-সত্যি? দ্বীপীর আকাশছোঁয়া আগ্রহ দেখে সূর্য বলল, গুড়াখু দিয়ে দাঁত মাজলে নেশা হয়। মাথা ঝিমঝিম করে। গা পাক দেয়। কারোর আবার বমি হয়। দ্বীপী গুড়াখু মুখে ঢুকিয়ে তর্জনী দিয়ে মাজতে মাজতে বলেছিল, আমার কি হবে না। সিগারেট খেয়ে আমার মাথা ঘোরা তো দূরে থাক-একটু পা-ও টলেনি।
-এত সাহস ভালো নয়। দ্বীপীকে সতর্ক করেছিল সূর্য, ফেলে দে, ফেলে দে বলছি। মাথা ঘুরে গেলে কে তোকে সামলাবে শুনি।
-কেন, তুই তো আছিস, তুই আমাকে দেখবি না?
সূর্যাক্ষ কোনো কিছু বলার আগে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল দ্বীপী, এক সময় বসে থাকার ক্ষমতাও তার নিঃশেষ হল, সাটপাট হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিল সে। সূর্যাক্ষ দেখল দ্বীপীর চোখের কোণে থেঁতো হয়ে যাচ্ছে জলকণা, বড়ো অসহায় দেখাচ্ছে তার সুন্দর মুখখানা।
প্রায় আধ ঘণ্টা এভাবেই কেটে যায়, দ্বীগী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আবার উঠে বসলে সূর্যাক্ষ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দ্বীপী তার বদলে যাওয়া মুখের আদল দেখে বলল, বড্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম তাই না? তবে আমি জানতাম আমার কিছু হবে না। কেন জানিস?
-না। সূর্যাক্ষ ঘাড় নাড়ল।
দ্বীপী সতোর সঙ্গে বলল, তুই আমার সঙ্গে থাকলে যমরাজও আমার কিছু করতে পারবে না। তুই আমার শক্তি, তুই আমার আলো। কথা হারিয়ে দ্বীপী তার নীচের ঠোঁটটায় দাঁত বসিয়ে দিল আনমনে।
সম্পর্কের কদমগাছে কবে যে ফুল ধরেছে একথা কেউ জানত না। জীবনের কোনো এক বর্ষায় ওরা দেখল আষাঢ়ের জলবাহী মেঘ আগামী দিনের স্বপ্ন হয়ে ঝুলে আছে মাথার উপর। জলীয় আবহাওয়ায় এখন কদমগাছের ভরা সংসার। গাঢ় সবুজ রঙের চওড়া পাতাগুলো যেন কোনো এক অদেখা রাজকুমারীর মুখ। ফুলগুলো সব সুখের চিহ্ন হয়ে ঝুলছে। কোনো কোনো ফুলের আয়ু দীর্ঘস্থায়ী হয়।
০৫. পার্টির মিটিং
২১.
তিনদিন পরে পার্টির মিটিং কালীগঞ্জ বাজারে, দেবগ্রাম থেকে মীর মহম্মদ আসবেন ভাষণ দিতে–এসব নানা কারণে কপোতাক্ষবাবুর আর সময় নেই সংসারের দিকে নজর দেওয়ার। দিন রাত ঝোলা কাঁধে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন পার্টির চাঁদা তোলার জন্য। মাইক-লাইট-মঞ্চের পেছনে খরচ আছে। এত টাকা জোগাড় হবে কোথা থেকে? চিন্তায় কপোতাক্ষবাবুর মুখমণ্ডল ভার হয়ে আছে।
ঘর থেকে বেরনোর সময় মীনাক্ষী বেজার গলায় বলেছিলেন, যাচ্ছ যাও, তবে দুপুরে খাবে কী না বলে যেও। রোজ রোজ ভাত নষ্ট করতে গায়ে লাগে। ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে কপোতাক্ষ বলেছিলেন, দশের কাজে গেলে কখন ফিরব আমার সে খেয়াল থাকে না। কাজের সময় খাওয়ার কথাও মনে থাকে না।
এত দৌড়ঝাঁপ করে কি পাচ্ছ তুমি? গ্রামের মানুষ তো তোমাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। বড়দাও তোমার ওপর অসন্তুষ্ট। তিনি তো মুখের ওপর বলেন ছোট ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছে।
-দাদার কথা বাদ দাও। কপোতাক্ষ সহজ হবার চেষ্টা করলেন, দাদা কি বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মানুষ হয়ে জন্মেছি যখন তখন আমার কিছু করণীয় আছে। আমি আমার কর্তব্য করতে চাই।
বেশ ভালো কথা। তবে তোমার সংসার করা উচিত হয়নি। ঘরে এক পা, আর পাটি অফিসে আর এক পা এভাবে সংসার চলতে পারে না। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। তুমি আমাকে কৃষ্ণনগরে রেখে আসবে চল। মীনাক্ষী দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে বললেন কথাগুলো।
কপোতাক্ষ ধাক্কা খেলেন। মীনাক্ষীকে এত কঠোর হয়ে উঠতে তিনি কখনো দেখেননি। পার্টির কাজে ডুবে থাকলে সংসারের দিকে আর ফিরে তাকানো সম্ভব হয় না। মীনাক্ষীর দীর্ঘদিনের পুষে রাখা ক্ষোভ আজ প্রকাশ্যে চলে এসেছে নানা কারণে।
কপোতাক্ষ এই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কীভাবে সামাল দেবেন ভাবলেন। ঘর থেকে যদি বিদ্রোহ শুরু হয় তাহলে তার কিছু করার নেই। অবশ্য মীনাক্ষী একগুয়ে নন। সমঝোতার পথে হাঁটতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে সেই প্রতিবাদকে সামাল দেওয়া যাবে কীভাবে?
কপোতা মাথা নেড়ে বললেন, তুমি খামোখা রাগ করছ। আমাদের পার্টি-লাইনের নির্দেশ আছে বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়।
–তুমি পার্টির জন্য তোমার স্ত্রী-পুত্র সব কিছুকে ত্যাগ করেছ। এই ত্যাগ যদি তোমার কাছে ক্ষুদ্রতর ত্যাগ হয় তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই। গোঁজ হয়ে বসে মীনাক্ষী রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
মীনা, লক্ষ্মীটি, আমার কথা শোন….।
-তোমার অনেক কথা আমি শুনেছি, আর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে মীনাক্ষী তাকালেন, দয়া করে এবার যাও। তুমি আর তোমার ছেলেকে নিয়ে আমি আর পারছি না।
-কেন, সূর্যকে নিয়ে তোমার আবার কি সমস্যা হল? কপোতাক্ষ শুধোলেন।
মীনাক্ষী সহজ হতে পারলেন না, ছেলেটাও তোমার মতো ভবঘুরে হয়েছে। তুমি দেশোদ্ধার করে বেড়াচ্ছো, সে দেশ থেকে কুসংস্কার তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ওদের একজন মাস্টারমশাই, কী যেন নাম- তিনি এই দলের পাণ্ডা। শুনলাম কাল প্রাইমারী ইস্কুলে ওদের বিজ্ঞান-সচেতনতার ওপর সভা হবে। কাল মাস্টারমশাই এখানে খাবেন। সূর্য বলে গেল।
এখন পরীক্ষার সময় এসব ব্যাপারে নাক না গলালে ভালো হত। কপোতাক্ষ বিচলিত চোখে তাকালেন।
মীনাক্ষীর কণ্ঠস্বরে অবজ্ঞা উথলে উঠল, তোমারই তো ছেলে, বাপের সব গুণই পেয়েছে। আমি বোঝালে সে বুঝবে কেন? তার এখন নিজস্ব মতামত দেবার অধিকার জন্মেছে। আমি কিছু প্রতিবাদ করলে সে আমাকে থামিয়ে দেয়। বলে চুপ করো।
