গোরা সাধুর ডেরা হরনাথকে বড্ড টানে। গাঙধারে হরনাথের একমাত্র প্রতিবেশী হল এই গোরা সাধু। দশটা কথা বললে যে মানুষটা একটাও কথার জবাব দেয় না তার সঙ্গে ভাব জমানো কঠিন কাজ। প্রথম প্রথম হরনাথ বিরক্ত হত–এখন আর হয় না।
গোরা সাধুর মনটা গঙ্গামাটির চেয়েও পবিত্র। তার লম্বা শরীর, মেদহীন চেহারা, টানা চোখ, সম্ভ্রান্ত মুখশ্রী …. সেই সঙ্গে শাঁখের চেয়েও ফর্সা গায়ের রঙ এ গাঁয়ের সব মানুষের চেয়ে তাকে আলাদা মর্যাদায় ঠাঁই দিয়েছে। সব চাইতে বড়ো কথা গোরা সাধু নিজের জন্য কখনো কারোর কাছে হাত পাতে না। এত বড়ো বন্যায় সে গাছ আঁকড়ে পনের দিন পড়ে রইল টানা। কপোতাক্ষবাবু পার্টি থেকে নৌকা পাঠিয়েছিলেন তাকে উদ্ধারের জন্য। গোরাসাধু সেই নৌকো ফিরিয়ে দিল। একটা মানুষ টানা পনের দিন না খেয়ে কী ভাবে বেঁচে থাকে এই প্রশ্ন এখনও হাজার প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় গ্রামবাসীদের। তারা আশ্চর্য না হয়ে পারে না। তারা গোরাসাধুর অলৌকিক ক্ষমতার কথা স্মরণ করে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। বুড়ো-বুড়িরা ক’কদম এগিয়ে গিয়ে বলে, নদের নিমাই ফিরে এসেছে গো! আহা, বিটা ছেলের এত রূপ, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না! হরি হে মাধব…..! ভিকনাথকে পিছনে ফেলে হরনাথ গোরাসাধুর ডেরায় গিয়ে দাঁড়াল। গ্রামের মানুষরা গোরাসাধুর অশ্বত্থ গাছটাকে সিমেন্ট-ইট দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছে যত্ন করে। এতেও সাধুবাবাজী প্রতিক্রিয়াহীন। তার আবাহনও নেই, বিসর্জনও নেই। তবু গ্রাম ভেঙে মানুষ আসে কাতারে কাতারে। কেউ আসে রোগ সারাতে, কেউ আসে টাকা বানাতে। কেউ চায় ঘর বাড়ি বিষয় সম্পত্তি।
গোরাসাধু নির্বিকার চোখে চেয়ে থাকে। ঠোঁট নড়ে না, এমন কী চোখের পলকও পড়ে না। মায়েরা তার কাছে হাতজোড় করে বলে, বাবা, আমাদের দয়া করো। ঘরে আমাদের বিপদ। এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করো।
গোরা সাধুর কাঁধ ছাপানো চুল হাওয়ায় নড়ে, গলার একমুখী রুদ্রাক্ষটা ঘামে ভিজে যায়, পাথরের মালাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে দিনের আলোয়, লম্বা হাত বাড়িয়ে সাধুবাবা প্রসাদের থালা থেকে উঠিয়ে নেয় একটা ফল। এভাবে সারাদিনে জড়ো হতে থাকে ফলের সম্ভার। এত ফল, একা মানুষ খাবে কী করে? গোরা সাধু অবশিষ্ট ফল হরনাথকে দিয়ে দেয়। হরনাথকে তার বিশেষ পছন্দ। এ গাঁয়ের অনেকেরই ধারণা হরনাথের সঙ্গে সাধুবাবার চরম একটা মিল আছে। ওরা একা থাকলে নাকি কথা বলে।
সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ভার অন্যের।
হরনাথ গোরা সাধুর সামনে দাঁড়িয়ে জোড় হাত করে প্রণাম করল। গোরা সাধু পিছন দিকে দৃষ্টি ফেলে কী যেন দেখছিল, হরনাথের উপস্থিতিতে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। এক সময় কিছু বলে গোরাসাধু উঠে গেল অশ্বত্থ গাছের ডালে। হরনাথ অবাক হয়ে দেখল গাছের ডালে ভাঁজ করে রাখা আছে কম্বল, একটি ভেড়ার লোমের আসন, রক্তজবার চেয়েও কটকটে লাল বর্ণের কয়েকটি বস্ত্রখণ্ড।
গত রাতে শীতের প্রকোপ আদৌ কম ছিল না তবু শুধুমাত্র এক টুকরো লাল কাপড় গায়ে জড়িয়ে সিমেন্টের বেদীটায় শিরদাঁড়া টানটান করে বসে ছিল গোরাসাধু। তার চোখযুগল অধো নীমিলিত, অদ্ভুত এক দিব্যকান্তি প্রসন্নতা তার শরীর থেকে নির্গত হচ্ছিল যা দেখে হরনাথ মুগ্ধ না হয়ে পারেনি। তার যাবতীয় দুঃখ-জ্বালা, পাথরের চেয়েও কঠিন মনোকষ্ট সব যেন গলে জলের চেয়েও তরল হয়ে যায় গোরা সাধুর দর্শনে। কী এক যাদু আবেশ হরনাথের সমগ্র শরীরে সঞ্চারিত হতে থাকে। মনে মনে সে পুলকিত হয়ে ওঠে। তখন তার হৃদয় গঙ্গাবক্ষের চেয়েও প্রসারিত হয়, মন খুশিতে কাশফুলের মতো দোলে। এই মানুষটি গঙ্গাধারে আসার পর থেকে এখানকার আবহাওয়া পরিমণ্ডল সব কিছু বদলে গিয়েছে। গ্রামের মানুষের শ্রদ্ধা এবং আবেগ এই মানুষটিকে ঘিরে হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছে। যে কেউ গঙ্গাস্নানে এলে গোরা সাধুর দর্শন না নিয়ে গ্রামে ফেরে না। সাধুসঙ্গে আপামর মানুষের হৃদয় পুলকিত হয়ে ওঠে, সংসারে শান্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্য পরিলক্ষিত হয়। সমস্যার গ্রন্থিগুলো এক এক করে খুলে যেতে থাকে। এক আশ্চর্য দৈবশক্তি গোরা সাধুকে যেন তড়িৎ-আবেশের মতো ঘিরে আছে সব সময়।
গতকাল হরনাথ গোরাসাধুর জন্য মাটির পাত্রে মদ এনেছিল বাঁধধার থেকে। সেই মদ গোরা সাধু প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেছে। হরনাথ সময় পেলে মাঝেমধ্যে গোরা সাধুকে গাঁজার কলকে সেজে দিয়ে যায়। সে ভুল করেও সাধুবাবার কলকেতে মুখ দেয় না, সে তার নিজের কলকে ছাড়া অন্য কোনো কলকেতে গাঁজা সেবন করে তৃপ্তি পায় না। এতদিন আসা যাওয়া তবু গোরা সাধুকে হরনাথ চিনতে পারেনি একবিন্দু। তবে এটুকু সে বুঝেছে মানুষটি অসৎ বা ধান্দাবাজ নয়। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ান আর দশ পাঁচটা সাধুর মতো লোভী বা আত্মকেন্দ্রিক নয়। মনের উদারতায় এই মানুষটি আকাশের কাছাকাছি। এত ভালো মানুষ হরনাথ এই গ্রামে আর একটিও দেখেনি।
এই মানুষটিকে নীলাক্ষবাবুর সন্দেহ হয়। এর জনপ্রিয়তা তাঁকে হীনমন্যতার পুকুরে চোবায়। নিজের অন্তঃস্থলের ঈর্ষাকে চাপা দিতে না পেরে তিনি সরাসরি থানার বড়োবাবুর কাছে গিয়ে বলেছিলেন, আপনি নিশ্চয়ই গোরাসাধুর কথা শুনে থাকবেন। লোকটিকে আমার প্রথম থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলে মনে হয়। তাছাড়া ওর যা চেহারা, কাঠামো, হাবভাব তা দেখে ওকে আমার পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বলে মনে হয় না। এই মানুষটি অন্য কোনো রাজ্য থেকে এখানে পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে আসার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। নাহলে পৃথিবীর এত ভালো-ভালো জায়গা ফেলে গঙ্গার ধারে আশ্রয় নেওয়া হল কেন? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোন উদ্দেশ্য আছে। গ্রামবাসীর স্বার্থে আপনাকে সেইটা খুঁজে বার করতে হবে। বড়ো কিছু অঘটন ঘটে যাওয়ার পূর্বেই আপনাকে এখন থেকেই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
