সদরে গিয়ে ফটো তুলল রামায়ণ। বুকের দোষ হয়েছে তার। ফুসফুসটা কেটে দিয়েছে যক্ষা পোকায়। রোগটা ভালো নয়। ওষুধ খেতে হবে, সেই সঙ্গে পথ্য। ডিম-দুধ-মাছ-মাংস আরও কত কি! খেতে মন চায় কিন্তু টাকা কোথায়? ফলে দিনে দিনে নেতিয়ে গেল রামায়ণ। ফি-কাশিতে কফের সঙ্গে উঠে এল রক্ত। শেষে কোয়াশের দু’পাশে জড়িয়ে গেল চাপচাপ রক্ত।
একদিন দুপুরবেলায় শ্বাস আটকে গেল রামায়ণের। একটা প্রতিবাদের মৃত্যু হল খড়ের ঘরে। বিদুরের তখন জ্ঞান পড়েছে, সে বুক চাপড়ে কাঁদল গণেশির সঙ্গে গলা মিলিয়ে।
যে যায় সে কিছু না কিছু রেখে যায়।
বিদুর আট ক্লাস অব্দি পড়ে আর ইস্কুলের চৌকাঠ মাড়াল না। মা মুড়ি ভাজবে, তালাই বুনবে, পরের দোরে কাঁথা সেলাই করবে–এসব পছন্দ হত না তার। সে গলা ফাড়িয়ে বলত, কেনে যাবি পরের দোরে? খেজুর পাতার ঝাড়ু বানা। আমি হাটে নিয়ে গিয়ে বেচব।
রামায়ণ রেগে গেলে বলত, পেট কি ঘরে রেখে আসব বাবু: মজুর খাটাবেন, আর মজুরদের পেটের কতা ভাববেন না-তা কি হয়? বিড়ি-মুড়ি দুটোই চাই জলখাবারে। যদি না দেন তাহলে এই আমরা হাত গুটিয়ে আলের উপর বসে রইলাম।
কোদাল চালাতে গিয়ে একবার পা কেটে গিয়েছিল রামায়ণের, বাবু তার চিকিৎসার খরচাপাতি দেবেন না-রামায়ণ এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ল। পরের দিন বাবুর লেঠেল এসে মাথা ফাটিয়ে দিল তার, বিদুর কাঁপা কাঁপা চোখে সব দেখল। বাবু জাতটা তার রক্তে উঁচ হয়ে ঢুকে গেল।
গণেশি কাতর হয়ে তার ঘরের মানুষটাকে বলত, ওগো, তুমার দুটা পায়ে ধরি ছেলেটার মাথা আর খেও না। নিজের তো সব্বোনাশ করেচো–ওর আর সব্বোনাশ করো না।
ততদিনে বিদুরের মনের ভেতর ভূমিকম্প ঘটে গিয়েছে। লাঙল যার জমি তার কথাগুলো উড়ে এল বিভিন্ন গ্রাম থেকে। পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ সব এক হও। জোতদারের কালো হাত ভেঙে দাও খুঁড়িয়ে দাও। ইন কিলাব জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ! বাসের হেল্পারি করে বিদুর ভেবেছিল অভাবের রথটাকে থামিয়ে দেবে কিন্তু হল না। অভাবের হাজার থাবা। সে থাবাও বেড়ালের থাবার মতো লুকানো এবং রহস্যে ভরা।
বিদুরের মনে পড়ত বাবার হাতে ধরে নীলকুঠির ধারে বেড়াতে যাওয়ার কথা। বাঁধের একপাশে ইতিহাসের কঙ্কাল হয়ে, দাঁড়িয়েছিল জঙ্গলে ঘেরা নীলকুঠি। রামায়ণ তর্জনী তুলে বলত, ওই দেখ, ওই কুঠিটায় লালমুখো সাহেবরা তোর ঠাকুরদাকে বেঁধে চাবুক মারত। তুই বড়ো হয়ে এই নীলকুঠি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিস। ওর হাওয়া-বাতাসে পাপ মিশে আচে, সাবধান।
বাপের কথাগুলো ওই বয়সে সঠিক বুঝতে পারত না বিদুর, সে শুধু ভ্যালভ্যাল করে তাকাত, তার চোখে ছড়িয়ে পড়ত ক্রোধের আগুন, সে পাগলের মতো হাঁপাত, আর খোঁচা খাওয়া জন্তুর মতো ধুকত ক্রমাগত।
রামায়ণ ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেত, কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলত, নিজেকে সামলা। নিজেকে সামলানো বড়ো কঠিন রে! আমি পারিনি, তুই যেন পারিস বাপ।
হরিনাথপুরের আবহাওয়ায় হাঁপিয়ে উঠেছিল বিদুর, কৃষ্ণনগরের বাস-লাইনের বন্ধু তাকে পরামর্শ দিল কোলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার। প্রথমে প্রস্তাবটা শুনে বিরক্ত হল বিদুর, পরে মন শান্ত হতে সে ভেবে দেখল-কালীগঞ্জের মজুরখাটা জীবন তার জন্য নয়। সবার দ্বারা সব কাজ হয় না। রামায়ণ পারে নি এই সমাজের কিছু মানুষকে মেনে নিতে। ওদের শক্তি ছিল, সামর্থ্য ছিল কিন্তু সর্বোপরি ওদের কোনো মনুষ্যত্ব ছিল না। মনুষ্যত্বহীন মানুষের সঙ্গে বিবেকবান মানুষের যে সংঘাত, দ্বন্দ্ব থাকবে এ নিয়ে তার কোনো মতান্তর ছিল না। শেষ পর্যন্ত সমাজের যাঁতাকলের কাছে হার স্বীকার করতে হয়েছিল রামায়ণকে। বাবার এই পরাজয় বিদুর মন থেকে মেনে নিতে পারে নি। সে দু-একবার প্রতিবাদে মুখর হয়েছে কিন্তু তার সেই প্রতিবাদকে ভোঁতা করে দিয়েছে সমাজযন্ত্র।
গণেশিও ছেলের উপর বিরক্ত। ঘরের মানুষটার মৃত্যু তাকে অসহায় করে তুলেছে দিনকে দিন। কাতর হয়ে সে বিদুরকে বুঝিয়েছে, জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াইয়ে নেমে তুই পারবি নে, বাপ। তুর বাপ অসময়ে যেত নি, তার জেদ তাকে শ্মশানঘাট অব্দি নিয়ে গেল।
আট-ক্লাস পড়া বিদুর মায়ের মুখের উপর কোনো কথা বলে না। সে জানে মাকে বোঝনো এ জীবনে তার পক্ষে সম্ভব নয়। যে মহিলা সারাদিন মুড়ি ভেজে, ফাইফরমাশ খেটে বেড়ায় পরের দোরে তার পক্ষে স্বাধীনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিছু কিছু রক্ত থাকে যেখানে বশ্যতাকে ভাবা হয় অন্ধকার।
বিদুর তর্কের পথে হাঁটল না, কৃষ্ণনগরের বন্ধুর সাথে সে চলে গেল কোলকাতায়। আর যাইহোক কোলকাতায় তাকে ভিক্ষে করে খেতে হবে না। বড়ো শহরের বড়ো বুক। তার মন সংকীর্ণ নয়, খোলা মাঠ।
একটা চামড়ার কারখানায় বিদুর তার রুজি-রোজগারের সন্ধান পেল। সারা দিন কাজে ডুবে থাকা, সন্ধে হলে বস্তির ঝুপড়ি ঘরে ফিরে আসা। সময় চতুর হরিণের মতো পালিয়ে যেত কোথায়। ট্রামের ঘড়ঘড় আওয়াজ যেন বাঘের গোঁ-গোঁ আর্তনাদ, মানুষের সমুদ্রজোয়ার কোলাহল বিদুরকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত কালীগঞ্জ-হরিনাথপুর-ব্ৰহ্মণীতলার রাস্তায়। প্রায়ই মনে পড়ত বাবার কথা। শোষণের কালো হাত, বৈষম্যের চোখ রাঙানী তাকে সরাসরি যুক্ত করে দিল শ্রমিক-আন্দোলনের সঙ্গে। বিদুর কোথায় থামতে হয় জানত না, তার আবেগই তাকে শেষ করে দিল। পুলিশের ফাঁদে তাকে ধরা দিতে হল শেষে। জেলের মোটা চালের ভাত যে তার জন্য নয়–এটা বুঝতে পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে পালিয়ে এল কালীগঞ্জে। কোলকাতায় থাকলে মালিকপক্ষের পোষা গুণ্ডারা তার প্রাণপাখিকে যে কোনো সময় লুটিয়ে দিত রাজপথে।
