–তোমাকে চাই। সুর করে কথাগুলো বলে ওদেরই একজন খপ করে চেপে ধরল লাবণির নরম হাতটা। হ্যাঁচকা টান দিয়ে লাবণিকে জোর করে টেনে আনল নিজের কাছে। লাবণি মোড়া মারছিল মাজায় বাড়ি খাওয়া খরিস সাপের মতো।
এই নক্কারজনক দৃশ্য সহ্য হল না ফকির মোল্লার। সে হুঙ্কার দিয়ে বলল, ছেড়ে দে কাফের, নাহলে তুদের আজ খতম করে দেব। কী ভেবেছিস কী তোরা? বুড়া হয়েছি বলেই কি ইমানটা আমার বুড়া হয়ে গেছে। ভ্যান-রিকশা গড়িয়ে দিয়ে বুনো মোষের গোঁ নিয়ে তেড়ে গেল ফকির মোল্লা। ছেলে দুটো লাবণিকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে এল সক্রোধে। নিমেষে ওদের একত্রিত পাশবিক শক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ল ফকির মোলার উপর। এক সময় রাস্তার উপর শুইয়ে দিল ওকে। বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখানোর শেষ ইচ্ছেটুকু মুখ থুবড়ে পড়ল নির্জন পিচ রাস্তার উপর। গঙিয়ে উঠে বলল, বেটিরে পালা, যেদিকে মন চায় আঁধারে তুই পালা।
লাবণি পালাল না, মাথা সোজা করে দাঁড়াল। ফকির মোল্লার ডান কাঁধে ধারালো চাকু ঢুকিয়ে দিয়েছে ওদের একজন। রক্তে ভিজে গিয়েছে ওর ছেঁড়া গেঞ্জিটা। লাবণি ফকির মোল্লার কাছে ছুটে যেতে গেলে তার পথ আটকে দেয়। শেষে তাকে টানতে টানতে নিয়ে যায় রাস্তার পাশের খেতটায়। শুকনো আলসের বিছানায় তাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে শুইয়ে দেওয়া হয় কালো আকাশের নিচে। তারপর পর্যায়ক্রমে শুরু হয় ধর্ষণের মহড়া। যতক্ষণ জ্ঞান ছিল ততক্ষণ দাঁতে দাঁত টিপে নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল লাবণি। পরের দিকে নেতিয়ে যাওয়া শালুকফুলের মতো গা-হাত-পা এলিয়ে পড়ে রইল সে। তার সংজ্ঞাহীন শরীরে পর্যায়ক্রমে বিষ ঢেলে দিল সময়।
.
২২.
পরের দিন যখন জ্ঞান ফেরে লাবণির তখন সে দেখে হাসপাতালের সাদা চাদরে জ্বলজ্বল করছে তার শরীরের রক্তদাগ। অসহ্য যন্ত্রণায় থাইয়ের কাছে হাত নিয়ে যেতে পারছে না সে। শরীরের সংযোগস্থল অবশ আর ভার হয়ে আছে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তার মা তখন চোখের জলে ভাসছে। কপোতাক্ষ নিচুগলায় কথা বলছেন পুলিশ অফিসার আর ডাক্তারবাবুর সঙ্গে।
চারদিনের মাথায় হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে গেল লাবণির। সে তখন আর বাড়ির বাইরে বেরতে পারে না। তার ফর্সা মুখ কালি হয়ে আছে কলঙ্ক দাগে। গ্রামের বউরা তাকে এসে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। কেউ চাপা গলায় বলছে, ভয় নেই। বিষগুলো সব ওয়াশ করে বের করে দিয়েছে।
কেউ তার মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, মেয়েটাকে এবার পরের ঘরে পাঠিয়ে দাও বৌদি। ওর যখন বাবা নেই কতদিন তুমি আর পুষবে!
পুরোপুরি সুস্থ হতে লাবণির লেগে যায় ছমাস। এই ছ’মাসে অন্তত তিনজন পাত্র তাকে দেখে পছন্দ করে গেল। কিন্তু তারা যখন কানাঘুষোয় শুনল লাবণি ধর্ষিতা, তখন তারা আর ওদের ঘরের ছায়া মাড়াল না।
ধীরে ধীরে মন ভেঙে গিয়ে ধুলোয় লুটিয়ে গিযেছিল লাবণির। মায়ের মুখের দিকে সে তাকাতে পারত না, কষ্ট হত। তার মা আক্ষেপ করে বলত, কেন বেঁচে রইলি, মরে গেলেই বুঝি ভালো হত তোর! তুই চলে গেলে আমিও তোর পিছু নিতাম। এ জ্বালা আর সহ্য হয় না মা-বুড়োমা। দয়া করো গো, দয়া করো।
কৃষ্ণনগরে চেক-আপ-এ গিয়েছিল লাবণি। লেডি-ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে বললেন, সরি, তোমার গর্ভধারণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ইডিয়েটগুলো শুধু তোমার সতীত্ব নয়, মাতৃত্বও কেড়ে নিল!
বাস থেকে নামতে গিয়ে পা-টলে গিয়েছিল লাবণির, সারাক্ষণ নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধ করেছে সে। এই কঠিন কথাগুলো সে মায়ের কাছে কিছুতেই বলবে না। ভেঙে পড়া মানুষকে টুকরো-টুকরো করে কী লাভ হবে তার? পরাজয় অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়। মৃত্যুই হতে পারে যন্ত্রণা মুক্তির সিঁড়ি।
ব্ৰহ্মণীতলায় না নেমে কী ভেবে সে নেমে পড়ল আগের স্টপেজ কদবেলতলায়। এখান থেকে সামান্য পথ হাঁটলেই জগৎখালির বাঁধ। বাঁধের নীচে বুড়িগাঙের ক্ষীণ ধারা। সেই ধারা শেষ হলে শুরু হয় দিগন্ত সবুজ করা আখের খেত। সাহেবদের ভগ্নপ্রায় নীলকুঠিটার চারধারে বুনো আগাছার ঝোপ। সাপখোপ, পোকামাকড়ের রাজত্ব। আজ আর ঘরে না গিয়ে বিষতেলটা ওখানেই খেয়ে নেবে সে। মরবার জন্য এমন উত্তম জায়গা সে আর কোথায় পেত?
হাঁটতে-হাঁটতে নীলকুঠীর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল লাবণি। বিদুর বিড়ি খেতে এসে দূর থেকে তাকে দেখে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে ছোট পাকায় সন্দেহ। ভর-সন্ধ্যায় এ পথে তো কোন মেয়ে হাঁটে না। এ পথ দিনের বেলাতেও মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। তাহলে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসছে মেয়েটি? কাদের ঘরের মেয়ে, কী নাম ওর? বিদুর আগ্রহকে সামাল দিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়াল।
লাবণি ঝোপের পাশ দিয়ে সোজা ভয়হীন চিত্তে চলে গেল নীলকুঠীর পেছনে। ওর সাহসকে বাহবা না দিয়ে পারল না বিদুর। পা টিপেটিপে সেও লাবণিকে অনুসরণ করল।
কিছু দূর এগিয়ে লাবণি চারপাশ দেখে নিয়ে হাতের ব্যাগটা অবজ্ঞা ভরে ছুঁড়ে দিল ঘাসের উপর। তারপর ঝাঁকুনি দেওয়া শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেল ব্যাগের কাছাকাছি। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে, দু’হাত বিছিয়ে শরীরের ভার আলগা করে বসে পড়ল ঘাসের উপর। ব্যাগ খুলে নতুন একটা কৌটো হাতে নিয়ে সে কাঁদল অনেকক্ষণ। প্রথমে ফুঁপিয়ে, তারপর সশব্দে। অন্ধকার চিরে বাতাস বয়ে আনল তার কান্না। বিদুরের যুবক হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠল নিমেষে। এবার সে স্পষ্ট বুঝতে পারল মেয়েটির নিরালায় আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।
