ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গিয়ে জু’নেওয়া ছাড়া কোনো কাজ রইল না বিদুরের। পুরো নদীয়ায় তখন আন্দোলনের হাওয়া দমকা বাতাসের রূপ নিয়ে এদিক সেদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। এই অবস্থায় কুশল মাস্টারের সাথে আলাপ হল বিদুরের। মানুষটাকে প্রথম দর্শনেই মনে ধরে গেল তার। তার মূর্খ বাবা যে ঢঙে কথা বলত, শিক্ষিত কুশল মাস্টার সেই কথাগুলোকে অন্যভাবে প্রকাশ করল। ভাষার মানে এক, শুধু পরিবেশন ভঙ্গিটাই যা আলাদা।
পার্টির মিটিং-এ কপোতাক্ষর সঙ্গে পরিচয় হল বিদুরের। মানুষটার মন গঙ্গার জলের চাইতেও পবিত্র। কারোর কাছে মাথা নত করা নয়, বুক ফুলিয়ে মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়াই তার আসল উদ্দেশ্য। তর্ক এবং তথ্যের কচকচানী দূরে সরিয়ে বিদুর নিজের মতো কবে পার্টির ভাষাকে বোঝার চেষ্টা করল। পার্টির ভাষাকে শ্ৰম-শ্রদ্ধা এবং আনুগত্যে সে করে ফেলল হৃদয়ের ভাষা। আর হৃদয়ের ভাষা, যুক্তির স্রোতকে বাইরের কঠিন সমাজ মেনে নেবে কেন? শুরু হল আবেগহীন মানুষের সঙ্গে হৃদয়বান মানুষের সংঘাত।
সেই সংঘাত, দ্বন্দ্ব এখনও অব্যাহত। বিদুর এখন আর একা নেই, তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে লাবণি। লাবণি তার শ্বাস-প্রশ্বাস, আন্দোলনের ইনকিলাব ধ্বনি। নিঃসন্তান লাবণি এই গণ-আন্দোলনকে ধরে নিয়েছে তার সন্তান।
বাঁধের ধারে এই মাটির ঘরখানায় আলো-বাতাস আসে যথেষ্ট। বর্ষায় এই ঘরের দাওয়ায় শুয়ে শোনা যায় ছাড়াগাঙের হুঙ্কার। এখন জল সরে গিয়ে পুরো মাঠ হিল- হিল করছে হাওয়ায়। পুরুষ্ট আখগাছ তার ছিপছিপে শরীর নিয়ে কোমর দোলাতে ব্যস্ত।
শীতের এই সময় ধুঁধুঁলগাছে ফুল আসে। তিতা ধুঁধুঁলের ফুলগুলো গাঢ় হলুদ রঙের। ঘরের চালে ওরা সংসার বিছিয়েছে পরম মমতায়। খরানীকালে এই লতাগাছ শুকিয়ে একেবারে নিপ্রাণ বাবুইদড়ি। এখন হলুদ ফুলে সেজে উঠেছে ওর সবুজ দেহ। সেদিকে তাকিয়ে লাবণি আর চোখ ফেরাতে পারে না। কচি-কচি ধুধুলগুলো তার মনে লাভের জন্ম দেয়।
মিঠে ধুঁধুঁলের তরকারি খেতে বড়ো সুস্বাদু। ঝিঙের যেমন পোস্ত দরকার ধুধুলের শুধু আলু হলেই কিস্তিমাত। কিন্তু অত সাধ করে রাধা রান্নাটা মাঠে মারা গেল। যাকে ভেবেছিল মিঠে ধুপুঁল সেগুলো একেবারে তিতার তিতা। ফলে দুপুরবেলা পুরো তরকারিটাকে ফেলে দিতে হল লাবণির।
ওই সুন্দর ধুঁধুঁল গাছটার উপর তার বেশ অভিমান হল। যে গাছ মানুষের উপকারে লাগে তার কি দাম? মাকালফলে চোখ ভরে কিন্তু মন ভরে না। বিদুর বলেছিল, আহা, গাছটাকে দোষ দিয়ে কী হবে? প্রকৃতি সবাইকে একরকম সাজ পরায় না। এখানে লঙ্কা গাছের পাশে তেঁতুলগাছও থাকবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
লাবণি কি যেন বলতে যাবে ভাবছিল, হঠাৎ সাইকেলের ঘটাং-ঘটাং শব্দ পেয়ে সে মুখ তুলে দেখল কপোতাক্ষ ঘেমে-নেয়ে একসা হয়ে নেমে আসছেন বাঁধের নিচে। হঠাৎ লাবণির কী হল, সে চিৎকার করে বলল, ওগো শুনছো, দেখো কে আসছে! কপোতাক্ষ এগিয়ে এলেন ঘরের কাছাকাছি, সাইকেলটা আমড়াগাছে হেলান দিয়ে বিদুরের দিকে তাকালেন, কেমন আছো বিদুর? অনেক দিন তোমার কোনো খবর পাইনি। তাই আজ কাজ পড়তেই চলে এলাম।
স্বভাব সুলভ হেলে উঠল বিদুর, আপনি এসেছেন ভালোই হল। এ তো আমার কাছে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির সমান। তা দাদা বলুন। একটু লাল চা হয়ে যাক। চায়ের অনুরোধে ইতস্ততবোধ করলেন কপোতাক্ষ, এই মাত্র গোবিন্দর দোকান থেকে চা খেয়ে এলাম। তবে তোমার যদি খেতে মন হয় করতে বলো। চায়ে আমার অরুচি নেই। কপোতাক্ষ থামলেন, লাবণিকে বলো ও যেন একটু বাইরে আসে। আমার হাতে সময় কম। কালীগঞ্জে কয়েকটা কাজ সেরে আমি মানিকডিহি ফিরব।
লাবণী এল। পরনের শাড়িটা সে বদলে এসেছে। বাইরের লোকের সামনে অমন ছেঁড়াফাটা শাড়ি পরে আসা যায় না। সঙ্কোচবোধ হয়। কপোতাক্ষ তার অনেক দিনের পরিচিত। তখন প্রায় হরিনাথপুরে আসতেন। লাবণির বাবার সঙ্গে ওঁর আলাপ ছিল। বাবার মৃত্যুর পর কপোতাক্ষ আর লাবণিদের বাড়িতে আসেন নি। আসতে ভালো লাগত না।
খাটিয়ায় বসে কপোতাক্ষ আগামী মিটিংয়ের কথা ওদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। একটা ছাপানো রসিদ বই বিদুরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, চাঁদা না উঠলে কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে হবে না। আমি পুরঞ্জন ভটচাযের কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছি। তোমার উপর পুরো হরিনাথপুর কালীগঞ্জ কামারী আর অনন্তপুরের দায়িত্ব থাকল। ঘরে বসে থাকলে পার্টির কাজ এগোবে না। আমাদের মানুষের কাছে যেতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে। সবাই যে আমাদের আদর্শকে গ্রহণ করবে এমন নয়। দশজনের কাছে গিয়ে যদি একজন আমাদের আদর্শকে গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে আমাদের চরম লাভ। বিদুর সঙ্কোচ কাটিয়ে বলল, দাদা, সবই তো বুঝলাম কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনতে চায় না। মানুষের মধ্যে শ্রেণী সচেতনতার অভাব। সামাজিক বৈষম্য কুরে কুরে খাচ্ছে তবু ওরা নীরব।
কপোতাক্ষ নীরব হাসলেন, ওদের ঘা মেরে বাঁচাতে হবে। ওদের জাগাতে হবে। মানুষকে যদি আমরা সচেতন করতে না পারি তাহলে আমাদের আন্দোলন বৃথা হয়ে যাবে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের তাদের মতো করে কথা বলা শিখতে হবে। এরা মাকর্স লেনিন বোঝে না। এরা মানুষের ভাষা ও মন বোঝে। এদের মনে একবার ঠাঁই করে নিলে আমাদের আন্দোলন আয়ুস্মান হবে।
