সুফল ওঝার নেশা ছুটে যাবার পর লাল কাপড়ে মোড়ানো পুঁটলিটা বগলদাবা করে নিশ্চয়ই গাঁয়ে ফিরে গিয়েছে। জ্যোৎস্না রাতে ওষুধের জন্য গাছের শেকড় তুলতে বেরয়। রাত জাগা তার অভ্যাস। গুণিন বিদ্যের ঘোরে সে ঝড়ো বাতাসের চেয়েও অস্থির। এই অস্থিরতা কেবল তাকেই মানায়। ভিকনাথ তার পেছন পেছন ঘুরে কি পাবে? ফলাফল শূন্য। ঝারি তাকে বারবার করে বুঝিয়েছে–যেও নি গো। যার পেছনে ঘুরচো সে হল গিয়ে সাহেব মাঠের ভূত-আলো। দুর থিকে দেখতে পাবা, কাছে গেলে কিছু নেই। আলেয়ার পেছনে ঘুরে নিজের শরীল এলিয়ে কী পাবে তুমি?
আমি ওঝাগিরি শিখে তুরে সুখে রাখব বউ। ভিকনাথের চোখে স্বপ্ন চিকচিকিয়ে উঠল।
সেই স্বপ্ন তাকে নিশি পাওয়া মানুষের মতো টেনে নিয়ে যায় সুফল ওঝার পেছন-পেছন। লুলারামকে বাণ মেরে মারতে পারলে তার বুকের গভীরে উথলে ওঠা ক্রোধের নদীটা কিছুটা হলেও শান্ত হবে। ঝারি তখন পুরোপুরি তার বুকের ছায়ায় চলে আসবে। একটা মন দু-ফাঁক রাস্তার মতন হয়ে গেলে কোন রাস্তাটা যে কার বোঝা দায়। মন যদিও বা দুটো হয়, শরীর তো দুটো হয় না। ভিকনাথের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল হাঁটতে হাঁটতে।
ঝারি তার সঙ্গে বেইমানী করেছে। মাঘ মাসে পরবের সময় বিয়ে হয়েছিল তার। প্রথমত ঘরের চালে উঠে গিয়েছিল ভিকনাথ। ঝারি তাকে গান গেয়ে গেয়ে তোয়াজ করে নামাল, নেমে এসো গো/বেঁধে বেড়ে খাওয়াব পো/ভালোবাসায় নাওয়াব পো/ নেমে এসো নেমে এসো গো, ও আমার প্রাণের নাগর/ভরা যৌবন জিয়োনো কই, বুক হয়েছে ডাগর।
পাঁচুই গিলে টলতে টলতে গান গাইছিল ঝারি, তার সাথের মেয়েরা সুর ভাসিয়ে হাতে হাত ধরে নাচছিল ভাদোর মাসের লকলকিয়া আখগাছের মতন। সেই সুখের দৃশ্য মানুষের জীবনে খুব কম আসে। ভিকনাথ চোখ মুদলেই এখনও শুনতে পায় ঝারির সুরেলা গান। চুল্লুর নেশার চাইতেও বেশি নেশা হয় তখন। সেই ঝারি এমনভাবে বিকিয়ে দেবে নিজেকে লুলারামের কাছে? জীবন থাকতে এসব মেনে নেওয়া ভীষণ কষ্টের। এর চাইতে হাত ঢুকিয়ে বুকের ভেতর থেকে কলজে উপড়ে আনা সহজ কাজ।
নেশা কেটে গেছে তবু যেন পা জোড়া টলতে থাকল ভিকনাথের। লুলারাম তার বুকে শেয়ালকাঁটা গাছ পুঁতে দিয়েছে। ঝরি সেই গাছটাতে জল দেয়। কোনোদিনও চেষ্টা করে না গাছটাকে তুলে ফেলে দিতে। এ কেমন সম্পর্ক কিছুই মাথায় ঢোকে না লুলারামের। ছোটবেলায়, মনে পড়ে তার মামাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশে। কাকে যেন খুন করেছিল মামা। নারীঘটিত কেস। বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তি দিয়ে জেলে গিয়েছিল মামা। সে সময় দাদুর জমিজমা এমনকী থালা বাসন ঘটি বিক্রি হয়ে যায় কেস চালাতে গিয়ে। একরকম পথের ভিখারি হয়ে যায় ওরা। এত কিছুর পরেও মামাকে মনে মনে সমর্থন করে ভিকনাথ। মামা সমাধান চেয়েছিল, সমাধান করেই ছেড়েছে। ভিকনাথের বিচারে ঝারিও কম অপরাধী নয়, সে যাত্রাদলের সখীগুলোর মতো নাটুকে ব্যবহার করছে। রোজ একটু একটু করে সরলতা খুন করছে ঝারি। পাপ আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে সে প্রমাণ করতে চাইছে–কত বড়ো নির্দোষ। ফুলে দাগ লাগলে সহজে তা নজরে পড়ে। ফুলেরও কলঙ্ক থাকে। সেই কলঙ্ক দাগ ফুল না ঝরে যাওয়া পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকে জাহির করে যায়। এমত অবস্থায় ভিকনাথের কি কর্তব্য সে বুঝে উঠতে পারে না। তার মাথা টলে ওঠে। ঝিনঝিন লাগে পায়ে। মনের মধ্যে সমস্যার ঘূর্ণিগুলো দলা পাকায়। চোখের কোণ দুটো করা ব্যাঙের মতো কটকটিয়ে ওঠে। চোখ রগড়ে নিয়ে সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল শ্মশানের ডোম হরনাথ লাল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।
হরনাথের চোখ জোড়া বলে দিচ্ছিল ঢিলিকে পোড়ানোর পর সে রাতভর ঘুমায়নি। নেশার মধ্যে ডুবে থেকে রাত পার করে দিয়েছে সে। লোকে বলে, মানিকডিহির ঘাট কোনোদিন ফাঁকা যায় না। ঘাট ফাঁকা গেলেও শ্মশান থাকে জমজমাট। শেরপুরের হরনাথকে কে না চেনে এই গ্রামের। দশ গাঁয়ের লোকে জানে তাকে। ঘর সংসার হরনাথের সব ছিল। বানের বছরে ঘর গেল, বউ-মেয়ে দুজনেই চলে গেল। সে বছর পুবে খাটতে গিয়েছিল হরনাথ। বউ-মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গায়ে এসে সে দেখল শূন্যঘর, নিমগাছের ডালে বসে দুপুরবেলায় কা-কা করে ডাকছে কাক। তাকে দেখে পাড়াপ্রতিবেশীরা ভিড় জমিয়ে শুকনো মুখে বলল, বড়ো দেরি করে এলি রে! কী করব, চারদিকে থৈ থৈ করচে জল। মানিকডিহির শ্মশানেও ডুব জল। উপায় না দেখে পচা লাশ বানের জলে ভেসিয়ে দিলাম।
তাদের হাহাকার বানানো নয়, বুকের গভীর থেকে উঠে আসা। ফাঁকা ঘরে সারারাত কাদল হরনাথ। পাশের বাড়ির টগরী তাকে বুঝিয়ে বলল, ও কাকা, কেঁদো না গো, তুমি কানলে আমি আর চোখের জল এটকে রাখতে পারব না! আমিও তুমার সাথে গলা ফাড়িয়ে কাঁনব।
টগরী আর শিউলি মিতে পাতিয়েছিল জুনানপুরের কালীতলায়। জুড়ানপুরের মা কালী বড়ো জাগ্রত। সবাই বলে-ওখানে মিতে পাতালে সে জোড় নাকি কুনোদিনও ভাঙে না।
টগরী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, কাকা গো, আমাদের জোড় ভেঙে গেল গো! শিউলি আমারে বলেছিল, এবার বড়ো পুজোয় দুজনে মিলে নাগরদোলায় চাপব। আমাদের আর নাগরদোলায় চাপা হল নি গো-ও-ও-ও। টগরী সশব্দে কেঁদে উঠেছিল।
রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে পরের দিন বড়ো গঙ্গার পাড়ে চলে এসেছিল হরনাথ। মা গঙ্গার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের ঝাঁকড়া চুল আক্রোশে চেপে ধরে সে অঝোরধারায় কাঁদল। ডুবা শাক খেয়ে পেটের দায়ে মরল তার বৌ আর মেয়ে। ভারতী আর শিউলিকে খাটিয়ায় চাপিয়ে হাসপাতাল অব্দি নিয়ে যেতে পারেনি কেউ। হাসপাতালেও কোমর জল। মালীপাড়ার কাছে বাঁধ ভেঙেছে। জল নামছিল শ’হাতির চেয়েও বেশি চিৎকারে। মালীপাড়া থেকে হাসপাতালের দূরত্ব একটা বিড়িরও পথ নয়। ফলে হাসপাতালের মাঠটাতে জলের তোড়ে কেউ ঢুকতে পারে না ভয়ে। জল থৈ-থৈ হাসপাতালের কর্মচারী আর ডাক্তার চলে গিয়েছেন জীবনের দায়ে নিরাপদ আশ্রয়ে। এই অবস্থায় কে আর ঝুঁকি নিয়ে ওদের পৌঁছে দেবে হাসপাতালে। ফলে সম্পূর্ণ বিনা চিকিৎসায় মারা গেল ভারতী আর শিউলি। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ওদের চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়াল, ভাগ্যের কী পরিহাস মৃত্যুর পরেও মাটি পেল না ওরা। জলে ভাসিয়ে দিতে হল ওদের পচন ধরা লাশ।
