মহাদেব মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব সামলে তার সংসার এখন টলমল। মাথার উপর দুটো মেয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, ওদের পাত্রস্থ করা আশু-প্রয়োজন। দু-একজন যে দেখে যায়নি তা নয়। মেয়ে ওদের পছন্দ। কিন্তু দাবীর কাছে নুইয়ে গেছেন দেবোত্তর। এত টাকা গয়না আসবে কোথা থেকে? চন্দ্রিকার গায়ের সামান্য গহনাগুলো খুলে নিলেও এ সমস্যার সমাধান হবে না।
ওদের কথার মাঝখানে সূর্যাক্ষ এসে দাঁড়াল। দ্বীপীকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, কী রে আসি বলে তুই যে কাশী চলে গেলি! চল, ফিজিক্সের অঙ্কগুলো চটপট করে ফেলি। আর দেরি করলে প্র্যাকটিস করার সময় পাব না।
-সে তো বুঝলাম, কিন্তু আমার দুটো প্র্যাকটিক্যাল খাতার দরকার। দ্বীপী খুব গুরুত্ব সহকারে বলল।
সূর্যাক্ষ ওদের বোবা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে ফেলল, তুই কাল ঠিক খাতা পেয়ে যাবি।
-তার মানে?
-মানেটা খুব সহজ। কাল আমার কালীগঞ্জে কাজ আছে। কাল তোর জন্য ওখান থেকে খাতা কিনে আনব। এবার কথাটা তোর মাথায় ঢুকল তো?
তোর কিনে দেওয়া খাতা আমি নেব কেন? দ্বীপী ঝাঁঝাল সুরে বলল, তোর বুঝি পয়সা বেশি হয়েছে? দাঁড়া, আমি তোর মজা দেখাচ্ছি।
এবার সূর্যাক্ষ আহত হয়ে চন্দ্রিকার স্মরণাপন্ন হল, কাকিমা দেখলে তো দ্বীপীর কেমন ব্যবহার! একটু সুযোগ পেলে ওর ঝগড়া করা চাই। অন্য কেউ হলে ওকে একদম পাত্তা দিত না।
-না দিত, না দিত। তাতে আমার বয়ে গেছে। আমি কারোর খাই না, পরিও না।
–খাওয়া-পরার কথা আসছে কোথা থেকে? সূর্যাক্ষর চোখ-মুখ নিস্প্রভ দেখাল। সে চন্দ্রিকার দিকে তাকিয়ে তার সমর্থন পাবার জন্য বলল, দেখলে কাকিমা কেমন ওর ব্যবহার। যেখানে বিয়ে হবে সে ঘর একেবারে জ্বালিয়ে দেবে।
কথা শেষ হল না, সূর্যাক্ষর দিকে তেড়ে এল দ্বীপী, নিজেকে কী ভাবিস বল তো? ভাবছিস মা’র সামনে মেয়ের নিন্দে করে পার পেয়ে যাবি? মা আমাকে তোর চেয়েও ভালো চেনে বুঝলি?
এবার অসহ্যবোধ হতেই ধমকে উঠলেন চন্দ্রিকা, দ্বীপী, তুই চুপ করবি! বড় ঝগড়ুটে হয়েছিস। কার সাথে কী ভাবে কথা বলতে হয় জানিস না বুঝি? সূর্য তো ঠিক বলেছে। মেয়েদের বেশি তেজ ভালো নয়।
ছেলেদের সব কিছুই ভালো, তাই না মা? দ্বীপী মুখ বিকৃতি করে হাসল। সূর্যাক্ষ বলল, তুই কি শুধু তর্ক করবি, কাজের কাজ কিছু করবি না? রাত বাড়ছে, আমি কিন্তু চলে যাবো।
দেবোক্তর সূর্যাক্ষর সমর্থনে বলল, যা মা, নিজের কাজ কর। কর্মই ঈশ্বর। কর্মই ধর্ম। ধর্মের পথে থাক। দেখবি তোর অমঙ্গল হবে না।
দ্বীপী থুতনি নাচিয়ে চলে এল পাশের ঘরে। সূর্যাক্ষ তাকে অনুসরণ করল। ঘরে ঢুকে তার জন্য এমন অভ্যর্থনা লুকিয়ে ছিল তা আগাম অনুমান করতে পারে নি সূর্যাক্ষ। তাকে মাথা উঁচু করে ঘরে ঢুকতে দেখে দ্বীপী গম্ভীর গলায় বলল, দাঁড়া। তখন কি যেন বলছিলিস? ওঃ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমার যেখানে বিয়ে হবে সেই ঘর আমি জ্বালিয়ে দেব তাই না?
দ্বীপীর ক্রুদ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে সূর্যাক্ষ ঢোক গিলে কিছু বলতে গেলেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দ্বীপী। চকিতে হাত বাড়িয়ে সে সজোরে চিমটি কাটল সূর্যাক্ষর পেটে। সামান্য চর্বি মুচড়ে যেতেই সূর্যাক্ষর গলা থেকে নিমেষে বেরিয়ে এল ওঃ আর্তনাদ।
দ্বীপী শরীর দুলিয়ে খিলখিল করে হাসল। হাসতে হাসতে সে বলল, তোর সব বাহাদুরী আমার জানা আছে। একটা রামচিমটিতেই তোর মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। যদি আমড়াচিমটি কাটি তাহলে কি হবে তোর?
-মানে? হকচকিয়ে শুধাল সূর্যাক্ষ।
দ্বীপী একটুও দ্বিধা না করে বলল, আমার বিয়ে হয়ে গেলে তুই খুব সুখে থাকবি তাই না? কী নিষ্ঠুর রে তুই? অমন কথা বলতে তোর মুখে বাঁধল না?
-আমি তো ঠিকই বলেছি। একদিন না একদিন তোর তো বিয়ে হবেই।
দ্বীপীর ব্যথিত চোখে চিকচিকিয়ে উঠল জল, এতদিন ধরে তোর সাথে মিশছি, তোকে আমি আজও চিনে উঠতে পারলাম না। সত্যি বলতে আমাকে তুই কী ভাবিস?
-কেন বলবো? সূর্যাক্ষ জেদ ধরল।
–না, তোকে আজ বলতে হবে। যদি না বলিস তাহলে আমি তোর ফিজিক্স বই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেব।
-তাহলে তো বেশ ভালোই হবে, আর কষ্ট করে পড়তে হবে না। সূর্যাক্ষ দাঁত টিপে টিপে হেসে উঠল।
দ্বীপী রাগে কাঁপছে, লাল হয়ে গিয়েছে ওর সুন্দর মুখটা। কিছু বলতে গিয়ে জড়িয়ে গেল ওর কথা। মাথায় হাত দিতেই কাটা দাগটার কাছে আটকে গেল হাত। তখন কোন ক্লাস? সম্ভবত থ্রি। দ্বীপী আব্দার করেছে পাকা কুল পেড়ে দেবার জন্য। ইটের টুকরো সূর্যাক্ষ ছুঁড়ে মারছে গাছে। কুলগাছের নীচে শ্লেট-বই হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে অবুঝ দ্বীপী। হঠাৎ একটা ইটের আঘাতে ফেটে গেল দ্বীপীর মাথা ব্যথায় শুকিয়ে গেল কচি মুখ। চুলের গোড়া ভিজিয়ে গরম রক্ত কানের পাশ দিয়ে চুঁইয়ে নামল। রক্ত দেখে দারুণ ভয়ে গুটিয়ে গিয়েছে সূর্য। কী করবে, কী করা উচিত–তা তার ছোট্ট বুদ্ধিতে কুলাচ্ছে না। দ্বীপীই হাতের চেটোতে রক্ত মুছে এগিয়ে এল সামনে, তোর কোনো দোষ নেই। আমার নিজের দোষেই মাথা ফেটেছে। কুল খাওয়ার সখ হয়েছিল। সে সখ আমার মিটে গিয়েছে।
দ্বীপী সেদিন এক ফোঁটা কাঁদল না। বরং সাহস দিয়ে বলল, যা, হাড়মটমটির ঝোপ থেকে পাতা ছিঁড়ে আন। রস বের করে আমার ফাটা কপালে লাগিয়ে দে। জানিস তো সূর্য, আমার বাবা বলে–হাড়মটমটির রসে ফাটা কপাল জুড়ে যায়।
