-আশ্চর্য তো!
–আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক। মীনাক্ষীর ঠোঁট শক্ত হয়ে উঠল। কপোতাক্ষ আর কথা বাড়ালেন না, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি চমকে উঠলেন। হরিনাথপুরের কদবেলতলায় যেতে হবে তাকে। রোদ উঠে গেলে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে কষ্ট হয়। হাঁটু দুটোয় ব্যথা হয়। দিনরাত সাইকেল চালানোর দায়ভার হাঁটু দুটো বুঝি নিতে পারছে না।
কপোতাক্ষ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। প্রতিদিনের মতো আজ আর মীনাক্ষী গেট খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেন না। কপোতাক্ষ একবার পেছন ফিরে তাকালেন। মাটির রাস্তায় গাছের জড়াজড়ি ছায়া ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।
হরিনাথপুরের ব্ৰহ্মণীতলা সব সময় জমজমাট। পুরনো বটগাছের ছায়ায় জায়গাটা শীতল হয়ে থাকে। এখন বটের পাকা ফল নজরে না পড়লেও দল বেঁধে টিয়া আর হরিয়াল পাখি এসে বসেছে গাছের ঝাঁকড়া ডালে। বিশেষ করে দুপুরবেলায় ওদের কিচিরমিচির হাট বসে।
সাইকেল চালিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন কপোতাক্ষ। শীতের রোদ নরম হলেও মেজাজ ধানী লঙ্কার মতো। সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে কপোতাক্ষ গোবিন্দর চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালেন
গোবিন্দর অদ্ভুত গড়ন, ওর চেহারা সার্কাস দলের জোকারদের মতন। লম্বায় সে চারফুট দুই ইঞ্চি, হাত-পা ছোট ছোট, অনেকটা শিলনোড়ার মতো। এ এলাকায় তার চলতি নাম হল ঘুঁটে। গোবিন্দ খুঁটে।
গোবিন্দ ঘুঁটের চায়ের দোকান ব্ৰহ্মাণীতলার গর্ব। শুধু চা নয়, সঙ্গে টায়েরও ব্যবস্থা রেখেছে গোবিন্দ। সকালে ঘুঘনি, বিকেলে গরম-গরম চপ-পিঁয়াজি হরিনাথপুরের মানুষকে সামান্য হলেও শহুরি ছোঁয়া পাইয়ে দেয়। গোবিন্দ গর্ব করে বলে, আমার চায়ের সাথে পিঁয়াজি সোনার সাথে সোহাগা। ঘুঘনি-মুড়ি হল গিয়ে খাঁটি সোনা, কোনো ছল-চাতুরী ভেজাল পাবে না।
কপোতাক্ষ গোবিন্দর চায়ের দোকানের বেঞ্চিটায় গিয়ে বসল। কিছু দূরে কদমগাছের পাতায় শীতের রোদ এসে গায়ে পড়া মেয়েছেলের মতো ঢলে পড়ছে। কপোতাক্ষ দোকানীর দিকে চোখ তুলে তাকালেন, আজ কাগজ আসেনি?
–আজ্ঞে না বাবু। গোবিন্দ জড়োসড়ো চোখে তাকাল। এত ছোট দোকান। ফলে খবরের কাগজ রাখার কোনো মানে হয় না। তবু লোক এসে তার দোকানে খবরের কাগজের খোঁজ করে।
বাঁধের ধারে সুনীতি ডাক্তারের চেম্বার। ডাক্তারবাবুর খবরের কাগজটা বাসওয়ালা এখানেই সুতলি বেঁধে ফেলে দিয়ে যায়। সেই কাগজ কুড়িয়ে এনে মন দিয়ে পড়ে গোবিন্দ। তার অবশ্য বিদ্যাবুদ্ধি বেশি নেই তবু সে রাজনীতিটা মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করে।
খাদ্য-আন্দোলনের রেশ শুকিয়ে গেলেও এখনও তার রেশ ছেয়ে আছে দেশগাঁয়ে। এক জেলার চাল আর এক জেলায় যাবে না। জোর কর্ডনিং। পুলিশী হুজ্জোতির কথা প্রায় শোনা যাচ্ছে। হরিনাথপুরে বসে শহর এবং শহরতলির খবর পেয়ে যাচ্ছে গোবিন্দ। তবু এত কড়াকড়ির মধ্যে সন্ধের আঁধারে বস্তা ভর্তি চাল পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। মুর্শিদাবাদের চাল লালগোলা ট্রেনের সিটের তলায় বস্তাবন্দী হয়ে চলে যাচ্ছে শিয়ালদা-কোলকাতায়। রোজ কত নতুন নতুন গল্প জন্ম হচ্ছে খবরের কাগজের পাতায়।
গোবিন্দর চায়ের স্বাদ মন্দ নয়।
সার্কাস দলের জোকার চা-বানানোটা শিখেছে ভালো। চামচ দিয়ে ওর চিনি গোলার কায়দাটা ভারী আজব। যতক্ষণ না ফেনা উঠছে গ্লাসে–ততক্ষণ রেহাই নেই কারোর।
চা-খেয়ে দাম মিটিয়ে কপোতাক্ষ বললেন, আচ্ছা গোবিন্দ, বিদুর রাজোয়ারকে দেখেছো নাকি?
-না বাবু, সকাল থেকে তার দর্শন তো পাই নি! গোবিন্দ অনুগত তাকাল।
কপোতাক্ষ কী ভেবে বললেন, আমি ওর বাড়ি যাচ্ছি। যদি বিদুর রাজোয়ারের সঙ্গে তোমার দেখা হয় তাহলে আমার কথা বলো। বিশেষ কাজ আছে। ও যেন সত্বর বাড়ি ফিরে যায়।
চা-দোকানের এই এক ঝামেলা। গোবিন্দ মনে মনে বিরক্ত হলেও তার প্রকাশ বাইরে প্রতিফলিত হয় না। তথ্যকেন্দ্র না বলে মানুষ কেন যে চা-দোকান বলে একথা গোবিন্দর মাথায় ঢোকে না।
রাস্তা দিয়ে হাজার মানুষ যায়, তাদের হাজার কথা। দোকানেরও নিজস্ব কিছু কথা থাকে। সব কথা এক সাথে মিলেমিশে খিচুড়ির আকার ধারণ করে। তখন আসল কথাটাই ভুলে যায় গোবিন্দ। ভুলে যাওয়ার একটাই অর্থ-ঝগড়া অশান্তি বিবাদ।
গোবিন্দ জ্ঞানত এখন আর কোনো ঝুট ঝামেলায় জড়াতে চায় না। ঝামেলা মনের শান্তি কমায়। আর শান্তি কমলে আয়ু কমে যায় মানুষের।
চারফুট দশ ইঞ্চির খেলায় হায়ার যেত গোবিন্দ। দশ-বারো বছরের বালকদের বিরুদ্ধে পঁয়ত্রিশ বছরের বুড়ো ভাম খেলতে নামত। ওর পায়ে বল পড়লেই গোল। পঁয়ত্রিশ বছরের হাড়ের সঙ্গে বারো বছরের কচি হাড় কি পারে কখনো? ফলে ফুটবল ম্যাচ নিয়ে তীব্র অশান্তি। গ্রামে গ্রামে কাজিয়া-মারামারি। সব শেষে থানা-পুলিশ- হাসপাতাল। এসব শুকনো অশান্তির মূলে গোবিন্দ খুঁটে।
পুরঞ্জন ভট্টাচার্যের টালির ঘরটা ব্রহ্মাণীতলায়। তার শ্যাওলা ধরা টালির চালে মাধবীলতার বংশ আরাম করে শুয়ে আছে। বাতাস এসে মাঝে মাঝে তাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়।
কপোতাক্ষ পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে পুরঞ্জনের চোখে ধরা পড়ে গেলেন।
-কী হে নেতা, আমাকে যে না দেখেই চলে যাচ্ছো! পুরঞ্জন ভট্টাচার্য সরল হাসিতে কপোতাক্ষর পথ আটকে দাঁড়ালেন, চলো, আমার টালির ঘরে সামান্য জিরিয়ে যাবে। কতদিন এদিকে তো আসো নি। এবার পঞ্চায়েত ভোটে তোমরা নিশ্চয়ই প্রার্থী দেবে?
