অমায়িক হাসলেন কপোতাক্ষ, এখনও জেলা পার্টির কোনো সিদ্ধান্ত আমরা জানতে পারি নি। যদি জানতে পারি আপনাকে এসে জানিয়ে যাবো।
পুরঞ্জন বললেন, তোমাদের পার্টি খুব শৃঙ্খলাবদ্ধ। আমার বিশ্বাস তোমরা এবার যোগ্য প্রার্থী পঞ্চায়েতে দাঁড় করাবে। আমি চাই লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হোক। অনেকদিন তো হল–একঘেয়ে ডাল-ভাত খেয়ে চলেছি। এবার একটু মুখ বদলানর দরকার।
পুরঞ্জন ভট্টাচার্য এ এলাকার বিশিষ্ট মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সততা, মানবপ্রীতি কারোর নজর এড়িয়ে যায় না। এমন দরাজ মনের মানুষ প্রতিদিন সন্ধেবেলায় সিন্সিল রিডের হারমোনিয়াম নিয়ে বসেন সংগীত সাধনায়। শ্যামাসংগীত তার কণ্ঠে বেড়ার উপর লতিয়ে যাওয়া ঝিঙেলতার চেয়েও সুন্দর। সন্ধেবেলায় ব্রহ্মাণীতলায় পরিচ্ছন্ন এক আধ্যাত্মিক-ভাবের জন্ম হয়, যার সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং পুরঞ্জন ভট্টাচার্য। কপোতাক্ষর তাড়া ছিল। পুরঞ্জন ভট্টাচার্যের হাতে চাঁদার রসিদটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, দাদা, কালীগঞ্জ বাজারে মিটিং আছে, বাইরে থেকে ডেলিগেট আসবেন, আপনার কিছু সাহায্য দরকার।
–অবশ্যই, অবশ্যই। চাঁদার রসিদটি ধরে তিনি টাকার অঙ্কে চোখ বোলালেন, তুমি একটু বসো। আমি ঘর থেকে টাকাটা এনে দিচ্ছি। তোমাকে চাদা কেন দেব জানো? তোমার অ্যাক্টিভিটি আমার ভালো লাগে। আমি পার্টি দেখি না। যে পার্টি মানুষের কল্যাণ কামনা করে, মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায়–আমি সেই দলকে সমর্থন করি। তুমি একটা নতুন ধারা, নতুন আদর্শের আবির্ভাব ঘটাচ্ছ এই গ্রামে। আমি জানি না-তুমি কতদুর সফল হবে। তবে আমার পূর্ণ সমর্থন তোমার উপর রইল। ভগীরথ মর্ত্যে গঙ্গাদেবীকে এনেছিলেন, তুমি আমাদের গ্রামে এই নতুন আন্দোলনের ভগীরথ। ভাবীকাল নিশ্চয়ই তোমাকে মনে রাখবে।
পুরঞ্জন ভটচার্যের সঙ্গে কথা বলে উৎসাহিত হন কপোতাক্ষ। এমন উদার মনের মানুষ গ্রামসমাজে খুব কমই চোখে পড়ে। এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা হলেও এরা যে যে-কোন গ্রামের মেরুদণ্ড এবং মানদণ্ড এ বিষয়ে কপোতাক্ষর কোনো সন্দেহ নেই।
কদবেলতলা চায়ের দোকানে বিদুর রাজোয়ারের দেখা পেলেন কপোতাক্ষ। সাইকেল ঠেলে সোজা তিনি পাড়ার মধ্যে ঢুকে গেলেন। জগৎখালি বাঁধের ধারে ছোট ছোট ঘরগুলোয় হাজার বিক্ষোভ অবজ্ঞা বঞ্চনা যেন শুকনো বারুদের মতো জমে আছে। বিদুর রাজোয়ারের মতো মানুষ এই বারুদে দেশলাই ঠুকে দিলে যে কোনো মুহূর্তে আগুন ধরে যেতে পারে। তবে আন্দোলনের কাজে বিদুরের সাহসিকতা এবং সংযম সম্ভ্রমের দাবীদার। সে সহসা কারণ ছাড়া উত্তেজিত হয় না, আর উত্তেজিত হলে সহজে তা ঠাণ্ডা হতে চায় না।
ছোট থেকেই বিদুর অভাব, অসাম্য আর বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছে। তার এ লড়াই এখনও শেষ হয় নি। নিজের জীবনকে এই লড়াইয়ে বাজি রেখেছে সে। বিদুরের বাবা রামায়ণ ছিল খেতমজুর। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তার সংসার খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলত। আসলে খেতমালিকরা দিনভর খাটিয়ে নিয়ে পারিশ্রমিক দিতে চাইত না। গরিবের হাতে পয়সা তুলে দেওয়ার অর্থ কিছুটা হলেও তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া। স্বাধীনতার এত বছর পরে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। এসব ভেক কথায় মন গলত না রামায়ণের। সে কাজের বিনিময়ে নগদ অর্থ আশা করত। বাবুরা এই সহজ শর্তে রাজী নয়, ফলে তাদের ধানাই-পানাইয়ের শেষ নেই। ন্যায্যপ্রাপ্তি না হলে সে বাবুদের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নেমে যেত। একটা খেতমজুরের এত সাহস আসে কোথা থেকে? পেটে মারলে মাথা ঝিমাতে বাধ্য। আর ঝিমধরা শরীর নিয়ে মাঠের কাজ হয় না।
হতাশা রামায়ণকে কুরেকুরে খাচ্ছিল। গণেশি তাকে বোঝাল, ওভাবে ঝিম ধরে বসে থেকো না। কুঠিয়া গতর উইয়ে খায়। বসা দেহে ধসা হয়। কাজের মধ্যি ডুবে যাও গো.. দেখবা কতো আরাম, কতত শান্তি।
-কাজ দিলে তো কাজে যাব! রামায়ণের গলায় হতাশা, বাবুরা সব যুক্তি করে আমাকে হেঁটে দিয়েছে। আমি কি করব? সব আমার পোকাড়ে ভাগ্য।
-যাও, বাবুদের কাছ থেকে মাফি মেঙে আসো।
-না। উটি আমার দ্বারা হবে নি। গণেশির প্রস্তাবে প্রতিবাদে ভেঙে পড়ে রামায়ণ, না খেয়ে মরব সে-ও ভালো তবু যে ছেপ ফেলে দিয়েছি তা আবার লোতুন করে চাটব না। আমি এক বাপের বাচ্চা….।
ঘরে বসে ভাবনা হয় কিন্তু পেটের দানা জোটে না।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস-ঘরে বেকার বসে থাকে রামায়ণ। তার বিড়ির নেশা বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে গাঁজার কলকে তার জামার পকেট থেকে খুঁজে পায় গণেশি। বুক ছ্যাৎ করে ওঠে ভয়ে। মাঠের কাজ হারিয়ে মানুষটা এখন পাগলপারা। দিন-রাত শুধু খাক-খ্যাক করে কাশে। দলা দলা কফ ছুঁড়ে দেয় ধুলোয়। একবার কাশি শুরু হলে আর থামতে চায় না। ভ্যাসভেসে আওয়াজ ওঠে বুক কাঁপিয়ে।
কালীগঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তার বললেন, কাশিটা ভালো মনে হচ্ছে না। বুকের এক্স-রে করা দরকার।
কালীগঞ্জে এক্স-রে মেশিন নেই ফলে বুকের ফটো তোলা যাবে না। ফটো তুলতে গেলে কৃষ্ণনগরে যেতে হবে। কৃষ্ণনগরে যেতে গেলে টাকার দরকার। ফটো তোলার পয়সা, বাসভাড়া আসবে কোথা থেকে? চিন্তায় গণেশির মুখ শুকিয়ে গেল। অবশেষে গলার হার, হাতের কলি স্যাকরা-দোকানে বেচে দিল সে।
