-কেনে মিচে কতা বলচো ওস্তাদ! রাগে চোখের তারা ঠিকরাতে শুরু করে ভিকনাথের, তুমার মুরোদ আমার জানা আছে। তুমি হলে গিয়ে খেলনা বাঘ, হাঁ করলে খড় বিচুলি বেরিয়ে পড়ে।
-কী বললি?
–যা বললাম তা তো নিজের কানে শুনতে পেলে! মাকালফল দেখেছো? দেখতে সোন্দর পারা। কিন্তু ভেতরটায় গু-গোবর পোরা। কুনো সুয়াদ নেই, ঘেরান নেই। তুমি হলে গিয়ে সেই মাকাল ফল। ভিকনাথ মুখের লালা হাতের চেটোয় মুছে নিল।
তবে রে শালা, যে পাতে খাওয়া সেই পাত ফুটো করা? হাঁপাতে লাগল সুফল ওঝা, তুর অতি বাড় বেড়েছে, ইবার হাতেনাতে তার ফল পাবি। তুর এমন দশা করে ছাড়ব যে ডুবে মরতেও জল পাবি না।
-মেল ফ্যাচর ফ্যাচর করো না তো? মাথায় রাগ চড়ে গেলে ওস্তাদ বলে রেহাই পাবে না। ভিকনাথ খোলা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। বিড়বিড়িয়ে উঠল তার ঠোঁট, মা গঙ্গাবুড়ি, আমারে শক্তি দাও। হারামীটার হাড় যেন আমি ভেগে দিতে পারি।
সুফল ওঝা টলোমলো পায়ে এগিয়ে এল ভিকনাথের সামনে। বুক চিতিয়ে সে হুঙ্কার দিয়ে বলল, গুরুর মুখে মুখে জবাব দিচ্ছিস, তুর ভালো হবেনি বলে দিচ্চি। এখনও সময় আচে নিজেকে সামলা। নাহলে পোড়া কাঠের মতুন তুর এই দেহ গাঙ্গের জলে ভেসে যাবে।
দাঁতে দাঁত চেপে রাগে গরগরিয়ে উঠল ভিকনাথ, তারপর বুনো হাওয়ার মতো চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুফল ওঝার গায়ের উপর। এত আচমকাই ঘটনাটা ঘটল যে সুফল ওঝা নিজেকে বাঁচাবার আর সময় পেল না।
বালিয়াড়িতে জমে উঠল দু-জন মাতাল মানুষের জীবনমরণ লড়াই। গঙ্গা বয়ে যাওয়ার শব্দ হচ্ছিল কুলকুল। ভিকনাথ আক্রোশে সুফল ওঝার মুখ ঠুসে ধরেছে বালিতে, বল শালা, তুই আমার বউয়ের দিকে কেনে লজর উঠিয়ে দেখেছিলিস? ঘরে তুর বৌ নেই? শালা রাছুয়া, শালা লুলার ভাই! আজ তুর গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো করে ছাড়ব।
ছাড়রে, ছাড়রে! বালিতে সুফল ওঝার দম আটকে যাবার জোগাড়, সেদিকে কোনো হুশ নেই ভিকনাথের। সে চুলের মুঠি ধরে ক্রমাগত মাথা ওঠায়, আবার নামায়। কখনও বা শুন্যে মাথা তুলে পাগলের মতো ঝকায়, আমার বউরে তুই রাঢ় রাখতে চাস, দাঁড়া তুর দেখাচ্চি মজা! মন্ত্রফন্ত্র সব তোর গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়ে দেব। মানুষ ঠকিয়ে বড়োলোক হওয়ার বাসনার বেলুনটা আমি বেবুর-কাঁটায় ফুটা করে দেব।
চাঁদ গড়িয়ে যায়, জেলে নৌকো ভাসে গাঙের জলে। জ্যোৎস্নায় চকচক করে বালিচর। দু-জন মাতাল এক সময় গা-হাত-পা এলিয়ে শুয়ে থাকে দু-দিকে, যেন মানুষ নয়, চরে বেকায়দায় আটকে যাওয়া দুটো দিকভ্রান্ত পথহারা বোয়ালমাছ।
.
সকালের আলো চিকচিক করছিল মোটা দানার বালিতে পড়ে। রোদের নরম কামড়ে গা গরম হয়ে উঠছিল ভিকনাথের। হঠাৎ গাঙের দিকে তাকিয়ে তার ঝারির কথা মনে পড়ল। ঝারি কী চায় তার কাছে। হলদিপোঁতা ধাওড়ার সব চাইতে সুন্দরী বউ সে, পাড়ার অন্য কোনো বউয়ের সঙ্গে তার আচার-ব্যবহার মেলে না। সে যেন আকাশ থেকে ঠিকরে পড়া নক্ষত্র। তার দীর্ঘদেহ তরলা বাঁশের মতো সুন্দর, মেদহীন। কাচবরণ শরীরে লাবণ্যর কোনো কমতি নেই। মুখখানা এতই কোমল যেন তা বুড়িগাঙের এঁটেল মাটির চেয়েও নরম এবং লতলতে। ভাসা ভাসা চোখ দুটোয় সর্বদা বিছিয়ে থাকে অপার মুগ্ধ বিস্ময়। দীর্ঘাঙ্গী শরীরের ঢেউ তোলা খাঁজ-ভাঁজ সব যেন মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। ঝারি তার কাছে কী চায় ভিকনাথ ভাবল। অমনি মনের ভেতরে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চের স্রোত বয়ে গেল তাকে পরাজিত করে। ভিকনাথ বুঝল তার পক্ষে ঝারিকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। ঝারি তার হৃৎস্পন্দন। রাতের ঝারি তার সারা দিনের সালসা।
নেশা ছেড়ে যাওয়ার পর শরীর যেন হালকা লাগে ভিকনাথের। দু-হাতে ভর দিয়ে সে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। প্রবাহিত গঙ্গার সামনে মানুষ নিজেকে বুঝি আবিষ্কার করে অপার মুগ্ধতায়। যে কোনো জলের একটা অদৃশ্য মন-কেমন করা শক্তি থাকে। সেই অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ভিকনাথের হঠাৎ মনে পড়ল সুফল ওঝার মুখখানা। গত রাতের পরপর ঘটনাগুলো তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল, এক সময় হাঁপিয়ে উঠল সে। বিবেকের তাড়নায় সে সুফল ওঝাকে দেখতে চাইল আশেপাশে। দৃষ্টির চারপাশে সে শ্মশানের হালকা ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। ঠিক মন খারাপ নয়, এক ধরনের শূন্যতা কিংবা নিঃসঙ্গতায় সে কেমন অসহায়বোধ করল নিজেকে। কাল রাতে নেশার ঘোরে অমন কাণ্ড না করলেই বুঝি ভালো হত। হাজার হোক সুফল ওঝাকে সে গুরু বলে মেনেছে। গুরু নিন্দে, গুরুর অপমান-অমর্যাদা ধর্মে সয় না। এ ঘোরতর পাপ।
ভিকনাথ জলের কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। দেশী মদের বাসি ঘ্রাণে মুখটা কেমন বিস্বাদ হয়ে আছে। আঁজলা ভরে জল তুলে নিয়ে কুলকুচি করল সে। ভালোমতন চোখে-মুখে জলের ছিটে দিল। অতীতকে নেড়ে ঘেঁটে আর বিশেষ লাভ হবে না। অতীত ইঁদুরের গর্তের মতো, একবার ঢুকে গেলে সেই ঘুলঘুলি থেকে বেরনো দায়।
.
ভিকনাথ হাঁটতে লাগল ঘরের দিকে। ঝারির জন্য তার মন বড়ো অস্থির হয়ে উঠল নিমেষে। ঝারিকে ঘরে একা রেখে আসা উচিত হয়নি তার। ঝারির মন ফুলের চেয়েও নরম, তপতপে। সেখানে যে কেউ পাপের স্পর্শ দিয়ে দিতে পারে। ঝারি তো মাটির মতো। মাটিকে যে কেউ নাড়তে ঘাটতে পারে।
