এসব ভাবনা হরনাথকে পাগল করে তোলে, বোলতার কামড়ের চেয়েও তীব্র জ্বলনে অস্থির হয়ে ওঠে তার দেহ-মন। টগরীর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে, আমার শিউলি তোর মধ্যে বেঁচে থাকবে বিটি। কিন্তু তোর কাকিরে আমি আর পাব না। আমার পাপে ওরা চলে গেল। কার জন্যি এ ঘর আঁকড়ে পড়ে থাকব বল? আজ থিকে শ্মশানই আমার ঘর, শ্মশানই আমার সব। এই বড়ো গঙ্গার জলে ওরা ভেসে গিয়েছে। এই বড়ো গঙ্গায় ওদের শরীল মিশে আছে। যারা শেষবেলায় আগুন পায় না তাদের আমি আগুন দেব। তাদের সৎকার করব। নিজের বউ-মেয়ের তো সৎকার করার ভাগ্য হয়নি। দশের সৎকার করে আমি আমার পাপের বোঝা কম করব।
সেদিন থেকে শ্মশানের কাছে গাঙের পাড়ে কুঁড়ে বেঁধে পড়ে আছে হরনাথ। তার খাওয়া-পরা-শোওয়ার কোনো ঠিক নেই। সারাদিন পথের দিকে সে হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে কখন মড়া আসবে, কখন বলহরি হরিবোল ধ্বনি ভেসে আসবে।
দাহ করার কাজে হরনাথের চেয়ে যোগ্য মানুষ এ অঞ্চলে আর দুটি নেই। দাহ শেষ হলে সে কারোর কাছে হাত পেতে দাঁড়ায় না। শ্মশানযাত্রীরা দু’ভাড় কাঁচা মদ দিলে তাতেই সে খুশি। সে চায় গ্রামের যত মড়া সব যেন তার হাতে দাহ হয়। মড়া পুড়িয়ে এখন এক ধরনের তৃপ্তি পায় হরনাথ। মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। আনন্দ আর পরিতৃপ্তি গাঙ্গার ঢেউ হয়ে বুকের উপর আছড়ে পড়ে। শিউলি আর ভারতী আগুন আর মাটি পায়নি। আর যাতে এমন ঘটনা না ঘটে তার জন্য মনে মনে সচেষ্ট থাকে হরনাথ।
মাটির হাঁড়িতে ভাত চাপিয়ে শ্মশানের পোড়াকাঠ সে ঠেলে দেয় তিন মাথার উনুনে। ধোঁয়ার পাশাপাশি লকলকায় আগুন। আর সেই আগুনে নিজেকে কাঁচা মাটির দলার মতো পুড়িয়ে আরও শক্ত করে নেয় হরনাথ। প্রায়ই তার চোখ থেকে জল ঝরে পড়ে। চোখ রগড়ে নিয়ে সে কেমন ঝিমানো চোখে তাকায়। শোক চাম এঁটুলির চেয়েও বেয়ারা, শরীর ছেড়ে যায় না। হরনাথের কালো মহিষ বর্ণ চেহারাটায় রুক্ষ্মতা পাথর কুঁচির মতো মিশে থাকে। কপালে তার অজস্র দাগ, ভাঁজ, কাটাকুটির খেলা। মোটা আর জোড়া ভ্রূ তাকে করে তোলে শ্মশানভূমির অসুর।
হাঁটতে হাঁটতে ভিকনাথ ঘোর সন্দেহের চোখে হরনাথের দিকে তাকাল। একটা মানুষের এত পরিবর্তন সে ভাবতে পারে না। সময় মানুষকে কত বদলে দেয়। সময় বুঝি গঙ্গার ধারার চাইতে বলবান। কোনো কোনো শোক শেকড় চারানো বনস্পতির চেয়েও ক্ষমতাবান-সহজে যাদের উপড়ে ছুঁড়ে ফেলা যায় না। তবু কিছু বলতে হয় এই ভাবনা থেকে ভিকনাথ শুধোল, হরদা, কেমুন আচো গো ইখানে?
-শ্মশানে যেমুন মানুষ থাকে তেমুন। হরনাথের কণ্ঠস্বরে আফসোসের বেহালা কঁকিয়ে উঠল।
ভিকনাথ এরপরে আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। দুটো অকাল মৃত্যু পুরোপুরি বদলে দিয়েছে হাসি-খুশি মানুষটাকে। মনে হয় হরনাথ বুঝি রক্তমাংসের মানুষ নয়, ইট-পাথরের মানুষ। সে কখন খায় কখন ঘুমায়–এ সব কেউ টের পায় না। তবে খুব ভোরে ওঠা তার স্বভাব। গঙ্গাস্নান না সেরে সে কোনো কাজ শুরু করে না। তার লম্বা জটাধরা চুলগুলো বটের ঝুরির মতো ঘাড়ের উপর অবহেলায় পড়ে আছে। গোলাকার মুখটার স্বাভাবিক শ্রী হারিয়ে গিয়েছে সেই চেনা মুখ থেকে। এখন হরনাথকে দেখলে ভয় এসে গোপনে ঠুকায় মনের কোমল অংশ।
হরনাথ ছাতাধরা দাঁত বের করে বলে, লুলার কপালটাও ফোপরা। ওর বউটাও অসময়ে চলে গেল! আহা, মনে কত দুঃখ পেলে তবে না মানুষে গলায় ফাঁস নেয়। ভিকনাথ স্বাভাবিক ভাবে হেসে উঠতে পারল না, তার বুকের মধ্যে খচখচ করছে কাঁটা, না, মানে… বৌদির মাথার গণ্ডগোল ছিল; বুঝতেই তো পারচো!
-সে আমি জানি। গমগমিয়ে উঠল হরনাথের গলা, মাথায় গণ্ডগোল থাকলে সবাই কি গলায় ফাঁস নেয়?
ভিকনাথ অসহায় চোখে তাকাল, অত ভেতরের ব্যাপার-স্যাপার আমি কি করে জানবো বলো?
-না না, তুমার তো জানার কথাই নয়। হরনাথ রহস্যভরা কণ্ঠে বলল, তবে এট্টা কথা, বৌদি পুড়তে বেশি সময় নিল না। ভালো মানুষরা চটজলদি পুড়ে ছাই হয়ে যায়
ছিপছিপে জল দাঁড়িয়ে আছে আখ খেতের গোড়ায়। সাদা বক আর চৈতন্যবক হাজির হয়েছে মাছ খাবার জন্য। মাছ না পাক অন্তত পোকা তো পাবে এই জমাট বাঁধা আখের খেতে। দু-ধারে চাপ বেঁধে আছে আখের জমি, তার মাঝখান দিয়ে গোরুরগাড়ি যাওয়ার মতো চওড়া পথ। সেই পথে গাঙধার থেকে উঠে আসছে ঠাণ্ডা হাওয়া, শিরশিরিয়ে ওঠে শরীর, তবু ভালো লাগার হালকা ছোঁয়া ছুঁয়ে যায় মনের আগল।
মাঝে মাঝে মন খারাপ করলে হরনাথ কোম্পানীর পাকাদালান পর্যন্ত এসে আবার ফিরে যায়। কাল ঢিলিকে পোড়ানোর সময় ভারতীর কথা মনে পড়ছিল হরনাথের। সেই থেকে চিনচিনে কষ্টটা শরীর জুড়ে রয়ে গেছে। রাতভর ভারতীর মুখটা মনে করে সে কষ্ট পেয়েছে, ঘুমাতে পারেনি এক ফোঁটা। এরকম ঘুম না এলে সে সিধা চলে আসে গোরা সাধুর ডেরায়। গোরা সাধুর আরেক নাম মৌনী সাধু, আসলে সে কারোর সঙ্গে কোনো কথা বলে না, এ পৃথিবীর অনেক কিছুই তার মন থেকে পিছলে যায় কচু পাতার জলের মতো। গোরা সাধু কোন প্রদেশের মানুষ, কী তার মাতৃভাষা–এ সম্বন্ধে কারোর কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই এখনও। তবে গ্রামবাসীরা বলে, গোরা সাধু বানের জলে ভেসে এসে সাহেবমাঠের অশ্বথগাছে আটকে গেছে অনন্তকাল। এই গাছের মোহ ত্যাগ করে পৃথিবীর অন্য কোনোখানে গিয়ে সে সুখ পাবে না।
