থানার বড়োবাবু নীলাক্ষবাবুর কথাগুলো মন দিয়ে শুনেছিলেন। সন্দেহ তার মনেও জমাট বেঁধে আছে। সাধারণত এই ধরনের পলাতক মানুষরা খুনী কিংবা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মঞ্চের পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ হন। গোরা সাধু কোন দলে অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন। সাদা পোষাকের একজন পুলিশ প্রায় মাস তিনেক ঘুরঘুর করেছে গোরা সাধুর ডেরার চারধারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে কোনো তথ্যই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়নি যা বড়োবাবুকে সগর্বে বলতে পারে। গোরা সাধু স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও পরিচ্ছন্ন মনের। তার জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত পরিশীলিত এবং উচ্চমানের। সৌজন্যতা, শিষ্টাচার তার মজ্জাগত। এমন দেবকান্তি মানুষ কোনোদিন খুনী বা দাগী আসামী হতে পারে না।
মৌনী সাধুর গাঁজার কলকে খুব যত্ন নিয়ে সেজে দেয় হরনাথ। আচ্ছন্নতা কাটিয়ে ভরাট হেসে ওঠে সাধুবাবা। তারপর ইষ্টদেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করে গাঁজার কলকেয় লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া উগরে ঈষৎ লাল চোখে সে হরনাথের দিকে তাকাল। তাতেই সারা শরীরে খুশির বান ডাকল হরনাথের, অদ্ভুত আনন্দধারায় প্লাবিত হল তার খরায় পোড়া মন। যেন এইমাত্র গঙ্গার শীতল জলে সে স্নান সেরে এল–এমন তৃপ্তিময় আনন্দ অনুভূতিতে তার অন্তরাত্মা পুলকিত হয়ে উঠল।
প্রকৃত মানুষের সান্নিধ্য যে কোনো মানুষের ভালো লাগে। রোদের রঙ কড়া হতেই হরনাথ ফিরে এল তার নিজের কুঁড়েঘরে। সারাদিনের অনেক কাজ পড়ে আছে। মাটির কলসীতে গঙ্গার জল ভরে রোজ চিতার বাঁধানো বেদীটা ধুয়ে দেয় হরনাথ। চিতা সাফ-সুতরো রাখলে হরনাথের মনটাও পবিত্র হয়ে ওঠে। মানুষের শেষযাত্রায় শুদ্ধতা যাতে কম না হয় সেদিকে তার খেয়াল পুরোমাত্রায়। গঙ্গা যা পারে মানুষও কি তা পারে না? হরনাথের মন বলল, পারে, অবশ্যই তা পারে.
.
২০.
মাস খানিক পরে সূর্যাক্ষ আর দ্বীপীর ফাইনাল পরীক্ষা। রাত দশটা অব্দি একসাথে পড়ছে ওরা। সূর্যাক্ষর পড়া শেষ হলে দেবোত্তর হ্যারিকেন নিয়ে এগিয়ে দেন তাকে। পথ যদিও সামান্য তবু অন্ধকার শুয়ে থাকে ধুলো পথে। চন্দ্রিকাই জোর করে বলেছেন, যাও না গো, ছেলেটাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসো।
অন্ধকারকে বিশ্বাস নেই চন্দ্রিকার। শুধু অন্ধকার নয়, কাঁচা বয়সকে বিশ্বাস করেন না তিনি। আগুন আর ঘি পাশাপাশি থাকলে যে কোনো সময় হার মানতে পারে যে কেউ। এটা কোনো দোষের নয়, এটাই ধর্ম। তবু সব জেনেও দ্বীপীকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। ছোট থেকে সূর্যাক্ষ আর দ্বীপী এক সাথে স্কুলে যায়। ওদের খেলাধুলা হাসি গল্প দৌড় ঝাঁপ সব কিছু একসাথে। তবু চন্দ্রিকার মনে সন্দেহ ঘোঁট পাকায়।
সূর্যাক্ষকে তিনি মুখের উপর নিষেধ করতে পারেন না। সূর্যাক্ষ না এলে বরং ঘরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। দেবোত্তর মহাদেব মন্দির থেকে ফিরেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন, কি গো, আজ বুঝি সূর্য আসে নি?
চন্দ্রিকা তখন সামনে এসে উত্তর দেবেন, হ্যাঁ, এসেছিল গো। কী যেন কাজ আছে ঘরে, তাই আটটার মধ্যে চলে গেল!
-দ্বীপী মন দিয়ে পড়ছে তো? তুমি ওর উপর একটু নজর রেখো।
-আমি নজর রাখব না তো কি তুমি নজর রাখবে? চন্দ্রিকা অসন্তুষ্ট হন। দেবোত্তর বলেন, অ্যাঁ, রেগো না। যা বলছি-মন দিয়ে শোন। মেয়েটা বড়ো হচ্ছে। ওর দিকে খেয়াল তোমারই রাখা উচিত। আমি আর কী করতে পারি। আমি তো সারাদিনই বাইরে বাইরে থাকি।
-বাইরে বাইরেই থাকো। এসব নিয়ে আর মাথা ঘামিও না। তুমি কি তোমার নিজের মেয়েকে চেনো না? দ্বীপীর মতো মেয়ে এ গ্রামে কটা আছে? চন্দ্রিকা জোর গলায় বললেন, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। ওরা দুটিতে যমজ ভাই-বোনের মতো মেশে। ওদের জন্য তোমার চিন্তা না করলেও চলবে।
–সেই ভালো। দেবোত্তর দীর্ঘশ্বাস ভাসালেন বাতাসে, মেয়েটাকে একটা টিউশনিও দিতে পারিনি। দেব কোথা থেকে। মন্দিরে যা দক্ষিণা পাই তা তো সংসার খরচে সব শেষ হয়ে যায়। তবু ভাল–ওরা মিলেমিশে পড়ছে। আমি শুনেছি–যারা সায়েন্স পড়ে তারা মিলে-মিশে পড়লে রেজাল্ট ভালো হয়।
চন্দ্রিকা চুপ করে থাকলেন, এসব বিষয়ে তার কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। দ্বীপী পড়তে পড়তে উঠে এল হঠাৎ মা, শোন।
চন্দ্রিকা মুখ তুলে তাকালেন, বাবাকে বলো কাল কালীগঞ্জ বাজার থেকে যেন দুটো প্র্যাকটিক্যাল খাতা কিনে আনে। আর তা যদি না হয় আমাকে টাকা দিলে আমি গিয়ে কিনে আনতে পারব। মনে রেখো খাতা দুটো আমার খুব দরকার। তিন দিনের মধ্যে ইস্কুলে জমা দিতে হবে। ওতে স্পেশ্যাল মার্কস আছে।
দেবোত্তর শুকনো মুখে কথাগুলো শুনছিলেন। দ্বীপীর আব্দার সামান্য, কিন্তু এর গুরুত্ব অনেকখানি। দুটো খাতার দাম নেহাৎ কম হবে না। এমনি খাতার চাইতে প্র্যাকটিক্যাল খাতার দাম বেশি। মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়ছে বলে–এটুকু জেনেছেন দেবোত্তর। কিন্তু এখন জেনেও তিনি না জানার ভান করে দাঁড়িয়ে থাকেন।
চন্দ্রিকা কী বলবেন কিছু ভেবে পান না। জিনিসপত্রের যেভাবে দাম বাড়ছে তাতে সংসার চালাতে তার নাভিশ্বাস উঠছে। নাহলে চক্রবর্তী বাড়ির দুধ কোনোদিন বাইরে যায়না। পরপর দুটো গোরু দুধ দিচ্ছে। এত দুধ খাবে কে? সূর্যাক্ষকে রোজ বড়ো কাচের গ্লাসে দুধ ভরে দেন চন্দ্রিকা। গাঢ়, ফুটানো দুধ সূর্যাক্ষ খেতে ভালোবাসে। আর তাকে খাইয়ে তৃপ্তি পান চন্দ্রিকা। দ্বীপী দুধ পছন্দ করে না। লহরী পায়েস খেতে ভালোবাসে। ঊর্মি এসবের কোনটাতেই নেই। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে বরাবর ও নাক সিটকায়। দুধ নষ্ট করতে ভালো লাগে না চন্দ্রিকার। ঘরের জিনিস হলেও বাজারে তার একটা মূল্য আছে। রবি গোয়ালা ঘরে এসে দুধ দুইয়ে নিয়ে যায়। মাস গেলে ও যা টাকা দেয় তা সংসারের অনেক কাজে লাগে। দেবোত্তর দুধ বিক্রির ব্যাপারে প্রথমে আপত্তি করলেও এখন তিনি নীরব থাকতে পছন্দ করেন।
