সেই দ্বীপী এখন রাগে কাঁপছে থরথরিয়ে, তাকে সামলানো দায়। সূর্যাক্ষ শান্ত হয়ে বলল, দ্বীপী, তোকে একটা কথা শুধাই, জবাব দিবি তো?
দ্বীপী ফাটা দাগ থেকে হাত সরিয়ে গুম হয়ে দাঁড়াল, তোর সাথে আমার কথা বলতেই ইচ্ছে করে না। তুই তো পাথর। পাথরের সাথে কি কথা বলা যায়?
সূর্যাক্ষ হাসল, আমি পাথর হলে তুই পাহাড়। বুঝলি? এই পাথরই একদিন পাহাড়কে বাঁচিয়ে দিল, তোর নিশ্চয়ই মনে আছে কথাটা। যদি মনে না থাকে তো বল–আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি।
দ্বীপী ঠোঁট শক্ত করে ভেংচে উঠল, মনে রাখতে আমার বয়ে গেছে। ওসব ছোট ছোট কথা যত মুছে যায় তত ভালো।
গঙ্গা স্নান করতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিলিস মনে নেই? কে বাঁচিয়েছিল তখন?
–তুই যা ভীতু, তুই কি আমাকে বাঁচিয়েছিলিস? দ্বীপীর গলায় ফুটে উঠল অবজ্ঞা।
সূর্যাক্ষ হার মানল না, আমি না থাকলে সেদিন তুই ঠিক পটল তুলতিস।
কী করে? দ্বীপী বিমূঢ়ভাবে তাকাল।
–কে চিৎকার করে ঘাটের মাঝিদের ডেকেছিল বল? মাঝিরা যদি না আসত সেদিন তো তোর মকরস্নান চিরদিনের মতো হয়ে যেত।
-হয়ে যেত তো হয়ে যেত–তাতে তোর কি? দ্বীপী ঝগড়ুটে বেড়ালের দৃষ্টি মেলে তাকাল, আমি বেঁচেছি আমার আয়ুর জোরে। তোর চেঁচানোর জোরে বাঁচিনি বুঝলি?
দ্বীপী লাল টুকটুকে জিভ বের করে ভেংচি কাটল। এবার সূর্যাক্ষ তেড়ে গেল তার দিকে। দ্বীপীকে ঠেলা মারতে মারতে নিয়ে এল বিছানায়। হুমড়ে ফেলে দিয়ে ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, এবার যদি তোকে আমি কামড়ে দিই কে তোকে বাঁচাবে?
ভয়ে চোখ বন্ধ করে দ্বীপী বলল, আমার ভগবান আছে, সে আমাকে বাঁচাবে।
-তাহলে তোর ভগবানকে ডাক। সূর্যাক্ষ দ্বীপীর গোলাপী গালে গাল রেখে শুষে নিতে চাইল উত্তাপ। এক সময় পাকানো দড়ির মতো মোচড় মেরে উঠল তার দেহ। সূর্যাক্ষকে দু-হাতে ঠেলে দিয়ে সে বলল, তুই একটা অসভ্য, তুই একটা
-বল, গ্যাপ রাখলি কেন বল। ফিল আপ দ্যা ব্ল্যাঙ্ক।
দ্বীপী চোখ বন্ধ করে বলল, মনে রাখিস আমি এখন বড়ো হয়েছি। আগের মতো যখন তখন আমাকে তুই ছুঁবি না। কেউ দেখে ফেললে আমি লজ্জায় পড়ে যাবো। তাছাড়া লোকে আমাকে ভুল বুঝতে পারে।
সেই কথাটা তো আমিও তোকে বলতে চাই। আগে তো নিজের ফ্রকের হুক নিজে লাগাতে পারতিস না। আমাকে কেন বলতিস, সূর্য, হুকটা লাগিয়ে দে তো।
–তখন আমি ছোট ছিলাম।
–এখন আমি যদি তোর হুক লাগিয়ে দিই?
-সূর্য, মার খাবি কিন্তু। বড় ফাজিল হয়ে গিয়েছিস তুই। দাঁড়া আমি মাকে সব বলে দেব। সূর্যকে ঠেলে দিয়ে বিছানায় উঠে বসে দ্বীপী। সে ঘেমে গিয়েছে। ওর ঘামের প্রতিটি বিন্দুতে লেখা আছে ভালোবাসার কথা। এই ভালোবাসা ভুলে থাকা বড়ো কঠিন।
দ্বীপীকে একবেলা দেখতে না পেলে হাঁপিয়ে ওঠে সূর্যাক্ষ। একটা নেশার মতো কে যেন তাকে টেনে আনে দ্বীপীদের বাড়িতে। দ্বীপীর হাসি মুখটা দেখলেই তার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি-অবসাদ দূর হয়ে যায়।
দেবোত্তর ওদের মেলামেশাটাকে মেনে না নিয়ে পারেন নি। ছোট থেকে একসঙ্গে এরা বড়ো হচ্ছে। পিঠাপিঠি ভাই-বোনের মতো ওদের সম্পর্ক। শুধু সম্পর্ক নয় ওদের ইস্কুল, ক্লাস সব এক।
তবু মাঝে মাঝে রাশ টেনে ধরেন চন্দ্রিকা। বেথুয়াডহরীতে দ্বীপীর সিনেমা দেখতে যাওয়ার আব্দার তিনি মেনে নিতে পারেন না।
-ওঃ মা, কেন যেতে দিচ্ছো না আমাকে? আমি কি একা যাচ্ছি নাকি? আমার সঙ্গে তো সূর্য যাচ্ছে। দ্বীপীর ছেলেমানুষী আব্দার চন্দ্রিকার মাথা গরম করে দেয়। ধমক দিয়ে তিনি বলেন, মনে রাখিস এখন তুই আর ছোট নোস। গ্রামের দিকে তোর বয়সী মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়ে ঘর-সংসার হয়ে যায়। লেখাপড়া শিখছিস, এই বয়সে এতো অবুঝ হওয়া তোর সাজে না।
-আমি কী করছি মা যার জন্য তুমি আমাকে এত কথা শোনাচ্ছো? দ্বীপী আর বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না।
মেয়ের কাছ থেকে সামান্য ধাক্কা আসতেই চন্দ্রিকা নিজেকে কিছুটা সামলে নিল, কিছু করা না করা বড়ো প্রশ্ন নয়। তোর এখন থেকে মনে রাখা উচিত কার সঙ্গে কী ভাবে কতটা মিশবি।
-তুমি কি সূর্যকে নিয়ে কিছু বলতে চাইছে? দ্বীপী সরাসরি প্রশ্ন করল, আমার সঙ্গে সূর্যর রিলেশনটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এটা যে ঠিক কী ধরনের রিলেশন তা আমি তোমাকে ঠিক বোঝতে পারব না।
চন্দ্রিকা সামান্য সাহসী হলেন, আমরাও ঠিক বুঝতে পারি না। তাছাড়া সূর্যকে আমি ঘরের ছেলের মতো দেখি।
দ্বীপী গম্ভীর মুখে কপালে ভাঁজ ফেলে নীরব থাকল।
চন্দ্রিকা সামান্য হালকা গলায় বললেন, আমি বললাম বলে তুই কিছু মনে করিস না। আমি মা। আমাকে দশ দিক নজর রাখতে হয়।
এবার ফুঁসে উঠল দ্বীপী, তা বলে নিজের মেয়েকে তুমি ভুল বুঝবে? কালীপুজোর মেলায় পাঁপড় ভাজা কিনতে গিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম। সেবার তো তুমি দেখেছ সূর্য আমাকে খুঁজে পেয়ে কেমন পাগলের মতো করছিল। ওর মতো ছটফটানী, উদ্বেগ আমি বাবার মধ্যেও দেখিনি।
-মনে রাখিস, ওরা বড়োলোক। ওর জ্যাঠা মানুষ হিসাবে ভালো নয়।
-কে কী রকম মানুষ, আমি সেই বিচারে যাব না। আমি শুধু সূর্যকে জানি। ও আমার ভীষণ ভালো বন্ধু। দ্বীপী জোর গলায় কথাগুলো বলে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
চন্দ্রিকা যে অনেকটাই কোণঠাসা তা তিনি হাবেভাবে বুঝিয়ে দিলেন। আজকালকার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তর্কে পেরে ওঠা ভীষণ কঠিন। এ ব্যাপারে গ্রাম-শহর সমানভাবে এগিয়ে। কাজের অজুহাতে তিনি রান্নাঘরে চলে গেলে দ্বীপী তখনও স্বাভাবিক হতে পারে না। হাজার কথার মধ্যে দ্বীপীর একটা কথাই মনে পড়ে। সাহেব মাঠের ভোজপুরী দারোয়ান কিষাণজীর কাছ থেকে বাদশাহী গুড়াখু চেয়ে এনেছিল সূর্য। তার অর্ধেকটা দ্বীপীকে দিয়ে বলেছিল, এই গুড়া দিয়ে দাঁত মাজলে তোর দাঁতের ব্যথা সব সেরে যাবে, তোর দাঁত সাদা মুলোর চেয়েও আরও সাদা হয়ে যাবে।
