সোহাগে গায়ের বর্ণ বোঝা দায়, শরীরও ধুলোছোঁয়ায় গিরগিটির মতো রঙ বদলায়। ক’ পা হেঁটে এলেই ঝোপ-ঝাড়ে ঠাসা হয়ে যায় এলাকা, টাক তাতানো রোদের বুক ছুঁয়ে পাখির ডাক ভেসে আসে। হা-করে দাঁড়িয়ে পড়ে রঘু। জুলজুলিয়ে আশেপাশে তাকায়। চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে আশ্চর্যবোধ। নজর এড়ায় না চুনারামের, অমন করে ভ্যালভেলিয়ে কী দেখচিস? হ্যাঁ রা, তুর কি হলো বল তো?

এ সময় ঢিলি কাকিকে দেখবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে। মেয়েমানুষটার কি গরম-টরম লাগে না? লু’ কে জব্দ করে কিভাবে। ছাতিতে দম আছে বলতে হবে। চোখ ডলে নিয়ে রঘু আপন মনে বলল, হা দেখো দাদু, ঢিলি কাকি বনের ভেতর কি করছে দেখো। ওর জানে কি ভয়-ডর নেই?

হাসল চুনারাম, ম্যায়াঝিটার মাথাটা গিয়েচে। টুকে গরম পড়লে ঘিলু গলে লাড়িয়া তেল হয়ে যায়। যাদের মাথার দোষ, তাদের এই সময়টাতে ঘরে এটকে রাখা দায়। লুলারামের বৌ-ভাগ্যটা পুকায় কাটা। এ আর ভালা হবার নয়।

জ্ঞান পড়ার পর থেকে রঘুনাথ ঢিলিকে দেখছে টো-টো কোম্পানী হয়ে ঘুরে বেড়াতে। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো সবাই জানে তার মাথার গণ্ডগোল। এ রোগ সহজে সারে না। কবিরাজ, ফকির, বৈদ্য, পীরবাবার থান, মনসাতলা, ঢিলবাঁধা, সুতো বাঁধা…সব বৃথা গেল, হত্যে দেওয়াও বিফলে গেল, ঢিলি কোনো কিছুতেই ভালো হল না, তার চঞ্চল চোখ, অসহিষ্ণু চোখের তারা সব সময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। পাড়ার লোকে বলে লুলারামের চরিত্র দোষ, ভিকনাথের বউয়ের সঙ্গে তার নাকি লটখট চলছে। অনেকেই দেখেছে ওদের আড়ালে-আবডালে কথা বলতে। ঢিলির কানে গিয়েছে কথাগুলো। শোনার পর থেকে তেতে গিয়েছে মাথা। পাগল বলে সে তো দেখতে শুনতে মন্দ নয়। দেখে-শুনে লুলারাম তাকে বউ করে এনেছিল ঘরে। তখন চাঁদের সাথে, নালফুলের সঙ্গে তুলনা করত তার। দুই মেয়ের পরে সে এখন আকাশের ঘুরঘুট্টিয়া আঁধার। ঘরে থাকলেও লুলারাম তাকে পুছেও দেখে না, ক্ষেপি, বদমেজাজী বনবেড়াল ভেবে এড়িয়ে চলে। ঢিলি মরমে মরে, মনে মনে কাঁদে। ঝারির কথা সে দুর্গামণির কাছে ফলারের চিড়ের মতো চটকে দেয়, জানো তো দিদি, সে ঢেমনিটা তুমার ঠাকুরপোকে বশ করেচে। বেহায়া মরদটা তার আঁচলের চাবিগোছা হয়ে ঝুলচে। আমি কোথায় যাই বলদিনি। তাদের তো লাজ-লজ্জা নেই। এদিকে আমি যে লাজে মুখ দেখাতে পারচি নে।

–তুমি বেশি ভেবো না বুন। তুমার তো শরীল তত বিশেষ ভালো নেই।

কে বলল ভালো নেই? ঢিলি প্রতিবাদে মুখর হল, আমার শরীল দিব্যি ভালো আচে। শরীলের দোহাই দিয়ে তোমরা কেউ পার পাবা না। আমি কাউরে ছাড়বো না। সব্বাইকে টানতে-টানতে পাকুড়তলার বিচার সভায় নিয়ে যাব। ছাড়ব না। মার দিব্যি দিয়ে বলচি–কাউরে ছাড়ব না।

হাট ছাড়ি দিব, পরনের কাপড় ছাড়ি দিব তবু ভাতার ছাড়ব না। ঢিলি মুখের দুপাশে গাজরা ছড়িয়ে হাঁপায়। চোখের গুলি দুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসতে চায়, এক অসহনীয় জ্বালা তার বুকের ভেতরটাতে নারকেল কোরার মতো কুরতে থাকে। ঘরে আর মন বসে না ঢিলির, বাইরের উন্মুক্ত প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ঢিলি বাঁধের ধুলোয় উঠে আসে, দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে সে কার সঙ্গে কথা বলে, বিড়বিড় করে, কখনও কাঁদে, কখনও হাসে। কখনও বা জলের দিকে তাকিয়ে সে একনাগাড়ে ধারাভাষ্য দেয়, সারাদিনের ঘটনাগুলোকে সে হুড়মুড়িয়ে আউড়াতে থাকে, যেন এ পৃথিবীর সমাজ সংসারের সব কিছু তার মুখস্থ, স্বয়ং মা সরস্বতী তার কণ্ঠে যেন ভর করেছেন, এতকিছুর পরেও ঢিলির কোনো ক্লান্তি নেই, সে বুনোপাড়া ছাড়িয়ে অনায়াসে চলে যায় বাবুপাড়ায়, বাবুপাড়া ছাড়িয়ে চোখের নিমেষে পৌঁছে যায় অশোথ তলায়, সেখান থেকে বামুনপুকুর কিংবা মোকামপাড়ার বিলে। মন ভালো থাকলে সে উচ্চস্বরে গান গায়, হাসিতে বাতাস ফালাফালা করে নিজের অস্বস্তিকে ভাসিয়ে দেয়।

ঢিলিকাকিকে দেখে রঘুনাথের অবাক হওয়ার ঘোর বুঝি আর কাটে না, সে ভাবতে থাকে এত চড়া রোদে বউ-মানুষটা এখানে এল কী ভাবে? তাহলে পাড়াপড়শিরা যা বলে তা সব সত্যি। ঢিলিকাকি পাগলী, তার মাথার দোষ আছে, হরিনাথপুরের বুড়োমা তলায় মানত করেও সে আর ভালো হবে না। লুলারাম কাকা আবার আর একটা বিয়ে করবে, ঝারি বা তার চেয়ে সুন্দরী কাউকে। ঢিলিকাকির দু’ মেয়ে নূপুর আর নোলক চোখ ভাসিয়ে কাঁদবে, কাকার হাতে-পায়ে ধরেও তার মন গলাতে পারবে না। লোকে বলে লুলারাম কাকার নাকি পাথরের মন, মুনিরাম দাদুর ডাকাতের রক্ত তার শরীরেও বইছে। রক্তের দোষ যাবে কোথায়?

ঝোপঝাড় ঠেলে ভর দুপুরে এলোমেলো শরীরে ধুলো পথের উপর এগিয়ে এল ঢিলি। ঘাড় বেঁকিয়ে রঘুনাথ আর চুনারামকে এক ঝলক দেখে নিয়ে সে ক্ষিপ্রপায়ে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে। রঘুনাথ ভয় পাচ্ছিল, ঝোঁকের মাথায় ঢিলি কাকি আবার বামুনপুকুরে ঝাঁপ দেবে না তো? পাগলের মন বোঝা দায়, কখন কি করে আগাম বলা মুশকিল। ভয় আর উত্তেজনায় চোখের তারা কেঁপে উঠল রঘুনাথের, চুনারামের দিকে সে অসহায় চোখে তাকাল। চুনারাম তাকে ভরসা দিয়ে বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই রে। ও ম্যায়াঝি মরবে না। পুরো ঘর-সনসার জ্বালাবে, তারপর যদি কিছু হয় তো হবে।

রঘুনাথ খুশি হল, কেমন থতমত খাওয়া চোখে তাকাল, তুমি অমন করে কেনে বলচো গো দাদু? কাকির উপর তুমার দেখচি কুনো মায়া দয়া নেই।

না, নেই। যেন হ্যাটাবাঘের গলায় গর্জে উঠল চুনারাম, ও আটকুড়ীর বেটি রাজোয়ার বংশের মুখে চুনকালি লেপবে, তুই জানিস নে দাদু, ওর জন্যি আমাদের কত দুর্নাম, লোকে টি-টি কার দেয়। সব কতা তো কানে আসে, শুনি। বুঝি না কেন যে ডুবে মরতে জল জোটে না ওর।

রঘুনাথ স্পষ্টত বুঝতে পারে ঢিলি কাকির উপর চুনারামের কেন গোখরো ক্ষরিস রাগ। বুনো পাড়ায় ঘর হলেও লুলারামের রমরমা অবস্থা, গেল সনের আউড়গাদাই বলে দেবে ক’ বস্তা ধান উঠেছিল জলজমি থেকে। এখনও বাড়িঘরে ধানের গন্ধ ম-ম করে। ঘর-বাড়ি সবখানে মা লক্ষ্মীর উপচে পড়ার ছাপ আছে। লুলারাম কাকারা বড়লোক, ওদের পয়সাকড়ি আছে–এ কথা ভেবে মনে মনে সুখ পায় রঘুনাথ। তবে সে জানে–পরের সোনা নিয়ে গর্ব করা ভালো নয়, কেন না ফি-কথায় দুর্গামণি বলে–পরের সোনা দিও না কানে, খুলে নেবে হ্যাঁচকা টানে।

উবু হয়ে ঢিলি দু-হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে বুনো জল-শ্যাওলা। পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো লক্ষ্মণ তার আর নেই। বেশ বোঝা যায় পাগলামীর উগ্রতায় সর পড়েছে। ঢিলি আঁজলা ভরে জল খায় পশুর মতো। কাপড়-চোপড় এমন কী বুকের কাছটা তার ভিজে সপসপে দেখায়। চুনারাম হা করে দেখছে। শুধু চোখ নয়, মুহূর্তে কঠিন হয়ে ওঠে তার মেটে রঙের পুরু ঠোঁট দুটো, দেখলু, আমি বলছিলেম না ও ম্যায়াঝি মরবে নি। ও হল গিয়ে সাধের পাগল, সেয়ানা পাগল। সবার চোখে ধুল দিলেও আমার চক্ষে তা ছিটোতে পারবে নি। আরো বাব্বাঃ, বয়সে আমার মুচ পেকেছে, রসে পাকেনি রে! হুঁস করে খাস ভাসিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল চুনারাম। ঘরের বউ না যাওয়া অবধি সে ঘাটে যাবে কি করে? খুড়শ্বশুর বলে কথা। ধর্ম মান ভাসিয়ে দিয়ে তো লোকালয়ে বাঁচা যাবে না। একটা মাঝারি মাপের পিটুলিগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে খুট থেকে ডিবা বের করে বিড়ি ধরাল। বিড়ির পেছনে লম্বা টান দিয়ে আয়েসী চোখে সে দূরের দিকে তাকাল। এখন আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি তবু রোদের কী তেজ দেখো। মনে মনে সে যেন নিজেকেই শোনাতে চাইল ভাবনাগুলো। গুয়ারামের উপর আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে সে কেমন ময়দা-লেচির মতো লতলতে হয়ে গেল স্নেহ-মায়ায়।

জল খেয়ে, মাথা ভিজিয়ে পাড়ে উঠে এল ঢিলি। রঘুনাথ লক্ষ্য করল ঢিলিকাকির পরনের কাপড় চোপড়ের কোনো ঠিক নেই। ঢিলাঢালা পোশাকটা কোনোমতে লজ্জা স্থানগুলোয় ঢাকা দেওয়া। জোরে বাতাস এলে তা পুরনো, হলদেটে পাতার মতো খসে গিয়ে মহালঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দিতে পারে। নপুর, নোলক বড়ো হয়েছে। ওরাও তো এদিকটা দেখভাল করতে পারে। নাকি লোকমুখে শুনে শুনে ওরাও হাল ছেড়ে দিয়েছে। মেয়ে দুটোর এই অমনোযোগী মনোভাব মন থেকে মেনে নিতে পারল না রঘুনাথ। কোথা থেকে কষ্ট এসে তার মনটাকে সাঁতিয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবল ঘরে ফিরে গিয়ে সে নূপুর আর নোলকের দুয়ারে যাবে। ওদের বোঝাবে। ওরা যদি না বোঝে তা হলে লুলারাম কাকাকে দিয়ে ওদের গাল খাওয়াবে। সে যে ওদের থেকে বড়ো–এটা আজ সে প্রমাণ করে ছাড়বে।

বামুনপুকুরে চ্যাটপেটে কাদা নেই, বেশির ভাগই বালি, ফলে ঘাটের কাদা পায়ে জড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগই থাকে না। এ তল্লাটের সব চাইতে বড়ো পুকুর বামুনপুকুর। বর্ষাকালে এই পুকুর যেন মোকামপাড়ার বিলটাকে শরীর ফুলিয়ে হুঁশিয়ার করে দেয়, গর্বে গালভরিয়ে বলে, দেখো, বিলকুমারী আমি তুমার চাইতে কোনো অংশে কম নই। তুমার শরীল পেচিয়ে শুধু ভ্যাদা লতা, জলা-শ্যাওলা। আর আমাকে দেখো-কেমুন লাল শাপলা আর সাদা শাপলায় সেজেচি দেখো। আমার জলো-লতার ফুলগুলো নাকছাবি, মন হলে আমি পাল্টে পাল্টে পরি। সাজতে যে আমার বড়ো ভালো লাগে। তুমি বিলকুমারী হলে আমি হলাম জলকুমারী, রাজকুমারী।

চোখ ভরে দেখার মতো পুকুর বটে বামুনপুকুর। চারধারের পাড় বাঁধানো জল বুড়ো-মা মেলায় বেচতে আসা কাচ বাঁধানো ফ্রেমের মত, একবার দেখলে চোখ ফেরান যায় না, বট আঠায় লটকে যাওয়া বনিপাখির মতো লটপটায়। ভালো লাগার রেণুগুলো মথের গায়ে জড়িয়ে থাকা রেশমী ধুলোর মতো মনের আনাচে কানাচে ভেসে বেড়ায়, মনটাকে চোখের পলকে বানিয়ে দেয় ফুলের বাগান। এই মুগ্ধতাকে দু’হাতে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে উড়িয়ে দেয় ঢিলি, রঘুনাথের মুখোমুখি এসে সে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, রঘু না? এখানে মরতে কী করতে এয়েচিস? যা ঘর যা। চড়া রোদে তুর মাথার চুল উঠে চাঁদ পড়ে যাবে। তখন ব্যা-থা হবে না, মেয়েঘরের বাপ বলবে ছেলে তুমাদের টাকলা। কথা শেষ হল না হাসি সংগতের মতো বেজে উঠল দুই ঠোঁটে। অবাক হয়ে তা দেখতে থাকল রঘুনাথ। ঢিলি কাকির বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে তবু এই বয়সে তার চেহারাটা বামুনপুকুরের চেয়েও ভরাট। তার শরীরে ঢেউ ওঠে সর্বদা, চঞ্চল চোখের মণি দুটোয় ক্ষ্যাপাটে এক দৃষ্টি বুনো বাতাসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভালো লাগার ডালপালা ছড়িয়ে ঢিলিকাকি যেন বলে–আমাকে দেখ। আমি গাঁয়ের বউ তবু শহরের কারোর চাইতে কম নয়। বুনো ঘরের বউ বলে নয় ঢিলি বরাবরই সুন্দর! রঘুর মনে হল সব পাগলই সুন্দর, ওদের মনের স্বচ্ছতা সুন্দর করে তোলে বাঁধনহীন, তোয়াক্কাহীন মনটাকে।

ঢিলি কাকির কথায় রঘুনাথ তাই অবাক না হয়ে পারে না, কি বলছ গো কাকি? আমার আর কত বয়স, আমাকে কেনে বিয়ে সাদীর কথা বলছো?

-তোকে বলব না তো কি গাছকে বলব? ঢিলি বিড়বিড়িয়ে উঠল, যা বাপ কথা না বাড়িয়ে গা ধুয়ে আয়। এক সাথে ঘর ফিরব।

আমার ফিরতে দেরি হবে। রঘুনাথ ঢিলির চরকাটা চোখের দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলল, তুমি যাও গো। আমি নাল ফুলের ডাঁটি তুলব। মা বলেছে–ঘরে শাকপাতা নেই। আজ নালফুলের ডাঁটি চচ্চড়ি হবে।

–অঃ। তুর মায়ের যেমন বুদ্ধি। নালফুলের ডাঁটায় কি আচে রে, কিছু নেই। শুধু ভুসভুসিয়া জল। টুকে আঁচ লাগলে জল কাটে, লোহার কড়াই হয়ে যায় বুড়িগাঙ। ঢিলি রহস্যভরা চোখে হাসল, তুর মা বাপু সুবিধের মেয়েমানুষ নয়। ওর মনে ভারি গর্ব। আমার ছিমুতে হাত পাততে শরমায়। আরে বাবা, আমার কাছে লাজে রাঙা হওয়ার কি আছে, আমি কি পর নাকি?

-মা বরাবরই ওইরকম। শুকোবে, শুকিয়ে সুপুরি হয়ে যাবে তবু হাত পাতবে না। রঘুনাথের গলায় দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

পানসে হেসে ঢিলি বলল, তুর মা’র মতো তুর বাবার মাথাতে গোবর পুরা। ড্যাং-ড্যাং করে জন-ঘাটতে ভিন দেশে চলে গেল। গিয়ে কি লাভ হল, কিছু না! চারদিকে এখন খরা চলছে। তুই দেখে নিস এবছর ঠিক আকাল হবে। ঢিলি বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলে তৃপ্তি পেল। এরকম ভালো ভালো কথা সে প্রায়ই বলে থাকে। যখন সে এসব বিবেচনার কথা বলে তখন তাকে পাগলি বলে মনেই হয় না। এই জন্যই বুঝি চুনারাম তাকে সেয়ানা পাগলা বলে আখ্যা দিল। চুনারামের কথার সঙ্গে রঘুনাথ একমত নয়। তার নজরে ঢিলি কাকির আলাদা সম্মান আছে। ওরা শুধু বড়োলোক বলে নয়, বড়ো মন আছে ওদের। বুনোপাড়ায় একমাত্র ঢিলিকাকিদের মাটির দোতলা ঘর, ঘরের মাথায় সোনাখড়ের টাইট চাল। সেই চালের মাঝখানে বিশেষ কায়দায় লাগানো আছে মুখোমুখি দুটো টিনের ময়ুর, মিস্ত্রি যত্ন নিয়ে বানিয়েছে। হাওয়া দিলে সেই পাতলা টিনের ময়ূর ঝনঝনিয়ে কেঁপে যায়, ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে ওরা যেন উড়তে চাইছে খোলা আকাশে। ওরা টিনের নয়, যেন সত্যিকারের ময়ুর।

.

০২.

বয়সকালে খারাপ দেখতে ছিল না ঢিলিকাকি, রাতে ফোটা পদ্মফুলের মতো চনমনে ছিল তার মেজাজখানা। লুলারাম খুড়া তার রূপে মোহিত হয়ে ঘুরঘুর করত তার চারধারে। তার তখন কাজে কম্মে মন ছিল না। ঢিলিই ঠেলে-ঠেলে পাঠাত কাজের জন্য। অভিমানে মুখ ফোলাত, ঘরে বসে কি সুখ পাও জানি না গো…। তুমার জন্যি লোকে আমাকে দশ কথা শোনায়। নিন্দে করে।

-কি কথা আমি কি শুনতে পারি?

–শুনে হজম করতে পারবা তো? সব খাবার সবার পেটে হজমায় না।

–বলে তো দেখো। লুলারাম কাকার কণ্ঠস্বরে জেদ।

হাসতে হাসতে ঢিলির কাঁচা হলুদ শরীরে ঢেউ উঠত, সব্বাই বলে–আমি তুমারে নাকি জাদু করেছি। আমার নজরে নাকি আটা আচে। আমার শরীরটা নাকি শ্যাওড়াগাছের চেয়েও ভয়ের। বলদিনি, এসব শুনে কার মন ভালো থাকে?

-কে বলেছে এসব কথা, বলো। আমি তার জিভ উপড়ে নেব। লুলারাম হাঁপাতে থাকে। তার বুকের ভেতর পাঁচ-ঘোড়ার ইঞ্জিন চলে, এ গাঁয়ের কাউকে না হলে আমার চলে যাবে কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার এক পল চলবে না। আমি পাগল হয়ে যাবেখন।

-কেন? দিঘল চোখে আঠা বেছায় ঢিলি।

-সত্যি কথা বলব? শুনে তুমার হাসি পাবে। ভেজা বেড়ালের মতো চোখে ঢিলির দিকে তাকাল লুলারাম, আগে বুঝিনি-এখন বুঝেচি গো, বউ হল মায়ের চেয়েও বড়। বউকে সুখে রাখলে আমার দশদিক সুখে থাকবে।

–এ কথা তুমি মন থিকে বলতে পারলে? তুমার জিভ উল্টালো না? ঢিলির নিরীহ শান্ত চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরল, খবরদার তুমি আমারে ছোঁবে না। শরীলের নেশায় তুমি পাগল হয়ে গিয়েচ। তুমি আমাকে ভালোবাসো না, শুধু আমার এই নাদুসনুদুস গতরটাকে ভালোবাসো। যতদিন আমার রূপ যৌবন থাকবে ততদিন তোমার ভালোবাসা টাটকা থাকবে। রূপ ফুরোলে তুমিও ফুড়ুত করে উড়ে যাবে।

–মিচে কথা। লুলারাম চোখের নিমেষে তার খড়খড়ে হাতটা চেপে ধরে ঢিলির বাসনা তেল চুবানো মাথায়, মা’র দিব্যি, শুতে-বসতে আমি তুমার মুখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাই নে। আমি যা বলেছি তা সত্যি গো! কেন বলেচি-জানো? মা’র জন্য আমার কুনোদিন মন খারাপ করে না। এমনকী মা’র কথা আমার একদম মনে পড়ে না। তুমার সঙ্গে আমার একহপ্তাও হয়নি, অথচ তুমার জন্যি আমার বুক টাটায়। আমার চোখে নিদ আসে না।

.

এই অনুগত লুলারাম এখন লোহার মোটা শিক, বাঁকানো যায় না। রাত-বেরাতে সে ঢিলিকে বিছানায় ফেলে বাহ্যি করার নাম করে ঝারির ঘরে ঢুকে যায়। ভিকনাথের খাটা গতর মড়ার মতো ঘুমোয়। তেল-টিনের দরজায় টোকা পড়লেই ঝারি এলোমেলো শাড়িতেই বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। দরজায় শেকল তুলে সে আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে চলে আসে জগৎখালির বাঁধ-ধারে। শরীরের দাবি মিটিয়ে ভোর রাতে সে ফিরে যায় নিজের ঘরে। ওরা ভাবে–এসব কেউ টের পায় না। অথচ হাওয়া-জল-গাছ সব জানে। মরা চাঁদে জানে, তারা জানে। ঝারি ভয়ে ভয়ে বলে, পেট বেঁধে গেলে কি করব গো? তখুন ডুবে মরতেও যে জলা জুটবে না।

-ভয় কি, প্রভা বুড়ির শেকড়বাটা খাইয়ে দেব। পচা লাউজালির মতো কখন পেট খসে যাবে, ভিকনাথ তো ছেলেমানুষ, ওর বাপও টের পাবে না। লুলারামের কণ্ঠস্বরে অশ্বত্থের ছায়া ঢলে পড়ে, তুমি চিন্তা করো না তো! আমি তো আছি, আমি তো মরে যাইনি। আমার যা জমিজমা আছে তুমি বসে খেয়েও শেষ করতে পারবে না।

ঝারির কাজলটানা চোখে স্বপ্ন ঝিলিক দিয়ে ওঠে, সত্যি বলছো, আমাকে ছুঁয়ে বলো।

লুলারাম তাকে ছোঁয়, শুধু ছোঁয়া নয়–বুকের যাঁতায় পিষতে থাকে বুক, ঝারির শরীর কাদামাছের মতো মোড়া মারে উত্তেজনায়, কথা জড়িয়ে যায়, উঃ, আমি মরে যাবো গো, আর পারচি নে! ছাড়ো, ছাড়ো! আলো ফুটচে চারধারে। ভিকনাথ জেনে গেলে আমারে গলা দাবিয়ে মেরে দেবে। ইবার আমাকে যেতে দাও।

–ও শালাকে আমি ছাড়ব ভাবছো? ওর মরণ আমার হাতে। বেশি তেড়িবেড়ি করলে গলায় হেঁসুয়া চালিয়ে দেব। লুলারামের লুললুলে শরীর পাকানো দড়ির মতো শক্ত হয়ে উঠল, কঠিন চোয়াল নড়ে উঠল, তুমারে রাজরানী করে রাখব। আগে পাগলীটার গতি করি, তারপর

-যা করার তাড়াতাড়ি করো। আমার তর সয় না। ফি-রাতে পেলিয়ে আসতে মন করে না। খালি ভাবি–আমি কি রাতচরা গোরু?

গোরু কেনে হবে গো, তুমি আমার হরিণী! আহা কী রূপ, কী রূপ! লুলারামের পিছল জিভ চুকচুক শব্দ করে ওঠে শঙ্খ লাগা সাপের মতো।

এসব ভাবলে তার মনটা চৈত্রের রোদে ফাটা জমির মতো ফেটে চৌচির, আর সেই ফাটলের মধ্যে লুকিয়ে-ছাপিয়ে বসে থাকে রাগের ফণাধারী সাপ, তার শুধু ফোঁসফোঁসানী, ওই দুটা তিলে খচ্চর মানুষকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য মনটা শীতকাতর কুকুরছানার মতো যন্ত্রণায় কুঁইকুঁই করে। সব খবর ঢিলির কানে আছে, মনে আছে। লোক ভাবে সে পাগল। হ্যাঁ পাগল। লুলারামই তাকে পাগল করে ছেড়েছে। শুধু খেতে-পরতে পেলে কি একটা বৌয়ের সব পাওয়া হয়ে যায়, আর কিছু কি দরকার হয় না জীবনভর। লুলারামের ভালোবাসাটা এখন খরায় ঝলসে খড়খড়ে ঘাস; প্রাণ নেই, টান নেই-যা আছে শুধু অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের ধুলো ওড়া। এর শাস্তি ওকে পেতে হবে। মাথায় খাঁ খাঁ রোদ নিয়ে ঢিলি শক্ত হয়ে দাঁড়াল, নিজের অজান্তে হাতের মুঠি শক্ত হয়ে এল তার, মাথাটা চোখের নিমেষে বুমবুমিয়ে উঠল, নাক ছাপিয়ে নেমে এল গাঢ় নিঃশ্বাস। এমন অস্বস্তিবোধ হলে সে বুঝতে পারে মাথার অসুখটা বাড়ছে, এবার সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, নিজেকে আর ধরে রাখার কোনো ক্ষমতা থাকবে না ওর। ঢিলি কী ভেবে আবার পুকুরঘাটের দিকে দৌড়ে গেল, এবার আর ধীর পায়ে নামল না, ডাঙা থেকে ব্যাঙের মতো ঝাঁপ দিল পুকুরে। তার ছিপছিপে সুন্দর শরীরটা মৃগেল মাছের মতো ঢুকে যেতে লাগল জলের গভীরে। প্রায় মিনিট খানেক পরে কালবাউস মাছের মতো চুলভর্তি মাথা ঠেলে জলের উপরভাগে উঠে দু-হাত থাবড়াতে লাগল ঢেউওঠা জলের উপর। পাড়ে যে দু-জন পুরুষমানুষ দাঁড়িয়ে আছে তখন তার সে খেয়াল নেই। প্রায় একরকম ভয় পেয়ে রঘুনাথ চিৎকার করে উঠল, ও কাকি, উঠে আসো গো… উঠে আসো। আমার বড্ড ভয় করছে।

কথাটা কানে গিয়েছিল ঢিলির, ভয় কি রে বেটা, ভয় কি? জল আমার সই রে, আগুন আমার মিতে। তুর কুনো ভয় নেই বেটা, আমাকে কেউ মারতে পারবে না। আমি হলাম মা বুড়োমার বেটি। মা চণ্ডীর বেটি। আমার ক্ষতি করবে কিনা ওই ভিকনাথের বউটা! ছ্যাঃ!

জল দাপিয়ে পাড়ে উঠে এল ঢিলি, ওর চুল বেয়ে জল নামছে খড়ের চাল বেয়ে জল নামার মতো, পুরো মুখখানার মলিনতা ধুয়ে গিয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে বর্ষার কদমফুলের মতো। অনেক দূরে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিল চুনারাম, সে আর থাকতে না পেরে সামনে এগিয়ে এসে মুখ নিচু করে দাঁড়াল। মনে মনে ভাবল খুড়শ্বশুরকে দেখে ঢিলি নিশ্চয়ই লাজ পাবে, শরমে চোখের আড়ালে চলে যাবে। চুনারাম যা ভেবেছিল তাই হল। ঢিলির সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল উভয়ে। লজ্জায় গুটিয়ে গেল ঢিলি, লম্বা হাতের চাপাকলি আঙুল দিয়ে সে ঘোমটা দিল সযত্নে। ঠাণ্ডা জলে তার মাথাটা বুঝি ঠাণ্ডা হয়েছে, সে আর আশেপাশে না তাকিয়ে বিড়বিড় করতে করতে সোজা চলে গেল বাঁধের দিকে। বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার সুখ অনুভব করল রঘুনাথ, পরমুহূর্তে ঢিলিকাকির জন্য তার কষ্ট হল, বুকের ভেতর গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল, পুরো মুখটা নিমেষে বিষাদছায়ায় ভরে উঠল। চুনারাম বিড়ি ধরিয়ে এবার একটা বিড়ি রঘুনাথের দিকে এগিয়ে দিল, নে ধরা। বাপের ছিমুতে খাস আর আমার ছিমুতে খাবি নে তা কি হতে পারে?

ভালো না লাগলেও হাত বাড়িয়ে দিল রঘুনাথ, দাও। মাথাটা ধরে আছে। ধোঁয়ায় যদি চিন্তার ধোঁয়া ওড়ে।

-তুর এত চিন্তা কিসের? গলায় ধোঁয়া আটকে চুনারাম খুকখুক করে কাশল, আজ দিনটার দফারফা সেরে দিয়ে গেল লুলার বউটা। কুন কুক্ষণে যে ওর সাথে দেখা হল হে ভগবান। দেখা না হলে কখুন আমরা ঘর ধরে যেতাম।

আয়েশ করে বিড়ি টেনে রঘু পুকুরের দিকে তাকাল, দাদু গো, এবার আমি তাহলে কইফুল তোলা শুরু করি।

-হ্যাঁ হ্যাঁ, তা আর বলতে। চুলরাম পুকুরের চারধারে, এমনকী স্থির হয়ে থাকা দৈত্যের মতো জলটাকে নিবিড় চোখে দেখল, যা দাদু। ঝেঁপিয়ে পড়। আর দেরি করা উচিত হবে না। বেলা তো টিকলিতে উঠে গিয়েচে। আমাদের ফিরতে দেরি দেখে তুর মা নিশ্চয় খুব ভাবচে।

-তা ভাববে বইকি। জলের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথের চোখ ছোট হয়ে এল, মনের ভেতর ভয় হামাগুড়ি দিলেও বাইরে সে তা ভুল করেও বুঝতে দিল না, পায়ে পায়ে পুকুরয়াড়ির মুড়োয় গিয়ে দাঁড়াল সে। চুনারাম বিড়ির শেষটুকু ফেলে দিল জলে, তার চোখের তারায় সামান্য হলেও ভয়ের কাঁপুনী ছড়িয়ে পড়ল, বেশি দূর যাবি নে, যা তোলার ধারে-ধারে তুলে চটপট উঠে পড়বি। পুরনা পুকুর আর ছোকরা বাঘের গোঁ বোঝা দায়।

এই বয়সে সাঁতার কাটায় রঘুনাথ হয়ে উঠেছে ওস্তাদ। এ গাঁয়ের কোনো ছেলে ছোকরা তার সাথে ডুবসাঁতার-চিৎসাঁতারে পারে না। ভরা বর্ষায় রঘুনাথ গাঙ পেরিয়ে চলে যায় ভিন পাড়ে, তার হাঁপু ধরা তো দূরে থাক, সামান্য বড়ো করেও শ্বাস ছাড়ে না। লুলারাম তার সাঁতারের বহর দেখে বলেছিল, রাজোয়ার বংশের মান রাখবি তুই। তুর যদি মন চায়, আমার বিদ্যেটাও শিখতে পারিস। তোর মতোন চ্যালা পেলে আমি শরীল নিংড়ে দু-হাত উজাড় করে সব দিয়ে যাব। কি রে নিবি? লুলাখুড়ার কথা শুনে হাঁ-হয়ে গিয়েছিল রঘুনাথ। চট করে তার মুখে কোনো ভাষা আসে নি। সেদিন প্রস্তাবটা শুনে ভয়ে তার গলা জড়িয়ে গিয়েছিল। লুলারাম এ তল্লাটের নাম করা ডাকাত। এ বিদ্যায় তার বুদ্ধি প্রখর। নিজের গাঁয়ে কিংবা তার আশেপাশে সে কোনো কাণ্ড করে না। কিন্তু ভিন গাঁয়ে তার দাপট নোনা অঞ্চলের বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর। গ্রামের প্রায় মানুষ এ সংবাদ জানলেও ভয়ে কেউ মুখের উপর কিছু বলে না। তবে মাঝে মাঝে থানার জিপ আসে কালীগঞ্জ থানা থেকে। ওরা বেশির ভাগ আসে মাঝ রাতে। পাকুড়তলায় জিপ দাঁড় করিয়ে ওরা হেঁটে আসে লুলারামের দোতলা ঘর অবধি। পাড়ার কুকুরগুলো তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে, চিল্লিয়ে–চিল্লিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় গেরস্থের। ঘুম চোখে রঘুনাথ অনেকদিন শুনেছে খিস্তি-খেউড়। চোখ ডলে নিয়ে লুলারাম কাকা হাতজোড় করে দাঁড়িয়েছে থানার মেজবাবুর সামনে, আজ্ঞে বাবু, ছি-চরণের ধুলো যখন পড়েছে তখন টুকে ভেতরে আসুন। কিচু না হোক এক গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে যান।

মেজবাবুর চোখ আগুন উগরায় আঁধারে, মারব এক লাথ, মেরে সার গাদায় ফেলে দেব। হারামীর বাচ্চা, থানার হাজিরা কি তোর বাপ দিতে যাবে? যদি শুনি ফের বিলা করেছিস-তোর চ্যাং মাছ কেটে তোকেই ভেজে খাইয়ে দেব। আমাদের সব সময় তোর উপর নজর আছে। চরকুঠিয়া-হাটাগাছার কেসটার এখনও ডিসিশন হয়নি। যদি প্রমাণ হয় ডাকাতিতে তুই ছিলিস তা হলে পেঁদিয়ে তোর পেছনের হাড়-মাংস আলাদা করে দেব।

মেজবাবুর ধমকানীতে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপে ঢিলি। থানার মেনিমুখো মানুষগুলো কি যে বলে তার মগজে তিলমাত্র ঢোকে না। তবে লুলারাম লতপতে চোখে তাকায়, তার দৃষ্টিতে ভয় তো নেই উল্টে বদলা নেবার বাসনা। রঘুনাথ ঘুমশরীরে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে সব শোনে, শোনামাত্র ভয়ে গা-হাত-পা কাঠ হয়ে যায়, দুর্গামণি ভয়ে ফিসফিসায়, আতঙ্কে কালো হয়ে যায় তার মুখ, এ ব্যাটা, ঘর চ। কার ঢিল কার গায়ে লাগবে ঠাকুর জানে। ছিঃ ছিঃ, ঠাকুরপোর চরিত্র আর শুধরালো না! এ সব দেখাও পাপ, শোনাও পাপ। চ, ব্যাটা ঘর চ।

লুলারাম খুড়ার কথাগুলো এখনও মনের ভেতর ঘাই দেয়। সৎ-পথে তার মাটির দোতলা ঘরখানা ওঠে নি। এই ঠাঁটবাট, চলা ফেরা এসবের জন্য টাকা-পয়সা দরকার। এ সব খরচা আসে কোথা থেকে? চুনারাম পেছনের চামড়ার খড়ি উসকে বলে, উৎপাতের ধন চিৎপাতে যাবে, তুই দেখে নিস দাদু। চাঁদ-সূয্যি এখনও আলো দেয় রে, তুই দেখে নিস দাদু, ওদের ভালো হবেনি। যারা পরের ধনে পোদ্দারী করে তাদের সেই ধন খসে যায়।

নাল ফুলের ডাঁটায় বাঁ-হাতের বেড় ভরে গিয়েছে রঘুনাথের। জলজ ডাঁটাগুলো থেকে অদ্ভুত একটা সুঘ্রাণ আসছে, টাটকা ফুলগুলোও কম যায় না, সুগন্ধ গায়ে মেখে ওরা সব যেন জলকুমারী। রঘুনাথ ওদের নরম শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে, আদর করে। মন ভরে যায়। এতক্ষণ জলে থাকার মেহনতটা সুদে আসলে উঠে যায়। ডাঙার কাছে সাঁতরে গিয়ে সে চুনারামকে ডাকে, দাদু, ধরো। জলে ভেসে গেলে আর আমি জড়ো করতে পারব না। হেঁপসে গিয়েচি।

হাঁটুজলে নেমে নালফুলের ডাঁটিগুলো যত্ন নিয়ে ডাঙায় ছুঁড়ে দিচ্ছিল চুনারাম। বার বার জল থেকে ডাঙায় ওঠা সময় সাপেক্ষ কাজ, সময় বাঁচাতে চুনারামের বুদ্ধিটা মনে মনে তারিফ করল রঘুনাথ। মনে মনে সে ভাবল আজ ঘরে ফিরলে দুর্গামণির আঁধার মুখে আলো ঝরে পড়বে। অনেক দিন পরে মায়ের খুশি মুখটা দেখতে পাবে সে। গুয়ারাম খাটতে যাবার পর থেকে কেমন মেঘলা হয়ে আছে দুর্গামণির মনটা। রঘুনাথ আড়চোখে দেখেছে। তারও মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। অভাবই এই মন খারাপের জন্য দায়ী–একথা বুঝতে আর বাকি নেই রঘুনাথের। আর একটু বড়ো হয়ে অভাবের টুঁটিটা সে টিপে ধরবে। লুলারাম কাকার কথাগুলো সে আজও মন থেকে মুছে ফেলতে পারে নি। কথাটায় দম আছে; মদের মতো নেশা হয় শুনলে। পরের ধন চুরিয়ে যারা বাঁচে তারাও তো মানুষ। তাদের কেউ ডরে, কেউ ঘেন্না করে। তবে তারা বেশ ঠাটবাট নিয়ে থাকে। তাদের কাছে নিজ-হাত জগন্নাথ। কোনো কাজই তো পাপের নয়। বিধান যদি এই হয় তাহলে পাপের কোনো প্রশ্ন ওঠে না। রঘুনাথ অন্যমনস্ক হয়ে গেল ভাবতে-ভাবতে। জলে গা-ভাসাতে আর ভালো লাগল না তার। উড়ুলমাছের চেয়েও জোর-গতিতে সাঁতার কেটে সে ডাঙার কাছাকাছি এল। চুনারামকে বলল, তুমি ডাঙায় ওঠো, আমি একদিকটা সামলে নিচ্ছি।

-পারবি রে দাদু?

-না পারার কি হল? রঘুনাথের গলায় ছোকরা হয়ে ওঠার জেদ ঝরে পড়ল। নাল ফুল আর ডাঁটাগুলোকে নিয়ে সে জল সাপড়ে ডাঙায় উঠে এল। ডাঙায় উঠে বাঘ দেখার মতো চমকে উঠল সে, বুকের মধ্যে চলতে থাকল আটাচাকির মেসিন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীলাক্ষবাবু কোঁচা সামলে সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন। ভরদুপুরে এদের পুকুরয়াড়িতে দেখতে পাবেন আশা করেন নি; তিনি অবাক হলেন, কি ব্যাপার, তোমারা এখানে কী করছ?

চুনারাম ভেজা হাত পরনের খাটো ধুতিতে মুছে নিয়ে হাসল, এই যে বাবু, নালফুল তুলছিলাম। পেটের ধান্দায় কুথায় না যেতে হয় গো!

-তা বলে যাওয়ার আর জায়গা পেলে না? শেষ পর্যন্ত আমার এই পুকুরটাই তোমাদের নজরে পড়ল? বলিহারি দিই তোমাদের চোখকে। নীলাক্ষবাবুর গলা চুঁইয়ে ঘৃণা আর বিস্ময় পাশাপাশি ঝরে পড়ল, তিনি এক দৃষ্টিতে নালফুলগুলোর দিকে তাকালেন, এগুলো তুললে যে, অনুমতি নিয়েছ?

অসহায় ঘাড় নাড়ল চুনারাম, জলের মুফুতে জিনিস, কত লোকে তো নেয় বাবু, আমি না হয় দুটো ডাঁটা না বলে তুলে নিয়েছি।

কেন নিলে? আমার জলের ফসল আমার, মানো তো কথাটা? রাগে লাল দেখাচ্ছে নীলাক্ষবাবুর চোখ দুটো। সেই অগ্নিবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ ম্যাদামারা হয়ে গেল চুনারামের, তার ভাবখানা এমন, সে যেন টানাজাল ফেলে সব মাছ ধরে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এখন ধরা পড়ে যাওয়াতে কাঁচুমাচু মুখ। তাকে দেখে হুঁকরে উঠলেন নীলাক্ষবাবু, জান, আমি তোমাকে থানায় ঢুকিয়ে বেধড়ক মার খাওয়াতে পারি।

-জানি, সে ক্ষেমতা আপনার আচে, বাবু! আপোসের পথে হাঁটতে চাইল চুনারাম, এবারকার মতো ছেড়ে দিন গো, বেলা বাড়চে ঘর যাই। তাছাড়া ভোখও লেগেচে জব্বর। পেটের ভেতর খিদে ভাবটা কুকুরের নখ হয়ে আঁচড় কাটচে।

অনেকক্ষণ পরে নীলাক্ষবাবুর নজর রঘুনাথের উপর পড়ল, তোমার সাথে এটা কে?

–আজ্ঞে, গুয়ারামের ব্যাটা।

-ওঃ। তা এখন থেকে ওকে হাত ধরে সব শেখাচ্চো বুঝি? নীলাক্ষবাবু ঠোঁট বেঁকাল, রক্তের দোষ আর যাবে কোথায়? কালকেউটের ছা তো কালকেউটেই হয়। কেউ হেলে সাপ হলে ওরা তাকে মেরে ফেলে।

–দুটো ডাঁটার জন্যি এত কতা বলা কি নেয্য হয়, বাবু? চুনারামের কথায় হোঁচট খেলেন নীলাক্ষবাবু। তিনি আগের মতো উত্তেজিত হলেন না, শুধু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, তোমাদের সাহস দেখে আমার খুব অবাক লাগছে। দিনে দিনে আর কত কী যে দেখতে হবে।

দেখার তো সবে শুরু। মুখ ফসকে রঘুনাথের গলা ঠেলে বেরিয়ে এল কথাগুলো। নীলাক্ষবাবু অবাক চোখে তাকালেন, তুমি চুপ করো হে ছোকরা? সেদিনের ছেলে, নাক টিপলে দুধ বেরয়, তার আবার বড়ো বড়ো কথা।

এখন তো ছোট মুখে বড়ো কথা শোনা যায়। রঘু কথাগুলো বলেই মাঝ পুকুরের দিকে তাকাল, নালফুলগুলো আমরা না নিলে ও গুলান পচে যেত। জল নষ্ট হোত ওতে। বদঘেরাণ ছাড়ত, সেটা কি ভালো হোত?

ভালো-মন্দ যা বোঝার আমি বুঝব, তুমি আগ বাড়িয়ে কথা বলার কে? নীলাক্ষবাবুর চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। রাগে ফুঁসছিলেন তিনি। ছেলেটার স্পর্ধা দেখে তিনি বিস্মিত। ছোটলোকদের এই বাড় কোনোমতে সহ্য করা যাবে না, ফলে গায়ে গরম তেল ছিটিয়ে পড়ার যন্ত্রণা শুরু হল নীলাক্ষবাবুর, তোমার বাবার নাম কি আমি জানতে পারি?

-শ্রীগুয়ারাম রাজোয়ার! রঘুনাথ ঘাবড়াল না।

নীলাক্ষবাবু দাঁত দিয়ে দাঁত ঘষলেন, হালকা হলেও সেই ঘর্ষণের শব্দটা তার কানে বোলতার ভোঁ-ভোঁ আওয়াজের মতো বিশ্রী শোনাল, দরকার হলে আমি আজই থানায় যাব। আজ পুকুরে নালফুল তুলছে, কাল সুযোগ পেলে মাছ ধরবে। এটা কি মামার বাড়ি? যা খুশি তাই করবে। থানার বড়বাবু আমার চেনা-জানা। দেখি শেষ পর্যন্ত কী করা যায়। নীলাক্ষবাবু উবু হয়ে ডাঁটাগুলো খামচে ধরলেন, তারপর সক্রোধে ছুঁড়ে দিতে চাইলেন জলের দিকে। চুনারাম কালবিলম্ব না করে বাবুর পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল, এ কাজ করবে নি বাবু, বড়ো আশার জিনিস। ঘরে কুনো বাজার নেই। এগুলান নিয়ে গেলে চচ্চড়ি হবে। কত আশা করে নাতিটা পুকুর থিকে তুলেছে।

-ঠিক আছে, আজকের মতো নাও। পরে যদি দেখি ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। নীলাক্ষবাবু গা থেকে ক্রোধ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। যাওয়ার সময় তিনি কড়া চোখে রঘুনাথের দিকে। কটমট করে তাকালেন, শোন ছোকরা, তোমার সাথে আমার আবার দেখা হবে। আজকের দিনটার কথা মনে রেখো, তাতে দু’পক্ষের মঙ্গল। রঘুনাথ গুরুত্ব দিল না নীলাক্ষবাবুর কথাকে, অবজ্ঞায় শক্ত হয়ে উঠল তার ঠোঁট, আমিও চাইচি-চটজলদি আবার দেখা হোক। যত দেখা হবে তত সম্পর্ক আরও ভালো হবে।

ওরা দু-জন দুদিকে ছিটকে গেল।

ফেরার পথে চুনারামের মুখে কোনো শব্দ নেই। খাঁ-খাঁ রোদের ভেতর সে একমনে হাঁটছিল। রঘুনাথ তাকে তাতানোর জন্য বলল, কি গো দাদু, ভয়ে কি দম এটকে গেল নাকি?

পায়ের গিঁট ফুটিয়ে চুনারাম ভয়ার্ত চোকে তাকাল, বাবু লোক ভালো নয়, হারামীর হদ্দ। আশেপাশের গাঁ-গুলাকে জ্বালিয়ে মারচে। ভয় তো হবেই। খরিস সাপের লেজে পা দেওয়া তো মুখের কথা নয়।

-মিচিমিচি ভয় পেওনি তো? রঘুনাথ দম নিল, এই তো দেখলে লাঙল যার জমি তার নিয়ে কত লড়াই হয়ে গেল। কারা জিতল? সে তো তুমি নিজের চোখে দেখলে! ফলে বাবুদের অতো ফটফটানী থাকবে না। তবে সময়ের সাথে ওরা যদি না বদলায় তাহলে পরে মুখ থুবড়ে পড়বে।

-তুই এসব কতা শিখলি কুথা থেকে?

–কেসনগর থিকে মাস্টুর আসে, সে আমাদের আখ খেতে কেলাস নেয়।

–আগে বলিস নি তো?

–মাস্টুর মানা করেছে।

-মাস্টুর আর কী কী বলেচে? আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল চুনারাম। তার ভয়-ভয় করলেও সে কথাগুলো শুনতে চায়।

রঘুনাথ উৎসাহিত হয়ে হাতের মুঠি পাকাল, তারপর গলার রগ ফুলিয়ে ডান হাত মুঠো করে ছুঁড়ে দিল শূন্যে, লড়াই-লড়াই লড়াই চাই। লড়াই করে বাঁচতে চাই। বুঝলে দাদু, লড়াই ছাড়া এদেশে কিছু হবার নাই। কুশলবাবু বলেচে-সে আসছে রোববার আসবে। এবার গাঙধারে মিটিং হবে। হলদেপোঁতা ধাওড়া থেকে শুরু করে বসন্তপুর ধাওড়া থিকেও লোক আসবে। ইবারের মিটিংটায় খাস জমি দখল নিয়ে কথা হবে।

-খাস জমি যে দখল নিবি–জমিটা কুথায়? চুনারাম খ্যা-খ্যা করে কালো দাঁত দেখিয়ে হাসল, বাবুদের বোন্দুক আচে, তুই বাপু ওসব ঝুটঝামেলায় যাবি নে। গুয়া যদি জানে তো লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে ছাড়বে। ওর রাগ তো জানিস, দিবে ঘর থেকে বের করে। কথায় কথায় বেলা ঢলে পড়ে, অশ্বত্থের ডালে হাজার-কিসিমের পাখি এসে জড়ো হয়েছে। ওদের ছোট-বড়ো চিৎকারে বাতাস পুলকিত হয়ে হিল্লোল তুলেছে তেলা পাতায়। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল রঘুনাথের, টিউকলটার দিকে তাকিয়ে সেই শুকনো ভাবটা খরার মাটির চেয়েও খড়খড়ে হয়ে উঠল।

দাদু, তুমি টুকে দাঁড়াও। রঘুনাথ ছুটে গেল কলের দিকে। সরকারি এই কলের জল যেন চিনি পাতা সরবত। খরানী দিনে এর শীতল জল যেন পাতাল থেকে স্বেচ্ছায় উঠে এসেছে মানুষের সেবায়। এই শেষ-দুপুরেও কলপাড়ে ভিড়ের কোনো শেষ নেই। নূপুর মাটির কলসী নিয়ে এসেছে জল নিতে, ওর বেণী করা তেল জবজবে চুল শিরদাঁড়ার দু’দিকে ঝুলে আছে কালো রঙের সাপের মতন। টিউকলের হ্যাণ্ডেলে চাপ দিলে ভসভসিয়ে জল উঠছে পাতাল ছুঁড়ে। নূপুর অবাক হয়ে দেখছে সেই স্ফটিকস্বচ্ছ জল। রঘুনাথ গিয়ে সেখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল, এই সর বলছি। তেষ্টা পেয়েচে। ভরপেট জল খাবো। এই বুন, কল দাবিয়ে দে নারে।

আব্দারের কথায় নূপুর বেজে উঠল খুশিতে, নে। তবে মুখ লাগাবি নে। জানিস রঘুদা, এই ধাওড়াপাড়ার টিউকলে কত বাবুলোকে তেষ্টা মেটায়।

রঘুনাথ খুশি হল না কথা শুনে। কলসীতে জল ভরে নূপুর তার ছোট্ট কোমরের খাঁজে আটকে নিল। অমনি কলসী চুয়ানো জলে তার হলদে রঙের পুরনো ফ্রকটা ভিজে রঙবদল করে ফেলল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নূপুর বলল, রঘুদা, তুর খোঁজে সেই বামুনপাড়ার ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা এসেছিল। জেঠি বসতে বললে সে বসল না। যাওয়ার সময় বলল, সে কালীগঞ্জ থিকে বিকেলবেলায় ফিরবে। তোকে ঘরে থাকতে বলেছে। কী যেন দরকার।

রঘুনাথ চুপ করে থাকল। সূর্য সময়-অসময়ে এখন ঘরে আসে। দশ বছর আগেও তার বাপ-ঠাকুরদা এদিকের ছায়া মাড়াত না। তবে কি সময় ঢলছে? নাকি নতুন করে সূর্য উঠবে আবার।

.

০৩.

বিকেলবেলায় লাখুরিয়ার ওদিক থেকে একখণ্ড মেঘ কালো দৈত্যের চেহারা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধাওড়াপাড়ার মাথার উপর, চক্কর কেটে চতুর চিলের মতো ওড়ে, উড়তে উড়তে হুস করে মানিকডিহির ঘাটের কাছে গিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়, তাকে আর দেখতে পায় না চুনারাম। শুধু বুক ফুঁড়ে উঠে আসা একটা বড়োশ্বাস বুকের পাকা লোম কাঁপিয়ে সরসরিয়ে নেমে যায় পায়ের গোড়ালির দিকে। চুনারাম অস্ফুটে বলে ওঠে, আজও ভাগলো, আজও ঠকালো। শালা আকাশটাও কেমুন হারামী হয়েচে দেখো, ঢালব ঢালব করেও ঢালচে না। মানুষগুলার সাথে ধ্যাসটুমু মারাচ্চে। চুনারাম আর নিজেকে নিজের ভেতর ধরে রাখতে পারে না, চাপা রাগটা ক্ষরিস সাপের মতো ফণা তুলতে চায় প্রকৃতির বিরুদ্ধে। দেশ-গাঁ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলে এখন তার অত চিন্তা নেই, তার যত চিন্তা শুধু গুয়ারামকে নিয়ে। ছেলেটা বুনোপাড়ার দলের সঙ্গে মুনিষ খাটতে মানিকডিহির ঘাট পেরিয়ে নয়াগ্রামের দিকে চলে গিয়েছে। ওদিকটায় বর্ধমান, শুনেছে সেখানে নাকি চাষকাজের লোকের বড্ড অভাব, টাকা ছড়ালেও কাজের লোক পাওয়া যায় না, ফলে মাঠকাজে সেখানে বরষার দিনে ভীষণ অসুবিধে। বৃষ্টি না হলে ছেলেটা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে বিদেশ বিভুঁইয়ে, যা সাথে করে নিয়ে গিয়েছে তা-ও আঁজলা চুয়ানো জলের মতো নিঃশেষ হয়ে যাবে, আসলে বসে খেলে সসাগরা পৃথিবীটাকে চিবিয়ে খেতে মানুষের বেশিদিন লাগবে না। দুলাল আর ইন্দুবালার ঘর আসার কথা শুনেছে সে, তবে ওরা এবার বসন্তপুর ধাওড়া হয়ে আসবে, সেখানে দুলালের বড় মেয়ে বিন্দুর বিয়ে হয়েছে, তাদের সংসারে কী সব অশান্তি, তা মিটমাট করে না এলে বিদেশে-বিভুঁইয়ে গিয়েও শান্তি নেই দুলালের। দুলাল এই আসে ওই আসে বলে চুনারামের ভেতরটাতে অপেক্ষার ট্যাক গজিয়ে গিয়েছে, এখন একটা উন্মনা অস্থিরতা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে হরসময়। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকতে বেলা গড়ে যায় পশ্চিমে, রোদের তেজ মরে আসে শুকনো তেজপাতার মতো, আর ঠিক তখনই রঘুনাথকে দুলালের ঘরে বলে কয়ে পাঠাল চুনারাম। রঘুনাথের যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, বিশেষ করে খাওয়ার পরে তার একটু গড়িয়ে নেওয়ার দরকার, এটা এখন এক প্রকার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তবু চুনারামের অনুরোধকে ঠেলতে পারল না রঘুনাথ, আর সেই সঙ্গে দুর্গামণিও চাইছিল রঘুনাথ যেন দুলালের ঘরে যায় এবং খোঁজ নিয়ে আসে। মায়ের দুঃখী মুখের কথা ভেবে রঘুনাথ দুলালের ঘরে গিয়েছিল, এবং সেখানে দুলালের বুড়ি মা ভূষণী ছাড়া আর কেউ নেই। ভূষণী বুড়ি খনখনে স্বরে যা বলল তার অর্থ করলে দাঁড়ায়, সে ছেলে এখুন আসবে না গো। আসা কি মুখের কথা? এ তো লাখুরে-হলদেপোঁতা ধাওড়া নয়, পথ যে অনেকটা, এট্টা নদী পেরতে হয়, তাপ্পর হাঁটা পথে ক’ ক্রোশ আমি ঠিক জানি নে বাবু। ছেলেটারে আগে ঘর ধরতে দাও, ঘর এলে আমি তারে তুমাদের ঘরে পেঠিয়ে দেবো। চিন্তা করো না।

ভূষণীবুড়ি এই বয়সে একা আছে, ঘর সামলায়, স্বপাক খায়। শরীর ভালো বুঝলে সে ভিখ মাঙতে যায় পাড়ায়-পাড়ায়। দশ ঘরের চাল ফুটিয়ে না খেলে তার খিদে মরে না। আসলে অভ্যেস, স্বভাব দোষ যাবে কোথায়। দুলালের বাপ গত হবার পর ভিক্ষাই ছিল তার একমাত্র জীবিকা, এত দিনের অভ্যাসকে সে তাই ভুলতে পারেনি, কেউ বাধা দিলে সে ফোকলা মাড়ি বের করে বলবে, ভিখ মাঙাটা অক্তে ঢুকে গিয়েচে গো, ঘরে হাত মুড়িয়ে বসে থাকলি পরে শরীলটা ম্যাজম্যাজ করে, সুখের ভাত হজমাতে চায় না। শুনলে হাসবে-ভিখ মাঙতে না গেলে রাতে আমার নিদ হয় না।

রঘুনাথ বেজার মুখে ঘর ফিরে এসে চুনারামকে কথাটা উগলে দিয়ে আর দাঁড়াল না, এক ছুটে টেরি বাগিয়ে বাঁধের গোড়ায় গিয়ে কদমছায়ায় দাঁড়াল। সূর্যর আসার সময় হল, সে গেলে সাইকেল ঠনঠনিয়ে এ পথ দিয়ে যাবে, এবং অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করে যাবে। সূর্য লাখুরিয়ার হাই ইস্কুলে পড়ছে, অথচ রঘুও ওই ইস্কুলে পড়তে পারত, কিন্তু তার বাবার জন্য বড় ইস্কুলে শেষঅব্দি পড়া তার হল না। প্রধান বড়ো মুখ করে বলেছিল, বুনোঘরের কোনো ছেলে যদি পড়তে চায় তার সবরকম খরচাপাতি তিনি সরকার থেকে পাইয়ে দেবেন। কথাটা গুয়ারামের কানে পৌঁছেছিল। কিন্তু গুয়ারাম রাজি হল না, ওর সাহসেও কুলাল না কেন না এর আগে সে এরকম বড়ো বড়ো কথা শুনেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই তাদের কপালে জোটে নি। ছেলেকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিতে সে রাজি নয়, তার চেয়ে নিজের কাজে লেগে যাক। দু-পয়সা কামাক, তা সংসারের দায়ে-অদায়ে লাগবে। মায়ের সঙ্গে পাড়ার সব গোরু নিয়ে চরাতে যেত রঘুনাথ, দুর্গামণির কেঁচড় ভর্তি মুড়ি, যার জন্য ভরদুপুরেও ঘর আসত না তারা, বুড়িগাঙের জলে মুড়ি বাঁধা গামছা ভিজিয়ে পাটালি কিংবা ভেলিগুড় দিয়ে দুপুরের আহারটা সেরে নিত তারা। গোরু চরানোয় যে এত সুখ আগে জানত না রঘুনাথ, পরে যত দিন অতিবাহিত হল–এই সুখ একদিন নেশায় পরিণত হল, সেই সঙ্গে খুলে গেল মনের জানলা-দরজা। বাবুদের গোরু চরাতে এসে কৃষ্ণনগরের কুশল মাস্টারের সাথে তার পরিচয়। এত ভালো মানুষ তাদের আশেপাশের দশ-গাঁ ঘুরে এলেও পাওয়া যাবে না। কুশল মাস্টারের কথায় জাদু আছে যে জাদু হরিনাথপুরের কদবেলতলা ধাওড়াপাড়ার বিদুর রাজোয়ারের আছে। শুধু বিদুর নয়, তার স্ত্রী লাবণি রাজোয়ারও কম যায় না, ওরা এখন সব ধাওড়াপাড়ায় গিয়ে মিটিং-সভা করে বেড়াচ্ছে, বিচারসভার গাঁওবুড়োকে ওরা কোনো পাত্তাই দিতে চায় না। ওদের কথা মন দিয়ে শুনলে গায়ের খুন গরম হয়ে যায় রঘুনাথের। একা থাকলে সেসব কথা মনে পড়ে ওর, মাছ ঘাই দেওয়ার মতো তোলপাড় করে দেয় মন, বাবুদের তখন মনে হয় কালীপুজোর তুচ্ছ শ্যামাপোকা, ওদের ভয় করে কি হবে, ওদের না আছে হুল, না আছে তেজ-বিষ। ওরা টোড়া সাপেরও অধম, শুধু চেহারায় দশাসই রাবণ। ওদের সাথে মিশে বাবুদের আর ভয় পায় না রঘুনাথ, বাবুরা উল্টা-সিধা বললে সে মুখের উপর জবাব দিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে মনের ভেতর আনন্দ এসে জড়ো হয়, আর সেই অন্তর্গত আনন্দটা জিয়োল মাছের মতো রক্তের পুকুরে বেঁচে থাকে ঢের দিন। এখন সময় পেলেই সে হাঁটতে হাঁটতে কদবেলতলার ধাওড়াপাড়ায় চলে যায়। বিদুর আর লাবণির সঙ্গে গল্পগুজব করে ফিরে আসে সাঁঝের বেলায়। দুর্গামণি বকাঝকা করলে সে দাঁত বের করে হাসবে, ও তুমি বুঝবে না মা। সব কতা সবার মগজে কি ঢোকে গো।

-আমার ভয় করে বাপ। শুনেছি ওরা মানুষ ভালো নয়, সুযোগ পেলে মানুষ খেপায়, মানুষ তাতায়। হাসি মিলিয়ে যায় দুর্গামণির শুকনো মুখের। ভয় এসে রাতচরা বাদুড়ের মতো খামচায় মুখের চামড়া।

গুয়ারামের কথা ভেবে চুনারামের রাতের ঘুম উধাও। গুয়ারাম ভিন গাঁয়ে গিয়ে কী খাচ্ছে, কোথায় শুচ্ছে এই নিয়ে যত চিন্তা। বাপকে নিয়ে রঘুনাথের কোনো মাথাব্যথা নেই, সে জানে তার বাবা যেখানে থাকবে ভালো থাকবে। মানুষের ঘাড়ে দায়িত্ব না চাপলে সে ভার বইতে পারে না, এমনকী সিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সেদিক দিয়ে দুলাল যা করেছে ভালো করেছে, অন্তত কটা দিন ওই কুঁড়ে মানুষটা কাজের মধ্যে থাকতে পারবে যা তার নিজের জন্য মঙ্গল তো বটে, পুরো সংসারের জন্যও সুখের।

চুনারাম বিকেলের দিকে ঘর ছাড়লে হাতে একটা বেতের লাঠি আঁকড়ে ধরে। আজ সে যে লাঠিটা নিয়েছে সেটা তার দাদুর আমলের। শুনেছে এই লাঠিটা দেবগ্রামের গোরুর হাট থেকে কেনা, এই তেলতেলা লাঠিটার বয়স শ’বছরের কম হবে না। লাঠি হাতে নিয়ে হাঁটলে শুধু শরীরের নয়, মনের বয়সও বেড়ে যায়। তখন বাঁধের ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগাঙের চেয়েও নিস্তেজ মনে হয় নিজেকে। অথচ এই লাঠিটা আঁকড়ে ধরলে শরীরে একটা টগবগে স্ফুর্তি আসে, আত্মবিশ্বাস প্রজাপতির মতো ফুরফুর করে ওড়ে মনের বাদাড়ে।

এখন আলোর রঙ সর্ষেফুলের চেয়েও নজরকাড়া। লাখুরিয়া থেকে উড়ে আসা মেঘটা ছুটে চলে গিয়েছে গাঙের দিকে। ফাঁকা বাঁধের উপর দাঁড়ালেও মেঘের রংটা বোঝা যায় না। এবছরটা খরা জ্বালাবে গাঁ। নামসংকীর্তনের দল খোল-করতাল বাজিয়ে গ্রাম ঘুরবে ভোরবেলায়। ললিত রাগিণীর সুর ভাসবে বাতাসে, হারমোনিয়ামের ব্লো টেনে কৃষ্ণনামের সুর ভাসবে সারা গাঁ-ময়। চুনারাম শুনেছে আজ থেকে দু’ক্ষেপে হবে নামগান। ভোরবেলা আর সাঁঝবেলায়। গাঁওবুড়া গ্রামসভা ডেকে বলেছে, তুলসীমঞ্চে ঝারা বাঁধো সব্বাই। মা তুলসী শেতল হলে পুরা ধরণী শেতল হবে। নামগানের জোরে মেঘ ঝরবে, এছাড়া কুনো গত্যন্তর নেই।

গাঁওবুড়ার কথা মেনে নিয়েছে সবাই। সেই সঙ্গে সবাই একবাক্যে বলেছে, গাঁয়ের ধুলোয় পাপ মিশেছে। যে পাপ করছে সে ভেবে দেখুক বারবার। একার পাপে হাজার কেন কাঁদবে। কথা শেষ হলে পুরো সভা মুনিরামের দিকে তাকিয়েছে। আর তাতেই চমকে উঠেছে কুষ্ঠরোগী মুনিরাম। বারবার ঢোঁক গিলে সে খড়খড়ে গলায় বলেছে, আমাকে দোষ দিও নি গো, আমি আর সাতে-পাঁচে নেই। ওসব কু-বিদ্যে আমি ছেড়ে দিয়েছি বহুৎ দিন হল। আমি এখন আমার মতো করে বাঁচি।

-তুমার কথা বলচি নে মুনি। সভার সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি মুনিরামের দিকে তাকিয়ে কাশল, সন্দেহ পাকমোড়া মারছে তার পুরো শরীরে, মুনিভাই তোমার কথা হচ্ছে না, হচ্ছে তুমার ছেলে লুলার কথা। ওর চলন-বলন ভালো ঠেকছে না আমাদের। খবর আছে ফি-রাতে ও ঘরে থাকে না।

মুনিরাম তেনা জড়ানো শরীর হেলিয়ে খুক খুক করে কাশল, আমি যত দূর জানি ব্যাটা আমার কু-কাজ করতে বেরয় না। সে এখন ঘরেই থাকে। আমার ঘরের বউটা তাকে রাত-বেরাতে যেতে দেয় না। বউয়ের কোল ছেড়ে লুলা আমার কেন যাবে বলো? ওপরওয়ালার দয়ায় আমার কি খাওয়া-পরার অভাব আচে? সে সব তো তুমরা নিজের চোখে দেখচো।

–দেখচি বলেই তো এত কথা বলা। সভা গমগমিয়ে উঠল, লুলার স্বভাব-চরিত্তির ভালো নয়। ভিকনাথের বউটার সাথে লটঘট চলছে। অনেকে ওদের আঁধার রাতে বাঁধের ধারে ঘুরঘুর করতে দেখেচে। বল, এসব তো ভালো নয়। এটাও তো সেই অনাচারের মধ্যে পড়ে। কী বলো?

মুনিরামের মুখে যেন এঁটেল মাটির কাদা লেপে দেয় গ্রামসভা। কথা হারিয়ে বুড়োটা ভ্যালভ্যাল করে তাকায়। বুকের ভেতরটা তার টিসটিস করে ভয়ে। যৌবনে তার সামনে এমন কথা বলার হিম্মোত কেউ রাখত না। তখন ঘোড়ায় চেপে বাঁধের ধারে টহল দিত মুনিরাম। তার কালো ঘোড়াটা হাওয়ার গতিতে ছুটত, দেবগ্রাম পৌঁছোতে সময় নিত বিশ মিনিটেরও কম। এ গ্রামের মানুষ সেই প্রথম আরবী ঘোড়া দেখে। মুনিরাম ঘোড়াটা কিনেছিল পলাশী মনুমেন্টের এক সাহেবের কাছ থেকে। কালো রঙের তেল চুয়োনো ঘোড়াটা সাহেবের বিশেষ পছন্দের ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার সময় ঘোড়া নিয়ে তো উড়োজাহাজে চড়া যাবে না, তাই জলের দামে বেচে দেওয়া। সাহেবঘোড়ার মেজাজ ছিল সাহেবের মতো, ছোলা ভুষি গুড় কচিঘাস ছাড়া সে আর কিছু খাবে না। যে কেউ তাকে ছুঁলেই পেছন পা দিয়ে লাথ ছুঁড়ে দিত সজোরে, চিঁ-হিঁ-হিঁ শব্দে পিলে চমকানো ডেকে উঠত তার অনিচ্ছা জানিয়ে। সেই জাঁদরেল ঘোড়াকে শেষ পর্যন্ত বশে এনেছিল মুনিরাম। চাবুকের ভয় পশুরও আছে। এক টানা দশ মাইল দৌড়ে ঘোড়াটাকে জব্দ করেছিল সে। পরে এই ঘোড়া তার অবস্থা ঘোরাতে সাহায্য করে। অমাবস্যা রাতে গাছপুজো সেরে মুনিরাম চলে যেত পরের দোরে ডাকাতি করতে। তার ঘাড়ে চামড়ার প্লেটের সাথে টাইট করে বাঁধা থাকত ছররা বন্দুক। কাজ শেষ করে ওই বন্দুক সে লুকিয়ে রাখত খড়গাদায়। থানা থেকে পুলিশ এলে টের পেত না কোনো কিছু। চোরাই মাল পুকুরে বস্তায় বেঁধে রেখে আসত মুনিরাম। জলের তলায় মাসের পর মাস পড়ে থাকত বাসন-কোশন সোনা দানা। তখন ছিল সুখের সময়, তখন চোখ টাটাত মানুষজন। আজ কত বদলে গেছে হলদেপোঁতা ধাওড়াপাড়া, তবু মানুষের মন থেকে ঈর্ষার কঠিন আঁচড় মুছল না। লুলারামের পেছনে লেগেছে সবাই। ছেলেটার বদনাম করতে পারলে ওরা আর কিছু চায় না। ভিকনাথের কচি বউটাকে নিয়ে এসব গল্পকথার কোনো মানে হয়? কষ্টে বুক ভেঙে যেতে থাকে মুনিরামের, তবু সে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। পরক্ষণে তার মনে হয় লুলারামকে তার বিশ্বাস নেই। যৌবন গঙ্গার পাড় ভাঙা ঢেউয়ের মতো, উপর থেকে কিছু বোঝা যায় না, তলায় তলায় চাকু শানায়। দশ লোকে যে কথা বলে তা কি আর ভুল হবে? যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। এবার থেকে চোখে-চোখে রাখতে হবে ছেলেটাকে। বউটা আর পেরে ওঠে না, ওরও তো মাথার কোনো ঠিক নেই, গরম চড়লে ঘিলু গলে যায়, শুরু হয় পাগলামী। ইংরেজি দাবাই করিয়ে এ রোগের কোন সুরাহা হবে না, আয়ুর্বেদ কিংবা তুকতাক ঝাড়ফুঁকে একে জব্দ করার ওষুধ আছে। মুনিরাম তার বিশ্বাস নিয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। ঢিলি গাছগাছড়ার ওষুধ খায়, কিন্তু কোনো সুফল পায় না। প্রভাবুড়ি রোজ সকালে এসে তাকে ঝাড়ফুঁক করে যায়, সেই সঙ্গে মন্ত্রণপাড়া জল খাইয়ে যায় কিন্তু এতেও কোনো ফল হয় না। আসলে বিধি মারলে ওষুধ মেলা ভার। ঢিলি তাই বুনো হাওয়ার মতো দৌড়ে বেড়ায়, তার রাত-বেরাত নেই, খরা-বর্ষার ধার ধারে না। সে স্বাধীন জলের ধারা। তাকে ঠেকানো যায় না, আটকানোও যায় না।

সভা শেষ হলে মুনিরাম একা হয়ে যায়, কানের ভেতর ঝাঁ-ঝাঁ বোলতার কামড় নিয়ে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে সে পাড়ায় ফিরে আসে। ধারে-কাছে সে লুলারামকে দেখতে পায় না। ঢিলি মাটিতে পা-থেবড়ে বসে খোলামকুচি দিয়ে আঁচড় কাটছিল। মুনিরাম তার দিকে এগিয়ে গেলে সে চিল্লিয়ে ওঠে, খবরদার, এদিক পানে আসবে না। আমি ঝারির পুতুল গড়িয়েচি গো। ওর বুকে আমি হলাবান মারব। ওকে আমি নাগবান মেরে বিষ ঢালব। ও মাগী আমার সব খেল গো। ওর জন্যি আমি আজ ভাতার ছাড়া।

মুনিরাম কী বলবে কথা খুঁজল। সে কিছু বলার আগেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল ঢিলি, ধুলো হাতটা ছাপা শাড়িতে মুছে সে ছাতা ধরা দাঁত বের করে খ্যা-খ্যা করে হাসল, বুড়ার আবার মরণ দেখো, ছেলের হয়ে বলতে এয়েচে। ছ্যা- ছ্যা! ও আবার ছেলে নাকি? ওতো ছেলি–প্যাঠা। বদা গো, বদা! বুঝেনি। হা-হা-হা! থুতু ছিটিয়ে হাসি ছড়াল ঢিলি। লাঠিতে ভর দিয়ে কিছুটা তফাত-এ দাঁড়াল মুনিরাম, লুলারে দেখেচো, সে কুথায় গেল বলতে পারো?

-পারি গো সব পারি। কেনে পারব নাই। ঢিলি বুক দুলিয়ে হাঁপাচ্ছিল, বেধুয়ার বেটা বেধুয়া হবে এ আর বড়ো কি কথা! এতদিন নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে বুড়া এখন এয়েচে ছেলের খোঁজ করতে। মরতেও দড়ি জোটে না। রাগে শরীরটা তেতে উঠলেও মনিরামের এখন কিছু করার নেই। অসুখ তার ক্ষমতায় থাবা মেরেছে, মানুষের অভিশাপ তাকে আজ অক্ষম করেছে, সারাজীবনের পাপকাজে তার পাপের ডিঙা ভরে গিয়েছে, সে এ জনমের শাস্তি শেষ জীবনে পেয়ে গিয়ে নিজের প্রতি বড়ো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। গাঁয়ের লোক আড়ালে আবডালে বলে, মুনিরাম কুনোদিন মুনিও হবেনি, রামও হবেনি। যে মানুষটা আগাগোড়া শয়তান সে দেবতার সাজ পরলেও মানুষ ঠিক তাকে চিনতে পারে। পাপের বদঘেরাণ যে দুনিয়া ছাড়া! অত মানুষের চোখের জল কি বেথা যাবে।

মাঝে মাঝে দগদগে ঘাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিয়ে হিসাব কষে মুনিরাম। বামুনপাড়ায় ডাকাতি করতে গিয়ে সে সোনাদানা ছিনিয়ে নিয়েছিল বিধবার। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে তুলে দেবে মা। সেই মায়ের স্বপ্ন আর পূরণ হতে দিল না মুনিরাম। জোর করে ছিনিয়ে নিল আঁচলের চাবিগোছা। টিনের বাক্স খুলে বের করে আনল স্যাকরার দোকানে গড়ানন বালা বাউটি চুড় চন্দ্রহার। পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিল বিধবা-মা, চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল দুঃখিনীর হৃদয়-সমুদ্র, ওগুলো নিও না গো, এর চেয়ে আমার জান নিয়ে নাও। এই ফালগুনে আমার মেয়েটার বিয়েঘর। ওর বাবা নেই। আমি বহু কষ্টে এগুলো জমিয়ে রেখেছি। এগুলো নিয়ে গেলে আমি পঙ্গু হয়ে যাব, খালি হাতে আমার মেয়েকে কেউ ছোঁবে না গো।

কেউ না নিক, আমি নেব। রানী করে রাখব। দেবে তো বলো।

তোর ওই মুখে পোকা পড়ুক। আমিও বামুনের মেয়ে। কোনোদিন পাপ আমাকে ছোঁয়নি। তোকে আমি শাপ দেব।

–তবে রে মাগী। চিৎ হয়ে শো। আজ রস গোটাব। হাত ধরে বউটাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিয়েছিল মুনিরাম। তারপর সে পশু হয়ে গেল নিমেষে। ধুতি সামলে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, যা এবার তোকে পাপ ছুঁয়ে গেল। এবার তুই প্রাণভরে আমাকে শাপশাপান্তি দে। আমি জানিরে–শকুনের শাপে গোরু মরে না। এলোমেলো শাড়িতে লজ্জাস্থান ঢেকে বিধবা মা’টি কাঁদছিল, তোকে আমি শাপ দেব, হ্যাঁ, হাজার বার দেব। যার মা-বোন জ্ঞান নেই সে বেঁচেও মরার মতো বাঁচবে। যে হাত দিয়ে তুই আমাকে ধরলি–সেই হাতে তোর কুঁড়িকুষ্ঠি হবে। খসে খসে পড়বে তোর হাত-পা। তুই নুলো হবি, তুই কৃমিকীট হবি। সবাই তোকে দেখে নাক কুঁচকাবে। তোর মুখে থুতু দেবে। পরের দয়া নিয়ে তুই বাকি জীবনটা বাঁচবি। আমি যদি সতী হই, আমার শাপ তোর ঠিক লাগবে।

মাত্র তিন বছরের মাথায় কুঁড়িকুষ্ট ফুটল মুনিরামের শরীরে। অসাঢ় হয়ে গেল শরীরের নিম্নাঙ্গ। তখন সত্যবতী বেঁচে, যৌবন কইমাছের মতো ছড়ছড়াচ্ছে অথচ তার কিছু করার নেই, শুধু পূজ-রক্ত নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। বামুনবাড়ির বিধবা বউটার কথা মনে পড়েছে মুনিরামের, ভয়ে আঁতকে উঠেছে সে, পাপের ডোবায় সে তখন ডুবে যেতে গিয়ে নিজেকে বাঁচাবার উপায়গুলো হারিয়ে ফেলে। এক ঘনঘোর আচ্ছন্নতা, আত্মধিক্কার, অপরাধবোধ সেদিন থেকে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, এর থেকে নিষ্কৃতি সে আজও পায় নি।

হাঁটতে হাঁটতে বাঁধের গোড়ায় চলে যাবার ইচ্ছে হয়েছিল চুনারামের কিন্তু অতটা খাড়াপথ লাঠিতে ভর দিয়ে উঠতে তার শরীর সায় দিল না। পিটুলিগাছটাকে পাশ কাটিয়ে সে ঘরের সামনের পথটায় এসে দাঁড়াল, ধুলোয় থিকথিক করছে পথটা, পা ফেললেই পায়ের চেটো ধুলোর বিছানায় ডুবে যায়, সারা পায়ে ধুলো জড়িয়ে নিজের পাটাকে আর চেনা যায় না। ধুলোভরা পা দুটো যেন অন্য কারোর।

কঞ্চির বেড়ার উপর ফড়ফড় করে উড়ছে রাজফড়িং; কিছু দূরে একটা কালো কুচকুচে ফিঙে হা-করে দেখছে ফড়িংগুলোর গতিবিধি, একটু সুযোগ পেলেই ফিঙে পাখিটা উড়ে এসে খাবলা মেরে ধরে নেবে রাজফড়িং তারপর উড়ে গিয়ে কোঁত করে গিলে নিয়ে আবার অপেক্ষায় থাকবে দ্বিতীয় শিকার ধরার জন্য। আগড় সরিয়ে চুনারাম গলা খেঁকারি দিয়ে মুনিরামের উঠোনে ঢুকে এল। এ সময় ঢিলির ঘরে থাকার কথা নয়, যথারীতি সে ছিল না, শুধু নূপুর এগিয়ে এল তার গলার আওয়াজ পেয়ে, দাদু, আসো গো।

পথ দেখিয়ে নূপুর সরে দাঁড়াল, নুপুরের ব্যবহারে মুগ্ধ চুনারাম হাঁ-করে তাকাল, ভাই কইরে? নূপুর কিছু না বলে উঁচু জায়গাটা দেখিয়ে দিল, বহু বছর আগে মুনিরাম মাটির ঘর তুলেছিল, ভয়ঙ্কর বন্যায় তা গলে যায়, হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে মাটির ঘরখানা। সেই থেকে জায়গাটা উঁচু হয়ে আছে, ছাগলছানা তিড়িং বিড়িং লাফায় সেই উঁচু ভাঙা কাঁথ দেওয়ালে। শীতকালের সকালে রোদ উঠলে মুনিরাম ওই উঁচু ঢিবি জায়গাটায় গিয়ে বসে, পিঠে রোদ লাগিয়ে সময় কোথা দিয়ে কেটে যায়, সে নিজেও টের পায় না। বছরের অন্য সময়গুলোতে রোদ সরে গেলে কিংবা রোদের তেজ কমলে মুনিরাম বোরা বিছিয়ে ওখানে বিশ্রাম নেয়। খিদে লাগলে ওখানে বসেই মুড়ি চেবায়, নূপুর পেতলের ঘটিতে জল দিয়ে যায়, বুড়োটা ঢকঢক করে খায় তারপর মুখ মুছে নিয়ে নূপুরকে আশীর্বাদ করে, তুই রাজরানী হবি। তোর মন অনেক উঁচা হবে। তোর মনে দয়া-মায়া উপচে পড়বে। তুই তোর বাপ-মায়ের মান রাখবি। সেদিক থেকে ভাগ্যবান লুলারাম। ওর ছেলে নেই ঠিকই, কিন্তু মেয়ে দুটো ছেলেকেও ছাপিয়ে যায়, সংসারের কাজে ওরা দশভুজা, ক্লান্তি নেই, সারাদিন মেশিনের মতো খাটছে তো খাটছে ফলে ঢিলির অভাবটা কাজের মাধ্যমে পুষিয়ে দিয়েছে ওরা। লুলারাম তাই শান্তিতে ঘোরাফেরা করতে পারে, শুধু বাজারহাট করে দিয়ে সে খালাস। লোকজন হাঁড়ি খুন্তি সব সামাল দেয় ওই দুটি মেয়ে। মুনিরাম চোখের সামনে অষ্টপ্রহর সব দেখে তাই কেউ কিছু ওদের নামে বললে ওর পিত্তি জ্বলে যায়, রাগে মুখ দিয়ে আজেবাজে কথা বের হয়ে আসে।

পড়ন্ত রোদে চুনারাম খাটো ধুতি গুছিয়ে মুনিরামের মুখোমুখি বসল। পাশাপাশি ঘর তবু অনেক দিন হল এদিকটায় তার আসা হয়নি, এমনকি খোঁজ খবরও নেওয়া হয়নি। অসুস্থ ভাইয়ের উপর চুনারামের একটা চোরাটান আছে যা সে কখনও কাউকে বলে বোঝাতে পারবে না। বাপ ঢুলিরাম গত হবার সময় তার হাত ধরে বলেছিল, আমার সময় হয়েছে বাছা, ইবার আমাকে যেতে হবেখন। তোর ভাই থাকল, তারে তুই দেখিস। বড় ভাই তো বাপের সমান।

ঢুলিরামের কথাগুলো আজও মাঝে মাঝে মনে পড়ে চুনারামের, তখন মনটা কেমন কঁকিয়ে ওঠে, ব্যথায় নীল হয়ে যায়। দেশ-দুনিয়া, এ জগত কিছু ভালো লাগে না, মুনিরামের ঘেয়ো শরীরটা যেন তার শরীরের ভেতর ঢুকে যায়, কিছুতেই এই ব্যাধিটাকে ঠেলে বের করে দেওয়া যায় না। কালীগঞ্জ হাসপাতালের মোটা টিকাদারবাবু মুনিরামকে দেখে বলেছিলেন, ঘরে বসে থাকলে এ অসুখ সারবে না। হাসপাতালে যেও, ডাক্তারবাবু ওষুধ দিয়ে দেবেন। হাসাপাতালে এ রোগের চিকিৎসা হয়।

-পাপরোগের চিকিৎসা হয়? যেন আকাশ থেকে পড়েছিল মুনিরাম। সেদিন পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল চুনারাম। টিকাদারবাবু মুনিরামকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, পাপরোগ বলে কোনো রোগ হয় না। কুষ্ঠ কোনো অভিশাপ নয়, ওটা একটা রোগ। যে-কারোর হতে পারে। সব কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়। নিয়ম করে দেখালে এ অসুখ সেরে যায়, এ রোগটাকে ভয় পাবার বা লুকোবার দরকার নেই। জ্বরজ্বালা, মাথা ব্যথার মতো এটাও একটা অসুখ।

তবু টিকাদারবাবুর কথায় ভরসা রাখতে পারে নি চুনারাম আর মুনিরাম। ওই মাঝ বয়েসী মানুষটা বলে কি! এমন কথা কি বিশ্বাস করা যায় যে কুষ্ঠরোগটা কোনো বিধির অভিশাপ নয়? পাপের ফল নয়? গ্রামসমাজের চাপে পড়ে মুনিরামকে আলাদা করে দিয়েছে লুলারাম। তার জন্য আলাদা একটা ঝুপড়ি বানিয়ে দিয়েছে পণ্ডিতবিলের ধারে। চাপা গলায় সতর্ক করে বলেছে, এদিকপানে এসো না, গাঁয়ের কেউ দেখে নিলে আমার ঝামেলা হয়ে যাবেন। তুমার যখন যা দরকার হবে আমাকে বলবে–আমি দিয়ে আসব।

দুকুরবেলায়, সাঁঝবেলায় তাহলে কুথায় খাবো? মুনিরামের গলা বুজে এসেছিল কান্নায়। বাঁশপাতার মতো কাঁপছিল সে।

–আঃ, মন খারাপের কী আছে? আমরা তো তুমার পাশে আছি, শুধু ঘরটা যা আলাদা। লুলারাম ধমক দিল।

নিজের হাতে বানানো ঘরে নিজে থাকতে পারব না! ওঃ, এ যে কী মা শীতলা বুড়ির মহিমা কিছু বুঝতে পারি না। এর চেয়ে শ্মশানঘাটে চলে গেলে ভালো হত। ওখানে সমাজের লাল চোখ নেই। কোঁকড়া চুলগুলো সজোরে চেপে ধরে হা-হুতোশ করে মুনিরাম। খড় আর ছিটে বেড়ায় বানানো ঝুপড়িটাকে সে মন থেকে মেনে নিতে পারে না, কষ্ট হয়, বুক মোচড় দিয়ে ওঠে, চোখের কোণে থিকথিক করে জল, বুঝতে পারে সে এ সংসারে এখন একটা এঁটো পাতা ছাড়া আর কিছু নয়। তবু চুনারাম আসে, মাঝে মধ্যে তার খোঁজখবর নিয়ে যায়, ভালো-মন্দ কিছু হলে সে ছোটভাইটার জন্য পাঠিয়ে দেয়। একা খেতে মন সায় দেয় না। বাবার কথাটা মনে পড়ে, বড়ো ভাই তো বাপের সমান।

আজ দাদাকে দেখে মুনিরাম উৎসাহিত বোধ করল, আয়, ছিমুতে সরে আয়। কদিন পরে এলি বল তো? আমি তো পথের দিকে হাঁ-করে চেয়ে থাকি। বুড়াটার খোঁজ নিতে কেউ আসে না। আর আমার কাছে আসবেই বা কেন? মধু যা ছিল সব আমি যে নিংড়ে দিয়েছি।

-চুপ কর ভাই। চুনারামের চোখে ব্যথার সর পড়ল, কেউ না আসুক–আমি সময় পেলে ঠিক আসব। তুই ভাববি নে। তা এখুন কেমুন আচিস ভাইরে…?

-ভালো নেই, ভালো নেই রে! ডানে-বাঁয়ে নিয়ন্ত্রণহীন ঘাড় দোলায় মুনিরাম, ক্ষয়ে যাওয়া, ঘেয়ো হাতটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটায় ডানা ভাঙা প্রজাপতির মতো ফড়ফড় করে, খুব কষ্ট হয় রে, এবার চলে গেলে বুঝি ভালো হত। শীতলাবুড়ির কবে যে দয়া হবে কে জানে। আমি তো হররোজ দু-বেলা তারে ডাকচি।

–সব ঠিক হয়ে যাবেখন। চুনারাম মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাইল।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুনিরাম ভাবুক হয়ে গেল, আর ভালো হবে না রে, যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। এবার পুটলি বাঁধার সময় হয়েছে। আর তা ছাড়া, আমিও আর বাঁচতে চাইনে। এ জীবনটার ওপর ঘেন্না ধরে গেছে, হাঁপসে গেছি আমি, আর ভাল লাগে না ভাই, আর ভাল লাগে না। মুনিরাম থামল, চোখ রগড়ে নিয়ে নির্লিপ্ত তাকাল, লুলাটাকে নিয়ে আর পারিনে। বউটারে সে ভেষণ জ্বালাচ্ছে। ভিকনাথের বউটার সাথে সে নাকি ঢলাচ্ছে। ছিঃ, ছি, আমি কুন দিকে যাই বলদিনি। এই বয়সে এসব কি মানায় রে। শরীলটা এট্টু জুঁৎ হলে আমি ভাবছি বউটার সাথে টুকে দেখা করব। ওরে বুঝিয়ে বলব। দেখি কুনো কাজ হয় নাকি?

-প্রেমবোগ কুঠরোগের চেয়েও খতরনাক। খবরদার তুই ওই রাড়ুয়া ম্যায়াঝিটার কাছে যাবি নে। আমি শুনেচি–সে বড়ো মুখরা। তুর মান-সম্মান রাখবে নি। চুনারাম বোঝাবার মতো করে বলল কথাগুলো। মুনিরাম মন দিয়ে শুনে শুধুমাত্র ফুঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তারপর কেমন হাওয়া বেরনো বেলুনের মতো চুপসে গেল।

.

কালীগঞ্জ থেকে ইস্কুল সেরে সাইকেল নিয়ে ফিরছিল সূর্যাক্ষ, রঘুনাথ তাকে পাকুড়তলায় ধরে ফেলল। সূর্যাক্ষ সাইকেল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল, গালে টোল ফেলে হাসল সে, কোথায় থাকিস রে রঘু, তোর যে আর টিকির নাগাল পাওয়া যায় না। ভুলে গিয়েচিস-আজ ফুটবল ম্যাচ আছে। যাবি না?

রঘুনাথ উৎসাহিত হল, যাব না মানে? সেই কখুন থিকে আমি ঘুর ঘুর করচি তুর জন্যি। যাক, দেখা হয়ে ভালো হল। রঘুনাথ এগিয়ে গিয়ে সূর্যাক্ষের সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে হাত রাখল, দে, সাইকেলটা আমাকে দে। মাঠ অব্দি আমি চালিয়ে নিয়ে যাবো। তুই পেছনে বসবি।

তুই পারবি? সূর্যাক্ষের চোখে সন্দেহ, পড়ে গেলে আর রক্ষে থাকবে না। সে দিন একটা চালকারবারী সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে বাঁধের নিচে গড়িয়ে গিয়েছিল। ওর অন্ডকোষে লেগেছে। হাসপাতালে ভর্তি আছে। শুনেছি অবস্থা নাকি ভালো নয়।

অত ভয় পেলে চলবে? রঘুনাথ সাহসী হয়ে উঠল, যা হবার হবে। সবাইকে একদিন তো পটল তুলতে হবেই। দে সাইকেলটা দে।

একরকম জোর করে সূর্যাক্ষের সাইকেলটা কেড়ে নিল রঘুনাথ, তারপর কিছুটা দৌড়ে ধপাস করে সে সাইকেলের সিটে চড়ে বসল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকল, এই সূর্য, বসে পড়, দেখ, বেলা কুথায় চলে গিয়েছে। খপখপ কর। আজ তুই দেরিতে এসে সব কিছু এলেবেলে করে দিলি।

সূর্যাক্ষ বই আঁকড়ে ধপাস করে ক্যারিয়ারে বসে পড়ল, তারপর পাছায় জোরসে চিমটি কেটে বলল, মেয়েদের মতো চালাস নে, জোরে-জোরে চালা। এমন শামুকের মতো চললে কখন পৌঁছাবি?

বাঁই-বাঁই করে সাইকেল ছুটল বাঁধের ধুলো উড়িয়ে, সারা শরীরে স্ফুর্তি এসে গেল রঘুনাথের, সে শিস দিয়ে গান ধরল দুরের দিকে তাকিয়ে। এ সময় বাঁধের ধার অপরূপ সাজে সেজে ওঠে। এই আলোটাকে লোকে বলে কনে দেখা আলো। কিছুটা আসার পর সূর্য গাঙধারের ঝাউগাছগুলো দিকে তাকাল, দেখ গাছগুলোকে কেমন বড়ো দেখাচ্ছে। রোজ দেখি আর মনে হয় ওরা কত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছে।

রঘুনাথ সাইকেলের হ্যাণ্ডেল জোরসে ধরে প্যাডেলে জোরে চাপ দিয়ে থামল, গাঙধারের বাতাসে গাছপালার বড় বেশি হয়। গাঙের ঘোলাটে জলে পলি থাকে। সেই পলি হাড়গুড়া সারের কাজ করে। আমার দাদু বলে, ঘোলা জলে আয়ু বাড়ে মাছেদের, আর গাছ বাড়ে চড়চড়িয়ে।

সূর্যাক্ষের মধ্যে একটা ভাবুক মন সর্বদা হাডুডু খেলে, কোনোসময় তাকে দুঃখ এসে ছুঁতে পারে না। তার মা তাকে শিখিয়েছে, হাসি হল মানুষের শরীরের একটা মোক্ষম ওষুধ। এই ওষুধে সব রোগজ্বালা ভালো হয়ে যায়, মানুষের কোনো কষ্ট থাকে না।

কথাটা মনে ধরেছে রঘুনাথের, তার খুব ইচ্ছে করে সূর্যাক্ষের বাড়ি গিয়ে ওর মায়ের সাথে গল্প করতে। দুর্গামণির সঙ্গে সূর্যাক্ষের মায়ের বুঝি তুলনাই চলে না। রঘুনাথ তার মায়ের কথা ভেবে মনে মনে কেমন গুটিয়ে যায়, দু’মায়ের ফারাকটা তার দৃষ্টির বাইরে চলে যায়।

সূর্যাক্ষের খোলা হাওয়ার মতো মন, তা না হলে বুনোপাড়ায় আসতে তার বয়ে গেছে। গাঁয়ে মাত্র ক’ঘর বামুনের বাস, তার মধ্যে ওরা বেশ সম্পন্ন। সূর্যাক্ষের মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে, জলঙ্গী নদীর ধারে। বিকেলে সেখানে খোলা বাতাস দৌড়-ঝাঁপ খেলে বেড়ায়, সেই বাতাসের গায়ে থাকে হিমেল সুবাস, জলকণার মিহি আদর। গরমের দিনে জলঙ্গী নদীর বাঁধের উপর দাঁড়ালে শরীর একেবারে জুড়িয়ে শীতল হয়ে যায়, আরামে চোখ বুজে আসতে চায় ঘুমে। কতদিন সূর্যাক্ষের মামার বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি, তার মা বলেছে–আগে ভালো মতো পাশ কর, তারপর তাকে নিয়ে যাবো। বারোদোলের মেলায় ভিড় বেশি। সে সময় গেলে বেশ আনন্দ হয়।

সাইকেল ঢালু পথ বেয়ে নেমে এল মাঠের উপর। সবুজ ঘাসের উপর রোদ পড়ে চিকচিক করছে মাঠখানা। ঠিক গোল-পোস্টের পিছনে একটা বুনো জামগাছ। বুড়োটে পাতা শুকনো তেজপাতার মতো ছড়িয়ে আছে মাঠের ভেতর, পাতাগুলো সাতভায়া পাখির মতো উড়ছে হাওয়ায়। সেদিকে হা-করে তাকিয়ে আছে সূর্যাক্ষ। আর একটু পরে খেলা শুরু হবে, তার প্রস্তুতিতে মাঠ সেজে উঠছে। সূর্যাক্ষ আর রঘুনাথকে দেখে এগিয়ে এল তারক। খুব অবাক হয়ে সে শুধোল, তোদের দু জনের এত আসতে দেরি হল যে।

রঘুনাথ কিছু বলার আগেই সূর্যাক্ষ বলল, কালীগঞ্জ থেকে ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। মোকামপাড়ার কাছে এসে সাইকেলের হাওয়া কমে গেল। ওই অত দূর থেকে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে আবার ফিরে গেলাম বাজারে। বাজার ছাড়া তো সাইকেল সারানোর কোনো দোকান নেই জানিস তো। তবে রঘু ধাওড়াপাড়ার কাছে আগে থেকেই দাঁড়িয়েছিল। হেঁটে এলে রঘু আগে পৌঁছে যেত কিন্তু ও-যে আমাকে ছাড়া আসবে না।

রঘু তোর চামটুলি। গলা ফাড়িয়ে হাসল তারক। তার সেই দরাজ হাসি সংক্রামিত হল রঘুনাথের শরীরে। সেখান থেকে হাসি রাজহাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল সূর্যাক্ষের কণ্ঠ। ওরা তিনজন হা-হা শব্দে হাসতে লাগল।

এক সময় হাসি থামিয়ে সূর্যাক্ষ বলল, আজ রঘু ব্যাকে খেলবে। ওকে আমি সাহস দিয়েছি। ওর কোনো অসুবিধা নেই।

ব্যাকে খেলার জন্য রঘুর গায়ের জোরটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সূর্যাক্ষ। ওর গাট্টাগোট্টা চেহারায় যে শক্তি লুকিয়ে আছে তা একটা চামড়ার বলকে শাসন করার পক্ষে মাত্রারিক্ত। রঘুনাথ খেলার খ’ না জানলেও এই লুকিয়ে থাকা শক্তি ওকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। বল খেলার প্রস্তাব সূর্যাক্ষ প্রথম দিতেই রঘুনাথ আকাশ থেকে পড়েছিল, ওসব বল পেটাপেটি খেলা আমার দ্বারা হবে নি।

-কেন হবে না, আলবাত হবে, চল। রঘুনাথের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সূর্যাক্ষ পাকুড়তলায়। তারপর বুঝিয়ে বলেছিল, বল খেলা খুব সহজ রে, একটু বুদ্ধি ঘিলুতে থাকলে যে কেউ খেলতে পারে।

রঘুর তবু আড়ষ্টতা কাটে না, ছোটবেলায় বাতাবীলেবু নিয়ে বহু খেলেচি। সে খেলা ছিল মজার খেলা। মাঠে নেমে খেলতে যাওয়ার মানে দশ লোক হা-করে দেখবে। খেলা ভালো হলে হাততালি দেবে, খেলা খারাপ হলে গালমন্দ। আমার এমনি-তে মাথা গরম, কার সাথে ঝুট-ঝামেলা হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমি মাঠের বাইরে থাকবখন, সেটা আমার জন্যি ভালো হবে।

তোর ভালো-মন্দ তোর বুঝে কাজ নেই। যা বোঝার আমরা বুঝব। বুঝলি? সূর্যাক্ষের দাবি রঘুনাথ ঠেলতে পারে নি। বামুনবাড়ির এই ছেলেটাকে তার মন্দ লাগে না, ওর মধ্যে কোনো উপরচালাকি নেই, পুরনো কুয়োর জলের চাইতে ঠাণ্ডা এবং উপাদেয়। এমন মনের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় অনায়াসে। এরপর সূর্যাক্ষ রঘুনাথের বন্ধু হয়ে গেল। ইস্কুল যাওয়া আসার পথে রোজ ওদের দেখা হয়, রঘুনাথ বেলা দশটা বাজলে সূর্যাক্ষর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে কদবেল তলায়। দুর্গামণি তার এই পাগলামী দেখে সতর্ক করে বলছিল, বুঝে-শুনে মিশবি বাপ। বাবুঘরের ছেলে মেয়েরা বড্ড চালাক হয়। ওরা সুযোগ পেলে তুর সব নিয়ে, তাপ্পর ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তাই বলচি বাপ, হিসেব করে পা ফেলিস। গড়বড় হলে নড়বড়ে হয়ে যাবে তুর জেবন, তখন কেঁদেকেটে কুনো পথ পাবি না। মায়ের কথা সবসময় যে সত্যি হয় তা নয়। সূর্যাক্ষের মন তার চেয়েও ভালো। প্রায় সে চরানীমাঠে দেখা করে রঘুনাথের সঙ্গে। তার গলায় অবুঝ আব্দার, চল তোকে আজ বাড়ি নিয়ে যাবো। আমার মা বলেছে তোকে ঘরে নিয়ে যেতে।

-ধ্যাৎ, তুর ঘরে গিয়ে কী হবে?

-কেন থাকবি খাবি গল্প কবি। সূর্যাক্ষর কণ্ঠস্বরে বন্ধুত্ব উছলে ওঠে, আমার মা যে কত ভালো তা তুই নিজের চোখে দেখতে পাবি। ওখানে একবার গেলে তোর আর আসতেই মন করবে না।

–যাব, সময় করে ঠিক যাবো।

–না, আজই চল। আজ মা পায়েস রেঁধেছে। তুই খাবি। সূর্যাক্ষ জেদ করল।

-ধুর, পায়েস আমরা হররোজ খাই। রঘুনাথ অবাক হল না মোটে, জাউভাতে গরম দুধ ঢেলে দিলে পায়েসভাত হয়ে যায়। আমার মা বলে পায়েস ভাত খেলে গতরে শক্তি আসে। তখন ভালো মুনিষ খাটা যায়। বাবুরা খুশি হয়ে দু-পাঁচ টাকা বকশিস দেয়। রঘুনাথ নিজের বিশ্বাসে অনড় থাকে। তাকে বোঝাবার ক্ষমতা সূর্যাক্ষের নেই, সে শুধু অবাক হওয়া চোখে তাকায় আর বোকার মতো হাসে। মানুষ এখনও কোথায় পড়ে আছে ভাবলে অবাক হয় সূর্যাক্ষে। তার বাবা কপোতাক্ষ বলেন, মানুষকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলতে হবে। সবার চোখে শিক্ষার আলো দিতে হবে। স্বাধীনতার চব্বিশ বছর পরেও মানুষ অন্ধকারে ডুবে আছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা ওদের গ্রাস করছে। ওদের সচেতন করার দায়িত্ব তোমাদের নিতে হবে সূর্য। শুধু পাঠ্যপুস্তক পড়ে তোমাদের এ শিক্ষা পূর্ণ হবে না। চোখ-কান খোলা রেখে মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে তোমাদের। ধনী দরিদ্র ছোট বড়ো সবাইকে কাছে টেনে নিতে হবে। তবেই আমাদের এই মহান দেশ প্রগতির পথে অগ্রসর হবে।

মাঠের মধ্যে রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে সূর্যাক্ষ চঞ্চল হয়ে উঠল; এই রঘু, যা করার তাড়াতাড়ি কর। দেখ, মোকামপাড়ার দল আগে-ভাগে মাঠে নেমে গিয়েছে। ওরা গা-ঘামাচ্ছে। তুই ঝটপট ড্রেস করে নে। আজ ওদের ছাড়ব না, গো হারা হারাবো। তারক রঘুনাথের বরাদ্দ সাদা কালো জার্সিটা এগিয়ে দিল, জামগাছের আড়ালে গিয়ে এটা পরে আয়। আর হ্যাঁ, প্যান্টের নীচে তোর জাঙ্গিয়া আছে তো?

রঘু ঘাড় নাড়ল, জাঙ্গিয়া কি সে জানে না, ঘোর কাটিয়ে সে তাকাল, প্যান্টের নীচে ল্যাঙ্গোট পরে এয়েচি।

–তুই এই বয়স ল্যাঙ্গোট পরিস? সূর্যাক্ষ হাসি আটকাতে পারছিল না, ল্যাঙ্গোট তো রামনগর সুগারমিলের বিহারী দারোয়ানগুলো পরে। ওরা ল্যাঙ্গোট পরে রোজ সকালে মালাম লড়ে। আমি বাবার সাথে গিয়ে দেখেছি।

তারক তার কথাকে সমর্থন করল, হ্যাঁ, সূর্যর কথাটা ঠিক। আমিও ল্যাঙ্গোট পরা কুস্তিবীর দেখেছি। জানিস ওরা গায়ে কত্তো তেল মাখে!

রঘুনাথের এসব কিছু দেখা হয়নি, সে ধাওড়াপাড়া ছেড়ে পলাশী সুগারমিলের দিকে কোনোদিনও যেতে পারেনি। গুয়ারাম তাকে যেতে দেয় না, বেশি জেদ ধরলে বলে, হারিয়ে যাবি বাপরে। গাঙের ধারে ছেলেধরা ঘোরে। লালগুলার ওদিক পানে টেরেন যাওয়ার লোহার পুল হচ্ছে, সেখানে নরবলি না দিলে পুল খাড়া হবে নি। তাই ছেলেধরা বড়ো বোরা নিয়ে ঘুরচে ছেলে ধরতে। ওদের হাতে লাল গুলাপফুল থাকে। সেই গুলাপফুল মন্ত্ৰপুড়া। একবার নাকে শুঁকিই দিলে একেবারে রামছেলির মতুন হয়ে যাবি। অমনি খপ করে বোরায় ঢুকিয়ে নিবে তুরে, মা বলে চেঁচাতেও সময় পাবিনে। গুয়ারামের কথায় ভয়ে গায়ের নোম চেগে উঠত রঘুনাথের, মাকে জড়িয়ে ধরে শুলেও ভয় কাটত না, চোখ বুজলেই সেই জাদুকর আলখাল্লা পরা ছেলেধরাকে দেখতে পেত সে, ভয়ে হিম হয়ে যেত শরীর, কথা আটকে গিয়ে ঘড়ঘড় করত গলা।

বুনো জামগাছের আড়ালে হাফ-প্যান্টুলুন ছেড়ে কালো প্যান্ট আর রঙচঙে জার্সি পরে নেয় রঘুনাথ। পোশাকটা পরার সাথে সাথে তার মনে হয় সে যেন জাতে উঠে গেল। এই পোশাক পরা অবস্থায় তার মা যদি একবার দেখতে পেত তাকে তাহলে পুত্রগর্বে বুক ভরে যেত মায়ের। মনে মনে সে ভাবল খেলা শেষ হয়ে গেলে এই পোশাকটা সে চেয়ে নেবে। গোল-পোস্টের সামনে চুন দিয়ে দাগ কেটে রেখেছে ক্লাবের ছেলেরা অনেক আগেই। শুধু গোল-পোস্টের সামনে নয়, খেলার মাঠের চারধারে চুনের দাগ লম্বা হাড়ের মতো শুয়ে আছে। গাঁ-ভেঙে লোক এসেছে খেলা দেখতে। আজকের খেলাটায় যে জিতবে সেই দলকে একটা কাপ আর সের পাঁচেক ওজনের খাসি উপহার দেওয়া হবে। যারা হারবে তারা খাসি পাবে না, শুধু পাবে ছোট একটা রানার্স কাপ। সূর্যাক্ষ এসব কথা পাখি পড়ানোর মত করে শিখিয়েছে রঘুনাথকে, ভালো করে খেলবি, আজ জিতলে রোববারে ফিস্ট হবে ক্লাব ঘরে। সেদিন খাসি কাটা হবে। তোরও নেমতন্ন থাকবে।

খাওয়ার কথায় গায়ের জোর ফিরে পায় রঘুনাথ। সে খেলার কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝে নিয়েছে–বল কোনোমতে গোলের দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। যে আসবে বল নিয়ে তাকে ক্ষামি করে ফেলে দিতে হবে ফলে তার আর সাহস হবে না পুনরায় বল নিয়ে তার সামনে দাঁড়াবার। গায়ের জোরে সে যে এদের হারিয়ে দেবে-এ ব্যাপারে সে একশ ভাগ নিশ্চিত। সূর্যাক্ষ কেন ক্লাবের অনেক ছেলেই তার পায়ের শট পরীক্ষা করে দেখেছে। রঘুনাথের এক শটে বল চলে গিয়েছে বাঁধের ওপিঠে, যা অবিশ্বাস্য এবং চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়। যার শটে এত জোর সে কি মামুলি খেলোয়াড় নাকি। রঘুনাথের কদর বেড়ে গিয়েছে সেই থেকে।

উৎসাহীদের ভিড় বাড়তেই খেলা শুরু হয়ে গেল রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথে। সূর্যাক্ষ সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলছে, ওর ডান পায়ের কাজ নিখুঁত, লক্ষ্যভেদ করতে পারে প্রতিকূল পরিবেশেও।

ব্যাক পজিশনে দাঁড়িয়ে সূর্যাক্ষের খেলা দেখছিল রঘুনাথ, হঠাৎ ওর পা গলে বল এসে পড়ল পেনাল্টি লাইনের কাছাকাছি, তাই দেখে শরীর নিয়ে কটাশের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘুনাথ, গায়ের জোরে সে লাথ কষাল বলের মাঝখানে, ঘাস ছিলে গেল সেই শটের জোরে, বল গিয়ে পড়ল অন্য প্রান্তের গোলরক্ষকের হাতে। হাততালিতে ফেটে পড়ল দর্শকমহল। ওদের আনন্দ ভাসিয়ে নিয়ে গেল রঘুনাথকে।

খেলা শেষ হল দুই শূন্য গোলে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই সূর্যাক্ষ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল রঘুনাথকে, কী দারুণ খেললি রে তুই! আজ তোর উপর অসুর ভর করে ছিল।

.

০৪.

তারকের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি, রঘুনাথ সবাইকে দেখিয়ে দিল ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়। উরিব্বাস; ও যে ভাবে খেলল–তা কেবল স্বপ্নেই ভাবা যায়! রঘুর পিঠ চাপড়ে দিল তারক, আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি মদনদা রঘুকে দেখা করতে বলেছে। ও আজকের খেলার সেরা প্লেয়ার পুরস্কার পাবে। আঃ, যা লাগছে না আমার! তারক আর একবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। ওর যে ব্যস্ততার শেষ নেই। পুরস্কার বিতরণী সভা শেষ হতেই সাঁঝ নেমে এল বাঁধের ধারে। ধাওড়াপাড়ায় একা একা ফিরে যেতে হবে রঘুনাথকে, আজকে আর সূর্যাক্ষদের বাড়ি যাওয়া হবে না কোনো মতে। রাত করে ঘর ফিরলে দুর্গামণি ঘর-বার করবে, চুনারাম লাঠি হাতে অন্ধকারে বাঁধের উপর উঠে এসে ছানিপড়া চোখে দুরের গাঁখানার দিকে তাকাবে।

খাড়া পথ বেয়ে বাঁধের উপর রঘুনাথ উঠে এল। বেশ ফুরফুরে লাগছে মনটা। বিরাট কোনো কিছু করে ফেলেছে এমন একটা অনুভব তার স্নায়ুতন্ত্রকে টান টান করে মেলে ধরতে চাইছে। ভালো লাগার অনুভূতিগুলো খ্যাপলা জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের রক্তজলে। এ সময় গাঙধারের ঝাউবনগুলোর দিকে তাকানো যায় না, মনে হয় ওরা গাছ নয়, এক একটা ঝাঁকড়া মাথার আগোলদার। ওদের হাতে লাঠি, কোমরে ফেট্টি দেওয়া ধুতি। পায়ের দশ আঙুল শেকড়ের মতো ছড়িয়ে আছে মাটির ভেতর।

রঘুনাথ ভাবছিল সূর্যাক্ষর সঙ্গে যাওয়ার সময় দেখা হলে ভালো হোত। ও যে কোথায় চলে গেল ওকে আর দেখতে পায় নি সে। মনটা খারাপ লাগছিল রঘুনাথের। আর ঠিক তখনই ফিকে আঁধারে সূর্যাক্ষ দৌড়াতে দৌড়াতে তার সামনে এসে হাজির হল, কী ব্যাপার তুই যে চলে যাচ্ছিস?

রঘুনাথ শান্ত চোখে তাকাল, ঘর তো যেতেই হবে। ঘর না গেলে মা খুব ভাববে। তাছাড়া বাবা ঘরে নেই। দাদু রাতে ভালো চোখে দেখে না। আমাকে যেতে হবে।

-যাবি মানে? আজ মা তোর জন্য রাঁধবে! আজ তুই আমাদের ঘরে যাবি। মাকে সেইমতো বলে এসেছি। সূর্যাক্ষ অবুঝ হয়ে উঠল।

রঘুনাথ মিনমিনে গলায় বলল, বললাম তো ঘরে যেতে হবে, ঘরে না গেলে মা চিন্তে করবে।

–ঠিক আছে, আমিও তোর সাথে যাবো।

–মিচিমিচি কেনে যাবি? রঘু বোঝাতে চাইল, পরে একদিন তোদের ঘরে যাব। আজ বাদ দে।

-তুই দাঁড়া, আমি আসছি। সূর্যাক্ষ রকেটগতিতে মাঠে নেমে গিয়ে সাইকেলটা বেল বাজাতে বাজাতে মাঠে নিয়ে এল, ওঠ।

–আমাকে চালাতে দিবি নে বুঝি? রঘুনাথ প্রশ্ন করল।

সূর্যাক্ষ আদেশের ভঙ্গিতে বলল, তোর এখন আরামের দরকার। চুপচাপ সাইকেলের পিছনে গিয়ে বসে পড়। তুই কি করে ভাবলি আমি তোকে একলা ছেড়ে দেব অন্ধকারে। যদি তোর কিছু হয়ে যায়?

–আমার কিছু হবে নাই। আঁধারে আমার চোখ জ্বলে। রঘু দাঁত বের করে হাসল। কিছুটা আসার পর মাঠ-পালানো হাওয়া আছড়ে পড়ল তার গায়ের উপর, সেই হাওয়া সারা গায়ে বুলিয়ে দিল শীতলতার চাদর। ধবধবে খড়ি ফোঁটা চালকুমড়োর মতো চাঁদ ফুটেছে আকাশে, ধীরে ধীরে অপসারিত হচ্ছে সাঁঝবেলার অন্ধকার, পোকামাকড়ের আজব ডাকে চেনা পৃথিবীটা জেগে উঠছে চোখের সামনে। আঁশশ্যাওড়া ঝোপের ভেতর থেকে একটা শেয়াল মোটা লেজ ফুলিয়ে মাঠের দিকে চলে গেল। রঘুনাথ বুঝতে পারল শেয়ালটা আখখেতের আল ধরে সোজা চলে যাবে বুড়ি গাঙের ধারে, ওখানের কাঁকড়ার গর্তে লেজ ঢুকিয়ে কাঁকড়া ধরে খাবে। মরা-কাঁকড়ার খোলা পায়ে লাগলে কেটে যায়, রক্তপাত ঘটতে পারে, তাই খালি পায়ে বুড়িগাঙের ধারে গেলেও রঘুনাথ খুব সতর্ক হয়ে চলা ফেরা করে।

পাকুড়তলায় এ সময় বুড়োথুড়োদের জটলা হয়, বিড়ির ধোঁয়ায় তৈরি হয় কৃত্রিম মেঘ, তার অনেকক্ষণ পরে রঘুনাথের ভেতরটা বিড়ি ফুঁকবার জন্য পুলিয়ে ওঠে। খুব ছোটবেলা থেকে সে নেশা-ভাং করছে, চুনারাম খুশি হয়ে তার মুখে মদ ঢেলে দিত, পাঁচুই ঢকঢক করে খাইয়ে দিয়ে বলত, খা দাদু, খা। হাড় শক্ত হবে।

বিড়ি খাওয়াটা এখন আর রঘুনাথের কাছে কোনো সমস্যা নয়। সে খুড়া, দাদু, এমন কি বাপের সামনেও বিড়ি টানে। দুর্গামণিরও বিড়ির নেশা জব্বর, আগে সে চাষ-কাজে যেত মাঠে তখন গোটা দশেক লাল সুতোর বিড়ি না হলে কাজে তার মন বসত না। গুয়ারাম সতর্ক করত, অত খাসনে রে বউ, ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। নেশা রঘুনাথের জীবনে বুড়িগাঙের জলের মতো ছুঁয়ে আছে, এর থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই, নেশা যেন পাখি ধরার ফাঁস হয়ে চেপে বসেছে গলার উপর।

পাকুড়তলায় আর দাঁড়াল না সূর্যাক্ষ, তার তাড়া আছে, রঘুনাথকে সঙ্গে নিয়ে তাকে আবার গাঁয়ে ফিরতে হবে, না হলে চিন্তায় ভেঙে পড়বে মীনাক্ষী। কপোতাক্ষ সাধারণত ঘরে খুব কম থাকে, বাঁধে-বাঁধে সাইকেল নিয়ে তিনি চলে যান কদবেলতলা ধাওড়া, হলদেপোতা, কমলবাটি আর বসন্তপুর ধাওড়া। মানুষগুলোর প্রতি যত দিন যাচ্ছে তার দায়িত্ব বাড়ছে। সূর্যাক্ষকে তিনি বলেছেন, তৈরি থাকো। শ্ৰেণী-সংগ্রাম আবশ্যক। আমাদের লড়াই করে সুখ-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে হবে। ব্রিটিশ পরবর্তী সামন্তপ্রভুরা আমাদের হাতে ভালোবেসে ক্ষীরের সন্দেশ তুলে দেবে না।

কপোতাক্ষর কথাগুলো বড়ো অস্পষ্ট আর ধোঁয়াশা লাগে সূর্যাক্ষর। সংগ্রাম কথাটার অর্থ সে সঠিক জানে না। কদবেলতলা ধাওড়ার বিদুর রাজোয়ার গলার রগ ফুলিয়ে বলে, এ অত্যাচার বঞ্চনা বেশি দিন চলতে পারে না। আগে আমরা এক গালে চড় খেয়ে অন্য গাল বাড়িয়ে দিয়েছি। এখন যুগ পাল্টাচ্ছে। চড়ের বদলে লাথি মারতে হবে ওদের। আমি লেনিন পড়িনি, মার্ক পড়িনি। ওরা কে আমি জানি নে। জানার দরকারও নেই। আমি শুধু জানি-লাঙ্গল যার, জমি তার। যে ভাগের জমি কেড়ে নিতে আসবে তার কাটামুণ্ডু জমির আলে শুইয়ে দেব আমরা।

বুনোপাড়ার ঘরগুলোয় টিমটিম করে বাতি জ্বলে। বেশির ভাগই লম্ফো, ডিবিরি, সলতে পাকানো তেলের প্রদীপ। একমাত্র লুলারামের ঘর ছাড়া আর কারোর ঘরে হ্যারিকেন নেই। ফলে একটু বেশি হাওয়া বইলে বাতি নিভে যায়, ঘুরঘুটি অন্ধকার হামলা চালায় বিনা বাধায়। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে। এখনও কারোর কেরোসিন তেল কেনার সামর্থ হল না। দারিদ্রসীমার অনেক নীচে বাস করে ওরা। মাঝে মাঝে রঘুনাথের এসব দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে না, তার মাথায় বিষপোকা কামড়ে দেয়, বড়ো বড়ো শ্বাস ছেড়ে সে দুর্গামণির মুখের দিকে তাকায়, কথা আটকে যায় তার মুখগহ্বরে।

সাইকেলটা উঠোনে ঢুকিয়ে বড়ো করে শ্বাস ছাড়ল সূর্যাক্ষ। তার কানে ভেসে এল ঢিলির এলোমেলো গানের স্বরলিপি। গরমটা আজ একটু কম তবু ঢিলির গানের কোনো বিরাম নেই।

এসব এড়িয়ে রঘুনাথ মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, হাঁ দেখ মা, কী এনেচি তুর জন্যি।

–হায় বাপ, কুথায় পেলিরে এমুন বাবু জিনিস? বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল দুর্গামণির।

রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে গর্বিত হাসি, বল খেলতে গিয়েচিলাম, বাবুরা দেলে গো! রঘুনাথ হঠাৎ করে সূর্যাক্ষর দিকে তাকাল, ওকে বসতে না বলার জন্য মনে মনে অনুতপ্ত হল সে। এক সময় নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, মারে, আজ আমি ঘরে খাবনি। সূর্য আমারে লিতে এয়েছে। আমি ওর ঘরে গিয়ে খাবো।

–সে তো মানলাম কিন্তু অত রাতে আসবি কী করে? দুর্গামণির কপালে চিন্তার রেখাগুলো নেচে উঠল।

সূর্যাক্ষ এদের আলোচনায় অংশ নিল, কাকিমা, রঘু আজ ফিরবে না। খেয়ে-দেয়ে রঘু আর আমি এক সাথে ঘুমিয়ে যাবো।

-রঘু যে যাবে তুমার মা জানে?

-হ্যাঁ, মা-ই তো বলেছে রঘুকে নিয়ে যেতে। সূর্যাক্ষ বোঝাল, রঘু না গেলে মা মন খারাপ করে বসে থাকবে।

একটা অস্বস্তি দুর্গামণির গলায় ঘোঁট পাকাচ্ছিল, তার থেকে মুক্তি পেতে সে নির্দ্বিধায় বলল, তুমি খাটে শুয়ে, আমার ঘরের রঘুরে নীচে বিছানা করে দিবে।

-তা কেন হবে? আমরা তো এক সাথে ঘুমোবো। ঘুমাতে ঘুমাতে কত গল্প হবে। সূর্যাক্ষ যেন সব দেখতে পেল।

-কী জানি বাবা, আমার ডর লাগে। দুর্গামণি পানসে হাসি দিয়ে নিজের ভয়টাকে লুকাতে চাইল। যুগ বদলেছে কিন্তু তার কোনো আলো ওদের পাড়ার উপর পড়ে নি। এখনও গাঁওবুড়ো রাজ করে চলেছে। চাপা কলটা খারাপ হয়ে গেলে সারাবার লোক আসে না বিডিও অফিস থেকে। অনেকেই গায়ে ছোঁয়া লাগলে ঘেন্নায় নাক কুঁচকায়, দিলি তো ছুঁয়ে, এখন আমাকে ফিরে নাইতে হবে।

এখনও পাল-খেদানোর মুড়ি দেয় গেরস্থ। এমনভাবে দেয় যাতে ছোঁয়া না লাগে শরীরে। দুর্গামণি সব বুঝলেও মুখে তার কোনো ভাষা নেই, শুধু চোখের জল আগুনের অক্ষর হয়ে ঝরে পড়ে!

আঁচলে চোখের জল মুছে নিয়ে দুর্গামণি উদাস হয়ে গেল, তুর দাদুরে বলে যাবিনে? ঘরে এসে বুড়ামানুষটা কি ভাববে বল তো? শেষবেলায় আমাকে গাল মন্দ করবে।

দাদু কুথায়? রঘুনাথের প্রশ্নে দুর্গামণি আঁধার পথের দিকে তাকাল, সে গিয়েছে দুলাল ঠাকুরপোর ঘরে। তার সাঁঝবেলায় আসার কথা। তুর বাপের খপর না পেলে বুড়াটা মনে হয় পাগল হয়ে যাবে।

–পাগল হওয়ার কি আছে, মা? রঘুনাথের অবাক চোখে প্রশ্ন বিছিয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কষ্ট করে হাসল দুর্গামণি, ও তুই বুঝবিনে বাপ, বড় হ, তারপর বুঝবি। এট্টা ধানে যে এট্টা চাল হয়–এ হিসাবের মতো জেবনটা অত সহজ নয়। বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চুনারাম, আঁধারে সে সাহস করে বেরিয়ে ফেঁসে গেছে। রাতকানা মানুষের এই এক সমস্যা।

চুনারামকে দেখে রঘুনাথ জলের মাছের মতো স্মৃতিতে টগবগে হয়ে উঠল, দাদু, আজ আমি নতুন-গাঁয়ে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে সূর্য আচে।

কে সূর্য? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল চুনারাম।

বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে রঘুনাথ মিষ্টি করে হাসল, নতুন গাঁয়ে ঘর। তুমি ওকে দিনের বেলায় দেখেচো। ওর বাপের নাম কপোতাক্ষ। পার্টি করে। কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘোরে গো!

.

০৫.

অন্ধকারের হাজার রূপ। আঁধার রাতে রঘুনাথের বুঝি চোখ জ্বলে, সে সাঁই সাঁই করে সাইকেল হাঁকায়, এঁড়ে গোরুর মতো হাঁপিয়ে ওঠে তবু ক্লান্তির কথা সে মুখ ফুটিয়ে সূর্যাক্ষর কাছে বলে না। সাইকেল চালানো এখন তার কাছে নেশার চাইতেও বেশি কিছু। সূর্যাক্ষ তার এই অতিরিক্ত আগ্রহকে ভয় পায়, বলা যায় না কখন কি হয়, তখন বিপদে পড়ে যাবে ওর পরিবার।

গাঁয়ে ঢোকার আগেই আলোর ফুটকিগুলো নাচতে লাগল চোখের তারায়। একটা পেঁচা গোমড়া মুখ নিয়ে উড়ে গেল পিটুলিগাছের মাথা থেকে। ঢালু বলে সাইকেল থেকে নেমে পড়েছে সূর্যাক্ষ আর রঘুনাথ। ধুলো পথে ওরা পাশাপাশি হাঁটছে। দুপাশে বাঁশবন আর ছোট ছোট ঝোপঝাড়। ঝিঁঝি পোকার ডাকের ভেতর থেকে আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে অসংখ্য জোনাকি পোকা। আলোগুলো জ্বলছে, নিভছে বেশ ছন্দোবদ্ধ, চোখে রাতের আবেশ বুলিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। ধুলোভরা পথের শরীর এখন নরম হয়ে আছে, এদিককার ধুলোর রূপ ভারী সুন্দর, বড়ো ঘরের ফর্সা টুকটুকে মেয়ের মতো তার ঘি-বর্ণ গায়ের রঙ, মোলায়েম, নরম একেবারে ধূলিচন্দনের চেয়েও সুন্দর। এই ধুলো পথ দু একবার বৃষ্টি হলেই মাখা ময়দার মতো চ্যাটচ্যাটে হয়ে যাবে, তখন কাদায় ভরে যাবে সারা পথ, হাঁটা চলায় মানুষের রাজ্যের অসুবিধা।

আজ আকাশে ফ্যাকাসে একটা চাঁদ উঠেছে, হাওয়া বইছে মৃদুমন্দ। আশেপাশের ঝোপ থেকে ভেসে আসছে রাতফুলের ঘ্রাণ। বেশ উগ্র সেই সুগন্ধ। সূর্যাক্ষ হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল, দাঁড়া তো। আঃ, কী সুঘ্রাণ রে! মনে হচ্ছে কাঁঠালীচাঁপা ফুল ফুটেছে। গন্ধটা চিনতে পারছিল না রঘুনাথ, সূর্যাক্ষ নির্দিষ্ট করে বলাতে সে মনে মনে মিলিয়ে নিল গন্ধটা, দুইয়ে-দুইয়ে চার হয়ে যেতেই তার পুরু ঠোঁটেও খুশি গড়িয়ে পড়ল, ঠিক বলেছিস সূর্য, এ ঘ্রাণ কাঁঠালীচাঁপা ফুলের ছাড়া অন্য কোনো ফুলের হতে পারে না। দিনের বেলায় হলে এক ছুটে গিয়ে তোকে ফুল পেড়ে দিতাম।

সূর্যাক্ষর কমনীয় কণ্ঠস্বর, জানিস রঘু, মা কাঁঠালীচাঁপা ফুল ভীষণ পছন্দ করে। আমাকে প্রায় বলে ফুল এনে দিতে। কিন্তু রাস্তার ধারে গাছ, কখন ফোটে, কে তুলে নিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না।

–আমাদের পাড়ায় একটা মস্ত কাঁঠালীচাঁপা গাছ আছে। ওর পাতাগুলান এই খরার দিনেও তেলতেলে। রোদ পড়লে দেবদারু পাতার মতো চকচক করে। জানিস, আগে আমার মায়ের মুখ ওই কাঁঠালীচাঁপা পাতার চেয়েও চকচকে ছিল। এখন খাটতে গিয়ে খসখসে ডুমুরপাতা। মাকে দেখলে আমার ভেতরটা কষ্টে মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার আর তখুন বেঁচে থাকতে সাধ যায় না। রঘুনাথের গলার স্বর আর্দ্র হয়ে উঠল, তুই দাঁড়া, আমি দেখচি কাঁঠালীচাঁপা ফুল পাওয়া যায় কিনা। আমি ঘেরাণ শুঁকে ফুলের কাছে পৌঁছে যেতে পারি।

-না। খবরদার যাবি নে। সূর্যাক্ষ চেঁচিয়ে উঠল ভয়ে, ওখানে সাপ আছে। কাঁঠালীচাঁপা ফুলের গন্ধে বিষধর সাপ আসে। দিনেরবেলায় এ গ্রামের বহু মানুষ তা দেখেছে।

-সাপ আমার কি করবে রে, সাপকে আমি থোড়াই ডরাই! আমি বুনো ঘরের ছেলে, সাপ-পোকামাকড় আমার কুনো ক্ষতি করতে পারবে না। রঘুনাথ কথা না শুনে রাস্তা থেকে নেমে ঝোপের দিকে চলে গেল। কাঁঠালীচাঁপা গাছটা অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে সাঁওতাল যুবতীর মতো শুয়েছিল আকাশের তলায়। রঘুনাথ হাতড়ে হাতড়ে আন্দাজে ঠিক পৌঁছে গিয়ে ছুঁয়ে দিল গাছের সরু ডাল। মনে মনে ভাবল চাঁদ যদি আর একটু জ্যোৎস্না দিত তাহলে কত ভালো হত। তবু সে দমল না। হাত বাড়িয়ে একসময় খুঁজে নিল ফুলটা। পৃথিবী জয় করে আসার আনন্দ তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল। কাঁঠালীচাঁপা ফুলটা সূর্যাক্ষর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, যাক মনে বড়ো শান্তি হচ্ছে। যদি ফুলটা পাড়তে না পারতাম তাহলে মনে মনে এট্টা দুঃখ হোত।

সূর্যাক্ষ চুপ করে থাকল। আর ক’পা এগোলেই বুড়ো নিমগাছটাকে দেখতে পাবে সে। এখানে মাচা বেঁধে বয়স্করা তাস পেটায়। হাজার কথার ফোয়ারা ছোটে সন্ধের পর থেকে। দীনবন্ধু নতুন রেডিও কিনেছে কালীগঞ্জ বাজার থেকে। সেই রেডিওটাকে গোল করে ঘিরে থাকে প্রায় জনা দশেক মানুষ। ওরা খবর শোনে, গান শোনে। যাত্রা বা নাটক হলে এই ভিড়টা আরও বেড়ে যায়, তাদের হল্লা থামাতে দীনবন্ধু মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে, এই তোরা থামবি, যদি না থামিস তাহলে রেডিও আমি ঘরে দিয়ে আসব। ঘরে মেয়েরা শুনবে, তখন বুঝবি মজা।

রেডিও চলে যাওয়া মানে আসরের প্রাণ চলে যাওয়া ফলে হৈ-হট্টগোল থেমে যায় চোখের পলকে। মানুষের আগ্রহ-কোলাহল ফুটরসের গুড়ের মতো জুড়াতে থাকে। রাত বাড়লে এই আসর ভেঙে যায়, তখন যে যার মতো ঘরে ফিরে যায় বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে। গ্রামসমাজে বিড়ির প্রভাব অনস্বীকার্য। দীনবন্ধু রসিকতা করে বলে, কেঁদুপাতা আমাদের কাঁদিয়ে ছাড়বে গো! ধোঁয়া গিলতে গিলতে আমাদের ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমাদের হুঁশ নেই।

প্রভাত মজা করে বলল, বিড়িকে বিড়ি বললে অপমান করা হয় দাদা। লাখুরিয়া গিয়ে শুনে এলাম–ওরা বিড়ির এট্টা আলাদা নাম দিয়েছে। শুনবা? মাজায় দড়ি, খাকি চেহারা। মেজাজ কড়া। সাদা কাঠি ওর কাছে পাত্তা পায় না। বিড়ি হলে গিয়ে গাঁ-ঘরের বুনো বাউরির বিটি, আর সাদা কাঠি মানে সিগারেট হলো গিয়ে বাবুঘরের ঝিউড়ি, দেখতে ভালো, কিন্তু খাটতে পারে না। আর স্বাদেও মন ভরে না। নেশা হওয়া তো দূরে থাক নেশা চটকে যায়। তোমরা এ ব্যাপারে কি বলো হে?

নিমতলার মাচায় গবেষণার শেষ নেই। এ বছর ফলন মেন হবে, কার মেয়ে কার সাথে পালাল, পেট ধসাল সব। তবু এই নিমতলা সূর্যাক্ষর বুকের মধ্যে কাঁপুনি তোলে। এখান দিয়ে যাওয়া-আসার সময় ওর চোখ চলে যায় পুরনো, ছিরিছাঁদ হীন, নোনাধরা ঘরখানার দিকে। ওই হুমড়ে পড়া জরাজীর্ণ পাকা ঘরটাকে তার মনে হয় তাজমহলের চেয়েও সুন্দর। ওখানে যে দ্বীপী থাকে। দ্বীপীর কথা রঘুকে বলা হয়নি তার। সেই সুযোগও আসে নি। তবে সময় করে সব বলতে হবে ওকে।

নিমতলার বাঁক পেরিয়ে এলে সূর্যাক্ষদের পাকা দোতলা বাড়িটা চোখে পড়বে। দোতলা অবধি লতিয়ে উঠেছে মাধবীলতার গাছ, থোকা থোকা ফুল বছরের সব সময় ফুটে থাকে, বিশেষ করে রাতের দিকে সুগন্ধ উজাড় করে ঢেলে দেয়, ঘরের পরিবেশ পুরোপুরি পাল্টে যায়, মনের অন্তঃস্থলে ভালোলাগার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো টান টান হয়ে ওঠে। মাধবীলতার গাছটা ছাড়া ওদের ঘরের সামনের বাগানটায় শোভা পাচ্ছে হাসনুহানা গাছটা। হাসনুহানার সবুজ সংসারটা বেশ গোছানো। কাতার দড়ি দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া ডালপালাকে বেঁধে দিয়েছে সূর্যাক্ষ, বেঁধে না দিলে ওরা মাটিতে লুটায়, যেন ওদের কেউ দেখার নেই এ সংসারে। গরমের সময় গাছটাতে কুঁড়ি ভরে যায়, রাতে ফুলগুলো ওদের ছোট্ট শরীর দেখিয়ে হেসে ওঠে, অমন সাদা হাসি ফুল আর শিশু ছাড়া আর কেউ হাসতে পারে না। হাসনুহানার উগ্র সুবাস বাতাসকে মাতাল করে তোলে। দ্বীপী বেড়াতে এলে গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে, অমন একাগ্র দৃষ্টিতে ও কী যে দেখে তা অনুমান করা যায় না। সূর্যাক্ষ কোনো প্রশ্ন করলে নিরুত্তর হাসে। দ্বীপীর এই হাসি সূর্যাক্ষকে পাগল করে দেয়। সে দ্বীপীর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর শরীর থেকে হাসনুহানার সুবাস চুরি করে নেয়। টোকা মেরে বলে, গাছটা তোর পছন্দ? নিবি?

দ্বীপীর ডাগর ভাসা চোখের দৃষ্টি থেকে হাসির রেশ মেলায় না, তুই আমাকে এই গাছটার চারা এনে দিবি, কোথায় পাবি?

-সে যেখানেই পাই, তুই নিবি কিনা বল?

–নেব তো বললাম।

-রোজ জল দিতে হবে কিন্তু। সূর্যাক্ষর কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে এল, আর একটা কথা। গাছটা আমরা দুজনে মিলে লাগাব। কি রাজি আছিস তো?

-হঠাৎ এমন শখ? দ্বীপী তরল করে হাসল।

-না, তেমন কিছু নয়। মনে হল তাই বললাম। অবশ্য রাজি হওয়া না হওয়া সব তোর উপর নির্ভর করছে। এ তো জোর করার জিনিস নয়। সূর্যাক্ষ কথাগুলো যেন দ্বীপীকে নয়, নিজেকে শোনাল।

দ্বীপী অবাক হল না, সে স্বতঃস্ফূর্ত স্বরে বলল, এতে রাজি না হওয়ার কি আছে। সমরবাবু আমাদের গাছ লাগাতে বলেছেন। গাছ লাগালে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে। ছায়ায় ভরে যাবে আমাদের গ্রাম।

সমরবাবু যে গাছ লাগানোর কথা বলেছেন সে তো ফুলগাছ নয়। তাছাড়া ফুলগাছের আয়ু কম। একটা হাসনুহানা গাছ আর কত বছর বাঁচে। সূর্যাক্ষর এ সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হয়, মা যদি পাল্টা কোনো প্রশ্ন করে।

একটা হ্যারিকেন টানা বারান্দার মাঝখানে বসানো থাকে। হলদেটে আলো ঢেকে দেয় বারান্দার অন্ধকার। এদিকটায় এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। আগামী বিশ বছরে আসবে কিনা সন্দেহ আছে কপোতাক্ষ’র। এ বিষয়ে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা দরকার। গম পেষাতে এখানকার মানুষকে যেতে হয় লাখুরিয়া কালীগঞ্জ। ওখানে ডায়নোমো চলে, গলগল ধোঁয়া আর বিকট ভট ভট শব্দ। সেই ডাইনোমো আটাকলের মেসিন ঘোরায়, গম পিষে গিয়ে সাদা আটা বাতাসে ওড়ে। সের প্রতি পেষাই খরচ গুণে নেয় চাকির মালিক।

সূর্যাক্ষ বাইরে দাঁড়িয়ে মা’ বলে ডাকতেই ভেতর থেকে সাড়া দিলেন মীনাক্ষী। ব্যস্ত পায়ে তিনি দরজা খুলে শুধোলেন, এত দেরি হলো যে। আমি তো ভাবছিলাম কি হল আবার।

-কী আবার হবে, রঘুর জন্য দেরি হয়ে গেল। সূর্যাক্ষ বলল, ওর আসার কোনো ঠিক ছিল না। বল খেলার পর ও বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। আমি ওর মাকে বলে জোর করে নিয়ে এলাম।

মীনাক্ষী হ্যারিকেনের বাতিটা উসকে দিলেন, সামান্য উঁচুতে হ্যারিকেনটা উঠিয়ে ধরে তিনি রঘুর দিকে নিবিষ্ট চোখে তাকালেন, ঘরে এসো বাবা। সূর্যের মুখে আমি তোমার অনেক গল্প শুনেছি। আজ আসতে পেরেছ, বেশ ভালো হল। আসা-যাওয়া না থাকলে সম্পর্ক স্থায়ী হয় না।

রঘুনাথ কি বলবে ভাবছিল, তার ভেতরে অস্বস্তির আস্তরণটা ক্রমশ মোটা হচ্ছিল। এমন পরিবেশে আসা তার জীবনে এই প্রথম। এরা কি জানে না তার বুনোপাড়ায় ঘর, ছোট জাত বলে গ্রামের অনেকেই তাদের ঘৃণার চোখে দেখে। সব জেনে শুনেও এমন আদর আপ্যায়ন তাকে বিস্মিত করল। ঘটনাটা সে ঘরে গিয়ে চুনারামকে বললে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মোচ নাচাবে, ওসব হল গিয়ে বাবু ভদ্দর লোকদের ভান। ও ফাঁদে পা দিস নে দাদুরে, ভুসভুসিয়ে সার গাদার মতো তলিয়ে যাবি, শ্বাস নিতে পারবি নে। এই অবিশ্বাস এক দিনের নয়, বহু জন্মের। এ এক অভিশাপ।

সূর্যাক্ষ কি শাপমুক্ত করতে তার জীবনে উদয় হয়েছে? রঘুনাথের সংশয় তখনও কাটে না। সে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে আছে মীনাক্ষীর মুখের দিকে। এমন সুন্দর মেয়েমানুষ সে কালীগঞ্জে কালীপুজোর সময় দেখেছে। সচরাচর এরা ঘরের বাইরে আসে না, উৎসব পার্বণের কথা আলাদা।

মীনাক্ষী রঘুকে বললেন, তুমি বসো। আমি তোমাদের জন্য জলখাবার করে আনি। রঘুর খিদে পাচ্ছিল তবু সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, জলখাবারের দরকার হবে নি। রাতে আমি ভিজে ভাত খাই। মা আলু মাখা দেয়। আলু মাখা আর পেঁয়াজ দিয়ে ভিজে ভাত খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ভিজে ভাতে খিদে মরে।

মীনাক্ষীর ঠোঁটে রঘুর সরলতার সমর্থনে হাসি ফুটল, আজ আর ভিজে ভাত খেতে হবে না, আজ গরম ভাত খেও। আমি তোমাদের জন্য ভাত রেঁধেছি। পুকুরে জাল ফেলা হয়েছিল। পুকুরের রুই মাছের ঝোল রেঁধেছি।

রঘুর জিভে জল এলেও নিজেকে সংযত করল সে। ভালো খাওয়া তার কপালে জোটে কোথায়? বাবুদের ঘরে মোহৎসব থাকলে সেদিনটা ভোজ খাওয়ার দিন। শালপাতায় ভাত, কুমড়োর ঘন্ট আর ডাল খেতে কী যে আনন্দ। টমাটোর চাটনি যদি তার সঙ্গে হয় তাহলে তো আর কথা নেই। রাত্রিকালে মহোৎসব খেতে গেলে টায়ার ধরিয়ে নেয় রঘু, পুরনো টায়ার পোড়ে চড়বড়িয়ে, হালকা লালচে আলোয় পথ দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না। সেই খুশির দিন বুঝি সূর্যাক্ষ তাকে ফিরিয়ে দিল। রঘুর চোখ করকরিয়ে ওঠে দুর্বলতায়, তার সামাজিক অবস্থানের কথা বিচার-বিবেচনা করে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিজেকে তখন আর ছোট মনে হয় না, মনে হয় সেও এই এলাকার একজন, তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে সবার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। ফলে আর গুটিয়ে থাকা নয়, এবার থেকে তার নিজেকে মেলে ধরার সময়।

খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকতে রাত্রি হল। রঘুনাথের জীবনে এই প্রথম এত ভালো ভালো খাবার খাওয়া। খাওয়ার সময় দুর্গামণির কথা তার খুব মনে পড়ছিল। বার দুই বেদম কাশিতে কাহিল হয়ে পড়েছিল তার মা, শেষে কালীগঞ্জ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে সে ভালো হল। হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার বলেছিলেন, যা খাবে পেট ভরে খেতে হবে। দিনভর মাঠেঘাটে খাটতে গেলে খাওয়ার দরকার। বুকের রোগ ধরে গেলে তখন আর বাঁচানো যাবে না।

বুকের রোগ মানে যক্ষ্মা। আতঙ্কিত গুয়ারাম সেদিন গালে হাত দিয়ে বসেছিল। দুর্গামণির কিছু হয়ে গেলে সে-ও পঙ্গু। এ সংসার টানবে কে। আর এই বয়সে ফের ঘরের চালে চড়ে বিয়ের নাটক করা যাবে না। সেদিন থেকে দুর্গামণির মাঠে খাটতে যাওয়া বারণ। এমন কী নেশার জিনিস সে কু নজরে দেখবে, সাধ হলেও ছুঁয়েও দেখবে না।

ভালো-মন্দ খাওয়ার সময় রঘুনাথের হাত আর মুখের কাছে উঠতে চায় না। যেন শিরায় খিঁচ ধরেছে হঠাৎ এমনভাব। মনটা কোথায় যেন উড়ে পালায়, কিছুতেই আর স্বাভাবিক হতে চায় না।

মীনাক্ষী বলেন, খেয়ে নাও, কী ভাবছো?

-না, কিছু না। রঘুনাথ নিজেকে আড়াল করে নিজের গভীরে। শামুক লুকানো বিদ্যা সে বুঝি শিখে ফেলেছে।

সূর্যাক্ষ তার অস্থিরতা অনুমান করে নিজেই কেমন অস্থির হয়ে উঠল, কী ব্যাপার রঘু, খাচ্ছিস যে! মা’র রান্না বুঝি ভালো হয়নি? সংকোচে রঘুনাথ যেন মাটিতে মিশে যেতে চায়, না, না, তা নয়।

–তাহলে কি?

–মার কথা খুব মনে পড়ছে। মা তো এত ভালো খাবার কুনোদিন খায়নি। রঘুনাথ ছুঁয়ে দেওয়া লাজবন্তী লতার মতো কুঁকড়ে গেল।

–তুই খেয়ে নে। কাল যাওয়ার সময় মাসীমার জন্য পাঠিয়ে দেব। সূর্যাক্ষ ওর মায়ের দিকে তাকাল। মীনাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তুমি কিছু ভেব না বাবা। আমার মাথায় থাকবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। ঘন করে কলাই ডাল মীনাক্ষী রেঁধেছেন নারকেল কোরা দিয়ে। এক হাতা ডাল রঘুনাথের পাতে দিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন, কী আশ্চর্য, এখনও মানুষটা ঘরে ফিরল না!

-বাবা কোথায় গিয়েছে মা? সূর্যাক্ষও অবাক।

মীনাক্ষী গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, তোর বাবা কোথায় যায় আমাকে কি বলে যায়? আমাকে বলে যাওয়ার তার সময় কোথায়? দেশোদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে ঘরটাকে ভুলতে বসেছে। আমার আর ভালো লাগে না হাঁপিয়ে উঠেছি। সূর্যাক্ষ কার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে ভেবে পেল না। এ সময় চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ঘরে উঠে এল ওরা। আগে থেকে বিছানা পাতাই ছিল। কী সুন্দর ফুলছাপা একটা চাদর ঘরটায়। চেহারাই বদলে দিয়েছে জ্যোৎস্না রাতের মতো। কোথায় একটা পেঁচা ক্রাঁও ক্রাঁও শব্দে ডেকে উঠল। তারপরে চুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল শুকনো বাঁশপাতার উপর। পাশের বাঁশবাগান থেকে ইঁদুর আর কালপেঁচার ঝটপটানির শব্দ এল! শিরদাঁড়া টান টান করে খাটের একপাশে বসে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকল রঘুনাথ। পেঁচা ধাওড়া পাড়াতেও আছে, এখানকার পেঁচাগুলো বুঝি বেশি হিংস্র।

সূর্যাক্ষ নীরবতা ভঙ্গ করল, পান খাবি?

পান আমার ভালো লাগে না। রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল।

–তাহলে মৌরি?

–ওসব আমার অভ্যেস নেই। রঘুনাথ উসখুশিয়ে উঠল।

সূর্যাক্ষ দুম করে বলে বসল, তাহলে কী খাবি? আমি তো খাওয়ার পরে একটা নাম্বার টেন সিগারেট খাই। না খেলে আমার ঘুম পেয়ে যায়। পরীক্ষা থাকলে দু-চারটে তো খেতেই হয়, নাহলে পাশ করতে পারব না যে।

–তুর বাবা-মা জানে না? বিস্ময়ের বাঁধ ভেঙে গেল রঘুনাথের।

সূর্যাক্ষ দরাজ গলায় হেসে উঠল, বাবা একদিন দেখে ফেলেছিল তবে বকেনি। শুধু বলল-তোমার এখন সিগারেট খাওয়ার বয়স হয়নি। খাচ্ছো যখন বেশি খেও না। ওষুধের মতো পরিমাপ করে খেও।

তার মানে?

–মানেটা বুঝলি না? সূর্যাক্ষ বেশ মজা করে বলল, বাবা বলেছে–একটা দুটো খেতে। তার বেশি যেন না হয়। আসলে গরিব পার্টি করে তো। গরিব মানুষের দামি জিনিস বেশি খাওয়া ভালো নয়।

-তোর কাছে বিড়ি আচে? রঘুনাথ সাহস নিয়ে বলে ফেলল কথাটা, কালীপুজোর রাতে থাকা দেখতে গিয়েচিলাম। সেদিন প্রথম বাঁধের ধারের দুকান থিকে সিকারেট কিনে খাই। বড়ো কড়া মাল। গলায় ধুয়ো আটকে গিয়েচিলো। তামুকটা তিতা-তিতা, জিভে লাগলে চড়বড় করে জ্বলে।

সূর্যাক্ষ উঠে গিয়ে বইয়ের তাকটার কাছে দাঁড়াল। বই ভর্তি তাকের ভেতর থেকে সে বিড়ির বান্ডিলটা বের করে আনল। একটা রঘুনাথকে দিল, নে ধরা।

-দেশলাই না দিলে কি হাওয়ায় বিড়ি ধরে?

–ও হো। ভুল হয়ে গিয়েছে। সর্যাক্ষ বিছানার তলা থেকে লুকোনো দেশলাইটা বের করে দিল। শুধু রঘুনাথ নয়, সে নিজেও একটা বিড়ি ধরিয়ে মৌজ করে টান দিয়ে বলল, বিড়ি হল গিয়ে আয়ুবর্ধক ধূম্র টনিক। যে খেয়েছে সেও পস্তায়, আর যে খায়নি সে-ও পস্তায়। এ হল গিয়ে শাঁখের করাত। যেতে কাটে, আসতে কাটে। দুনিয়া ঘুরে এলে এর তুলনা পাওয়া ভার।

রঘুনাথ অর্ধেক কথা না বুঝে বোঝার মতো মুখ করে তাকাল। তখনই নীচ থেকে ডাক ভেসে এল মীনাক্ষীর। উদ্বেগ ভরা গলা। ব্যস্ত হয়ে উঠল সূর্যাক্ষ, এই রে, মা ডাকছে। মৌরির কৌটোটা কোথায় রাখলাম? বিছানার উপর তো রেখেছিলাম। বিছানার উপরে মৌরির কৌটো ছিল না, ওটা ছিল বইয়ের তাকে। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেতেই গুচ্ছের মৌরি মুখে পুরে দিল সূর্যাক্ষ, তুই বস। আমি আসছি।

দক্ষিণ খোলা ঘর, হাওয়া এসে অবাধে হাডুডু খেলছে ঘরের ভেতর। পাতলা পর্দা তিরতির করে উড়ছে সেই হাওয়ার আদরে। পাশের বাঁশবন থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কোঠরা ব্যাঙের ডাক। আশেপাশে কোথাও বুঝি চামচিকির বাসা আছে, বিদঘুঁটে গন্ধে নাক কুঁচকে যাচ্ছে রঘুনাথের।

মিনিট দশেক পরে কাঠের সিঁড়ি কাঁপিয়ে ফিরে এল সূর্যাক্ষ, মা এখনও খায়নি। বাবার ভাত আগলে বসে আছে। আমি কত বললাম খেয়ে নিতে। কিছুতেই খাবে না। পতিভক্তির জ্বলন্ত উদাহরণ। পেটে জ্বালাপোড়া শুরু হলে বুঝবে!

–তুর বাপ কি সবসময় অমন দেরি করে?

সূর্যাক্ষ অন্যমনস্ক হয়ে গেল, বাবার এই এক দোষ। সময়জ্ঞান থাকে না। হঠাৎ বাইরের গেট খোলার শব্দ হল। ঘড়িতে পেন্ডুলাম মাথা ঠকল বারো বার। সূর্যাক্ষ ঢিল ফেলা পুকুরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল, এই বাবা এল। যাক, বাঁচা গেল। নাহলে এত রাতে মা আমাকে খুঁজতে পাঠাত।

-তুর বাপ যে এয়েচে কি করে বুঝলি? রঘুনাথ নিজেকে চালাক ভেবে প্রশ্ন করল। সূর্যাক্ষ বলল, বাবার গেট খোলার কায়দাটাই আলাদা। গেট খোলার শব্দ শুনে আমি বলে দিতে পারি কে এসেছে।

–ভারী মজার তো! রঘুনাথ সুতোর কাছাকাছি আগুন এসে যাওয়া বিড়ির টুকরোটা নিভিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল। সূর্যাক্ষ কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে তার মুখোমুখি বসল, তোকে একটা কথা বলা হয়নি।

-কী কথা? রঘুনাথ আগ্রহ প্রকাশ করল না।

–থাক, কাল বলব।

রঘুনাথ বইয়ের তাকটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে শুধোল, এই তাকে সব বই তুর? অ্যাতো বই তুই পড়িস কী করে? এত মোটা মোটা বইতে ছবি থাকে না?

-থাকে। তবে সেই ছবি তোর ভালো লাগবে না। সূর্যাক্ষ এড়িয়ে যেতে চাইল।

-ওই মোটা বইটা দেখব? পড়তে তো পারব না, অন্তত ছুঁয়ে দেখি। রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে হিলহিলিয়ে উঠল মলিন হাসি। বইটা টেনে বাইরে আনতে গিয়ে হাত থেকে ঠিকরে পড়ল। বেশ শব্দ হল। বই ছিঁড়ল না কিন্তু বইয়ের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা সাদা-কালো মেয়ের ছবি। অপ্রস্তুত সূর্যাক্ষ ছবিটা চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলতে চাইল গেঞ্জির ভেতর। রঘুনাথের মনে দোলা দিয়ে উঠল রোমাঞ্চ, ওটা কি রে? আমাকে দেখাবি না বুঝি? ঠিক আছে, ওটা আর লুকোস নে, ঠিক জায়গা মতো রেখে দে। পড়া-লিখার জিনিস, হারিয়ে গেলে তুর ক্ষেতি হবে। রঘুনাথ কিছু আন্দাজই করতে পারেনি, সে বোকার বোকা, হদ্দবোকা। এবার বন্ধ জানালাটা খুলে দিল সূর্যাক্ষ। সাদা-কালো ছবিটা বিছানার উপর ছুঁড়ে দিয়ে সে বলল, নে দেখ। আমার লাভার। আমি একে ভালোবাসি।

 বুকের ভেতর

০৬.

মানুষের বুকের ভেতর কত কি যে লুকোনো থাকে, মানুষের হৃদয় হল সমুদ্রতল! শুধু জল নয়, সেখানে জীবনও থাকে। রঘুনাথ ভালোবাসা ছাড়া কোনো শব্দেরই অর্থ উদ্ধার করতে পারল না, সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, ছবিটা খাট থেকে তুলে নিল হাতে। তারপর নতুন কিছু দেখার মতো সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ছবিটাকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জড়তা ভেঙে গিয়ে ডিম ফোঁটা মুরগির বাচ্চার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল বিষয়টা, সূর্যাক্ষ মুখোমুখি চেয়ার টেনে বলল, মেয়েটাকে চিনলি না তো? ওর নাম দ্বীপী। নিমতলার ধারে ওদের ঘর। আমি রোজ একবার করে ওদের বাড়িতে যাই। গিয়ে গিয়ে নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। না গেলে কষ্ট হয়, বুকটা টনটনিয়ে ওঠে, মনে হয় সারাদিনের কোনো একটা কাজ করতে ভুলে গিয়েচি। রঘুনাথ আশ্চর্য হল না, মেয়েটার সাথে বুঝি তুর লটঘট চলছে? তা ভালো। তবে এসব ধ্যাসটুমু করতে গিয়ে পড়াশোনার যেন দফারফা না হয়ে যায়। পীরিত করা বড়ো ঝামেলার জিনিস রে। আমার বুড়াদাদু বলে ভাব-ভালোবাসা হল গিয়ে বুড়িগাঙের বানের জল, এই আচে ওই নেই, তাই ভালোবাসা বুকে বয়ে বেড়িয়ে শরীল খারাপ করার কুনো মানে হয় না।

দ্বীপীর কথা ভাবলে আমার শরীর খারাপ করে না। ও আমার শ্বাস-প্রশ্বাস। জোর গলায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল সূর্যাক্ষ, ওর মুখটা একবার না দেখলে বইয়ের সব পড়া কেমন গুলিয়ে যায়। দ্বীপী আমার সবটা জুড়ে বসে আছে। ও আমার সমুদ্র। কিন্তু ও আমাকে কি ভাবে কি চোখে দেখে তা আমার আজও জানা হয়নি।

আবেগের ধারা বিবরণী চলে ক্রমাগত। রাত্রির বয়স বাড়ার সংকেত বুঝতে পারে না কেউ। নীচের ঘরগুলো থেকে নীরবতা ছাড়া কোনো শব্দ ওঠে না। কপোতাক্ষ ঘরে একা আসেন নি, সঙ্গে করে দু-জন অতিথিকে এনেছেন। ওরা রাতে খাবেন। মীনাক্ষী কপালের ফুটে ওঠা বিরক্তির রেখাগুলোকে যথাসম্ভব লুকিয়ে ফেলে আবার ভাতের জল চড়িয়েছেন উনুনে। কপোতাক্ষর এই স্বভাব বহু পুরনো ব্যাধির মতো, শতবার নিষেধ করেও মীনাক্ষী এর কোনো সুফল পান নি। মানুষটার এই জনহিত করার প্রবণতা বুঝি কোনোদিন অবলুপ্ত হবে না। মীনাক্ষীর বড়ো আশ্চর্য লাগে। কপোতাক্ষকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত রাত করে এলে যে?

রাত হয়ে গেল মীনু। আসলে কী জান, পার্টির কাজ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চেয়েও ঝামেলার। ঘড়ি ধরে এসব কাজ হয় না। কপোতাক্ষ বোঝাবার চেষ্টা করলেন, দেখি কাল থেকে যাতে আর দেরি না হয় সেই চেষ্টাই করব।

এরা কি খাবেন? সংশয় দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন মীনাক্ষী। খুব হালকা মেজাজে হেসে উঠলেন কপোতাক্ষ, জানি এত রাতে তোমার খুব অসুবিধা হবে তবু তুমি আছো বলেই আমি ভদ্রলোকদের সঙ্গে আনতে সাহস পেলাম। তাছাড়া এত রাতে ওরা গোয়াড়ী ফিরে যেতে পারবে না। বাস নেই। কাল সকালে ওঁরা চলে যাবেন।

-খাবেই যখন তখন একটা খবর পাঠাতে পারতে। মীনাক্ষীর গলা থেকে চুঁইয়ে নামল বিরক্তি।

–বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছে।

–এই ভুল তোমার মজ্জাগত। এই ভুল তুমি বারবার করো। কপোতাক্ষ কোনো প্রতিবাদ করলেন না, তিনি জানেন অনেক সময় নীরবতাই সান্ত্বনার মলম।

মীনাক্ষী চলে যাচ্ছিলেন, কী মনে করে ফিরে এলেন, শোন, সূর্যর বন্ধু এসেছে। পারলে রাতেই একবার ছেলেটার সঙ্গে দেখা করে নিও। বড়ো ভালো ছেলে। হলদেপোঁতা ধাওড়ায় থাকে। খাওয়ার সময় ওর মায়ের কথা মনে পড়ছিল বলে ঠিক মতো খেতেই পারল না।

-কী নাম বল তো? কপোতাক্ষ উৎসাহিত হলেন।

–রঘুনাথ রাজোয়ার।

– হ্যাঁ-হ্যাঁ বুঝেছি। ছেলেটার মুখ দেখলে নিশ্চয়ই চিনব। তবে আমি ওর বাবা আর দাদুকে চিনি। ওরা বড্ড গরীব তবে সৎ। কপোতাক্ষ আনমনা হয়ে গেলেন, ওদের নিয়ে তো আমার সংগ্রাম। জানি না এই অসম লড়াই আমি কতদুর টেনে নিয়ে যেতে পারব। তবে আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। আমার এই লড়াইয়ে আমি তোমাকেও পাশে পেতে চাই।

আমি পাশে না থাকলে তোমাকে না খেয়ে শুকাতে হোত। মীনাক্ষী সাদা ঝকঝকে দাঁত বের করে হাসলেন, হাসতে-হাসতে একসময় গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি, মানুষের জন্য কাজ করো এতে আমি তোমাকে কোনোদিন বাধা দেব না। তবে তোমার কাছে আমার একটাই নিবেদন–পর-উপকার করতে গিয়ে নিজের শরীরটাকে যেন ভেঙে ফেল না। মনে রেখো-শরীরও নদীর পাড়ের মতো, একবার ভেঙে গেলে, ধস নামলে আর মেরামত করা যায় না।

– হ্যাঁ-হ্যাঁ, এতো লাখ কথার এক কথা। কপোতাক্ষ মাথা নাড়লেন।

মীনাক্ষীর মনের মেঘ কেটে গিয়েছে, আমি যাই। তুমি একটু ওদের সঙ্গে গল্প করো। রান্না হয়ে গেলে ডাকব।

মীনাক্ষী চলে যাবার পরও একা অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন কপোতাক্ষ। সূর্যাক্ষর সঙ্গে কাল রাতেও তার দেখা হয়নি। তিনি যখন ফেরেন তখন সূর্যাক্ষ ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি ওর। সূর্যাক্ষর অভ্যাস রাত বারোটার মধ্যে শুয়ে পড়া। রাত বারোটাতে শুলেও ও সকাল পাঁচটার মধ্যে উঠবেই। পেছনের বাঁশবাগানটাতে পাখির মেলা বসে যায় তখন, বিশেষ করে এক দল কাক বাঁশগাছে বসে দলবদ্ধভাবে ডাকতে থাকে, ওরা বুঝি সকালের আলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে পৃথিবীতে। আর আশ্চর্য, সকালবেলায় কাকের কা-কা ডাকও  শুনতে মন্দ লাগে না সূর্যাক্ষর। পাখিগুলো বুঝি তার ঘুম ভাঙানোর জন্য প্রতিদিন প্রস্তুত হয়ে থাকে। কাক ছাড়াও বাঁশবাগানের ডোবাটায় এক জোড়া ডাহুক আসে প্রতিদিন সকালে। ওদের ডাকটা বড়ো অদ্ভুত। সব সময় ওদের যেন কেউ তাড়া করছে এমন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ওদের ক ক ক ক ডাকে স্পষ্ট। সূর্যাক্ষ বুঝতে পারে ডাহুক হল সব চাইতে ভীতু পাখি। সুন্দর পাখি। একমাত্র ডাহুকই গলায় সাদা মোতির মালা পরে ঘুরে বেড়ায়, ওদের পালকের বিন্যাস, সজ্জা কোনো শিল্পীর দক্ষ হাতের অঙ্কন নয়, স্বয়ং প্রকৃতির, সৃষ্টিকর্তা বহু যত্ন নিয়ে ওদের পালকে রঙ ভরেছেন, তিল তিল করে ওদের তিলোত্তমা করে তুলেছেন।

কী মনে করে কপোতাক্ষ দোতলার সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গেলেন, কান পেতে কথা শোনার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, সূর্যাক্ষর গলা পাওয়া যাচ্ছে। গল্প আর বন্ধু পেলে ছেলেটার চোখের ঘুম পেয়াদাদের মতো উধাও হয়ে যায়। কপোতাক্ষর তবু সংশয় ছিল যাবে কি যাব না বলে। কিন্তু বাইরে ঠিকরে পড়া হ্যারিকেনের আলো তার সংকোচকে দূরে সরিয়ে দিল। কাঠের সিঁড়ি ভেঙে তিনি উঠে এলেন দোতলার বারান্দায়। ঘরে না ঢুকেই তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, সূর্য, ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি?

সূর্য সাড়া দিল, না বাবা, জেগেই আছি।

রঘুর হাত থেকে দ্বীপীর ফটোটা কেড়ে নিয়ে সে চকিতে বিছানার তলায় লুকিয়ে ফেলল, তারপর রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা আসছে।

রঘুনাথও নিমেষে শরীরটাকে টানটান করে উঠে দাঁড়াল। সূর্যাক্ষর বাবার সঙ্গে তার আলাপ নেই। আলাপ করার প্রয়োজনও হয়নি। তবে কপোতাক্ষ রোজ শেরপুরের বাঁধ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কালীগঞ্জের বাজারে যান, ওখানেই তাঁর আসল আড্ডা। প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরেন। এ অঞ্চলের ডাকাত-চোর-বদমাশ-লুটেরা-ধান্দাবাজ সব তার চেনা জানা। ফলে রাত করে বাড়ি ফিরলেও কেউ তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায় না, বরং চোখাচোখি হলে মুখ নামিয়ে নিয়ে চলে যায়। এই সম্মানটুকু আছে বলেই এখনও কপোতাক্ষ সারাদিন লড়াই করার শক্তি পান।

ঘরে ঢুকেই সবার আগে কপোতাক্ষ রঘুর দিকে তাকালেন, তোমাকে আমি দেখেছি, কিন্তু কথা হয়নি। তোমার বাবার নাম কি গুয়ারাম?

রঘুনাথ ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলেই মাজা নীচু করে হাত বাড়িয়ে দিল কপোতাক্ষর পায়ের দিকে। পা ছোঁয়ার আগেই কপোতাক্ষ রঘুনাথের হাত দুটো ধরে ফেললেন, না-না থাক। প্রণাম করার দরকার নেই। তুমি মনে মনে আমাকে শ্রদ্ধা করলেই প্রণাম করার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শ্রদ্ধা জানানো হয়। আর একটা কথা। চট করে লোকের পায়ে হাত দিতে যাবে কেন? মাথা নত করার স্বভাবটা বন্ধ করতে হবে আমাদের। বাবা-মা আর তোমার শিক্ষক ছাড়া কারোর কাছে মাথা নত করবে না।

কপোতাক্ষর কথায় যেন চাপা আগুন উসকে উঠল। একটা তেজ তার কথার মধ্যে ঠিকরে বেরচ্ছিল।

-ঠিক আছে। তোমরা বসো। রাত হল। কাল সকালে আবার কথা হবে। তিনি সূর্যাক্ষর দিকে তাকালেন, মশারি টাঙ্গিয়ে ঘুমাবি। বাঁশ বাগানের মশারা কিন্তু দৈত্য হয়। আমি আসি।

কপোতাক্ষ চলে গেলেন। সূর্যাক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, আমার বাবাকে কেমন দেখলি। রঘু?

–তুর বাবা বেশ ভালো মানুষ। অমন মানুষ আজকালকার দিনে পাওয়া ভার। রঘুনাথের কথায় খুশি হল সূর্যাক্ষ, প্রসঙ্গ বদল করল সে, কাল তোকে দ্বীপীদের বাড়িতে নিয়ে যাবো।

–আমার লাজ লাগবে, আমি যাব না।

-যাবি না মানে? তোকে যেতেই হবে। জেদ ফুটে উঠল সূর্যাক্ষর গলায়। রঘু বলল, আগে সকাল হতে দে, তারপর দেখা হবেখন।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল রঘুর, জানালা টপকানো রোদ এসে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। চোখ ডলে নিয়ে সে দেখল চারিদিকে ফুটফুটে আলো হাসির নমনীয় রঙ মেখে নিজেকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। সূর্যাক্ষ কখন উঠেছে তা সে সঠিক জানে না। তবে সূর্যাক্ষ ঘরের এক কোণে হ্যারিকেন নিয়ে মনযোগ সহকারে পড়ছিল। ওর ভোরে ওঠা অভ্যাস, যত রাতে ঘুমাক না কেন তোর ভোর ঘুম ভাঙবেই। এই অভ্যাসটা মীনাক্ষীই তাকে পাইয়ে দিয়েছেন, ভোর ভোর না উঠলে দিনটা বড়ো ছোট হয়ে আসে। মীনাক্ষী প্রায় দিনই আবৃত্তি করার মতো করে বলেন, আরলি টু রাইজ এন্ড আরলি টু বেড মেকস আ ম্যান হেলদি অ্যান্ড ওয়াইস। বুঝলি-অনুগত ঘাড় নাড়ে সূর্যাক্ষ। কপোতাক্ষ ঘুমের ব্যাপারে আপোষহীন। দেরি করে ঘুমালে দেরিতে ওঠা তার স্বভাব। বিশেষ দরকারেও সে বিছানা ছেড়ে উঠবে না। আর যদি কোন কারণে উঠতে হয় তাহলে বিরক্ত হয় প্রচণ্ড, দিলে তা ঘুমটা ভাঙিয়ে, ঘুমে কত দাম জানো?

–আমার আর জেনে দরকার নেই। তুমি আগে বাজারে যাও তো। ঘরে কিছু নেই। ছেলেটা কী খেয়ে ইস্কুলে যাবে? মীনাক্ষীর কণ্ঠস্বরে বাতাস-খেদানো ঢেউয়ের ব্যস্ততা।

কপোতাক্ষ মীনাক্ষীর মুখের উপর কোনো কথা বলতে পারেন না। অস্বস্তি হয়। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন গোয়াড়ী শহরে মীনাক্ষীদের বাস চলে। আর একটা বাস কৃষ্ণনগর-করিমপুর রুটে। দুটো বাস ছাড়াও ওদের আছে কাপড়ের দোকান। ভাব-ভালোবাসার বিয়ে নাহলে কি মীনাক্ষী কোনোদিন এই অজ পাড়াগাঁয়ে এসে বসবাস করত। বিবাহ শব্দটা তাই ভাগ্যঘেঁষা।

পিতৃদেব ক্ষীরমোহনের মৃত্যুর ছ মাসের মধ্যেই নীলাক্ষ জমিজমা, বাস্তুভিটে, পুকুর বিল এমনকী বাসনপত্র সব চোখ উলটে ভাগ করে নিলেন। এমনকী ভাগ হয়ে গেল গোয়ালের গোরু-মোষ। নীলাক্ষ যাওয়ার আগে গায়ে চিমটি কাটার মতো কথা বলল, তোর সাথে ইচ্ছে থাকলেও আর থাকা যাবে না। গাঁয়ের মানুষ খেপিয়ে তুই যে কারবার শুরু করেছিস–তা কখনও সমর্থনযোগ্য নয়। ভাবছিস সস্তা রাজনীতি করে চারদিক মাত করে দিবি–তা কিন্তু হবার নয়। মানুষ ফাঁকিটা ধরতে পারে। আর যেদিন ফাঁকিটা ধরতে পারবে তোদের কিন্তু গাঙের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। সময় আসলে আমার কথাটা মিলিয়ে নিস।

–তা বলে তুই ঘর ছেড়ে চলে যাবি? ভ্রূ তুলে জিজ্ঞাসা করল কপোতাক্ষ।

-না গিয়ে উপায় নেই। আমি চোরের সাথে ঘর করব তবু তোর সাথে নয়। মুখ বেঁকে উঠল নীলাক্ষর, তোর সাথে থেকে আমার নিন্দে হচ্ছে। ফলে ঘরের খেয়ে আমি বনের মোষ তাড়াতে পারব না। তাছাড়া তোর ছায়ায় নিজেকে ঢাকলে হাসাহাসি করবে লোকে।

–আর একবার শেষ বারের মতো ভেবে দেখ। কপোতাক্ষ বোঝাতে চাইল, দশের লাঠি একের বোঝা। কথাটা মানিস তো?

নীলাক্ষ চলে যাওয়ার পর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল কপোতাক্ষর। সে এখনও বুঝতে পারেনি কী তার অপরাধ? কেন দাদা তার সাহচর্য ছেড়ে গেল। তবে নতুন জায়গায় নতুন বাড়িতে নীলাক্ষ বেশ সুখে আছে। জমিদারের মতো মেজাজ সে এখনো ধরে রেখেছে নিজের ভেতর।

মীনাক্ষী এসে সকালের চা দিয়ে গেলেন। প্রতিটি সকাল তার কাছে নতুন মাত্রা নিয়ে ধরা দেয়। একটা ভয় পেঁচিয়ে ওঠে বুকের ভেতর। রামনগর সুগার মিলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন কপোতাক্ষ। মিল-কোম্পানীর সঙ্গে তার পটল না। শ্রমিক আর চাষিদের দাবী নিয়ে যত অশান্তি। অগ্রভাগে কপোতাক্ষ ঝান্ডা হাতে–জবাব চাই, জবাব দাও। সমস্যা একটা নয়। সাহেবমাঠের আখ বিক্রির সমস্যা ছিল বহু দিনের, সেই সঙ্গে যুক্ত হল পেয়াদাদের সমস্যা। ওরা নূন্যতম বেতনে কাজ করতে আগ্রহী নয়। বেতন বৃদ্ধির জন্য অসন্তোষ দানা বাঁধছিল ওদের ভেতর। মনে অশান্তি নিয়ে মাঠ পাহারার কাজ হয় না। এ কাজে বিপদ সব সময় মাথার উপর খাড়ার মতো ঝোলে। মিলের কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মিল প্রশাসন উদাসীন। ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থার আশাপ্রদ নয়, তাছাড়া যাতায়াতের পথঘাট খানাখন্দে ভরা। এসব সমস্যার কথা ভেবে কপোতাক্ষর রাতে ভালো ঘুম হয় না। বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার আগে ঘর সামলে নেবার বড়ো প্রয়োজন। শ্রমিকরা এবার পুজোর বোনাসের জন্য সংঘবদ্ধ হবে। ওদের নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষ কোথায়? কপোতাক্ষই চাকরির ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে গেলেন। আলোচনার মধ্য দিয়ে মীমাংসাসূত্র বেরিয়ে আসার কথা ছিল কিন্তু বাস্তবে তা হল না একপক্ষের অনড় মনোভাবের জন্য। কপোতাক্ষর উপর রুষ্ট হলেন কর্তৃপক্ষ। তাকে আত্মসংশোধনের সুযোগ দিলেন ওরা। কিন্তু কপোতাক্ষর মন আতাগাছের ডালের মতো ভঙ্গুর নয়, তিনি পাকা বাঁশের কঞ্চি, মচকাবেন তবু ভাঙবেন না। ফলে একদিন ছাঁটাইয়ের চিঠিটা ধরিয়ে দিলেন অফিসের বড়বাবু। এরকম কোনো অঘটন ঘটবে আগে থেকে আঁচ পেয়েছিলেন কপোতাক্ষ। মীনাক্ষী সব শুনে নিরাপত্তাহীনতায় ডুকরে উঠলেন, এ কী শোনালে গো, এখন আমাদের কী ভাবে চলবে?

-তুমি ভয় পেও না। তিনটে পেট ঠিক চলে যাবে। আমি ক্ষীরমোহন চক্রবর্তীর ছেলে। আশা রাখি আমার মাথার উপর যতদিন দাদা আছে আমার খাওয়া পরার কোনো অসুবিধা হবে না। কপোতাক্ষর কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা এবং সহনশীলতার সহাবস্থান, একটা কথা মনে রেখো মীনা, জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি। ভগবানে আমার কোনো আস্থা নেই। আমার দেবতার নাম মানুষ-দেবতা।

-তুমি কি পাগল হলে? দাদা কেন তোমার সংসার টানতে যাবেন? মীনাক্ষীর চোখ জোড়ায় অশান্তি চিকুর কাটে, তোমার দাদা দেখো কোনদিন আবার পৃথক না হয়ে যান।

যায় যদি তো যাবে, তাতে আমার কি? কপোতাক্ষর কণ্ঠস্বরে হালকা সুর, এ পৃথিবীতে কেউ কারোর অনুগত নয়। যে যার কর্মের দ্বারা খায়। আসলে প্রতিটি দানায় যে খাবে তার নাম লেখা থাকে। তাছাড়া আমার চাকরি আমার দোষের জন্য যায়নি। বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে আমি ক্ষুদ্রতর স্বার্থ ত্যাগ করেছি।

মীনাক্ষী সংসারের দাবীর কথা কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারেন না। উল্টে কপোতাক্ষ বোঝান, আমার যদি ডাল ভাত জোটে তোমারও জুটবে। আর তা যদি না জোটাতে পারি তোমাকে কৃষ্ণনগরে রেখে আসব। তুমি খোড়ে নদীর উন্মুক্ত হাওয়া খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা রেখো। যদি সম্ভব হয় ভবিষ্যৎ-এর বিপ্লবের জন্য নিজেকে তৈরি রেখো।

-কী পাগলের মতো বকছো! সূর্যর ভবিষ্যৎ-এর কথা ভাববে না? মীনাক্ষী রাগ জ্বালা লুকিয়ে রাখতে পারল না? হতাশায় ডুবে গেল তার সুন্দর মুখশ্রী।

সকালের চা-টা সুন্দর বানিয়েছিলেন মীনাক্ষী। কপোতাক্ষ তার সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে বসেছেন বাইরের বারান্দায়। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে আলোচনা চলছে পূর্ণমাত্রায়। তাদের কথা শোনার কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না সূর্যাক্ষ। সে মীনাক্ষীর মুখোমুখি দাঁড়াল, মা, আমি রঘুকে এগিয়ে দিয়ে আসি। আজ আমার স্কুল আছে। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পর টিউশানি সেরে ফিরব।

রঘুনাথ বিদায়বেলায় কেমন করুণ মুখ করে তাকিয়ে ছিল মীনাক্ষীর দিকে। সূর্যাক্ষর মা যেন কুমোরপাড়ায় গড়া মা দুর্গা। যেমন ব্যবহার, তেমন কথা-বার্তা, আন্তরিকতা। রঘুনাথের মন ভরে গিয়েছে। মানুষের প্রতি তার ভুল ধারণা অনেকটাই পাল্টে গেছে। ঘরে ফিরে সব কিছু গুছিয়ে বলতে হবে দুর্গামণিকে, যদিও এসব কথা সে আদৌ বিশ্বাস করবে না। রঘুনাথ তক্তাপোষে ঘুমিয়েছে সূর্যাক্ষের পাশে একই বিছানায়। একথা গ্রাম- সমাজে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার পরিবেশ এখন ডিমের ভেতর ভ্রুণের মতো লুকিয়ে আছে। বিশ্বাস না করলেও সে দুর্গামণিকে গল্প বলবে সব। এ গল্প শুনে চুনারামের কী প্রতিক্রিয়া হবে তা মনে মনে সব যেন দেখতে পাচ্ছিল রঘুনাথ।

মীনাক্ষী স্নেহের চোখে রঘুনাথের দিকে তাকালেন, আবার এসো বাবা। সংকোচ করো না, এ বাড়ি তো তোমার। যখন মন চায় চলে আসবে।

রঘুনাথের ঠোঁট কেঁপে উঠল, থরথরিয়ে উঠল দৃষ্টি। সে বুঝতে পারল আর একটা শব্দও যদি মীনাক্ষী উচ্চারণ করেন তার প্রতি তাহলে সে উগত কান্নার বেগকে সামাল দিতে পারবে না, বাঁধ ভেঙে গিয়ে আবেগের বন্যা আসবে শরীরের নদীতে।

সকালবেলায় নিমতলা ঝাট দেয় খোঁড়া হারু। ওর ভুষিমালের দোকান মাত্র বিশ হাত দূরে। শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও হারু একাজটা নিজের হাতে করতে পছন্দ করে। হারু শুধু খোঁড়া নয়, তার উচ্চতা মাত্র তিন ফুট দুই ইঞ্চি। সে তার যৌবনে সার্কাস দলে নাম লিখিয়েছিল, সেখানে সে জোকার সাজত, মুখে রঙচঙ মেখে হাসি-আনন্দ বিলোত দর্শকদের। সার্কাসের জীবন হারুর পছন্দ হয়নি কোনোকালে। সে ম্যানেজারের ক্যাশ ভেঙে পালিয়ে এল তিন বছর পরে। গাঁয়ে এসে ভয়ে ভয়ে সময় কাটাত সে। ছ’মাস পরেও যখন সার্কাসের লোক এল না তার খোঁজে তখন সে সাহস করে নিমতলায় ভূষিমালের দোকান খুলল। হারুর দোকান এ তল্লাটে বিখ্যাত, গাঁ বলে সে দাম গলা কেটে নেয় না, সামান্য লাভ রেখেই সে ব্যবসা করতে পছন্দ করে। এখন কাঁচা টাকার মুখ দেখেছে হারু। সে এখন গরিব দুঃখীদের মহাজন, সুদে টাকা ধার দেয়, গোপনে বন্ধকের কারবার করে।

কপোতাক্ষ হারুকে বারকতক সতর্ক করেছেন, সুদের টাকা থাকে না হারু। তোমার তো অভাব নেই তবু তুমি কেন সুদের কারবার করবে? মানুষের অভিশাপ কুড়িয়ে জীবন কোনোদিন সুখের মুখ দেখে না। তাই বলছিলাম কী হারু, তুমি এসব ছেড়ে দাও। শুধু ভুষিমালের দোকানটা চালাও। ওতেই তোমার মঙ্গল।

হারু সুখী না হলেও ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। সে জানে কপোতাক্ষর রাগের বাহার। মানুষটা ভালোর ভালো কিন্তু রেগে গেলে মাথায় খুন চড়ে যায়, তখন সাত বুঝিয়েও তাকে সামলানো যায় না।

নীলাক্ষর কাছে হারু খোঁড়া কাঁচুমাচু হয়ে অভিযোগ করেছে কপোতাক্ষর বিরুদ্ধে। সব শুনে দৃঢ় অথচ চাপা কণ্ঠে নীলাক্ষ আউড়েছেন, কপোতের কথা আমার কাছে বলো না। বাবার মৃত্যুর পর আমরা ভিনো হয়ে গিয়েছি। আমাদের হাঁড়ি আলাদা, ঘর আলাদা। এমনকী চিন্তা-ভাবনাগুলোও আলাদা। ওই অমানুষটাকে আমি কিছু বোঝালে বুঝবে না। ও নিজেকে কমরেড মনে করে।

হারু খোঁড়া একথা শোনার পরে দ্বিতীয় কোনো কথা বলার সাহস পায়নি। আপোষের ঢোঁক গিলে সে মন দিয়েছে নিজের কাজে।

এ সময় নিমগাছের ছায়া বড়ো মধুর হয়। নিম হাওয়ায় রোগ-জ্বালা ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। সূর্যাঙ্ক জ্ঞান বাড়ার পর থেকে এই গাছটাকে দেখছে। এর বুঝি বয়স বাড়ে না, গতর বৃদ্ধি হয় না, এ যেন জরা নিরোধক ছাল পড়ে কালের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সূর্যাক্ষ রঘুনাথের দিকে তাৎপর্যপূর্ণ চোখে তাকাল, কি রে যাবি নাকি দ্বীপীদের ঘরে? মন চাইলে বল এখুনি নিয়ে যাবো তোকে।

রঘুনাথ সংকোচ আড়ষ্টতায় ভুগছিল, না, আজ থাক। পরে কুনোদিন আসবখন।

পরের কথা পরে হবে, এখুনি যাই। সূর্যাক্ষ কাতর হয়ে উঠল, জানিস কাল রাতে দ্বীপীর স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন দেখতে-দেখতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। সেই থেকে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। চল মাইরি। সূর্যাক্ষ রঘুনাথের হাত ধরে টানল।

.

০৭.

দ্বীপীদের বাড়িখানা পোড়ো বাড়ির মতোন, কতদিন যে চুনকাম হয়নি সময়ই তা জানে। বাড়ির সামনে দু’পাল্লা কাঠের দরজা, তাতে আলকারীর রঙ বর্ণ হারিয়ে সাদা জামা ঝুলকালিতে বোঝাই হয়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে। ঘরের সীমানার পাচিলটাও নোনা ধরা, বয়স্ক। ফ্যাকাসে লাল রঙের ইটগুলো দাঁত বের করে হাসছে। সূর্যাক্ষ দ্বিধাহীন হাতে বার কতক শেকলের বাড়ি দরজায় মারতেই কে যেন দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিল। সূর্যাক্ষর মন প্রজাপতি হয়ে উড়তে লাগল দ্বীপীকে দেখতে পেয়ে। কিছু বলার আগেই দ্বীপী কেমন নরম চোখে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে উঠল, কাল যে এলি না বড়ো, জানিস আমি কি ভাবছিলাম। ভাবছিলাম তোর সাথে কথা বলব না, রাগ করে থাকব।

সূর্যাক্ষর চোখ দুটো পোষা বেড়ালের চেয়েও অনুগত দেখাল, রাগ করিস না। দেখ আজ আমি কাকে সঙ্গে করে এনেছি।

দ্বীপী ভীতু চোখে লজ্জা মিশিয়ে তাকাল। রঘুনাথের চোখে সে চোখ ফেলতে পারল না। চোখ নিমেষে নামিয়ে নিয়ে ঠাকুর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

সূর্যাক্ষ কৌতুক হেসে বলল, ওকে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। ওর নাম রঘু, রঘুনাথ। ভীষণ ভালো ফুটবল খেলে। বাঁশি বাজায়। সময়-সুযোগ হলে তোকে একদিন বাঁশি বাজিয়ে শুনিয়ে যাবে। কি রে রঘু, বাজাবি তো?

রঘুও নিরুত্তর, দম না দেওয়া ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো স্থির হয়ে আছে। নট নড়ন চড়ন। সূর্যাক্ষ ওর পিঠে থাবড়া মারল, কি রে কথা বলছিস না কেন? বোবা হয়ে গেলি বুঝি?

বিরক্তির সঙ্গে তাকাল রঘুনাথ, কথা থাকলে তো বলব? আমার কুনো কথা নাই। সব কথা মুখে এটকে গেছে।

–কেন রে?

–সামনে যে দাঁড়িয়ে আচে তার জন্য। রঘুনাথ এবার সংযমের বেড়া ভেঙে হেসে উঠল।

দ্বীপী বলল, তোর বন্ধু তো বেশ রগড় জানে। কোথায় বাড়ি রে ওর?

সূর্যাক্ষ কিছু বলার আগেই রঘুনাথ বলল, বাঁধের ধারে বুনোপাড়ায়। হলদিপোঁতা ধাওড়ার নাম শুনেচ?

ঘাড় নাড়ল দ্বীপী, আমরা তো রোজ ওই বাঁধ ধরে ইস্কুলে যাই! স্কুলে যাবার সময়টা আনন্দের চামর বুলিয়ে দেয় দ্বীপীর চোখে-মুখে। বিরক্তি নয় বেশ মজা হয় তার। মজার পাশাপাশি এক বিমল আনন্দ ছুঁয়ে থাকে তাদের। গ্রাম থেকে ওরা এক সাথে বেরয়। বাঁধের গোড়ায় এসে সূর্যাক্ষ বলবে, দ্বীপী, এবার তুই ক্যারিয়ারের পেছনে ঝপাৎ করে বসে পড়। কত আর হাঁটবি।

প্রথম প্রথম দ্বীপীর লজ্জা লাগত, এখন সেই লজ্জা শরত শিউলির মতো ঝরে গেছে। সাইকেল গড়ালে শুরু হয় ওদের কথামালা। দ্বীপী মুখ তুলে শুধোবে, হ্যাঁরে সূর্য, তোর কষ্ট হয় না আমাকে নিতে?

-ধ্যুৎ তোকে নিতে আমার কষ্ট কি। তুই যা রোগা। বোঝাই যায় না বসে আছিস।

-হ্যাঁরে, আমি কি এতই রোগা? বল তো আমি কার মতো রোগা? দ্বীপীর চকচকে চোখে দুঃশ্চিন্তা, আমি কি ডমরু ক্ষ্যাপার চেয়েও রোগা নাকি?

ডমরু বিয়ে পাগলা, রোগা খিটখিটে ওর চেহারা, মেয়ে দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে যেন ঠাকুর দেখছে। ওর নামে পাড়ায় পাড়ায় একটা ছড়া ঘোরে।

ডমরু ক্ষ্যাপা, বউয়ের বাবা,/বউ আনতে কবে যাবা।/ বউ গিয়েছে বাপের ঘর। এঁড়ে গোরুর লেজ তুলে ধর।

ডমরুর চেহারাটা মনে পড়তেই হেসে ফেলল সূর্যাক্ষ। দ্বীপীর স্ফুরিত অধরোষ্ঠ কেঁপে উঠল, হাসছিস যে! একদম হাসবি নে। তুই হাসলে আমার একদম ভালো লাগে না।

হাসব না কি কাঁদব? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সূর্যাক্ষ।

দ্বীপী সাইকেল থেকে ঝপ করে নেমে পড়ে, ধুলো ছিটিয়ে হাঁটতে থাকে রাগের ঘোরে। সূর্যাক্ষ তার সামনে গিয়ে মুখ ভেংচে বেল বাজায়। এভাবেই পাঁচ পাঁচটা বছর কেটে গেছে ওদের স্কুল যাওয়া আসায়। পাড়াপড়শিরা ভাবে ওরা দুটিতে যেন ভাই-বোন। ভাই-বোন না হলে কি তুই-তুকারি সম্পর্ক হয়।

দ্বীপী একদিন জামা ছাড়ছিল ঘরের ভেতর, সূর্যাক্ষ পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে একেবারে অবাক। দ্বীপীর ছড়ানো পিঠটা একেবারে টকটকে ফর্সা, হালকা লালচে আভা ফুটে উঠেছে ত্বকের উপর। চোখ বটআঠায় আটকে যাওয়া বনি পাখির চেয়েও অসহায়। গলা খেঁকারি দিয়ে কেশে উঠতে পারেনি সে, যদি স্বপ্নটা শেষ হয়ে যায়-ভয় একটাই। দ্বীপী টের পেয়ে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়েছিল সূর্যাক্ষকে। লজ্জায় আরক্ত তার চোখ-মুখ, কী অসভ্য রে তুই?

-কেন কী হলো? সূর্যাও কম অবাক নয়।

দ্বীপী নাকের ছিদ্র বিস্ফারিত করে বলেছিল, মেয়েরা পোশাক বদলালে সেখানে কি ছেলেদের থাকা উচিত হয়?

-মা তো শাড়ি বদলায়। আমি তো দেখি।

–মা তো কিছু বলে না।

-তখন তুই ছোট ছিলিস। ছোটদের চোখে পাপ থাকে না। শিশুদের চোখ তো ফুলের চেয়েও পবিত্র। তুই বইতে পড়িস নি? দ্বীপী কুলকুল করে হেসে উঠল, খবরদার আর কোনোদিন আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবি না। তুই বড়ো হয়েছিস। আমিও বড়ো হয়েছি। এখন এসব ভালো দেখায় না। দ্বীপী হাই ইস্কুলের দিদিমণির মতো বলল কথাগুলো।

-তাহলে তুই যে আমার সাইকেলে বসে যাস, তখন! তখন যদি লোকে কিছু কথা বলে। দ্বীপীর মুখের গোলাপী আভা চিন্তায় মিলিয়ে গেল, লোকে বলতেই পারে। লোক কিছু বললে আমাদের সমঝে চলতে হবে। লোক যা বলবে তা আমাদের মানা উচিত।

আমি লোকের কথা মানি না। আমি শুধু তোর কথা মানব। বল দ্বীপী, আমার জন্য তোর মন খারাপ করে কি না?

দ্বীপীর কানের লতি লজ্জায় জবাফুলের মতো লাল হয়ে উঠল, তার মুখে কোনো ভাষা নেই, তার বুকের ভেতর শুশনিপাতার ঢেউ উঠল, কলজেটা গুড়ল পাখির মতো ডেকে উঠল গুড়গুড়িয়ে, সাবুদানা ঘাম বিজবিজিয়ে উঠল কপাল জুড়ে, কেঁপে কেঁপে উঠল চোখের তারা, ওর সিল্কি মুখে পিছলে যেতে লাগল জীবনের প্রথম রোদ্দুর, কোনোমতে ঠোঁটের কোণটা কামড়ে সে উদাস হয়ে গেল।

সূর্যাক্ষ খপ করে তার হাতটা ধরে মুচড়ে দিল জোর করে, তুই মিথ্যুক, ভীষণ স্বার্থপর। নিউটনের সূত্র বলছে–প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। তাই যদি হয় তাহলে তোর জন্য আমার মন খারাপ করলে তোরও আমার জন্য মন খারাপ করবে। আরে, এ তো এ প্লাস বি হোলস স্কোয়ারের ফরমূলার চাইতেও সোজা। তুই এটাকে ভুল প্রমাণ করবি কি করে?

–আমার হাতটা ছেড়ে দে সূর্য, লাগছে।

–লাগুক। লাগার জন্য তো ধরেছি।

–মেয়েদের হাত আর মন নরম হয় জানিস না বুঝি?

-কথা ঘোরাস না, সোজা কথার সোজা জবাব দে। সূর্যাক্ষ রীতিমতন উত্তেজিত, তুই যদি আমাকে কোনো জবাব না দিস তাহলে আমি আর কোনোদিন তোর বাড়িতে আসব না।

-না এসে থাকতে পারবি তো? আহ্লাদী গলায় প্রশ্ন করল দ্বীপী।

–আমাকে রাগাস না, আমি সব পারি।

–আমিও সব পারি।

–পাক্কা?

-পাক্কা। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে দ্বীপী হাসছিল। ওর রক্তবর্ণ পঞ্চদশী ঠোঁট পাকা তেলাকচুর মতো আহ্বান করছিল সূর্যাক্ষকে। সূর্যাক্ষ সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে ডানে বাঁয়ে তাকাল, তারপর দ্বীপীকে পাগলের মতো নিজের কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তুই আমার সঙ্গে না মিশলে আমি মরে যাবো দ্বীপী, আমি আর একটা লাইনও পড়তে পারব না। তুই আমার পড়া, তুই আমার খেলা, তুই আমার ঘুম সব। আমাকে ভুলে যাস না দ্বীপী। তুই ভুলে গেলে দেখবি আমি ডমরু পাগলার মতো মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

-কী ভাবছিস? দ্বীপীর ডাকে হুঁস ফিরে এল সূর্যাক্ষর। এমন ছেলেমানুষী তার ভেতরে মাঝে মাঝে ভর করে। সত্যি দ্বীপী এখন তার জীবনে প্রদীপের আলোর মতো। দ্বীপীকে সে কখনো খারাপ ভাবতে পারে না। দ্বীপীও তাকে নিকট বন্ধুর মতো দেখে সব সময়।

-তোর বন্ধু এল, ওকে ঘরে নিয়ে যাবি না বুঝি? দ্বীপী হাসতে হাসতে বলল, চল, ঘরে গিয়ে বসি। আজ নারকেল মুড়ি খাওয়াব। জানিস ভোরবেলায় গাছ থেকে একটা ঝানু নারকেল পড়েছে। বাবা মন্দিরে যাওয়ার আগে ছাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে ওটা। ভালোই হল নারকেলটা তোদের খাওয়াতে পারব।

দ্বীপী ওদের ঘরে বসিয়ে চলে গেল।

চন্দ্রিকা দ্বীপীর মা। কাঁসার জামবাটি ভরে মুড়ি আর নারকেল নিয়ে এলেন তিনি। রঘুনাথকে দেখে তিনি স্মিত হাসলেন, একটা জামবাটি তিনি রঘুনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নাও বাবা, মুড়িগুলো খেয়ে নাও। আমি দুধ পাঠিয়ে দিচ্ছি দ্বীপীকে দিয়ে। দুধ মুড়ি খেলে পেটে কিছুক্ষণ থাকবে।

চন্দ্রিকা চলে গেলেন। দ্বীপী এল দুধভর্তি কাচের গ্লাস হাতে। রঘুনাথের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে সে বলল, আমাদের পোষা গোরুর দুধ। সব মিলিয়ে তিনটে আছে। তিনটেই পালা করে দুধ দেয়।

রঘুনাথ কাচের গ্লাসটা ধরে নিয়ে দ্বীপীর দিকে তাকাল। মানুষ এত সুন্দর হতে পারে তার ধারণা ছিল না। দ্বীপীর মুখের গড়ন অনেকটা বাঁশ পাতার মতন, কথা বললে, হাসলে সুন্দর টোল পড়ে গালে। ঈদের চাঁদের মতো ওর চেহারাটা মেদহীন, পিঠ ছাপানো চুলগুলো ঢেউ খেলানো, অনেকটা কালো দিঘির জলের মতো ধারাবাহিকভাবে সাজানো। কখনোই দ্বীপী রোগা নয় বরং সে সাজানো-গোছানো সোনালি বালির চর।

দ্বীপী ঘরে এসে একটা কাঠের টুল টেনে নিয়ে ওদের মুখোমুখি বসল। খাওয়া থামিয়ে রঘুনাথ বলল, একদিন আমাদের ঘরে এসোখন। আমার মার সাথে তুমার আলাপ করিয়ে দেবখন। তুমারে দেখলে মা ভেষণ খুশি হবে। মা তুমার মতন সোন্দর মেয়েছেলে কুনোদিন দেকেনি।

সুতলি দড়ি দিয়ে টাঙানো ছিল দ্বীপীর ঘরের তিনটে জানলার পর্দা। ছাপা শাড়ি কেটে বানানো পর্দাগুলোর রঙ জ্বলে গেছে রোদ-হাওয়ায়, তবু বাতাস এলে ওগুলোই ফড়ফড়িয়ে ওড়ে, ঝলকে-ঝলকে আলো ঢুকে আসে বিনা বাধায়, মন্দ লাগে না দেখতে।

শিবমন্দিরের একমাত্র পুরোহিত হিসাবে বেশ নাম ডাক আছে দেবোত্তরের। তার নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা এবং ব্যক্তিত্ব সবার নজর কাড়ে। তবে পয়সার দিক থেকে মানুষটা একেবারে নুয়ে আছেন। পরপর তিন মেয়ে তাঁর জীবনে হতাশার সৃষ্টি করেছে, সে হতাশার কথা মাঝে মাঝে চন্দ্রিকার কাছে প্রকাশ করে তিনি ধমক খান। চন্দ্রিকা ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত হয়ে বলেন, এ যুগে ছেলে-মেয়ের ফারাক দেখতে যেও না। এখন ছেলে-মেয়ে সব সমান, দু-চোখের তারার মতো।

মেয়েগুলোকে মানুষ করার চেষ্টা করেছিলেন দেবোত্তর, কিন্তু শুধু দ্বীপী ছাড়া আর দুটি মেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ হতে দিল না। বড় মেয়ে লহরী স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে টেনে-টুনে। সে আর প্রি-ইউনিভার্সিটি পড়তে চাইল না নিজের ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে। একটা পাশ করেই সে স্থিতু হয়ে বসে আছে ঘরে, গ্রাম ছেড়ে বাইরে বেরতে তার তীব্র অনীহা, মাঝেমধ্যে সে দেবোত্তর সঙ্গে শিবমন্দিরে গিয়ে বিড়বিড় করে আপনমনে। দেখতে শুনতে সে মন্দ নয়, চোখ নাক মুখ আকর্ষণীয়, তাই দু-চারটে সম্বন্ধ আসছে এদিক-সেদিক থেকে। পাত্রপক্ষের মেয়ে পছন্দ হলেও বিয়ে হচ্ছে না দেনা-পাওনার জন্য।

ঊর্মি একটু কম কথা বলে, সে পড়াশোনায় ভালো ছিল কিন্তু অসুখ ওর পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়। প্রায় দিন সে শারীরিক কারণে স্কুলে যেতে পারত না, স্কুলে গেলেও বাড়িতে এসে তার পড়ার শক্তি থাকত না। ফলে সে বাধ্য হয় লেখাপড়ায় ইতি টানতে। দ্বীপী তিন বোনের মধ্যে সব চাইতে পড়াশোনায় ভালো, ওর স্মৃতিশক্তি প্রখর–একবার পড়লে সব মনে থেকে যায়। সে এবার সায়েন্স নিয়ে ক্লাস টেনে উঠেছে, সূর্যাক্ষ তার সহপাঠী। ওরা এক সঙ্গে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি পড়ে। দুজনে ঘন্টার পর ঘন্টা এক সঙ্গে অঙ্ক করে। পড়াশোনায় ওদের অমনোযোগ লক্ষ্য করেনি কেউ। দ্বীপীর খুব ইচ্ছে সে বড়ো হয়ে রিসার্চ করবে কেমিস্ট্রি নিয়ে, তা যদি না হয় তাহলে সে ব্যাঙ্কে চাকরি করতে চায়, কেন না তার মামা প্রায় বলেন, ব্যাঙ্কের মাইনে অন্যান্য সরকারি সংস্থার চাইতে ঢের বেশি। বাবার দুঃখ দূর করতে হলে দ্বীপীর অনেক টাকা দরকার। ইদানীং তার পড়ার চাপ বেড়েছে প্রচণ্ড, সে সময় পায় না তাই ভোরবেলায় উঠে মনোযোগ দিয়ে পড়তে বসে। দেবোত্তর ছোট মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

দ্বীপী লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হলে দুঃখ ঘুচবে দেবোত্তরের। চন্দ্রিকাও দ্বীপীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোট মেয়েকে নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। আর যাই হোক দ্বীপী তাদের মনে দুঃখ দেবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সে সহজভাবে মানিয়ে নেবে। সেই ক্ষমতা তার আছে।

দ্বীপীদের বাড়ি থেকে বেরতে ন’টা বেজে গেল। গাঙধারের আখ খেত থেকে হাঁক ভেসে এল পেয়াদার। এখন খটখট করছে আকাশ, কোথাও এক চিলতে মেঘের দেখা নেই। বাতাস জড়িয়ে ধুলো উড়ছে সর্বত্র। আর কতদিন প্রকৃতিতে ধুলো খেলা চলবে বুঝতে পারল না সূর্যাক্ষ। রোদ বাড়লে স্কুলে যেতে কষ্ট হয়। ছাতা নেওয়া তার পোষায় না। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ক্যারিয়ারে দ্বীপী, এই তিনের সমন্বয়ে খেলাটা বড়ো কঠিন হয়ে যায়, একটু অমনোযোগ হলে দুর্ঘটনা ঘটতে বেশি সময় লাগবে না।

দ্বীপী তার সঙ্গে থাকলে বুকে বল পায় সূর্যাক্ষ। তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি হয়ে গেলে তারা মোকামপাড়ার রাস্তাটা ধরে ফিরতে ভালোবাসে। নির্জন রাস্তা দ্বীপীর খুব পছন্দ। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ও কুটকুট করে কথা বলে। পণ্ডিত বিলের জলে গড়িয়ে যায় তার মাধুর্য-ভরা কণ্ঠস্বর। সূর্যাক্ষ তাকে তাতিয়ে দেবার জন্য বলে, জানিস তো, বিলের বালিহাঁসগুলো তোর চাইতে দেখতে সুন্দর। আমার ওদের ভালোবাসতে ভীষণ ইচ্ছে করে। দ্বীপী রাগে না, শুধু মসৃণ কাঁধটা ঝাঁকিয়ে ঠোঁট ওলটায়, জানিস তো তোর চাইতে আমবাগানের হনুমানগুলো আরও সুন্দর। ওদের পোড়ামুখ ঠিক তোর মতন। তবে ওদের ঝকঝকে দাঁতগুলো তোর মতন হলুদ আর ছাতা ধরা নয়। ওরা তোর চেয়েও ভদ্র।

–তুই এসব আমার নামে বলতে পারলি?

-কেন বলব না, তুই থুতু ছিটালে আমি কি তোকে ফুল ছিটাবো? দ্বীপী গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, আমি গান্ধীনীতিতে জীবন কাটাতে পছন্দ করি না। আমার আদর্শ সুভাষচন্দ্র। কেউ যদি আমাকে চড় মারে, আমি তাকে অবশ্যই ঘুষি মারব।

-কী মেয়েরে বাব্বা! সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল সূর্যা।

দ্বীপী তোয়াক্কাহীনভাবে বলল, মেয়ে বলে ভাবিস না চিরটাকাল তোদের কথা শুনব। তুই ঠিকই বলেছিস আমি হলাম বালিহাঁস! কেন জানিস? বালিহাঁস ভীষণ চালাক। অনেক সময় জাল ফেলেও ওদের ধরা যায় না।

বিলের জল সোজা কোমর দুলিয়ে নাচের মুদ্রায় চলে গিয়েছে জগৎখালি বাঁধ বরাবর। একটা সুইচ-গেট আছে জল এদিক-ওদিক যাবার জন্য। বর্ষায় বিল ভরে গেলে বাঁধের পাহারাদার চাবি ঘুরিয়ে গেট খুলে দেয়। জল তখন ছুটতে থাকে কমলাবেড়িয়ার দিকে। এখন রোদ গায়ে মেখে জলো শ্যাওলা বুকে নিয়ে জল চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আকাশমুখো। নাকছাবির চেয়েও সুন্দর ঘেসো ফুল জড়িয়ে ধরেছে জলের কোমর। কনে সাজানোর মতো যেন সেজে উঠেছে পুরো পণ্ডিত বিল। একবার দেখলে তার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় না।

বেশির ভাগ দিন এ পথ দিয়ে গেলে সাইকেলে বসতে চায় না দ্বীপী। সূর্যাক্ষ কিছু বললে ভ্রূ তুলে তাকায়, এত জল এ তল্লাটে এ সময় আর কোথাও নেই। জলের পাশে হাঁটতে আমার ভালো লাগে, যদিও মা বলে আমার নাকি জলে ফাড়া।

সূর্যাক্ষ সকৌতুক হাসে, তুই এসব বিশ্বেস করিস? অমলকান্তি স্যার বলছিলেন গ্রামে বিজ্ঞান সচেতনতার উপর ঘরোয়া একটা অনুষ্ঠান করবেন। আমি বললাম হলদিপোঁতায় করলে কেমন হয়? স্যার ভেবে দেখছেন।

–অমলকান্তি স্যার মনে হয় খুব রাগী। দ্বীপী মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করল, স্যার বলছিলেন আমাদের ভারতবর্ষের অনেক মানুষই নাকি এখনও পেট পুরে খেতে পায় না।

তোর কোনো সন্দেহ আছে? সূর্যাক্ষ দ্বীপীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। বাঁধের কাছে এসে সূর্যাক্ষ মন খারাপ করে বলল, এবার আমাকে ঘরে ফিরতে হবে রঘু, তুই এবার একা চলে যা। যদি সময় পাই বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করব। আর হ্যাঁ, শোন কোনো দরকার হলে তুই আমাকে অবশ্যই বলবি। সবসময় ভাববি আমি তোর পাশে আছি।

রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই সূর্যাক্ষ ফিরে যাচ্ছিল সাইকেল নিয়ে। সেই সময় হঠাৎ মাঠ থেকে ধুতি পরা অবস্থায় উঠে এলেন নীলাক্ষ। রঘুনাথের দিকে তর্জনী উঠিয়ে বললেন, ওই বুনোদের ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো? জানো কি ওর স্বভাব-চরিত্র ভালো নয়। কাল আমার মুখে মুখে তর্ক করছিল পুকুরপাড়ে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, পেটে কালির আঁচড় নেই, কত আর ভদ্র হবে। সূর্যাক্ষ কি জবাব দেবে ভাবছিল। নীলাক্ষ তড়িঘড়ি করে বললেন, ওর সাথে মিশবে না। ওদের সঙ্গে যদি সম্পর্ক রাখতে হয় তাহলে দূর থেকে রাখবে। উপর উপর হ্যাঁ-হুঁ বলে ছেড়ে দেবে। তোমার বাবার মতো আবার গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ো না।

সূর্যাক্ষ বিরক্তি হজম করে তাকাল। কপোতাক্ষর অপমান তার গায়ে ফোসকা ফেলে। অমলকান্তি স্যার তার বাবাকে দেবতার চোখে দেখেন। অথচ তার নিজের দাদা ছোটভাইকে হেয় করছে। এদের যে কী বিচার সঠিক বুঝতে পারে না সূর্যাক্ষ। সে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ততা তৈরি করল, জেঠু, আমি এখন যাই। আমাকে আবার স্কুল যেতে হবে। সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল সূর্যাক্ষ, আর তখনই নীলাক্ষর গলা ফাঁকা জায়গায় গমগমিয়ে উঠল, শোন তোমার এবার কোন ক্লাস হলো?

ঘাড় ঘুরিয়ে পাংশু মুখে সূর্যাক্ষ জবাব দিল, ক্লাস টেন।

–বেশ, বেশ। মাথা দোলালেন নীলাক্ষ, কপালে অবাঞ্ছিত ভাঁজ, শোন, যে কথা বলার জন্য তোমাকে আটকে দিলাম। ওই যে শিব মন্দিরের পুরোহিতটা, কী যেন নাম, ওঃ মনে পড়েছে দেবোত্তর ঠাকুর, ওর মেয়েটার সাথে বেশি মিশবে না। আমি শুনেছি তোমার নাকি ওদের বাড়িতে যাতায়াত বেড়েছে। এটা ভালো কথা নয়। গ্রামে থাকি। সব কথা আমার কানে আসে। তুমি আমাদের বংশের ছেলে। আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়।

খুব অসহায়ভাবে সূর্যাক্ষ বলল, দ্বীপী আমার সঙ্গে পড়ে। ও তো সায়েন্স নিয়েছে। আমার চাইতে পড়াশোনায় ভালো। আমরা দুজনে একসঙ্গে অঙ্ক করি।

-কেন তোমার বাবা কি তোমাকে মাস্টার দিতে পারেনি? ঝাঁঝালো গলায় অবজ্ঞা মিশল নীলাক্ষর।

সূর্যাক্ষ পরিস্থিতিকে সামাল দেবার জন্য বলল, না তা নয়। বাবা টিউশনি দিতে চেয়েছিল আমারই সময় হয় না। এতদূর থেকে কালীগঞ্জে গিয়ে টিউশানি পড়া পোষায় না। যাওয়া-আসায় অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।

-তা ঠিক তবে পড়াশোনার প্রতি আরও যত্নশীল হও। তোমার দাদা রুদ্র সেন্ট পল’এ ভর্তি হয়েছে একথা কি তুমি জানো? সন্তান গর্বে নীলাক্ষর চোখ-মুখ ঝকঝকিয়ে উঠল, রুদ্রের মতো ছেলে এ গ্রামে আর একটিও নেই। তুমি চেষ্টা করো দাদাকে ছাপিয়ে যাওয়ার।

–আমার স্মৃতিশক্তি কম।

-বেশি ঘোরাঘুরি না করলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে। মনটাকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করো। দেখবে তাহলে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। নীলাক্ষ জ্ঞান দেবার ভঙ্গিতে বললেন কথাগুলো। অসহিষ্ণু সূর্যাক্ষ অস্থির হয়ে বলল, জেঠু, এবার আমি যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।

যাও, তবে ওই পুরোহিতের মেয়েটাকে সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে যাবে না। মনে রাখবে তুমি ওর সহপাঠী, ওর চাকর নও।

মুখটায় হঠাৎ কেউ বুঝি ছিটিয়ে দিল দোয়াত ভর্তি কালি, সূর্যাক্ষ কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল নিজের কালিমায় ভরা মুখের কথা চিন্তা করে।

নীলাক্ষর আরও কিছু বলার ছিল। তিনি এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন সূর্যাক্ষের কাছে। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, তিতির বেলডাঙা কলেজে পড়তে যায়। ওর কলেজ যেতে খুব আগ্রহ। আমি শুনেছি কালীগঞ্জের একটা ছেলে ওর পেছনে লেগেছে। ও তোমার দিদি হয়। একটু খেয়াল রেখো। কোনো খবর থাকলে আমার কাছে গোপন করবে না। থানার ও.সি. আমার বন্ধু। আমি ভাবছি বেণীমাধবকে দিয়ে ছেলেটাকে একটু টাইট দিতে হবে। ঘি আর আগুনের কারবার। বলা যায় না তো কখন বিপদ ঘটে যায়!

নীলাক্ষ চলে যাওয়ার পরও হাঁটতে পারছিল না সূর্যাক্ষ। এলোমেলো কথাগুলো বিষাক্ত পোকার মতো দংশন করছে মাথার ভেতর। এত বয়স হল তবু মানুষটার কোনো রুচিবোধ জন্মাল না। একটা সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব তার ভেতরে ঘোলা জলের মতো বিরাজমান। কপোতাক্ষর সঙ্গে এই প্রবীণ মানুষটির কত অমিল। চিন্তাভাবনায়, মন মানসিকতায় দু’জন দুই মেরুর বাসিন্দা। কপাল টিপে দূরের বাঁধের দিকে তাকাল সূর্যাক্ষ। রঘুনাথকে আর এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। রোদের মধ্যে একলা হেঁটে যাচ্ছে রঘুনাথ। সূর্যাক্ষ ভাবল-কপোতাক্ষ কি ওদের মাথায় ছাতা হতে পারবেন?

.

০৮.

অশ্বত্থতলায় ভিড় লেগে থাকে সবসময়। পাড়ায় বউ-ঝিরা এসময় জল আনতে যায় বুড়িগাঙে। কেউ কেউ প্রাতঃকৃত্য সেরে গা ধুয়ে ঘরে ফেরে। এই বুড়িগাঙ আছে বলে অনেকের ভরসা। স্রোত থেমে গেছে, তবু তো গাঙ। বর্ষায় এর দাপট দেখলে ভয় হয়, পিলে চমকে যাবার উপক্রম। দুর্গামণি একবার ভরা বর্ষায় ভেসে যাচ্ছিল স্রোতের তোড়ে। দুলাল ডিঙা নিয়ে গিয়ে তাকে বাঁচায়। তা যদি না হত তাহলে একেবারে মানিকডিহির গাঙে গিয়ে পড়ত দুর্গামণি। ওখানে জলের স্রেত মুখে গাঁজরা নিয়ে ছোটে। বড়ো বড়ো নৌকা পারাপার হয় সব সময়। কেননা নতুনগ্রাম যেতে হলে এ জল পেরতে হবে সবসময়।

রঘুনাথ পাকুড়তলায় এসে দাঁড়াল। একটা ঘোরের মধ্যে কতগুলো ঘন্টা তার কেটে গেল। সেই আচ্ছন্নতা এখনও হেমন্তের শিশিরের মতো তাকে লেপটে আছে। ঘটনাগুলো ভিড় করে একের পর এক মনে আসছে, আর অমনি তার মনের ভেতরে এক বিরাট পরিবর্তন, বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। এসব অনুভব সে তার মাকেও বলে বোঝাতে পারবে না। দুর্গামণির এত বোঝার ক্ষমতা কোথায়? তার সরল সাদাসিধে মন তো পাকা আতার মতো, একটু চাপ দিলে ভেঙে যায়।

রঘুনাথ দুলালকে দেখতে পেয়ে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেল, কাকা, তুমার সাথে দাদুর কি দেকা হয়েছে? দাদু তুমাকে পাগলের মতোন খুঁজছিলো।

-আমি খপর পেয়েছি ভাইপো, কিন্তু এখুনো তার সাথে আমার দেখা হয়নি। মেয়েটাকে লিয়ে আমার এখুন মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলদশা। বিয়ের এত বছর পরে জামাই আবার সাইকিল চাইচে। কুথায় পাবো ভাইপো, তুই তো আমার অবস্থা লিজের চোক্ষে দেকচিস!

রঘুনাথ সমব্যথীর চোখে তাকাল। সহসা তার মনে পড়ে গেল কপোতাক্ষর কথা। ওই মানুষটা পারেন এই বিপদ থেকে দুলালকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কী ভেবে রঘুনাথ কোনো কথা বলার উৎসাহবোধ করল না। সে অস্ফুটে প্রশ্ন করল, কাকা, বাবা কেমুন আচে? তার খপর সব ভালো তো?

গুয়ারামের জন্য রঘুনাথের মনটা মাঝে মাঝে উতলা হয়ে ওঠে, ঝড়ে নুইয়ে যাওয়া ধানচারার মতো অবস্থা তখন। দুর্গামণি চুনারামের সামনে গুয়ারামের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে না, মনটা কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকে, সংকোচ হয়। একসময় তার মনে হয় মানুষটার সঙ্গে গেলে বুঝি ভালো হত। তাহলে এত চিন্তা মনটাকে খুবলে খেত না। কদিন থেকে গুয়ারামের স্বপ্ন দেখছে দুর্গামণি। না জানি কেমন আছে সে। দুলালের সঙ্গে দেখা হলে ভালো হত। দুলালের আসার সংবাদ সে পেয়েছে কিন্তু তার দর্শন সে এখনও পায়নি। দুলালকে খবর পাঠিয়েছে চুনারাম। সময় বের করে সে নিশ্চয়ই আসবে, কথাবার্তা হবে। গুয়ারাম চুনারামের একমাত্র লাঠি যা শেষ বয়েসে হাত ধরে তাকে অনেকটা পথ নিয়ে যাবে।

দুলাল একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল বাতাসে, তোর বাপের খপর ভালোই তবে সে মাঝখানে জ্বরজ্বালায় ভুগল। ওদিককার হাওয়া-বাতাস ভালো নয়রে। গায়ে সয়ে যেতে টেইম লাগবে। তাছাড়া জল বদলের সাথে সাথে মানুষের মনও বদল হয়। জলবদল মানিয়ে নিলেও মনবদল মানিয়ে নিতে সময় লাগে।

-এখুন কেমুন আচে সে? রঘুনাথের চোখে উৎকণ্ঠা গড়িয়ে পড়ল।

-বললাম তো ভালো আচে। চিন্তার কুনো কারণ নেই। দুলাল এত জোর দিয়ে কথাগুলো বলল যেন সে এই প্রশ্নে কিছুটা বিরক্ত।

-তুমি কবে যাবে গো, কাকা?

–দেকি কবে ও দেশের মাটি টানে! ফ্যাকাসে হাসি দুলালের ঠোঁটে ঝুলে রইল, মাটি না টানলে কিছু হবার নয়। মানুষের কি সাধ্যি মাটিকে এড়িয়ে চলে।

দুলাল হঠাৎ-ই যেন দার্শনিক হয়ে গেল।

রঘুনাথ বলল, কাকা, একবার সময় হলে ঘরের দিকে এসো। মা’র সাথে দেকা করে যেও। দাদুও খুব চিন্তায় আচে।

দুলাল রঘুনাথের কথাকে পাত্তা দিল না, পোড়া বিড়িটা ধুলোর ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সে বেজার মুখে বলল, আমারও মনটা ভালো নেই ভাইপো। মেয়েটার জন্যি ভারী চিন্তা হচ্চে। জামাই বাছাধনকে আমার বিশ্বেস নেই। কখন মেয়েটার কী ক্ষতি করে ফেলে! যা যুগ পড়েচে, এখুন কুনো ক্ষতি হয়ে গেলে পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই।

কাজ কামাই করে ঘর আগলে পড়ে আছে দুলাল। ইন্দুবালারও মন সায় দিচ্ছে না কাজে যাওয়ার। বিন্দু তাদের একমাত্র সন্তান। ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসলে সারা জীবন পথে বসে কাঁদতে হবে। তখন চোখের জল মুছিয়ে দিতে কেউ আসবে না। জামাই শ্রীকান্ত বিন্দুকে বড়ো জ্বালায়, খোঁটা দেয় গরীবিয়ানার। বিন্দু এসব সহ্য করতে পারে না, সে অঝোর নয়নে কাঁদে। শ্বশুরঘরে তার চোখের জল মুছিয়ে দেবার কেউ নেই। বিন্দুর এই বিবশতার সুযোগ নিতে চায় শ্রীকান্ত। সে ধাওড়াপাড়া ছেড়ে পালিয়ে যায় শহরে। ওখানে নাকি ওর বন্ধু থাকে। শ্রীকান্তর কথাবার্তা সন্দেহজনক। চালচলনও ভালো লাগছে না বিন্দুর। মানুষটা নিশ্চয়ই খারাপ মানুষের খপ্পরে পড়েছে নাহলে থানা থেকে পুলিশ কেন আসবে তার খোঁজে? পুলিশ আসার পর থেকে শ্রীকান্ত পলাতক। তার নাকি এখন প্রচুর টাকার দরকার। টাকা হলে কেস সব মিটে যাবে, সে আবার মাথা উঁচু করে গ্রামে ফিরতে পারবে, পুলিশও তার পিছু ছেড়ে দেবে।

এত টাকা কোথা থেকে আসবে দুলাল ভেবে পেল না। তার ভাগ্যটাই ছোট থেকে পোকায় কাটা। ভূষণী তার জন্মদাত্রী মা কিন্তু এই মাকে সে কি কোনোদিন ক্ষমা করতে পেরেছে? নাকি ক্ষমা করা যায়?

ধাওড়াপাড়ার সবাই জানে দুলালের বাপ দয়াল কেমন মাটির মানুষ ছিল। তার ভালোমানুষীর পুরস্কার সে পেয়ে গিয়েছে। ভূষণীকে মন দেওয়ার পর থেকে সে পাগল হয়ে গিয়েছিল ড্যাং-ডেঙে বাস্তুতলার মেয়েটার জন্য। ভাদু পরবে ভূষণী নজর কেড়েছিল তার, ডুরে শাড়ি পরে ঝকঝকে আলোয় ভূষণী যেন বিয়ে বাড়ির ঝাড়বাতি। ভাদু পরবের মেলায় ওদের আলাপ হল, সেই আলাপ গড়িয়ে গেল পুতুলনাচের আসর অবধি। লায়লা-মজুনর পালা দেখে মজনুর জন্য চোখের জল ফেলেছিল ভূষণী, তার কাঁচা মনের পরিচয় দিয়ে বলেছিল, আমারে লিয়ে পেলিয়ে চলো, তুমারে ছাড়া আমি আর থাকতে পারচি নে। এর চেয়ে বেশি ব্যথা দিলে মরে যাবো গো। ভাদুপরবে আলাপ, তার দু-মাস পরে ভূষণীর হাত ধরে গাঁয়ে ঢুকেছিল দয়াল। মেয়েমানুষের রূপ দেখে সেদিন হাঁ হয়ে গিয়েছিল গাঁয়ের মানুষ, কেউ কোনো বিরুদ্ধ রা কাড়ার সাহস দেখাল না। সবাই আড়ালে আবডালে বলল, দয়ালটার বউভাগ্য চকচকে তবে দেখো কতদিন এই সোনা গরিবের ঘরে চকচকায়। মেয়েমানুষ বুড়িগাঙের জলের মতোন, আজ এখানে কাল সিখানে। এরা কোকিলা পাখির মতোন স্থিতু হতে জানে না, শুধু এ-ডালে সে-ডালে উড়ে বেড়ায়। বিয়ের হলুদ ফিকে হতেই দয়াল সকাল হলেই ছুটে যেত জনমজুর খাটার জন্য। না খাটলে পয়সা দেবে কে? মুখ দেখে তো কামাই হয় না। এভাবেই অভাবের সংসার চলছিল গড়িয়ে গড়িয়ে। তিন বছর পেরিয়ে গেল বিয়ের তবু ভূষণীর গতর ভারী হল না। পাড়ার বউরা তাকে পাকুড়তলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে বোঝাল, কিরে ভূষণী, এক বেছানায় নিদ যাস তো? তোর বরটা কেমুন রে, এখনও কুনো ফল দিল না। ফুল হবে না, ফল হবে না শুধু শুখাগাছ নিয়ে কী লাভ?

সেই থেকে চিন্তাটা মাথায় ফুট কাটছিল ভূষণীর। কত রাত যে ভোর হল তবু সেই রাতের ফসল শরীরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করল না। তাহলে কি তার শরীরটা খরার মাটি, দানা ছড়ালেও ফসল ফলে না? কপালে চিন্তার ভাঁজ, ভূষণী রাতে ঘুমাতে পারে না। নাগরা বাজিয়ে দয়াল ফেরে অনেক রাতে, ফিরেই সে ভূষণীর উষ্ণতা চায়। ভূষণী মুখ ঝামটায়, যাও গান-বাজনা নিয়ে মেতে থাকো গে, আমাকে দেখার তুমার সময় কুথায়। ভাবছি-কাল থিকে আমি তুমার সাথে কাজে যাব। ঘরে আমার মন ধরে না। সময় শিল-নোড়ার মতো বুকের উপর চেপে বসে।

সাহেব মাঠে তখন কাজ চলছে, আখ ঝোরার কাজ। আখ কেটে আলসে সাফসুতরো করে আঁটি বাঁধা। মিল কোম্পানীর ট্রাক্টর এসে নিয়ে যাবে। মিলবাবু নীলকণ্ঠ কাজ দেখাশোনা করে মন দিয়ে। মুনিষ যাতে কাজে ফাঁকি না দেয় সেইজন্য তিনি আলের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কালীগঞ্জ বাজারে তার কোঠাদালান, ঘরে রূপসী বউ সুবর্ণা। বউ রূপসী বলে সংসারে খিটিমিটি লেগে আছে। নীলকণ্ঠবাবুকে সুবর্ণা পাত্তা দিতে চান না, জুতোর শুকতলা বানিয়ে রাখতে চান। নীলকণ্ঠবাবু মেনে নিতে পারেন না এই অত্যাচার। সুবর্ণাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে বলেন, তোমার মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। যাও না কদিন বাবার কাছ থেকে ঘুরে আসো।

সুবর্ণা ভ্রূ-কুঁচকে তাকাল, আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো? যদি যাই তাহলে আর আসব না। পায়ে ধরে ডাকলেও আসব না। আমার বাবা-দাদার সাধ্য আছে আমাকে বসে খাওয়ানোর।

সুবর্ণা মনের জ্বালা মেটাতে চলে গেলেন। বড়ো একা হয়ে গেলেন নীলকণ্ঠ। ঘরে মদ খেতেন গলা পর্যন্ত। সুবর্ণার অনুপস্থিতি রুক্ষ করে তুলত তার মেজাজ। যত দিন গেল শরীরের ক্ষিদেটা পদ্মানদীর জলের মতো ফুঁসতে লাগল। সুবর্ণাকে চিঠি লিখলেন তিনি, ফিরে এসো। যা হবার হয়েছে। আমি আর পারছি না।

সুবর্ণা এলেন না, জেদ ধবে থাকলেন শহরের মাটিতে।

মিল কোম্পানীর কাজে কামাই করা পছন্দ করেন না নীলকণ্ঠবাবু। রোজ সাইকেল নিয়ে তিনি মাঠে যাবেনই যাবেন। সেদিন কাজ হচ্ছিল পশ্চিমধারের আখক্ষেতে। দয়াল আসেনি, কোন গাঁয়ে তার কীর্তন আছে, সেখানে তাকে ঝাল করতাল বাজাতে হবে। খোলওয়ালা না এলে গলায় ঝুলিয়ে নিতে হবে পোড়ামাটির খোল। সব বাদ্যযন্ত্র দয়ালের হাতে পড়লে পোষা বেড়াল। দয়ালও বাজায় খুব নিষ্ঠা সহকারে। শরীর নিংড়ে সুর বের করে।

ভূষণী আখের ভূঁইয়ে কাজ করছিল। আলের উপর দাঁড়িয়ে ভূষণীর যৌবন দেখছিল নীলকণ্ঠ। একটু আগে সে নেশা করেছে, ফলে ঘোর ঘোর দৃষ্টি। ভূষণীর শরীরের বাঁধন গঙ্গামাটির মতন ঢিলেঢালা নয়, বরং ওর শরীরের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে পুরুষের নোঙর করা মন। সুবর্ণার এত অহঙ্কার কিসের? ওর গায়ের চামড়া ফর্সা বলেই কি? যতই ফর্সা হোক সুবর্ণা, ভূষণীর কাছে সেই রঙ চুনকাম করা দেওয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। ভূষণীর মাজা রঙে লালিত্য মাগুরমাছের ত্বককেও হারিয়ে দিচ্ছে। ও হাসলে বাবলাগাছে ঝুমা ঝুমা ফুল ফুটে ওঠে অজস্র। আর সেই হলুদফুল বাড়িয়ে দিচ্ছে রোদের নম্রতা। নীলকণ্ঠ ভূষণীর দিকে কাঁপা চোখে তাকিয়ে ধরা পড়ে গেল। ভূষণী হাসতে হাসতে বলল, বাবু, তুমার লিখা হয়েছে গো। যাও, ঝটপট ঘর চলি যাও। ঘর গিয়ে মাথায় ঠাণ্ডা তেল জেবড়ে আরামে নিদ যাও। আর রোদে রোদে ঘুরোনি।

-ঘর গেলে কি নিদ আসে রে? মন তো মাঠে পড়ে থাকবে। নীলকণ্ঠর কথা জড়িয়ে গেল, সে টলে পড়ল ভূষণীর উপর, আমাকে ধর। ঠেকা দে।

-ঘর যাও বাবু।

–কার জন্য ঘর যাবো বল? সেখানে কে আছে আমার?

–কেনে তুমার বউ!

–তার মুখে লাথি মারি। সে আমার মুখে লাথি মেরে চলে গিয়েছে। চুল চেপে ধরে ডুকরে উঠল নীলকণ্ঠ।

ভূষণী মাতাল মানুষটাকে সামলাতে গিয়ে নিজেই বেসামাল হয়ে পড়ল। নীলকণ্ঠ তাকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ল ঘাসের বিছানায়। ভূষণীর বুকের উপর চড়ে বসেছে সে, আমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিস নে ভূষণী। তুই ফিরিয়ে দিলে আমি মরব। কেউ আমাকে ভালোবাসা দেয়নি, অন্তত তুই আমাকে একটু হলেও ভালোবাসার স্বাদ দে। আমি তোকে ঠকাব না রে, তুই চাইলে আমি সব ফেলে তোকে নিয়ে পালিয়ে যাব।

আখের খেতে আলো আঁধারী আলো, কিছু দূরে দিঘিতে ঢেউ উঠেছে জলের, ছোট ছোট আবেগ ভরা ঢেউগুলো সিঁদিয়ে যাচ্ছে জলের শরীরে আলোড়ন তুলে। ভূষণী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে ঢেউ হল, জল হল, তারপর ভ্রমরবসা শাপলা ফুলের মতো হেসে উঠল খিলখিলিয়ে, কিছু হয়ে গেলে তার দায় তুমি নেবে তো বাবু? ধোঁকা দিবেনি তো?

-বললাম তো চল পালিয়ে যাই এদেশ ছেড়ে। নীলকণ্ঠ বাধাহীনভাবে ঠোঁট ঘষে ভূষণীর লালচে ঠোঁটে।

ভূষণী দু-হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে পুরুষশরীর। তার আধফোঁটা চোখ, মলাটহীন দেহাতি শরীর তিরতির করে কাঁপে, যাব নি গো বাবু যাবনি। এ মাটি ছেড়ে আমি কুথাও যাবনি। ইখানেই বাঁচব, ইখানেই মরব। এত সুখ এই দেশছাড়া আর কুথায় পাবো।

দয়ালের পুরুষক্ষমতা ছিল না যদিও সে সুপুরুষ তবু সে ফসল ফলানোর চাষি নয়। মাত্র তিন মাসেই ভূষণী টের পেয়ে গেল সে মা হতে চলেছে। নীলকণ্ঠ দয়ালকে আগোলদারের কাজ পাইয়ে দিয়েছে সাহেবমাঠে। রাতে সে ঘরে থাকে না। পাঁচ হাত লাঠি বাগিয়ে চলে যায় খেত আগলাতে। তার গলার স্বরে বাতাস কাঁপে, ভুই কাঁপে। মাঠ জেগে ওঠে সেই অসুর শব্দে। ঘরে বসে ভুষণী সব শুনতে পায়, নীলকণ্ঠর অপেক্ষায় তার দু-চোখের পাতা এক হয় না, শরীরের নেশাটা গুড়মদের মতো চাগান দেয়, নীলকণ্ঠ এসে তার নেশাকে চূর্ণ করে মোকামপাড়ার বিলপথে ফিরে যায়।

একদিন দয়ালের চোখে ধরা পড়ে গেল ওরা। সেদিন নেশার ঘোরে মারাত্মক বাড়াবাড়ি করে ফেলল দয়াল। পুরো পাড়া জাগিয়ে দয়াল ঠুকরে উঠল, পালা আমার ঘর থিকে পালা। নাহলে চুলের মুঠি ধরে তুরে আমি ঘর থিকে ছুঁড়ে বুড়িগাঙের জলে ভেসিয়ে দেব। কাক-শকুনে খাক তুর যৌবন। তুর এত রূপের গরব। মরবি। মরবি। মরবি।

নীলকণ্ঠ চুপচাপ চলে গেলেও তার ভেতরে অপমানের তুষআগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল। সেই আগুন সময়ের প্রশ্রয়ে বেড়ে দাবানলের সৃষ্টি করল। এক মাসের মধ্যে দয়ালের লাশ পড়ে থাকল খেতের আলে। সাত মাসের পেট নিয়ে ভূষণী কাঁদল অঝোর ধারায়। সে চায়নি দয়াল ঝরে যাক তেঁতুলফুলের মতো।

এসব খবর সুবর্ণার কানে পৌঁছে গিয়েছিল লোক মারফত। তাছাড়া এই মুখরোচক সংবাদ নিয়ে চোত-গাজনে বোলান বাঁধল বারোয়ারি পাড়ার দল। তাতে নীলকণ্ঠ আর ভূষণীর প্রেমকাহিনি পেয়েছিল প্রাধান্য। দয়ালের অস্বাভাবিক মৃত্যুটাকে গ্রামের মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। ঈর্ষায় কালো হয়ে গিয়েছিল সুবর্ণার ফর্সা মুখ। প্রায় মাসের উপর তিনি ঘরের বাইরে বেরতে পারেননি লজ্জায়। নীলকণ্ঠ তাকে এভাবে হারিয়ে দেবে, তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। ভূষণী কি তাহলে তার চাইতেও সুন্দরী? হতে পারে। তাকে একবার চোখে দেখা দরকার। শত্রুকে অত সহজে ছেড়ে দেওয়া নয়। লোকে দুধ-কলা দিয়ে বিষধর সাপ পোষে। আবার সেই সাপের ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। হিসাব চুকিয়ে না দিলেই সুদে-আসলে বাড়বে। শহরের জলবায়ু সুবর্ণাকে এত বড়ো করেছে। তিনি হেরে যাবেন ওই অশিক্ষিত ভূষণীর কাছে? হতে পারে না, কখনো হতে পারে না। বদলা তিনি নেবেনই, যে করেই হোক। নীলকণ্ঠকে তিনি ছেড়ে দেবেন না। কত ধানে কত চাল হয় এই হিসাব তিনি বুঝিয়ে ছাড়বেন।

সুবর্ণার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন তিনি তিন দিনের ছুটি নিয়ে। মাঠের কাজে দায়িত্ব অনেক, ছুটিছাটা পাওয়া যায় না। অথচ তার ছুটি হয়ে গেল। মাসের পর মাস পেরিয়ে গেল তবু নীলকণ্ঠর দেখা নেই। ভূষণীর প্রতিক্ষারত চোখ পথ দেখতে দেখতে আমড়ার আঁটির চেয়েও কঠিন হয়ে গেল। তবু নীলকণ্ঠ শহর থেকে ফিরলেন না। গ্রামের মানুষ বলতে লাগল মানুষটাকে ওর শালারা গুন্ডা লাগিয়ে মেরে ফেলেছে। তারপর খড়ে নদীর চরে পুঁতে ফেলেছে।

কথাটার সত্যতা ভূষণী এখনও পায়নি। নীলকণ্ঠ মারা গিয়েছে কিনা সে জানে না। নীলকণ্ঠ বেঁচে আছেন এ বিষয়ে সে নিশ্চিত। তার বেঁচে থাকার প্রমাণ দুলালের মধ্যে জলছবির মতো ফুটে উঠছে। দুলাল তাই ধাওড়াপাড়ার কারোর মতো দেখতে নয়। তার খাটো চেহারায় আভিজাত্য হ্যাজাকের আলোর মতো তাপ ছড়ায়। ভূষণীর দুচোখ জড়িয়ে যায় কান্নায়। ওই মানুষটা তাকে সত্যি সত্যি সুখ দিয়েছিল, কোনোদিনও সে অস্বীকার করেনি এই সম্পর্ককে। সবসময় ভূষণীকে বুকে জড়িয়ে বলেছে, তুই আর কারোর নোস। তুই আমার। শুধু আমার।

নীলকণ্ঠ নিরুদ্দেশ হওয়ার পরে সুবর্ণা আর কালীগঞ্জে থাকলেন না। কিসের মোহে এখানে পড়ে থাকবেন তিনি? পুরুষের টান সরে গেলে নারী তো ভাটার নদী। এই সত্য ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন সুবর্ণা। যত দিন গেল; তত তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। একদিন জমিজমা পুকুর এমনকী দোতলা বাড়িটা বিক্রি করে কৃষ্ণনগরে চলে গেলেন।

ভূষণীর দিন চলছিল কষ্টে। মাঠের কাজে গতর খাটাতে না গেলে তার দিন চলে না। দুলালকে জমির আলে শুইয়ে দিয়ে সে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। ছেলেটা কাঁদে। সেই কান্নার মধ্যে সে শুনতে পায় নীলকণ্ঠের খিলখিলানো দরাজ হাসি। তখন পরিশ্রমকে আর পরিশ্রম বলে মনে হয় না। মনে হয় সব শ্রমই পুজোর ফুল।

দুলাল বড়ো হয়ে হরিনাথপুরের ধাওড়াপাড়ায় বিয়ে করেছে। ইন্দুর স্বভাব, সাংসারিক টান মন্দ নয়, বরের উপর তার ভালোবাসা অটুট আছে। নিজে না খেয়েও সে দুলালকে খাওয়ায়, সব কাজে সে আগে থাকে, তার বিশ্বাস, প্রথম ঝড়টা যেন আমার গায়ে লাগুক। আমি থাকতে তুমার যেন কুনো ক্ষতি না হয়। মা শীতলাবুড়ির কাছে সে সবসময় এটাই কামনা করে।

দুলাল যখন বছর দশেকের তখন গাঁয়ে-গঞ্জে জোর গুজব, লাখুরিয়া কালীগঞ্জের মানুষ ফিসফিসিয়ে বলছে, এবার খেল জমবে। বড়ো ঘরের পাগলী বউটা ফিরে এসেছে। সে তো খালি হাতে যাবে না। শুনছি সে নাকি বুনোপাড়ার দুলালকে সাথে করে নিয়ে যাবে। দুলাল তার বরের শেষ চিহ্ন। ভূষণী তাকে পেটে ধরলেও তার দাবীর চাইতে সুবর্ণার দাবী কম নয়। কেসটা যদি কেসনগরের কোর্টে ওঠে তাহলে খেল জমবে।

এক টানটান উত্তেজনায় ভূষণী ঘুমোতে পারেনি পরপর সাতদিন। গাঁওবুড়া তাকে বলল, হাওয়া খারাপ দেখচি। ছেলেটারে লিয়ে যেদিকে দু-চোক যায় পেলিয়ে যা। ওই বড়োলোকের বিটির সাথে তুই কি কেস লড়ে পারবি? সে তুর কলজের ধনকে লিতে এয়েচে। এ ছেলের উপর তুর যেমুন টান, তারও তো তেমন থাকবে।

ভূষণী শেকড় ছড়ানো গাছের মতো অনড় অবিচল, কেনে পেলিয়ে যাব? আমি কি চোর না ডাকাত? পেটে ধরা ছেলেটা তো আমার, তুমরা সব সাক্ষী আচো। ওঃ, অতো মাগনা নাকি, চাইলেই মোওয়ার মতো হাতে তুলে দিয়ে দিতে হবে। এদেশে কি বেচার নেই? হলেওবা বড়ো ঘরের বিটি, ওর খেয়াল-খুশিতে কি চাঁদ-সূর্য উঠবে নাকি?

ভূষণী পালাল না, মাটি কামড়ে পড়ে রইল গাঁয়ে। পালালে বছর আটেক আগেই সে পালিয়ে যেত যখন তার যৌবন খুবলানোর জন্য চার খেতে আসা মাছের মতো হামলে পড়েছিল শরীরচাটা মাছ। সেই সময় তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি ভূষণী, লোভের ফাঁদে ডাকপাখির মতো ধরা দেয়নি। নীলকণ্ঠর স্মৃতি আঁকড়ে সে বাঁচতে চেয়েছে বছরের পর বছর। এখন চোখ মুদলে নীলকণ্ঠর গায়ের নিঃশ্বাস তার উদোম বুকে আছড়ে পড়ে, নীলকণ্ঠ তার সরু থুতনি নিয়ে গিয়ে আলতোভাবে ঠুসে ধরেছে বুকের ঢালু জলাশয়ে। এই স্মৃতি, এই অনুভব রক্তে পানকৌড়ি পাখি হয়ে সাঁতার কাটে। মানুষটা রক্ত মাংসের শরীর নিয়ে তার বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। স্বপ্নে এসে কথা বলে। হাসে, শিস দেয়। খুনসুটিতে জাগিয়ে তোলে ভূষণীর ক্ষুধিত শরীর।

ঝুমুরগানের দিন সুবর্ণা রিকশা নিয়ে সোজা চলে এসেছিল হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। তার হাতে একটা নতুন কাপড়, মিষ্টি। দুলালের জন্য জামা-প্যান্ট-খেলনা। অশ্বত্থতলায় রিকশা দাঁড় করিয়ে সুবর্ণা চলে গিয়েছিল ভূষণীর ঘরের দাওয়ায়। ভূষণীকে বলেছিল, আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি বোন। ভয় পেও না, আমি রাক্ষুসী বা ডাইন নই যে তোমার ছেলেটাকে কেড়ে নিয়ে পালাব। তাই যদি আমার মনের ইচ্ছে হত তাহলে আমাকে এখানে আসতে হত না। টাকা ছড়ালে কাক-শকুনের অভাব হয় না। এখন গাঁ-ঘরে শ’টাকায় লেঠেল পাওয়া যায় কিনতে। তোমার ছেলেকে ছলে-বলে কেড়ে নিয়ে যেতে আমার বেশি সময় লাগত না। কিন্তু আমি তা করব না। সেটা আমার ধর্মও নয়। আমি শুধু এসেছি মানুষটার শেষচিহ্ন দেখতে। তোমার ওই ছেলের মধ্যে সে আজও বেঁচে আছে। সুবর্ণা কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, ভূষণীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাকে বসতে বলবে না? ঠিক আছে আমি দাঁড়িয়েই কথা বলছি। ছেলেটাকে একটু নিয়ে এসো। ওকে আমি চোখের দেখা দেখে চলে যাব। তোমার কোনো ভয় নেই। দিনের বেলায় আমি চুরি করতে আসিনি। ওই দেখো আমার রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আজ আমি শহরে ফিরব।

ঝুমুর গানের আসর ভেঙে ছুটে এসেছে মানুষ। সবাই মজা দেখার জন্য উদগ্রীব। এত মানুষের ভিড় ঠেলে সুবর্ণা দুলালকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। ভূষণী মনের জোর ফিরে পেল। দুলালকে নিয়ে এল। সুবর্ণার কোলে তুলে দিয়ে বলল, এই ছেলেই আমাকে মাঠবাবুর কথা ভুলতে দেয় না। কি করে ভুলি? মানুষটা তো রসের জাহাজ। আমাকে সেই জাহাজে চেপিয়ে কুথায় কুথায় নিয়ে গেল। আমার ঘরের মানুষটা চার বছরে আমাকে যা দেয়নি, বাবু আমাকে চারমাসে তা দিয়েছে। আগে আমি শেয়ালকাঁটা গাছের মতো খড়খড়ে ছিলাম, বাবু আমাকে জলোপাতার মতুন নরম আর সোন্দর করেছে।

-এমনিতেই তুমি খুব সুন্দরী। সুবর্ণা মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন কথাটা, তোমার বাবুর নজর ছিল মানতে হবে। সত্যি বলতে কি–তুমি আমাকে সব দিক দিয়ে হারিয়ে দিয়েছ। আমি হেরে গেছি ভূষণী। ওকে আমি দুলাল দিতে পারিনি। শুধু ঘৃণা আর অবহেলা দিয়েছি। আজ বুঝতে পারছি আমার তাচ্ছিল্য অবজ্ঞা ওকে আজ এপথে নিয়ে এসেছে। আমি যদি ওর প্রতি মনোযোগী হতাম, ওকে যদি সামান্য ভালোবাসা দিতাম তাহলে ও খাঁচা ভেঙে পালাত না। আমি যা দিতে পারিনি, তুমি ওকে তাই দিয়েছ ভূষণী। আমার পালিশ করা রূপের চাইতে তোমার আকাড়া চালের লালআউস ভাত ও অনেক তৃপ্তি সহকারে খেয়েছে। আমি হেরে গিয়েছি ভূষণী।

সুবর্ণা গোপালের মুখে চুমু খেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। এখনই ছেলেটার মুখের আদলে ছাপ পড়ে গিয়েছে বাবার, জলছবির মতো নীলকণ্ঠ স্পষ্ট হয়ে উঠবে সময়ের সাথে সাথে। ধাওড়াপাড়ার ধুলোমাটি মেখে সে নীলকণ্ঠ হয়ে ঘুরে বেড়াবে। সুবর্ণা অনেক ভেবে নিয়ে সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, তুমি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারো। নীলকণ্ঠর সম্পত্তিতে তোমারও ভাগ আছে আমি মনে করি। তুমি চাইলে এর অর্ধেক আমি তোমার নামে লিখে দেব।

-টাকা-পয়সা, ধনদৌলত আমার দরকার নেই। ভূষণী ঘাড় দোলাল তীব্র অনীহায়। সুবর্ণা বললেন, ঠিক আছে। তোমার কথা আমার মনে থাকবে। এ পৃথিবীটা গোল, এবং যথেষ্ট ছোট। যদি বেঁচে থাকি তাহলে তোমার সঙ্গে আমার আবার ঠিক দেখা হবে। ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করো। ও তো শুধু তোমার একার ছেলে নয়, ও ছেলে আমারও। সময় পেলে আমি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো। যদিও কালীগঞ্জের বসবাস আমি উঠিয়ে দিয়েছি। পচা সুতোয় কোনো সম্পর্ক বাঁধা যায় না, বাঁধতে গেলে শক্ত ডোর দরকার, নাহলে ছিঁড়ে যায় ভূষণী।

সুবর্ণা চলে গেলে ভূষণী বুক হালকা করে শ্বাস ছাড়ল কিন্তু তার মনের খচখচানিটা কমল না। মাঠবাবু কিসের জন্য তার ছায়া চেয়েছিলেন, যার ঘরে সব সম্পদ গোছানো আছে সে কেন ভিখারি হতে গেল তার মতো দেহাতির কাছে। তাহলে কি ভালোবাসা যুগে যুগে মানুষকে ভিখারি করে দেয়, সময় সেই ধারাকে বয়ে নিয়ে যায় অনন্তকাল।

.

পাকুড়তলা থেকে রঘুনাথ যখন ঘরে ফিরে এল তখন রোদ টং-টং করছে আকাশে। দুর্গামণি মুখ ভার করে বলল, তুর এখন আসার সময় হলো? বাপের স্বভাব নিয়ে গা ঘুরলে কি দিন চলে যাবে? অত বড়ো ছেলে গতর না খাটালে চলবে কি করে?

দুর্গামণি যে বেজায় রেগে আছে এটা বুঝতে পেরে মুখে কুলুপ আঁটল রঘুনাথ। বুকের ভেতর জমে থাকা গল্পগুলো সে এখন আর হালকা করতে চাইল না। ওগুলো তার সুখের স্মৃতি, যদি হারিয়ে যায় অবহেলায় তাহলে সে ভীষণ কষ্ট পাবে। যে জগৎ তার জানা ছিল না, সেই জগৎ-এ সে পা রেখেছে। সেই অনাস্বাদিত বিশ্বকে সে এবার নিজের মতো করে ভালোবাসতে শুরু করবে। সে থমকে দাঁড়াবে না, আরও অনেকে পথ হাঁটতে হবে তাকে। এই প্রস্তুতিতে রঘুনাথ যেন উজ্জীবিত হয়ে উঠল।

ঘরের কাজ করতে করতে দুর্গামণি বলল, তোর কাকা তুকে ডেকেচে। সে ঘরে আচে। তুকে দেকা করতে বলচে। নূপুর এসেছিল। খপর দিয়ে গেল। বলল–ভেষণ দরকার। যা, একবার তার ঘর থিকে ঘুরে আয়।

লুলারামের মাটির দোতলা ঘরখানায় অনেক রহস্য দানা বেঁধে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এ পাড়ার মানুষ গুজব ভালোবাসে, গুজব ছড়াতে পারলে কদমফুলের মতো তাদের মনটা খুশিতে উপচে ওঠে। লুলারাম বরাবরই নিজেকে রহস্যের মোড়কে ঢেকে রাখতে ভালোবাসে, এতে সে এক ধরনের তৃপ্তি পায় যা তাকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

কঞ্চির বেড়াটা পেরিয়ে এলেই শুরু হয় লুলারামের ঘরের সীমানা। ওর বাবা মুনিরাম গাছের ছায়ায় বসে আছে খাটিয়া পেতে। বসে থাকা ছাড়া ওই বুড়োমানুষটার বুঝি আর কোনো কাজ নেই। বয়স হলে এমনিতেই মানুষ কমজোরী হয়ে পড়ে। তার উপরে যদি শরীরে কোনো অসুখ স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে তাহলে তো আর ভোগান্তির শেষ নেই। কুষ্ঠরোগটা যদিও কোনো রোগ নয় তবুও এর মন ফালাফালা করার প্রভাব অস্বীকার করতে পারে না মুনিরাম। রোগটা ধরা পড়ার পর এই লুলারামই তাকে মোকামপাড়ার বিলের ধারে রেখে আসতে চেয়েছিল। সে যাত্রায় হাতে-পায়ে ধরে কোনোমতে বেঁচে যায় মুনিরাম। বিপদ কাটলেও বিভিন্ন রকমের ফাঁড়া খাঁড়ার মতো তার কপালে ঝুলছে। প্রায়ই থানা থেকে পুলিশের জিপ আসে পাড়ায়। অশ্বত্থতলায় তারা জিপ দাঁড় করিয়ে ভারী বুটের মচমচ শব্দ তুলে ঢুকে আসে গাঁয়ে। লুলারামের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে খিস্তি উগরে দেয় তারা। তখন দরজা খুলতে দেরি হলে আর রক্ষে নেই। দুমদুম লাথি পড়বে কাঠের দরজায়, সেই লাথিতে কেঁপে উঠবে পুরো পাড়া। লুলারাম চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে আসার আগেই থানার মেজবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন, যাক আজও বেঁচে গেলি! যেদিন ধরতে পারব সেদিন মারের চোটে তোর অন্নপ্রাশনের ভাত বের করে ছেড়ে দেব। এই এলাকায় চুরি-ডাকাতি একদম আমি বরদাস্ত করব না।

মুনিরাম হাতজোড় করে কিছু বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেবেন মেজবাবু, চুপ কর হে, তোমাকে আর আদা ছাড়াতে হবে না। বেশি ওকালতি করতে এলে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলের ভাত খাইয়ে দেব।

জেল কী জিনিস তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে মুনিরাম। তাই এখন জেলের কথা শুনলেই তার শরীরটা সিঁটিয়ে যায়। ঢিলি তার স্বামীর কী দোষ বুঝতে পারে না। নূপুর, নোলকের অবস্থাও তথৈবচ। তারা ঘুমচোখে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। এসব তাদের আর ভালো লাগে না। গাঁয়ের মানুষগুলো দিনেরবেলায় তাদের কত কথা শোনায়। সে সব কথা গায়ে ফোসকা ফেলে মনটাকে ঘা করে দেয়। ঢিলি তাদের বোঝায়, মন খারাপ করবি নে। পাপ বাপকে ছাড়ে না। তুর বাপও পার পাবে না।

মুনিরাম গাছের ছায়ায় খাটিয়া পেতে আরাম করছিল চুপচাপ। এখন ওর শরীরটা রোগ আর বয়সে গুটিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বসে থাকলে তাকে এক দলা মাংসের মতো দেখায়। মুনিরামকে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে মুখ তুলে তাকায় সে, কে, কে যায় রে?

আমি গো কচিয়া দাদু! রঘুনাথ দাঁড়াল।

মুনিরামকে সে কচিয়া দাদু বলে ডাকে। এই সম্বোধন দুর্গামণি তাকে শিখিয়েছে ছোটবেলা থেকে।

-কুথায় যেচিস রে দাদুভাই? মুনিরামের প্রশ্নে রঘুনাথ বলল, কাকা আমাকে ডেকেচে!

-ওঃ। ঠিক আচে যা। সময় পেলে টুকে আসিস। গল্প করব। মুনিরামের কথায় বেদনা ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার সবাই এই মানুষটাকে এড়িয়ে চলতে পারলে খুশি হয়। সবাই জেনে গিয়েছে এই মানুষের দ্বারা কারোর কোনো উপকার হবে না। বুড়ো ঘোড়ার কদর কোনোকালেই ছিল না। এটা ঘোড়ারই দুর্ভাগ্য। রঘুনাথ ওখান থেকে সরে এলেও তার মনে একটা প্রশ্ন দানা বাঁধল। বয়স কি মানুষের সব কেড়ে নেয়? কেন নেয়? পাকা তেঁতুল, পুরনো চাল, এমনকী পুরনো ঘিয়ের কদর এখনো কমেনি। তাহলে মানুষের কেন এ হাল হবে? লুলারাম নিজের বাবাকে কোনো গুরুত্ব দেয় না। সে যে একজন বয়স্ক মানুষ, এ সংসারের মাথা এই বোধ তাকে এখন আর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় না। সে ভাবে–মুনিরাম পৃথিবী ছেড়ে বিদেয় নিলে তার বুঝি রক্ষে। ঝারির সঙ্গে লটরপটর তাহলে জমবে ভালো। ঢিলিকে সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, একটা পাগলীকে এত গুরুত্ব দেবার কোনো অর্থ হয় না। শুধু পথের কাঁটা মুনিরাম সরে গেলেই লুলারাম স্বাধীন, আজাদ পাখি।

নূপুরের সাথে দেখা হল দাওয়ায়। রঘুনাথ কিছু বলার আগেই নূপুর আগ বাড়িয়ে বলল, কুথায় থাকিস রে দাদা? বাবা কত খুঁজল তোকে।

–আমি মানিকডিহি গিয়েচিলাম।

-কেন রে? বাবুদের সাথে বুঝি তুর ভাব জমচে? নূপুর না বুঝেই খোঁচা দিল রঘুনাথকে। রঘুনাথ ম্লান হেসে তাকাল, সূর্যকে চিনিস? ও আমার বন্ধু হয়েছে।

নূপুর অবাক হল না, ভালো কথা। তবে বড়ো মানুষ বড়ো ধড়িবাজ। ওরা যখুন তখুন চোখের পাতা উল্টায়।

–সূর্য অমন নয় রে! রঘুনাথ জোরের সঙ্গে বলল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নূপুর বলল, ভালো কথা। ভালো হলে দেখতে ভালো লাগে। ঠকতে না হলে আরও ভালো। লুলারামের মাটির ঘরখানা অন্ধকারের আখড়া। এই আঁধারে রহস্য শুয়ে আছে চাদরমুড়ি দিয়ে। এ গাঁয়ের সবাই জানে লুলারামের মাটির ঘরে মা লক্ষ্মীর আনাগোনা আর সেই লক্ষ্মীকে কিভাবে খুশি করতে হয়, পূজা দিতে হয় লুলারামের চাইতে এ গাঁয়ের কেউ বেশি জানে না। এককালে লুলারাম ললাটবাবুর লেঠেল ছিল। ললাটবাবুর অঙ্গুলি হেলনে সে উঠত-বসত। তার নির্দেশে লুলারাম কত নিরীহ মানুষের মাথা ফাটিয়েছে, মেরে অথর্ব করে দিয়েছে তার কোনো গোণা গুণতি নেই। টাকার বিনিময়ে সে পারে না এমন কাজ তার দৃষ্টির মধ্যে নেই। ফলে এখন ও গাঁয়ের মানুষ লুলারামের সামনে বেশি তেড়িবেড়ি করে না। সমঝে চলে। কার মনে কী আছে তা জানতে লুলারাম এখন আগ্রহী নয়। তবে নিজের নামটার উপর তার বড়ো ঘেন্না। প্রায় মুনিরামকে বলে, আর নাম পেলে না খুঁজে! আমি কি লুলা নাকি যার জন্যি আমার নাম লুলা রাখলে?

মুনিরাম কোনো উত্তর দিতে পারে না, ভীতু চোখে তাকায়। যা মেজাজ, বিশ্বাস নেই এই পাষণ্ড ছেলে কখন কি করে ফেলে।

কাঁথ দেওয়ালের পাশ দিয়ে হাত পাঁচেকের চওড়া দাওয়া। সেই দাওয়া মাথায় খড়ের ছাউনি নিয়ে সোজা এগিয়ে গিয়েছে আরও বিশ-বাইশ হাত। দাওয়া যেখানে শেষ হচ্ছে–সেখান থেকে শুরু হচ্ছে আঁধার ঘরে যাওয়ার সরু পথ। বেশি দূর যেতে হল না, সামান্য গিয়েই রঘুনাথ টের পেল একটা অন্ধকার পুরী তাকে হাঁ করে যেন গিলতে আসছে। আলো থাকলে ভালো হত, আলো না এনে ভুল করেছে সে। একবার ভাবল ফিরে গিয়ে নূপুরের কাছ থেকে লম্ফো চেয়ে আনবে। কিন্তু ফস করে দেশলাই জ্বলে উঠতেই সে অবাক চোখে তাকাল। সেই স্বল্প আলোয় রঘুনাথ দেখল লুলারামের হলদে হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো বিকশিত হয়ে পরিতৃপ্তির একটা হাসি উগরে দিচ্ছে। বড়ো জান্তব আর পৈশাচিক হাসি।

রঘুনাথ ভাবছিল এই অন্ধকার কুঠুরীতে লুলারাম কি করছে একা একা। তীব্র গরমে আশপাশ যখন আইঢাই করছে তখন এই গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশে একটা মানুষ একা একা কি করতে পারে ওখানে? চোরাকুঠুরীর গল্প এর আগেও শুনেছে রঘুনাথ কিন্তু কোনোদিনও সাহস করে ওখানে ঢোকার তার স্পর্ধা হয়নি। মুনিরাম, দুর্গামণি মানা করত তাকে। মুনিরাম বলত, দাদুভাই, বিচুটি বনে ঢুকলে যে কুনো সময় ওর জ্বলুনীপাতা গা-গতরে ঘষে যেতে পারে। তখুন চুলকে চুলকে চাকড়া-চাকড়া দাগ হবে সারা গায়ে। সেটা কি ভালো দেখায় দাদুরে! বিচুটি বনের ধারে-কাচে যাস নে। আলো বাতাসে হাত-পা ছড়িয়ে খেল। আন্ধারঘরে মন আন্ধার হয়ে আসে।

গুয়ারামও খুশি হত না রঘুনাথ লুলারামের উঠোনে পা রাখলে। সে বেজার হয়ে বলত, খেলতে মন চায় পাকুড়তলায় চলে যা। কারোর দোরে লাফ-ঝাঁপ খেলা ভালো নয়। সব ঘরেই সব সময় কিছু না কিছু খেলা হয়। সে খেলা ছোটছেলেদের দেকা বারণ।

–কি খেলা বাপ?

–বড়ো হ। বুঝবি? গুয়ারাম এড়িয়ে যেত প্রশ্ন।

এখন রঘুনাথ বড়ো হয়েছে কিনা জানে না তবে চোরাকুঠুরীর অনেক রহস্য গল্প তার কানে এসেছে। ললাটবাবুর সৌজন্যে লুলারাম চোরাকুঠুরীটাকে দিনে দিনে বানিয়ে ফেলেছে গুমঘর। প্রতিশোধ নেওয়ার এমন মনোরম জায়গা আর কোথাও নেই এই গ্রামে। গুমঘরে ধরে এনে কারোর গলা দাবিয়ে দিলে কেউ টের পাবে না। খুন করলেও রক্তের ছিটে নজর এড়িয়ে যাবে। এমনকী আর্ত-চিৎকার হারিয়ে যাবে মাটির দেওয়ালে ঠোক্কর খেয়ে। লুলারামের বধ্যভূমি এই চোরাকুঠুরীর গল্পকথা কোনোদিনও শেষ হবার নয়।

রঘুনাথ সত্যি-মিথ্যা জানে না। তবে সে জানে যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। চোরাকুঠুরীর মেঝেয় পা রেখে তার শরীরে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছে সে বড়ো বড়ো চোখ মেলে দেখতে চাইল লুলারামকে। দেখতে না পেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডাকল, কাকা, তুমি কুথায়?

-কেন রে, তুর বুঝি ডর লাগে? অন্ধকার থেকে উড়ে এল লুলারামের কণ্ঠস্বর। ভয় জিনিসটা এই বয়সে অপমান। রঘুনাথ নিজেকে সামলে নিল, ভয় পাবো কেনে? আমি তুমার কাছে যেতে চাই। রঘুনাথ নিজেকে নিজের মধ্যে খুঁজে পাবার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পরে আবার একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে লুলারাম সামনে এল। তার দু’হাতে রক্ত দেখে চমকে উঠল রঘুনাথ। লুলারাম সেই রক্তমাখা তর্জনী নিজের মোটা ঠোঁটে চেপে ধরে বলল, চুপ। হল্লা করিস নে। জানাজানি হলে হুজ্জোত বাড়বে!

অতো অক্ত? কী হয়েছে গো কাকা? রঘুনাথ হাঁপাচ্ছিল। সে কিছুটা উত্তেজিত। লুলারাম তাকে শান্ত হতে বলল, ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নাই। এট্টা কালোখাসি ধরে এনেচি মুকামপাড়া থিকে। পণ্ডিত বিলের বেড়ার ধারে চরছিল। দেকে আর লুভ সামলাতে পারলাম না। মনটা টেনে নিয়ে গেল হুড়হুড়িয়ে। ভাবলাম কত্তো দিন মানসো খাইনি। আর খাবো কি করে? খাসিমানসের যা দাম বেড়েচে। লুলারাম কথা থামাল।

রঘুনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলল, তার মানে চুরি করে এনেচো?

–ও কথা বলতে নেই ভাইপো। লুলারাম দাঁত বের করে হাসল, না বলে আনলে শাস্ত্রে বলছে চুরি করা হয়। তবে শাস্ত্রে এ-ও বলচে-চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা। তা আমাকে ধরার মতো কুনো মামু নেই এ-গাঁয়ে। চাইলে যখুন দেবে না তখুন না বলে নিয়ে এলাম। না বলে নিয়ে এলে কুনো দোষ হয় না। বরং মাসের সুয়াদ বাড়ে।

রঘুনাথের মুখে কথা আটকে গেল। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। কাকাকে এ চেহারায় সে কোনোদিন দেখেনি। না দেখলেই বুঝি ভালো হত। লুলারাম বলল, এই ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে তুর অতো না ভাবলেও চলবে। শুন, আমি তুকে কিজন্য ডেকেচি। মন দিয়ে শুন। ঢোঁক গিলে লুলারাম তার রক্ত জড়ানো হাতটা রঘুনাথের কাঁধের উপর রাখল, তুর কুনো ভাই নাই, দাদা নাই। মেয়ে দুটা আর তুই হলি আমার সম্বল। তুকে আমি কিছু গুপ্তবিদ্যে দিয়ে যেতে চাই। বংশের অক্ত ছাড়া তো এসব কাউকে দেওয়া যায় না। ওস্তাদের বারণ আচে। বুঝলি?

রঘুনাথ অন্ধকারে ঘাড় নাড়ল।

লুলারাম উৎসাহ পেয়ে বলল, তুর কচিয়াদাদু চোর ছিল জানিস তো? সে এখুন আর রাত-বেরাতে বেরুতে পারে না। সে আগে ছিল বাঘ, এখুন হয়েছে বুড়াবাঘ। তুই জানিস তো বুড়াবাঘ শিকার ধরতে পারে না। এখুন আমি তাকে শিকার ধরে এনে দিই। তা খেয়ে সে বেঁচে থাকে। আমি না থাকলে বুড়াটা মরে ভূত হয়ে যেত। এ সনসারে কেউ কাউরে দেখবে না। যে যার, তার তার। কপাল চাপড়েও কুনো লাভ নেই। কপাল আমবাতের মতো ফুলবে। তাতে কার লাভ? কারোর নয়। তাই বলছিলাম কি, তুই আমার পথে চলে আয়। আমি তুকে হাতে করে সব শিখিয়ে যাই। এতে আমার স্বার্থ আছে। আমি বুড়া হলে তুই আমাকে শিকার ধরে দিবি। কি রে দিবি তো?

রঘুনাথ হ্যাঁ-না কিছু বলতে পারল না চট করে। অন্ধকারে তার চোখ কুঁকড়ে যাচ্ছিল। শুধু লুলারামের কথাগুলো ছাড়া আর কিছু যেন ঘরের মধ্যে পড়ে নেই। এই অন্ধকার হাতড়ে কি পেতে পারে সে? অন্ধকার শুধু ভয়ের জন্মদাতা। চোরাকুঠুরীতে নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া চামচিকির ডানা ঝাড়ার ব্যস্ত আওয়াজ প্রকটিত হল। লুলারাম অধৈর্য হয়ে বলল, তুর বাপরে আমি পথে আনতে পারলাম না। সে যেটা বুঝবে–সেটাই শেষ কথা। গরিব মানুষের এত গোঁ ভালো দেখায় না। তারে আমি বলেছিলাম আমার সাথে কাজে লেগে পড়তে। সে আমার কতা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। তাতে কার ক্ষতি হয়েছে? গাঁ-ছেড়ে তাকে তো চলে যেতে হল দূর গাঁয়ে খাটতে। এতে কী লাভ হল বলদিনি বেটা।

লাভ-ক্ষতির কথা নয়, গুয়ারাম মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে। একথা ঠিক তার দুবেলা ভাতের জোগাড় হয় না, দুর্গামণিকে ঝোড়-জঙ্গলের শাক-লতা পাতা খুঁজে আনতে হয়, তবু তারা সম্মানের সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, পুলিশ এসে তাদের দরজায় লাথি মারে না, ধমকায় না। রঘুনাথ কাকার মুখের উপর একটা কথাও বলতে পারে না, তার আড়ষ্টতাবোধ হয়, সে পাথরচোখে গিলতে থাকে গুমোটবাধা অন্ধকার।

বিরক্ত লুলারাম উত্তেজিত হল না, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ঠিক আছে, তুই যা ভালো বুঝিস কর। মন চাইলে আসবি না হলি পরে চলি যাবি। সব তুর উপর ছেড়ে দেলাম। লুলারাম আর একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাল, বিব্রত রঘুনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, খাসিটা মেরেচি, মানসো লিয়ে ঘর যা। এই বয়সে একা খেতে পারি নে, দিয়ে খেলে কলজের দম বাড়ে।

প্রায় সের দুয়েক মাংস লুলারাম পাতায় মুড়িয়ে ধরিয়ে দিল রঘুনাথের হাতে, তার সতর্ক চোখ-মুখ, গলা নামিয়ে বলল, তুরে যা বললাম-দু কান যেন না হয়। পেটের কথা বাইরে গেলে বেপদ বাঁধে। কলিকালের মানুষরা ভালো হয় না, ওরা কেউ-কারোর সুখ দেখতে পারে না। তুর-আমার কতা আলাদা, অক্তের সম্পর্ক তো!

রঘুনাথ গুমঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘাম মুছল কপালের। চোরাকুঠুরীর ভেতর কুয়া খুঁড়ে রেখেছে লুলারাম। ললাটবাবুর লেঠেল হওয়ার সুবাদে সেই কুয়ায় খুঁজলে এখন হাড়গোড়ও পাওয়া যাবে। এই কুয়োর খবর গ্রামের অনেক মানুষই জানে না। তবে দুর্গামণির সব নখদর্পণে। সে একদিন কথায় কথায় ঢিলিকে সতর্ক করে বলেছিল, বেঘোরে জানটা কেনে দেবে বুন, চোখ মুদে থাকো, না হলে মানিয়ে নাও। এদের বংশ খুনেবংশ। মদ-মেয়েছেলে নিয়ে ওদের সময় কাটত। আমার শাশুড়ির মুখে গল্প শুনেচি-তার শ্বশুর নাকি মদ খেয়েই চক্ষু মুদল। তোমার বর লুলারে কুনো বিশ্বাস নেই। ও পারে না হেন কাজও নেই। ঝারির জন্যি ও তুমাকে ঝোড়কাটার মতো কেটে চোরাকুঠুরীর কুয়ায় ফেলে দিবে। থানা-পুলিশ পাড়াপড়শি কেউ টের পাবে নি।

দুর্গামণির সতর্কবাণী রঘুনাথের হুড়হুড় করে মনে পড়ে গেল। প্রথমে সে ভেবে ছিল এগুলো হয়ত গল্পকথা, কথার কথা। কিন্তু আজ সে যা নিজের চোখে দেখল বাইরে এসে ভাবতে গেলে হিম হয়ে যাবে গা-হাত-পা। রঘুনাথ একবার ভাবল–সে থানায় গিয়ে সব বলে দেবে; পরমুহূর্তে সে বোঝাল নিজেকে। না, ভালো হবে না। কাকাকে ধরিয়ে দিয়ে তার ক্ষতি বইতে লাভ হবে না। হাজার হোক কাকা, দায়ে-আদায়ে পাশে দাঁড়ায়। কাঁধ দেওয়ারও তো লোক দরকার। তাছাড়া নূপুর, নোলক ওদেরকে সে ভুলবে কি করে? ওরা তো কোনো দোষ করেনি। ওরা ফুলের মতো নরম, দিঘির জলের মতো মৃদুভাষী। বাবার পাপে মেয়েরা কেন ভুগবে?

রঘুনাথ মাংস নিয়ে আপনমনে হাঁটছিল। ঢুলিরামের গল্প সে দাদুর মুখে শুনেছে। বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে চোখে জল চলে আসত চুনারামের। মানুষ অতীতের কাছে দাস হয়ে থাকতে ভালোবাসে না। চুনারাম ঢেঁকুর তুলে বলত, আর কুনোদিনও মদ খাবো না। মদ মন খায়, শরীল খায়। আয়ু খায় চিবিয়ে-চিবিয়ে।

ঢুলিরাম নেশায় চুর হয়ে থাকত সব সময়। নেশা করলে তার পা টলত, মাথা টলত, মুখ দিয়ে আজেবাজে কথার চাইতে বেরিয়ে আসত টুসুগান। বেশ রগড়ের লোক ছিল সে। গঙ্গামণি প্রায়ই কেঁদে-কেটে বলত, ছেড়ে দাও গো এই সব্বোনাশী নেশা। নিজের শরীলটাকে দেখবা না? কী হয়েছে তুমার চেহারা! একেবারে ঢিংঢিঙা। মনে হয় ফুঃ দিলে উড়ি যাবা।

এই চেহারায় সাহেবমাঠে কাজ করত সে। হাতে লাঠি, হাঁটুর উপর খাটো ধুতি। ধাবড়া নাক, সরু মুখের কপালে জোঁকের মতো শুয়ে থাকত চিন্তার দাগ। ওগুলো দু-মুখো সাপের মতো টনটন করত প্রায়সময়। বর্ষার সময় দিন পনের জ্বরে পড়েছিল সে। জ্বর ভালো হতেই মাঠে গিয়ে দেখল তার জায়গায় অন্য মুনিষ কাজে লেগেছে। বেকার হয়ে গেল ঢুলিরাম। হাতে পয়সা নেই অথচ নেশা করার শখ আছে। নেশা না করলে তার প্রাকৃতিক কর্ম হত না। কাজ না করলে সংসার চলবে কি করে? চুনারাম আর মুনিরাম বেকার। ঘরে চাল নেই, তেল নেই। মাঠে কাজ নেই। গঙ্গামণি কোনমতে টানছিল সংসার। কোনোদিন কাজ পায়, কোনোদিন আবার কাজ পায় না। একদিন ঢুলিরামই দু-হাত সম্বল করে বেরিয়ে পড়ল ভিক্ষায়। বাঁচতে তো হবে? এই আকাল কবে যে কাটবে শীতলাবুড়ি জানে। ভিক্ষা করা সহজ কাজ নয়। মাত্র পনের দিনেই বুঝে গেল ঢুলিরাম। বামুনপাড়ার মানুষরা বলল, তোমাকে ভিক্ষে দিয়ে কী হবে। চাল বেচে তো তুমি চোলাই খাবে। তার চেয়ে বউরে পাঠাও, তার হাতে আমরা দুমুঠি চাউল তুলে দেব।

গঙ্গামণির সেই সুযোগ আর এল না। একদিন ভিখ মাঙতে গিয়ে গায়ে গরম বাতাস লাগিয়ে বাঁধের ধার থেকে কটরাব্যাঙের মতো ঠিকরে পড়ল ঢুলিরাম। মরেই যেত, শুধু ভাগ্যের জোরে চোখের পাতা তুলে তাকাল। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গেল না সে, কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে বলল, বাপ রে ওখানে গেলি পরে মরে যাবো। কড়া কড়া বড়ি আর ইনজিসিন এ গতর লিতে পারবে নি। তার চেয়ে দেহাতি দাওয়াই ভালো।

বাড়ি ফিরে এসে বার দুয়েক বাহ্যি গেল ঢুলিরাম। বাঁধের গোড়া থেকে তার ফিরে আসার কোনো ক্ষমতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত গঙ্গামণি তাকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে এল। এভাবে সাত দিন কাটল তবু অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। খেজুরপাতার তালাই এ লেপটে গিয়েছে ঢুলিরামের দেহ। চোখের কোল বসা। গাল ঢুকে গিয়েছে শুকনো আমের মতো। ইংরেজি দাবাইয়ের উপর তার কোনো আস্থা নেই, হাসপাতালের কথা উঠলেই সে চিঁ-চিঁ করে বলে, মরি তো এই হলদেপোঁতায় মরব। তুদের হাতে-পায়ে ধরি রে, আমারে আর হাসাপাতালে নিয়ে যাস নে।

ঘরের মানুষটার কাতরতা দেখে গঙ্গামণি পাড়া জাগিয়ে কাঁদে, হা আমার কি হল গো, মানুষটা যে আর বেছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না গো! মা শীতলাবুড়ি, মা গো মা, তুমি আর অতো লিঠুর হয়ো না। মুখ তুলে চাও মা। মুখ তুলে চাও। ঘরের মানুষটারে ভালো করে দাও মা। বুকের অক্ত দিয়ে তুমার ধার শোধ করব। দয়া করো মা, দয়া করো।

-মা’র দয়া হবে নি রে; আমার সময় হয়ে এয়েচে। ঢুলিরামের মাথাটা যেন খেতের তরমুজ, আমার কতা শুন। আমার জন্যি চোলাই কিনে আন ভাটিখানা থিকে। নেশায় আমার মন টনটন করচে।

–বাহ্যি দিয়ে অক্ত ঝরচে, এ সময় কেউ নেশা করে গো? গঙ্গামণির দৃষ্টিতে কাতর প্রশ্ন।

নেতানো ঢোঁক গিলে ঢুলিরাম বলল, আমার শেষইচ্ছেটা পূরণ করি দে বউ। তুর কাছে এ জীবনে আর কিছু চাইব না।

-আমি বউ মানুষ, কী করে চুল্লু ভাঁটিতে যাই বলো? এতদিন গেল, কুনোদিনও যাইনি। আচ আমার বাঁধো ঠেকচে। গঙ্গামণি তার অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিল।

ঢুলিরাম জোর গলায় বলল, তুই যা। আমার হাতে সময় কম।

—যাব যে পয়সা কুথায়?

ঢুলিরাম ফাপড়ে পড়া চোখ মেলে তাকাল, আমার শেষ ইচ্চেটা আর পূরণ হল না। বলেই সে গঙ্গামণির হাতটা ধরল। অমনি সরু লিকলিকে রূপার চুড়ি দুটো সরে গেল কনুইয়ের দিকে, আশায় চকচকিয়ে উঠল মন, এই তো পয়সা পেয়ে গিয়েচি। যা বউ, চুড়ি বেচে আমারে মদ এনে দে। আমি তো সোনাদানা চাইচি নে, সামান্য মদ।

গঙ্গামণি রুপোর চুড়ি বেচে দিল সাকরা দোকানে। টাকা নিয়ে সে দৌড়ে গেল ভাটিখানায়। ব্যস্ত হয়ে বলল, দাদা গো, ঘরে বড়ো বিপদ। ওর জন্যি মদ দাও।

-সাত দিন ধরে অসুক। এখন মদ খাবে? কেমন মানুষ গো তুমার বর। ভাটিখানা মালিকের কপাল কুঁচকে গেল, সব জেনে-শুনে এ পাপ আমি করতে পারবোনি। তুমি ঘুরোন যাও।

–আমি খালি হাতে ঘুরে গেলে সে আর বাঁচবে নি। গঙ্গামণি আঁচলে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠল, দাদা গো, মানুষটারে বাঁচাও। মদ ছাড়া যে মানুষটার একদিনও চলে নি, সে যে সাতদিন ধরে কী ভাবে আচে একবার তার কথাটা ভেবে দেখো।

বাটিতে মদ ঢালতে-ঢালতে ভাটিখানার মালিক বলল, এট্টা কতা ছিল যদি রাখো। মদ আমি দিচ্ছি ঠিকই কিন্তুক মন আমার সায় দিচ্চে নি। শুনেচি-নেশার জিনিস না দিলে পাপ হয়। সে আমার পাপ হোক। তুমি ওরে এক ঝিনুক মেপে মদ দিও। এর বেশি দিও না, আমার মাথার দিব্যি।

গঙ্গামণি সাবু ফোটান দিতে চেয়েছিল ঢুলিরামকে। সে হাত দিয়ে বাটি সরিয়ে দিল অনীহায়, আগে মদ দে বউ। মদের ঘেরাণ শুঁকে মাথা ধরা সারাই।

গঙ্গামণি বাটিটা ধরিয়ে দিলে চুমুক লাগাতে যায় ঢুলিরাম, আঃ, কতদিন পর চেনা ঘেরান পেলাম! পরানটি একেবারে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল রে!

দাঁড়াও ঝিনুক নিয়ে আসি। গঙ্গামণি পা বাড়াল।

পানসে হেসে ঢুলিরাম বিষাদভরা চোখে তাকাল, কেনে রে, আমি কি কোলের খোকা নাকি? নেশার সময় বাধা দিস নে, চটকে যাবে।

দু’ ঢোঁক খেয়েই ঢুলিরামের হাত আলগা হয়ে বাটিটা পড়ে গেল বিছানার উপর। দু’বার হেঁচকি উঠেই ঢেঁকির কাঠের মতো স্থির হয়ে গেল ঢুলিরাম।

চোখ বুজলেই রঘুনাথ যেন গঙ্গামণির কান্না-দৃশ্য দেখতে পায়। মনটা ঘোলা জলের চুনো মাছের মতো ছটফটায়। বেড়ার কাছে এসে সে দেখে দুর্গামণি বসে আছে তালপাতার আসনে, তার সম্মুখে ঠাকুর হয়ে বসে আছে দুলাল। কী ভেবে রঘুনাথ তাদের সামনে দিয়ে গেল না। অবেলায় মাংস দেখে দুলালের মনে সন্দেহ হবে। হাজারটা প্রশ্ন করবে তাকে। তার সব প্রশ্নের উত্তর কি দিতে পারবে রঘুনাথ। সেই কারণে বুক কেঁপে উঠল। পিছন দিক দিয়ে ঘরে ঢুকে রঘুনাথ শুনল, দুর্গামণি বলছে, ইবার যখুন খাটতে যাবে আমারে সাথে করে লিয়ে যেও। রঘুর বাপ যাওয়ার পর থিকে মনটা আমার ভালো নেই। কুনো মতে বেঁচে আছি গো। বারবার মনে হয়-খাটতে না গিয়ে আমি বুঝি অপরাধ করে ফেলেছি।

-সে তুমি যেও। তবে ইখানকার রাঁধাবাড়ি কে করবে? দুলাল আরও কিছু শোনার জন্য হাঁ-করে তাকাল। একটু ভেবে নিয়ে দুর্গামণি বলল, আমার ঘরের রঘুটা সব পারে। দুটা মানুষের ভাত সে কি ফুটিয়ে নিতে পারবে না?

–বেশ পারবে! তাহলে তৈরি থেকো। দুলাল উঠে দাঁড়াল।

কঞ্চির আগাড় সরিয়ে দুলাল চলে যেতেই দুর্গামণি বিড়বিড়িয়ে বলল, মা শীতলাবুড়ি, তুমি আমার মনোকামনা পূরণ করো। ঘরের মানুষটাকে আমি গিয়ে যেন ভালো দেখতে পাই। ওরে ভালো রেখো মা।

.

০৯.

ভালো-মন্দ, থাকা না থাকা সব শীতলাবুড়ির ইচ্ছে। ক’ দিনের গরমে দুমদুম বাষ্প হয়ে যাচ্ছে বুড়িগাঙের জল। পাল খেদিয়ে এখন আর সুখ নেই কারোর। পাঁচ বছর আগে যা সুখ ছিল এখন তা ছিবড়ে। গোরু-মোষ পিছু মুড়ি আর জিরেন-কাট রসের পাটালি দিত মনিব। এখনও দেয় কিন্তু দায়সারা দশা। মন ভরলেও পেট ভরে না। রঘুনাথ হাঁপিয়ে উঠেছে গোরুর পাল খেদাতে গিয়ে। দুর্গামণি তার মনের ছটফটানি লক্ষ্য করে বলল, মাথা গরম করে কুনো লাভ হবে নি। এক কাঠা করে মুড়িই বা কে দেয় এই বাজারে।

সবাই দেবে। ঝাঁঝিয়ে উঠল রঘুনাথ, ভাবছো মুফতে দেয়, তা তো নয়। গোরু চরাতেও মেহনতের দরকার হয়। পাল খেদানো মুখের কতা নয়। এট্টু চোখ সরে গেলে কপালে চরম কষ্ট আচে। গোরু এদিক-ওদিক কেটে পড়লে জান ঢিলা হয়ে যাবে। তখুন বদনামের আর শেষ থাকবেনি।

-কুন কাজটা আরামের বল তো? দুর্গামণি অসন্তুষ্ট চোখে তাকাল।

রঘুনাথ মুখ ভার করে বলল, একাজ বড়ো এক ঘেয়েমীর কাজ। আমি হেঁপসে উঠেচি মা। পাল নিয়ে যেতে হলে তুমরা যাও, আমি আর যাবো না। ওসব আমার ভাল লাগে না।

–তুর কি হয়েছে বল তো? দুর্গামণির গলায় সন্দেহ প্রকট হল, ওই বামুনপাড়ার ছেলেটাই তুর মাথা খেল। বড়গাছে ভাঁড় বাঁধলে চলবে? নাকি তা শোভা দেয়? রঘুনাথ কপাল টিপে ধরল রাগে, তুমার আর বিদেশে খাটতে গিয়ে লাভ নেই।

-তুর বাপ যে গিয়েছে।

–যাক।

–আমি না গেলে ভালো দেকায়? দুর্গামণি কেমন সহজ হয়ে এল, ইবারটা যাই, আর যাবো না। বয়স হচ্চে।

-আমি এট্টা কাজ পেয়ে গেলে আর তুমারে খাটতে দিতাম না।

–ছেলের কথা শুনে হেসে উঠল দুর্গামণি, তুর মনটা বড়ো সাফসুতরো। তুর উপর রাগ করে থাকতি পারি নে।

শেষ পর্যন্ত পরদেশে আর খাটতে গেল না দুর্গামণি।

সাঁঝবেলায় কীর্তন দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল চুনারামের। সে ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখছিল তন্ময় হয়ে। খোল করতালের শব্দ তার কানে যেতেই হুঁশ ফিরে এল। দুপুরবেলা সে কালো সুড়সুড়ি পিঁপড়েদের দল বেঁধে যেতে দেখেছে নিরাপদ আশ্রয়ে। পিঁপড়েগুলোর হাঁটা-চলায় অস্বাভাবিকতা পুরো মাত্রায় লক্ষ্য করেছে সে। সুড়সুড়ি পিঁপড়ে সাধারণত চোখে পড়ে না। কারণ ছাড়া ওই জাতের পিঁপড়েগুলো মানুষের চোখের আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে। সামান্য হলেও চুনারামের বয়স্ক-মন বৃষ্টি হতে পারে এই আশায় পুলকিত হয়ে উঠেছিল। যদি বৃষ্টি হয়–শুধু মানুষ নয়–গাছপালা প্রকৃতি–সাহেবমাঠ-বুড়িগাঙ সব যেন দম ছেড়ে বাঁচবে।

কীর্তন দলটি নাচের মুদ্রায় হেলে দুলে বাঁধের উপর উঠে যাচ্ছে। বেশ কদিন থেকে ওদের আর প্রার্থনার অন্ত নেই। গরম হাওয়ার দাপটে মাঠেঘাটের কাজকর্ম এখন বন্ধ হবার মুখে। এত চড়া রোদে মুনিষগুলোও আর পারছে না। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে এ ও জ্ঞান হারিয়ে পড়ছে ঢেলা খেতে।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়নি, মেঘ করে এল আকাশ জুড়ে। পাকুড়তলায় জল আনতে গিয়েছিল দুর্গামণি। সে ফিরে এল হড়বড়িয়ে। বাইরে অনেক কিছুই পড়ে আছে। মেঘের যা তর্জন-গর্জন। যে কোনোসময় ঢাললেও ঢালতে পারে। দুর্গামণি ঝুম কালো আকাশের দিকে তাকাল। চিকচিকিয়ে উঠল তার চোখের তারা। এক ফোঁটা বৃষ্টির দানা তার চোখের নীচটাতে পড়ল অশ্রুদানার মতো।

–মা শীতলাবুড়ি মুখ রেখো। আচ মন ভরে ঢালো। ঢেলে ঢেলে সব ভেসিয়ে দাও। জোর পায়ে দুর্গামণি আগড় সরিয়ে ঢুকে এল দাওয়ায়। দু’চারবার চাঁটি মারার মতো বাতাস এসে ফোঁসফোঁস করল কলাগাছের ঝাড়ে, নতুন বেরনো পাতাগুলো কাঁপতে লাগল হাওয়ার শাসনে, সজনেগাছের হলুদপাতাগুলো চুনোমাছের মতো সাঁতরে বেড়াল বাতাসের নদীতে। মাঝ আকাশে বাজ পড়ল কড়কড়াত। বিদ্যুৎ-এর চিকুর ফাটিয়ে দিল আকাশের সিঁথি। অনুরাগ পর্ব শেষ হলে শুরু হল তুমুল বর্ষণ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দলবদ্ধ ভাবে নেমে এল পৃথিবীর ধুলোয়। সৃষ্টির আদিম খেলায় মেতে উঠল চরাচর।

রঘুনাথ কালীগঞ্জ বাজারে এসেছিল ঢিলিকে খুঁজতে। হাট করতে এসে গাঁয়ের একজন ঢিলিকে দেখেছে পুরাতন বাজারে ঘোরাঘুরি করতে। নূপুর এসে বলল, দাদা, যা না রে, মাকে ধরে লিয়ে আয়। এখুন গেলে তার সাথে তুর দেকা হয়ে যাবে। তুকে দেখলে সে পেলিয়ে যেতে পারবে না। তুর কথা শুনবে। যা দাদা।

নুপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট পেয়েছিল রঘুনাথ। ওদের খাওয়া-পরার কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু সুখের। সুখ জিনিসটা দূর দেশের পাখির মতো উড়ে গেছে সংসারে ছেড়ে। শান্তি খুন হয়েছে চোরাকুঠুরীর অন্ধকারে।

ঠিক আচে। যেচ্চি। দেকি কতদূর কী করা যায়। রঘুনাথের কণ্ঠস্বরে ছিল সান্ত্বনা। নূপুর ব্যস্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ, তুই যা। তুই না গেলে মা বাস ধরে দেবগ্রাম-পলাশী পেলিয়ে যাবে। ওখান থেকে টেরেন ছাড়ে। টেরেন চেপে পেলিয়ে গেলে তার হদিস আর পাওয়া যাবে না। নুপুরের ছলছলানো চোখ মন খারাপ করে দিল রঘুনাথের।

কালীগঞ্জে এসে আটকা পড়ে গেল রঘুনাথ। এ বৃষ্টি যে চট করে থামবে না সে হাড়ে-হাড়ে টের পেল। অসুবিধা হলেও এই অসুবিধা মানিয়ে নেওয়া যায়। কদমগাছের ফুলগুলোর জন্য তার কষ্ট হত। ফি-বছর এ সময় ফুল ফোটে, গাছটা আকাশের ঝকমকে তারার মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। এ বছর সেই সময় কবে পেরিয়ে গেল। কুঁড়ি ধরেছিল কিন্তু শুকিয়ে তা বেশিরভাগই ঝরে গেল। বুড়িগাছের শুকনো মুখের দিকে আর তাকানো যেত না, যেন বড়ো ঘরের বিটি হঠাৎ রোগে-শোকে ধূসর মলিন শুকনো। ওর মুখে জলের ছিটে দেবার আর কেউ নেই।

চা-দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল রঘুনাথ তবু ত্যাড়াবেড়া জলের ছাঁট ভিজিয়ে দিল তাকে। জলের মোহনী শক্তি প্রবল, রোমাঞ্চিত হল রঘুনাথ। রাস্তায় জল জমে যেতেই বৃষ্টি এবার দম নিল। তবু গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিকণা ঝিরঝির করে ঝরছিল। মাত্র ক’ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ধরিত্রী এমনভাবে সে শ্বাস ছাড়ল। উৎকট খরার সেই ভয়াবহতা এখন আর নেই, চারদিক থেকে ছুটে আসছে ঠাণ্ডা আমেজ। শুধু আমেজ নয়, সুখের গন্ধ পেল রঘুনাথ।

যার জন্য এতদূর আসা, সেই ঢিলিকাকিকে দেখতে পেল না রঘুনাথ। নূপুর আর নোলককে সে কি বলবে? কাকিকে খুঁজে পেলাম না এই কথাটা বলতেই তার বাবো-বাধো ঠেকবে। ওরা কাঁদবে না, কিন্তু মন খারাপ করে কষ্ট পাবে। এই মুহূর্তে লুলারামকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারল না। আজ ঢিলিকাকির এই অবস্থার জন্য লুলারামকাকাই দায়ী। ঝারির সঙ্গে কাকার সম্পর্কটা ডালপালা ছড়িয়েছে। লুকিয়ে লুলারাম গিয়ে মাংস দিয়ে এসেছে ঝারিকে। ভিকনাথ সব জানত, সে লোভে পড়ে কোনো নিষেধ করে নি। অভাব মানুষের সব খায়। ভিকনাথকে তার অভাব পুরোপুরি গিলে নিয়েছে। ফলে ঝারির মুখের উপর সে কোন কথা বলার সাহস রাখে না।

পুরাতন বাজারটা ঘুরে রঘুনাথ চলে গেল বাস-স্ট্যাণ্ডের দিকটায়। ওদিকটা এখন এই দিকটার মতো জমজমাট নয়। দু-একটা মিষ্টি দোকান, সোনা দোকান, কাপড়ের দোকান, সাইকেল দোকান ছাড়া আর কিছু নেই। বাস-স্ট্যাণ্ডের চা-দোকানটায় তখনও বেশ ভিড় দেখতে পেল রঘুনাথ। সবার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা। সেই উত্তেজনাকে ঘিরে রয়েছে আশঙ্কা আর সংশয়।

দুল কাহারকে এ গাঁয়ের কে-না চেনে। ওর মতো দরাজ মনের মানুষ খুবই কম হয়।

দুলু কাহারের বাপের নাম কুলু কাহার। সে আগে পাল-কোম্পানির টালিকারখানায় কুড়ুল নিয়ে কাঠ ফাড়ত। শুধু কাঠফাড়া নয়, যখন যা কাজ পেত সে কাজ মন লাগিয়ে করত। গায়ে তাগদ থাকলে মানুষের মনে কর্মভীতি জমতে পারে না। টালি কারখানার কাজ মরশুমি কাজ। বর্ষা-বাদলের দিনে তা হবার নয়। ভেজা কাঠ শুকোবার জন্য রোদ দরকার। কাঁচা কাঠে পোড় জ্বলে না, শুধু ধোঁয়া উগরায়। কুলু তাই বর্ষা-বাদলের দিনে কুড়ুল ফেলে মোট বইত, মুনিষ খাটত। বিশেষ করে কালীগঞ্জ বাস-স্ট্যাণ্ডে তার সময় কেটে যেত বেশি করে। এখানে টুকটাক কাজ লেগেই থাকে। বাসের মাথার মাল-লোড করা, লরিতে পাট চড়ানো..আরও কত কী কাজ। দিনভর খাটলে ভাত-কাপড়ের অভাব হত না কুলুর। তার তিন বেগমের দু-জন এখন দেশ ছাড়া। শুধু ছোটবিবি তাকে জড়িয়ে আছে সুন্দরী শুয়োফলের মত। দুলু হল বড়ো বেগমের সন্তান। সে বড়ো বাপ ন্যাওটা। কুলুরও ছেলেটার উপর টান কম নয়। ওই ছেলেই তো তাকে খাওয়াবে, পরাবে। ওই ছেলেই তো তার বুড়ো বয়সের লাঠি, সাহারা। ছেলেকে তাই চোখে চোখে রাখত সে।

বয়স বাড়লে শুধু চামড়া নয়, ঢিলেঢালা হয়ে যায় মানুষের মনও। ভেঙে যাওয়া কলসী-হাঁড়ির খোলামকুচির মতো স্বপ্নটাও অর্থহীন, গুরুত্বহীন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছড়িয়ে যাওয়া স্বপ্নকে নতুন করে মালা গাঁথার মতো আর একত্রিত করা যায় না। কুলু কাহারের ইচ্ছা ছিল সে ছেলেটাকে অন্তত লাখুরিয়া হাই ইস্কুল অবধি পাঠাবে, কিন্তু দুলুর জেদ, গোঁ আর পালিয়ে বেড়ানো স্বভাব তাকে পণ্ডিত বিলের জলের মতো স্থিতু হতে দিল না। ফলে অ-আ ক-খ শিখেই দুলুর পড়া শেষ। গায়ে গতরে বাড়তেই সে-ও কুড়ুল তুলে নিল কাঁধের উপর। একদিন কুলু কাহারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল কারখানায় কাজ করবে বলে। কাঠ-চেরাইয়ের কাজ মন্দ নয়। এ কাজ করে অনেকেই তো সংসার টানছে।

কুলু কাহারের এখন বয়স হয়েছে, সে আর নিয়ম করে খাটতে যেতে পারে না। তবু সে নিয়ম করে একবার স্ট্যাণ্ডের চা-দোকানটায় আসবেই আসবে। এতদিনের অভ্যাস, বাজারে না এলে তার ভাত হজম হবে না। দুলু হাজার নিষেধ করলেও সে শুনতে চায় না, গোসা করে বলবে, বুড়া হয়েচি মানচি–তবু এখুনও তো মাজা পড়েনি, লাঠি ছাড়া চলাফেরা করতে পারি। এখুনও মাল আমি তুলে দিতে পারব বাসের মাথায়।

মনে যত জোর থাক কুলু কাহারকে মোট বওয়াতে মানুষ এখন ভয় পায়। বুড়ো মেরে কেউ পাপের ভাগীদার হতে চায় না।

সংসার চলছিল দুলুর ঘাম ঝরানো মেহনতে। ফুঁকফুঁক করে প্রায়ই সে বিড়ি টানত বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে। কাঠ-চেরাইয়ের কাজে মেহনত যেমন আছে–তেমন আছে পয়সা। শক্তি জল হয়ে ঢল নামাত পা-বরাবর। যেমন খাটত তেমন খাদ্য পেত না দুলু। তার যুবক চেহারা ঝাঁপিতে আটকে রাখা জাতসাপের মতো ফুঁসছিল। একদিন বদলা নিল সে-ও। কাশি-কফের সঙ্গে কাঁচা রক্ত উঠে এল সেই প্রথম। কালীগঞ্জের ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে বলল, তোমার টি-বি হয়েছে দুলু। তোমার এখন আরামের প্রয়োজন। দুধ-ঘি, ভালো-মন্দ নিয়মিত খেতে হবে তোমাকে। যদি নিয়ম করে ওষুধ খাও আর আমার কথা শুনে চলো তাহলে তোমার এই অসুখ মাস তিনেকের মধ্যে পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে।

দুলুর বুকের রোগ ভালো হয়ে গেল, সে এখন সুস্থ মানুষ। তবু ডাক্তারবাবু মানা করেছেন তাকে কাঠ-চেরাইয়ের কাজে যেতে। গাঁয়েঘরে বিকল্প কাজ কোথায়? হালকা কাজ ছাড়া দুলুর চলবে না। শেষপর্যন্ত সে একটা কাজ পেল পালেদের আটা চাকিতে গম-পেষানোর। মাস গেলে মাইনে দেবে পালবুড়ো। এছাড়া জলখাবার, এটা-সেটা।

দুলু আটা চাকির কাজটা মন দিয়ে করছিল। এ কাজে সে বেশ স্ফূর্তিও পেত। হঠাৎ অমনোযোগে তার ডান হাতটা জড়িয়ে গেল ঘূর্ণায়মান বেল্টের সঙ্গে। মেসিনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে অক্ষম হল দুলু। মেসিন তার ডান হাতটা বল প্রয়োগে বিচ্ছিন্ন করে দিল শরীর থেকে।

সঙ্গে সঙ্গে কাটা হাত আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলা দুলুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল পালবুড়ো।

ডাক্তারবাবু জবাব দিলেন, এখনই একে কৃষ্ণনগরে নিয়ে যান। আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যা ব্লিডিং হয়েছে, ইমিডিয়েট ওর ব্লাডের দরকার।

পালবুড়োর চেষ্টায় দুলু প্রাণে বাঁচলেও তার ডান হাতটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রইল। অথর্ব হয়ে গেল দুলু। চোখ ফাটিয়ে কান্না এল তার। কুলু কাহার তার কোঁকড়ানো চুলে স্নেহের হাত রেখে বলল, চোখ মুছ। যা হবার তা তো খোদা করে দেখাল। খোদার উপর আমার কুনো রাগ নেই বেটা। তুর এট্টা হাত নেই তো কি আছে? তুর দুটা পা আচে। যার পা আচে সে তো ভবঘুরে। ইবার থিকে তুই চরে খা। আমি খোদাতালার কাছে তুর লাগি দোয়া মাঙচি।

দুলু সেই থেকে না ভিখারি, না বাউল, না ফকির। তবে তার গলায় চড়া সুরে খেলে বেড়ায় লালন ফকির। গাঁয়ে গঞ্জে, হাটে-বাজারে এমনকী রেলগাড়ির কামরায় সে ভিখ মেঙ্গে বেড়ায় সকাল থেকে সন্ধে। গান শোনানোর পরে বা হাতটা বাড়িয়ে দেয় হাতের তালু চওড়া করে। কেউ দেয়, কেউ আবার দেয় না। তবু সারাদিনে কুড়িয়ে বাড়িয়ে সে যা পায় তাতে তার দিব্যি চলে যায়। এখন মনে কোনো খেদ নেই দুলুর। কুলু কাহার তাকে বিয়ের কথা বললে দুলু হাসে, আর আমারে বাঁধতে চেও না বাপ। মন আমার বারমুখী হয়েছে। এ ঘর যে কবে পর হয়ে যাবে-সে কতা আমি হলফ করে বলতে পারচি নে। যে কদিন আমি সংসারের লতায় জড়িয়ে আছি, সে কদিন তুমাদের কুনো অসুবিধে হতে দিব না। জান দিয়ে হলেও তুমাদের আমি সেবা করে যাবো।

সন্ধে সাড়ে সাতটায় বাস থেকে নামল দুলু কাহার। তার গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা, মাথার কোঁকড়া চুল ঘাড় ছাপিয়ে কাঁধ ছুঁয়েছে, কপালে খড়ি দিয়ে আঁকা রসকলি, চোখে মুখে ক্লান্তির পাশে অদ্ভুত এক প্রসন্নতা। জমা জলে পা দিয়ে সে কিছুটা বিব্রত। পায়ের চপ্পলটা আর একটু হলে তাকে বেকায়দায় ফেলে দিত, নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে সে আশেপাশে আবেশী চোখে তাকাল। তার ঢুলু ঢুলু উদাসী চোখ হঠাৎই রঘুনাথকে দেখতে পেয়ে প্রফুল্লবোধ করল, কি রে, তুই ইখানে কি করচিলি? ফিরবি নে?

ঢিলিকাকিকে খুঁজতে বেরিয়েচি। রঘুনাথ এগিয়ে এল সামনে, তুমি তো দেবগ্রাম থিকে ফিরলে, সিখানে কি তার সাথে দিখা হলো তুমার? বাউল-কায়দায় ঘাড় নাচাল দুলু কাহার, তার কাটা হাতের ল্যাকপ্যাক করা জামার কাপড়টা সেই ছন্দে দুলে উঠল, তুর কাকারে বল–একবার বরমপুর বা কেসনগরে লিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে। শুনেচি ওর তো পয়সার কুনো অভাব নেই। অভাব নেই যখন তখন ওর অতো হাড়কিপটেমী কেন? টাকা-পয়সা কি সঙ্গে যাবার ধন রে! ওসব হল অলিত্য। নদীর ঢেউ। আজ আচে, কাল নেই।

রঘুনাথ চুপচাপ শুনছিল। সে সব জেনে-বুঝেও এখন কিছু বলতে পারে না। ঘরের কথা বাইরে বলা শোভা দেয় না। লোক হাসবে। নিন্দে করবে। মুখে কুলুপ এঁটে রঘুনাথ দুলু কাহারের দিকে তাকাল, চলো দুলুকাকা। ঘরে গিয়ে আবার খপরটা দিতে হবে।

-খপর দিয়ে কি হবে? তারে তো আমি পেরাই লালগুলা টেরেনে দেখি। দুল ঠোঁট কুঁচকে আধ্যাত্মিক-মুদ্রায় ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিছুক্ষণ পরে সে নিজের অবস্থায় ফিরে বলল, চল চা খাই। আজ রাতে ঘুম ভালো হবে বুঝতে পারছি। সারাদিন ভেষণ কষ্ট যায়। গান গেয়ে-গেয়ে গলাটা ঘড়ঘড় করে ব্যথায়।

-একটু আরাম করলেই তো পারো।

–তা যায়। কিন্তু সনসার? সনসার যে আরামের কতা বলে না।

বাঁশের বাতা চিরে বানানো হয়েছে বেঞ্চি। লোক বসে-বসে চকচক করছে সেই বাতা। টুকরো ছিটকাপড় দিয়ে বানানো ঝোলাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বাঁ-হাত দিয়ে কাঁধটা রগড়ে নিল দুলু কাহার, তারপর গর্দান নাড়িয়ে মেয়েলী স্বরে বলল, দুটো চা।

দুলু পেশার সঙ্গে নিজেকে পাল্টে নিয়েছে পুরো মাত্রায়। চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে সে এখন ভিন্নমানুষ। যারা তাকে বছর পাঁচেক আগেও দেখেছে তারা এখন অবাক হয় দুলুর এই পরিবর্তনে। কুলু কাহার ছেলের এই পরিবর্তনে মাথার চুল চেপে আক্ষেপ করে, হায় খুদা, এ কী করলে গো তুমি? সব দিয়ে কেড়ে নিলে কেনে? আমার দুষটা কুথায়?

বাপের এই হাহাকারকে কোনো গুরুত্ব দেয় না দুলু। সে জানে দু-দিনের এই শরীর জলে ভাসবে, দাঁড়কাকে ঠুকরে খাবে। পচা দেহকে এত ভালোবেসে কি হবে? ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাড়ে চুমুক দিয়ে দুলু কাহার বলল, সামনে বড়ো খারাপ দিন আসচে রে! এমন এট্টা খারাপ দিন আসচে যখন মানুষ মানুষকে চিনবে না। এই দাদা, ভাই, কাকাখুড়োর সম্পর্কগুলো সব রেললাইনের খোয়ার চেয়েও নিরেট হয়ে যাবে। মানুষের মন থিকে দয়া-মায়া সব মুচে যাবে। কপালে ভাঁজ ফেলে অন্যমনস্ক হয়ে গেল দুলু কাহার।

রঘুনাথ আয়েশ করে চা-খেয়ে ঠোঁট মুছে বলল, কাকা, এট্টা কতা বলি তুমারে। রাগ করো না।

-রাগ করবো কেনে? বল, বল।

-তুমি টেরেনে গান গাও, গান শোনাও। কই গাঁয়ের মানুষকে তো গান শোনাও না? রঘুনাথের প্রশ্নে সামান্য হলেও বিচলিতবোধ করল দুলু কাহার, গাঁয়ের মানুষের আগের সেই মন নাই। এখুন হাড়সার খাওয়া ফসল খেয়ে ওদের মন হাড়ের চেয়েও শক্ত হয়ে গিয়েছে। ওদের মনে দয়া-মায়া বস্তুটাই নাই। তাছাড়া ভিখ দেওয়ার সময় ওরা মুষ্ঠি ভরা চালটাও দিতে চায় না। ভিখ না পেলে আমার তো চলবেনি। তাই হররোজ গাঁ ছেড়ে পালাই! কাজ-কম্মো সেরে আবার গাঁয়ে ফিরি। আমার যে টিকি বাঁধা আচে এই গাঁয়ে!

রাতে জাউভাত রেঁধেছে দুর্গামণি। বৃষ্টির পরে তার মেজাজটাও বেশ ফুরফুরে। রঘুনাথকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে, সে জিজ্ঞাসা করল, নিদ লাগচে বুঝি? ভোক লাগলে বল-ভাত বেড়ে দিই।

রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল, দাদু মনে হয় শুয়ে পড়েচে।

–শুতে দে। দিনভর আরাম পায় না মানুষটা। দুর্গামণির গলা নরম হয়ে এল, দুলাল কাল চলে যাবে। এদিকে আবার ইন্দুমণির জ্বর এয়েচে। দেখ দেকি কেমুন বেপদ! আর ভালো লাগে না।

-কাকা কেনে মুনিষ খাটতে চায় না? রঘুনাথের হঠাৎ প্রশ্নে ঠোঁট ওল্টাল দুর্গামণি, বুক ভরানো শ্বাস ছেড়ে ছেলের মুখের দিকে তাকাল, সবার ভাগ্য সমান হয় না বাপ। কারো কারোর ভাগ্য ভুষো ছাই দিয়ে ওপরওয়ালা লিখে দেয়।

-কাকা কেনে খাটতে যায় না আমি জানি।

–কী জানিস? দুর্গামণির চোখ শক্ত হয়ে উঠল।

রঘুনাথ অকপটে বলল, কাকার স্বভাব ভালো নয়। গাঁয়ের মানুষ কাকাকে লিয়ে অনেক কথা বলে। কাকা চোর। আমার কচিয়াদাদুও চোর।

-চুপ। যা বলেচিস, আর বলবি নে। দুর্গামণি জ্বলে উঠল, ওরা তুর গুরুজন। ওদের লিয়ে কু-ভাবতে নেই।

-কু’ কাজ করলে কু-ভাবব না?

–না। তুই ছোট, ছোটর মতুন থাক।

-আমিও তো একদিন বড়ো হবো। তখুন?

–তখুন কি? চুলায় শুকনো তুষ ছড়িয়ে দিয়ে দুর্গামণি অঙ্গার চোখে রঘুনাথকে দেখল।

রঘুনাথ মায়ের চোখে চোখ ফেলে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, কাকা আর কচিয়াদাদুর মতন আমিও রেতেরবেলায় মুনিষ খাটতে যাবো। রাতেরমুনিষ হলে আমাকে আর বাবার মতন গাঁ-ছাড়া হতে হবেনি।

দুর্গামণির সারা শরীর কেঁপে উঠল রঘুনাথের কথা শুনে, ওসব কথা মনে আনাও পাপ। যা নাক-কান মুল। এই আমার মাথায় হাত রেখে বল–আর কুনোদিন এসব কথা মনে আনবি নে। তুই যদি এসব কথা ভাবিস-তাহলি আমার মরণ হবে বলে দিলাম। কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না।

রাতভর ঘুমাতে পারল না রঘুনাথ, ঘুরে-ফিরে মায়ের কথাই ভাবছিল সে। তাদের সংসারে অভাব আছে কিন্তু সেই অভাবের কাছে এখনও মাথা বিক্রি করে দেয়নি দুর্গামণি। সে বিপথগামী হবে না, এটাই তার শপথ।

রঘুনাথের মনে পড়ল অনেকদিন আগের একটা ঘটনা। দাদুর সঙ্গে ছাতু তুলতে গিয়েছিল সে বামুনবাড়ির জঙ্গলে। এই এলাকার বালি ছাতু বেশ বিখ্যাত। বর্ষার শুরুতেই শুরু হয়ে যায় ছাতু ফোটা। ছোট ছোট ছাতুগুলো বর্ষার জল পেয়ে বনফুলের মতো মেলে ধরে নিজেদের। অসংখ্য ছাতু যেন ঘাস ফুলের মতো জাহির করে নিজেদের। বামুনবাড়ির কর্তা নীলাক্ষবাবু এইগুলোকে নজরে রাখেন, কাউকে হাত লাগাতে দেন না। চাইলেও একটা ছাতু কাউকে তিনি দেবেন না। নিজের সম্পত্তির উপর তার টান বরাবরের। চুনারাম এসব তথ্য জানত। রঘুনাথকে নিয়ে সে তাই বেরিয়ে গিয়েছিল ভোর-ভোর। আলো ফুটলে মানুষজনের সমাগম বাড়বে। ছাতু তুলতে দেখলে সেই খবর পৌঁছে যাবে বাবুর কানে। বাবু রাগারাগি এবং গালমন্দ করবেন। সেরকম হলে পাকমোড়া দিয়ে কেড়ে নেবেন বেতপালি। তখন সব শ্রমই পণ্ডশ্রম।

প্রাণভরে ছাতু তুলে ঘরে ফিরে এসেছিল চুনারাম। ছাতু তোলার গল্প গর্বভরে শুনিয়ে দিল দুর্গামণিকে। রঘুনাথ ভেবেছিল দাদুর কথা শুনে খুশি হবে দুর্গামণি। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। সব শোনার পরে রাগে ঝাঁ-ঝাঁ করছিল দুর্গামণির মাথা, ছিঃ, একাজ তো মানুষের কাজ হয়নি। পরের বেড় থেকে ছাতু তুলে আনায় কুনো বাহাদুরী নেই। বাবু যদি দেখতি পেত তাহলি লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত।

রঘুনাথ অতিরিক্ত উৎসাহ নিয়ে বলেছিল, বাবু দেখবে কি করে? আমরা যে আলো না ফুটতেই ঘর থিকে বেরিয়ে গিয়েচি।

-কাজটা ভালো করিস নি বাপ। দুর্গামণির কণ্ঠস্বরে হতাশা ঝনঝনিয়ে উঠল, পরের জিনিস না বলে নিলে চুরি করা হয়।

–তাহলে আমরা চোর?

-হ্যাঁ, চোরই তো। দুর্গামণির গলা কঠিন হয়ে উঠল। এরপরে রঘুনাথের আর কথা বলার সাহস হয়ে উঠল না। বউমার রকমসকম দেখে চুনারাম আর কথা বাড়ায়নি। সুড়সুড় করে চলে গিয়েছিল তক্তাপোষের কাছে। দাওয়ার একধারে তক্তাপোষটা সব সময় পড়ে থাকে। চুনারামের ওটাই বিশ্রাম করার জায়গা। বসে পা দোলাচ্ছিল সে। দুর্গামনির কথা ভাবছিল সে। গরিবঘরের মেয়েটার সাহস আছে। অভাবে সে ভেঙে পড়ে না। অন্যায়ের কাছে নিজেকে সে বিকিয়ে দিতে শেখেনি। ধাওড়াপাড়ায় এমন বউ কটা ঘরে আছে? চুনারাম বিড়ি ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল বাতাসে। বউমার জন্য গর্ব হল তার। এ মেয়েই পারবে গুয়ারামকে পথে আনতে। এর হাতে সংসারের রাশ থাকলে সে সংসার খাদে তলিয়ে যাবে না।

দুর্গামণির মুখটাই ঘুমাতে দিচ্ছিল না রঘুনাথকে। সে উঠে গিয়ে চুনারামের বিছানার পাশ থেকে বিড়ির ডিবা আর দেশলাই নিয়ে এল। বিড়ি খেলে ধোঁয়ায় যদি মনটা খোলা হয়। সাবধানে বিড়ি ধরিয়ে ফুঁসফুঁস করে টানল রঘুনাথ। তবু মন থেকে তার ভয় গেল না। এ পাড়ার সব ছেলেরাই গুরুজনদের সামনে বিড়ি ফোঁকে। এটাই রেওয়াজ। দুর্গামণি রঘুনাথকে সেই সহজ পথে চলতে দেয়নি। চোখ রাঙিয়ে বারবার শাসন করেছে সে, খবরদার কুনোদিন ওসব ছুঁয়ে দেখবি না। যদি কুনোদিন তোকে নেশা করতে দেখেছি সেদিন চ্যালাকাঠ দিয়ে মেরে তুর মাথা ফেটিয়ে দেব।

-রতন, ড্যাবরা যে খায়?

–ওরা গু খায় বলে তুই-ও খাবি? দুর্গামণির জবাবের কাছে মাথা ঝুঁকে গেল রঘুনাথের। সেই থেকে একটা ভয় এবং শ্রদ্ধা তার মনের ভেতর বাসা বাঁধল। মাকে সে কোনো কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারে না। দুর্গামণি প্রায়ই তাকে বলে, শুধু ঘাড়ে-গর্দানে বড়ো হলে মানুষ বড়ো হয় না। মানুষকে বড়ো হতে গেলে বড়ো কাজ করে দেখাতে হয়।

বড়ো কাজ মানে দশের কাজ, সমাজের কাজ। রঘুনাথ ভাবে। এসব কাজে হিম্মত দরকার। চড়াইপাখির মতো বুক নিয়ে এসব কাজ হয় না।

বিড়িটা নিভিয়ে উঠোনে ফেলে দিল রঘুনাথ। পুরো মুখটা তেতো হয়ে গিয়েছে। গলাটা শুকোচ্ছে বারবার। মনটা ছটফট করছে কী জন্য সে ঠিক বুঝতে পারে না। সন্ধের পর থেকে জোর বৃষ্টি হয়েছে। পথের ধুলো এখন কাদা। মাটি থেকে অদ্ভুত একটা সুগন্ধ উঠে আসছে বাতাসে। খরার বাতাস আজ বড়ো অহঙ্কারী। এই শান্ত পরিবেশটা ভালো লাগছিল রঘুনাথের। শীত-শীত আমেজ ছড়িয়ে রয়েছে সাবধানে। বৃষ্টির সময় বুড়িগাঙের জলে খৈ-ফোটার মতো চড়বড় চড়বড় শব্দ হয়। জলের বিন্দুগুলো ভেঙে কাচের মতোন ছড়িয়ে যায় জলের উপর। সামান্য ঢেউ দিলে সেই দৃশ্য অপার্থিব।

রঘুনাথ ভাবল কাকার সঙ্গে তার একবার দেখা করার দরকার। লুলারামের প্রস্তাবটা মনে ধরার মতো। রাতের কাজটা ঠিকঠাক শিখে নিতে পারলে তখন শুধু টাকাই টাকা। গুয়ারাম রগড় করে বলে, টাকা নয় তো যেন চাঁদির জুতা। চাঁদির জুতায় কাঠেরপুতুল হাঁ-করে। বুবায় কতা বলে। মরা মানুষ পিটপিটিয়ে তাকায়।

রঘুনাথের টাকার ভীষণ দরকার। গুয়ারামের ঘর ছেড়ে যাওয়াটা তার মনোপূতঃ হয়নি। পেটের দায়ে মানুষ কেন জন্মভিটা ছাড়বে? মাটি ছেড়ে গেলে মানুষের আর থাকে কি?

লুলারামের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে কী ভেবে আগড় থেকে হাত সরিয়ে নিল রঘুনাথ। তার মন বলল, যাসনে রঘু, উখানে যাস নে। পাপের পুকায় কেমড়লে তার বিষজ্বালা বড়ো ভয়ঙ্কর। তুই সইতে পারবি নে, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাবি। তারচে ঘুরোন যা, ঘর যা। লুভের পথ, পাপের পথ তুর নয়।

কী ভেবে অন্ধকার বেড়ার ধার থেকে মাথা নিচু করে এল ফিরে রঘুনাথ। বাঁধের উপর উঠে এসে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। রাতেরবেলায় বাঁধের ধার শান্ত, একেবারে শুনশান। এসময় আকাশ থেকে দেবতারা নেমে এসে বুঝি হাওয়া খায়। বুড়িগাঙের জলে গা ধুয়ে আবার চলে যায় স্বর্গে।

এখন কদমগাছের পাতা নড়ছিল জলে হাওয়ায়। মুখ থ্যাবড়া পেঁচাটার মনে সুখ নেই। ইঁদুরগুলো আজ সব কোথায় পালাল? বসে বসে ঘাড় ঘুরাল পেঁচাটা। যেন ঘাড় নয়–পুরো শরীরটা তার ঘুরে গেল। এ সময় বুড়িগাঙের জলে কপাত করে ঘাই দিয়ে উঠল মাছ। দূরে কোথাও ক্র্যাও-ক্র্যাও শব্দে ডেকে উঠল রাতপাখির দল। এক-যোগে প্রহর ঘোষণা করে ভেসে এল শেয়ালের চিৎকার।

.

১০.

রঘুনাথ আকাশের দিকে তাকাল। ফিকে জ্যোৎস্না চুঁইয়ে নামছে পৃথিবীতে। অমাবস্যা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। হয়ত ভোরের দিকে আরও ঝকঝকে দেখাবে চারপাশ। কী ভেবে বাঁধের ঢালু পথ বেয়ে মাঠের দিকে একা একা নেবে গেল রঘুনাথ। তার হাতে লাঠি বা কোনো আলো নেই। সাহেবমাঠের আল সব সময় বিপজ্জনক। ওখানে শামুকভাঙা খরিস সাপের বসবাস। ওরা মাঠেই শঙ্খ লাগে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। ঘাস কাটতে গিয়ে দুপুরবেলায় রঘুনাথ অনেকগুলো খরিসের ছাকে দেখেছিল চরতে। ভয় যে লাগেনি তা নয়। তবে ওদের সে মারেনি। দুর্গামণি খরিসের ছাগুলোকে ড্যাকা বলে। ড্যাকা ওদের চলতি নাম। হাঁটতে হাঁটতে রঘুনাথের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি চলকে উঠল। এই মাঠে কমলার সঙ্গে তার কতবার দেখা হয়েছে। যতবারই চোখাচোখি হয়েছে ততবারই চোখ নামিয়ে ভীতু খরগোসের মতো দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছে কমলা। ওর নরম চোখের তারায় ধরা পড়ে যাওয়ার কাঁপুনি। এই কাঁপুনিটা রঘুনাথের বুকের ভেতরে পুরুষমথের মতো ফড়ফড় করে। এই ফড়ফড়ানীর অন্য নাম কষ্ট। সূর্যাক্ষ বলে, কষ্ট নয়রে, ভালোবাসা।

ভালোবাসা কি রঘুনাথ এখনও জানে না। তবে কমলার সঙ্গে তার যেদিন দেখা হবে সে রাতে সে স্বপ্ন দেখবেই দেখবে। ঘুম ভেঙে গেলে সারারাত তার আর ঘুম আসে না। আখখেতের আলের কচি-কচি ঘাস মাড়িয়ে কমলার দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তার মনের ভেতর বায়োস্কোপের ছবির মতো দুলতে থাকে। চোখ বুজে ভাবলে কী আনন্দ, মনটা কদমফুলের মতো ফুটে ওঠে, মৃদু চাপা একটা সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয় বিছানায়।

আজ সেসব কোনো অনুভব রঘুনাথকে ভাবায় না। সে ভাবছে একটাই কথা। সে কোন দিকে যাবে? চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। ধরা পড়লে? মার, অপমান, থানা-পুলিশ কিংবা জেল-হাজত। সে ধরা পড়বে কেন? গুরুবিদ্যা কোনোদিন কি বিফলে যায়? কাকার কাছে কাজ শিখবে সে। কাকা-ই হবে তার ওস্তাদ, গুরু। রঘুনাথ ভেতরে-ভেতরে তাতছিল। দুর্গামণির মুখটা মনে পড়তেই তার উথলে ওঠা আবেগে কে যেন ঠাণ্ডা জল ছিটিয়ে দিল। আলের উপর পা থেবড়ে বসে পড়ল সে। আবার দোলাচালের দোলনার মতো দুলতে লাগল মনটার। বাঁধের উপর দৌড়ঝাঁপ খেলা পাড়ার কুকুরগুলোর চিৎকার ভেসে এল, রোজ ওরা এসময় পাগল হয়ে যায় কেন? এটা কি কুকুরের স্বভাব? এভাবে চিৎকারে পাড়া মাথায় তোলার কোনো কি কারণ আছে, নাকি এই প্রহর পেরনো সময়ে তারা কী বিশেষ কাউকে দেখতে পায়? রঘুনাথ নিশ্চিত হল যে রাতের সময়টুকু সবার জন্য ভাগ-বাটোয়ারা করা থাকে। চোর কোন সময়টাকে পছন্দ করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করার জন্য? লুলারামকে একথা অবশ্যই সে জিজ্ঞাসা করবে। সব কাজেরই একটা নিয়ম-নীতি-নিষ্ঠা থাকার প্রয়োজন। এসব যখন রঘুনাথ ভাবছিল তখন বাঁধের উপর দিয়ে চলন্ত একটা আলোক উৎসকে দূর থেকে দেখতে পেল। আলোটা কিসের সেটা অনুমান করার জন্য সে ঘাড় সোজা করে বাঁধের দিকে তাকাল। তখনই তার কানে এল শেষযাত্রার ধ্বনি। বল হরি হরি বোল। কাদের আবার শূন্য হল সংসার? কার আবার পুড়ল কপাল? শ্মশানঘাটে যাওয়ার রাস্তাটা বাঁধ ধরে গিয়ে মানিকডিহির গাঁয়ে ঢোকার ঢালুপথ পেরিয়ে আরও অনেকটা। হ্যাজাকের আলো পায়ের গতির সঙ্গে দুলছে। সরে সরে যাচ্ছে জমকালো আলো। রঘুনাথ অনুমান করল হ্যাজাক নিয়ে শ্মশানে যাওয়ার মানে মৃতর বাড়ির অবস্থা মন্দ নয়। আলোটা বেশ কিছুক্ষণ পরে দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই একরাশ বিষাদ-দুঃখ এসে গ্রাস করল রঘুনাথকে। অথচ সে বুঝতে পারল না তার এত কিসের দুঃখ।

রাত বয়স্ক হতে থাকে, মাথার উপর উড়ন্ত রাতপাখির ডাকে রঘুনাথের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়। ঘরে ফেরার তাগিদটা এবার তাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। এত বড়ো একটা রাত দু-চোখের পাতা এক না করে ফুরিয়ে যাবে ভাবা যায় না। দুর্গামণি বলে, রাত উজগারা ভালো নয়। রাত শুধু ঘুম খায় না, খুনও খায়।

দু-হাতে ভর দিয়ে রঘুনাথ উঠে দাঁড়াতে চাইলে একটা ফিসফিস কথা তার কানের গহ্বরে সিঁধিয়ে যায়। এত রাতে কে কথা বলছে অমন চাপা গলায়? কণ্ঠস্বরটা চেনা মনে হচ্ছে, তবু সঠিক যেন চিনতে পারছে না সে। আগ্রহ আর বিস্ময়বোধে রঘুনাথ টানটান হয়ে বসে থাকল ঘাসের আসনে।

ঘন আখগাছের ভেতরে সম্ভবত দুজন মানুষ কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। এরা কি কথা বলার জন্য আর জায়গা খুঁজে পেল না। আশ্চর্য! রঘুনাথ শুনল একটি অপরিচিত কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন গলায় বলছে, এ হতে পারে না লুলাভাই। সব বিদ্যার চর্চা দরকার। চর্চা না থাকলে জং ধরবে। আর জং ধরলে কমে যাবে বিদ্যার ধার। তখন এই বয়সে ভেলকি হারিয়ে চোখ হবে সাধারণ হাটুরের মতোন। আমি চাই-হপ্তায় অন্তত দুটা করে কাণ্ড হোক।

সে তো হবে কিন্তু–। লুলারাম কী বলতে গিয়ে থামল, রোজ রাতে পুলিশ আসে আমার ঘরে। পাকুড়তলায় থানার গাড়িটা থামিয়ে তারা আমার কপাটে লাথ মারে। খিস্তি দেয়। এসব শুনে আমার মেয়েদুটো ভয়ে কাঁপে। তারা কান্নাকাটি করে। আমার আর ভালো লাগে না।

–ভালো না লাগলে চলবে? হাবুলচোর ঝুঁকে পড়ল, বসে খেলে সাগরও শুকিয়ে যায়। মানো তো কথাটা? নাকি মানো না? যাই হোক আমি বলছিলাম কি পুলিশও থাকবে, আবার চোরও থাকবে। এটা সংসারের নিয়ম। হাবুলচোর বড়ো করে শ্বাস টেনে নিল বুকের ভেতর, সেই শ্বাস শরীরে চালান করে লুলারামের মুখের দিকে সংশয় ভরা চোখে তাকাল, মরা পোড়ানো কি একা হয় গো, এরজন্য দল দরকার। বিদেশ-বিভূঁয়ে চুরির কাজে গেলে মানুষের খুব দরকার হয়। হাতে হাত না মিলিয়ে কাজ করলে খুব বিপদ। ধরা পড়ে গেলে ছাল ছাড়িয়ে ডুগডুগি বাজাবে। তবে তুমি থাকলে আমার কুনো চিন্তা থাকে না। তখন রাতকে ধমকাতে মন চায়।

অনেকক্ষণ চুপ করে গেল লুলারাম, একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল সে, কাজ করতে তো মন চায় হাবুলদা কিন্তু পেরে উঠি না। ছাতিটা আর আগের মতোন দঢ়ো নেই। বয়স হচ্চে তো

-এ তুমার ভুল ধারণা লুলাভাই।

–ভুল নয় গো, সত্যিকথা। মনে ভয় ঢুকেচে। ভয় হল গিয়ে উইপুকা। কখুন কুরে কুরে খেয়ে লিবে তুমাকে–টেরও পাবে না। লুলারাম ঘাড়-গর্দান টানটান করল। সামনে সরে এসে হাবুলচোর খপ করে হাত দুটো জড়িয়ে ধরল লুলারামের, ভাই, যে কতা বলছিলাম। মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্রপক্ষের দাবি-দাওয়া আচে। টাকার তো দরকার। কাজে না গেলে টাকা আসবে কুথা থেকে। টাকা তো আকাশ থিকে বৃষ্টির মতোন ঝরবেনি।

-তাহলে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেচো? তা কি নাম যেন তুমার মেয়ের?

–পারুল। হাবুলচোর কাশল, কন্যাদায় মহা দায়।

–বুঝলাম। তাহলে কী করতে চাও এখন? লুলারামের কথায় যেন প্রাণ ফিরে এল হাবুলচোরের, আমি ভাবছিলাম গাঙ পেরিয়ে নয়াগ্রামের দিকে গেলে কেমুন হয়? ওদিকটায় কারোর হাত লাগেনি। আমি খোঁজখবর লিয়ে দেকেছি–মন্মথ মাস্টারের বাড়িটা সব দিক দিয়ে ভালো। ভালো মালকড়িও পাওয়া যাবে। মা শীতলাবুড়ির কেপা হলে বড়পুজা অব্দি আরামে চলে যাবে।

-সে তো বুঝলাম। কিন্তুক অত লৌকো কুথায় পাবে?

–সে সব আমি ঠিক করে রেখেচি।

কপালে ভাঁজ ফেলে লুলারাম বলল, আরও ভালো করে খোঁজখপর নাও। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। সামনের মাসের অমাবস্যায় কাজ হয়ে যাবে।

-মাঝে কি তুমার ঘরে একবার আসব?

-আসতে পারো, তবে দিনের বেলায় ভুল করেও এসো না। গাঁয়ের সব মানুষ তুমাকে চেনে, তুমি কি করো সব জানে। লুলারাম সাবধান করার গলায় বলল।

হাবুলচোর কথা মিটে যাওয়ার পর তার কাপড়ের ঝোলা থেকে বের করে আনল দেশি মদের বোতল, কাচের গ্লাস, আর ডালমুট, লুলাভাই, তুমার জন্য এনেচি। লোকাল ভাটির মাল নয়, খাস বেথুয়ার জিনিস।

দুটো গ্লাসে মদ ঢালল হাবুলচোর, একটা গ্লাস লুলারামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এখন আর দেশী খেয়ে জুত পাই না। সব ভেজাল। কী খাবো বল তো? গাঁ-গঞ্জে জুচ্চোর ভরে গিয়েছে।

লুলারাম খোলা পানীয়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, মদ খাওয়ার সময় অতো কতা বলো না। নেশা জমতেও ধ্যানের দরকার।

হাবুলচোর মুখ দিয়ে দোষ-স্বীকার করার শব্দ করল, তা যা বলেচো। লাখ কথার এক কথা।

ওদের নেশা জমে উঠতেই রঘুনাথ আর দাঁড়াল না। হাবুলচোরকে সে যে এর আগে দেখেনি তা নয়। একবার পণ্ডিত বিলে টানাজাল ফেলে মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল সে। সেবার তাকে জামগাছে বেঁধে বেদম মারে গ্রামের লোক। পরে থানা থেকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রায় মাসের উপর লেগেছিল তার সুস্থ হতে। এত মার খেয়েও সে লুলারামের নাম ফাঁস করেনি। রঘুনাথ দেখেছে সেদিন বিলের রাস্তায় লুলারাম ঘোরাঘুরি করছিল বেশ ডাঁটের মাথায়। তার সতর্ক দৃষ্টি ছিল হাবুল চোরের চোখের উপর। দৃষ্টি দিয়ে দূর থেকে হাবুলচোরকে শাসন করছিল লুলারাম।

গুপ্তবিদ্যায় শাসন না থাকলে লাগামছাড়া হয়ে যায় ভাবনাচিন্তা। বাঁধের উপর এসে রঘুনাথ ভাবছিল –হাবুলচোরের মেয়ে পারুলের কথা। মেয়েটাকে সে দেখেছে। বেশ স্বাস্থ্যবতী, শ্যামলা। তবে ওর চোখ দুটো বেশ সুন্দর, কাজলটানা, পদ্মর পাপড়ির মতো। পারুলের চেহারায় একটা মাতৃমুখ ভেসে ওঠে। ওকে দেখে কোনো খারাপ চিন্তা মনে আসে না।

পারুলের ভাবনা যেন কমলার কথা মনে করিয়ে দেয় রঘুনাথকে। হপ্তাখানিক পেরিয়ে গেছে তবু ওর সাথে দেখা হয় নি। রঘুনাথ খবর নিয়ে জেনেছে-কমলা তার মামার বাড়ি গিয়েছিল। কুলবেড়িয়া হাঁটাপথ। ভ্যানরিকশার ঝামেলা নেই। কমলা যে ফিরেছে–এ খবর সে জানে। নোলকের সঙ্গে তার পাকুড়তলায় দেখা হয়েছিল। কী কথায় যেন নোলক বলে ফেলেছে কথাটা।

রঘুনাথ আর বাড়ির দিকে গেল না। কে যেন তাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল কমলাদের ঘরের দিকে। আজ রাতে তার আর ঘুম আসবে না, আজকের রাত তার ঘুরে বেড়ানোর রাত।

চেনা পথ তবু আঁধারে হাঁটতে রঘুনাথের কেমন ভয় ভয় করে। ভয় তার সুফল ওঝার ছেলে কাশীনাথের জন্য। ছেলেটার বড্ড মাথা গরম। বারদুয়েক স্কুল ফাইনাল দিয়েও সে বেড়া ডিঙাতে পারল না। এখন ঘরে বসে টিউশন পড়ায়। বাপের ওঝা- গিরির ওপর তার আস্থা একেবারে নেই বললেই চলে। সুফল ওঝা বলছিল, এই মাদুলি শরীলে ছুঁয়ে থাকলে সব পড়া তোর হড়হড়িয়ে মনে পড়ে যাবে। এই মাদুলির নাম–বিদ্যাদেবী সরস্বতী মাদুলি। বৃহস্পতিবারে তুই এটাকে ধারণ করবি। ধারণের দিন নিরামিষ খাবি।

নিষ্ঠাসহকারে ডান হাতের বাহুতে মাদুলিটা ধারণ করেছিল কাশীনাথ, কিন্তু কোনো কাজের কাজ হয়নি। পড়া মনে পড়া তো দূরের কথা, মুখস্থ পড়াও মনে পড়ছিল না ঠিকঠাক। ঘরে ফিরে এসে সুফল ওঝাকে রাগের মাথায় ধরিয়ে দিয়েছিল মাদুলি, এই নাও তোমার যন্ত্র। মগজে কিছু না থাকলে শুধু মাদুলি পরে কিছু হয় না। তোমার জন্য আমি স্কুল ফাইন্যাল পাশ করতে পারলাম না। তোমার এই মাদুলি আমার পড়ার ইচ্ছেটাকে নষ্ট করে দেয়। আমি যে মন নিয়ে পড়ছিলাম, সেই মনটাকে নষ্ট করে দিল তোমার এই মাদুলির চিন্তা। আমাকে দিয়ে তুমি যা করার করলে, খবরদার তুমি এ মাদুলি আর কাউকে দেবে না। আমার মতো আর কারোর সর্বনাশ হোক এ আমি চাইনে।

মুখ শুকিয়ে চুন ফুটেছিল সুফল ওঝার, দৃষ্টি নিষ্প্রভ। গলা কাঁপছিল উদ্বেগ দুঃশ্চিন্তায়। তবু ছেলের সামনে সে তার পেশাকে ছোট করতে পারে না। এতদিন ধরে লালন করা গর্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া কি সহজ? যে কোনো খেলায় জয়-পরাজয় থাকতেই পারে। তা বলে আত্মসমর্পণ কখনো উচিত নয়।

কাশীনাথ বদরাগী ছেলে। সে রঘুনাথের চাইতে বয়সে বড়ো হবে। সরাসরি কুস্তি লড়ে রঘুনাথ হয়তো তার সঙ্গে পারবে না। না পারলে পিছিয়ে সে আসবে না। কমলাকে সে মন দিয়েছে। একথা মিথ্যে নয়। মন দেওয়ার অর্থ নিজেকে অন্যের কাছে বন্ধক রাখা। মন এক জায়গায়, দেহ এক জায়গায়–এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। রঘুনাথ কঞ্চির আগোল সরিয়ে নিকোনো উঠোনে পা দিল। অমনি দাওয়ার শুয়ে থাকা কালো রঙের কুকুরটা ডাকতে ডাকতে ছুটে এল তার সামনে। রঘুনাথ ভয় পেল না। শরীর টানটান করে দাঁড়াল। চেনা মানুষ দেখে ডাক থেমে গেছে কুকুরের। পায়ের কাছে এসে সে লেজ নাড়ছিল আদর খাওয়ার জন্য। রঘুনাথ উবু হয়ে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বেশ বোঝা গেল রাতচরা গোরুর মতো তার এই জায়গায় যাতায়াত আছে। ইঙ্গিতপূর্ণ তিন টোকায় দরজা খুলে পাটখেতের বুনো হাওয়ার মতো বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলা, যেন সে জানত রঘুনাথ আসবে, সে না এসে থাকতে পারে না। তবু অভিমানে কমলার ঠোঁট নড়ে উঠল, এত দেরি হল যে! যাও, ভালো লাগে না। তোমার জন্যি পথ দেখে-দেখে চোখ আমার শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে গেল।

নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় রঘুনাথ শুধোল, কাশীদা কুথায়?

-সে তার ঘরে শুয়েচে। ঠোঁট উল্টাল কমলা। তারপর রঘুনাথকে ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে সে খিল লাগিয়ে দিল সতর্কভাবে।

তক্তাপোষের উপর এলোমেলো হয়ে আছে বিছানা। সেই বিছানা যেন রঘুনাথকে আকর্ষণ করছিল। কমলা গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে রঘুনাথের দিকে তাকাতেই ওরা দুজনে দু-জনের উপর ভেঙে পড়ল।

একটা বালিশে দুটো মাথা একে অন্যের দিকে মুখ করে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। কমলার বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে রঘুনাথ ফিসফিসিয়ে বলল, মামার ঘরে এতদিন থাকতে পারলে? আমার জন্যি তুমার বুঝি মন কেমুন করে না?

-কে বলল? কমলা রঘুর খোলা বুকে ঠুসে ধরল ঠোঁট, তোমার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। আমার যে কি হল আমি তা নিজেই জানি না। এভাবে চললে তোমার কাকির মতো পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হবে। এত কষ্ট বুকে নিয়ে কি বাঁচা যায় গো…

-তুমার এত কিসের কষ্ট?

-ও তুমি বুঝবে না। ছেলেদের প্রাণ সুপুরির চেয়েও শক্ত হয়। কমলার হাত রঘুনাথের বুকের উপর কিলবিল করে নড়ছে। একটা টান উত্তেজনা রঘুনাথের পায়ের বুড়ো আঙুলের কাছে এসে থেমে যাচ্ছে। ঘনঘন শ্বাস পড়ছে রঘুনাথের। ভয়ে কাঠ- ব্যাঙের মতো ক্রমাগত লাফাচ্ছে তার বুকটা।

বুকে মুখ গুঁজে কমলা কাতর চোখে তাকাল, এ ভাবে আর পারা যাচ্ছে না, চলো কোথাও পালিয়ে যাই।

রঘুনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, কুথায় যাবো বলদিনি?

-যেদিকে দু-চোখ যায়। কমলা সাহসী হয়ে উঠল।

-তুমার বাপ আমাকে বাণ চালিয়ে মেরে ফেলবে। তার মন্ত্রের বহু জোর। গাঁয়ের অনেক মানুষ তুমার বাপকে ভয় পায়। গলা কেঁপে গেল রঘুনাথের।

-তোমার ভেতর থেকে ভয় আর কোনোদিন গেল না। কমলা আশ্চর্য চোখে তাকাল, সেই প্রথম দিনের কথা তোমার মনে আছে। সেদিনও কাঁটা বের করতে গিয়ে তুমি ভয়ে কাঁপছিলে। তোমার এত ভয় কেন বলো তো?

রঘুনাথ কি জবাব দেবে খুঁজে পেল না। সে কমলার জ্যোৎস্নানরম মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল সে আকাশের চাঁদকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। জ্যোৎস্নার প্লাবনে ভেসে উঠছে তার শরীর।

সাঁঝবেলায় হাট থেকে ফেরার সময় কাঁটা ঢুকে গিয়েছিল কমলার পায়ে। হাঁটতে হাঁটতে ঝপ করে সে বসে পড়েছিল ধুলোয়। তার অস্ফুট আওয়াজে রঘুনাথ এগিয়ে গিয়েছিল সামনে, কী হয়েছে গো?

সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কমলা বলেছিল, পায়ে কাঁটা ঢুকে গিয়েছে। কাঁটাটা ভেঙে গিয়েছে। আর বেরুচ্ছে না। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।

-আমি কাঁটা বের করতে পারি। কথাগুলো বলে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল রঘুনাথ, যদি বলো তো চেষ্টা করে দেখতে পারি।

সংশয়াচ্ছন্ন চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল কমলা, দেরি করো না। খুব ব্যথা হচ্ছে। যা করার তাড়াতাড়ি করো। আমাকে আবার অতটা পথ যেতে হবে।

রঘুনাথ অনুমতি পেয়ে বাজারের থলিটা নামিয়ে রেখেছিল রাস্তার একপাশে।

তারপর হন্তদন্ত হয়ে ভেঙে এনেছিল খেজুরগাছের কাঁটা। মুখের থুতু দিয়ে সে কমলার পায়ের তালু পরিষ্কার করে কাঁটা দিয়ে বের করে দিল কাঁটা। বেশ বড় ধরনের বাবলাকাঁটা। ভাঙা কাঁটাটা কমলার হাতে তুলে দিয়ে বলল, নড়ো না। আর এট্টু বসো। আমি হাড়মটমটির রস হাতে পিষে লাগিয়ে দিচ্ছি। অক্ত আর বেরবে না, বিদনাও কমে যাবে।

কমলা অবাক হয়ে সেদিন রঘুনাথকে দেখেছিল। খুব বেশি বয়সের ফারাক হবে না ওদের। বলা যেতে পারে প্রায়ই সমবয়েসী। এই বয়সের ছেলেরা মেয়েদের ছুঁতে ভয় পায়। কমলা সেদিনই টের পেয়েছিল রঘুনাথের শরীরের কাঁপুনি। সেই কাঁপুনিটা রঘুনাথ এখনও বুকের ভেতর বয়ে বেড়ায়। অথচ কমলা সেই কাঁপুনিটাকে থামিয়ে দিতে উদগ্রীব। রঘুনাথের হাতটা বুকে চেপে সে বলে, দেখো, আমি কেমন ঘামছি। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো তো। আমার ঘামগুলো তুমি শুষে নাও। এই গরম আমি আর সহ্য করতে পারছি নে…। ণ

রঘুনাথের বুকের উপর ভেঙে পড়ল কমলা, কাজলাদিঘির জলের মতো ছড়িয়ে গেল তার কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো মাথার চুল। কমলা উশখুশিয়ে উঠল। ওর সারা শরীর জুড়ে ঢেউ উঠছে, হঠাৎ আসা বন্যায় সে বুঝি ভেসে যাবে, হারিয়ে যাবে। তার ডাকে সাড়া দিতে পারে না রঘুনাথ, একটা অলঙ্ঘনীয় ভয় তার রক্তে পানকৌড়ি পাখির মতো ডুবসাঁতার কাটে, হারিয়ে যায় আবার ভেসে ওঠে, সাঁতরে অবলীলায় চলে যায় শরীরের একপাড় থেকে অন্যপাড়ে। কমলা ফুঁপিয়ে ওঠার আগে হকচকিয়ে তাকাল, কী হলো, ঠাকুর দেখার মতো কি দেখছো আমাকে! তোমার কি কোনো কথা নেই, ভাষা নেই।

রঘুনাথ গাছের মতো স্তব্ধ চোখে তাকাল, ইবার আমাকে ফিরতে হবেখন। রাত ফুরিয়ে আসছে। মনে হয় পোকরাতারা ফুটে উঠেচে আকাশে।

কমলা বিরক্তিতে ভ্রূ-কুঁচকে বলল, এত কষ্ট করে তোমার আসার কি দরকার ছিল বুঝি না। ঝুঁকি যখন নিয়েছে তখন আর একটু ঝুঁকি নিলেই পারতে।

রঘুনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি চাইনে আমার ভুলের জন্য তুমি জীবনভর কাঁদো। তুমাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছু নেই।

এবার ফুঁসে উঠল কমলা, ঢং করো না। তোমার কি আছে–তুমি কি তা জানো? কোনো মানুষই জানে না তার আসল শক্তির কথা।

রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল, আমি জানি-তুমার ভেতরে কী শক্তি আছে। মেয়েমানুষের ভেতরে নদী থাকে, বন থাকে। তারা মাঠের ঘাস। রাগ নেই, দুঃখ নেই।

একথা শুনে কমলার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। ছাড়া চুল খোঁপা করে নিয়ে সে সবিস্ময়ে নিজের দিকে তাকাল, আমার অনেক ভাগ্য যে তোমার মতো ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সবাই যেরকম হয়–তুমি সেরকম নও। তুমি আলাদা।

রঘুনাথ প্রতিক্রিয়াহীন। সে শুধু মুচকি হেসে বলল, আমার মা বলে সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নাহলে সম্পর্ক পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছাড়ে। তুমার আমার মেলামেশাটা পচা সুতোর বাঁধন নয় যে হুট করে তা ছিঁড়ে যাবে।

তোমার কি আমার কাছে কিছু চাওয়ার নেই? কমলার সকৌতুক প্রশ্ন। কাঁধ ঝাঁকিয়ে রঘুনাথ বলল, চাওয়ার কি আছে? না চাইতে তুমি আমাকে সব দিয়েছো। আমার এখন শুধু একটাই চাওয়া। সারাজীবন আমি যেন তুমার মুখের হাসিটুকু দেখতে পাই।

কমলা ফোটা পদ্মের মতো অপেক্ষায় ছিল ভ্রমরের গুঞ্জন শোনার জন্য। রঘুনাথ সমর্পণের গলায় বলল, ডুবে যাওয়া সহজ কিন্তু ভেসে থাকা কঠিন। আমি সদা সর্বদা তুমার মনে ভেসে থাকতে চাই।

রঘুনাথ জানে কমলার সঙ্গে তার এই সম্পর্ক এ সমাজ কোনোদিনও মেনে নেবে না। এই সম্পর্ক পরিণতির দিকে এগোলে ঝড় উঠবে। এলোমেলো হয়ে যাবে তাদের সংসার। মাটি হারা হয়ে বাঁচতে হবে তাদের। পালিয়ে বাঁচার মধ্যে সুখ কোথায়? তাছাড়া কমলার যদি মোহভঙ্গ হয় তখন? কাঁচা বয়সের ভালোবাসার রঙ পাকা হলেও সেই রঙের স্থায়ীত্ব কলার কষের মতো গাঢ় বা দীর্ঘস্থায়ী নয়। রঘুনাথের বুকের ভেতর তাই ভয়ের উইটিপিটা একটু একটু করে বাড়ছে।

বারোয়ারিতলার রামযাত্রার আসরে কমলাকে পাপড় কিনে দিয়েছিল রঘুনাথ। কাশীনাথ এটাকে ভালো নজরে দেখেনি। রঘুনাথকে বাঁধের ধারে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধমকেছে, বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়াতে যাস নে। হাত ভেঙে দেব।

-কী যা তা বলচো! রঘুনাথের গলায় ফ্যাসফেসে শব্দ উঠল।

–যা তা নয়, ঠিক বলছি। বাবার কানে কথাটা তুলে দিলে তুই কি ধাওড়াপাড়ায় টিকতে পারবি? কাশীনাথের তিক্তস্বরে বিষ ঝরে পড়ল। এখনও সময় আছে, সাবধান হয়ে যা। বেশি বাড়লে ব্যাঙের ছাতার মতো ফুটুরডুম হয়ে যাবি।

সেদিন কাশীনাথের চোখে জ্বলন্ত আঁচ দেখেছিল রঘুনাথ। সামান্য হলেও ভয় পেয়েছিল সে। সে জানে কাশীনাথের একটা দল আছে গ্রামের মধ্যে। সে দলের সব সদস্যই তার বয়সী। ওদের মাথা গরম, টেম্পার বেশি। ছোট-বড় জ্ঞান ওদের খুব কম। রঘুনাথ ইচ্ছে করেই আর কথা বাড়ায়নি। সে জানত এখানে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হবে না। সমাজের স্তরগুলো একদিনে ভাঙবে না। ওগুলো ভাঙার জন্য কপোতাক্ষর মতো বেশ কিছু মানুষের দরকার। সূর্যাক্ষর মতো উদার মন না হলে বুড়িগাঙের জলও একদিন সমাজ-সংস্কারের ধুয়োয় কালো হয়ে যাবে।

রামযাত্রার শেষে কমলা রঘুনাথকে খুঁজছিল। কাশীনাথ তার চঞ্চল চোখের তারাকে এক জায়গায় থামিয়ে দিল কথার বাণে, তুই যাকে খুঁজছিস তাকে আমি লাথি মেরে ভাগিয়ে দিয়েছি। ছিঃ কমলা, তোর এতটা নীচে নামা উচিত হয়নি। মনে রাখিস–তুই সুফল ওঝার মেয়ে। তোর বাবার সুনাম দশ গাঁয়ে। তুই যদি ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসিস তাহলে আমাদের আর মুখ দেখাবার জায়গা থাকবে না।

–তুই অকারণে অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে ভাবছিস দাদা। কমলার টলটলে চোখে পাপের কোনো স্পর্শ ছিল না, রঘু আমাদের গাঁয়ের ছেলে। ও আমাকে একটা পাঁপড় কিনে দিয়েছে-এতে দোষ কোথায়? ওর সরলতাকে কু-নজরে দেখা উচিত নয়।

-তুই বড়ো হয়েছিস–একথাটা মাথায় রাখিস। কাশীনাথ ভেঙে পড়ল না, রুখে দাঁড়াল, লোক যাতে আঙুল তুলে কিছু না বলতে পারে সেইজন্য তোকে আগে-ভাগে নিষেধ করলাম। মানুষ যখন ভুল করে, সেই ভুলটা সে নিজে ধরতে পারে না। অন্যকে ধরিয়ে দিতে হয়।

-রঘুনাথের উপর তোর কি আগে থেকে কোনো রাগ ছিল?

কাশীনাথ শরীর ঝাঁকিয়ে কুলকুল করে হেসে উঠল, রাগ? ওর উপর রাগ করার আমার সময় কোথায়? ওর সাথে তুই আমাকে গুলিয়ে ফেলেছিস কেন? ও কোথায়, আর আমি কোথায়!

ঠোঁট কামড়ে অবজ্ঞার হাসি হেসে উঠল কমলা, কে যে কোথায় তা যদি সে নিজে বুঝতে পারত তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।

-একটা বুনোপাড়ার ছেলের জন্য ওকালতি করে তুই আমাকে ছোট করছিস?

ছোট তুই অনেক আগেই হয়ে গেছিস। রঘুনাথকে শাসিয়েছিস-সেটা খুব বড়ো মাপের বাহাদুরির কাজ নয়। কমলার স্ফুরিত ঠোঁট ঘৃণায় বেঁকেচুরে গেল। কাশীনাথ সেই রক্তবর্ণ চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। কমলা এত শক্তি পেল কোথা থেকে? সে শুনেছে প্রেমে পড়লে মানুষ বড়ো একরোখা হয়ে যায়। তখন বর্ষার নদীকে তার মনে হয় মামুলি ডোবা। জলোচ্ছ্বাসকে মনে হয় জলের ছিটে। তাহলে কি কমলা ইতিমধ্যে মন দিয়ে ফেলেছে বুনোপাড়ার রঘুনাথকে। ব্যাপারটা বেশ জটিল এবং উদ্বেগপূর্ণ। এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। কমলার ঘোরাফেরা, হাবভাব মেলামেশার উপর নজর রাখা দরকার। সুফল ওঝা ঘরে থাকে না। প্রায়ই এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে দৌড়াতে হয় তাকে। তার অবর্তমানে ছেলে হিসাবে কাশীনাথের দায়িত্ব কম নেই। দায়িত্ব এড়িয়ে থাকা যে ভীষণ কঠিন।

০৩. ভীষণ কষ্ট

১১.

কমলাকে ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট হয় রঘুনাথের।

আসার সময় কমলাও কেমন ম্লান বিধুর দৃষ্টিতে তাকায়। অনেক কিছু তার বলার থাকে, সে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারে না। সময় তখন ঘোড়ার মতো লাফায়। গুছিয়ে রাখা কথাগুলো সব ছেঁড়া মালার ফুলের মত এলোমেলো হয়ে পড়ে। অন্য কোনো প্রসঙ্গ এসে গিলে নেয় নির্দিষ্ট সময়।

ইদানীং কলাবতীর পাশে ইচ্ছে করে ঘুমায় না কমলা। অজুহাত দেখিয়ে বলে, অনেক রাতঅবধি আমি রেডিও শুনি। রেডিওর নাটকগুলো কী যে ভালো একবার শুনতে শুরু করলে শেষ না শুনে ছাড়া যায় না। আমি রেডিও শুনলে তোমার ঘুম চটকে যাবে মা। তোমাকে তো ভোরে উঠতে হয়। তোমার কষ্ট হবে।

রঘুনাথ আসবে তাই মিথ্যে কথার জাল বোনে কমলা। ওর জন্য রাত জাগতে কোনো কষ্ট হয় না তার। জানলা খুলে নেশাগ্রস্তের মতো ঠায় বসে থাকে সে। দৃষ্টি নিবদ্ধ ধুলো পথের দিকে। তাঁতশালের মাকুর মতো রঘুনাথেরও আসা-যাওয়ার বিরাম নেই। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে সে বুঝতে পারে না। সে জানে-চোরের দশ দিন তো মালিকের একদিন। সেদিনটাতে যে কী হবে। শিউরে ওঠে রঘুনাথ। কমলা তাকে সাহস জুগায়, ভয় পেও না। আমি তো আছি। পৃথিবীর সবাই একদিকে গেলেও আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। তাতে আমার যা হবার হোক। যে নিজের কাছে সাচ্চা, সে কেন অন্যকে ভয় পাবে।

কমলার ভালোবাসা ফুল ছুঁয়ে দেওয়ার মতো সুন্দর।

রঘুনাথ ওর ভালোবাসাকে ছুঁতে পারে, বুঝতে পারে। কমলা দল বেঁধে নাইতে আসে বুড়িগাঙে খরাবেলায়। কখনও সে চলে আসে পাকুড়তলার কলটাতে জল নিতে। এগুলো সব অজুহাত। যদি একবার রঘুনাথের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায় এই আশায়। আশা যে সবদিন পূরণ হয় তা নয়।

রঘুনাথের ঘাস ফড়িংয়ের স্বভাব। সে এক জায়গায় স্থিতু হতে জানে না। ইদানীং ওর বামুনপাড়ায় যাতায়াত বেড়েছে। সূর্যাক্ষ বন্ধুত্ব করেছে ওর সঙ্গে। দেবোত্তর ঠাকুরের বাড়িতে ওর এখন ঘনঘন যাতায়াত। কমলার মনটা অস্থির হয়ে ওঠে দ্বীপীর কথা ভেবে। দ্বীপীর মতো মেয়ে হয় না।

কমলার চোখের চাহুনি, চেহারা, কথা বলার ধরন দেখে দুর্গামণির মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে অনেকদিন আগে। রঘুনাথও নিজেকে বদলে নিয়েছে, সে এখন মায়ের কাছে ধোঁয়াশা দূরের জমি।

একদিন বাঁধের গোড়ায় দুর্গামণি ওদের দেখে ফেলে, এমন অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গ্রামসমাজে অচল এবং দৃষ্টিকটু। কমলা হেসে গড়িয়ে পড়ছিল রঘুনাথের উপর। নির্বিকার রঘুনাথ প্রতিক্রিয়াহীন। ঘনিষ্ঠতা না থাকলে এমনটা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসম ঘনিষ্ঠতা দুটি সবুজ মনে আগুন ধরায়। সেই আগুন এক সময় তৈরি করে দাবানল। পুড়িয়ে খাক করে দেয় সংসার। ভয়ে দুর্গামণির চোখের তারা কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসে। রঘুনাথকে একলা পেয়ে কাছে ডেকে বলে, সুফল ওঝার মেয়েটার কি নাম রে? বেশ বড়ো হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। রঘুনাথ মায়ের ভেতরের কথা আঁচ করতে পেরে চুপ করে থাকে। দুর্গামণি গলা চড়িয়ে বলে, ইখনকার ছেলেমেয়েদের কুনো লাজ-লজার বালাই নেই। ওরা যে নিজেদের কী ভাবে তা কে জানে। তা বাপ, তুরে এট্টা কথা বলি মন দিয়ে শুন। ঘরে তুর বাপ নেই। তুর কাকা থেকেও নেই। আপদ-বেপদ কিছু হলে আমি তুরে বাঁচাতে পারব নাই।

-কী বলতে চাইছো তুমি স্পষ্টাস্পষ্টি বলো তো? রঘুনাথের কথায় পোড়া লঙ্কার ঝাঁঝ।

-বলছিলাম কি ওই সুফল ওঝার মেয়েটার সঙ্গে বেশি ঢলাবি না। ওরা বড়ো ঘরের বিটি। ওদের গায়ে চট করে কাদা লাগে না। যত দোষ এই গরিব গুরবোদের-মনে রাখিস। দুর্গামণি আড়ষ্টতা কাটিয়ে বলল, ওর লজর দেখে আমার ভালো ঠেকেনি। মন বলছে তুর উপরে মেয়েটার টান জমেছে।

-সে আমি কি করে বলব? আমি হাত গুনতে জানি না। রঘুনাথ মুখ বেঁকিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইল।

দুর্গামণি তাকে ছাড়ল না, সত্যি করে বলতো–কবে থিকে ওর সাথে তুর আলাপ?

-কী যা তা বলছো! রঘুনাথ মায়ের দিকে বেজার চোখে তাকাল।

–যা তা নয় বাপ। ঠিক বলচি। দুর্গামণি জোরের সঙ্গে বলল, আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ লয়। আমি মা। আমাকে তুই ফাঁকি দিবি?

রঘুনাথ মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

দুর্গামণি ভাঙা গলায় বলল, বাপরে, এ কাজ তুর ঠিক কাজ হচ্চে না! পথ ছেড়ে দে। মেয়েটারে তুই যেতে দে। ওরে এটকে রাখলে তুর কষ্ট বাড়বে। সে-ও জ্বলবে।

রঘুনাথ বোবাদৃষ্টি মেলে তাকাল, মাকে তার বোঝানোর কোনো ক্ষমতা নেই। মার কাছে তাদের সম্পর্কটা যেন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

অন্ধকারে রঘুনাথ হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে। কমলার সঙ্গে দেখা হলে তার মনটা ফুরফুরে কাশফুলের মতো দোলা দিয়ে ওঠে। বুকের ভার কমে গিয়ে হালকাবোধ হয়। ঘরে ফিরে গিয়ে এখন তার ঘুম আসবে।

রাস্তার ধারে ঝাঁকড়া মাথার গাবগাছ অন্ধকারের চাদর জড়িয়ে মূর্তিমানের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাবতলায় এসে দম নিল রঘুনাথ। এভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে কমলার সঙ্গে দেখা করার কোনো অর্থ হয় না। সুফল ওঝা টের পেলে তার সর্বনাশ করে ছাড়বে। সুফল ওঝার রাগী মুখটা মনে পড়তেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল সে। ওই মুখটাকে সে আর দেখতে চায় না।

দূরে রাস্তার মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে দু-জন লোক। ওদের একজনের হাতে হ্যারিকেন আর অন্যজনের হাতে লাঠি, কোদাল। ওরা শেকড়বাকড়ের খোঁজে পাশের ঝোপে গিয়েছিল। কিছু শেকড় অমাবস্যায় তোলার নিয়ম। নাহলে সঠিক প্রয়োগ ঘটে না। রঘুনাথ কিসের আশঙ্কায় গাছের আড়ালে চলে গেল। দূর থেকে সুফল ওঝার গলাটা সে ঠিক চিনতে পেরেছে। অসময়ে তাকে দেখলে হাজার প্রশ্ন ভেসে আসবে। চোর বলে সন্দেহ করতে পারে। ইচ্ছে করলে রটিয়ে দিতে পারে বদনাম। রঘুনাথ কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না। গাবগাছের আড়ালে গিয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

সুফল ওঝার হাতের হ্যারিকেনটা দুলছিল। তার অন্য হাতে চটের থলি। মাটি সমেত শেকড়বাকড় বেরিয়ে আছে বাইরে। এগুলো ধুয়েমুছে সাফসুতরো করে তার ব্যবসা চলবে। ঝাড়-ফুক করে অবস্থা ফিরে গিয়েছে সুফল ওঝার। ঘরের খড়ের চাল সরিয়ে টিন দিয়েছে মাথার উপর। সেই টিনের চালে টিনের ময়ুর দোলে হাওয়ায়। দূর থেকে তা দেখতে পায় গ্রামের সবাই। অনেকের চোখ ঈর্ষায় করকরিয়ে ওঠে। সুফল ওঝার সেসব দিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের কাজে পাগল। নিজের ব্যবসা নিয়ে মাতাল।

দু-জন মানুষ গাবগাছ ছাড়িয়ে চলে যেতেই স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বাঁচল রঘুনাথ। তার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

রাতের আঁধারে শেকড় তোলার ঝুঁকি অনেক। ঝুঁকি ছাড়া আজকাল কোনো কাজ হয় না। কমলা হাসতে হাসতে বলে, ডরেছে কি মরেছো। আমার বাবাকে দেখো এই বয়সেও এ-গাঁ সে-গাঁ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওই মানুষটার কোনো ভয়ডর নেই।

আজ অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছে রঘুনাথ। ভাগ্যিস সুফল ওঝা রাতকালে ঘরে ছিল না। ঘরে থাকলে বিপদ বাধত। বয়স বাড়লে মানুষের ঘুম পাতলা হয়।

রাস্তায় উঠে এসে রঘুনাথের ইচ্ছে করল দৌড়ে বাঁধের ধারে চলে যেতে। কিন্তু বাধ সাধল বৃষ্টি। গুড়গুড় শব্দে রাগ উগরাল মেঘ। হাওয়া এসে মারতে লাগল শপাং শপাং চাবুক। গাছ কেঁপে গেল, উড়ে গেল ধুলো। চোখে হাত চাপা দিয়ে রঘুনাথ ধুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। বৃথা সেই চেষ্টা। দুড়দাড় শব্দে বৃষ্টি নামল। ভোরের বাতাস ভিজিয়ে দিল জলের ধারা। শুধু গাছপালা নয়, রঘুনাথও ভিজে গেল জলের ছাঁটে। ভিজে সপসপে হয়ে ঘরে ফিরল সে।

দুর্গামণি এখনও জেগে আছে রঘুনাথের প্রতীক্ষায়। ছেলেকে বিছানায় না দেখে তার মনে চিন্তা মাগুরমাছের কাঁটা মেরেছে। আর ঘুমাতে পারেনি সে। ছেলেটা রাতকালে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কোথায় যায়, কেন যায়? এ-ও কি সেই নেশা? এই সবে ষোল ছাড়িয়ে সতেরোয় পা রেখেছে রঘুনাথ, এর মধ্যেই এত কিছু। দুর্গামণির সব হিসাব ওলোট পালোট হয়ে গেল। নিজের যৌবনকালের কথা মনে পড়ল। তখনও প্রেম-পীরিত সব ছিল। ছিল এক বন্য উগ্রতা। শ্যামের বাঁশি শুনে রাধা কি যায়নি যমুনায়! শুধু রাধা নয়, শ্যামও গিয়েছে ছুটে। তখনও চাঁদ ভাসত আকাশে, সূর্য হাসত পুবের কোণে। তবু দুর্গামণি কোনোমতে মেনে নিতে পারে না। অসহায়ভাবে সে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাল, বেছানা ছেড়ে কুথায় গেছিলিস এত রাতে?

-বাঁশতলায়। নামুচাপ পেয়েছিলো। রঘুনাথ হাত কচলায়।

–মিচে কতা কোস নে। ধমক দিতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠল দুর্গামণির, তুর বাপ ঘরে নেই। এখুন এসব কাজ কি তুর পক্ষে ভালো দেকায়। ধরা পড়লে সারা গায়ে ঢিঢি পড়বে। তখুন এই পোড়ামুখ নিয়ে বেরতে পারবি?

রঘুনাথ ঘাবড়াল না, দুর্গামণির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল, কমলার সাথে দেকা না হলে আমার নিদ হত না। ওর সাথে দেকা করে এয়েচি, এতে পাপ কুথায়?

–পাপ থাকে মানুষের মনে। কার মুখ তুই চাপা দিবি, বাপ। দুর্গামণির থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ বলল, যা সত্যি তাকে আমি চাপা দিব কেন যা সত্যি তার থেকে তো ট্যাঁক গজায়। সেই ট্যাঁক থেকে গাছ হয়। গাছ সেই থেকে ফুল হয়, ফল হয়। এসব যদি পাপ না হয়, তাহলে আমারটাও পাপ নয়।

-চুপ কর। ও কথা বলিস নে। দুর্গামণি বর্ষার বাদল মেঘের মতো ভেঙে পড়ল।

.

ঝমঝমানো বৃষ্টি থামতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল দুলাল। কাজ ছেড়ে বসে থাকা কাজের মানুষের পক্ষে সব চাইতে বুঝি কঠিন কাজ। চারপাশে জল ঝরে পড়ছিল টুপটাপ। অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছিল চতুর্দিক জুড়ে। ইন্দু চোখ ঘুরিয়ে বলল, হাঁ দেখো গো, মাত্রর ক’দিনের বরষাতে সব কেমুন পান্টি গেচে। গাছপালাকে চেনা যায় না, প্রথম বে-হওয়া ম্যায়ার মতো লাগছে।

দুলাল ভরসায় চোখে তাকাল, তা যা বলেচো। তারপরই তার কণ্ঠস্বর আর্দ্র হয়ে গেল, এতবার এলাম-গেলাম তবু মনটা ও-দেশে বাঁধা পড়ল না। আমার এই দেশটা কতো সোন্দর গো। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। ভালো করে দেখলে আর চোখ ঘুরানো যায় না।

বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু হাওয়ায় ভাসছে জলীয়ভাব। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ জলকণা আত্মগোপন করে আছে বাতাসে। কদিনে অশ্বত্থগাছের পাতা আরও লাবণ্যময়ী হয়ে উঠেছে জলের সোহাগে। আখ খেতের দিকে তাকালে আর চোখ ঘোরানো যায় না, প্রতিদিনের দেখা আখগাছগুলো যেন স্ফুর্তিতে টগবগিয়ে উঠছে গাঙ পালানো হাওয়ায়। আলোর ঘাসও স্পর্ধা নিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।

দুলালদের যাওয়ার সময় ভূষণীবুড়ির গলা বুজে আসে কান্নায়। যত না কান্না আসে তার চেয়ে বেশি আসে কাঁপুনি। ছেলে বউ বাইরে থাকার অর্থ ভ্যারেণ্ডা গাছের মতো একা হয়ে যাওয়া। লোক বলে-একা না বোকা, ঠিক কথা। একা মানুষের মনটা সব সময় যেন ডানা ভাঙা পাখি, উড়তে পারে না। শুধু চিন্তা ভাবনার মেঘগুলো হানা দিয়ে কালো করে দেয় মুখখানা। দুলাল চলে যাওয়া মানে কলিজা উপড়ে বুড়িগাঙে ভাসিয়ে দেওয়া। অনেকদিন পরে ভূষণী বুড়ির সুবর্ণার মুখটা মনে পড়ল। সময় নদীর স্রোতের চেয়েও দ্রুতগতিতে বয়ে গেছে। সময়কে আটকে রাখবে এমন বলবান কোথায়? সুবর্ণা ধাওড়া পাড়া ছাড়ার আগে বলেছিল–সে আবার আসবে। কত বছর চলে গেল, ফি-বছর অশ্বত্থ গাছে নতুন পাতা গজায়, নতুন আলো এসে সেই তেল চকচকে পাতায় চুম্বন এঁকে দেয়, সব কিছুই হয় চারপাশ জুড়ে…শুধু কথা দিয়ে যাওয়া সুবর্ণা আর ফেরে না। সেদিন সুবর্ণাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল, ভূষণীবুড়ির মনে হচ্ছিল সুবর্ণাই নীলকণ্ঠর আসলি জোড়া। এ যেন যেমন হাঁড়ি তেমন সরা, একেবারে মাপে মাপে। বাবুঘরের বিটিদের খেয়াল-খুশি বোঝা দায়। সুবর্ণা যদি হিসাব মতো দুলালের পাশে দাঁড়াত তাহলে ছেলেটাকে আজ মাথায় বোঝা নিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে ভিন দেশে খাটতে যেতে হত না। ওদের অনেক ছিল। দুলাল কি তার থেকে কিছু পেতে পারত না? আসলে স্নো-পাউডার ঘষা সুর্বণা যা বলেছিল তা শুধু কথার কথা। একটা দীর্ঘশ্বাস ভূষণী বুড়িকে হারিয়ে দিয়ে মিশে গেল বাইরে। ভূষণীবুড়ি গলার কাঁপুনি থামিয়ে কোনোমতে বলল, শরীলের উপর লজর দিবি। শুধু কাজ কাজ করে শরীলটাকে ধসিয়ে দিবি তা যেন না হয়।

এবার ইন্দু সরে এল ভূষণীবুড়ির সমর্থনে, মা, তুমার বিটা আমার এট্টা কতাও শুনে না। মানা করলে আমারে করে মারতে আসে। লোকজন কুনো মানামানি নাই।

-ওঃ, মারবে সস্তা! তুমারে মারতে আসলে তুমিও চড়ে বসবা। ছাড়বা না। ভূষণীবুড়ি উল্টো সুরে রামায়ণ শুরু করল, তুমার শ্বশুরও অমন ত্যাড়াবেঁকা ছিল। নিশা করতে মানা করলে গজরাত। তবে আমিও কম ছিলাম না। দেশী মদের বোতলে আমি কাঁচা তেঁতুল সিজিয়ে মাড় করে রেখে দিতাম। ইবার কত খাবি খা। খাওয়া তো দূরে থাক রাগে শুধু খাবি খেত মানুষটা। অতীত একবার পিছু ধরলে ঘর ফেরে না। ভূষণীবুড়ি ছেলের মাথায় হাত রাখল, মেয়েটার লিয়ে ভাববি না। আমি তো আচি, আমি তো মরে যাইনি। বেশি বেগারবাই দেখলি পরে সে ঢ্যামনারে আমি টাইট দিয়ে ছেড়ে দিব। হারামীর ছানাটা ভেবেচেটা কি। ইবার কিছু হলে কতো ধানে কত চাল হয় তা আমি গুনে গুনে জামাইবাবাধনকে দেখিয়ে দেব। তুই মন শান্তি করে যা।

গরম দুধ জুড়ানোর মতো মনটা কি সহজে জুড়োতে চায়!

বিন্দুমণিকে নিয়ে দুলালের চিন্তার শেষ নেই। বিয়ের পরে রোজ তাকে চোখের জল ফেলতে হয়। রোজ শ্রীকান্ত তাকে লেবু চিপকানোর মতো চিপকায়। এমনিতে সংসারের যাতাকলে ভুষি হয়ে গিয়েছে তার জীবন, তার উপর ঘরের মানুষটার অত্যাচার তার মাথাটাকে বিগড়ে দিয়েছে।

দুবেলা খেতে পেলে কি সুখে থাকে মেয়েরা?

ইন্দু তবু মেয়েকে বোঝাতে কসুর ছাড়েনি। দুলালও তার পাশে ছিল সেই সময়। চোখের জল মুছে বিন্দু তাদের বলেছিল, তুমরা যাচ্ছ যাও। ও বেশি কিছু বাড়াবাড়ি করলে আমি পুটলি বেঁধে ঘর ফিরি যাবো। আর আসবো নি। কেনে আসব? আমার পিঠের চামড়া কি মোষের? শুধু পড়ে পড়ে মার খাবো। তুমরা কুনোদিন আমাকে মারোনি। ও কুথাকার কে হরি গো?

বিন্দুর মনের সব ক্ষোভ জ্বালা অশান্তি জড়ো করলে পণ্ডিত বিলের চাইতে আড়েবাড়ে বড়ো হবে। অশান্তির পাক আর ঘাঁটতে চায় নি দুলাল। বসন্তপুর ধ্যাওড়ার মুরুব্বির হাত ধরে বলেছে, খুড়াগো, মেয়েটা রইল, ওরে দেকো। ও তুমাদের লাতনির বয়সী গো। ভুলচুক করলে ওরে নিজের ভেবে মানিয়ে নিও। তারপর বেয়াই মশাইয়ের হাত ধরে সে কী বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। বেয়াই মশাই পেছনের মালাইচাকি চুলকে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ভয়ের কিছু লাই, চিন্তার কিছু লাই। সব ঠিক হয়ে যাবেন। তুমার ঘরের বিটি তো আমার ঘরের বিটি। ওসব নিয়ে ভেবো না। মন হালকা করে যাও। কাজ থিকে ফিরলে আবার এসে দেকা করে যেও।

জামাইয়ের দাবি ছিল সাইকেলের। এ বাজারে একটা সাইকেলের দাম মেরে কেটে মেলা টাকা। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? ভাবতে ভাবতে দুলাল যেন বুড়িয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ ইন্দুবালাই চিন্তামুক্তির আলোটা দেশলাই কাঠির মতো ফস করে জ্বেলে দিল, যে চার কাঠা জমিন আচে ওটা বেচে দাও। মানুষ থাকলে অমন জমিন ঢের হবে।

–দায়ে-অদায়ে শুধু ওইটুকুই তো ছিল! দুলালের চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল।

ইন্দু তাকে বুঝিয়ে বলল, দায়ে-অদায়ে তো প্রয়োজনের জিনিস লাগে গো। মেয়েটা ভালো থাকলে, ওর মুখে হাসি ফুটলে আমাদের আর বুড়া-বুড়ির কি চাই।

-ঠিক আছে, তুমার মতই আমার মত। দুলাল ঘাড় গুঁজে চলে গিয়েছিল গোঁসাই পাড়ায়। মাঝের গাঁয়ের নীলু বামুন বন্দকী কারবার করে। জমিটার উইল বাঁধা দিয়ে যদি কিছু টাকা দেয়? সুদ যা লাগবে শোধ করে দেবে সে।

বেঁচে থাকলে কারোর টাকা সে মারবে না।

নীলাক্ষ কথা রেখেছিলেন। সব শুনে বললেন, ঠিক আছে ঢাকা আমি দেব কিন্তু মুনিষ খেটে ফিরে আসার পর আমার টাকা ফেরত দিতে হবে। তখন আমি একদিনের জন্যও টাকা ফেলে রাখতে পারব না।

-সে ভাবতে হবে নি বাবু। গরিবের কতা চট করে নড়চড় হয় না। দুলাল অনুগত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে হাত কচলায়।

লেখাপড়া শেষ হলে টিপছাপ দিল দুলাল। টাকাগুলো গুণে নিয়ে সে আর দাঁড়াল না। সোজা বাঁধ ধরে চলে এসেছিল ঘরে।

বেয়াইঘর থেকে ফেরার সময় তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি এল। বেলগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়েও শরীর বাঁচাতে পারল না ওরা। ফাঁকা জায়গায় মাথা বাঁচানো দায়। ভিজে-নেয়ে ওরা ফিরে এল ধাওড়াপাড়ায়। তারপর থেকে শুরু হয় ফেরার মহড়া। বুকের পাথর নেমে যেতে বড়ো খুশি খুশি দেখাচ্ছিল দুলালকে, ইবার শান্তি মনে যেতে পারব। বেয়াই-মশাই আমার গা ছুঁয়ে কথা দিয়েচে-মেয়েটার কুনো ক্ষতি হবে না। আঃ, আজ বড়ো ভাল লাগছে গো!

বিদায়পর্ব শেষ হতেই বাঁধে উঠে এল ওরা।

দুলাল মুখ মুছে নিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে পিছন ফিরে তাকাল। অন্তত জনা পনের ছেলে-মেয়ে মাঝবয়েসী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তাদের দেখার জন্য। সাধারণত এপাড়ার খুব কম মানুষ বাইরে যায়। বাইরে যাওয়া বললে ওদের কাছে বড়োজোর দেবগ্রাম–বেথুয়াডহরী নয়ত কালীগঞ্জের হাটে যাওয়া। এই যাওয়াতেও বিচ্ছেদের ব্যথা আছে।

পথের এক পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টান করে বাঁধের দিকে হাপুস নয়নে চেয়েছিল ভূষণীবুড়ি। ধীরে-ধীরে ছোট হয়ে আসছিল ওদের দৃশ্যমান শরীর। বাঁক পেরতেই ওদের আর দেখতে পেল না সে। সাদা শাড়ির ময়লা আঁচল দাঁত দিয়ে চিপে শরীর বাঁকিয়ে কেঁদে উঠল সে। এমন সশব্দ ভগ্ন কান্নার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। সচকিত মানুষ এবার দৃষ্টি ঘোরাল ভূষণীবুড়ির উপর। সহানুভূতি, সমবেদনায় কলকলিয়ে উঠল জড়ো হওয়া গ্রামীণ মানুষ। বাতাস শুধু শুনতে পেল কাতর ভূষণীবুড়ির কণ্ঠস্বর, ইবার আমার কী হবে গো, ইবার আমি কারে লিয়ে থাকবো গো-ও-ও। আমার কলিজার ধন, পরানের টুকরা মুনিষ খাটতে চলে গেল গো-ও-ও-ও।

দুহাতে ধুলো আঁকড়ে ভূষণীবুড়ি মাটির মা হয়ে উঠল ক্রমশ।

.

১২.

টানা বৃষ্টিতে পুরো নেতিয়ে গিয়েছে কালীগঞ্জের অঞ্চল।

জগৎখালি বাঁধের উপর এখন প্যাচপ্যাচ করে কাদা। চন্দন রঙের ভেজা মাটি পেছল বড়ো। পা টিপে টিপে সাবধানে না হাঁটলে যে কোনো সময় বেসামাল হবে এই শরীর। চুনারাম এখন তাই ভয়ে বাঁধের উপরে খুব কম যায়। নেহাত ঠেকায় না পড়লে সে এড়িয়ে যায় বাঁধ ধার।

এখন বাঁধে দাঁড়িয়ে পুরো পণ্ডিত বিলটাকে দেখতে পায় গাঁয়ের মানুষ। বিল যেন ফুলেফেঁপে সাগর। সেখানে দিন রাত তালডিঙা নিয়ে মাছ ধরছে জেলেবস্তির লোকেরা। শুধু মাছ নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসেছে বিলে। বর্ষার সময় ডাহুক আর মেছো বকের চেহারা বুঝি পাল্টে যায়। গুড়গুড়ি বালিহাঁসগুলোকে যেন চেনাই যায় না। ওরা ডুব দেয়, কিছু দূরে গিয়ে আবার ওঠে। আবার ডুব দেয়, আবার ওঠে…এভাবেই চষে বেড়ায় সারা বিল। ওদের কালো কুচকুচে পাখনা থেকে তেল গড়ায়। চকচক করে পুরো শরীর। ওদের ছানাগুলো মা-বাবার পিঠের উপর চেপে আকাশ দেখে, বিলের জলের শোভা দেখে মোহিত হয়। শুধু মন খারাপ মেছেচিল আর মাছরাঙার। ভরা বিলে মাছের হদিশ পেতে তাদের কালঘাম বেরিয়ে পড়ে। এই বাড়তি জল সমস্যা বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের। জল না মরলে মনের মতো শিকার পাওয়া যাবে না। তখন পোকামাকড় ব্যাঙ গেঁড়ি-গুগলি খেয়ে বাঁচতে হবে।

বৃষ্টি হলে পিছু-নাচানো পাখিগুলোর সুখ ধরে না। ওরা নলখাগড়ার ঝোপে বসে মজা দেখে। কখনও ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় জলশোলার বনে। এখন বিল সবুজ হয়ে আছে জলশোলাগাছে। শুধু জলশোলা নয়, কত যে বুনোফুল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নাকছাবির মতো ফুটে আছে বিলের জলে-যার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না রঘুনাথ। চোখের আর কী দোষ। গত সাত-আটমাস বৃষ্টি হয়নি একফোঁটা। খটখটে মাটি ভাপ ছাড়ছিল হরদম। চারপাশে শুধু পাতা ঝলসে যাওয়ার কুঁচুটে ঘ্রাণ। এখন চারপাশ জুড়ে শুধু সবুজের সুঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে, পুরো এলাকাটাই হঠাৎ করে ধনী হয়ে উঠেছে বৃষ্টির জাদুস্পর্শে।

রঘুনাথ খেজুরগাছটার গোড়ায় এসে দাঁড়াল।

এসময় কমলার আসার কথা। লোকমুখে খবর পাঠিয়েছে সে। তার বিশেষ কী যেন দরকার। কী যে দরকার-ভাবছিল রঘুনাথ।

ক’দিন থেকে তার মনের অবস্থাও ভালো নেই, মেঘলা হয়ে আছে সব সময়। দুর্গামণির ভীতু চোখের দিকে সে এখন আর তাকাতে পারে না। ওর মনে ভয় ঢুকেছে। সে ভয় তাড়াবে কে? দুর্গামণির ধারণা হয়েছে-রঘুনাথকে সুফল ওঝা মেরে ফেলবে। এই অসম প্রেম সে কোনোদিন মেনে নেবে না।

কাশীনাথও মুখিয়ে আছে রঘুনাথকে জব্দ করার জন্য। এক কোপে পেলে সে আর দুকোপে যাবে না। বুনোপাড়ার ছেলে হয়ে তার বোনের হাত ধরেছে, ভাবা যায়? ঘোর অপরাধ। এই জঘন্য অপরাধের চরম শাস্তি হওয়া দরকার। শাস্তি যাতে সঠিক ভাবে দেওয়া যায় সেইজন্য গোপনে প্রস্তুত হচ্ছে সে।

রঘুনাথের এখন সামনে সমূহ বিপদ। তবু সে কমলার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে এসেছে। কতদিন দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। রাতে সে ছটফট করে, ঘুম আসে না। চোখের তারায় কমলার ছবি নড়ে ওঠে সর্বদা। মনের ভেতর কমলা পোষমানা টিয়াপাখির মতো কথা বলে।

আনমনে হাঁটতে গেলে হোঁচট খায় রঘুনাথ। হু-হু করে জ্বলছে বুড়ো আঙুলটা। কষ্ট হজম করে রঘুনাথ রাস্তার দিকে তাকাল। এদিকটা বেশ নির্জন। ফাঁকা ফাঁকা।

হেলেপড়া খেজুরগাছে বসে আছে মাছরাঙা পাখি। পাখিটারও চিন্তা। পাখির আবার কিসের চিন্তা-রঘুনাথ ভাবল। ওদের আকাশ আছে। খাঁচার চাইতে আকাশ কত বড়ো। ওদের গোপন ব্যাধির মতো ছোট জাত বড়ো জাত নেই। ওদের ধনী দরিদ্র নেই। ওরা সবাই মাছরাঙা।

বিলের জলে মুখ ভেঙ্গাচ্ছে সরু সরু ধানগাছ। গাছগুলো জল পেয়ে সব বেড়ে গেছে। ওসব গাছে ধান হবে না। দিনভর শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে খাড়া তীরের মতো। ওরা যে দাঁড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন-ওদের কষ্ট হয় না।

জলা ধানগাছগুলোর ভেতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে ঢোঁড়াসাপটা চলে গেল। রঘুনাথ দেখল ওদের গতিময় যাতায়াত। হাসি পেল। যেন অকাজের লোক, বেশি কাজ দেখাচ্ছে। ওদের চাইতে মেটে সাপগুলো ঢের ভালো। গায়ে পা পড়ে গেলেও ফুঁসে ওঠে না, মাটির চেয়েও শান্ত। শুধু ঝামেলা হয়, বুক ধকধকিয়ে ওঠে হঠাৎ ফণা তুলে দাঁড়ানো মাঠ খরিসসাপকে দেখলে। পালাবে না ছোবল মারবে–তা ওদের চোখ দেখে বোঝা যায় না। শুধু শরীর টানটান করে সতর্ক থাকতে হয়। না হলে বিপদ। ওরা তো সাক্ষাৎ যম। রঘুনাথের গা সিরসিরিয়ে উঠল।

দূর থেকে রঘু দেখতে পেল ছাতা হাতে নিয়ে কমলা আসছে, ওর পাশে দশ-বারো বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে। সম্ভবত ওর কাকা-জেঠার মেয়ে। ওর মা পাঠিয়েছে পাহারা দেবার জন্য। যে-ই পাঠাক না কেন, রঘুনাথ আজ ভয় পাবে না। সে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। হুমড়ে পড়া হাওয়া বাঁচাল শরীরে ছুটে গেল বিলের দিকে। খলবল করে নড়ে উঠল জল। ঢেউ উঠল ছোট-ছোট। রঘুনাথ বুঝতে পারল, ওগুলো ঢেউ নয়, হাসির ঝলক।

প্রেমে পড়লে মানুষ শুকনো গাছে ফুল দেখে। তখন ভূত-ভবিষ্যৎ ভুলে যায়। মাঝ বিলের তালডিঙার মতো প্রেমের ভবিষ্যৎ, এই ভেবে নিশ্চিত হলো রঘুনাথ। কমলা সব ব্যাপারে সাহসী। সংকোচহীন।

সে এসে নুয়ে পড়া খেজুরগাছটার পাশে এসে দাঁড়াল। তার পাশে ঠাকুরের ঘটের মতো দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। কমলা অস্বস্তি কাটিয়ে বলল, তোমাকে আমার ভীষণ দরকার। আজ বেথুয়া থেকে আমাকে দেখতে লোক এসেছিল। আমাকে দেখে ওদের পছন্দ হয়েছে। আজই পাকা কথা বলতে চায়। আমি রাজি হইনি। ওরা আবার দশ দিন পরে আসবে।

কমলা মন খারাপ করা চোখে তাকাল, ওর কাঁদো-কাঁদো মুখ। রঘুনাথ বিল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, হঠাৎ করে যে এত বিপদ এসে যাবে ভাবতে পারি নি। কী যে করব, মাথায় কিচু ঢুকচে না।

-তোমাকেই তো ভাবতে হবে। এখন বোবা হয়ে থাকলে বিপদ ঘটে যাবে। কমলার গলা কঠিন হয়ে উঠল ধীরে-ধীরে, আমি আর পারছি না ঘরবার সামলাতে। তাছাড়া আমার অত শক্তিও নেই। এ সময় আমার পাশে তোমার দাঁড়ানোর দরকার।

-বলো আমারে কী করতে হবে?

কমলা দুঃসাহসী হয়ে উঠল, চলো, আমরা পালিয়ে যাই।

কুথায় পেলুবো? বড়ো অসহায় শোনাল রঘুনাথের গলা।

–যেদিকে দুচোখ যায়। এত বড়ো পৃথিবীতে পালাবার জায়গার কি অভাব? শুধু ইচ্ছেটা থাকলেই হবে। জোর করল কমলা।

পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা কী ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ওকে কিছু বলতে হল না, ও পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল বিলের ধারে। আলোচনার গুরুত্ব বুঝে বোবা হয়ে গিয়েছে মেয়েটা।

ভুল করে শ্বাস ছেড়ে কমলা যেন রুইমাছের মতো ভেসে উঠল, যা বলার এখনই বলো, আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। দোকানে যাচ্ছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। তবু মা সঙ্গে বোনকে পাঠাল।

–তুমি যদি সুফল ওঝার মেয়ে না হতে তাহলে আমি আরও জোর পেতাম।

–সুফল ওঝার মেয়ে হওয়া কি পাপের?

-না, তা নয়। রঘুনাথ কমলার মন জুগিয়ে বলল, তুমি যা আমাকে করতে বলবে তাতেই আমি রাজি আচি।

-তাহলে ঘর কবে ছাড়বে?

–যেদিন তুমার মন হবে।

-বেশ। এখন আমি আসছি। কমলা এগিয়ে গিয়ে তার বোনকে ডাকল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে রঘুনাথকে একবার দেখল। রঘুনাথের দু-চোখে বিছিয়ে গিয়েছে শঙ্কা। এর পরিণতি কোথায় তা সে জানে না। সে শুধু জানে–তার কমলা আছে, কমলা থাকবে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। ঘরসুদ্ধু মানুষ এ বিয়েতে মত দিয়েছে। তার বাবা গর্ব করে বলছে, মেয়ে আমার বড়ো ঘরে পড়বে গো! এই পচা গা ছেড়ে মেয়ে আমার ঢেউনের বাসিন্দা হবে। সবই মা মনসার কৃপা। হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর দয়া।

কাশীনাথ কমলার বিয়ে নিয়ে তেমন বেশি আগ্রহী নয়। কেন না কমলা তার মান-সম্মান রেখে কথা বলে না। আজকাল তার ব্যবহার অনেকটাই পাগলের মতো। চাহনিও বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। সংসারের কাজে-কর্মে তার মন নেই। সব সময় কী যেন ভাবতে থাকে সে। কোথায় যেন হারিয়ে যায় সে। বোনের এই অন্যমনস্ক মনটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না কাশীনাথ। হাজার বুঝিয়ে যখন কাজ হল না, তখন হাল ছেড়ে দিয়েছে সে। কমলাও চায় না দাদা গায়ে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ করুক।

যার এত অনীহা, সেই কাশীনাথ খুশি হয়েছে পাত্রর সঙ্গে কথা বলে। মেয়ে দেখে পছন্দ হয়েছে ছেলের মা এবং আমার। ওরা পণ নেবে না, খালি হাতেই বৌ করে নিয়ে যাবে কমলাকে।

কলাবতী এতটা আশা করেনি। কমলাকে আড়ালে ডেকে সে বুঝিয়ে বলল, যাচা অন্ন ছাড়তে নেই মা। পরে তাহলে কপাল চাপড়াতে হয়। কমলা ঠোঁট কামড়ে বলেছিল, এ বিয়েতে আমার মত নেই, মা।

মত নেই, তার মানে? হাঁ-হয়ে গিয়েছিল কলাবতীর মুখ, এত ভালো ছেলে। এ ছেলেকে না করে দিলে শেষে তোর কপালে কানা-খোঁড়া জুটবে। তাছাড়া তোর মামা এনেছে সম্পর্কটা। মামার মান-সম্মানের কথা একবার ভাববি নে, মা।

বিয়েটা সারাজীবনের ব্যাপার। এ নিয়ে আমি কোনো আপোষ করতে চাই না। কমলার গলা থেকে ঝলকে ঝলকে নেমে এল বিরক্তি, আমাকে জোর করো না। জোর করলে এর ফল মারাত্মক হবে।

-তোর বাবাকে আমি কী বলব? মহাফ্যাসাদে পড়ে কলাবতী তাকাল।

–যা হোক একটা কিছু বানিয়ে বলে দাও।

–মিথ্যে কথা বলব?

–মিথ্যে কথা তো তুমি নিজের জন্য বলছো না, আমার জন্য বলছো। মেয়ের ভালোর জন্য মিথ্যে কথা বললে তোমার কোনো পাপ হবে না। কমলা নির্দ্বিধায় বলল কথাগুলো।

বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে সময় নেয় কলাবতী। এ কী শুনছে সে। দিনে দিনে মেয়েটার এ কী হলো? এই কমলাকে সে তো আগে চিনত না। যে মেয়েটা ভালো করে গুছিয়ে কথা বলতে পারত না, তার মুখে এমন কথা কে জুগাল? আর ভাবতে পারছিল না কলাবতী। মাথাটা বড্ড ধরেছে। মনে হয় চোরা গ্যাস- অম্বলের ফল।

মেজাজটা খিটখিটে হয়ে উঠল কলাবতীর, ওই বুনো ছেলেটার সঙ্গে তোর শেষ কবে দেখা হয়েছিল?

কমলা অকপটে বলল, ওর সাথে আমার রোজই দেখা হয়।

-কাজটা ভালো করছিস না, কমলা।

-ভালো-মন্দ আমি জানি না। আমার মন যা চায়, আমি তা করি। কমলা জেদ ধরে দাঁড়াল। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ে সে যেন অবজ্ঞাকে ছুঁড়ে দিতে চাইছিল কলাবতীর মুখের উপর।

কলাবতী আশ্চর্য হয়ে বলল, তুই যে এত বদলে যাবি আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তোর বাবার এত নামডাক। তার মেয়ে হয়ে তুই যদি এসব করিস তাহলে লোকে কি ভাববে?

-কে কি ভাবল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কলাবতীর মুখের দিকে তাকাল কমলা, তুমি এখন যাও মা। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। তবে একটা কথা, জোর করতে যেও না।

–জোর করব না? কলাবতীর কণ্ঠস্বরে বিস্ময়, আমি চাই–তোর ভালো হোক। তুই সুখি হ।

–তাহলে আর কেন কথা বাড়াচ্ছ। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।

-তুই এখনও আগুন আর জলের ফারাক বুঝিস না। তোর উপর কি সব ছেড়ে দেওয়া যায়, নাকি তা সম্ভব!

-তা যদি না পারো তাহলে তোমারই কষ্ট বাড়বে। কমলা জোরের সঙ্গে বলল, একটা পাগলও নিজের ভালোটা বোঝে। আমি তো পাগল নই, পুরোপুরি সুস্থ। তাহলে আমি কেন নিজের ভালো বুঝব না?

-যা ভালো বুঝিস কর তবে ভেবে-চিন্তে। পরে যেন কাঁদতে না হয়।

-কাঁদব না মা, আমি তো তোমার মেয়ে। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে কমলা তার কষ্টটাকে বশে রাখার চেষ্টা করল।

কমলা চলে যাওয়ার পর বিলের ধারটা বড়োই ফাঁকা লাগছিল রঘুনাথের। এমন যে ঝড় উঠবে ভাবতে পারেনি সে। মন টলে গিয়েছে বারবার। কমলার যা মানসিক শক্তি, সেই শক্তি রঘুনাথের ভেতরে কেন জন্ম নিল না? কেন বারবার হেরে যাচ্ছে সে। কেন দু’পা এগিয়ে পিছিয়ে আসছে দশ পা? এ অবস্থায় একবার যদি সূর্যাক্ষর সঙ্গে দেখা হত তাহলে বুক উজাড় করে সব কিছু বলতে পারত রঘুনাথ। সব শুনে সূর্যাক্ষ তাকে সঠিক রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে পারত। অনেকদিন হল মানিকডিহি যাওয়া হয় নি তার। সময়গুলো বুনো খরগোসের মতো ছুটে পালিয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে রঘুনাথের মনে পড়ে গেল হাবুল চোরের কথা। লুলারামও তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিতে পারে। ওদের অভিজ্ঞতার মূল্য তাকে দিতেই হয়। ওরা ঝুরি নামানো বটগাছের মতো।

লুলারামের প্রস্তাব মেনে নিলে টাকার কোনো অভাব হবে না রঘুনাথের। সে জানে–অর্থবল মহাবল। এর কোনো বিকল্প নেই। গ্রামসমাজে চট করে কেউ টাকা দিতে চায় না। অনেকেই টাকাকে ভালোবাসে নিজের চাইতে। সেই টাকার জন্য সে যদি একটু নীচে নামে তাহলে দোষ কোথায়? হাতে টাকা এলে কমলার সব অনুরোধ সে মেনে নিতে পারবে। কমলাকে আর দুঃশ্চিন্তার বোঝ মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করতে হবে না।

একটা পিটুলিগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রঘুনাথ দু’ভাগ হয়ে যাওয়া রাস্তাটার দিকে তাকাল। একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে হাবুল চোরের বাড়ি, অন্য রাস্তাটা বাঁক খেয়ে ছুঁয়ে দিয়েছে সূর্যাক্ষর ঘর। কোনটা বেশি নিরাপদ বুঝতে পারে না রঘুনাথ। সে যেন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে নিভে যাওয়া লম্ফ।

.

ধুলোর পথ টানা বর্ষায় রূপবদল করে চ্যাটচেটে কাদা। সতর্ক হয়ে পা না ফেললে পিছলে পড়ার ভয়। বড়ো ইস্কুলটার কাছে এসে রঘুনাথ শুনতে পেল কাশীনাথ তাকে ডাকছে। আজ কাশীনাথের সঙ্গে কোনো দলবল নেই, সে একা। ফলে রঘুনাথ সাড়া দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মুখ তুলে শুধাল, কী ব্যাপার কাশীদা?

তোর সাথে দুটো কথা আছে, দাঁড়া। জোরে পা চালিয়ে কাশীনাথ এগিয়ে এল, তোর কাছে বিড়ি আছে? যদি থাকে, দে। মাথাটা বড্ড ধরেছে। আর ভালো লাগছে না।

রঘুনাথ অবাক চোখে তাকাল কাশীনাথের দিকে। এত নরম কথার অর্থ বুঝতে পারল না সে। শয়তানের ছলের অভাব হয় না। আজ কি উদ্দেশ্য নিয়ে কাশীনাথ তাকে দাঁড় করাল ঠিক বুঝতে পারল না রঘুনাথ। তিতকুঁড়ো ঢোক গিলে রঘুনাথ হালকা গলায় বলল, তুমি আবার বিড়ি খাওয়া কবে থেকে ধরলে?

কাশীনাথ সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে তুই যে খাস? তুই তো আমার চাইতে অনেক ছোট।

পানসে হাসি ছড়িয়ে গেল রঘুনাথের মুখে, বিড়ি খেতে বয়স লাগে নাকি? বিড়ি খেতে গেলে শুধু কলিজার জোর দরকার। এই জোরকে অনেকে বলে দোম। তা বিড়ি যে খাবা–তুমার বুকে দোম আচে তো?

–আছে কী না নিজের চোখেই দেখ।

এবার আর বিড়ি না দিয়ে পারল না রঘুনাথ। শুধু বিড়ি নয়, সেই সঙ্গে ম্যাচিস বাক্সটা সে এগিয়ে দিল।

কাশীনাথ বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে রঘুনাথকে দেখছিল। অস্বস্তি হতেই রঘুনাথ শুধোল, অমন করে কী দেখচো কাশীদা?

-সত্যি কথা বলব? তোরে দেখছি।

ছ্যাঃ, বেটাছেলে আবার বেটাছেলেকে দেখে নাকি?

–কেন আমি দেখছি। এতে কোনো অন্যায় হয়েছে নাকি? কাশীনাথ ঝুঁকে পড়ল সামনে, কমলা তোর কথা খুব বলে। ও যে কত বোকা তা আমি এখন বুঝতে পারছি। আমার মনে হয় বোনটার মাথার ঠিক নেই। তা সত্যি করে বলতো–ওকে তুই কিছু খাইয়েছিস নাকি?

–এসব কী বলচো? রঘুনাথ ঘাবড়ে গেল, আমার বাপ-ঠাকুরদা ওসব বিদ্যে জানে না। ওসব বিদ্যে তো তুমার বাপ জানে, তাকে গিয়ে শুধধাও।

-না, না। তার কোনো দরকার হবে না। কাশীনাথ ঢোক গিলল। প্রসঙ্গ বদলে বলল, কোথায় গিয়েচিলিস অবেলায়?

দাদুর শরীল খারাপ, জ্বর। সাত দিন হয়ে গেল, ভালো হচ্ছে না। রঘুনাথের কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল, বড় কাহিল হয়ে গিয়েছে বুড়া মানুষটা। হাঁটতে চলতে পারে না। বসে থাকলেও টলে পড়ে।

–চটা ডাক্তারের পুরিয়া দিস নি? কাশীনাথ প্রশ্ন করল।

রঘুনাথ সহজভাবে বলল, হ্যাঁ দিয়েছি। কিন্তু তাতে কুনো কাজ হয়নি।

-নেশা ভাঙ করলে পুরিয়া-ওষুধে কাজ হয় না। এর জন্য কড়া-ডোজ দরকার।

সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নাড়ল রঘুনাথ।

কাশীনাথ বিজ্ঞের মতো বলল, এখনকার জ্বর-জ্বালা সব আলাদা। এক ওষুধে কাজ হয় না এখন। এসব জ্বর বাগে আনতে গেলে হাসপাতালের বড়ি-ইনজেকশন দরকার।

কাশীনাথের কথাটা ভুল নয়। চুনারামের জ্বরটার মতিগতি বোঝা গেল না সাত দিনে। সেদিন পণ্ডিত বিলে ছিপ ফেলতে গিয়েছিল চুনারাম। রোদ ফোঁটা দুপুর। বর্ষা কদিন ঢেলেই এখন ক্লান্ত। দম নিচ্ছে। কেঁচো খুঁড়ে মালাই চাকি ভরে ঘর থেকে বঁড়শি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল চুনারাম। বাঁশতলার ছায়ায় বসে বঁড়শি ফেলেছিল সে। হঠাৎ কেঁপে বৃষ্টি এল। চুনারাম প্রথমে ভেবেছিল–এই বৃষ্টি বুঝি ছাগল তাড়ানোর বৃষ্টি। কিছু পরে তার ভুল ভেঙে যায়। বৃষ্টি থামল না, ঝরল শুধু ঝরল। গোরুর মতো ভিজে গেল চুনারাম। সব বর্ষার জল সমান হয় না। এ বরষার জল গায়ে বসে গেল চুনারামের। এই ফাঁকে একটা দেড়হাত মাপের বাণ মাছ ধরল সে বঁড়শি গেঁথে। জলে বাণ মাছ কেন, চুনো মাছেরও তাগত কম নয়। ছিপে টান ধরতেই সে ভেবেছিল রাক্ষুসী বোয়াল। পরে জলের উপর ছরছর করে উঠতেই শুধু সূচলো লেজটুকু দেখা যায়। চোখের দৃষ্টি কমেছে। ছানি পড়েছে দু-চোখে। ফলে বাণ মাছের লেজকে তার ঢোঁড়াসাপের লেজ বলে ভ্রম হয়। পরে ডাঙায় তুলতে সেই ধন্দ কেটে গেল। খুশিতে ভরে গেল চুনারামের মনটা। বাণ মাছটা তিন পোয়ার কম হবে না। আহা, পেকে হলদে হয়ে আছে মসৃণ দেহ। শুধু শিরদাঁড়ার কাঁটাগুলো করাতের মুখের মতো খ্যাচখ্যাচ করে লাগে। হাতে ঢুকে গেলে যন্ত্রণা শুরু হয়। মাছ ধরার আনন্দে মাথায় জল বসে  গিয়েছিল চুনারামের। হুঁশ ফিরল যখন মাথার জল শুকিয়ে গেল মাথায়। প্রথম রাতে খুঁক খুঁকে কাশি, ভোররাতে তেড়েফুড়ে জ্বর এল গায়ে। তাকে সামলানো দায়। জড়িবুটি চলছিল কদিন। তাতে কাজ হল না। শরীর ঝিমিয়ে গেল ক্রমে ক্রমে। হারিয়ে গেল ভেতরের শক্তি। বুড়াটা যেন আরো বুড়িয়ে গেল চোখের সামনে। জ্বর উঠলে আনশান বকত সে। কখনও গান ধরত চেঁচিয়ে। কখনও কাঁদত সুর করে। দুর্গামণিকে বলত, যাও বউমা, আমার ছেলেটারে ডেকে আনো। যদি না যেতে পারো তাহলে খপর পাঠাও। আমার মন কু গাইচে। কখন চক্ষু বুজে আসবে তা মা শীতলাবুড়ি জানে।

চুনারামের শরীরের অবস্থা ভালো নয়, চটা ডাক্তার তার রোগ সারাতে পারল না। পুরিয়া ফেল মেরে গেল ধুমজ্বরের কাছে। চটা ডাক্তার নিজের মুখে বলল, রঘুরে, তোর দাদুকে কালীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যা। ওখানকার বড় ডাক্তারের হাতযশ আছে। তোর দাদুকে ভালো করে দেবে।

চুনারাম হেঁটে যেতে পারবে না। যেতে গেলে খাটিয়ায় নিয়ে যেতে হবে। তার জন্য কম করে চারটে মানুষ দরকার। ধাওড়াপাড়ার এখন যা অবস্থা তাতে চারজন কেন দুইজন পাওয়াই মহা ঝামেলার। কে আর হাসপাতালে যেতে চায় হাতের কাজ ফেলে? পুরুষ যারা ছিল বর্ষা পড়ার সাথে সাথে তারা চলে গিয়েছে খাটতে। ধান বোয়া শেষে ধান কেটে ঘরে ফিরবে ওরা। এসব করতে আরও মাস তিনেকের ধাক্কা। ঘরের মানুষ ঘরে না ফেরা পর্যন্ত চলবে অপেক্ষা।

কাশীনাথ চলতে চলতে আচমকা বলল, একটা কথা রাখবি, রঘু? পারলে কমলাকে তুই ভুলে যা। ওতে দুজনেরই মঙ্গল।

জগৎখালির বাঁধ ইস্কুল ধার থেকে সোজা চলে গিয়েছে বসন্তপুর ধাওড়া এবং সেখান থেকে পাণ্ডবপাড়া, ঘাসুরিডাঙা, এড়েডাঙা ছুঁয়ে একেবারে পলাশী-রামনগরের সুগারমিল। দু-ধারে বিস্তীর্ণ সোনা ফলানো মাঠ এখন আখ আর পাটের সংসার সামলাতে হিমসিম। মাটি এখানকার হারিয়ে দেবে চন্দনের বাহার। খোলা আকাশ বুড়িগাঙের উপর বিছিয়ে দেয় আবরণহীন শয্যা। এমন নৈসর্গিক পরিবেশে কাশীনাথের কথাগুলো রঘুনাথের মনটাকে বাসিফুলের মতো ম্লান করে দিল। সে কী জবাব দেবে কিছু বুঝতে না পেরে কাশীনাথের দিকে অবাক করা চোখে তাকাল, তুমি একথা কেন বললে ঠিকঠাক বুঝতে পারলাম না। কমলা তুমার বুন হলেও সে তো আমার গাঁয়ের মেয়ে। কমলাকে জড়িয়ে তুমার এমন কথা বলা কি শোভা দেয়?

-কেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছিস, রঘু? তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল কাশীনাথ, তোদের মধ্যে প্রেম চলছে এটা অনেকদিন আগে আমি টের পেয়েছি। কমলাকে আমি চিনি। সে আমার কাছে কোনো কথা লুকাতে পারেনি। আমি ওর চোখ দেখে মনের কথা সব বুঝে গিয়েচি।

-কী ওর মনের কথা? রঘুনাথের কণ্ঠস্বরে আগ্রহ ফুটে উঠল।

কাশীনাথ ধীর-স্থিরভাবে বলল, তোর জন্য ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। এসব প্রেম-পীরিতি বেশিদিন টেকসই হয় না। হলেও টোল খেয়ে যায়। তখন দুটো জীবনই বরবাদ হয়।

–তুমি যেটাকে বরবাদ ভাবচো আমি যদি ভাবি সেটাই আমার জেবন-তাহলে?

-আমার ভাবাভাবি নিয়ে তোদের কি এসে যায়? ঝাঁঝালো সুরে বলল কাশীনাথ, দুটো জীবন নষ্ট হয়ে গেলে আমার খারাপ লাগবে। গ্রাম বলে তোকে এত বোঝাচ্ছি। শহর হলে কবে খালাস হয়ে যেতিস।

–তুমি কি আমাকে জানের ভয় দেখাচ্ছ? রঘুনাথের চোখের তারা কেঁপে উঠল, শুনে রাখো আমার আর জান-প্রাণের কুনো ভয় নাই। মার পেট থেকে জন্মেচি যখন মরব তো একদিন। সে যখন মরব তখন দেকা যাবে।

মনে রাখিস, পিঁপড়ের পাখা গজায় মরবার জন্য। কাশীনাথের শরীর কাঁপছিল রাগে, এখনও নিজেকে সামলে নে রঘু না হলে এর মাশুল তোকে দিতে হবে। সুফল ওঝার কত লম্বা হাত তা তুই জানিস নে। জানলে পরে খরিস সাপের গর্তে হাত ঢোকাতিস না!

এসব শোনানোর জন্যি কি তুমি আমাকে ডাকলে? অসিহষ্ণু রঘুনাথের আর কিছু ভালো লাগছিল না, কাশীদা, এবার তুমি যাও। আমাকে একলা যেতে দাও। সাপ-আর নেউলে কুনো সম্পর্ক হয় না।

-ঠিক আছে। তোকে যা বলার আমি বলে দিলাম। পরে আমাকে দোষ দিবি না। কাশীনাথ ঘাড় নাড়ল, তুই তোর বাপ-মায়ের এক ছেলে। আর দুটা ভাই-বোন থাকলে কোনো কথা ছিল না। ওরা সামলে নিতে পারত। কাশীনাথ নাটকীয় ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। ইচ্ছে করেই হাঁটার গতি শ্লথ করে দিল রঘুনাথ। কাশীনাথের উপস্থিতি তার কাছে অসহ্য লাগছিল। চোখ কুটকুট করছিল তার। শয়তান মানুষের ছলচাতুরির কোনো অভাব হয় না। কাশীনাথ একরকম শাসিয়ে গেল তাকে। এমনকী প্রাণের হুমকিও দিয়ে গেল। রঘুনাথ মরতে ভয় পায় না। তবে সে যদি মরে, মরার আগে আর দশটাকে মেরে তবেই সে মরবে। কমলার জন্য এ জীবনটা কিছু নয়। এ জীবনটা সে কমলার কাছে বন্ধক রেখেছে যে। তার এবড়ো-খেবড়ো জীবনে কমলাই ফুল ফুটিয়েছে। ফলে তাকে অবহেলা করলে তার পাপ হবে।

হাসপাতালের বড় ডাক্তার মাটির মানুষ। রঘুনাথ তাকে যতদূর সম্ভব অসুখের কথা বুঝিয়েছে। রুগী না এলে সাধারণত ওষুধ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারবাবু সদয় হলেন। হাসপাতালের টিকিটের উপর ওষুধ লিখে দিয়ে বললেন, যাও, কম্পান্ডারবাবুর কাছ থেকে ওষুধটা নিয়ে নাও। যেমন বললাম–তেমন খাওয়াবে। যদি দেখ জ্বর তিন দিনের মধ্যে কমল না তখন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। কথাটা মনে রেখো। হাসপাতালে ওষুধ আনতে গিয়ে অবনীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল রঘুনাথের। অবনী হাসপাতালের কর্মচারী। ছোটখাটো চেহারার মানুষটার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক সরলতা ফুলের সুগন্ধর মতো ছড়িয়ে আছে। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, মোটা ভ্রূ’র লোকটাকে দেখে রঘুনাথের হঠাৎ করে তার বাবার কথা মনে পড়ে গেল। কতদিন হল ঘর ছেড়েছে গুয়ারাম। আজ সে গায়ে থাকলে রঘুনাথকে ওষুধ নিতে হাসপাতালে আসতে হত না। সংসারের প্রথম দফার ঝড়টা সব সময় সামাল দেয় গুয়ারাম। চুনারাম একটা শক্ত খুঁটি। আজ সেই মানুষটাই জ্বরে কাতরাচ্ছে।

আউটডোরের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে অবনী শুধিয়েছিল, ও ছেলে, তোমার ঘর কোথায় গো? একা এসেচ না সঙ্গে আর কেউ আচে?

রঘুনাথ পায়জামা গুটিয়ে আরাম করে বসে বলেছিল, বাপ গিয়েচে রাঢ় দেশে মুনিশ খাটতে। ঘরে মা আর দাদু আচে। ওরা আসতে পারবেনি। দাদুর গায়ে জ্বর। ওর জন্যি তো ওষুধ লিতে এয়েচি।

লম্বা লাইনটা দেখে অবনী উশখুশিয়ে বলল, দাও তুমার টিকিটটা দাও। যা ভিড়। দেখি ভিতর থেকে বাবুকে বলে ওষুধটা আনতে পারি কিনা।

টিকিটটা নিয়ে অবনী চলে যেতেই রঘুনাথ ভাবছিল-সংসারে মানুষ যে কত রকমের আছে তার কোনো গোনাগুণতি নেই। যেচে আজকাল কেউ কারোর উপকার করে? এমন বোকামানুষ দেশ-গাঁয়ে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। কাগজে মোড়ানো দু-রকম বড়িগুলো অবনী রঘুনাথের হাতে দিয়ে বলল, সাদা বড়িটা দিনে তিনবার। সকাল-দুপুর আর রাতে। আর এই লালচে বড়িটাও দিনে তিনবার। বুঝলে? রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই অবনী দাঁত বের করে শিশুর মতো হেসে উঠল, একদিন সময় করে তুমাদের হলদিপোঁতা ধাওড়ায় যাব। গাঁ ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। গা ঘুরলে মন ফুরফুরে হয়, মনের শান্তি বাড়ে। রঘুনাথ হাঁ করে শুনছিল সব। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কথা বলতে ভালোবাসে এটা দিব্যি বুঝতে পারল সে। কোনোরকম স্বার্থ ছাড়াই অবনী তার ওষুধ এনে দিয়েছে। রঘুনাথ সংকোচ সরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমাদের ঘর কুথায় গো? নেশ্চয়ই নদীয়া জিলায় তুমাদের ঘর নয়?

-ঠিক ধরেচো। আমরা এ জেলার নই। এ জেলায় আমি শুধু পেটের দায়ে। জমিজমা নেই। চাকরি না করলে যে আমাদের পেটে ভাত জুটবিনি। অবনীর পাংশু মুখ থমথমে হয়ে উঠল।

রঘুনাথ লজ্জা কাটিয়ে বলল, আমাদের গাঁয়ে যেও। চালের উপর পুঁইশাক হয়েছে। কেটে দেবো।

–না বাবা, পুঁইশাকের জন্য নয়। যদি যাই তো শুধু তুমাকে দেখতে যাব। অমায়িক হেসে অবনী তার খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বোলাতে লাগল, তুমার দাদু ওষুধ খাওয়ার পর কেমন থাকে জানিও। তেমন হলে তুমি আমার সাথে দেখা করো। আমি ডাক্তারবাবুকে বলে ভালো ওষুধ লিখিয়ে নেব। অবনীর কথায় কী জাদু ছিল, যার ছোঁয়ায় রঘুনাথের সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল, সে অবাক করা চোখে অবনীকে দেখছিল। তার মনে হল গুয়ারাম যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দু-চোখে উপছে পড়ছে স্নেহের সমুদ্র।

বেলা বাড়ে। রঘুনাথ ব্যস্ত হয়ে উঠল, আমি যাই। ঘরে মেলা কাজ পড়ে আচে। আজ দাদুর গা-হাত-পা মুছিয়ে দেব। যাওয়ার সময় বাজার থেকে সাবু কিনতে হবে। সাবু ছাড়া দাদু এখন কিছু খাচ্চে না। মুখে অরুচি হয়েছে।

যাও, যাও। তুমার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম। খাকি প্যান্ট-জামার ধুলো ঝাড়ল অবনী, তা বাবা, তুমার নামটা তো জানা হলো না। কী নাম তুমার?

–আজ্ঞে, রঘুনাথ রাজোয়ার। পাকুড়তলায় গিয়ে আমার নাম বললেই হবে। সবাই আমাদের ঘর দেখিয়ে দেবে। রঘুনাথের কথাবার্তায় সারল্য ফুটে উঠল।

অবনী অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠল, তুমার মতোন আমারও এট্টা ছেলে আচে। ওর নাম শুভ। বাঁধধারের বড়ো ইস্কুলে পড়ে। এর পরের বার এলে আমার কুয়াটারে এসো। শুভ’র সাথে আলাপ হয়ে যাবে।

রঘুনাথ পাকা রাস্তায় উঠে এলেও অবনীর মুখটা তার মন থেকে মুছে গেল না। কিছু কিছু ছবি থাকে যেগুলো স্মৃতিতেও রক্তমাংসের মুখ। অবনী ছবি নয়, রক্তমাংসের মানুষ। ওর শরীরে হাড়ের চাইতে স্নেহ-দয়া-মায়া বেশি। এমন মানুষ সবার বন্ধু হয়। এমন মানুষ এ সমাজে দুর্লভ।

সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে একা পথ হাঁটছে রঘুনাথ।

কাশীনাথকে আর দেখা যায় না, পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে তার স্বাভিমানী চেহারা।

.

দিনভর বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। গাছের পাতা চুঁইয়ে জল ঝরছে হরদম। মাটি ভিজে নরম হয়ে আছে হলদিপোঁতার মুখখানা। বাঁধের উপর হাঁটতে এখন ভয় পায় দুর্গামণি।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে শুয়ে পড়েছে চুনারাম।

দেশ-গাঁয়ে এখন আকাল চলছে কেরোসিনের। চড়া দামে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে কেরোসিন। এর চেয়ে মিঠে তেলের প্রদীপ ঢের ভালো। একবার ধরালে টিমটিম করে চলে অনেকক্ষণ। ঘর আলো নিয়ে কথা।

রঘুনাথ বিছানা নেওয়ার পরেই শুরু করেছে নাকডাকা। ছেলেটা ওর বাপের স্বভাব পেয়েছে। বিয়ের রাতে মানুষটার নাক ডাকার শব্দে ঘুমাতে পারেনি দুর্গামণি। মাস দুয়েক পরে তা মানিয়ে যায়। এই নিয়ে পাড়ার বউদের অনেক কথা শুনতে হয়েছিল তাকে।

-কী ব্যাপার চোখের কোল বসে গিয়ে কাচের গায়ে কালি পড়েছে যে! শরীল সামলে মৌজ-মোস্তি কর। নাহলে মরবি।

ইঙ্গিতটা ভালো নয় তবু হেসে সব হজম করেছিল দুর্গামণি। নাকডাকার কথা সে বলতে পারেনি ওদের। বললে ওরা বিশ্বাসই করবে না। এরও অনেক পরে পেটে আসে রঘুনাথ। স্পষ্ট মনে আছে–বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল দুর্গামণি। শাশুড়ি তার গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল, ভয় পাবে কেন গো বিটি। তুমার নারী জেবন সার্থক হল। গাছে ফল না ধরলে সে আবার কিসের গাছ? যাই, শীতলাথানে গোটা ফল চড়িয়ে আসি। বলেই একটা গোটা পেয়ারা নিয়ে সে খুশি মনে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে সন্ধের পর থেকে। আজ আর খুশি মনে ঘর থেকে বেরতে পারল না দুর্গামণি। মনের ভেতর পশ্চিমী হাওয়া বইছে তার। বুড়িগাঙের জল বেড়ে বুঝি বান আসবে এখুনি। কোনোমতে নাকে-মুখে গুঁজে সে দুটো খেয়েছে। খাওয়ার সময় রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাতে তার কষ্ট হয়েছে। ছেলেটার যে কী হল তা মা শীতলাবুড়িই জানে। যতদিন যাচ্ছে তত যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। মনে তার কোনো স্ফুর্তি নেই। আগে গাঙের জলের মতো সে উছলে উঠত কথায় কথায়। এখন উচ্ছ্বাস তো দূরে থাক এক চিলতে হাসিও তার ঠোঁটে দেখা যায় না। সারাক্ষণ কী যেন ভাবছে। কী ভাবছে তা আর অজানা নয় দুর্গামণির। সুফল ওঝার মেয়েটাই তার মাথা খেয়েছে। বড় ধড়িবাজ মেয়েটা। পুকুরের চালাক রুইমাছের মতো খেলিয়ে একদিন সে সরে পড়বে। এসব মেয়েরা নিজের ভবিষ্যৎ-এর কথা আগে ভাবে। ওদের কাছে প্রেম-পীরিতি কাঁচা বয়সের শরীরের খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। দুদিন গেলেই সেই ভালোবাসার রঙ ফিকে হয়ে আসবে। তখন আম একদিকে আঁটি আর একদিকে পড়ে থাকবে। আমে-দুধে গড়াগড়ি খাবে। রঘুনাথ আঁটির মতো শরীর নিয়ে বেঁচে থাকবে। একবার যদি কেউ মন খুবলে দেয় সে মনের কি দাম থাকল? খুবলে খাওয়া ফল আর খুবলে খাওয়া মন দেবতার ভোগে লাগে না। দুর্গামণির শরীর শক্ত হয়ে গেল চলতে-চলতে।

এখন বাঁধের উপর আঁধার নেমেছে চাপ চাপ। মাত্র বিশ হাত নীচে খলবল করছে বুড়িগাঙ। মাঠ-আগোলদারের গলা ভেসে আসছে বাতাসে। সাঁঝ লাগার মুখেই খেয়ে নেয় চুনারাম। রঘুনাথও দাদুর পাশে বসে পড়ে খাওয়ার জন্য। এসব সেই কবেকার অভ্যাস, চট করে ছাড়তে চায় না। সাঁঝরাতে খেয়ে ভোররাতে ওঠা ওদের স্বভাব।

দুর্গামণি দূরের ঘরগুলোর দিকে তাকাল। টিমটিম করছে ঘরগুলো। বেশির ভাগ ঘরই অন্ধকার। বাঁধ থেকে পাড়ার মধ্যে নেমে এল দুর্গামণি। এসময় বাঁধের উপর লোক চলাচল কম। শুধু যারা কালীগঞ্জে তাস খেলতে যায় তাদের কথা আলাদা। তারা সাইকেলের প্যাডেল ঘোরায়, হাতে দুই ব্যাটারির টর্চ। ঝড়-বৃষ্টিকে ওরা তোয়াক্কা করে না।

আজ ওদের দেখা পেল না দুর্গামণি। নিশ্চিন্তে সে পাড়ার ভেতর ঢুকে এল। ভূষণী বুড়ির ঘরটাতে আলো নেই। তরল আঁধারে ঘরটাকে কেউ চুবিয়ে দিয়েছে। মনসা গাছটাকে পাশ কাটিয়ে দুর্গামণি উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। দু-একটা জোনাকি মাথার উপর পিটপিট করে জ্বলছে। আজ আর জ্যোৎস্না ফুটবে না, আকাশের কপালের টিপ হয়ে হাসবে না চাঁদ। আজ ঘোরতর অমাবস্যা।

আঁধার রাতকে তবু দুর্গামণির শুভ মনে হয়।

আগড় খুলে সে ঢুকে যায় ভূষণী বুড়ির উঠোনে। পোষা কুকুরটা তাকে দেখে লেজ নাড়ে। শব্দ করে কুঁইকুঁই। কুকুরের এই শব্দ ভূষণীবুড়ির কাছে সংকেত পৌঁছে দেয়। বিছনায় সতর্ক হয়ে বসে ভূষণীবুড়ি অন্ধকারের দিকে তাকাল। পায়ের শব্দটা ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। ভূষণীবুড়ি অন্ধকার চিরে গলা ভাসিয়ে দিল, কে, কে?

–আমি দুর্গা। নিচু গলায় উত্তর দিল দুর্গামণি।

-ওঃ, গুয়ার বউ। আয়, আয়। তারপর সে অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজতে লাগল দেশলাই, না পেয়ে বিরক্তি উথাল উঠল তার শরীরে, দিয়াসিলাইটা যে কুথায় রেকেচি কে জানে। দাঁড়া বউ, দাঁড়া। খুঁজে দেখি। খুঁজতে খুঁজতে ভূষণীবুড়ি একসময় দেশলাইটা পেয়ে গেল। ডিবরি ধরিয়ে ডাকল, আয় বউ, ভিতরে আয়। পথ দেখানোর জন্য ডিবরিটা উঁচু করে তুলে ধরল সে।

দুর্গামণি মাথা নিচু করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। বারো বাই বারো হাত মাপের ঘর, মাথার উপর পচা বড় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ভরা বর্ষায়। রোদ উঠলে এই দুর্গন্ধ আরও বাড়বে।

দুর্গামণি কপাল কুঁচকাল, মাসী গো তুমার কাছে আসতে হল। দিনমানে সময় পাই না, তাই রাতকালে এলাম।

-বল বউ বল, আমায় কি করতে হবে?

–আমার ভারি বিপদ গো।

–কি বিপদ, কিসের বিপদ?

–ছেলেটা মুটে কথা শুনচে না। ওর মতিগতি বুনো হাওয়ার মতোন, আমি কিছু বুঝতে পারছি । দুর্গামণি হাঁপ ছেড়ে তাকাল।

-এখন কাঁচা বয়স, অক্ত টগবগ করে ফুটচে।

–তা লয় মাসী। ও মেয়েছেলের খপ্পরে পড়েচে।

-একী সব্বেনাশের কথা রে? ভূষণী বুড়ি নড়ে-চড়ে বসল, তা মেয়েছেলেটার নাম কি? কুথায় থাকে?

-তারে তুমি চেনো। দুর্গামণির উত্তেজনার পারদ চড়ছিল, সুফল ওঝার মেয়ে কমলা গো। সে আমার ছেলের পেছনে লেগেচে। আর ছেলেও চামএঁটুলির মতন ওর গায়ে লেগে গিয়েচে। শুতে বসতে খেতে মেয়েটার নাম না নিলে ও ক্ষ্যাপা হয়ে যায়। এখুন বলচে–তারে ব্যা করবে।

মুহূর্তে ভূষণীবুড়ি ফিরে গেল তার যৌবনে। নীলকণ্ঠর মুখটা ঘাই দেওয়া বোয়ালমাছের মতো নড়ে উঠল তার মনে। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে সে দুর্গামণির দিকে তাকাল, এই বয়সটাতে ছেলে-মেয়েদের এট্টু উড়ুউড়ু স্বভাব হয়। ভাদুরে কুকুরগুলার মতো ছুঁকছুঁক করে। এটাকে পীরিত করা বলে না, বলে কেচ্ছা। রঘুকে এ পথ থিকে সরাতে হবে। তবে এতে সুফল ওঝার যদি গোপন চাল থাকে তাহলে আমি পারব না। তখন তোরে যেতে হবে বাদকুল্লা। সিখানে মস্ত বড় গুণিন আচে। সে গুরুমারা বিদ্যে জানে। এক ফুঁঃয়ে পাশার ছক বদলে দেবে।

–আমি অতদূর কি যেতে পারব, মাসী?

–এখুনি তোকে যেতে হবে না। আগে আমি চিষ্টা করে দেখি। আমি ফেল হয়ে গেলে ছেলে বাঁচাতে তুকে সিখানে যেতে হবে। ভূষণীবুড়ির নিরাসক্ত কণ্ঠস্বর, এবার খোলসা করে বল তো কি হয়েছিল?

দুর্গামণি যতটুকু বলা যায় ঠিক ততটুকুই বলল, আমার ঘরের রঘুটা রাতকালে মেয়েটার ঘরে চলে যায়। ভাবো তো ওর মা-বাপ যদি টের পায় ছেলেটাকে কেটে দু-টুকরো করে দেবে। দুর্গামণি কথা শেষ করে ফুঁপিয়ে উঠল, তুমি তো জানো–ওর বাপ ঘরে নেই। এখুন যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কি মানুষটার কাছে জবাব দিব।

ঠিক আছে, মাথা ঠাণ্ডা করে বস। গণনা করে দেখি কতদূর কী করা যায়। মাটিতে খোলামকুচির দাগ কেটে আঁকিবুকি করল ভূষণী বুড়ি। তারপর মুখ উঠিয়ে চোখ কপালে তুলে বলল, কেস সুবিধের লয়। ওরে বশীকরণের শিকড়ি খাইয়েছে পানের সঙ্গে।

-রঘু তো পান খায় না। বিস্ময়ে দুর্গামণির চোখ অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। ভূষণী বুড়ি বেদম কেশে বলল, আমার গণনা তো ভুল হবার নয়। ঠিক আছে–আমি আবার গুণচি।

আবার মাটির মেঝেতে আঁকিবুকি দাগ কাটল ভূষণীবুড়ি, দীর্ঘসময় ধরে গণনা করে বলল, বলছিলাম না, আমার গণনা ভুল হবার নয়। আবার দুয়ে দুয়ে চার হল। সব ঝামেলা মিটে গেল।

-তার মানে? দুর্গামণির অবুঝ চোখে জিজ্ঞাসা।

–তুই কাল সকাল সকাল আসবি। আমি তোকে মাদুলি বানিয়ে দেব।

–মাদুলি?

-হ্যাঁ। অস্ত্র ছাড়া লড়াই হবে কি করে? ভূষণীবুড়ির ঠোঁটে স্বস্তির হাসি খেলে গেল, ওই মাদুলির একুশটা গুণ। ওই মাদুলি ধারণ করলে শুধু কমলা কেন ডাকিনী যোগিনী কেউই ছুঁতেও সাহস পাবে না।

-বল কি? দুর্গামণির গলা কেঁপে উঠল বিস্ময়ে, তাহলে কাল আমি ঠিক সকালে আসব।

-আসার সময় পেছন ফিরে তাকাবি না। পেছন ঘুরে দেখলে হওয়া কাজ হয় না। ভূষণীবুড়ি সতর্ক করল।

দুর্গামণি তাকে পাল্টা চাপ দিল, ফিসফিসিয়ে বলল, আমি যা বললাম এ কথা যেন দু-কান না হয়। তাহলে সুফল ওঝা রঘুর ক্ষতি করে দেবে।

সুফল তো ছেলেমানুষ, ওর মরা বাপেরও ক্ষেমতা হবে নি। আত্মসম্মানে ঘা লাগতেই চটে উঠল ভূষণীবুড়ি।

শেকড় ছোঁয়ানো ফণা তোলা সাপের মতো ঝিমিয়ে গেল দুর্গামণি, গলা খাদে নামিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বলল, মনে দুখ লিয়ো না। কী বলতে কি বলে ফেলেচি। ছেলের চিন্তায় মাথাটা আমার ঠিক নেই।

–যা বউ, কতা আর বাড়াস নে। কাল সকালে আসিস। ভূষণীবুড়ির কথায় গাম্ভীর্য ফুটে উঠল।

দুর্গামণি ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। কিছুটা হলেও তার মনের ভার কমে এসেছে। দয়ালের মৃত্যুর পর ভূষণী ময়ূরভঞ্জ চলে গিয়েছিল। সেখানে বেশিদিন থাকেনি তবু যা শিখে গাঁয়ে ফিরেছে তার দাম নেহাৎ কম নয়। নীলকণ্ঠকে কি সে বশ করেছিল মন্ত্রবলে? যারা নিন্দুক তারা এ কথা আজও রটিয়ে বেড়ায়।

ভূষণী বুড়ির হৈ-চৈ নেই। সে বয়স্ক কুসুমগাছের মতো গম্ভীর আর লক্ষ্যভেদী। তার মন্ত্র সাপের মতো এঁকেবেঁকে নয়, চলে তীরের মতো সোজা। মা শীতলার দয়া হলে রঘুর প্রেমের ঘুড়িটা কমলার মনটাকে কেটে দিয়ে ছেইরে হয়ে উড়বে। তার নাগাল আর কোনোভাবে পাবে না রঘুনাথ। হাওয়ায় ভাসা ঘুড়ি আর চৈত্রমাসের ফাটা শিমুলতুলোর স্বভাব একই।

.

১৩.

টানা বর্ষায় ভরে উঠেছে মাঠ-ঘাট।

ফিটকিরি রঙের জলগুলো ফিট ব্যামোর রুগির মতো শুয়ে আছে অসাড়। মাঠপালান হাওয়ায় সেই জলে মাঝেসাঝে সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো ঢেউ ওঠে। চার আঙুল উঁচু সেই টেউগুলো গুডুলপাখির মতো জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দৌড়োয়। বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে রঘুনাথ এসবই দেখছিল।

বিকেলের দিকে বৃষ্টিটা পুরোপুরি থেমে যায়, আবার উৎপাত শুরু হয় সাঁঝের পর থেকে। লাল-চা খেয়ে ঘর থেকে বেরনোর সময় দুর্গামণি বলল, অবেলায় আবার কুথায় যাবি বাপ। ঘরে থাক। কখন যে বৃষ্টি হামলা চালাবে তার তো কুনো ঠিক নাই।

রঘুনাথ একবার ভাবল-সে বেরবে না। কিন্তু বিকেল হলে মনটা কেমন ছটফট করে, ঘরে বসে থাকতে একেবারে মন সায় দেয় না। বাইরে না বেরলে গুমোট হয়ে থাকে মন। এসময় জামতলায় বসে বিড়ি ফুকলে এমন সুখ আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

কমলার সঙ্গে বুড়িগাঙের পাড়ে দেখা হয়েছিল রঘুনাথের। ওর শাঁখের মতো মাজা শরীর চিন্তায় নিষ্প্রভ দেখাচ্ছিল। এমন মনমরা, গোড়াকাটা গাছের মতো ঝিমুনিভাব কোনোদিন দেখেনি রঘুনাথ। ফলে এগিয়ে গিয়ে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে তেমন সাহস আর হল না। ওদের ঘনিষ্ঠতার খবরটা সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিন ঘরে এসে সুফল ওঝা শাসিয়ে গেল দুর্গামণিকে, ছেলেকে সামলাও। ওর নজর এখন উপরপানে। নিজেকে যদি না বদলায় তাহলে পরে ওর ডিমা দুটা আমি উপড়ে নেব।

কথাটায় কাঁপুনি ছিল, জুরো-রুগির মতো কেঁপে গিয়েছিল দুর্গামণি। কাঁচা পয়সার মুখ দেখে সুফলের মাথা ঘুরে গিয়েছে। পয়সার গরমে তার এখন ধরাকে সরাজ্ঞান।

গুয়ারাম ঘরে থাকলে এমন অন্যায় মেনে নিত না। এমনিতে সাত চড়ে রা কাড়ার মানুষ নয় সে। তবু অন্যায় দেখলে তার মাথায় কাঁকড়াবিছে কামড়ে দেয়। পারুক না পারুক সে প্রতিবাদ করবে গলার রগ ফুলিয়ে।

দুর্গামণির অপমান হজম করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। সুফল ওঝা কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে হঠাৎ আসা ঝড়ের মতো মিলিয়ে গেল। সেই থেকে মনের ভেতর তছনছ শুরু হয়েছে দুর্গামণির। একা একা সে জ্বলছে। একথা চুনারাম বা রঘুনাথকে সে বলতে পারেনি। যদি সে বলত তাহলে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত তাদের উঠোনে। সুফল ওঝাকে আর মাথা উঁচু করে সাইকেল নিয়ে চলে যেতে হত না।

দুর্গামণির মনটা থেঁতলে যাওয়া কুমড়োর মতো রস চুয়াচ্ছে সর্বদা। ভয়টা তাকে তাড়া করছে মাঝে মাঝে।

পশ্চিমে সূর্য ঢলে যেতেই রঘুনাথ উঠে দাঁড়াল ঘরে ফেরার জন্য। আজও সূর্যাক্ষর সঙ্গে তার দেখা হল না। আর ক’মাস পরে ওর পরীক্ষা। দ্বীপীর কথা তার মনে পড়ল। দ্বীপী কেমন আছে কে জানে।

রঘুনাথ ধাওড়াপাড়ার দিকে হাঁটছিল। বাঁধের উপরটা প্যাচপ্যাচ করছে কাদায়। এঁটেলমাটির কাদা পা-হড়কে দিতে পারে যে কোনো সময়।

রঘুনাথের পা হড়কাল না, তাকে জোর করে ঠেলা মেরে বাঁধের উপর ফেলে দিল কাশীনাথের দলবল। ওরা তৈরি হয়েই এসেছিল। রঘুনাথের বুকের উপর একজন চড়ে বসে বলল, ঢ্যামনার বাচ্চা। আজ তোর একদিন কী …আমাদের একদিন। আজ ভাদুপরবের চোলাই তোর পেট থেকে বের না করে ছাড়ব না।

–তুমরা কি চাও? রঘুনাথ জানতে চাইল বহু কষ্টে।

–আমরা চাই তোর টাটকা মাথা। কথা ফুরোল না, আর আগেই চড় কিল ঘুষিতে তৎপর হয়ে উঠল হিংস্র হাতগুলো। রঘুনাথ দেখল মাত্র হাত পাঁচেক দুরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে কাশীনাথ। ওর ঠোঁটে প্রচ্ছন্ন গর্ব। সেই গর্বে কঠিন হয়ে উঠছে ওর ঠোঁট দুটো।

এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না রঘুনাথ। আচমকা আক্রমণে সে কিছুটা কাহিল। পর মুহূর্তে সে গা ঝাড়া দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল হামলে পড়া তিনজনকে। তারপর চিৎকারে বাতাস ফাটিয়ে ঠুকরে উঠল সে, বেধুয়ার ছা’রা আমাকে মারচে, দাঁড়া দেকাচ্ছি মজা। রঘুনাথ বাঁধের গোড়ায় একটা আধলা ইট দেখতে পেয়ে ছুটে গেল ক্ষিপ্র গতিতে। আধলা ইটটা তুলে নিয়ে সে বুনো মোষের মতো তেড়ে গেল রুদ্ধশ্বাসে। মাটি কেঁপে গেল যেন। যেন ঝড় উঠল। ভেঙে গেল বাঁধ। সজোরে ইটটা কাশীনাথের মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল সে। পাখিমারা টিপ ব্যর্থ হল না। আধলা ইটের আঘাতে কাশীনাথ বাপ রে বলে ঠিকরে পড়ল কাদায়। চারপাশে ছড়িয়ে গেল কাদাজল। রে-রে করে তেড়ে এল বাদবাকিরা। সামনাসামনি লড়াই হলে রঘুনাথ ওদের সঙ্গে পারবে না। ওরা অবশ্যই তাকে ঘায়েল করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।

বেড়ার পাশ ধরে বুনো বেগে ছুট দিল রঘুনাথ। হঠাৎ একজনের গরম নিঃশ্বাস তার ঘাড়ের উপর পড়তেই সে পাশের বেড়ার দিকে তাকাল। ঝিঙেলতা জড়িয়ে আছে কঞ্চির বেড়ায়। মাঝেমাঝে হলুদফুল ফুটে আছে ঝিঙেগাছের গয়নার মতো। কিছু দূরে দূরে খুঁটিবাশ পোঁতা।

জয় মা শীতলাবুড়ি। রঘুনাথ বেড়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চোখের পলকে টান দিয়ে একটা খুঁটি বাশ উপড়ে নিল। বাঁশটা আঁকড়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরে বুঝি অপদেবতা ভর করল। মাথার উপর খুঁটিবাশটা তুলে ধরে সে বোঁ-বোঁ শব্দে উন্মাদের মতো ঘোরাতে লাগল, আয়। মায়ের দুধ খেয়ে থাকলে এগিয়ে আয়।

মুখের দুপাশে গাঁজরা উঠে এল রঘুনাথের। সে গো-হাঁপানো হাঁপাচ্ছে। তার বুক কামারশালার হাঁপরের মতো ওঠা-নামা করছে ঘনঘন। খুঁটিবাঁশটা মাথার উপর তুলে সে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

বিকেলবেলায় স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে অমলকান্তিবাবু রোজ হাঁটতে বেরন। তিনি হঠাৎ খণ্ডযুদ্ধের এই দৃশ্য দেখে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এলেন। স্কুলের ছেলেরা খোলা বাঁধের উপর নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে এটা কোনোমতে বরদাস্ত করা যাবে না। তিনি দূর থেকে চিৎকার করে উঠলেন, এ্যায়, লাঠি ফেলে দাও। কী হয়েছে? কী হয়েছে তোমাদের? কেন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছ? অমলকান্তিবাবু পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। অন্ধকার তখনও পুরোপুরি গাঢ় হয়নি। রঘুনাথকে চিনতে পারলেন তিনি, এ্যায় রঘু। বাঁশটা নামাও। মারামারি করলে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

রঘুনাথ হাতটা শিথিল করতেই খুঁটিবাশটা তার পায়ের কাছে পড়ে গেল। মুখের গাঁজরা মুছে নিয়ে রঘুনাথ উত্তেজনায় ভেঙে পড়ল, মাস্টারমশাই, ওরা ভেবেছিল একলা পেয়ে আমাকে গুম করে দেবে। কিন্তু মা শীতলাবুড়ি আমাকে বাঁচিয়ে দিলো।

-শান্ত হও। মাথা ঠাণ্ডা করো। অমলকান্তি বোঝাবার চেষ্টা করলেন, এ্যায়, তোমরা কারা? কোথায় থাকো? কেন এসব করছো? এসব করে কি সুখ পাও তোমরা?

তিনটে ছেলে হকচকিয়ে তাকাল।

কাশীনাথ মাটি আঁকড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে কোনোমতে। ওর সারা শরীর কাদায় মাখামাখি। কপাল চুয়ানো রক্ত গালের দু’পাশে জমাট বেঁধে জোঁকের মতো শুয়ে আছে। তবু ও টলতে-টলতে অমলকান্তিবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল, স্যার, এই রঘু…আমার বোনের সর্বনাশ করে দিয়েছে। আমার বোন। কথা শেষ করতে পারল না কাশীনাথ, কান্নার ঝড়ে গুমরে উঠল সে।

অমলকান্তিবাবু কাশীনাথের কাঁধের উপর হাত রেখে বললেন, শান্ত হও। তোমাকে আমি ভালো ছেলে বলে জানতাম। বড়ো হচ্ছে। এখন পথে-ঘাটে মারামারি করা কি তোমাদের শোভা দেয়?

কাশীনাথ মুখ নামিয়ে নিল না; সংকোচ, লজ্জা বা অনুশোচনা কোনোকিছুই তার মধ্যে সংক্রামিত হল না। অমলকান্তিবাবুর চোখে চোখ ফেলে সে বলল, আজ রঘু বেঁচে গেল কিন্তু আজকের দিনটাই শেষ দিন নয়। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন নিয়ে একটা বছর হয়। একটা দিন বরবাদ হলে কিছু যায় আসে না। কাশীনাথ এবার তার সঙ্গীদের দিকে তাকাল, চল। এক মাঘে শীত যাবে না। রক্তের বদলা আমি রক্ত দিয়ে নেব। আমিও সুফল ওঝার ছেলে। যত বড়ো ফণা তুলুক না কেন সাপ-সেই সাপের বাঁচা-মরা সব আমার হাতেই থাকল।

টিপটিপিয়ে বৃষ্টি শুরু হতে ওরা আর দাঁড়াল না, জামতলা পেরিয়ে দৌড় লাগাল গাঁয়ের দিকে।

বৃষ্টির শব্দটা কখনও কখনও যুদ্ধের শব্দ বলে মনে হয়।

অমলকান্তিবাবু ছাতার নীচে ডেকে নিয়েছেন রঘুনাথকে, তোমাদের সমস্যাটা কি বলো তো?

রঘুনাথ দ্বিধা সরিয়ে তাকাল, ওর বুনের সাথে আমার ভাব হয়েছে। কিন্তু ওরা কমলাকে আমার সাথে মিলামেশা করতে দেবে না। আমি ছোট জাত। এই নিয়ে ওদের মনে গুঁজকাটালি।

মেয়েটা কি সত্যি তোমাকে ভালোবাসে?

রঘুনাথ অবাক চোখে তাকাল, আমার সাথে ঘর বাতে না পারলে কমলা পাগল হয়ে যাবে। এখুনই পাগল হয়ে গিয়েচে। মা-বাপ ওকে অন্য জায়গায় ব্যা দিবে।

সমস্যাটা অনেক গভীরে। কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না অমলকান্তিবাবু। গ্রাম- সমাজের দ্রুত বদল ঘটছে। বর্ণবৈষম্য এখনও গোপন-রোগের মতো ছড়িয়ে আছে গ্রামে-গঞ্জে। খবরের কাগজের পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি বিজ্ঞাপন দেখে এর অনুমান করা যাবে না। যতই আলো এসে পড়ুক তবু এই কঠিন চাপবাঁধা অন্ধকার সহজে অপসারিত হবার নয়।

কালীগঞ্জ-লাখুরিয়ায় অমলকান্তিবাবুর অনেকগুলো বছর অতিবাহিত হল। এখনও কুসংস্কারের সব লৌহকপাট তিনি কি ভাঙতে পারলেন? এসব সমাজ সংস্কারের কাজ সফলভাবে করতে গেলে যে শিক্ষার প্রয়োজন হয়, সেই পরিকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।

ধাওড়াপাড়ার কাছে এসে অমলকান্তিবাবু বললেন, তুমি এবার বাড়ি যাও। আমি এখান থেকে ফিরব। আজ যা আবহাওয়ার অবস্থা, আজ বেশিদূর যাওয়া আমার উচিত হবে না।

অমলকান্তিবাবু ফিরে যেতেই রঘুনাথ ঘরের দিকে গেল না। কী মনে করে সে সোজা চলে গেল বুড়িগাঙের কোলে। সারা শরীর কাদা-জলে মাখামাখি। এ অবস্থায় ঘরে ফিরলে দুর্গামণির প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হবে।

নিজের দিকে একবার তাকাল রঘুনাথ, তারপর বুড়িগাঙের পাড় থেকে সে সশব্দে লাফিয়ে পড়ল জলের উপর। অন্ধকারে সাঁতরে সে চলে গেল বহুদূরে। ক্লান্ত হয়ে আবার ফিরে এল পাড়ে। কপালের কাছটা সুপারির মতো ফুলে আছে। এতটাই ফোলা যে দুর্গামণির নজর এড়াবে না। এ ফোলা সহজে মেলাবারও নয়।

ভেজা কাপড়ে বাঁধের উপর উঠে এল রঘুনাথ। তার গা-হাত-পা টলছে। বাতাস লাগা বাঁশপাতার মতো মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠছে শরীরটা। একটা শীতভাব এখন ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ভোরের দিকে এই শীতানুভূতি আরো তীব্র হয়।

দুর্গামণির মন খারাপ থাকলে মুখের দোক্তা তেতো লাগে। বিড়ি খেলে তখন মগজের চিন্তাগুলো ফাঁসজাল কাটা টুনটুনি পাখির মতো উড়ে পালায়। মাঠে-ঘাটে খাটতে গেলে বিড়ি না হলে তাদের চলে না। নেশার জিনিস কঠিন কাজে সরল গতি আনে। দুর্গামণির মায়ের মা বিড়ি খেত। তার মা বিড়ি না পেলে সংসারে অশান্তি বাধিয়ে দিত। শুধু শুকনো নেশা নয়–তরল নেশাতেও তার আসক্তি প্রবল। বিশেষ করে ভেলিগুড়ের মদ পেলে সে মাংসের বাটিও ঠেলে দেবে।

নেশা করার ধারাটা দুর্গামণি ধরে রেখেছে। রঘুনাথ বড়ো হওয়ার পর থেকে নেশা করতে তার বাধো বাধো ঠেকে। তবু মন ছটফটালে লম্ফর আগুন থেকে বিড়ি ধরিয়ে সে সুখটান দেয়। পুরুষের মতো ধোয়া ছাড়ে, ধোঁয়া গেলে।

চুলার পাশে গালে হাত দিয়ে তুষজ্বাল ছুঁড়ে দিচ্ছিল দুর্গামণি। আগুনের হলকা চুলার ঝুঁটি ছুঁয়ে দিচ্ছে বারবার। রঘুনাথ দুর্গামণিকে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলেই ধরা পড়ে গেল, কুথায় গেচিলিস, এত রাত হলো যে?

মুখ তুলে রঘুনাথের দিকে তাকাতেই সে চমকে উঠল, কপালের কাছটা ফুলালি কিভাবে?

-বাঁধের ধারে পা পিছলে পড়ে গেলাম। বড্ড লেগেছে। কাদা-জলে সারা গা-গতর ভরে গেল। বুড়িগাঙে তাই ডুব দিয়ে ফিরলাম। রঘুনাথ আসল ঘটনা লুকোবার চেষ্টা করল।

-মিছে কথা কেন বলচিস বাপ? দুর্গামণির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, ভেজা মাটিতে পড়ে গেলে কি কপাল এমন ফোলেরে! তোরে নেশ্চয়ই কেউ মেরেচে। বল, কে মেরেচে তুরে?

-আমাকে মারবে কার ঘাড়ে এত সাহস আচে? রঘুনাথ বুক চিতিয়ে দাঁড়াল, আমার গায়ে হাত তুলার লোক এ গাঁয়ে জন্মায়নি।

তবু মন থেকে সন্দেহ মুছল না দুর্গামণির, এই ছেলেই তার যত চিন্তার গোড়া। ঝিম ধরে বসে থেকে দুর্গামণি তুষ ঠেলে দিচ্ছিল চুলার ভেতর।

কমলা কী চায় সে এখনও বুঝতে পারছে না স্পষ্ট। বয়স্ক মানুষের ঝাপসা দৃষ্টির মতো তার কাছে সব ধোঁয়াশা ঠেকে এখন। ভালোবাসায় শক্তি প্রবল। কিন্তু সেই শক্তি কি কমলার ভেতরে আছে? গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায় অনেকে। কমলা কোন দলে এখনও স্পষ্ট বুঝতে পারে না দুর্গামণি। ফলে ভয় তার মনে তাঁবু গেড়ে আছে।

কলাবতীর সঙ্গে কদিন আগে দেখা করতে গিয়েছিল দুর্গামণি। কিন্তু কলাবতী তার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিল না। এমন কী বসতেও বলল না সকালবেলায়। ওর চেহারায় ফুটে বেরচ্ছিল চাপা রাগ। দুর্গামণি গায়ে পড়ে বলল, দিদি, সবই তো জানো, এখন আমার কী করণীয় বলে দাও।

-আর ন্যাকা সেজো না। ফুঁসে উঠেছিল কলাবতী, ষাঁড় লেলিয়ে দিয়ে আমাকে বলছ গোরু সামলাও? যাও, যাও। আমার কাছে আর নাকে কেঁদো না। আমি তোমার মনের ইচ্ছে সব বুঝে গিয়েচি। আমার মেয়েটার সরল মনের সুযোগ নিয়ে তোমরা জাতে উঠতে চাইছ।

–এ কী বলচো গো দিদি? জাত কি পাকুড়গাছ, যে মন চাইলে উঠে যাব। দুর্গামণি দ্বিধার সঙ্গে বলল, ভুল বুঝো না দিদি। এতে আমার কুনো হাত নাই।

–নেই তো এসেছ কেন? মুখ দেখালে কি ঝামেলা সব মিটে যাবে। কলাবতী ফুঁসছিল, তোমার ছেলের জন্য আমাদের নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ হয়েছে। গাঁয়ে আমি মুখ দেখাতে পারছি না। কী কষ্ট! কলাবতীর ঠোঁট ফুলে উঠল, তারপর সেই ফোলানো ঠোঁট কান্নার রঙে মিশে গেল। হকচকিয়ে দুর্গামণি বলল, কেঁদো না দিদি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমার ঘরের কমলাকে টুকে ডাকো। ওর সাথে দুটা কতা বলে যাই।

-কী আর কথা বলবে, কথা বলার আছেই বা কি! কলাবতী এড়িয়ে যেতে চাইলেও দরজার আড়াল থেকে নিজেকে বের করে আনল কমলা। একটা বড়ো পিড়ি পেতে দিয়ে সে বলল, সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছে, বসো।

বসতে আসিনি, মা। দুটা কথা বলে চলে যাব।

–হ্যাঁ- হ্যাঁ বলো। কী বলতে চাও? কমলার কথা-বার্তায় কোনো জড়তা নেই।

দুর্গামণি কমলার মুখের দিকে অদ্ভুত এক মায়ার দৃষ্টি মেলে তাকাল, তুমাকে এট্টা প্রশ্ন শুধাই মা, তুমি যা করচো তা কি বুঝে-শুনে করচো?

কমলা অবিচলিত দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকাল, নিজের ভালোটা ক্ষ্যাপাও বোঝে। আমি ক্ষ্যাপা পাগলা কোনোটাই নই। মন চেয়েছে তাই মনের ডাকে সায় দিয়েছি।

দুর্গামণি মনে মনে খুশি হলেও তার উচ্ছ্বাস বাইরে সে মেলে ধরে না। কলাবতীকে সে আর দুঃখী দেখতে চাইল না।

মাথা উঁচু করে সে বেরিয়ে এল সুফল ওঝার দাওয়া থেকে।

বিয়ে নিয়ে তার মনেও অনেক টুকরো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিয়ের পরে প্রথামত ঘরের চালে উঠে গিয়েছিল বরবেশী গুয়ারাম। চাল থেকে সে কিছুতেই নিচে নামবে না। দুর্গামণি কাতর হয়ে ছড়া কেটেছে তাকে নামানোর জন্য।

চাল থিকে নামো তুমি
নিড়ান দিয়ে পুষব আমি।
তুমি ভাতার, তুমি সোয়ামী
সুহাগ দিব অঢেল আমি।
যেও না গো যেও না,
মাথার দিব্যি যেও না।
নেশায় আচে গু-গোবর
খেও না গো খেও না।

কত বছর পেরিয়ে গেল তবু ছড়াটা এখনও মাঝেমাঝে ঢেউ দিয়ে যায় দুর্গামণির মনে। আজ আরও বেশি করে মনে পড়ছে কেন না কমলা যদি তার ঘরের বউ হয়ে আসে সে কোনোদিন তার বরের মন ভেজানোর জন্য এমন ছড়া কাটবে না। কমলার কাছে এই পরিবেশ তেল আর জলের মতো, কোনোদিনও মিশ খাবে না।

দুর্গামণির টানে যুবক গুয়ারাম চলে যেত হরিনাথপুরের কদবেলতলায়। বাঁধের ধারে দুর্গামণিদের ঘরে গিয়ে সে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। দুর্গামণির বাবা-দাদা ওকে কত গায়ে চিমটি কাটা কথা বলত। তবু হুঁশ ছিল না গুয়ারামের। কী কথায় তার দাদা একদিন মারতে গিয়েছিল ওকে। সেদিন মুখ নিচু করে পাড়া থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল গুয়ারাম। যাওয়ার সময় বলে গেল, আর কুনোদিন কদবেলতলা ধাওড়ার মুক দেখবো না।

কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা সে রাখতে পারেনি। বাঁধের ক্ষ্যাপা জল যেমন বাঁধ ভেঙে দেয় তেমনি ভেসে গিয়েছে তার প্রতিশ্রুতি। তিন দিনের মাথায় আবার ফিরে এসেছে গুয়ারাম, সরকারি টিউকলের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে বলেছে, জান ইখানে, দেহটা কি না এসে থাকতি পারে? জানো, দুর্গা, কাল রাতভর তুমার জন্যি ঘুমোতে পারিনি। আর সে কী কষ্ট, চোখ বুজলেই তুমার মুখ, আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না–তাই তুমার কাচে পেলিয়ে এলাম।

-দাদা দেকলে তুমাকে আবার অপমান করবে। দুর্গামণির অসহায় চাহনি।

–অপমান করলেও আমার কিছু করার নেই। পীরিতির হাঁড়িকাঠে যে একবার গলা দিয়েছে সে কি রেহাই পায় গো?

-এতই যদি সোহাগ-দরদ তাহলে আমারে লিয়ে চলো। আমার আর ভালো লাগচে না।

শেষ পর্যন্ত বিয়ের ফুল ফুটেছিল দুর্গামণির। চুনারাম এসে তার বাপের সাথে কথা বলে দিনক্ষণ সব ঠিক করে যায়। বিয়ে চুকে যাওয়ার পরে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে গুয়ারাম। বছরখানিক সে দুর্গামণিকে ঘুমাতে দেয়নি, শরীর জুড়িয়েছে বিছানায়। দুর্গামণিও প্রথম বর্ষার নদীর মতো শুষে নিয়েছে তাপ-উত্তাপ। সেই বাপের ছেলে রঘুনাথ, তার কাছে বেশি কিছু সংযম আশা করে না দুর্গামণি।

খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকতে সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়।

রঘুনাথের বিছানার পাশে চুপচাপ বসে থাকে দুর্গামণি। গো-ধরা ছেলেটাকে বোঝাবে কার সাধ্যি।

দুর্গামণি কমলার প্রসঙ্গ তুলতে গেলেই রঘুনাথ তাকে থামিয়ে দেয়, কানের কাচে ঘ্যানঘ্যানর করো না তো, আর ভাল লাগে না। যাও গে, শুয়ে পড়ো।

-ঘুম আসে না রে বাপ, তুর চিন্তায় মরি। আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল দুর্গামণি। ফোঁপানী এক সময় কান্নায় বদলে যায়। সেই কান্নার ধ্বনি বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। রঘুনাথ দু’হাতে ভর দিয়ে বিরক্তিতে উঠে বসে বিছানায়। দুর্গামণির মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা জ্বালাপোড়া করে ওঠে। দুর্গামণির কান্না যেন শুঁয়োপোকা হয়ে ঢুকে যাচ্ছে তার কানের গহ্বরে। শরীর ঝাঁকিয়ে রঘুনাথ চিৎকার করে ওঠে, তুমি আমার ভালো চাও না, কুনোদিনও ভালো চাও না। তার চেয়ে এট্টা কাজ করো,আমারে বিষডিবা এনে দাও। আমি খেয়ে মরি। আমি না মরা অব্দি তুমাদের কারোর শান্তি হবে না। বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল রঘুনাথ।

-যাস নে বাপ, ফিরে আয়। দুর্গামণির আকুল কণ্ঠস্বর বুড়িগাঙের জলে গড়িয়ে গেল।

.

১৪.

সকালবেলায় মেঘের গোমড়া মুখ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল দুলু কাহারের। কাজে না গেলে মনটা উশখুশ করে হরসময়। লালগোলা ট্রেন তাকে যেন ডাকে। চেনা গাছপালা মাঠঘাট নদী বিল সবাই যেন হাত উঁচিয়ে ডাকে। এক নিঃসীম শূন্যতা খাঁ-খাঁ করে বুকের ভেতর। ঘরে মন না ধরলে দুলু সময় কাটাতে চলে যায় পণ্ডিত বিলে। ওখানে বালিহাঁসের দল এসেছে ডিম পাড়তে। উলের বলের চেয়েও ছোট ছোট পাখিগুলো ভারি অদ্ভুত কায়দায় সাঁতার কাটে। ডুব আর সাঁতার এই হল পাখিগুলোর এগিয়ে যাওয়ার নিয়ম। ওরা ডিম পাড়ে নলখাগড়া অথবা শোলার বনে। একটা দুটো ডিম নয়, সব মিলিয়ে ছটা-সাতটা।

পাখির ডিম নয়, যেন পাখিগুলোকেই ভালোবাসে দুলু। তবে এই বিলের ধারে দাঁড়ালে আগের মতো তার এখন আর মন খারাপ করে না। ডান হাতটা কাটা যাওয়ার পর তার ভাগ্যটা বুঝি কেউ কেটে দিয়েছে ধার ব্লেডে এলোমেলো। পাল কোম্পানি কাটা হাতের কোনো ক্ষতিপূরণ দিল না। অথচ দুর্ঘটনার সময় তারা চাপে পড়ে কথা দিয়েছিলেন, সবরকম আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবেন। দুলু শক্তিনগর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছে। সামান্য কটা টাকার জন্য পালবুড়ার কাছে গিয়েছিল। পালবুড়া মুখের উপর বলেছিলেন, যা দেবার সব দিয়েছি, আর আমার দ্বারা হবে না। একটা অকম্ম মানুষকে সারাজীবন ধরে পোষা কি সম্ভব? যা হবার হয়েছে, এবার আমায় মাফ করো।

হাত তুলে দিলেন পালবুড়া ফলে খালি হাতে ফিরে আসতে হল দুলুকে। বাঁশঝাড়ের কাছে এসে দুলু নিজের দুঃখ না সামলাতে পেরে কাঁদল। একটা হাত না থাকলে মানুষ কি বেকম্মা হয়ে যায়? ভুলে যেতে হয় সেই অসহায় মানুষটাকে? এসব হিসাব দুলুর মাথায় ঢোকে না। মানোয়ারা তার দ্বিতীয় আঘাত।

সবাই তাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছে, সে আসেনি। অথচ এই মানোয়ারা একদিন গমকলে না এলে ভাত হজম হত না তার। ঠোঁট উল্টে বলত, বেছানায় শুয়ে আমি আটাচাকির ঘ্যাড়ঘ্যাড় শব্দ শুনি। গায়ে আটা লাগলে মনে হয় সুগন্ধি পাউডার মেখেচি।

কথা শুনে মন ভরে যেত দুলুর। হা করে গিলত মানোয়ারার কথাগুলো। মনের ভেতর শিহরণের ঝড় বয়ে যেত। মানোয়ারা যা পারে অন্যমেয়ে তা বুঝি কোনোদিনও পারবে না। অথচ এই মানোয়ারা দুলুর হাত ধরে কাতর গলায় বলেছিল, আমাকে ভুলে যাবে না তো? ভুলে গেলে তুমি আমার মরামুখ দেখবে।

মানোয়ারার মিষ্টি হাসি বিষাদে মিলিয়ে যেত ঠোঁট থেকে। ভরা বুকে ছায়া পড়ত শোকের। গায়ে টাইট হয়ে বসে থাকত ঘটিহাতা ব্লাউজ। ছাপা শাড়িটা মানোয়ারাকে চোখের পলকে বানিয়ে দিত পরী। আটাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত সে, তার কথা আর ফুরোত না। দুলু ওর হাতে টাকা ধরিয়ে দিলে খুশিতে উথলে উঠে মানোয়ারা বলত, আজ চাল না কিনে এট্টা আতরের শিশি ঘরে নিয়ে যাবো। চাল তো খাওয়ার জিনিস, আর আতর হল মনের জিনিস।

দুলুর হাত কাটা যাওয়ার পর মানোয়ারা আর আটাকলে আসে না। দুলু যখন সদরে ভর্তি ছিল, সেখানেও সে যায় নি। অথচ দুল ভাবত আজ নিশ্চয়ই মানোয়ারা আসবে। মুখোমুখি বসে দু-দণ্ড কথা বলে চলে যাবে। মানোয়ারা আসে না। শুধু হতাশা আসে দুলুর মনের বাগানে। ওপরওয়ালা সাজা দিলে তার কি দোষ? সে তো পণ্ডিতবিলের ঢেউ। যে দিকে হাওয়া, সেদিকে তো ঢেউ গড়াবে।

পণ্ডিতবিলের পাড়ে এখন দুলুর সাথে দেখা হলেও কথা বলে না মানোয়ারা। মুখ ধাপিয়ে চলে যায় শামুক-শঙ্কায়। দুলু ডাকলেও সাড়া দেয় না সে। অথচ সে নিজেও বুঝতে পারে না তার কোথায় সমস্যা।

মানোয়ারার আব্বা চাঁদ মহম্মদ মসজিদে কাজ করত। তবু সংসার চালাতে হিমসিম খেত সে। প্রায়ই কাঁধে লম্বা ভিক্ষার ঝুলি ঝুলিয়ে ইনসাল্লা বলে সে বেরিয়ে যেত ঘর থেকে। দেহতত্ত্ব, ঠার-ঠোকর গান গেয়ে সে খুশি করার চেষ্টা করত গ্রামবাসীদের। রূপকাশ্রয়ী গান ভালো লাগত না অনেকের। মেয়েরা গালে টুসকি ফেলে লাজুক স্বরে বলত, ও চাচা, তুমার ফকিরি গান থামাও এবার। দু-চারটে ফাজিল-ফুক্কুড়ি গানের চচ্চড়ি শুনাও। মন ভরে যাক।

হাওয়া বদলাচ্ছে। এখন দরগা, মাজার কিংবা পীরবাবার মেলায় ফকিরি গানের চল কমেছে। এখন ছেলে-বুড়া, ছুঁড়া-ছুঁড়ি সবাই টংটংয়ে গান শুনতে চায়। তাদের বাধ ভাঙা আগ্রহ। গানে মন না ভরলে দান দেবে না দর্শক সাধারণ। তাই পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে চাঁদ মহম্মদ গান ধরে,

ও রসের লাগর, যেওনি গো যেওনি
অমন করে চুমা খেলে শরীল যে ভরলোনি।
ভরা শরীলে বাঁধ ভেঙেছে যৌবন হলো কৈ-মাছ
এসো ভোমর, ডাকি তুমারে মধু খেয়ে লড়াও গাছ।
গাছ লড়াও গো, লড়াও গো,
মধু ঝরাও গো, ঝরাও গো!
এ আদি খেলা, সারা বেলা
চকমকি আর শোলা গো-ও-ও-ও।

শরিফ মেলায় ফকিরি গানের মজলিস বসে সারা রাত। সেই আসরে চাঁদ মহম্মদ হাজির হয় দলবল নিয়ে। ফকিরি গানের পাশাপাশি রঙগানের ফোয়ারা ছোটে। তার বুড়া কণ্ঠা পেরে ওঠে না। শুধু কবি মনটা গর্জায়। চাঁদ মহম্মদ গুনগুনিয়ে ওঠে নতুন গানের কলি ঠোঁটে তুলে,

মক্কা-মদিনা পীরের থান
কেউ কি রুখেছে চাঁদের গান?
এ গানে দেহ কাঁপে, মন কাঁপে, কাঁপে বুকের ধ্বনি
এ গানে প্রেম-মহব্বত, যুগের হাওয়া, উপড়ে নেয় চোখের মণি।
আম্মা ছোট, বিবি বড়ো আব্বাজান হলো চাকর
সিটি মারে লেংড়া রাখাল দেখলে মেয়ে ডাগর।
ঘরের মেয়ে মেম সেজেছে, তুমার আবার ভয় কী
বগলকাটা বেলাউজ, লাল লিপিস্টিক ইংরিজিতে কয় কি?

দোল খাওয়া স্বর্ণলতার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে মানোয়ারা চলে যাচ্ছে বিলের পাড় ধরে ঘরের দিকে। দুলুর বুক ভেঙে যায় টিকটিকি কামড়ানো ডানা ভাঙা মথের মতো। এই মানোয়ারা কখনোই তার চেনা মানোয়ারা নয়। সেই সহজ সরল মানোয়ারাকে তার পাড়ার সাদাত ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে টাকার লোভ দেখিয়ে পুরে দিয়েছে স্থায়ী খাঁচায়। পাখি এখন সাদাতের দানা খায়, সে এখন কারোর কথা শুনবে না।

দুলু তবু আশা ছাড়েনি, একদিন কালীগঞ্জ বাজারে সে মানোয়ারার হাত ধরল জোর করে। টানতে টানতে নিয়ে গেল মাছবাজারের পেছনে, ওদিকে লোকজন কম, শান্তিতে কথা বলা যাবে। মানোয়ারার চোখে কোনো অনুশোচনার বুদবুদ ছিল না, বরং সে তৃপ্ত, পলিপড়া মাটির চেয়েও সুখী। দুলু তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, তুমি যে বলতে আমার সাথে সাদী না হলে মরে যাবে–এ সব কি মিছে কথা? বলো? চুপ করে থেকো না। আজ তুমাকে বলতেই হবে।

আগে হাত ছাড়ো তারপর যা বলার বলব। ঝ্যানঝ্যান করে উঠল মানোয়ারার গলা, তখন তোমার দু-হাত ছিল, এখন ডান হাতটাই কাটা। এক হাত নিয়ে যে নিজেকে পুষতে পারে না, ভিখ মেঙ্গে খায়–সে আবার আমারে পুষবে কি করে? ঘৃণা, বিতৃষ্ণা থিকথিকিয়ে ওঠে মানোয়ারার চোখে, খবরদার তুমি আমাকে আর কুনোদিন ছোঁবে না। শুনে রাখো এখন আমি সাদাতের বেগম হয়েচি। সে আমারে সুখ দেয়, সব দেয়। তুমি আর আমাদের মাঝখানে এসে কাবাবের হাড্ডি হয়ো না। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঠমকে-চমকে চলে গেল মানোয়ারা। ওর শরীর থেকে গড়িয়ে নামা আতরের সুবাসটা বাতাস মাতিয়ে রাখল বেশ কিছু সময়।

দুলু আর কিছু ভাবতে পারল না, মাথার চুল চেপে বসে পড়ল মুথাঘাস ভর্তি মাঠটাতে। হুড়হাড়, দুড়দাড় করে ধসে পড়ছে বিশ্বাসের পাড়। এ দুনিয়ায় ভালোবাসা, প্রেম-মহব্বত বলে কোনো জিনিস নেই দুলুর কাছে। তার এই শুকনো জীবনের কি দাম আছে?

ললাট ওস্তাদের সঙ্গে সেই সময় তার বাঁধের আড়ায় দেখা হল।

সব শুনে ললাট ওস্তাদ মুখ দিয়ে সমবেদনার চুক চুক শব্দ করে মড়ার খুলির ভেতর চোলাই ঢেলে এগিয়ে দিলেন দুলুর দিকে, খা বেটা খা। খেয়ে বাঁচ। এ এমন কারণবারি যা খেলে বুকের ভরা বস্তা সরে যাবে। বড়ো হালকা হয়ে যাবি বাপ। নারী হলো গিয়ে প্রকৃতি, মা। জগৎ-জননী। মহাশক্তি। কালী তারা ব্রহ্মময়ী। তারা ছলনাময়ী, আবার স্নেহময়ী। তারা অসুরনাশিনী, আবার বিপরীত বিহারে কামিনী। তুই ভুলে যা বেটা। তুই সাধক, তুই পূজক। তুই চাঁদ, তুই-ই সূর্য। তুই তার গলায় নর মুণ্ডমালা। যা আজ তোর বাগদীক্ষা হয়ে গেল। আজ পূর্ণিমা। শুধু জপ কর–শব্দ ব্রহ্মা, শব্দ ব্ৰহ্ম।

ললাট ওস্তাদ নিজেও দুলে দুলে সুরা পান করলেন। তারপর ডান হাত উর্ধ্বে তুলে ঝংকার দিয়ে গান ধরলেন, ডুব দে মন কালী বলে/হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে।

সুর সাঁতার কেটে গেল তার ছোট্ট দাওয়ায়। সুরা পান শেষ করে গাঁজার কষ্কে সাজল ললাট ওস্তাদ, অবশেষে শিবটান দিয়ে বলল, আজ থিকে আমি ললাট ওস্তাদ নই, ললাট গুরুজী। গুহ্য তত্ত্বকথা আমি যথাসময়ে দেব। নারীর পিছু টান আর তোর ভেতরে থাকবে না। জয় মা তারা। নে টান দে।

গাঁজার কলকেটা দুলর দিকে বাড়িয়ে দিলেন ললাট ওস্তাদ, দমে দমে বুকটা ভরিয়ে নে। ভরা বুকে কেউ আর ঢুকতে সাহস পাবেনি। তুই শিমুলতুলার মতো শুধু উড়বি আর উড়বি।

গাঁজার কল্কেয় টান দিয়ে মেজাজটা হালকা হলেও পেটের চিন্তাটা তাকে কোণঠাসা করে দেয়। পালবুড়া তাকে আর কাজে নেবে না। যার ডান হাত নেই, তাকে দিয়ে আর কী কাজ হবে?

দুল ভয়ে ভয়ে ললাট ওস্তাদের পায়ের কাছে বসল, গুরুজী, এট্টা কথা ছিল। অভয় দিলে বলি।

–গুরু পিতা সমান। তার কাছে তোর ভয় না পেলেও চলবে।–তুলে তাকালেন ললাট ওস্তাদ।

ঢোক গিলে দুলু বলল, আমার ডান হাতটা ওপরওয়ালা নিয়ে নিয়েছে। এখুন আমি বাঁচব কি নিয়ে, খাবো কি? ঘরে যে বুড়া বাপ–তারে কি খাওয়াবো?

জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। ললাট ওস্তাদ মুখ ফাঁক করে বললেন, হাত গিয়েছে, তোর গলার সুর তো যায়নি। কাল থিকে তুই টেরেনে-টেরেনে ভিখ মাঙবি। বাউল, শ্যামা সঙ্গীত, রসগান, টুসু ভাদু সব গাইবি। তোর উপর আমার আশীর্বাদ রইল। গুরু আশীর্বাদ বৃথা যাবে না। আগে আমি এ পথের পথিক ছিলাম। বাদ্যযন্ত্র, একতারা, ঘুঙুর সব আচে। তুই লিয়ে যা। আমি তোরে সব দিলাম।

ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম সেরে আখড়া থেকে বেরিয়ে এল সদ্য দীক্ষিত দুলু। বেঁচে থাকার সুতীব্র ইচ্ছাটা তার ভেতরে শেকড় চারিয়ে দিল গোপনে।

দুল এখন লালগোলা ট্রেনে একতারা বাজিয়ে, পায়ে জোড়া ঘুঙুর বেঁধে সবধরনের গান গায়, হালকা গানের গভীরে মাঝে মাঝে শুশুকের শ্বাস নেওয়ার মতো ভেসে আসে বাউলগানের কলি, চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করব কি’ কিংবা গোলেমালে গোলেমালে পীরিত করো না, পীরিতি কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়ে না’…..ইত্যাদি গানের তালে তালে তার পুরো শরীর দোলে, এমন কী কাঁধের কাছ থেকে কাটা হাতটা শীর্ণ হয়ে তাল ঠোকে সুরের মায়াবী ইশারায়। গান গাওয়ার সময় দুলুর শরীরে কেউ যেন ভর করে, ললাট ওস্তাদ যেন তার কানে কানে বলেন, দুলুরে, আমার ক্ষ্যাপা বেটা, তোর সুরের জালে পুরো জগৎ মোহিত করে দে। একমাত্র সুরই পারে প্রেমিক হয়ে প্রেমিকার কাছে পৌঁছোতে।

দুলু দরদ দিয়ে গায়, ওরে আমার জীবন গেল, যৌবন গেল … রইল না আর কিছু। সোনার শিকলি গায়ে জড়ালো, সার ছাড়লো না পিছু। দয়াল গুরুজী, এখুন আমি যাবো কুথায়?

মানোয়ারার ছিপছিপে গতর ঈষৎ পৃথুলা হয়েছে সুখের ছোঁয়ায়। সুখ ওর সেগুন কাঠ শরীরে পালিশ এনেছে স্বাচ্ছন্দের। এখনও হাসলে ঝকমকিয়ে ওঠে ওর দাঁতগুলো, গলার সঙ্গে লেপটে থাকা রূপোর হারটা মক্কা-মদিনার লকেট সমেত দোলে। কোঁকড়া চুলের নিবিড় রেশমীভাব এখনও লাউআঁকশির মতো পেঁচিয়ে নেমে আসে জুলফি বরাবর। কপালের সবুজ টিপটা দুই ভ্রূ-র মাঝখানে টিয়াপাখির মতো ওড়ে।

দুলু বাউল সাজলেও মানোয়ারার বুনটিয়া রূপের কাছে হার মানে, কোথা থেকে হাহাকার ছুটে এসে ভরাট করে দেয় প্রেমিক-হৃদয়। ঠোঁট-ঠোঁট চেপে কোনোমতে কান্নার বেগকে সামাল দেয় দুলু। পণ্ডিত বিলের ছায়ায় সে আর মানোয়ারার মুখটাকে দেখতে পায় না, বরং একটা লাল কৈ-ফুল বিলের জলে ফুটে ওঠে বাধ্য যুবতীর মতো। দুলু সেই দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘা নিজে শুকোবার চেষ্টা করে।

ঘা শুকোয় কিন্তু থেকে যায় দাগ।

.

১৫.

টানা বৃষ্টিতে শুধু কদমগাছ নয়, রূপ বদলে গেছে পুরো গ্রামের। সব থেকে বেশি বদল ঘটেছে বুড়িগাঙের। বৃষ্টির জাদুছোঁয়ায় বুড়িগাঙ এখন কিত-কিত খেলা কিশোরী। তার জলের রঙ এখন আর মাঠদিঘির জলের মতো কাচবরণ নয়, মাটিগোলা।

কালও হালকা কুয়াশার চাদর সাহেবমাঠ থেকে উঠে এসে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। আর মাঝের গাঁয়ের আলিঘাস আর চাপ-ঘাসের শরীরে জড়িয়ে গিয়েছিল শিশির। জলাখেতের ধারে কচুগাছগুলো সারা অঙ্গে সবুজ জড়িয়ে ছটফট করছিল পূর্ণতার জন্য। এ সময় কচুগাছের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ মিশে থাকে। এই গন্ধটা একবারে কচুগাছের শরীর নিঃসৃত, এই সুবাসের সঙ্গে আর কারোর বুঝি মিল নেই। রঘুনাথ হাঁস খোঁজার তাগিদে কালীগঞ্জ বাজারে গিয়েছিল সেই সাত সকালে। অনেক বেলাঅবধি বসে থেকেও হাঁসের খোঁজ সে পেল না। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। আর ঠিক তখনি দুলু এসে তার ঘাড়ের ওপর হাত রাখল, কি রে, এখানে বসে জু নিচ্চিস-ঘর যাবি নে?

দুলুকে এ সময় দেখে রঘুনাথও কিছুটা অবাক চোখে তাকাল, তুমি এ সময়? কোথা থেকে এলে গো? আজ বুঝি দেবগ্রাম যাওনি?

নিষ্প্রভ হাসল দুলু, না, আজ আর যাওয়া হল না ভাইরে। বাপটার শরীর খারাপ। তারে হাসাপতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলাম। এখুন যাই, তার জন্যি খাবারের ববস্থা করতি হবে।

-তুমার বাবার কি হয়েছে?

-তার কি রোগ জ্বালার শেষ আচে? বয়স হলে যা হয়। হাজার রোগের ফ্যাঁকড়া বেরয়। দুলু মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল, আল্লা-রহিম, হরি যিশু কুথায় গেলে তুমরা?/একা আমি, একা সে …. করে দিও না গুমরা। দুলু বিড়বিড়িয়ে উঠে মুখ নামিয়ে আনল সহসা, রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে সে বলল, চা খাবি? তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারা সকাল কিছু খাসনি? রঘুনাথ ইতস্তত গলায় বলল, ভিজে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি, তবে চা খাইনি বহুক্ষণ হল। আসলে কী জানো চা খেতে মন হয়নি। তুমি যখন বললে তখন চলো–দুজনে মিলে চা খেয়ে আসি।

পাশাপাশি হেঁটে ওরা চায়ের দোকানে এসে ঢুকল। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে জল ফুটছিল টগবগিয়ে। সামনের কাঠের তাকে সাজানো আছে বিস্কুটের বোয়ামগুলো। গোল, চৌকো, রঙিন, ভূসভূসিয়া….. কত রকমের বিস্কুট। দুটো চৌকো বিস্কুট দিতে বলে দুলু ঘনিষ্ঠ গলায় শুধোলদা, বল, কালীগঞ্জ বাজারে কি করতে এয়েচিস?

মনসা পুজোয় হাঁস বলি দেবে। মা মানসিক করেছিল আমার জন্য। রঘুনাথ কথা শেষ করতেই দুলু কেমন বিষণ্ণ চোখে তাকাল, মা-রতন পরম রতন, বুঝবি না রে এখুনি/ফুল বোঝে তার আসলি রূপ পাপড়ি ঝরে যখুনি। দুলু টেনে টেনে আবেশী গলায় বলল, ছোটবেলায় মা মরল, এখুন তার মুখটাই মনে পড়ে না। সব ঝাপসা ঠেকেরে, হাতড়ে হাতড়ে আমি তার মুখটা জড়ো করার চেষ্টা করি। হয় না, সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। আমার গুরুজী ললাট ওস্তাদ বলে-মা হল–জগৎমণি, জগৎজননী,/মা হলো চাঁদ-সূর্য শৌর্য বীর্য স্নেহের খনি চোখের মণি/জগৎ জননী। মা হল মা। এর কুনো বদল খুঁজে পাওয়া যাবে না।

চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে রঘুনাথ জিজ্ঞেস করল, দুলুকাকা, হাঁস কুথায় পাবো বলতো?

ভ্রূ কুঁচকে দুলু বলল, এ নিয়ে অত ভাবনা কেনে? কাল রোববার। দেবগ্রামের হাটে চল আমার সঙ্গে। তোরে আমি দেখে-শুনে হাঁস কিনে দেব।

দেবগ্রামের গোরুর হাটে অনেক বেপারী হাঁস-মুরগির ঝাঁকা নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। ঝাঁকার মুখে লাগানো থাকে দড়ির ফাঁসজালি। অল্প একটু টান দিলেই ছড়ানো গোলমুখ বন্ধ হয়ে হাতের মুঠোয় চলে আসে। দিনভর হাঁসের প্যাঁক-প্যাঁক ডাক, বেপারী গলা ফাটানো চিৎকারে ভরিয়ে রাখে দেবগ্রামের গো-হাটের বাতাস। হাট নয়তো যেন রোববারের মেলা। বাসে যেতে যেতে রঘুনাথ কত দিন যে দেখেছে এমন দৃশ্য। গোরুর লেজ মুচড়ে দিয়ে বেপারী আর ক্রেতা ছুটছে গোরুর পেছন পেছন। গোরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার এ এক অভিনব আয়োজন। চা-বিস্কুটের দাম মিটিয়ে দুলু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বেলা হল এবার তাহলে গাঁয়ের দিকে যাওয়া যাক। তা বাঁধে বাঁধে যাবি, না পাড়া ঘুরে যাবি?

রঘুনাথ হাসল, পাড়া ঘুরে যাওয়াই ভালো। কত কি দেখা যায়। দুলু পিন ফোটানো বেলুনের মতো চুপসে গেল হঠাৎ। মানোয়ারার পরিবর্তনটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মন থেকে। লোক মুখে সে খবর পেয়েছে মানোয়ারের বাপ চাঁদ মহম্মদ মোটা টাকা নিয়ে মেয়েটাকে বেচে দিয়েছে সাদাতের কাছে। চাঁদ মহম্মদের টাকার লোভ ছিল এ নিয়ে দুলুর মনে কোনো সন্দেহ নেই। টাকার জন্য সে গান গায়, দেহতত্ত্ব চর্চা ছেড়ে চুটকা গানে মনভরায়। তার কাছে আল্লা রসুল করিম হরি যিশু ভগবানের চাইতে টাকার শক্তি ঢের বেশি মনে হয়। সে এখন মসজিদের দেখভালের কাজে যায় না, ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে মৌজ করে, মেয়ের গতরখাটা পয়সায় পেট ভরায়। সুখপাখিটা ওর শরীরে এখন বাসা বেঁধেছে। এমন কী নড়ে-চড়ে দানা খেতে চায় না।

কী যুগ পড়ল! মানুষ এত তাড়াতাড়ি চোখ উল্টে নেয় কী ভাবে? তাহলে কি মানুষের চোখের পর্দা খাটো হয়ে আসছে দিনে দিনে? বেইমান, অকৃতজ্ঞ, স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে মানুষ জাত। দুলুর সরল চোখের তারা বালি ঢুকে যাওয়ার মতো করকরিয়ে ওঠে, মনে মনে হাঁপিয়ে উঠে চোখ রগড়ে নিয়ে সে দূরের দিকে তাকায়।

রোদ ঝলমল করছে চারপাশে। বড়ো তেঁতুলগাছটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির ডাক অনবরত। পাখির মতো সুরেলা গলায় কথা বলত মানোয়ারা, আটাকলে খদ্দের না থাকলে দুলু মন দিয়ে কথা গিলত মানোয়ারার। পালবুড়া রেগে যেত ওর মুখোমুখি বসে থাকার ধরন দেখে, টিপ্পনি ছুঁড়ে দিত বুড়োটা, আমার আটাচাকিকে, তোরা দেখছি রাধাকৃষ্ণের কদমতলা বানিয়ে ছাড়বি। তা বাপ, যা করো করো আমার বদনাম যেন না হয়। সেদিক পানে এট্টু খেয়াল রেখো।

মানোয়ারা আটাচাকিতে ঢুকলে চট করে আর ঘর যাওয়ায় মন করত না। দুলু কিছু বললে সে ঠোঁট ওল্টাত অভিমানে, গোলাপী গালে টুসকি ফেলে বলত, আমারে খেদিয়ে দিচ্চো, আমি যাবো না যাও। দেখি তুমি কি করতে পারো? অন্ধকারে মুখঢাকা গাছের মতো চুপচাপ বসে থাকত মানোয়ারা, দুলু তাকে ছুঁয়ে দিলে সে জলোচ্ছাস হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত দুলুর গেঞ্জি পরা ঘামগন্ধ ভরা বুকের উপর। আঠা লাগানো সিনেমার ছবির মতো সেঁটে থাকত সে, বিপরীত উষ্ণতায় দুলু টের পেত জীবনের মহার্ঘ্য সুঘ্রাণ। ছাপা শাড়িতে শরীর মুড়িয়ে মানোয়ারা শাহাজাদীর চোখে তাকাত, তুমারে ছাড়া আমি বাঁচব না গো, আমাকে খেদিয়ে দিলে আমি তুমার ঘরের ছিমুতে ঘুরঘুর করব। আল্লা কসম, আমি তুমার জন্য আমার এই বদন চোখের নিমেষে কুরবানি দিতে পারি। আর শুনো আমারে এড়িয়ে গেলে তুমি আমাকে জ্যাঁতা কুনোদিন পাবে না। বিলের জলে আমার দেহ দেকবে কৈ ফুল হয়ে ভাসচে।

-তোবা, তোবা। অমন কথা কয়ো না। আমার কলিজা ফাটি যাবে। দুলু শক্ত হাতের বেড়ে পেঁচিয়ে ধরত মানোয়ারার শরীর, গুড়কলের মেসিনের মতো পিষে বের করে আনতে চাইত মনের রসতৃপ্তি, চুমায় চুমায় ভরিয়ে দিত মানোয়ারার সংরক্ষিত ওষ্ঠযুগল। মানোয়ারার চোখ বুজে যেত অপার্থিব আনন্দে, ঠোঁট ফাঁক করে বিড়বিড় করে বলত, আমারে মেরে ফেল। প্রেম-পীরিতে এত জ্বালা আগে জানতামনি। সেই মানোয়ারা এখন খাঁচা ভেঙে উড়ে যাওয়া বনটিয়া, তাকে দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না। সে এখন সাদাতের বাগানে শিস দেয়, হাসে, খেলে, ঘুরে বেড়ায়। তার চেহারায় ছায়া পড়ে নুরি বেগমের, নুরি বেগম তার মা।

রূপসী নুরি চাঁদ মহম্মদের অভাবকে মানিয়ে নিতে পারল না শেষ পর্যন্ত। চাঁদ মহম্মদ আজান দিতে ভোরবেলায় মসজিদে চলে গেলে নুরি দু’হাত উর্ধ্বে প্রসারিত করে দোয়া মাঙত আল্লাতালার। বিড়বিড় করে বলত, আমারে আজাদ করে দাও রহিম। আমার ঘরের মানুষটা দোজকের কীট। ও আমার জীবন-যৌবন ছারখার করে দেবে। আমি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবো রসুল। দোয়া করো। আমার জান বাঁচাও।

দশ বছর ঘর করার পর নুরি বেগম পালিয়ে গেল আতিফের সঙ্গে। আতিফের বহরমপুরে কাঁচা মালের ব্যবসা। কাঁচা ব্যবসায় কাঁচা টাকা। তার কাছে নুরি বেগম খরিদ করা বাঁদী।

যতদিন রূপের জৌলুষ ছিল ততদিন কোনো সমস্যা হল না খাওয়া পরার। রূপ ঢলতেই কদর ঢলে গেল ভিন্ন দিকে। আতিফের দু-চোখের বিষ এখন নুরি বেগম। একদিন ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল আতিফ। তার কাঁচা-পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ভর্ৎসনা করে বলল, আর আমাকে জ্বালাচ্চো কেনে, ইবার ঘাড় থিকে নামো। ঢের হল, আর পারচি নে। ইবার আমারে ছেড়ে অন্য কাউকে দেখো। তা যদি না হয়, চাঁদের ঘরে ফিরে যাও। সে তুমাকে তো তালাক দেয়নি। শুনেছি সে নাকি এখন দয়ার সাগর। মসজিদ ঝাডপুছ করে। সাঁঝের বেলায় ফকিরি গান গায় মসজিদের চাতালে বসে। আর কিছু না হোক তুমার বুড়া বয়সে টেইম পাশ হয়ে যাবে।

নুরি বেগম আতিফের পা ধরে কাকুতি-মিনতি করে অঝোর ধারায় কাঁদল, ওগো, তুমার দুটা পায়ে ধরি, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। তার চেয়ে ফলিডল এনে দাও আমি খেয়ে মরি।

-ছিঃ ছিঃ, একী কথা! যে মোল্লার দাড়ি আছে, তার কি কুনো গুনাহ করা সাজে? তুমার জন্যি আমি কেনে দোজকের মাটি খরিদ করে রাখব? হাঁড়িচাচা পাখির মতো লালচে দাড়িতে হাত বুলিয়ে সে সজোরে ঝটকা দিয়ে পা’টা ছিনিয়ে নেয় নুরি বেগমের দখল থেকে। ঝড়ের গতিতে ঘর ছাড়ার আগে সে শাসিয়ে যায়, আর এক ঘণ্টা সময় দিলাম ঘর ছেড়ে চলে যাবে। নাহলে কেটে বস্তায় পুরে ভাগীরথীর জলে ভেসিয়ে দেব। তুমার মতন পাপী মেয়েমানুষের মানসো শ্যাল-কুকুরকে খাওয়ানোও পাপ।

নুরি বেগমের আর অপমান সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। কাঁপতে কাঁপতে রোদ মাথায় সে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। শেষে দশ ঘাটের জল খেয়ে বাস-স্ট্যান্ডের কাছে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। চাচ বেড়ার ঘর, স্যাঁতসেতে, আলো-বাতাস ঢোকে না। সেখানে মুটে বদনার সে দাসী হয়ে বেঁচে আছে।

নুরি বেগমের কথা মাঝেমধ্যে কানে আসে মানোয়ারার। ময়ূরের পেখম ঝরে গেলে কেউ তার দিকে তাকায় না। বোবা কোকিলকে কে খাঁচায় ভরে পুষবে, দানা খাওয়াবে?

সাদাত তার শরীর নিয়ে জোর করতে চাইলে মানোয়ারা বেঁকে বসে, আগে নিকে হোক, তারপর। অত তাড়াহুড়োর কী আচে মিঞা। গাছের ফল রয়ে-সয়ে খাও। এ তো ঝরে যাওয়ার জিনিস নয়।

সাদাতের বাহুবন্ধনে যাঁতাকলের মটরদানার মতো পিষ্ট হতে থাকে মানোয়ারা খাতুন। তার মুগ্ধ চোখ দেখতে থাকে সাদাতের আবেগ থরো থরো মুখখানা। দুলু কাহারের কথা মনে করে সে আর কষ্টের পুকুরে ঝাঁপ দিতে চায় না। অতীত তার কাছে সবসময় কাঁটার ঝোপ, বর্তমান তার কাছে খুশবুদার বসরাই গোলাপ। পণ্ডিতবিলের পাড়ে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেল দুলু। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা থেতলে গেল আধলা ইটে। কনকন করছিল নখের চারপাশ। রক্তে মাখামাখি হয়ে বুড়ো আঙুলটাকে মনে হচ্ছিল ঢোঁড়াসাপের থেতলে যাওয়া মাথা। রঘুনাথ তার পাশেই ছিল, হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে দুলু বিমূঢ়ভাবে তাকাল, তেমন কুনো চোট লাগেনি, যা লেগেছে তা আমি সামলে নিতে পারব। উবু হয়ে রক্ত মুছে দুলু খাড়া হয়ে দাঁড়াল। মাটিতে ঢুকে যাওয়া আধলা ইটটা হাতে জোর করে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল পণ্ডিত বিলের জলে। খপাৎ করে শব্দ হল জলের, চারদিকে ছিটিয়ে গেল জল ঢেউ তুলে। আর সাথে সাথে মেঘভরা জলবাহী আকাশের নীচ দিয়ে ডানা মেলে উড়ে গেল কয়েকটা মেছোবক আর মাছরাঙা পাখি। বালিহাঁসগুলো কাতর চোখে তাকিয়ে ডুব আর সাঁতারের নিপুণ কৌশলে পৌঁছে গেল নিরাপদ দূরত্বে। তারপর গলা ফাড়িয়ে ডাকতে লাগল ভয়ে।

নিজেকে সামলে নিয়ে দুলু উদভ্রান্ত স্বরে বলল, শোন রঘু, তোকে এট্টা কথা বলি। তুই আমার ভাইপোর মতো, তোরে আমার ভালো লাগে। এ সনসারে মেয়েছেলে থেকে তফাৎ-এ থাকবি। ওরা হল ছুতোর মিস্ত্রির তুরপুনের মতো। তোর কলিজা ফুটা করে সেখানে উইয়ের বাসায় ভরিয়ে দেবে। আর এট্টা কথা। ভালোবাসা আর উইয়ের বাসা-দুটাই বড়ো পলকা জিনিস। ম্যাচিস কাঠির মতো পুটপুট করে ভেঙে যায়। আর তখনই সেই খোখলা দিয়ে বেনেজল ঢুকে তোর চৌদ্দগুষ্টির মুণ্ডু চটকে ছেড়ে দেবে।

রঘুনাথ হাসতে গিয়েও হাসল না, হালকাভাবে মুখ মুছে নিয়ে সে দুলুর মুখের দিকে পুলিশ-নজরে তাকাল, কী হলো দুলুকাকা, মনে হতিচে চোট খেয়েছো। আরে ছাড়ো ওসব কথা। আমার দাদু বলে নিজে বাঁচলে বাপের নাম। কার জন্যি ভাববা তুমি। খবরদার, কারোর জন্যি ভেবো না। ভেবে ভেবে দিমাগ তুমার বরবাদ হবে, আসল কাজের কাজ কিছু হবে না।

–এসব বলা সহজ, করে দেখানো কঠিন রে! দুলু বাতাস ভরাল দীর্ঘশ্বাসে, আমার মনের অবস্থা ভালো নেই, গলা দিয়ে গান বেরুচ্চে না। কার জন্যি গাইব। যার জন্যি গাইতাম–সে এখন অন্যের খাঁচায় বুলি বলচে। আমাকে আর চেনেই না।

–সেই মহারানী কে শুনি, কী তার নাম? রঘুনাথ উৎসাহী হল।

–তার কথা না শোনাই ভালো। তার কথা বলতে গেলে আমার জিভ উল্টায় না।

তবু বলি সে মোকামপাড়ার মেয়ে। চাঁদ মহম্মদের বিটি, মানোয়ারা। দুলু দ্বিধাহীন ভাবে কথাগুলো বলে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাল।

রঘুনাথ বিজ্ঞ স্বরে বলল, দুলুক, এট্টা কথা বলি যদি কিছু মনে না করো।

-হ্যাঁ হ্যাঁ বল। উৎসাহিত হল দুল।

–তুমি মানোয়ারার এট্টা পুতুল বানিয়ে এই বিলের জলে ভাসিয়ে দাও। দেখবা সব হিসাব চুকে বুকে যাবে। তুমার আর কুনো কষ্টই হবে না।

বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায় বহু দূর। মেঘের মিছিল যেন ঘোড়ায় চেপে মেঘপাহাড়ের দিকে চলে যাচ্ছে টগবগিয়ে। দৌড়ে বেড়ানো মেঘগুলো চোখ ড্যামা ড্যামা করে দেখছে পাগলা ঘোড়ার কক্সরত। খিরিষগাছের তলায় দাঁড়ালে কোমল স্তর মেঘের তুলোর শরীর দেখা যায়। এ যেন বড় হয়ে যাওয়া কোন যুবতীর গোপন রূপবাহার।

রঘুনাথ উদাস হয়ে দেখছিল মেঘেদের ঘরবাড়ি। দুলু থুতনি চুলকাতে চুলকাতে বলল, আজ যাই। আবার হাসপাতালে যেতে হবে ভাত নিয়ে। ঘরে কেউ নেই। আমাকেই এক হাতে সব করতে হবে।

-তুমার অসুবিধা হলে বলো। আমিও তুমার সাথে চলে যাব।

-না, না। তার আর দরকার হবে নি। তবে সাবধানে চলা-ফেরা করবি। গাঁয়ে তোর শত্তরের অভাব নেই। দুলুর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

রঘুনাথ হাসতে হাসতে বলল, সে আমি জানি। তবে কেউ আমার কুনো ক্ষতি করতে পারবে নি। আমার ক্ষতি করতে এলে তার নিজেরই ক্ষতি হয়ে যাবে।

–তুই এত মনের জোর কুথা থেকে পাস? দুলু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

রঘুনাথ ভেবে নিয়ে বলল, আমার শক্তি আমার মা। জানতো আমার মায়ের নাম দুর্গা। দুর্গার দশ হাত। দশ হাতে দশ রকমের অস্ত্র। এছাড়া কপোতাক্ষবাবু, অমল মাস্টার–ওদের আমার ভালো লাগে।

রঘুনাথের কথা শুনে দুলু সশব্দে হাসতে গিয়েও থেমে গেল, অমল মাস্টারের কথা আর বলিস নে। সেদিন আমি না থাকলে এই ভরা বিলে ডুবে সে মরে যেত।

-কেন কি হয়েছিল?

–কি হয়েছিল তা আমি কি জানি। জলকাজ সারতে এসে দেখি–এট্টা মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে বিলে। কোনো কিছু না ভেবেই ঝেঁপিয়ে পড়লাম। এক হাতে সাঁতরে গিয়ে তারে কোনোমতে বাঁচালাম। শেষে দেখি কিনা হাইস্কুলের ছোকরা মাস্টর। কী সব ভূত নেই, মন্ত্র নেই, বাণ মারা নেই, সভা করে ফিরছিল। কারা তাকে বিলের জলে ঠেলে ফেলে দিয়ে পেলিয়ে গেছে। দুলু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, তবে আমি না থাকলে সেদিন মাস্টুরের দফারফা হয়ে যেত। তাও যা জল খেয়েছিল তা বের করতে আমাদের বাপ-বেটার ঘাম ছুটে যায়।

–এ সব কথা তো জানতাম না। রঘুনাথ অবাক হয়ে বলল।

-সব কথা কি সবার জানা সম্ভব? তুই থাকিস ধাওড়া পাড়ায়, আমি থাকি মোকামপাড়ায়। কথার কি পাখির মতোন ডানা আচে যে উড়ে যাবে?

–তা ঠিক। রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল, তারপর কি হলো, মাস্টুরকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বুঝি?

–তোর কি মাথা খারাপ না পেট খারাপ? হাসপাতালে নিয়ে গেলে আমি যে ফেঁসে যেতাম। দুলু মাথা নাড়ল, জলে ডোবা কেস, পুলিশ কেস। শেষে পুলিশ বলবে আমিই ঠেলা মেরে ফেলে দিয়েচি–তখুন?

-মাস্টার ভালো মানুষ, ও কেনে তুমার নামে মিছে কথা বলবে?

–আমার গুরুজী বলে কালো চুলের ভালো করতে নেই। কালো চুলের ভালো করলে হাড়ে হাড়ে ঠকতে হয়। দুপুর ঠোঁটে সরল হাসির ঢেউ খেলে গেল। রঘুনাথ বলল, মাস্টরকে আমি কতো বুঝিয়েছি, তবু মাস্টার বুঝবে না। মাস্টুরের ধারণা মন্ত্র পড়ে সাপের বিষ নামে না। ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই। একথা গাঁয়ের মানুষকে বোঝালে বুঝবে কেনে? যারা এসব ভাঙিয়ে করে খাচ্ছে তাদের যে বিপদ। তারা কেনে মাস্টুরকে ছেড়ে কথা বলবে? গাঁয়ে থাকতে হলে গাঁয়ের মানুষের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলাতে হবে। নাহলে সাঁঝের আঁধারে বিলের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে এ তো জানা কথা।

–ছোকরা মাস্টুরটার মাথা খারাপ। জিন-পরী নেই একথা বললে মোকামপাড়ার কেউ কি মানবে? কেউ মানবে না। সব ক্ষেপে যাবে। দুলু চুপ করে গেল। রঘুনাথ ঝাঁঝালো গলায় বলল, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ালে জান তো যেতেই পারে। সেই আগের গাঁ কি আর আচে গো? তলায় তলায় গাঁ যে অনেক বদলে গিয়েচে।

-হ্যাঁ, তা ঠিক। মেঘে মেঘে বেলা অনেক গড়ে গিয়েছে। দুলু কপালে ভাঁজ ফেলে রঘুনাথের দিকে তাকাল।

একটাই পথ মোকামপাড়া সটান চলে এসেছে পণ্ডিত বিলে। পথের ডান দিকে জল, বাঁ দিকে হাড়মটমটি, কচা আর আঁশশেওড়ার ঝোপ। সেখানে ক্যাচকেচি পাখি থপর থপর করে হাঁটে, সারাটা দিন ওদের কাজিয়ার কোনো কামাই নেই, জীবনটা বুঝি ওদের লড়াই-ঝগড়া করে কেটে গেল। ক্যাচকেচি পাখিগুলোর তবু মিলের কোনো শেষ নেই। গাঁয়ের অনেক মানুষ ওদের সাতভায়া পাখি বলে। সাত ভাই কার অভিশাপে পাখির রূপ নিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

দুলু মুখ ঘুরিয়ে বলল, বেলা অনেক হল, এবার আমি যাই। তুই যদি কাল দেবগ্রামে যাস তাহলে পরে আমার সাথে দেখা করিস। আমি সাড়ে সাতটার বাসে যাবেন। তোর মন হলে চলে আসিস। তাহলে দুজনে মিলে দরদাম করে হাঁসটা কিনতে পারব।

রঘুনাথ আর দেরি না করে বিলধারের পথটায় উঠে এল। এ পথটায় ছায়া আছে গাছের। বৃষ্টি-বাদলা দিনের রোদ কখনও সখনও চাঁদি গরম করে দেয়। গুমোট ভাবটা অসহ্য লাগতেই রঘুনাথ বুকের কাছে হাতটা নিয়ে এল। ঘামে জবজব করছিল হলদেটে গেঞ্জিটা।

আজ অশ্বত্থতলায় শ্রী শ্রী মনসা দেবীর পুজোর সভা আছে। সেখানে পাড়ার সবাই জড়ো হবে। পুজোর খরচ, কে কত চাঁদা দেবে, কে কি কাজ করবে এসবই দশ জনের হাজিরাতে ঠিক করে দেবে চুনারাম। দশের কাজ দশে মিলে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো। একার কোনো মত বারোয়ারি কাজে খাটবে না।

ফি-বছর মনসা মায়ের পুজোয় সুফল ওঝার একটা বড়ো দান থাকে। কোনো বছর ফল-প্ৰসাদ, কোনো বছর মাইকের দাম সে দিয়ে দেয়। ওর দলবল এসে পাকুড়তলায় ঝাঁপান গায়, মনসামঙ্গলের গান করে। পাড়ার ছেলে বুড়ো বউ-ঝিরা সেই গান কত ভক্তি সহকারে শোনে। বেহুলার দুঃখে তারাও চোখের জলে বুক ভাসায়। আহারে, বাসর ঘরে যার সোয়ামী মরল তার জন্য কি দুঃখ হবে না কারোর?

এ বছর নাগপঞ্চমী পুজো পূর্ণিমার ব্রতোপবাস এর ঠিক পাঁচ দিন পরে পড়েছে। ওই দিন গাঙ ধারে মেলা বসবে ওঝা গুণিনদের। বর্ধমান মুর্শিদাবাদ এমন কি বীরভূমের ওস্তাদ গুণিন আসবে সেই মেলায়। তারা খালি হাতে আসা পছন্দ করে না, তাদের সঙ্গে মাদুলি-তাবিজ-এর মতো থাকবে সাপঝাঁপি। সেই সব ঝাঁপিতে মাথা নিচু করে চুপচাপ পড়ে থাকবে বিষধর সাপ। এমন হরেকরকমের সাপ দেখার মওকা বছরে মাত্র একদিনই আসে। আর এই দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকে সুফল ওঝা। কত গুণী মানুষের পায়ের ধুলোয় ভরে উঠবে গাঙের ধার। উৎসবের ক’দিন দুলু যাবে না দেবগ্রাম। ললাট ওস্তাদের সঙ্গে সে আসবে এই অভিনব মেলায়। এখানে কবির গানের সঙ্গে লড়াই জমে দেহশক্তির। যে জিতবে সে হবে মেলার সেরা। যার সাপ ফণা তুলবে বেশি, সে হবে সাপেদের ওস্তাদ। এভাবেই দশটা শাখায় নাম উঠিয়েছে সুফল ওঝা। ফলে তার বিরামের কোনো প্রশ্ন নেই। সব কিছু একবার ঠিকঠাক বুঝে নিলে যে কোনো কাজই সহজ হয়ে ওঠে, গলানো ভাতের চেয়েও সহজ এবং সরল।

সুফল ওঝার এ কয়দিন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। সে মেলা কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য। তার কথাতেই অনেকে মাথা হেঁট করে। অশ্বত্থতলার সভা শেষ হয় বিনা বিবাদে। চুনারাম খুশি খুশি মুখ করে বলল, ধাওড়াপাড়ায় পুজা হবেনি, এ তো হতে পারে না। তা বাপু, তুমরা যে সব এগিয়ে এলে, ব্যবস্থা করলে এতে আমার মন ভরে গেছে। মা মনসা আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করে। তারে আমাদের খুশ রাখা দরকার। মা খুশ তো, বেটা খুশ। বেটা খুশ হলে আর ভাবনা কী। সমবছর আমাদের ভালো যাবে। মা মনসার রোষ থিকে আমরা সবাই বাঁচব গো। পাকুড়তলায় মাটি দিয়ে পুজোর বেদী বানিয়েছে ধাওড়াপাড়ার উঠতি বয়সের ছেলে ছোকরা। তাদের অনেক দিনের ইচ্ছে এবছর কালীগঞ্জ হরিনাথপুরের মতো প্যাণ্ডেল বেঁধে পুজো হোক। পুজোয় দিনভর বাজুক মাইক।

দেবগ্রামের হাট থেকে মনসামঙ্গলের ক্যাসেট কিনে এনেছে দুলু। চিকচিকিতে মোড়ানো সেই ক্যাসেটটা দুল রঘুনাথের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এর দাম তাদের দিতে হবে না। এটা মনসাপুজোয় আমার চাঁদা। দেবগ্রাম গোরুর হাটে ক্যাসেটটা বাজছিল। গানগুলো শুনে মনটা ভরে গেল। তাই ভাবলাম-এটা তোদের জন্যি লিয়ে যাই। দুলু তার কাটা হাত নাড়িয়ে শরীর দুলিয়ে হাসল, পুজোর সময় আসবখন। তখন এসে ক্যাসেটের গানগুলো সব শুনে যাবে। আহা, কি গান! মনসা মঙ্গলের সুর কানে ঢুকলে মন জুড়িয়ে যায়। এসব গানের মূল্য আলাদা। তোদের ওই ফোচকামো গানের মতো নয়।

দুলু চলে যাওয়ার পর বেদী তৈরি করার কাজে লেগে গেল রঘুনাথরা। ঝুড়ি ঝুড়ি বুড়িগাঙের মাটি এনে তৈরি হল বেদী। মনসা পুজোর পরেই ভাদ্রমাস চলে আসবে। শুরু হবে কম পুজোর তোড়জোড়। ধাওড়াপাড়ার বউ-ঝিউড়িরা মেতে উঠবে করম পুজোর আয়োজনে। সে সময় ভাদুগান আর করমগানে নড়ে উঠবে মেয়েদের ঠোঁট। কটা দিন সারা পাড়া ঘিরে উৎসবের আয়োজন। রঘুনাথের এসব উৎসব অনুষ্ঠান পরব মেলাখেলা ভালো লাগে। কটা দিন অন্যরকম মনে হয় তার। অভাবী জীবনে এইটুকু সুখ-আনন্দ লটারি পাওয়ার চেয়েও মনোমুগ্ধকর। মাসকলাই হাতে নিয়ে মেয়েরা সুর করে গাইবে, কলাইরে, তুরে আমরা কী করে ভুলাইরে, ক্ষেতেরে, জমিরে ফুলুক শুধু মাসকলাইরে, ঘরে-বাইরে শুধু সুখের কলাইরে, ও মাটি তুর ভুখ কি ভরে রে, ফুল আসুক গোছ গোছা, ঘরদোর সব ঝাড়াপুছা, দেশ দুনিয়ায় ফুল ফুল ফুলুনী, শরীল হেলিয়া দুলিয়া কলাইদানা ঝাড়ুনী, কলাইরে কলাইরে, খেতিবাড়িতে সুখের সাথে ঢলাইরে ঢলাইরে, রক্ষা কর ধরিত্রী মাতা, অঢেল কলাই ফলাইরে ফলাইরে।

পরবে শুধু মানুষ নয়, সুখী হয়ে ওঠে মাঠঘাট পশুপাখি গাছপালা। পরব এলে বদলে যায় রোদের রঙ।

বসন্তপুর ধাওড়া থেকে টেপ নিয়ে এসেছে শ্রীকান্ত। সে ভূষণীবুড়ির নাতজামাই। পুজার কদিন সে ভূষণীবুড়ির ঘরে থাকবে। দুপুরে পাত পেড়ে খিচুড়ি খাবে পাকুড়তলায়। রাতে দুর্গামণি তাকে নেমন্তন্ন করেছে খাওয়ার জন্য।

মা মনসার প্রিয় নৈবেদ্য হাঁস। কাঁচা দুধ আর কলা। ভেজানো মুগ কলাই। কাঁচা দুধ না হলে মায়ের পুজো হবে না। সেই সঙ্গে চাই-নকুলদানা বাতাসা ফলফলাদি। পাড়ার মেয়েগুলো সাদা ফুল, লাল ফুল তুলে রেখেছে সাজি ভরে। ফুল তোলায় তাদের কী আনন্দ! ওরা যেন শিশির চুবানো ঘাসের চেয়েও ঝকমকে। মায়ের পুজো নিয়ে রঘুনাথের যেন ব্যস্ততার আর শেষ নেই। রঙিন শাড়ি দিয়ে ঘেরা হবে বেদী। তার মাঝখানে মা আলো করে বসে থাকবেন। তার শরীরে শাটিংয়ের ঝলমলে পোশাক। মাথায় শোলার মুকুট। হাতে ফণাধারী সাপ, পায়ের কাছে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকবে মায়ের অনুগত সাপ। অষ্টনাগ, ষোল বোড়া… আরও কতধরনের কত জাতের সাপ। মায়ের মাথায় ছায়া দেবে পঞ্চনাগ। ফি-বছর ঘটপুজো হত, এবার আর ঘটপুজো নয়। প্রতিমার দাম দিয়েছে সুফল ওঝা। এ পুজো সে নিজের ঘরে করতে পারত কিন্তু মনসা পুজোয় ভুল হলে কোনো ক্ষমা নেই। মা প্রচণ্ড রাগী। বদলা না নিয়ে ছাড়বে না। উপায় না দেখে সুফল ওঝা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা বছর মা মনসাকে নিয়ে তার কাজ কারবার। মাকে খুশ না করতে পারলে সে যে দুঃখের সাগরে ডুবে যাবে। ফলে ধাওড়া পাড়ার পুজোয় সুফল ওঝার প্রভাব অনেক। সে সরাসরি না থাকলে দূর থেকে কলকাঠি নাড়ে। তবে এ বছর তার মন ম্যাদামারা। আচারের নুন দেওয়া লেবুর মতো চুপসে গেছে। এর কারণ রঘুনাথ। রঘুনাথ তার মেয়ের সঙ্গে লটঘট করছে। বাপ হয়ে কে মেনে নেবে? ছেলেটার বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার বাসনা। ধাওড়া পাড়ার অনেকেই রঘুনাথের কেসটা জানে, তারাও মনে মনে খুশি নয়। সকাল থেকে মাইক বাজছে জোর কদমে। কালীগঞ্জ বাজার থেকে মাইক ভাড়া করে এনেছে লুলারাম। মাইকের যাবতীয় খরচাপাতি সব তার। লুলারামের মাথার কোনো ঠিক নেই। সব সময় তার মনে অশান্তি লেগে আছে। ঢিলি কোথায় গিয়েছে তার খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। দুলু কাহারের ঘর গিয়েছিল লুলারাম। তার হাত ধরে বলে এসেছে, তোর বৌদিকে পাওয়া যাচ্চে না। শুনেছি সে নাকি দেবগ্রামের বাসে চেপে কুথায় চলে গিয়েছে। দু-একজন তারে ভিখ মেঙে খেতে দেখেছে। লোকমুখে খবর পাই কিন্তু আনতে গিয়ে দেখি সে সিখানে নেই। তুর কাকি তো আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলচে। আমি আর পারচি নে। হেঁপসে উঠেছি। তুই তো এদিক সেদিক যাস। তোর সাথে দেখা হলে তরে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়। আমার মন বলচে তুর দ্বারা এ কাজ সম্ভব হবে।

গাঁ ছেড়ে এত দীর্ঘসময় ঢিলি কোথাও থাকে না। সে বেঁচে আছে না মরে গেছে এখবর কেউ জানে না। তবে মরে গেলেই বুঝি ভালো হত, লুলারামে গলার কাঁটা নেমে যেত। নূপুর আর নোলক যেভাবে তার দিকে তাকায়–সেই নীরব দৃষ্টি কোনো মতেই সহ্য করতে পারে না লুলারাম। মেয়ে দুটোর চোখে সে অপরাধী হয়ে গেছে। ওরা বড়ো হচ্ছে। ওরা ঝারির ঘটনাটা জানে। সব জানার পরে লুলারামকে তারা ক্ষমা করবে কি ভাবে? নানা কারণে মনে মনে পুড়ে খাক হয়ে গেছে লুলারাম। তবু মনসা পুজোয় মাইক দিতে পেরে সে খুশি। দিন চারেক আগে ঘরে একটা চিতি সাপ বেরিয়েছিল। সামনে মনসা পুজো বলে সাপটাকে মারেনি সে। মা মনসার বাহন পুজোর আগে দেখা দিলে সেই ঘরে দেবীর পুজো আবশ্যক হয়ে পড়ে। লুলারাম ভেবেছিল ঢিলি ফিরে এলে সে পুজোর বন্দোবস্ত করবে। কিন্তু তা আর হয়নি। ঢিলি তার অশান্তিকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাড়ায় সবার চোখে ধীরে ধীরে অপরাধী হয়ে যাচ্ছে সে। এমনকী ঝারিও তাকে ভালো নজরে দেখছে না। সেদিন তো কলতলায় মুখের উপর বলে দিল, কী পাষাণ গো তুমি? যার সঙ্গে এত বছর তুমি ঘর করলে একবার তার খোঁজ নেবে না? সে তুমার বউ। মেয়ে দুটার মুখ চেয়ে তারে খুঁজে আনা তুমার দায়িত্ব।

ঝারির মুখের উপর লুলারাম একটা শব্দও বলতে পারেনি। ভিকনাথের বউটা আগের চেয়েও জেল্লাদারী হয়েছে। সামান্য আটপৌরে শাড়িতে তার রূপ যেন ফেটে বেরায়। মুখের হাসিটারই দাম লাখ টাকা। এ পাড়ায় বউ হয়ে আসার পর সে একদিনও খাটতে যায়নি। ভিকনাথই নিষেধ করে বলেছে, তুমি ঘরের বউ ঘরে থাকবা। আমার হাত-পা যত দিন সচল আছে, তুমারে আমি খাটতে যেতে দেব না। আমি চোখ মুদলে তোমার যা ইচ্ছে তাই করো।

-ছিঃ, কী কথা শোনাও সকাল সকাল! অভিমানে ঝারির মুখ ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে খসখসে ডুমুরের পাতা, যা বলেচো–আর কুনোদিন অমন কতা বলবা না। ওকথা শোনার আগে আমার যেন ছাতি ফেটে যায়।

লুলারামের সুখসঙ্গ ঝারি কোনো দিন ছাড়তে পারবে না, তা বলে সে যে তার ঘরের মানুষটাকে অবজ্ঞা করে তা নয়। ভিকনাথ সক্ষম পুরুষ তবু কী ভাবে যে ঝারি লুলারামের উপর ছিনে-জোঁকের মতো লেপটে গেল তা এখন আর সে মনে করতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে প্রথম এগিয়ে আসে লুলারাম। ঝারির চাইতে সে বয়সে অনেক বড়ো হবে। বয়স্ক হলেও তার যৌন-আচরণে বয়স্কতার কোনো ছাপ নেই বরং সে অনেক বেশি তরুণ, চনমনে প্রাণ-ভ্রমর। লুলারাম দু-হাত ভরে তাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এ পাড়ায় কারোর গলায় সোনার হার নেই শুধু ঝারি ছাড়া। দুটো চোঙা মাইক দুদিকে মুখ করে বেঁধে দিয়েছে রঘুনাথ। বেদীটাকে কে ঘিরে দিয়েছে কমলার কাছ থেকে চেয়ে আনা শাড়িতে। মুখ ফসকে বলার সাথে সাথেই কমলা শাড়ি তিনটে গুছিয়ে ভাঁজ করে রঘুনাথের হাতে দিয়ে দিল, যাক শেষ অবধি আমিও তোমাদের পুজোয় কাজে লেগে গেলাম। শাড়িগুলো যেন ফুটো না হয় সেদিকে খেয়াল রেখো। গত বছর পাড়ার ছেলেরা প্যান্ডেল বাঁধতে গিয়ে আমার একটা শাড়ি ফুটো করে দিয়েছে।

রঘুনাথ তাকে অভয় দিয়ে বলেছে, তুমার ভয় নেই। যেমন শাড়ি তেমনই ফেরত দিয়ে যাবো। আমার উপর তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো। রঘুনাথের কথা শুনে কমলা দাঁত দেখিয়ে হেসেছে, তোমাকে বিশ্বাস করবে না তো কি আকাশের তারাকে বিশ্বাস করব? তুমি আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে। বলেই সে হাত চেপে ধরেছিল রঘুনাথের, যাকে মন দিয়েছি তাকে তিনটে শাড়ি দিলে কী হয়? তুমি জানো না, তুমি আমার কোথায় আছো!

শাড়িগুলো লাগাতে গিয়ে বারবার করে এসব কথা মনে পড়ছিল রঘুনাথের।

মাইকে মা মনসার পাঁচালি বাজছে। এ বারের পুজো গেল বারের পুজোকেও ছাপিয়ে গেল। একটা পুজোকে কেন্দ্র করে পাড়ার সব মানুষের এমন প্রাণঢালা যোগদান এর আগে দেখা যায়নি।

রঘুনাথ অশ্বত্থতলা থেকে ঘরে এসেছিল কী যেন কাজে। তাকে দেখে দুর্গামণি বলল, বুড়িগাঙ থেকে ডুব দিয়ে আয়। আজ আর তুকে খেতি দেব না। আজ তুর উপোস।

উপোসে থাকা কষ্টের। তবু রঘুনাথ মায়ের মুখের উপর না বলতে পারে না। কত কষ্ট করে দুর্গামণি হাঁস কেনার টাকা জোগাড় করেছে তা নিজের চোখে দেখেছে রঘুনাথ। গ্রামের কেউ সামান্য কটা টাকা উধার দিতে চায় নি। বর্ষা বাদলের দিনে নগদ টাকা কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। টাকার বদলে চাল গম অনেকেই ধার দিতে চায়। সব সময় চাল-গম দিয়ে কি সংসারের সব চাহিদা মেটে?

মন খারাপ করে খুঁটিবাঁশে হেলান দিয়ে বসেছিল দুর্গামণি। অতগুলো টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে ভাবছিল সে। রঘুনাথের মানসিকটা যে করেই হোক এ বছর শোধ করতে হবে। ছেলেটার অসুখ মা মানসার দয়ায় ভালো হয়েছে। মুখ রেখেছে মা মনসা। দেবী আসছে। তার সেবা যত্ন না করলে সংসারের উন্নতি হবে না। মা মনসাই তো তার ভরসা, আঁধার রাতের বাতি।

তার মন খারাপ দেখে চুনারাম আগ বাড়িয়ে বলেছিল, কী হয়েছে বউমা? মুখ বেজার করে বসে আচো যে।

-রঘুর মানসিকটা এ বছর মনে হয় শোধ হবে না। উত্তর দিয়েছিল দুর্গামণি, হাঁস বলি দিব বলেছিলাম। কিন্তুক হাঁস যে কিনব তার টাকা কুথায়?

ওঃ, এই কথা। চুনারাম ফোকলা হেসে বলেছিল, কত টাকা লাগবে তুমার? যেন খাজানার সন্ধান পেয়েছে চুনারাম, সেই ভাঙাচোরা মুখের দিকে তাকিয়েছিল দুর্গামণি। মানুষটা বলে কি, মাথা খারাপ হয়ে গেল না তো? দুর্গামণির ভাবনা ওলোট-পালোট হয়ে গেল। যে মানুষটার বিড়ি খাওয়ার পয়সা জোটে না সে দেবে টাকা? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুর্গামণির মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে গেল।

তাকে চমকে দিয়ে ঈষৎ কুঁজো গতর সামান্য সোজা করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল চুনারাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল হাতে একটা বাঁশের পাপ নিয়ে। সেই শুকিয়ে যাওয়া বাঁশের পাঁপটা রঘুনাথের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চুনারাম বলল, এটা আমার লক্ষ্মীর ভাঁড়ার। যা দা নিয়ে আয়। দেকি এর ভিতরে কতো মাল-কড়ি জমেছে। চোখ বিস্ফারিত করে তাকাল দুর্গামণি। সে অপলক তাকিয়ে ছিল তরলাবাশের শক্ত-পোক্ত মোটা পাঁপটার দিকে।

রঘুনাথ দায়ের খোঁজে চলে গিয়েছে ঘরের দিকে। চুনারাম একটা বিড়ি ধরিয়ে তরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, তুমি চিন্তে করবে না বউমা। তুমার হাঁস কেনার টাকা হয়ে যাবেন। দু-সাল থিকে ইতে আমি টাকা ভরচি। উঠিয়ে দেখো, কত্তো ভারি। এ পয়সা আমার বহু কষ্টের পয়সা। পেট কেটে এসব আমি জমিয়েচি। এ টাকা আমি গুয়ারেও দিইনি। কিন্তু নাতির কতা, তুমার কতা আলাদা। তুমাদের দুজনার জন্যি আমি আমার সব দিয়ে দিতে রাজি আছি।

দুর্গামণি স্বপ্নাবিষ্টের চোখে তাকাল। মানুষটাকে চিনতে তার ভুল হয়েছিল। মনে মনে অনুতপ্ত হল সে। মানুষ চেনা অত সহজ নয়, মাটি চেনার চেয়েও কঠিন।

গ্রামসমাজে খুঁটিবাঁশে পয়সা জমানোর রেওয়াজ বহু পুরনো। দুর্গামণির বাবাও পয়সা জমাত খুটিবাঁশে। খুঁটিবাঁশে জমালে সেই পয়সা নয়-ছয় বা চুরি চামারী হবার সুযোগ খুব কম থাকে। খুঁটিবাঁশের মাঝখানে পয়সা ফেলবার জন্য ছিদ্র থাকে। সে ছিদ্র বড়ো সূক্ষ্ম। পয়সা ঢুকবে কিন্তু কোনোভাবে বের করানো যাবে না। দিনে দিনে ভরে উঠবে বাঁশের পাঁপ। পাঁপ ভরে গেলে একমাত্র ছিদ্রটাই হবে পয়সা বার করার উপায়। আর ঘরের খুঁটি কাটলে ঘর দাঁড়িয়ে থাকবে কীভাবে? অর্থাৎ কাটা খুঁটি বদলাতে হবে সাথে-সাথে। নাহলে ঘর মুখ থুবড়ে পড়বে মাটিতে। চুনারাম অতশত ঝামেলাবাজির ধার ধারে না, খুঁটি বাঁশ নয়, সে পাপ বাঁশেই পয়সা জমাতে ভালোবাসে।

দুর্গামণি অবাক হওয়া চোখে তাকিয়ে আছে সেই পাঁপ বাঁশটার দিকে। চালে গোঁজা দা-টা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চুনারামের সামনে দাঁড়াল রঘুনাথ, দাদু, এই নাও। কাটো- ফাড়ো যা খুশি করো–

-তুই থাকতে আমি কেনে দা-এ হাত দিব? চুনারাম কৌতুক হাসি ছড়িয়ে দিল পুরো মুখে।

দাদুর কথা কোনোদিনও ফেলতে পারে না রঘুনাথ, সে হাত বাড়িয়ে বাঁশের পাঁপটা নিয়ে দায়ের আঘাতে দু-ফাঁক করে দিল চোখের নিমেষে। ঝনঝন শব্দে পয়সা এবং ভাঁজ করা টাকা লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়, যেন টাকা নয়, পয়সা নয় এও যেন নক্ষত্রপতন।

দুর্গামণির ইতস্তত ভাবটি বেড়ে গেল। চুনারাম তা লক্ষ্য করে বলল, পয়সাগুলা বুঝে নাও। লক্ষ্মী চঞ্চলা, এদিক-ওদিক হতে দিও না।

উবু হয়ে পয়সা কুড়াচ্ছিল দুর্গামণি। রঘুনাথ আনন্দের সঙ্গে বলল, মা, কত হল ইবার গুণে ফেলো।

মাথা নেড়ে পয়সা গোণা শুরু করল দুর্গামণি। সব শেষে গা ঝাড়া দিয়ে সে বলল, সব মিলিয়ে একশ সতেরো টাকা হয়েছে। আমার হাঁস কিনতে অত টাকা লাগবেনি।

-না লাগুক, ও পয়সা তুমার কাছে রাখো বউমা। চুনারাম ভারি গলায় বলল, আমার কাছে থাকলি পরে সব খরচা হয়ে যাবে। তুমি মেয়েমানুষ। তুমাদের চাপা হাত।

পাঁপ-চেরা পয়সায় হাঁস কিনেছে রঘুনাথ। মানসিক শোধ করতে পারলে দুর্গামণিরও খুশি ধরবে না।

পরবের দিনে তার মোটা ঠোঁট দুটো স্ফুরিত হল আনন্দে।

অশ্বত্থ তলায় সাইকেল নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিল কাশীনাথ। কমলার শাড়ি দিয়ে ঘেরা হয়েছে মনসা মায়ের মণ্ডপ। এই দৃশ্য দেখতে গেলে তার চোখের ভেতরটায় কে যেন ছুঁড়ে দেয় কচার রস। করকরিয়ে ওঠে কাশীনাথের চোখ দুটো, এ শাড়ি কোথায় পেলি তোরা, এ তো আমার বোনের শাড়ি।

পাশে দাঁড়ানো রোগা ছেলেটা মিনমিনে স্বরে বলল, তুমার বোনের শাড়ি কিনা জানি না তবে এ শাড়ি রঘুদা চেয়ে এনেচে গাঁ থেকে। পুজো হয়ে গেলে ফের ঘুরিয়ে দিয়ে আসবে।

–এ কী মামার বাড়ি নাকি? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা– কাশীনাথ ছুটে গেল পাকুড়তলায়। দস্যু হাতে সে পটাপট ছিঁড়ে ফেলল সেলাই।

লম্বা ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে চাইলে কাশীনাথ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। একটা মোক্ষম খিস্তি দিয়ে বলল, হিম্মোত থাকলে তোর মায়ের পরনের শাড়ি খুলে নিয়ে এসে পুজো কর। পরের ধনে পোদ্দারী করে কি লাভ?

দাঁড়াও রঘুদাকে ডাকচি।

–ডাক গে যা তোর বাপকে। কার ঘাড়ে কটা মাথা সব আমার জানা আছে। ঠুকরে আস্ফালন করে উঠল কাশীনাথ।

রঘুনাথকে ডাকতে হল না তার আগেই অশ্বত্থতলায় পৌঁছে গেল সে। কাশীনাথকে মণ্ডপের শাড়ি খুলতে দেখে তার মাথায় বুঝি কাঁকড়া বিছে কামড়ে দিল। হুঙ্কার ছেড়ে দূর থেকে সে বলল, খবরদার কাশীদা, মণ্ডপের গায়ে হাত দিও না। বহু কষ্ট করে সুতো দিয়ে জুড়েচি।

–তুই জুড়েছিস তো আমার কী?

-কী মানে? এটা দশজনের পুজো।

—কমলার শাড়ি কোথায় পেলি? নিঃশ্বাস তেতে উঠল কাশীনাথের।

–তুমার বুন দিয়েছে। পুজা শেষ হলে দিয়ে আসব।

–না, এক্ষুনি আমি শাড়ি খুলে নেব।

–মনসাবুড়িকে তুমি অগ্রাহ্য করতে পারো না।

কাশীনাথ রঘুনাথের নিষেধ না শুনেই পড়পড় করে টানতে লাগল শাড়ি। চারধার ঘেরা মণ্ডপটা ফাঁকা হয়ে গেলে চোখের নিমেষে। সরে গেল আলো-ছায়া পরিবেশ।

নিমেষে মাথায় রক্ত উঠে গেল রঘুনাথের। সে ছুটে গিয়ে বেড়া থেকে উপড়ে আনল খুঁটিবাঁশ। তারপর কাশীনাথকে পেটাতে লাগল সজোরে। কাশীনাথ এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনটে-চারটে ঘা ওর পিঠে পড়তেই বাপরে বলে মাটি নিল কাশীনাথ। অশ্বত্থতলার ধুলো ওর মুখের ফাঁক দিয়ে ঢুকে গেল এক মুঠো। প্রাগৈতিহাসিক পশুর মতো কাতরাচ্ছে কাশীনাথ।

অশ্বত্থগাছের ফাঁক ফোকর দিয়ে মেঘেদের ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছিল, চলমান মেঘের ছায়া ভাসছিল বুড়িগাঙের জলে, সারিবদ্ধ আখক্ষেতে বাতাস আছড়ে পড়ে শব্দ তুলছিল গণ্ডগোলের। মনে হচ্ছিল কোনো জনবল বাজার এলাকায় হঠাৎ হামলাকারী আর প্রতিরোধকারীর তুমুল বিবাদ বেধেছে, আর সেই বিবাদের জেরে উৎপন্ন হল্লা স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে লোকালয়ে ছিটকে যাচ্ছে।

বাঁশের আঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে গোঙাচ্ছিল কাশীনাথ।

তার গায়ে যে রঘুনাথ হাত তুলতে পারে–এটা স্বপ্নেও ভাবেনি। অপমান কুরেকুরে খাচ্ছিল তাকে। এভাবে পড়ে পড়ে মার খেলে মৃত্যু অনিবার্য-এই ভেবে মাটিতে দু’হাতের ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল কাশীনাথ। মুখের ধুলো থুঃ শব্দে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে গ্রামের দিকে দৌড়তে লাগল প্রাণপণে।

পুটুস আর অ্যাশশেওড়ার ঝোপে ছেয়েছিল বাঁধের উল্টো দিকের এলাকাটা। দিনের বেলায় ব্রাত্য থাকে ওই জায়গা, সাধারণত অশৌচ হাঁড়িকুড়ি, গ্রামের নোংরা-আবর্জনা সব ডাঁই হয়ে থাকে ওখানেই। কাশীনাথ টলোমলো শরীর নিয়ে নোংরা মাড়িয়ে ছুটছে। ডগর কাঁসি ঢোল চড়বড়ি বাজনা থামিয়ে পাড়ার ছেলেগুলো রে-রে শব্দ মুখে তুলে পিছু নিয়েছে ওর। মুহূর্তে উৎসবের পাখিটা বিষণ্ণ হয়ে নেমে এল পথের ধুলোয়।

রঘুনাথ বাঁশের মাচায় গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসল। খরানীকালের মুথাঘাসের মতো নিষ্প্রভ হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। আজ এ কী করল সে? কাশীনাথকে ওভাবে বাঁশ-পেটা করা তার উচিত হয়নি। একথা নিশ্চয়ই কেউ না কেউ সুফল ওঝার কানে তুলবে। গ্রামের বাতাস গুজবের জীবাণুর ধারক এবং বাহক। কমলা শুনলে কী ভাববে তাকে নিয়ে?

রঘুনাথের ভেতরের ঘুমন্ত অসুরটা এভাবেই মাঝেমাঝে জেগে ওঠে, তাকে তখন থামানো যায় না, সংযমের বেড়ায় আটকে রাখা অসম্ভব। এই বুনো রাগ আর জেদ তার সর্বনাশ না করে ছাড়বে না।

কাশীনাথের সাইকেলটার দিকে নজর গেল রঘুনাথের। কোনো সহানুভূতি নয় রাগ এসে বাঘহাতা ঘাসের মতো দখল নিল মনের জমি। রঘুনাথ গা ঝাড়া দিয়ে এগিয়ে গেল সাইকেলটার কাছে। কাশীনাথ তাকে জানে মারতে চেয়েছিল বাঁধের ধারে। অন্ধ একগুঁয়ে রাগ রঘুনাথের ভেতরটা ফোপরা করে দিচ্ছে। ভাঙা, চিড় খাওয়া সম্পর্ক বেলের আঠায় জোড়ে না। তাকে জোড়া লাগানোর কথা ভাবাও ভুল।

রঘুনাথ এগিয়ে গিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে বাঁধের দিকে চলে গেল। এমন পাপী মানুষের কোনো জিনিস ছুঁয়ে থাকাও পাপ। রঘুনাথ হাত উঁচিয়ে সেই লম্বা কালো ছেলেটাকে ডাকল।

ছেলেটা তার সামনে আসতেই রঘুনাথ তার মত বদলে বলল, যা এটা নিয়ে গিয়ে শেরপুরের ভেতরটায় রেখে আয়। এই জিনিস মার বেদীর সমুখে থাকুক এ আমি চাইনে।

ছেলেটা সাইকেল ঠেলতে-ঠেলতে চলে যাচ্ছে শেরপুরের দিকে।

এখন চতুর্দিকে ঢ্যাঁড়শ ফুলের চেয়েও নরম রোদ উঠেছে। বৃষ্টি ধোওয়া রোদের আভিজাত্যই আলাদা। এই রোদ মানুষের মন খারাপ সারিয়ে দেয়। আর কিছুক্ষণ পরেই পুজোয় বসবে চুনারাম। এ পাড়ায় ব্রাহ্মণ আনে না বাইরে থেকে। আনার ইচ্ছে থাকলেও ব্রাহ্মণরাই আসতে চায় না। সংস্কারের বেড়াটা তখন কাঁটার ঝোপের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়ায় উভয়ের মাঝখানে। তাই এ পাড়ার কেউ বহুযুগ ধরে বামুনের দ্বারস্থ হয় না। তারা নিজেরাই নিজের হিত-কামনায় পুরোহিত।

দূর থেকে রঘুনাথ দেখল বৃদ্ধ চুনারাম খালি গায়ে তার সোডায় কাঁচা ধুতিটা পরে হেঁটে আসছে। তার হাতে একটা ভেড়ার লোমের আসন, সদ্যস্নান সারায় তার পাকা চুলগুলো চকচক করছে রোদ-হাওয়ায়। পুরোহিত বেশে চুনারামকে মানাচ্ছে মন্দ নয়। আজ যে পরব, আজ যে শ্রীশ্রী মনসা মায়ের পুজো একথা শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও বলে দিচ্ছে বারবার।

দুধের যেমন মাখন, ফুলের যেমন সুবাস, তেমনি মনসা পুজোয় ঝাঁপান না হলে মানায় না। ঝাঁপান নিয়ে সুফল ওঝার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ। ভিকনাথ তার পেছন-পেছন ঘুরছে সকাল থেকে। শুধু আজ নয়, বেশ কয়েক মাস হল তার মাথায় নেশা চেপেছে–তাকে মন্ত্রবিদ্যা শিখতে হবেই হবে।

ভিকনাথ তার সঙ্গ নেওয়ায় সুফল ওঝার লাভ ছাড়া লোকসান হয়নি। ভারি থলিটা এখন তাকে আর বয়ে বেড়াতে হয় না। ভিকনাথ বড়ো অনুগত। সুফল ওঝার হাত থেকে থলিটা কেড়ে সে নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেয়। ওস্তাদের মন না পেলে মন্ত্র পাবে না সে।

সুফল ওঝা ভিকনাথকে বলেছে, মন্ত্র তো শুধু মুখের বুলি। সেই বুলিতে শক্তি আর ভক্তি মিশালে তবে গিয়ে মন্ত্র হয়। শক্তি আমি দেব। শুধু ভক্তিটা তোর ভেতর থেকে তৈরি হবে। আর তা যদি না হয় আমি তোর গায়ে মন্ত্র খোদাই করে দিলেও কোনো লাভ হবে না। মনসা মায়ের পাঁচালি হয়ে যাবে তা।

কথাটা শোনার পরে বিমর্ষ হয়ে গিয়েছে ভিকনাথ। তার মন্ত্র শেখার একমাত্র উদ্দেশ্য হল ঝারিকে টাইট দেওয়া। বউটাকে উচিত শিক্ষা না দিলে সে যে ডানা মেলে প্রজাপতির মতো উড়ছে। লুলারামের সঙ্গে তার ঢলাঢলি এখন বড় চোখে লাগছে ভিকনাথের। পাড়ার লোকে দোষ দিচ্ছে তাকে। অনেকে আবার মুখের উপর বলছে, বউ সামলাতে পারো না তো বিয়ে করেছিলে কেনে? অমন বেবুশ্যে বউ থাকার চাইতে না থাকাই ভালো।

কথাগুলো কানে গেলে ঝিমিয়ে যায় ভিকনাথ। সে তখন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কথাগুলো সাপের মতো ছোবল মারে বুকে। দশ লোকে যা বলে তা মিছে কথা নয়। এক মুখকে চাপা দিলেও দশটা মুখ তো চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। কলঙ্ক আর কুৎসা বর্ষায় বুড়িগাঙের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়। ভিকনাথ মনে মনে ভেবেছে–অগ্নিবাণ মেরে সে শেষ করে দেবে লুলারামকে। ওর পুরো সংসার ছারখার হয়ে যাবে। ওর বউ পাগল হয়ে উদোম শরীরে ঘুরবে। ওর মেয়েদুটো দেবগ্রামে গিয়ে শরীর বেচে খাবে। ওর বুড়া বাপটার কুষ্ঠ রোগে পাপের পোকা কিলবিলিয়ে নড়বে।

সুফল ওঝাকে সব বলেছে ভিকনাথ। সব শুনে গম্ভীর হয়ে গিয়েছে সুফল ওঝা। ভিকনাথ তার পা-দুটো আঁকড়ে ধরে বলেছে, ওস্তাদ, তুমার এই পা দুটা আমার ভরসা। মনে আমি কিছু লুকিয়ে রাখতে পারি নে। আমার মন পাকাটির চেয়েও পলকা। চাপ দিলে পুট-পুট করে ভেঙে যায়। ও হারামীটাকে তুমি জানে মেরে দাও বাণ মেরে। আমি সারাজীবন তুমার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। ওর জন্য আমি রাতে ভালো ঘুমাতে পারি না। ওই হারামীর ছা-আমার সোন্দর বউটাকে ছিনিয়ে নিল।

–সব হবে, শান্ত হও। সুফল ওঝা বিড়ি ধরিয়ে চৈতন্যবকের মতো ঘাড় নাড়ে। ভিকনাথ তবু শান্ত হয় না, মেনিমুখো বেড়ালের মতো তাকায়, তুমি আমারে শান্ত হতে বলচো কিন্তুক আমি কী করে শান্ত হই বলো তো! আমার মাথায় বোলতা কেমড়ে দিয়েছে। তার যন্তনায় আমি জ্বলে মরচি। লুলারাম পয়সা করে আমার সনসারটা ভেঙ্গে দিলো। ঝারি এখন আমার কাছে শুতে চায় না। ওর এখন বড়োলোক হবার মন হয়েছে। তাই বুকে কিল মেরে বোবা হয়ে পড়ে আচি। চোকে সর্ষের ফুল দেখচি।

অত ভাবিস নে। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভিকনাথের ঘাড়ের উপর হাত রাখল সুফল ওঝা, আমি তো আছি, আমি তো মরে যাইনি। তোকে এট্টা কাজ করতে হবে। গুয়ার ব্যাটাটাকে এট্টু টাইট দিতে পারবি? ও কমলার পেছনে লেগেছে। মেয়েটাকে এট্টু বাইরে বেরতে দেয় না। সব সময় চামটুলির মতো জড়িয়ে আচে।

-কী করতে হবে বলো? খুশি না হলেও ভিকনাথ মন রাখার জন্য বলল, ঠিক আছে, কাজটা কি বুঝিয়ে বলো। যদি আমার দ্বারা হয় তাহলে ঠিক করে দেব।

সুফল ওঝা গা ঝাড়া দিয়ে বলল, কাজ সামান্যই। মেরে ওর পা দুটো উল্টে দিতে হবে। পারবি?

চোখ-মুখ শুকিয়ে ভিকনাথ বলল, ওর গায়ে হাত তুলতে আমি পারবানি। ওর বাপ গুয়া আমাকে অক্ত দিয়েছিল। ধাওড়া পাড়ার কেউ তখন পাশে দাঁড়ায়নি।

ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস কর। সুফল ওঝা মাথা চুলকে কপট হাসল, তবে লুলারাম ওই ঝাড়েরই বাঁশ। লুলারাম তোর সব্বেনাশ করেছে। তুই তার সব্বোনাশ করতে চাস। গুয়ার ব্যাটাটা কমলার মন বিষিয়ে দিয়েছে। আমিও ওর মন ছ্যারাবেরা করে দেব। সহজে ছাড়ব না আমি। এমন বাণ মারব যে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরবে।

ভয়ে হিম হয়ে গেল ভিকনাথের শরীর, কথা জড়িয়ে গেল তার, না, মানে, ইয়ে…

-থাক আর তোকে তোতলাতে হবে না। আমি তোর মনের ভাব বুঝে গিয়েচি। সুফল ওঝা কঠোর চোখে তাকাল, কত ধানে কত চাল হয় সে হিসেব আমার সব জানা আছে। যার গাল টিপলে এখনও দুধের ঘেরান যায়নি, সে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। মুখের হাজার দোষ, বুঝলি কি না?

ভিকনাথ অনুগত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল, সে আমি বুঝেচি ওস্তাদ। তবে তুমার পায়ে ধরি–তুমি আমার কেসটা ভুলে যেও না। ঝারিকে ঘরে ফিরিয়ে দাও। আমার ভাঙা সনসার জুড়ে দাও। দোহাই তুমার।

ভিকনাথের আকুতি দীর্ঘশ্বাস বাতাসকে বেদনাবিধুর করে তোলে, তার মজাটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সুফল ওঝা।

 ০৪. ঝাঁপান উৎসব

১৬.

ঝাঁপান উৎসবে তিনদিন আগে সুফল ওঝা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, এবছর মনে হচ্ছে মায়ের কাছে খালি ঝাঁপি নিয়ে যেতে হবে। ফি-বছর এসময় দু-চারটে জাতসাপ আমার ঝাঁপিতে থাকেই থাকে। এবছর মনে হচ্ছে মায়ের কাছে খালি হাতে যেতে হবে।

ভিকনাথ তার মন রাখার জন্য বলেছিল, অত চিন্তা করো না। মায়ের বাহন মা-ই জুটিয়ে নেবে। তবে যদি শরীল সাথ দেয় তাহলে চলো বিলের ধার দিয়ে ঘুরে আসি। ওদিকের ঝোপ ঝাড়ে তেনারা ঘোরাফেরা করে লোকমুখে খবর পেয়েছি। তা ছাড়া ফি-বছর ওখানেই তো তুমি মনসা পুজার ধরা সাপগুলো ছেড়ে আসো।

-তা ঠিক, তবে তাদের কি এখন পাব?

-পাই না পাই চলো না ঘুরে আসি। ভিকনাথ বোঝাল, জায়গাটা নির্জন। বিলের ঠাণ্ডা বাতাসে সাপগুলা আরাম করে থাকে ওখানে।

কথাটা মনে ধরেছিল সুফলের, ভিকনাথকে সে মুখের উপর মানা করতে পারেনি। মানুষটা বোকা হলেও সরলতা হারিয়ে ফেলেনি। এই সরলতাই ভিকনাথের সম্পদ। ওর সরল চাহনিতে ওর বড়ো বড়ো চোখদুটো কাঠটগর ফুলের মতো ফুটে থাকে সব সময়। এই সারল্য ওর খাটুনিভরা চেহারাতে ধরা পড়ে।

পণ্ডিতবিলের পাড় ধরে পায়ে চলার পথ। ভিকনাথ তার লম্বা রোগা শরীর দুলিয়ে বাঁক কাঁধে পথ হাঁটে। তাকে পেশাদার বেদের মতো দেখায়। বাঁকের দুদিকে দোল খায় শূন্য সাপঝাঁপি, যা যত্ন করে গোবর মাটি দিয়ে লেপা। ভিকনাথের পরনে ময়লা ধুতি, খালি গা। মাথায় ফেট্টি দিয়ে বাঁধা লাল গামছা। কিছু দূর এসে মোচ নাচিয়ে সে সুফল ওঝাকে শুধোল, ওস্তাদ, আমার মন বলচে আজ খালি হাতে ফিরতে হবে না। এদিকটায় কুনো ওঝা-গুণিনের পা পড়েনি।

খাড়া পথ ঠেঙিয়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে এল ভিকনাথ। কাঁধের বাঁকটা নামিয়ে ঘাড় মুছে নিয়ে সে পিছন ঘুরে তাকাল। সুফল ওঝা গামছা পেতে পা থেবড়ে বসেছে মাটিতে। এক মুঠো মাটি খামচে তুলে নিয়ে সে গন্ধ শুঁকে দেখছে বারবার। বিড়বিড়ান মন্ত্রের ধ্বনি কানে আসছিল ভিকনাথের।

এই ফাঁকে শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে দাঁড়িয়েছে সুফল ওঝা। ছোট করে কাটা গোঁফ নাচিয়ে নিঃশব্দে সে ঝোপ-ঝাড়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাল। ভিকনাথের কথাটাই ঠিক। এখানে কারোর পায়ের ছাপ পড়েনি। যদি তেনারা থাকে এখানে নিশ্চয়ই শান্তিতে আছে। গত বছর মনসা পুজোর পরে এখানেই চারটে খরিস সাপ ছেড়ে গিয়েছিল সুফল ওঝা। গেল সালে ঝাঁপান পার্টি মা মনসার গুণগান কম করেনি। সুফল ওঝাও পিছিয়ে ছিল না এসব ব্যাপারে। সে হেলে-দুলে গাইছিল, ডালা খুললে কালো মালা নাচেরে, নাচেরে/ও মালা কেমড়ে দিলে কেউ কি তখুন বাঁচে রে? বাঁচে রে?/ওরে অষ্টোনাগ ষোলবোড়া বত্রিশ চিতের বাহার রে/মা মনসার ভোগে লাগে, কাঁচা দুধ, পোষা হাঁসের মানসো রে। গানের তালে তালে মাথা হেলায় দশ জন মানুষ। ওরা সব দোহারকি। ওরা না হলে ঝাঁপান গান জমবে না। গানের তালে তালে চলতে থাকে সাপের খেলা। সুফল ওঝা হাঁটু নাচায়, কখনও গামছা বাঁধা হাত এগিয়ে দেয় সাপের ছোবলের এলাকায়। একাজে ঝুঁকি অনেক, চোট খেলে বাঁচার আশা কম। তখন কী সাপে কামড়াইলো বাছারে আমার মা বলিয়া ডাকিতে দিল না আর…! বলে কান্নাকাটি করলেও সে আর ফিরবে না। একবার দংশালে বিষ চারিয়ে যাবে রক্তে, মুখে গাঁজরা উঠে নীল হয়ে যাবে শরীর। মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে শ্মশানঘাটে।

খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে সুফল ওঝা মাটি ঝুরো ঝুরো করে উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ার দিকে। মাটি যে দিকে উড়ে যাবে, সেদিকেই তাদের দেখা পাওয়া যাবে। ঘাস মাটির গন্ধ শুঁকে পথ চিনে কটা মানুষ যেতে পারে। শুধুমাত্র ময়ূরভঞ্জের জানগুরু এ কাজটা করতে পারে। সব বিদ্যা দিলেও গুরুমারা বিদ্যা কেউ দিতে চায় না। সুফল ওঝা কাকুতি-মিনতি করেও জানগুরুর কাছ থেকে এটা আদায় করতে সক্ষম হল না। তবে জানগুরু তাকে অভয় দিয়ে বলেছিল, এক পাতে কি সব খাবি? পাত বদলা। তারপর ভাবব তুই হজমাতে পারবি কিনা। শোন বেটা, সবার পেটে কি ঘি সহ্য হয় রে?

সুফল ওঝা মুখ ঝুঁকিয়ে ফিরে এসেছিল দেশ-গাঁয়ে। মনে তার ইচ্ছে ছিল, সে আর একবার ময়ুরভঞ্জ যাবে। ওটা তার কাছে দেবস্থান। গুরুস্থান। ময়ূরভঞ্জের জনগুরু না থাকলে তাকে আজ হয়ত মাঠে-ঘাটে মুনিষের কাজ করে বেড়াতে হত। গাঁয়ে-গঞ্জে এত সম্মান কি তখন তার থাকত? আজ ঝাড়ফুঁক করে দুটো কাঁচা পয়সার মুখ দেখে সে। মাটির বাড়িখানা তার সবাই টেরিয়ে-টেরিয়ে দেখে। খড়ের মোটা ছাউনি ঘরের গরম ভাবটাকে পুরো শুষে নিয়েছে। মাটির ঘর হলেও তা দোতলা। কড়ি-বর্গা, জানলা-দরজা সব নিম আর কাঁঠালকাঠের। বাড়ির সামনের শিউলি গাছটায় সমবচ্ছর ফুল ধরে, বিশেষ করে সন্ধের পর থেকে কেউ যেন দামি আরশিশির ছিপি খুলে দেয়, হুড়মুড়িয়ে সুগন্ধ নাকে এসে আরামের সুড়সুড়ি দিয়ে পালায়। বেড়ার ধারে আকন্দগাছের সারি, ফলার মতো বড়ো বড়ো পাতাগুলোয় চুন বোলানো, মন ভরে যায়। সুফল ওঝার সব চাইতে ভালো লাগে ঘরের পেছনের কদবেল গাছটা। ওর তেল চকচকে ক্ষুদে-ক্ষুদে পাতাগুলো মেয়েদের কপালের কালচে-সবুজ টিপের মতো, সকালের রোদ বাড়লে পাতাগুলো যুবতী মেয়ের ভরাট নিটোল মুখের মতো চমকায়। তখন হাঁ হয়ে যায় সুফল ওঝার চোখ, সদ্য বেরনো বাঁশকোড়ার মতো হকচকিয়ে ওঠে চোখ। উঠোনের এক পাশে গোরু বাঁধা, পাতনাগুলো সুখের খনি, গোরুগুলো ঘাস-খড় কুচনো চিবাতে চিবাতে অনুগত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ে। সকালে ওই নীরিহ গোরুগুলো বালতি ভরা দুধ দেয়। আউসের মুড়ি দিয়ে জামবাটিতে দুধ সহযোগে খেতে ভীষণ ভালো লাগে সুফল ওঝার।

এত সুখ তার কপালে লেখা সে কি আগে জানত? এই মন্ত্রই তাকে সব জানিয়েছে, চিনিয়েছে। আর দশটা মানুষের থেকে আলাদা করে দিয়েছে তাকে। দশ গাঁয়ের মানুষ তাকে এখন এক ডাকে চেনে। এই সম্মান সে হারাতে চায় না কোনোমতে। হাইস্কুলের ছোকরা মাস্টার তাকে হেনস্থা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ওর মতন দশটা মানুষ গাঁয়ে থাকলে না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে তাকে। সুফল ওঝা তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। পথের কাঁটাকে পথেই খতম করে দিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু ভাগ্যের জোরে মাস্টার বেঁচে যায়। সেদিন যদি হাতকাটা দুলু গিয়ে না পৌঁছাত তাহলে সাঁতার না জানা মাস্টার বর্ষার বিলে বিষ দেওয়া মাছের মতো ভেসে উঠত। কাক-পক্ষীতেও টের পেত না-এর পেছনে কার হাত আছে।

আজ ডাঙাবনের ঝোপের মধ্যে বসে সুফল ওঝা কপাল কুঁচকে রোদের দিকে তাকাল। রোদ বাড়লে তেজ কমে আসে সাপের। ওদের ঘরসংসার তখন গরমগুহা। আইঢাই করে সংবেদী শরীর। উইটিপি থেকে বেরিয়ে এসে ওরা জলের ধারে ঘুরে বেড়ায়। ব্যাঙ শামুক মাছ যা পায় খায়। না খেলে পেট বাঁচবে কি করে? যাই দেবে অঙ্গে, তাই যাবে সঙ্গে।

বিল ধারের সাপগুলো ফণাধারী, ওদের চোটপাট মন্দ নয়, খর চোখ, তড়িৎ গতি, হিংস্র ভাবনা। ঠিক খেলিয়ে না ধরলে সমূহ বিপদ। সাপের চোখে চোখ রেখে সুফল ওঝার বেঁচে থাকা। চোখ সরে গেলে বিপদ। ঝাঁ-করে নেমে আসবে খাঁড়ার কোপের চেয়েও হিংস্র ছোবল। তখন মৃত্যু অবধারিত।

ঝোপঝাড় চিরে সুফল ওঝা এগিয়ে গেল উইটিপিগুলোর দিকে। বর্ষায় অমন নিরাপদ আশ্রয় আর কী হতে পারে? ওখানেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে পারে খরিস সাপের বংশ।

সুফল ওঝার নির্দেশে বাঁক নামিয়ে উইটিপি খুঁড়তে লেগে গিয়েছিল ভিকনাথ। ওর কালো শরীর চুঁইয়ে ঘাম আর মাটির মিশ্রণ নামছিল সরসরিয়ে, তবু ওর কোনো ক্লান্তি নেই। একমাত্র সুফল ওঝাই পারবে মন্ত্রের সাহায্যে ঝারিকে সংসারে ফিরিয়ে দিতে এটা তার বদ্ধমূল ধারণা। সুফল ওঝা সব পারে শুধু মরা মানুষ জ্যান্ত করতে পারে না। মাটি খোঁড়ার ঝোঁকে মাথায় বাঁধা লাল গামছা খসে পড়ে মাটিতে। গামছাটা তুলে নিয়ে ভিকনাথ রগড়ে রগড়ে মুখ মুছল, তারপর শূন্য দৃষ্টিতে উইটিপির দিকে তাকাল, ওস্তাদ, আর কত দূর খুঁড়তে হবে গো? হাতের ডানা দুটো যে ব্যথা করছে।

-কারোর ডানা ভাঙতে গেলে নিজের ডানা তো এট্টু ব্যথা করেই। সুফল ওঝা ছাঁটা গোফ নাচিয়ে হাসল, সাপধরার কাজ ভাত রাঁধার মতো সহজ কাজ নয়। এ কাজে কখন থামতে হবে তা আগাম কেউ জানে না।

উইটিপি খুঁড়ে পাকা খরিস বের করে আনতে গায়ের গেঞ্জি ভিজে সপসপে হয়ে গেল সুফল ওঝার। সাপটার ফোঁসফোঁসানীতে ভয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে ভিকনাথ। চোখের সামনে বিষদাঁত ভাঙা নয়, এমন সাপ সে কি এর আগে দেখেছে? মনে করতে পারল না ভিকনাথ। ভয়ে ঘাম ফুটে বেরল তার শরীরে। লাল গামছায় মুখ মুছে সে সুফল ওঝার চোখের দিকে তাকাল, ওস্তাদ, এটাকে কুথায় রাখবো, ঝোলায় না ঝাঁপিতে।

সুফল ওঝার ঠোঁটে গর্বের চিলতে হাসি, বিষদাঁত না ভাঙা অব্দি ও ঝোলায় থাকবে। যতক্ষণ না বিষদাঁত ভাঙচি, ততক্ষণ ওর জেদ-গোঁ কোনোটাই কমবে নি। কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল সুফল ওঝা, অতীত দিনে হারিয়ে গিয়ে সে আবার উড়ুলমাছের মতো ভেসে উঠল, আজ আমার কেন জানি না বাসুর কথা মনে পড়ছে।

কুন বাসুগো ওস্তাদ?

হরিনাথপুরের বাসুদেব। যে বাসুদেব বেলডাঙার রেল-ইস্টিশানে কাজ করত। ওই যে গাড়ি আসার সময় কিংবা টিকিট দেওয়ার সময় হলে ঘন্টা বাজাত–সেই বাসুদেব। বছর তিনেক আগের ঘটনা। সাপের বিষ বের করতে গিয়ে আঙুলটা সাপের মুখের ভেতর ঢুকে যায়। পাকা সাপটা কামড়ে দেয় ওকে। একেবারে বুড়ো আঙুলে। কত চেষ্টা করলাম। দশ গাঁয়ের গুণিন এলো। তবু মানুষটা বাঁচল নি। ভ্যানে চাপিয়ে বাসুরে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হল তখন ওর শরীরে জান নেই। প্রাণ পাখি উড়ে গেছে বহুক্ষণ। সুফলের অশ্রুপ্লাবিত মুখ। বাসুদেবের জন্য তার অন্তরটা কেঁদে উঠল অসময়ে। মানুষটার টাকা-পয়সা জমিজমার অভাব ছিল না। বেলডাঙায় তার নামে রেল কোয়ার্টার ছিল। তবু ফি-মাসে ঘর আসত দেখভালের জন্য।

বাসুদেব বৌ বাচ্চা নিয়ে কোয়ার্টারে থাকত। ওর বউয়ের পাকা ঘরে থাকার ভীষণ সখ। সেই চাকুরিয়া বাসুদেবের একটাই নেশা-মনসা পুজোয় সাপের খেলা দেখানো।

ফি-বছর আসত সে। সে-বছর এসে সে আর ফিরে গেল না। দৈবের লিখন কে খাবে?

ডাঙা ঝোপের সাপটার বিষ দাঁত ভাঙল না সুফল ওঝা। একা থাকলে এসব কাজ করা ঝক্কির। আনকোরা লোক দিয়ে এসব ঝুঁকির কাজ হয় না। বিপদ-আপদ ঘটে গেলে সে ঠেকা দিতে অক্ষম। লম্বা কাপড়ের থলিতে সাপটা ঢুকিয়ে নিজের কাছে রাখল সে। তখনো ফোঁস-ফোঁসানী থামেনি সাপটার। এ অবস্থায় ভিকনাথের হাতে সাপটা তুলে দেওয়া উচিত হবে না। হিতে বিপরীত হয়ে গেলে বিপদ।

মান গেল জান গেল তুর কাছে মা বিনতি/সাত সাগরের জল দিয়েছি মান রাখিস এই মিনতি। অশখলায় ডান পা নড়িয়ে হলদে খরিসের খেলা দেখাচ্ছিল সুফল ওঝা, ওর ধূর্ত চোখে যেন সাপের চোখটায় বসানো। একটু অন্যমনস্ক হলেই নিমেষে বিষ ঢেলে দেবে ফণা তোলা সাপ। ভিড় বাড়ছিল রোদ বাড়ার সাথে সাথে। আজ মনসা পুজোয় নতুন জামা আর ধুতি পরেছে সুফল ওঝা। ওর কপালে সিঁদুরের লম্বা তিলক আঁকা। সাপুড়ে নয়, কাঁপালিকদের মতো দেখাচ্ছিল ওকে।

মনসা পুজোয় জ্যাবজ্যাবে করে তেল মেখেছে সুফল ওঝা। নারকেল তেলমাখা তার ধাতে সয় না। জ্ঞানপড়ার পর থেকেই সরষের তেল মাথায় মাখছে সুফল ওঝা। সরষের তেল নাকি মাথা ঠাণ্ডা রাখে, ঘুম ভালো হয়। যদিও কাল সারা রাত ঘুমাতে পারে নি সে। কমলার ঘটনাটা তাকে বেশ দুঃখ দিয়েছে। মেয়েটা মুখের উপর অমনভাবে বলে দেবে স্বপ্নেও সে আশা করেনি। কমলা দীপ্তকঠে বলল, বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে রঘুকেই করব। রঘু ছাড়া আমি আর কাউকে আমার স্বামী হিসাবে ভাবতে পারি না।

কমলা অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছে না হলে অমন কথা সে বলে কিভাবে? তার লঘু-গুরু জ্ঞান নেই। সে প্রায় উন্মাদ।

সুফল ওঝা হতবাক দৃষ্টি মেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল অপলক। কমলা জ্ঞান দেবার ঢঙে বলেছিল, তুমি তোমার কাজ নিয়ে থাকতে পার বাবা। আমার জন্য ভেবো না, আমি পালাবার মেয়ে নই। যদি পালাবার ইচ্ছে থাকত তাহলে একবছর আগেই পালিয়ে যেতাম।

-কমলা তুই চুপ কর। চমকে উঠেছিল সুফল ওঝা, যত বড়ো মুখ নয়, তত বড়ো কথা তুই বলিস কি করে?

ঝাঁপান গানের সুর যতবার শোনা যায় ততবার যেন পুরনো হয় না। ভিড়টা জমে উঠেছে। সাপখেলাকে উদ্দেশ্য করে। ভিকনাথ রঘুনাথকে দেখতে পেয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, শোন রঘু, তুর সাথে কথা আচে। রঘুনাথ পাকুড়গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল, কী কথা?

চারপাশে সতর্ক চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভিকনাথ বলল, সামনে তুর বেপদ নাচচে। সাবধানে থাকবি। কমলার সঙ্গে দেখা-শোনা কম করবি।

-কেনে কি হয়েচে?

–সে অনেক কথা, পরে বলব। ভিকনাথ চোরের মতো ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

.

প্রীতি ম্যাচে এবার মানিকডিহি খেলতে যাবে দেবগ্রামে। সূর্যাক্ষ সন্ধেবেলায় এসে হড়বড়িয়ে বলে গেল, রঘু, তোকে ব্যাকে খেলতে হবে, তৈরি থাকিস। রঘুনাথ চোখ কপালে তুলে বলল, আমার দ্বারা খেলাফেলা হবে নি বলে দিলাম। তুই অন্য কাউকে দেখ সূর্য। বাবা ঘরে নাই। আমার কাল থেকে মাঠে আখ কাটতে যাবার কথা।

চুনারাম এই বয়সেও মাঠে যায় জনখাটতে। সে না খাটলে সংসার অচল। দুর্গা মাঠে জনখাটতে যাবে বলে অস্থির। চুনাম তাকে যেতে দেয় না। গলায় জোর খাটিয়ে বলে, তুমি ঘরের বউ, ঘরে থাকবা। আরে আমরা কি মরে গেচি, এ্যাঁ?

রঘুনাথ ঠিক করেছে সেও মুনিষখাটতে মাঠে যাবে। ভিকনাথ তাকে সাথে করে নিয়ে যাবে। ধার করে আখঝোড়ার হেঁসো কিনেছে সে। জনখেটে শোধ দেবে হেঁসোর পয়সা।

রঘুনাথের এই সিদ্ধান্তে চুনারাম খুশি হলেও খুশি হয়নি দুর্গামণি। এই বয়স থেকে ছেলেটা খাটতে যাবে–এটা মন থেকে কিছুতেই মানতে পারছে না সে। গুয়ারাম ঘরে থাকলে রঘুনাথ ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে খেত, এমনকী চুনারামকেও এই বয়সে জনখাটতে মাঠে পাঠাত না সে।

সূর্যাক্ষ হতাশ হয়ে বলল, তুই যে খাটতে যাবি শেষ পর্যন্ত পারবি তো? তোকে দেখে তো মনে হয় ফুলবাবু।

সূর্যাক্ষ রঘুনাথের হাত চেপে ধরে বলল, তোকে যে করেই হোক কালকের দিনটা উদ্ধার করে দিতেই হবে। তুই না গেলে আমাদের গ্রাম গো-হারা হেরে যাবে। তুই কি চাস আমরা হেরে যাই?

রঘুনাথ ইতস্তত করে বলল, ঠিক আছে আমি যাবো। কখুন যেতে হবে বল? তবে এটাই শেষ। গরিব মানুষের পেটের খেলাটাই আসল খেলা, আর সব খেলা ছেলেখেলা।

স্রিয়মান হেসে সূর্যাক্ষ বলল, তোর কথাই মেনে নিলাম। এবারটা চ। আর তোকে যাওয়ার জন্য বলব না। কাল বারোটার বাসে আমরা যাব। তুই বারোটার সময় বাঁধের উপর থাকিস। আমি তোকে সাইকেলে করে স্ট্যান্ড অবধি নিয়ে যাব। ফুটবল খেলার শখ ছোট থেকেই রঘুনাথের। গুয়ারাম মেলা থেকে তাকে একটা লাল রঙের রবারের বল কিনে দিয়েছিল। বলটা এত ছোট যে পা দিয়ে মারতে গেলে লাগত। এর চেয়ে বাতাবীলেবু পেটানো ঢের ভালো। পাকুড়তলায় মাঝেমধ্যে বাতাবীলেবু ম্যাচ হত। কাঁচা বাতাবীলেবু হাওয়ায় পড়ে গেলে গোরু-ছাগলেও খায় না। সেই বাতাবীলেবু নিয়ে বাঁধের উপর পেটা-পেটি খেলা। এই খেলা কি বল খেলার কোনো নিয়ম মানে? তবু রঘুনাথের মজা লাগত খেলতে।

মানিকডিহির মাঠে প্রথম সে ম্যাচ খেলতে নামে। সেদিনও সূর্যাক্ষ তাকে জোর করে নামায়। পরে রঘুনাথ ভেবেছে-কাজটা তার উচিত হয়নি। গায়ে শুধু জোর থাকলে খেলা হয় না। খেলার কায়দা-কানুন জানা দরকার। গোয়াড় গোবিন্দরা বরবাদ করে দেয় খেলার মাধুর্য। রঘুনাথ এবার মাঠে নামলে নিজেকে সামলে নিয়ে নামবে যাতে লোক না হাসে।

সারারাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারল না রঘুনাথ, চোখ বুজলেই খেলার শব্দ, ফুটবলের ধুপধাপ আওয়াজ, দর্শকদের চিৎকার চেঁচামেচি তার কানে উড়ে এল। তার উশখুসানি দেখে দুর্গামণি বিচলিত হয়ে বলল, রাত বাড়ছে, ইবার শুয়ে পড় বাপ। কাল আবার তুকে মুনিষ খাটতে যেতে হবে।

মুনিষ খাটতে যাওয়া নয় তো যুদ্ধ করতে যাওয়া। ছেলের জন্য ভিজে ভাত, পেঁয়াজ আর আলুচচ্চড়ি রেখে দিয়েছে দুর্গামণি। ভরপেট ছেলেকে না খাইয়ে পাঠালে ভিমরি লেগে পড়ে যেতে পারে। মেহনতের কাজে খাদ্য-খাবারই আসল কথা। এই শিক্ষাটা দুর্গামণি তার বাপ-মার কাছ থেকে পেয়েছে। এখন বদলে যাচ্ছে সময় তবু খিদের স্বভাব পাল্টায়নি। এই পেট হল মহাশত্রু। একে সামলে রাখতে পারলে দুনিয়ার সব কাজ মোটামুটি চলে যায়।

পাশ ফিরে শুয়ে রঘুনাথ অন্ধকারে মায়ের দিকে তাকাল, কাল আমি খাটতে যেতে পারবো নি মা। কাল আমার বল খেলা আচে দেবগ্রাম। সূর্য আমায় সেখানে নিয়ে যাবে।

-সূর্য হল গিয়ে বড়ো লোকের ব্যাটা। তার সাথে কি তুর পাল্লা দেওয়া উচিত হবে? দুর্গামণির কণ্ঠস্বরে ভয় আর বিস্ময় ঘোঁট পাকিয়ে গেল।

রঘুনাথ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল। সূর্য আমার বন্ধু। ওর কথা রাখব নি তো কার কথা রাখব?

–কতা রাখতে গিয়ে তিনটে মানুষের পেটের কতা ভুলে যাবি তা হয় না। দুর্গামণি অন্ধকার চিরে তীক্ষ্ম চোখে তাকাল, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। বল খেলে কি হবে? বল কি তুকে ভাত দিবে?

দুর্গামণির কথাগুলো মন থেকে মেনে নিতে পারল না রঘুনাথ, অথচ মায়ের মুখের উপর তার প্রতিবাদ করা সাজে না। তাই সে গলার স্বর মোলায়েম করে বলল, একদিন কাজে না গেলে যদি হাঁড়ি ঠনঠনায় তাহলে অমন সনসারে হাঁড়ি আঁখায় চড়িয়ে লাভ কি?

-গরিবের কিসে লাভ কিসে ক্ষতি তা যদি বুঝতে পারতাম বাপ? বড়ো জটিল হিসাব। এত বছর ধরে হাঁড়ি ঠেলে মাথা সব গুলিয়ে যায়। দুর্গামণির বুক ছুঁয়ে আক্ষেপের নিঃশ্বাস গড়িয়ে পড়ল।

অভাব ধাওড়াপাড়ায় কার নেই? তবু চরম অভাবের মধ্যে মানুষগুলো শ্বাস নেয়, বুড়িগাঙের জলে ডুব দিয়ে ভাতের প্রতীক্ষায় পাড়ে উঠে আসে। ওদের কাছে যে দিনটা যায় সেদিনটা ভালো। যে দিনটা আসছে, সেইদিনটা চিন্তার।

অনেক রাতে ঘুমালেও ঠিক ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল রঘুনাথের। কুসুমআলোয় শরীরের স্ফূর্তি ভাবটা শিশির চুবানো ঘাসের চেয়েও চনমনে হয়ে ওঠে। এ সময় কমলার কথা রোজ মনে পড়ে তার। অনেকদিন কমলার সঙ্গে দেখা হয়নি তার। সুফল ওঝা জোর করে মেয়েটাকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কমলার একদম যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কাশীনাথ তাকে জোর করে দিয়ে এল মামার ঘরে। দূরত্ব অনেক সময় মনের দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়। সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতো ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে দেয়। কমলাকে দূরে পাঠিয়ে দিয়ে সুফল ওঝা বেশ সুখেই আছে। কলাবতীও চিন্তামুক্ত। কাশীনাথ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ইদানীং নিচু ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের সে দায়িত্ব নিয়ে পড়াচ্ছে। মাস গেলে যা পাবে তাতে ওর হাত খরচ চলে যাবে। তা ছাড়া মাস্টার ডাকটা শুনতে তার মন্দ লাগে না। এই সম্মান টিউশনির অর্থমূল্যের চাইতেও বেশি মূল্যবান।

বেলা বারোটায় বাস ছেড়ে গেল মিষ্টির দোকানের সামনে থেকে। অন্যদিনের তুলনায় আজ বাসে ঠাসা ভিড়। গাঁয়ের ছেলেরা দেবগ্রামে খেলতে যাচ্ছে এটা কি কম গর্বের কথা।

পাশাপাশি সিট পেয়েছে সূর্য আর রঘুনাথ। বাইরের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে ওরা। কামারী পেরিয়ে যেতেই সূর্যাক্ষ বলল, আজ তোর মনে আনন্দ নেই। কেন কি হয়েছে রে?

-না কিছু হয়নি তো! রঘুনাথ এড়িয়ে যেতে চাইলে সূর্যাক্ষ তার চোখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, কী ভাবছিস তুই?

রঘুনাথ বলল, আসার সময় কাকার সাথে দেখা হল। কত রোগা হয়ে গিয়েছে। আসলে কাকি চলে যাওয়ার পর কাকার মনের অবস্থা ঠিক নেই। সারাদিন খালি মানসিক করে বেড়াচ্চে। ঠাকুরদেবতার থানে মাথা ঠুকচে।

-তোর কাকিকে নিশ্চয় তোর কাকা ভীষণ ভালোবাসত।

রঘুনাথ ঘাড় নাড়াতেই সূর্যাক্ষ বলল, আমার মন বলছে সে যদি বেঁচে থাকে নিশ্চয়ই একদিন ফিরে আসবে।

-আমারও মন তাই বলচে।

এ সময় ঢ্যাঁড়শ গাছে ফুল আসে। ফুলগুলো ঘিয়ে রঙের ভেলভেটের মতো, ভেতরে লাল রঙের ছিটে দেওয়া। বর্ষার জল পেয়ে বাঘহাতা ঘাসগুলো কিশোরী মেয়ের শরীরের বাড়কেও হারিয়ে দিচ্ছে।

দেবগ্রাম আসতেই বাসটা ব্রেক কষে ঝাঁকুনি দিয়ে থামল। জনা কুড়ি লোক নেমে এল বাস থেকে। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল গলা চড়িয়ে। ওদের আলোচনার মধ্যে উঠে আসছিল ফুটবল। মোটা মতোন হোমড়া-চোমড়া একজন গলা উঁচিয়ে বললেন, যদি তোমরা আজ জিততে পারো তাহলে আমি খুশি হয়ে তোমাদের একটা খাসী এনে দেব। যদি না জিততে পারো তাহলে ফেরার পথে শুধু চা-সিঙ্গাড়া।

দেবগ্রামের বলখেলার মাঠ স্টেশন থেকে বেশি দূরের পথ নয়। এখান থেকে রেল গাড়ির ঝমঝম শব্দ শোনা যায়। হুইশেল ভেসে আসে বাতাস বিদীর্ণ করে। বলখেলার মাঠটা সবুজ ঘাসে গা মুড়িয়ে অলস শরীরে শুয়ে আছে। একটু পরে তার ঘুম ভাঙিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হবে। বাঁশি বেজে উঠবে রেফারির। বল ব্যাক-ভলি করে গোলে ঢুকিয়ে দেবে সেন্টার-ফরোয়ার্ড। তখন ব্যাকে যে খেলে তার কিছু করার থাকবে না।

গোলকিপার আর ব্যাকের দায়িত্ব যে প্রচুর এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে রঘুনাথ মানিকডিহির মাঠে। সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বিস্মৃত হয়নি সে। অবশ্য এর কৃতিত্ব সূর্যাক্ষর। ও পাশে না থাকলে ম্যাচটা মনে হয় হাতছাড়া হয়ে যেত।

আজ ড্রেস পরে মাঠে নামতে গিয়ে একবার মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল রঘুনাথের। এসময় আখের আলসে ছাড়িয়ে মাঠ থেকে তার ফেরার কথা। ঘর ফিরতে রোদ ঝিমিয়ে যাবে। তারপর এক সময় কালচে হয়ে যাবে বুড়িগাঙের ঘোলাজল। বুড়িগাঙে ডুব দিয়ে এলে ভাত বেড়ে দেবে মা। সঙ্গে শাক ভাজা আর পাতলা ডাল। কোনো কোনো দিন শুধু শাক ভাজা, ডাল জোটে না, কোনোদিন আবার শুধু ডাল, শাক সেঁতলাবার মতো তেলও জোটে না।

বড়ো আশ্চর্য এই জীবন।

গোলের দিকে ধেয়ে আসা বলটাতে রঘুনাথ রাগের মাথায় লাথি ছুঁড়ে দিল। বল গিয়ে পড়ল ঠিক অন্য গোল পোস্টের পেনাল্টি এলাকার মাঝখানে। বাঘের মতো ওৎ পেতে ছিল সূর্যাক্ষ। বলটা বুক দিয়ে নামিয়ে পায়ে খেলাতে খেলাতে সজোরে কিক মারল গোলের দিকে। হেড দিয়ে বলটাকে মাঠের বাইরে বের করে দিতে চেয়েছিল ব্যাকি, কিন্তু তা হল না, বল কোণ ঘেঁষে রকেট গতিতে ঢুকে গেল গোলের ভেতর। জালে জড়িয়ে গেল বল। মানিকডিহি এগিয়ে গেল এক শূন্য গোলে।

যারা খেলা দেখছিল তাদের চক্ষু চড়কগাছ। এ-ও কি সম্ভব? একজন মানুষের পায়ে কত শক্তি থাকতে পারে? এ ছেলে খেলার মধ্যে থাকলে নাম করবে। একে আটকাবে সাধ্য কার?

খেলা শেষ হতেই সূর্যাক্ষ এসে রঘুনাথকে জড়িয়ে ধরল। সেই নাদুসনুদুস ভুড়িওয়ালা লোকটা এসে বললেন, সাবাস, এর আগে আমি তোমার খেলা দেখিনি। আজ তোমার খেলা দেখে মন ভরে গেল!

ক্লাবের মেম্বার তারক তাকে উসকে দিয়ে বলল, এ ছেলের পা নয় তো একেবারে ইস্পাত দিয়ে গড়া। মানুষের পা হলে এত জোরে শট মারা সম্ভব নয়।

এসব কথা রঘুনাথের কানে ঢুকছিল না কিছুই। সে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কী এমন করেছে সে যার জন্য তাকে এত বাহাদুরী নিতে হবে। আখের আলসে ছাড়াতে না গিয়ে সে বল খেলতে এসেছে। এর বেশি সে আর কিছু ভাবতে চায় না।

দেড় ঘণ্টা সময় মাঠের মধ্যে কী ভাবে কেটে গেল কিছুই টের পায় নি সে। মোটা লোকটা এগিয়ে এসে বললেন, আমাদের গাঁয়ে এমন ছেলে আছে আগে আমি জানতাম না। তোমার কি চাই বলো?

রঘুনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। তার হয়ে কথা বলল সূর্যাক্ষ, পচাদা, ও বড়ো লাজুক ছেলে, মুখ ফুটে কিছু চাইবে না। ম্যাচ খেলতে আসবে বলে ওর আজ মুনিষ খাটতে যাওয়া হয়নি। তুমি যদি ওর একদিনের ‘রোজ’ দিয়ে দাও তাহলে ভীষণ ভালো হয়।

-সে কথা আর বলতে। এই নাও, ধরো একশ টাকা। পচার থলথলে গাল খুশিতে নড়ে উঠল, টাকা দিয়ে এ খেলার কোনো বিচার হবে না। তবে তুমি যদি বলো আমি কেসনগর স্টেডিয়ামে কথা বলব। ওখানে আমার জানাশোনা আছে। আজ যা দেখালে তার সিকিভাগ যদি খেলতে পারো তাহলে স্টেডিয়ামের মাঠ তোমার দখলে চলে আসবে।

কিছু না বুঝে রঘুনাথ সূর্যাক্ষের দিকে সাহায্যের জন্য তাকাল। সূর্যাক্ষ বলল, রঘু গাঁ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। ঘরে ওর মা একা আছে। ওর বাবা মুনিষ খাটতে গিয়েছে রাঢ় দেশে। দাদুটা বুড়ো।

সামান্য হলেও আবেগে ঘা খেলেন নাদুসনুদুস চেহারার লোকটা। কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে সূর্যাক্ষ বলল, রাগ করো না পচাদা, যা সত্যি আমি তাই বললাম। আমাদের দেশের খেলোয়াড়রা সুযোগ পায় না। ওরা যদি সুযোগ পেত তাহলে দুনিয়াকে দেখিয়ে ছেড়ে দিত।

-তা ঠিক। তবে আমাদেরও দোষ আছে। পচার আবেগী কণ্ঠস্বর বাস্তবের মাটিতে ফিরে এল।

রঘুনাথের অনেকক্ষণ থেকে জল তেষ্টা পেয়েছে। সে দূরের টিউবওয়েলটার দিকে চাতক চোখে তাকাতেই সূর্যাক্ষ বলল, চল, আমিও তোর সাথে যাই। আমারও তেষ্টা পেয়েছে খুব।

জল খেয়ে ওরা যখন ফিরে আসছিল তখনই কু-ঝিক ঝিক রেলগাড়ির শব্দ শুনতে পেল। শব্দ যে গান হয়, সেই প্রথম রঘুনাথ বুঝল।

সূর্যাক্ষ বলল, তুই বুঝি এর আগে কোনোদিন ট্রেন দেখিসনি? রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই সূর্যাক্ষ আফসোস করে বলল, আজ আর সময় হবে না, না হলে আজই তোকে ট্রেন দেখিয়ে নিয়ে যেতাম। ছ’টার বাসটা যে করেই হোক ধরতে হবে। শুনেছি-আজ নাকি সাতটার বাস নেই। দেবগ্রাম আসলে ফেরার এই এক ঝামেলা।

অনেকক্ষণ পরে সূর্যাক্ষর কথা বলার ধরন দেখে রঘুনাথের ঠোঁট পিছলে বেরিয়ে এল হাসি, সশব্দে নয়, সে নীরবে হাসল শরীরে কাঁপন তুলে। ভালোলাগার রেশগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল তার সত্তায়। সেই রেশগুলো ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল কোষে কোষে।

ক্লাব সেক্রেটারী মদনদা মানিকডিহি জেতাতে ভীষণ খুশি। আবেগী স্বরে সে বলল, আমাদের এই দলটা সর্বকালের সেরা দল। আমার মন বলছে কেসনগর যদি আমাদের সঙ্গে খেলে তাহলে ওদেরও আমরা হারিয়ে দেব।

পচা বললেন, শুধু মুখে বললে হবে না, করে দেখাতে হবে।

তর্ক করতে করতে ওরা রাস্তার এক পাশ ধরে হাঁটছিল। এ সময় দেবগ্রামের পাকা রাস্তায় লোকজন ছড়ানো-ছিটানো ভাবে দেখা যায়। দত্ত মেডিকেলের কাছে আসতেই দুলুর সঙ্গে চোখাচোখি হল রঘুনাথের।

দুলুর বুকে যেন পাথর চাপা ছিল এতক্ষণ। সেই ভার পাথর সরিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল দুলু। কপালের ঘাম তর্জনীতে কেঁচে নিয়ে সে বলল, তোর সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো। যদি না দেখা হত তাহলে আজ নির্ঘাত আমাকে ধাওড়া পাড়ায় যেতে হোত।

দুলুব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মানোয়ারার বর সাদাত। ওর মুখে কোনো কথা নেই, ও শুধু শুনছিল। দুলু খপ করে রঘুনাথের হাত ধরে বলল, এটু আড়ালে চল, তোর সাথে দুটা গোপন কথা আছে।

সাদাত দুলুর ব্যবহারে কেমন ব্যথিত চোখে তাকাল। এ কেমন ভদ্রতা? এমনকী যা মুখ চেনা মানুষের কাছে বলা যায় না। আসলে দুলু সেই কাশিমবাজার থেকে এড়িয়ে চলছে সাদাতকে। সাদাতই তার মানোয়ারাকে ছিনিয়ে নিয়েছে টাকার জোরে। তাছাড়া মানোয়ারার মনে তার উপর কোনো ভালোবাসা ছিল না। মানোয়ারা পালবুড়ার আটা চাকিতে আসত শুধু টাকার জন্য। দুলু টাকা না দিলে তাদের হাঁড়ি চড়ত না।

গোলপোস্টের পেছনে হাত ধরে হুড়হুড় করে টেনে নিয়ে গেল দুলু। ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে চাপা গলায় সে বলল, শোন তোর কাকিকে দেখলাম পলাশী স্টেশনের বেঞ্চির নীচে শুয়ে থাকতে। চেহারা পুরো ধসে গিয়েছে। প্রথমে দেখে চিনতে পারিনি। পরে চিনতে পেরে তার কাছে যেতেই সে আমাকে দেখে প্রাণ বাঁচানোর দৌড় লাগাল। আমি তাকে হয়ত ধরতে পারতাম কিন্তু গাড়ি ছেড়ে দেবে বলে আমি আর ঝুঁকি নিইনি।

রঘুনাথের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না দুলুর কথাগুলো। ঢিলির সঙ্গে যদি তার দেখা হয়ে থাকে তাহলে সে কেন ছেড়ে এল হাবা-গোবা, পাগল-ছিটেল মেয়েমানুষটাকে। বড়ো অবিবেচকের কাজ করেছে দুলু।

কথাগুলো শোনার পরে মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল রঘুনাথের। সে যে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। বারবার তার কাকার কথা মনে পড়ছিল। লুলারাম দুলুর হাত ধরে কতবার বলেছে, তোরে আমি খুশ করে দিব যদি তুই তোর বৌদির খবর এনে দিস। আমি তো গাঁ ছেড়ে বেরুতে পারিনে, কত যে কাজের ঝামেলা!

ভাবতে গিয়ে রঘুর মাথার ভেতরটা ডানা ভাঙা পাখির মতো কাতরে উঠল, উঃ, কী শুনলাম গো! এসব শোনা তো আমার পাপ..।

-পাপ নয় রে, এসব হল গিয়ে কর্মফল। চল রঘু পলাশী থেকে ঘুরে আসি।

রঘুনাথ আবেগে ভাসল না, আমার কাছে নগদ কুনো পয়সা নেই। পলাশী যেতে গেলে হেঁটে যেতে হবে আমাকে।

দুলু অর্থপূর্ণ চোখে সাদাতের দিকে তাকাল, সাদাত ভাই, তোমার কাছে কিছু টাকা থাকলে উধার দাও। কাল সকালে ঘুরোন দিয়ে দিব।

সাদাত বলল, কালই যে ঘুরোন দিতে হবে এমন নয়। তুমি সুবিধা মতো দিও। আমি আমার বিবির মুখে তোমার অনেক সুখ্যাতি শুনেছি।

সাদাতের বাঁশ-চাটাইয়ের ব্যবসা সারা দুর্গাপুর-আসানসোল জুড়ে। যেখানে খনি, সেখানকার ধস ঠেকাতে দরকার হয় চাটাইয়ের। বিনা চাটাইয়ে ধস নামে মাটির। খনির বাঁধ দেওয়া জল হুসহুসিয়ে ঢুকে আসে অন্য খনিতে। তখন সমূহ বিপদ। এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে শুধু চাই চাটাই। মোকামপাড়ায় কারিগর আছে চাটাই তৈরি করার। সেই চাটাই বান্ডিল বেঁধে লোড করা হয় লরিতে। চাটাই ভর্তি লরি রওনা দেয় আসানসোল-দুর্গাপুরের দিকে। আগে ফোনে কথা বলে নেয় মহাজনরা। চাটাই পৌঁছে দিলে নগদ টাকা। তখন খালি লরি নিয়ে ফিরে আসতে হয় সাদাতকে। সাদাত খনি অঞ্চল থেকে কয়লা অথবা কয়লার গুঁড়ো নিয়ে আসে ট্রাকে ভরে। তাতে যা লাভ হয় লরির ভাড়া পুষিয়ে গিয়েও লাভের মুখ দেখা যায়। মোকামপাড়ায় বসে সাদাতের এই ব্যবসা অনেকেরই মাথার মধ্যে ঢোকে না তবে যতদিন যাচ্ছে ততই ফুলে-ফেঁপে উঠছে সে। মোকামপাড়ায় একমাত্র সাদাতেরই পাকা দালান। সারা মোকামপাড়া ঘুরে এলে একমাত্র ওরই আছে একশ দশ সি.সি-র মোটর সাইকেল।

মানোয়ারাকে সাদাত পয়সার টোপ দিয়ে পণ্ডিত বিলের মাছের মতো ডাঙায় তুলেছে খেলিয়ে। মানোয়ারা এখন তার পোষা বেড়াল, সারাদিন মিউমিউ করে আদরের কথা বলে। স্বামী গরবে ইদানীং তার পা পড়ছে না। এমনকী নিজের জন্মদাতা আব্বাজানকেও মানোয়ারা খুব বেশি পাত্তা দেয় না। চাঁদ মহম্মদ মেয়ের এই পরিবর্তন নিজের চোখে দেখছে, কষ্টে বুক ভেঙে গেলেও তার কিছু করার নেই। আসলে রক্তের দোষ যাবে কোথায়? নুরি বেগম ডানা কাটা পরীর মতো দেখতে ছিল, সে-ও তো কাঁচা বয়সে ভুল করে অন্যের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালাল। এখন নুরি বেগমের তেজ কমেছে, রূপ চটা ওঠা ফুটোফাটা মাটির মতো, এখন বহু কষ্টে দিন কাটছে তার। তার দুর্দশার ফিরিস্তি মাঝেমধ্যেই কানে আসে চাঁদ মহম্মদের। তখন বউটার জন্য এই বয়সে মনটা মাখা ময়দার চেয়েও নরম হয়ে যায়। মনে হয় বহরমপুর থেকে ফিরিয়ে আনবে নুরি বেগমকে। কোরানে ক্ষমার কথা বলেছে বারবার। চাঁদ মহম্মদ ধর্ম ছুঁয়ে শ্বাস নিচ্ছে এখনও। নুরি বেগমের বিচ্ছেদ এখনও তার মনে গোস্তকাটা ধার চাকু ঢুকিয়ে দেয়। তখন ছটফট করে পুরো বদন। সেই পুরনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে। মসজিদের নামাজ সেরে ফিরছে চাঁদ মহম্মদ। মনোয়ারা আব্দার ধরেছে সিমাই খাবে। দুধ-সিমাইয়ের পায়েস মেয়েটার ভীষণ প্রিয়। রফিকের দোকান খুলিয়ে সিমাই আর গুড়া দুধের ঠোঙা নিয়ে ঘর ফিরছে চাঁদ মহম্মদ। তিন-সাড়ে তিন বছরের মেয়েটাকে দুধের বোঁটা ধরিয়ে দিয়ে এককেতে হয়ে শুয়ে আছে কাঁথাকানির ভেতর নুরি বেগম। যেন সে কোন নারী নয়, আসমানের স্ত্রী, যেন সে কোনো হরী-পরী নয়, খুশির বাতাসে নুয়ে যাওয়া ফুলের গাছ, মাতৃত্বের সুগন্ধে ম-ম করছে ঘর। চাঁদ মহম্মদ সেই সুখের বাতাসকে বুক ভরে নিয়ে সারাদিনের রসদ খুঁজে নিচ্ছে নিজের জন্য।

সেই চোখের মণি মানোয়ারা এখন স্বামীর সুখের ঘর পেয়ে ভুলতে বসেছে বাপকে। চাঁদ মহম্মদের দুঃখ হলেও বুক চেপে থাকে সে। নিজের ঘর ছাড়া সে এখন ভুল করেও সাদাতের ঘরের দিকে তাকায় না। মানোয়ারাও পথে-ঘাটে বাপকে দেখলে মুখ নিচু করে চলে যায়, যেন সে চাঁদ মহম্মদকে চেনে না, চাঁদ মহম্মদ তার আব্বা নয়, তার কোনো আম্মাজান নেই বাপজান নেই, সে যেন আকাশ থেকে ঠিকরে পড়া তারা।

চাঁদ মহম্মদ এসব লক্ষ্য করে হায় আল্লা রসুলতান্না বলে দীর্ঘশ্বাস উগলে দেয় বাতাসে।

তুর ভালো হোক বিটি, তুর ভালো হোক। চাঁদ মহম্মদের ঠোঁট এমনকী চোখের তারা কেঁপে ওঠে ঝনঝনানো কাঁসার থালার মতো। ঝাপসা চোখে সে সুখের পৃথিবীটাকে দেখে জটিল কুয়াশায় ঢাকা।

সাদাত পলাশী গেল না, সে কালীগঞ্জের বাস ধরে গাঁয়ে ফিরে গেল। কথা হল সে ধাওড়াপাড়ায় গিয়ে লুলারামকে খবর দেবে। লুলারাম যেন গোরুরগাড়ি নিয়ে হাজির থাকে কালীগঞ্জে। কালীগঞ্জ থেকে শেরপুর ধাওড়া কম পথ নয়। অতটা হাঁটা পথ ঢিলিকে নিয়ে ফেরা মুখের কথা হবে না। তাছাড়া ঢিলির শরীরের অবস্থার কথা কারোরই সঠিকভাবে জানা নেই। এখন তার হাঁটাচলার ক্ষমতা আছে কিনা সেটাও দুলু স্পষ্টভাবে বলতে পারল না। একটা মানুষ প্রাণের ভয়ে দৌড়ে পালাল মানে সে যে পুরোপুরি সুস্থ এমন নয়।

পলাশী নামতেই অন্ধকার ছেয়ে এল চারদিকে। দুলু উশখুশিয়ে বলল, চল, এখন আমরা চা খেয়ে স্টেশনপানে চলে যাই। এখন কুনো ট্রেন নেই। ট্রেন আসবে সেই দশটার সময়।

ফাঁকা প্লাটফর্মে দু-একটা নেড়িকুকুর এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। টিমটিম করে জ্বলছিল স্টেশনের বাতিগুলো। দু’চারজন লোক ছাড়া পুরো প্লাটফর্ম এখন ফাঁকা ফুটবল খেলার মাঠ। গাছতলায় অন্ধকার শুয়ে আছে কল্পনার ডাইনিবুড়ির মতো। মাথার উপর খেলে বেড়াচ্ছে ফর্সা মেঘ। হাওয়ায় মিশে আছে মৃদু মৃদু শীতের কামড়।

দুলু, সূর্য আর রঘুনাথ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিল স্টেশনের শেষপ্রান্তে। আর একটু হাঁটলেই শুরু হবে ধানমাঠ। আশে-পাশের ঘর গেরস্থালির আলোগুলো অন্ধকারের সঙ্গে যুঝছে।

কাউকে দেখতে না পেয়ে রঘুনাথ মন বেজার করে বলল, মনে হচ্ছে কাকি ভয়ে কুথাও চলে গিয়েছে। ও মনে হয় আর ঘর ফিরবেনি। যদি ঘরে ফেরার ইচ্ছে হত তাহলে কি অমনধারা পেলিয়ে-পেলিয়ে বেড়াত?

দুলু নিরাশ গলায় বলল, ওই শেডের নীচে তাকে দেখেছিলাম। আমাকে দেখে চিনতে পেরে দে দৌড়..। যেন আমি খুব রাগী দারোগা। ওকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছি।

সূর্য বিচক্ষণের মতো বলল, নারে এসব কথা সঠিক নাও হতে পারে। আমার মনে হয় কাকিমা ভীষণ অসুস্থ। কোথাও ঠিক মাথা গুঁজে পড়ে আছে। আড়ালে থাকলে লোকে কম জ্বালাতন করবে সেইজন্য।

-আমি এতদিন ধরে লালগোলা টেরেনে যাতায়াত করচি, কোনোদিন ওর সাথে দেখা হয়নি। আজ জানলা দিয়ে ছেপ ফেলতে গিয়ে দেখি চেনা মানুষ! দুলু শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, জানিস রঘু, তখন তোর কাকার মুখটা মনে পড়ে গেল। মানুষটা দেখা হলেই আমাকে বলত-দেখিস তো দুলু, তোর বৌদির সাথে যদি দেখা হয় তারে সাথে করে ধরে আনিস। সব খরচাপাতি আমি তুরে দিয়ে দেব।

সূর্যর কথাই শেষ পর্যন্ত ঠিক হল।

চা-দোকানের পেছনে চট মুড়িয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়েছিল ঢিলি। রঘুনাথই তাকে প্রথম দেখে। দুলুকে বলতেই সে হেসে উঠল, দুর তোর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। যা দেখছিলাম সেটা তো মালের বস্তা।

-না গো, দেখো কেমুন এট্টু-এট্টু নড়চে!

-তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। বস্তাকে ভাবছিস তোর কাকিমা! ঠিক আচে চল কাছে গিয়ে দেখি। সন্দেহ মেটাতে দুলুই লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল সামনে। বস্তা ভেবে ঠেলা মারতেই ঝাঁকিয়ে উঠেছিল ঢিলি, ছোঁবে না গো, ছোঁবে না! আমার গায়ে কুঠ ফুটেচে। যে ছোঁবে তারও কুষ্ঠ হবে।

ঢিলির কণ্ঠস্বর চিনে নিতে কোনো অসুবিধা হয়নি রঘুনাথের। তাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কালীগঞ্জ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতেই যা ঝামেলা।

ধাওড়াপাড়ার লোকজন নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল লুলারাম। সে গোরুর গাড়ি জোগাড় করতে পারেনি তাড়াহুড়োতে, সেইজন্য চারপায়া এনেছে ঢিলিকে নিয়ে যাবে বলে। দড়ির খাটিয়ায় ঢিলি যাতে না পড়ে যায় সেইজন্য গোরু বাঁধার দড়ি এনেছে সঙ্গে। বেশি ছটফট করলে তাকে বেঁধে দেবে চৌ-পায়ায়। পাগলদের কোনো বিশ্বাস নেই। যেন কুলে এসে নৌকো না ডুবে যায় সেইজন্য এই বাড়তি সতর্কতা।

কালীগঞ্জে পৌঁছে চোখ রগড়ে নিয়ে ঢিলি সশব্দে ভেঙে পড়ল কান্নায়। লুলারাম এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরতেই ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল সেই হাত। ধিক্কার জানিয়ে বলল, খবরদার তুমি আমাকে ছোঁবে না। যদি ছুঁতে হয় আমাকে নয়, ভিকনাথের বউকে গিয়ে ছোঁও। তুমার ধ্যাসটোমো আমি সব ধরে ফেলেছি। তুমি আর আমার চোকে ধুলো ছিটোতে পারবে না।

ঢিলি হাত ছাড়িয়ে দিলেও তার শরীরের উত্তাপে ছ্যাঁকা খেল লুলারাম। ঢিলি জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে। ওকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

লুলারাম ভয় পেয়ে রঘুনাথকে বলল, তুর কাকির গা জ্বরে পুড়ে যাচ্চে। ওরে ধর। নইলে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে বিপদ হবে।

লুলারামের ভীতু চোখের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ ঢিলির দিকে এগিয়ে গেল। ঢিলি গর্জন করে উঠল, খবরদার আমাকে ছুঁবিনে। যদি ছোঁস তো তুর হাত আমি মুচড়ে ভেঙে দেব।

কাকি চুপ করো। মাথা গরম করো না।

–চুপ করব? কেনে চুপ করব? আগুন উগলানো চোখে তাকাল ঢিলি, এই পাপীটাকে কে এখানে আসতে বলেচে? আমি তো বেশ ছিলাম। ও এসে আমাকে তাতিয়ে দিল।

-তুমার গায়ে ধুম জ্বর। তুমি চুপ করো কাকি। রঘুনাথের কথায় কি ছিল শান্ত হয়ে গেল ঢিলি, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, আমি বাঁচতে চাইনে রে, আমাকে মরতে দে। এতদিন ঘরের বাইরে ছিলাম–বেশ ছিলাম। শুধু মেয়েদুটার জন্যি আমার কষ্ট হত। ওরা ছাড়া এ দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই।

ঢিলিকে দেখামাত্রই হাসপাতালে ভর্তি করে নিলেন বড়ো ডাক্তার। আউটডোরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিল পাড়ার সবাই। রোগী দেখে এসে ডাক্তারবাবু কথা বলবেন। লুলারামের ভেতরে মাকুর মতো সক্রিয় ছিল চাপা উত্তেজনা।

ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এলেন। হাতের ইশারায় লুলারামকে কাছে ডেকে নিলেন তিনি, তারপর চাপা গলায় বললেন, রোগী আপনার কে হয়? তবে সুখবর আছে। রোগী মা হতে চলেছে।

মাথায় বাজ পড়লেও মানুষের মুখ এত পুড়ে যায় না, লুলারাম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল সিমেন্ট বাঁধানো মেঝেতে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় কুলকুল করে ঘেমে গেল সে। ঢিলি আবার পোয়াতী হয়েছে কথাটা ভাবতে গিয়ে ঝ্যানঝেনিয়ে উঠল তার সারা শরীর। ঘেন্না এসে চার ঠোকরানো মাছের মতো ঠুকরে গেল তার মনের জমি। এ কু-কাজ কে করল, এ তো তার কাজ নয়। বছরের উপর হতে চলল ঢিলির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পাশে শোওয়া তো দুরের কথা ঢিলি তাকে ছুঁতেও দেয় না কোনোদিন। হাত ধরলে ঢিলি গাল দিয়ে ভূত ভাগায়, যাও না ঝারির কাচে, আমার কাচে মরতে কেনে এয়েচো! আমি তো তুমার কাছে এখুন কাঠের পুতুল!

কে, কে দায়ী এই দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য? কার পাতা ফাঁদে জড়িয়ে গেল ঢিলি। তবে কি রেল স্টেশন, ফাঁকা বাঁধ নাকি…। আর কিছু ভাবার ক্ষমতা ছিল না লুলারামের। বাঁ হাতে সজোরে কপাল টিপে সে রঘুনাথকে ডাকল।

রঘুনাথ সামনে আসতেই লুলারাম বলল, তোরা গাঁয়ে ফিরে যা, আমি রাতভর এখানেই থাকব।

-থাকবে তো খাবে কুথায়?

রঘুনাথের প্রশ্নে বিরক্ত হলো লুলারাম, এক রাত না খেলে মানুষ মরে না। যা তোরা যা। আমাকে একা থাকতে দে।

মাথায় আকাশ নিয়ে লুলারাম দাঁড়িয়ে থাকল অন্ধকারে।

.

১৭.

সাতদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে গেল ঢিলির।

এই সাত দিন দুবেলা ভাত নিয়ে হাসপাতালে যেত রঘুনাথ। হাসপাতালের খাবার ঢিলির মুখ দিয়ে নামতে চাইত না। নূপুর ভাত-তরকারি রেঁধে বেঁধে দিত গামছায়। সেই খাবার পৌঁছে দিয়ে বাইরের সিমেন্টের বেঞ্চিটাতে চুপচাপ বসে থাকত রঘুনাথ। লুলারাম প্রথম দিন ছাড়া দ্বিতীয় দিন থেকে হাসপাতালে আর আসত না। মাচা কুমড়োর মতো মুখ ঝুলিয়ে সে কী যেন ভাবত সবসময়। চিন্তার রেখাগুলো গাঢ় হয়ে ফুটে উঠত সারামুখে। মাঝেমধ্যে মুখ দিয়ে হুস করে শব্দ তুলে পাগলের মতো বলত, আমার সব্বোনাশ হয়ে গেল! মা শীতলাবুড়ি–একী করলে গো তুমি।

প্রথম রাতে হাসপাতালে থাকার গোপন উদ্দেশ্যটা ধরে ফেলে অবনী। তার সেদিন নাইট-ডিউটি ছিল। ফিমেল ওয়ার্ডে রোগীর চাপ না থাকায় অতসী দিদিমণি চেয়ারে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি চতুর লুলারাম। সে আউট ডোরের বারান্দা থেকে পা টিপে টিপে চলে এসেছিল ফিমেল ওয়ার্ডে। আজ রাত হোক ঢিলির জীবনে শেষ রাত। ও যতদিন বাঁচবে ততদিন জ্বালিয়ে মারবে লুলারামকে। বউটাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শেষ করে দেওয়া যেত কিন্তু তাতে ঝামেলা বাড়ত বই কমত না। গাঁয়ের মানুষের সন্দেহবাতিক মন। ওরা হাজার প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের ঔৎসুক্যের আর শেষ নেই। ঢিলি পরের ছানা পেটে নিয়ে ঘুরছে। পাগল হলেও ওর চেহারার বাঁধুনী ফুরিয়ে যায়নি। একনজর দেখলে চোখ ফেরানো যায় না, কেননা ওর দিঘির মতো চোখ দুটো সব সময় ছলছলানো আর টানাটানা। থলথলে বুকের সৌন্দর্য অনেকটাই দৃশ্যমান কারণে-অকারণে। পেট কুঁচকে গেলেও গভীর নাভি পথচলতি মানুষের মনে কামের ভাবটা বাড়িয়ে দেয়। বারুদবাতি যে কোনো সময় জ্বলে উঠে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্যের পাপের বোঝা লুলারাম কেন বইতে যাবে বরং তার পাপের ভাগীদার হোক সবাই। ঘুমন্ত ঢিলির কণ্ঠনালী সজোরে টিপে ধরতেই ঘুম ভেঙে যায় ঢিলির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সজোরে লাথ ছুঁড়ে দেয় লুলারামের অণ্ডকোষে। কাঠব্যাঙের মতো তখনই ঠিকরে পড়ে লুলারাম। তার পতনের শব্দে ঘুম চোখে ছুটে আসে অবনী। অতসী দিদিমণি ভাবেন- রুগি বুঝি ঘুমের ঘোরে পড়ে গিয়েছে খাট থেকে। দৌড়ে এসে তিনি দেখেন অন্য কাণ্ড।

অবনী রক্তচোখে ধমকাচ্ছে লুলারামকে, তোমাকে মেয়েদের ঘরে কে আসতে বলেছে শুনি? জানো, ডাক্তারবাবুর কানে কথাটা গেলে কালই তোমার রুগিকে ডিসচার্জ করে দেবে। একবার নাম কেটে গেলে ফিরে আর ভর্তি হবে না মনে রেখো।

অতসী দিদিমণি রাগে ফুঁসছিলেন, এদের আর বুঝিয়ে পারা যাবে না, যত সব অশিক্ষিতের দল। ছিঃ ছিঃ কী কাণ্ড দেখো! এত রাতে মেয়েদের ওয়ার্ডে লুকিয়ে চলে এসেছে। যতসব চরিত্রহীন কারবার।

গলায় হাত বোলাতে-বোলাতে ভয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ঢিলি। তার মুখে কথা নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই শুধু দু’চোখের কোণ ছাপিয়ে জলের ধারা নামছিল অনর্গল। সে জানে–উপর দিকে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়বে। সেটা কারোর জন্য মঙ্গল হবে না। ঢিলি স্পষ্ট বুঝে গিয়েছে লুলারাম তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তার ফিরে আসা লুলারাম সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।

অতসী দিদিমণি এগিয়ে গিয়ে শুয়ে থাকা ঢিলির কপালে হাত রাখল, তুমি কাঁদ কেন, তোমার কি হয়েছে?

–দিদিমণি গো, আমি আর বাঁচতে চাইনে। ঢিলি ঠোঁট মুখ কুঁচকে কেঁদে উঠল।

-এ্যায়, কেঁদো না, কেঁদো না বলছি। অতসী দিদিমণির কপট ধমকে ঢিলি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকাবার চেষ্টা করল প্রাণপণ, কিন্তু পারল না বরং ঝাঁকুনি দেওয়া কান্নায় কাহিল হয়ে সে নেতিয়ে শুয়ে রইল বিছানায়। অবনী লুলারামের হাত ধরে নিয়ে গেল বাইরে, দিলে তো আজ সবার ঘুম চটকে? পারো বটে ভায়া। তোমার সাহস দেখে আমার বুক এখনও কাঁপছে। লুলারাম ধকধকানো চোখে তাকাল, অবনীর কথাগুলো সঠিক বোধগম্য হল না তার। অবনী কি গলা টিপে ধরার দৃশ্যটা দেখেছে? যদি দেখে থাকে তাহলে অতসী দিদিমণির কাছে সে কেন ঘটনাটা ফাঁস করে দিল না। কেন সে বাঁচাল তাকে? লুলারাম গোঁফ চুলকে সংশয়ের চোখে অবনীর দিকে তাকাল।

অবনী অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তুমি কী ভাবছ, আমি জানি। ভাবছ–আমি খুব বোকা তাই না?

বুক শুকিয়ে গেল লুলারামের, না, না নয়।

-বউটাকে মারতে গিয়েচিলে কেন, ওর দোষ কি? অবনীর চোখে ক্রুর হাসি খেলে গেল।

লুলারাম কাঁপতে কাঁপতে বলল, যার গায়ে ছ্যাঁকা লাগে সে বোঝে। তুমাকে কি আমি বলে বোঝাতে পারব? তুমি যখুন দেখে ফেলেছো, তুমাকে আসল কথাটা বলি। আমার বউয়ের পেটে যে সন্তান এয়েচে-সেটি আমার লয়।

-তার মানে? আঁতকে উঠল অবনী।

অন্ধকারে মেঘ ডাকার শব্দ ভেসে এল।

.

গোরুর গাড়িতে চেপে ঘর ফিরছিল ঢিলি। চেনা পথ-ঘাট সব যেন বদলে গিয়েছে কেমন করে। নূপুর আর ঢিলি মুখোমুখি বসে আছে ছৌয়ের ভেতর। হাঁ করে নূপুর দেখছিল তার মাকে। ক’ মাসেই যেন পুরো শরীরটা বদলে গিয়েছে মায়ের। আগের চাইতে অনেক রোগা দেখাচ্ছে তাকে।

গত সাত দিনে নূপুরের কত ইচ্ছে ছিল হাসপাতালে আসার, লুলারাম তার ইচ্ছেটাকে থেঁতলে দিয়েছে। ধমক দিয়ে বলেছে–ঘরে থাক। ওখানে কেনে মরতে যাবি? সব খপর তো রঘুর মুখে পাচ্ছিস!

অন্যের মুখে ঝাল খেলে কি নিজের মুখে ঝাল লাগে? নাকি তা ভালো দেখায়? লুলারাম বলেছিল, তুদের সেই আগের মা আর নেই! এখুন যারে দেখবি সে হল তুর মায়ের কঙ্কাল।

কঙ্কাল হোক, যাই হোক মা তো মা-ই। একথা লুলারামকে বোঝাবে কে?

রঘুনাথ সব শুনে নূপুরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, কাকার কথা বাদ দে তো। ওর কথা যত গায়ে না মাখবি তত ভালো।

নূপুর বড়ো হয়েছে। বুঝতে শিখেছে আগুন-জলের মর্ম।

ঢিলি চেয়ে আছে তার দিকে, মুখে কোনো কথা নেই।

রঘুনাথ বলেছিল গোরুর গাড়ির পেছনে পা ঝুলিয়ে বসে সে ধাওড়াপাড়া অবধি আসবে কিন্তু শুভর জন্য তা আর হল না। অবনী রঘুনাথকে চিনতে পেরে ঘর পর্যন্ত নিয়ে গেল। ওখানেই শুভর সঙ্গে অনেক সময় ধরে কথা হল তার। শুভ বেশি কথা বলে না তবু ওর মনে কোনো গুমোটভাব নেই। শরৎকালের সাদা মেঘের মতো ফুরফুরে তুলো তুলো মন। এই মেঘের দিকে তাকালে মন ভালো হতে বাধ্য। সেদিন শুভর সঙ্গে টিকেদারবাবুর ছেলে সবুজও ছিল। ওরা দুজন মানিকজোড় এখনও গুলতি হাতে নিয়ম করে বাঁশঝাড়ে যায় ডাহুক মারতে। ডাহুকের দেখা না পেলেও ওদের কোনো দুঃখ নেই। ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা ওদের পেয়ে বসেছে।

সেদিন রঘুনাথ ওদের সঙ্গী হল। শুভর হাত থেকে গুলতি নিয়ে সে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই শুইয়ে দিল একটা ডাহুকপাখি আর মাঠঘুঘু। পাখি দুটোকে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে দেখে বেজায় মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল শুভর। সবুজ তার হাত ধরে আনন্দ করে বলেছিল, আজ ফিস্ট হবে। রঘুকে আমরা আজ যেতে দেবো না। আজ রাতে ও আমাদের সঙ্গে থাকবে।

অতসী দিদিমণি যত্ন নিয়ে রেঁধে দিয়েছিলেন ডাহুকপাখির মাংস। যদিও পরিমাণে অল্প মাংস কিন্তু স্বাদে ছিল অতুলনীয়। ঘুঘুর মাংসটা আলাদাভাবে আলাদা কায়দায় রাঁধলেন তিনি। নিজে মাংস খান না অথচ তাঁর মাংস রান্নার প্রশংসা না করে পারা যাবে না।

শুভ বলেছিল, পিসি তুমি এত সুন্দর মাংস রেঁধেছ যে জিভের জল আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। কোনো কথা শুনব না, আজ তোমাকে আমাদের সঙ্গে খেতে হবে।

অতসী দিদিমণি মিষ্টি হেসে বললেন, মাংস আমি জ্ঞানপাড়ার পর থেকে কোনোদিনও খাইনি। তোরা বড় হ। চাকরি কর। তারপর মিষ্টি আনবি, আমি খাব।

-সে তো অনেক দিনের ব্যাপার। সবুজ বিস্মিত স্বরে বলল, পিসি, আমরা কি চাকরি পাব কোনোদিন? আমার তো মনে হয় না আমরা কোনোদিন চাকরি পাব।

পিসি কিছু বলার আগে রঘুনাথ ভরসার গলায় বলল, কেন চাকরি পাবি না, নিশ্চয়ই পাবি। আমাদের শেরপুর গাঁয়ের দু’জন ছেলে পাশ করে মাস্টুর হয়েছে। ওরা মাস গেলে কড়কড়ে নোট গুণে নেয়।

অতসী দিদিমণি মন দিয়ে শুনলেন কথাগুলো, মন দিয়ে পড়লে নিশ্চয়ই তোরা চাকরি পাবি। শুভ তো পড়াশোনায় বেশ ভালো তবে ওদের ঘরের পরিবেশটা ভালো নয়। আমি তো ওকে বলেছি–এখানে এসে পড়তে। আমার ঘর তো ফাঁকা থাকে।

সে রাতে আর ঘরে ফিরতে পারেনি রঘুনাথ। লুলারাম গিয়ে খবর দিয়েছিল দুর্গামণিকে। দুর্গামণি কপালে ভাঁজ ফেলে চুনারামের মুখের দিকে তাকাল, চুনারাম তাকে ভরসা দিয়ে বলল, ছেলে নিয়ে অত ভেবো না বউমা। তুমার এই ছেলের কেউ কোনোদিন ক্ষতি করতে পারবে না। ওর গলায় আমি শুয়োরের হাড়ের তাবিজ বানিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছি। হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর দয়া আচে ওর উপর।

ভোর-ভোর ঘরে ফিরে এল রঘুনাথ।

সে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই দুর্গামণি উদ্বেগ নিয়ে বলল, জানিস বাপ, কাল এট্টা চরম বিপদ ঘটে যেত।

-কী হয়েচে মা? রঘুনাথের তর সইছিল না।

পাশে দাঁড়ানো চুনারাম দাঁতন করা থামিয়ে বলল, কী আর হবে। যত সব ছোটলুকের মরণ।

-তুমি থাম তো বাবা। দুর্গামণি ধমক দিয়ে চুনারামকে নীরব করে দিতে চাইল।

চুনারাম চুপ করে গেলেও তার ভেতরে কথার খই ফুটছিল। নিজেকে সংযত করে সে দুর্গামণির মুখের দিকে তাকাল। গলা নামিয়ে দুর্গামণি ভয়ার্তস্বরে বলল, কাল রাতে ছোটবউ পেলিয়ে গিয়েছিল আবার। আঁধারে পা হড়কে গিয়ে সে ছিটকে গিয়েছিল বুড়িগাঙে। ভাগ্যিস লুলারাম তখন কি কাজে বাঁধের ধারে ছিল। সে-ই লোক ডেকে ছোটবউকে বাঁচায়। বড়ো ভাগ্য ভালো যে ছোটবউয়ের কুনো ক্ষতি হয়নি।

বেলা বাড়তেই রঘুনাথ শুনতে পেল ঢিলি পা হড়কে বাঁধ থেকে পড়ে যায়নি। সে আত্মহত্যা করার জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল বুড়িগাঙে। সেই সময় ঝারির সঙ্গে মিলিত হবার আশায় বাঁধে এসেছিল লুলারাম। একদিন ঝারির সান্নিধ্য না পেলে তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। আর ঝারিও বড়ো খিটখিটে হয়ে ওঠে, সে তখন কারোর কথা সহ্য করতে পারে না।

ঝারি আর লুলারামের মেলামেশাটা এখন বাচ্চা-বুড়ো সবাই জানে। নূপুর বুঝতে শিখেছে সব, আড়ালে সে চোখের জল ফেলে। ঝারিকে তার ভালো লাগে না। ঝারির জন্য তাদের সংসারটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে যাচ্ছে। অথচ পাড়ার মধ্যে মাথা উঁচু করে ঘোরে বউটা। ওর ভেতর লজ্জা-শরমের কোনো শেকড় নেই। দু-কান কাটার লাজ-লজ্জা বুঝি থাকতে নেই।

শীতটা ধাওড়াপাড়ায় বড়ো কষ্টের।

বেলা ছোট হলে মানুষের মন যে ছোট হবে এমন সহজ সমীকরণ কোথাও লেখা নেই। কদিন থেকে গুয়ারামের জন্য মনটা বড়ো ছটফট করছে চুনারামের। শুধু মনে হচ্ছে যদি প্রাণপাখিটা হঠাৎ করে উড়ে যায় তাহলে ছেলের হাতের জল সে আর পাবে না। সবার ভাগ্যে কি এমন সুখ লেখা থাকে? সুখ হল সেই সরলা খিরিষগাছের ফল যা দিয়ে চারা হয়, জ্বালন হয়–ছাই ওড়া দুপুরে যার মর্ম বোঝা আর খা-খা শ্মশানে গিয়ে বুক চাপড়ে কাদা একই কথা। সুখের কোনো আকার নেই, আকৃতি নেই, সুখ হল জলের মতো মদের মত, নেশা হবে পিপাসা মিটবে। বড়োজোর খিরিষের আঠার মতো জড়িয়ে থাকবে কিছুক্ষণ।

ছেলের জন্য মন খারাপ চুনারামের আজকের নয়, বহু পুরনো অভ্যাস। এই ছেলের জন্য সে বাবুদের ঘরের কাজ ছেড়ে চলে এসেছিল গায়ে। লাজবতীও থাকতে পারত না তাকে ছেড়ে। প্রায়ই মুখ ভার করে বলত, তুমার সাথে আমারেও লিয়ে চলো। ইখানে একা থাকতি কি ভালো লাগে গো? মন ধরে না, খাঁ-খাঁ করে চারপাশ। আমি হেঁপসে মরি!

লাজবতীর টানে নয়, শুধুমাত্র ছেলের টানে বাবুবাড়ির কাজ ছেড়ে চলে এসেছিল চুনারাম। এখন মাজা পড়া শরীর, পাকা চুল, চোখে ছানি তবু ছেলেটাকে দেখার জন্য মনটা অকবগিয়ে ওঠে! রাতকালে এই চিন্তা আরও গাঢ় হয়। বিদেশ বিভূঁইয়ে ছেলেটা কেমন আছে কে জানে। যত দিন যাচ্ছে তত যেন চিন্তাটা ছোবল মারছে মনের ভেতর।

ভূষণীবুড়ি সেদিন ঘুরতে ঘুরতে তাদের দোর অবধি এসেছিল, একথা-সেকথার পরে বলল, ফাঁকা ঘরে হেঁপসে উঠেচি গো! ছেলে নেই, বউমা নেই, একা একা কী ভাবে যে সময় কাটে বলা দায়। মনে হয় দম এটকে মরে যাব।

ভূষণীবুড়ির কথাগুলো শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল চুনারামের। এ সময় বুড়িগাঙের জল স্থিতু হয়ে দম নেয়। আকাশের নীল বুকের ভেতর শুষে নিয়ে সাদা কালো নীল মিশিয়ে বিচিত্র এক আলপনা আঁকে জলের উপর। কদমগাছের ফাঁক দিয়ে কী অদ্ভুত কায়দায় গড়িয়ে নামে রোদ। সেই চুয়ানো রোদ গায়ে লেগে ঘাস হয় গর্ভবতী। নাকছাবির মতো ফুল আসে ঘাসের বুকে। বাসি চারাগুলো শিশির পান করে কিশোরীর টাইট শরীরের মতো টনটনিয়ে ওঠে। এত সুখ তবু সুখের মধ্যে লুকিয়ে থাকা উঁইপোকার মতো অসুখ কুরে কুরে খায় চিন্তার হাজার ফসলি জমি। শীতকালটা চুনারামের কাছে বা বেশি ভয়ের সময়। ক’দিন ধরে যা শীত পড়েছে তাতে হাড় কাঁপে ঠকঠকিয়ে। আমড়াগাছের পাতাগুলো সব ঝরে গেল। কার শোকে ন্যাড়া হয়ে গেল নিমগাছ।

এই শীতের সময় চুনারাম বরফের মাছের মতো প্যাটপেটিয়ে চেয়ে থাকে, মৃত্যুভয় তার লোমকূপে এসে বাসা বাঁধে। গেল সালে ধাওড়াপাড়ার চারজন বুড়া সাফ হয় শীতের কামড়ে। বয়স হলে শীত বুঝি কাউকে ক্ষমা করে না। যমরাজকে আয়ুর দক্ষিণ-দুয়ারে নিয়ে এসে দাঁড় করায়।

এ সময় গুয়ারামও কাছে নেই তাহলে মনের জোর শতগুণ বেড়ে যেত চুনারামের। রঘুনাথের উপর ভরসা নেই চুনারামের, নাতিটা গায়েগতরে বাড়ল কিন্তু তার বিচারবুদ্ধি বড়ো কম। কাঁচা বয়সের ভাবনা পাকা আতার মত, হালকা চাপ দিলেই পেটের ভেতরের মাল-মশলা সব কিছু দেখিয়ে দেয়।

এই শীতটা কাটবে কি? মোটা সুতোর চাদরটা গায়ে জড়িয়ে চুনারাম বাঁধের গোড়ায় এসে দাঁড়াল। প্রায় বছর দশেক আগে কেনা চাদরটা এখন জরাজীর্ণ, সুতোর ফুপি বেরিয়ে ঠান-বুড়িদের মতো দশা। রঙ জ্বলে গিয়ে এখন আর আগের চেহারা মনে পড়ে না। সকালের রোদ এসে ঢলিয়ে পড়ছে গায়ে। একটু আরামবোধ হচ্ছে চুনারামের। বেড়ার উল্টো পিঠে খেলা করছে বনিপাখির দল। ক্যাচর-ম্যাচর শব্দে উঠোন যেন হাটতলা। ধসে পড়া কাঁথ দেওয়ালের মাটি বর্ষায় ধুয়ে-গলে প্রায় সমতল। একটা তেল চকচকে ছাগলছানা তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে রোদে। ধসা দেওয়ালের উপর ছাগল নাচলে গৃহস্বামীর অমঙ্গল হয়। চুনারাম রাগের ঘোরে ছাগলছানাটা তাড়াতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল মুনিরামের চোখে।

দেখা মাত্র যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মুনিরাম, কাশতে কাশতে উঠে এল সে বেড়ার ধারে, কুথায় যেচিস রে, টুকে আয় না, কতা বলি।

অনেক বুড়িয়ে গেছে মুনিরাম, অসুখ ওর বয়সটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও বিশ বছর। শরীরে জোর নেই, চোখ ঢুকেছে গর্তে। কথা বলার সময় শ্বাসকষ্টের রুগির মতো ফ্যাসফেসে শব্দ হয়। চোখের তারা ছিটকে আসার উপক্রম।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড়াতে বাধ্য হল চুনারাম। পিঠাপিঠি দুই ভাই, অথচ দেখা হয় না কতকাল। পণ্ডিত বিলের পাড়ে মুনিরামকে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছিল মোকামপাড়ার লোকেরা। সিদ কাটতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সে। জামগাছে বেঁধে কী মার-ই না মারল ওকে। সেদিন ভাইয়ের জন্য কষ্ট হয়েছিল চুনারামের। মনে মনে ভেবেছিল এমন ভাইয়ের সঙ্গে যতদিন বাঁচবে যোগাযোগ রাখবে না। প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি। মুনিরামই রাতের বেলায় এসে তার পা ধরে কেঁদে কেটে বলল, দাদারে, তুর মুকে চুনকালি লেপে দিয়েছি। আমারে ক্ষেমা করে দে। যতদিন বাঁচব, আমি আর সিঁদকাঠি ছোঁব না। আর চুরিচামারি নয়, ইবার থিকে আমি বড়ো দানে হাত মারব। মোকামপাড়ার লোকগুলোকে দেখিয়ে দিব–ওরা আমার গায়ে হাত তুলে হেলেসাপকে খরিসসাপ বানিয়ে দিল। আগে ওদের ক্ষতি হত, ইবার থেকে ওদের সব্বোনাশ হবে।

মুনিরাম সিঁদেল চোর থেকে হয়ে গেল ডাকাত দলের সর্দার। তার কালো ঘোড়াটা বাঁধা থাকত বাঁশতলায়। বাঁধের উপর সে বিনা কারণে ঘোড়া ছোটাত। এক শ্বাসে চলে যেত মানিকডিহির গাঙপাড়। অন্য শাসে ফিরে আসত হলদিপোঁতা ধাওড়া।

মুনিরামের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না চুনারাম। হাজার হোক ভাই বলে কথা। বয়স বাড়লে সম্পর্কে কেমন ছাতা ধরে। অনেক সম্পর্ক আবার নতুন করে ট্যাক গজায়। মুনিরাম ক’ বছর আগেও কথা বলত না টাকার দেমাকে। নিজেকে ভাবত শেরশাহ। গায়ে কুঠ ফোটার পর মাটির ঢেলা থেকে তার মন হয়ে গিয়েছে লতলতে কাদা। এখন সাত চড়ে রা কাড়ে না সে। দিনের বেশির ভাগ সময় ঈশ্বরচিন্তা করে কাটিয়ে দেয়। হাত-পায়ের ঘাগুলোয় শুলোনী উঠলে সে কোঁকায়। ঢিলি তখন তার সেবা যত্ন করে। লুলারাম বিরক্ত হয়। মনে মনে ভাবে মানুষটা কেন মরছে না। এত লোকের বাপ মরছে, তার কেন বাপ মরছে না।

পণ্ডিতবিলের পাড়ে কুঁড়েঘর বেঁধে দিয়েছিল লুলারাম, বাপকে হাত ধরে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল সে। ফেরার সময় বলেছিল, কী করবো বলল, গাঁয়ের মানুষের রায়, আমাকে তো মাথা পেতে নিতে হবে। তুমার অসুকটা তো ভালো নয়। কার মুকে চাপা দেব বলো। যতদিন পেরেছি, লুকিয়ে তুমাকে ঘরে রেখেচি। আর পারলাম না। ইবার থেকে বিলধারেই থাকো। বিলের ঠাণ্ডা বাতাস তুমার শরীলটাকে ঠাণ্ডা করে দিবে। আমি সাতদিন অন্তর এসে তুমারে দেখে যাবো।

চোখের জল সেদিন আটকাতে পারেনি মুনিরাম। এই ছেলেকে হাতে ধরে চুরি বিদ্যার গুপ্তমন্ত্র শিখিয়েছে সে। সে তো শুধু জন্মদাতা বাপ নয়, একাধারে গুরু। দীর্ঘশ্বাস বুকে ঠেলে ওঠার আগেই বিলপাড় থেকে সটকে গিয়েছে লুলারাম।

অসুখ আর রুগী বয়ে বেড়ানো ঝক্কির কাজ। তাছাড়া মুনিরাম ঘরে থাকলে ঢিলিকে খারাপ নজরে দেখতে পারে না লুলারাম। মুনিরামের জন্য ঝারি রাতকালে ঘরে আসতে পারে না। ওর ঘুম খরগোসের চেয়েও পাতলা। খুট করে পায়ের শব্দ পেলে কে-কে বলে চেঁচিয়ে ওঠে। আর তার চেঁচানি শুনে পাড়ার কুকুরগুলো ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।

সেদিন লুলারামের ঘর থেকে গভীর রাতে বেরনোর সময় ধরা পড়ে গেল ঝারি। নূপুরই তার পথ আটকে দাঁড়াল। ধিক্কারে বাতাস কাঁপিয়ে বলল, তোমার সাহস তো কম নয়! বাঁধধার ছেড়ে এবার ঘরে ঢুকেছ, দাঁড়াও দাদুকে আর তোমার বরকে সব বলে দেব।

ঝারি তার হাত ধরে ক্ষমা চাইল কাকুতি-মিনতি করে।

বাবার চাপে পড়ে নূপুর তাকে ক্ষমা করে দিলেও মন থেকে ক্ষমা করতে পারেনি আজও।

মুনিরামের মুখোমুখি দাঁড়ালে চুনারাম আজও কেমন অপ্রস্তুত বোধ করে। মুনিরামের আঙুলে জড়ানো ন্যাকড়াগুলো পুঁজ রক্তে ভরে আছে। ওগুলোর দিকে তাকালে চুনারামের গা ঘিনঘিনিয়ে ওঠে, তার মনে হয় সে-ও বুঝি অচিরে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হবে। লুলারাম তার বাপকে বিলের ধার থেকে ফিরিয়ে এনে ভুল কাজ করেছে। কিন্তু এছাড়া লুলারামের সেদিন কিছু করার ছিল না। থানা থেকে বড়োবাবু লোক পাঠালেন। লুলারামকে জেলে যেতে হবে অন্তত বছর খানিকের জন্য। সে জেলে গেলে মেয়ে দুটোকে দেখবে কে? ঢিলির উপর তার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। কবে সে ঘর ছেড়ে চলে যাবে একথা আগাম কেউ বলতে অক্ষম। অতএব ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সেই মুনিরাম। বছর চারেকের মাথায় মুনিরামকে ফিরিয়ে এনেছিল লুলারাম। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সে বলেছিল, বাবা ঘরে চলো। আমার টেইম এয়েছে, আমাকে জেলে যেতে হবে। জেলে না গেলে বড়োবাবু আমাকে ছাড়বে না। মাঝ রাস্তায় জিপ থামিয়ে বলবে দৌড়ো। তারপর গুলি করে দেবে। বলবে পেলুতে যাচ্ছিলাম তাই গুলি ছুঁড়ে মেরে দিয়েছে। আইন সব ওদের হাতে। আমি জলে নেমে মগরমাছের সঙ্গে লড়াই করে কি পারব? আমি তো চুনোপুঁটি।

সেই যে ফিরে এল মুনিরাম, আর সে বিলমুখো হয়নি। একলা ঘরে মন বসত না তার, খেতে বসে চোখের জল ভাতের থালায় পড়ত। সাতদিন ছাড়া আসব বলে লুলারাম আসত মাসে একবার। হাত পুড়িয়ে সেদ্ধভাত খেতেই কালঘাম ছুটে যেত মুনিরামের। বউটা সাত তাড়াতাড়ি চলে গেল! সত্যবতী থাকলে তার কপালে এত দুর্ভোগ হত না। রাঁধাবাড়ার কাজটা সামলে দিত বউ। আর কিছু না হোক দুটো কথা বলে তো বাঁচা যেত শান্তিতে। একলা থাকার জ্বালা অনেক। বুকের পাঁজরে শিলপাথর কেউ চাপিয়ে দেয়। লুলারাম জেলে যাবার পর স্বাভাবিক হয়ে গেল ঢিলি। পাড়ার লোকে আড়ালে আবডালে বলল, বউটা ইবার শ্বাস ছেড়ে বাঁচল। ঘরের মানুষ যদি পরের ঘরে নজর দেয় তাহলে তার নজরে পাপ বাসা বাঁধে। সে মানুষের কুনোদিন কুনো উন্নতি হয় না। ঘরের লক্ষ্মী কানলে বাইরে লক্ষ্মী কি সুখ পায় না সুখে থাকে?

চৌপায়ার এক কোণায় বসে চুনারাম শুধালো, তা কেমুন আছিস?

–কেমুন আচি তা তো তুই নিজের চোকে দেখতে পাচ্ছিস। মুনিরাম ঘেয়ো হাতের দিকে তাকিয়ে কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল।

-মনে হচ্চে আগের চেয়েও ভালো।

–ওই ভালো! অন্ধের কিবা রাত কিবা দিন। কুনো মতে বেঁচে আছি। ঢোক গিলে মুনিরাম বলল, সাত সকালে তুই কুথায় যাচ্ছিস? আমারে সাথে করে নিয়ে যাবি? এখুন একা বেরতে ভয় পাই। সব সময় মনে হয় আমার পেছনে বুঝি যম হাঁটচে।

-ও তোর মনের ভুল। চুনারাম জোর দিয়ে বলল, বয়স হলে মরার চিন্তে মনটাকে কাকের মতন ছিঁড়ে খায়। আমারও কদিন থিকে মন কু’ গাইছে। জানি না এ শীতটা পার হবে কিনা!

-আমি তো যেতে চাই তবু সে যে আমাকে নিচ্ছে না। নিলে বাঁচি। আর পচা শরীলটাকে ঘষটাতে হয় না। কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেল মুনিরাম। চুনারাম বলল, আমাদের চলে যাওয়াই ভালো। আমরা আর কুনো কাজে লাগব না। এখন আমরা হলাম গিয়ে আখের আলসে। গোরও খাবে না, আর ঘর ছাওয়াও যাবে না। শুধু আগুন ধরালে চোখের পলকে ছাই হয়ে বাতাসে উড়বে।

উত্তরের হাওয়া এসে হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ল মুনিরামের গায়ের উপর, শীতে গা-কাঁটা দিয়ে উঠল তার, গায়ের ছেঁড়াখোঁড়া কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে সে কেমন করুণ চোখে তাকাল, ঘন্টি বেজে গিয়েছে, ইবার ছুটি হবে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি-সে গটমট করে আসছে। তবে যেতে আমার দুঃখু নেই। শান্তিতে যেতে পারলে বুকের বিদনাটা কমত।

-তুর আবার অশান্তি কুথায়? ধার চাকুর মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল চুনারাম। মুনিরাম গলা খাদে নামিয়ে বলল, অশান্তি আচে রে, অশান্তি আচে। বলেই সে কাছে সরে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল, বউমা তুকে কিছু বলে নাই?

-না তো!

-সারা ধাওড়াপাড়া জানে অথচ তুর ঘরের বউটা জানে না। কেমন বিকৃত স্বরে মুনিরাম বলল, আমার ঘরের বউটা এট্টা কাণ্ড করে বসেচে। পালিয়ে গিয়ে সে আবার ফিরে এল কিন্তু পেটে করে ছেলে নিয়ে এল। আমার ঘরের লুলাটা মানবে না। সে গরধপটা বলছে–ওটা তার সন্তান লয়। এ সন্তানের জিম্মা নিতে পারব নি।

-হায় কপাল, এ কী কাণ্ড! চুনারাম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, কী শুনালিরে, এ সব না শুনলে বুঝি ভালো হোত!

-এক দিন না একদিন তো তোকে শুনতেই হোত। তুই ঘরের বড়ো। তোকে তো শুনতেই হবে। বড় গাছে যে ঝড় লাগে বেশি। মুনিরাম অস্থিরতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমি এখুন কি করি বলতো? আমার যেতে কাটে, আসতে কাটে। আমি ফাটা বাঁশের ফাঁকে এটকে আচি। তুই আমাকে বাঁচা। না হলে আমি পাগল হয়ে যাব।

-তুই চুপচাপ থাক।

–তার মানে?

-বুবা হয়ে যা, কুনো কথা বলবি নে। মনে রাখিস বুবার শত্রু নেই। চুনারাম অনেক ভেবে বলল, বউমানুষ আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরলে অমন তো হবেই। সবই ভাগ্যের লিখন। তুই আমি কি করব বল?

নূপুর লাল চা নিয়ে এসেছে দুটো কাচের গ্লাসে। সঙ্গে বাটি ভর্তি আউস-চালের মুড়ি। সকালবেলার রোদ ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঁড়শগাছের পাতায় গা এলিয়ে দিয়েছে পরম তৃপ্তিতে, ঢ্যাঁড়শের ছড়ানো পাতা সেই রোদ্দুর গায়ে মেখে সুখী নজর মেলে দেখছে চারপাশ। এ সময় সুখী সাতভায়া পাখির দল বাঁশবাগানে হুটোটি খেলে বেড়ায়, যেন পুরো বাঁশবনটা ওদের, ওখানে বনকুয়ারও প্রবেশ নিষেধ। চুনারাম মুখ তুলে দেখল দলবদ্ধ পাখিগুলো যেন গায়ে ছাই মেখে থপর থপর করে হাঁটছে শুকনো বাঁশ পাতার উপর, অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে চতুর্দিকে, আর সেই শব্দের মাধুর্যে এই বয়সেও বাল্যবেলায় ফিরে যাচ্ছে চুনারাম। সাতভায়া পাখিগুলোকে সে ষাট বছর আগে যেমন দেখেছিল পাখিগুলো যেন আজও তেমন আছে। ওদের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাহলে একটা পাখির গড় আয়ু কত? পাখিরা কি বৃদ্ধ হয় না, ওদের যৌবন কি তার মতো হারিয়ে যায় না?

সাতসকালে মাথাটা কেমন গুমগুমিয়ে উঠল চুনারামের। কাল রাতে জব্বর শীত পড়েছিল। দুর্গামণি জলঢালা ভাত খেতে দিলে মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে সে বলেছিল, বউমা, এখুন শীত পড়ছে। এখুন আর জল ঢালা ভাত দিয়ো না। শীতে জীবন বড়ো কাহিল গো!

বিছানা বলতে ছেঁড়া কাথা আর একটা লোমওঠা কম্বল। বাবুরাই দিয়েছিল গায়ে দেওয়ার জন্য। তালাই-মাদুর শ্রী হারিয়ে ঘাটে যাওয়ার অপেক্ষায়। ছারপোকাগুলো আর বসবাসের জায়গা পায়নি, বেছে নিয়েছে ছেঁড়া কাঁথা আর জীর্ণ মাদুর-তালাইয়ের আশ্রয়। বুড়ো বয়সের জোড়াতালি দেওয়া ঘুম ওরাই বরবাদ করে দেয়। রক্ত চুষে ওরা পেট ভরানোর পরেই ঘুমের দেবী বিছানায় এসে বিশ্রাম নেয়। তখন রাত গড়িয়ে গিয়ে বয়স বাড়ায় শরীরে। পানবরজের পাশ থেকে ভেসে আসে শেয়ালের ডাক, শিমুলগাছের ছড়ানো ডালপালার ভেতর থেকে উড়ে যায় হুতোম পেঁচা, ইঁদুরগুলো তখন ভয়ে মরে, ঠকঠকিয়ে কাঁপে জান বাঁচানোর তাগিদে।

মুনিরাম চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে এক খাবলা মুড়ি মুখের ভেতর ছুঁড়ে দেয়, ফোকলা মাড়ি দিয়ে চাপ দিয়ে পিষে দিতে চায় মুড়ির ফোলানো শরীর, মুখের লালায় পিছলে যায় আউস-চালের মুড়ি। শেষে মিইয়ে গিয়ে মিনমিনে স্বর হয়ে বেরয় মুনিরামের কণ্ঠ থেকে, গুয়ারামের কিছু খপর পেলি?

চুনারামের দুর্বল জায়গায় বুঝি পিন ফোঁটাল মুখিরাম, নিঃস্ব চোখে তাকিয়ে বুড়োটা বলল, ছেলেটার খপর বহুৎ দিন হলো পাইনি রে। ছেলেটা পরের দোরে খাটতে যাক এ আমি চাইনি! কিন্তু আজকালকার ছেলেপুলে কথা শুনল না, জেদ দেখিয়ে গেল! ইখানে আমি চিন্তায়-চিন্তায় আধখানা!

চিন্তা তো হবারই কথা! মুনিরাম কোড়ক লাগা মুরগির মতো গা ঝাড়া দিয়ে বলল, দুব্বো ঘাস যতই সোন্দর হোক সবাই তারে মাড়িয়ে চলে। কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না। বুড়োলুকদের এই মনোভাব আমি কুনোদিন মন থিকে মেনে নিতে পারিনি। চাইলে যখুন দেবে না তখন না বলে নিতে দুষ কুথায়। না বলে নিলে চুরি করা হয়। যারা মানুষ ঠকায় তাহলে তারাও তো চোর। আমি লুলারে বলেছি-দুব্বোঘাস হোস নে বাপ, বাঘহাতা ঘাসের মতো বাঁচ। যতদিন বাঁচবি, মাথা উঁচা করে বাঁচবি। কারো কাচে ছোট হবি নে। বুনো বলে যারা আমাদের ঘেন্না করে তাদের মুখে তুই ছেপ দে।

মুনিরাম কুঁকুড়ে যাওয়া গলায় বলল, জীবনে চুরি করাটাকে আমি কুনোদিন পাপ বলে ভাবিনি। আমি ভেবেচি-ওটাও একটা ধম্মো। শুধু মুনিষ খেটে, গোরু চরিয়ে, ভিখ মেঙে জীবন বাঁচে না। জীবনের জন্যি পয়সা চাই। চাঁদির জুতো হলো এমন জিনিস যা তুরে বাবু-ভদ্দর লুকদের মধ্যিখানে লিয়ে যাবে। যার পয়সা নেই তার পুড়া কপাল। মনে রাখিস চাঁদির জুতোয় কাঠের পুতুল হাঁ-করে।

–আমি এখুন উঠিরে। চুনারাম এই আলোচনায় হাঁপিয়ে উঠছিল, দলছুট বকের মতো সে যেন পালিয়ে বাঁচতে চাইছে অন্য আকাশে। অভাব তাকে কোনোদিন টেনে নীচে নামায়নি, সে আধপেটা খেয়েছে তবু কোনোদিন বিসর্জন দেয়নি ধর্ম।

কুথায় যাবি সাতসকালে? মুনিরাম অস্থির চোখে তাকাল, আমারে টুকে লিয়ে যাবি? কদিন পাকুড়তলায় যাইনি। ওখানে গেলে পরে আমার মনের জোর বেড়ে যায়। পাকুড়তলার বাতাসে কি আচে জানি নে, আমার মনে হয় আমি আরো ঢেরদিন বাঁচব। চুনারামকে চিন্তিত দেখাল সহসা, তুই অতটা পথ হেঁটে যেতে পারবি? তুর কষ্ট হবে না তো?

কষ্ট হলে আর কি হবে? ঘর যদি বুকে চেপে বসে তাহলে বাইরে গিয়ে বুকের সেই খিল ছাড়াতে হয়। লাঠিতে ভর দিয়ে মুনিরাম বহু কষ্টে উঠে দাঁড়াল।

নোলক এসে তার নড়বড়ে অবস্থা দেখে বলল, দাদু গো, আমি কি তুমার সাথে যাবো?

দরকার হবে নি। মুনিরাম এড়িয়ে যেতে চাইল।

বেড়ার কাছে এসে আগড় খুলল চুনারাম। শীতের রোদ তখনও পথের কাদা সম্পূর্ণভাবে খড়খড়ে শুকনো করে দিতে পারেনি। তখনও ঘাসের ডগায় লেগে আছে শিশিরের ছোঁয়া, বসাকগাছের পাতা ভিজে আছে শিশির জলে, পাতামাছের মতো বাঁশপাতা হাওয়ায় দুলছে টলোমলো যেন সকালবেলায় তারা চুল্লু টেনেছে ভরপেট।

কাল সকালে থানা থেকে লোক এসেছিল লুলারামকে ডাকার জন্য। জিপে নয় সাইকেলে চেপে এসেছিল মুখ চেনা পুলিশটা। লুলারাম তখন ঘুমোচ্ছিল ঘরে। হাঁক ডাকে চোখ রগড়ে বাইরে এসে দেখেছিল খাকি পোশাক পরে মূর্তিমান দাঁড়িয়ে আছে। দাঁত বের করে বলল, তোমাকে বড়বাবু ডেকেছিল। এক্ষুণি চলো।

–পায়খানা-পিসাব করব না?

-না, সে সময় আমার হাতে নেই। কাল সারারাত ডিউটি ছিল। শরীর আর চলছে না। চলো, এক্ষুণি চলল। পুলিশটার তাড়া ছিল। শরীরে ছিল রাত্রি জাগরণের চিহ্ন। পোশাকও ঢিলেঢালা। রাজ্যের অলসতায় ডুবে ছিল তার চোখ দুটো।

লুলারাম চেনা পুলিশটাকে অবজ্ঞা করতে পারল না। থানা-পুলিশ-মামলা বড়ো ঝামেলার। বড়োবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন মানে কেস জটিল। কেস জটিল হবারই কথা। ছোট কুলবেড়িয়ায় ডাকাতি করতে গিয়ে লুলারামের গুরু হাফিজ ধরা পড়ে গেল। সেই গ্যাংয়ে লুলারামও ছিল তবে সে অল্পের জন্য বেঁচে যায়। হাফিজকে গোল করে ঘিরে ফেলে গ্রামবাসী। বকুলতলায় চলে গণধোলাই। কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি। গ্রামবাসীদের পুরনো ক্রোধ হাফিজের জীবনদীপ নিভিয়ে দিল।

প্রথমে শাবল দিয়ে মেরে তার পা দুটো ভেঙে দেয়, তারপর হাঁটুর কাছে চাপ দিয়ে উল্টে দেয়। পরে মাথার ঘিলুতে ঢুকিয়ে দেয় বর্শার ডগা। ফিনকি দেওয়া রক্ত আর থামতে চায় না। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে হাফিস।

টুকে পানি দাও গো, টুকে পানি দাও। তার আর্তস্বর বাতাস বিদীর্ণ করে অনেক দূর পৌঁছে যায়। জলের বদলে সে পায় লাঠির বেধড়ক প্রহার। বকুলতলায় লুটিয়ে পড়ে সে। তার মুখে ধুলো-কাদা ঢুকে গিয়ে বীভৎস দেখায়। তাতেও ক্ষান্ত থাকে না মারমুখী মানুষ। শেষমেষ একটা বড়ো বস্তায় ঢুকিয়ে মুখ বেঁধে তাকে চাপিয়ে দেওয়া হয় গোরুর গাড়িতে। গাড়োয়ানকে নির্দেশ দেওয়া হয় কালীগঞ্জ হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে চলে আসতে।

ভোর ভোর গোরুর গাড়ি পৌঁছেছিল কালীগঞ্জের হাসপাতালে। অবনী তখন ডিউটিতে। ধরাধরি করে নামানো হল হাফিজকে। বোরার মুখ খুলে তাকে শুইয়ে দেওয়া হল আউট-ডোরের বারান্দায়। কল-বুক পড়েই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এলেন ডাক্তারবাবু। ও.টিতে নিয়ে গিয়ে আইডিন লাগানোর সময় পেলেন না তিনি। তার আগে চোয়ালের দু পাশে, নাকের ছিদ্রে রক্ত উগলে প্রাণ ত্যাগ করল হাফিজ।

খবরটা সকালবেলায় কানে গিয়েছিল লুলারামের। বাঁশঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে চোখের জল ফেলল নীরবে। হাফিজ না থাকলে তার এত বাড়বাড়ন্ত হত না। হাফিজ হাতে ধরে তাকে কাজটা শেখায়। কানে মন্ত্র দেয়। আর সতর্ক করে বলে, যে রাতে ঘরের বাইরে পা দিবি–সে রাতে মদের বোতল ছুঁবিনে ভাই। মদ আর মেয়েমানুষ দুটারে এড়িয়ে চলবি। তাহলে দেখবি এ লাইনে সিঁড়ির পর সিঁড়ি। ধনে-মানে তুর জীবন তখন কানায় কানায় ভরে যাবে।

হাফিজ ছিল শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত, খরগোসের চেয়েও চালাক তবু তার এই অন্তিম পরিণতি কোনমতে মন থেকে মেনে নিতে পারে না লুলারাম। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে কাটা খাসীর মেটের মতো নড়ে। শুকিয়ে যায় গলা। গুরুর মৃত্যুতে লুলারাম ভেঙে পড়েছিল পুরোমাত্রায়। একবার চোখের দেখাও দেখতে পেল না হাসপাতালে গিয়ে। ওখানে গেলে তার ঝুঁকি বাড়ত বই কমত না। পুলিশের লোক ঘুরঘুর করছিল সাদা পোশাকে।

কৃষ্ণনগর থেকে ময়নাতদন্ত শেষে ফিরে এসেছিল হাফিজের লাশ। পরের দিন সন্ধেবেলায় হাফিজ ভ্যানে চেপে পৌঁছে গিয়েছিল তার নিজের গ্রাম ছোট-কুলবেড়িয়ায়। তার লাশের উপর আছাড় দিয়ে কাঁদছিল মোতিবিবি। হাফিজের ছোট-ছোট ছেলে দুটো ভ্যালভেলিয়ে দেখছিল, মৃত্যুর কি রূপ সেই ধারণা ওদের মনে স্পষ্টত গড়ে ওঠেনি।

সেদিন গভীর রাতে মোতিবিবির সাথে গোপনে দেখা করে এসেছিল লুলারাম। নগদ কিছু টাকা আর ডাকাতির কিছু সোনাদানা মোতিবিবির হাতে তুলে দিয়ে কাতর হয়ে বলেছিল, ভাবী যদি কুনোদিন দরকার হয় আমাকে খপর দিও। তুমাদের জন্যি সদা-সর্বদা আমার জান-হাজির থাকবে। হাফিজ ভাইয়ের কাছে এ বান্দার জীবন বাঁধা আচে। টাকা পয়সা সোনাদানা দিয়ে এ ঋণ কুনোদিনও শোধ হবে না।

ডাকাত দেখতে কালীগঞ্জ হাসপাতালে দুপুরবেলায় ছুটে গিয়েছিল রঘু। এর আগে সে কোনোদিন ডাকাত দেখার সুযোগ পায়নি। হাফিজ ডাকাতের নাম জ্ঞানপড়ার পর থেকে সে শুনছে। মানুষটা নাকি কাঁড়া-মোষের মতন দেখতে। মাংসখেগো বাঘের মতো নাকি তার রাগ। তেজে খরিস সাপকে সে হরিয়ে দেবে। এমন মানুষের দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা। বাঁধ ধরে পইপই করে ছুটে গিয়েছিল রঘুনাথ। পাকা রাস্তা ধরে নয়, সে গিয়েছিল থানার পাশ দিয়ে। বড়ো পাকুড়গাছটার পাশ দিয়ে ঢালু পথ সোজা নেমে গিয়েছে কামারপাড়ার দিকে। কামারপাড়া শেষ হলে শুরু হয় হাসপাতালের পাঁচিল।

আউট-ডোরের সামনে বুক চিতিয়ে শুয়েছিল হাফিজ ডাকাত। বুনো মোষের মতো পেশিবহুল চেহারা, ভরাট মুখ, চওড়া কপাল। দুটো পা যেন দুটো ইলেকট্রিক খাম্বা। সেই খাম্বা কেউ ভেঙে দিয়েছে জোর করে। চামড়া ফুটো হয়ে বেরিয়ে আছে সাদা হাড়। জমাট বাঁধা কালচে রক্ত চাপ বেঁধে আছে শ্যামলা মুখে, বোজা চোখ ফুলে একেবারে কমলালেবুর কোয়া, থেতলানো ঠোঁট চিপসে গিয়েছে দাঁতে। সাদা দাঁতে লেগে আছে ঠোঁটের মাংস। রঘুনাথের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। ঘরে গিয়ে কাকাকে সবিস্তারে বলতে হবে। কাকা পথ চেয়ে থাকবে তার। রঘুনাথ বুঝতে পারল হাফিজের সঙ্গে তার কাকার দহরম মহরম ছিল জব্বর। হাফিজ ডাকাতের মৃত্যুতে বেজায় দুঃখ পেয়েছে লুলারাম।

হাসপাতালের ঘাসে ঢাকা মাঠটাতে ডাকাত দেখার ভিড় উপচে পড়ছে। ভেসে আসছে নানা মানুষের হাজার কথা। রঘুনাথের ঝাঁ-ঝাঁ করছিল কান। ভিড় কোনকালেই পছন্দ নয় তার। শুধু মেলার ভিড় তার যা ভালো লাগে।

ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে শুভ তার হাত ধরল, কখন এলি?

-এই তো। রঘুনাথ চোখ ছোট করে তাকাল, এমন মরণ চোখে দেখা যায় না। আহা রে, এভাবে কাউকে মারতে হয় বুঝি?

-হাফিজ ডাকাত ভীষণ রাগী ডাকাত। ওকে পুলিশও ধরতে পারত না।

-র