তালগাছ চেরাই করে তাতে আলকাতরা বুলিয়ে চালের কাঠামো তৈরি করেছে লুলারাম। ঢালু হয়ে নামা চালের খড় দাওয়াকে ছায়া দিচ্ছে সবসময়। সেখানে মোটা রশা এ মুড়ো থেকে সে মুড়ো বেঁধে দিয়েছে লুলারাম।
নূপুর সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে উঠে এল ছাদে। দরকার ছাড়া ছাদে তার ওঠা হয় না। কেন ছাদে উঠবে সে? দোতলার ছাদে মোট একটাই ঘর। সেই ঘরে একটা মাত্র ছোট জানলা। পেছনের আমগাছ ডিঙিয়ে যেটুকু আলো আসে সেইটুকু আলোই ঘরের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
দড়িতে কাপড় মেলতে গিয়ে নূপুর কী মনে করে ঘরের দিকে তাকাল। ঝুলন্ত দুটো পা দেখে সবার আগে তার ভূতের কথা মনে হল। দিন দুপুরে ভূত অবিশ্বাস্য। টুকি দিয়ে দেখতে গিয়েই তার গলা ফুড়ে বেরিয়ে এল আর্তনাদ। বাবা গো’ বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নূপুর।
তার আর্তচিৎকার লুলারামকে উঠিয়ে আনল দোতলায়। নূপুরকে দেখার আগে সে দেখতে পায় ঢিলির লাশ। সায়ার খোলে হাওয়া ঢুকে ঘাঘরার মতো গোল হয়ে আছে চারপাশ। চুল ছড়িয়ে আঁধার পুরো মুখ। ফুলে ফেঁপে যাওয়া সেই মুখ আর চেনা যায় না। ঢিলির গায়ে কোনো জামা ছিল না ফলে তার পৃথুলা স্তন দুটো বরফের চাঁইয়ের চেয়েও শক্ত হয়ে লেপটে আছে বুকের নিচে। বিকৃত মুখ থেকে জিভ বেরিয়ে ঝুলে আছে বাঁ দিকে, সেই জিভের রঙ লালচে নয়, ফ্যাকাসে সাদা। শাঁখা রুলি-পলা সেঁটে গিয়েছে ফুলে ফেঁপে ওঠা হাতে। মাছি উড়ছিল ভনভনিয়ে। চতুর্দিকে নাক ঝাঁঝিয়ে ওঠা দুর্গন্ধ।
এক ঝটকায় লুলারামের বমি বেরিয়ে আসতে চাইল। ধুতির খুঁটে নাক চাপা দিয়ে বাইরে এসে ভেঙে পড়ল সে কান্নায়। ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে দোতলার ছাদটাতে। পাড়ার ছেলে বুড়ো এমনকী বউরা-মেয়েরা এসে জড়ো হয়েছে উঠোনে।
নাকে-মুখে গামছা বেঁধে ঢিলিকে নামানো হল কড়িকাঠের ফাঁস কেটে। ঢিলি তার পরনের শাড়িটাকে শেষ সঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছে।
নূপুরের জ্ঞান ফিরতেই তার প্রথম প্রশ্ন, আমার মা কোথায়? ও বাবা, আজ তোমার জন্য আমরা মাকে হারালাম!
নূপুরের এই কান্না শুধু অন্ধ আবেগ নয়, এর মধ্যে অনেক সত্য মিশে আছে। চোরাকুঠুরীতে নিয়ে তার মাকে গুম করে দিতে চেয়েছিল লুলারাম। এই চেষ্টা সে পরপর তিন বার করেছে। তিন বারই মা শীতলাবুড়ি ঢিলিকে শক্তি জুগিয়েছে রুখে দাঁড়াবার।
রুখে দাঁড়ালেও নিজের প্রতি ঘেন্না জন্মেছিল ঢিলির। অমন সোয়ামীর সে আর ভাত খাবে না, অমন সোয়ামীর ঘর সে আর করবে না। সে মরবে।
গুমঘরে লুলারাম তিন ব্যাটারির টর্চ মেরে হন্যে হয়ে খুঁজছিল ঢিলিকে। এমনকী গভীর কুয়োটায় বউটার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাহলে গেল কোথায়? যেখানেই যায় যাক,আর না ফিরলেই ভালো! যদি ফেরে তাহলে গুমঘরের মরণকুয়ায় তার শেষ কাজ সম্পন্ন হবে। কাক-পক্ষীতেও টের পাবে না।
-সাতদিন পরে এ কী বিপদ! লুলারাম কপাল চাপড়ে কেঁদে উঠল। এ কান্না লোক দেখানোর কান্না। এ কান্নার গতি বাড়ল যখন চুনারাম এসে সহানুভূতির হাতটা তার পিঠে রাখল।
-চুপ কর বাপ, মানুষ কি চিরদিন থাকে রে! মানুষ হল গিয়ে কচু পাতার জল, সামলে না রাখলে জল টলমল। চুনারামের কথা শুনে লুলারামের দাঁত লেগে যাবার জোগাড়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে যেন পুরো শরীরটাকে শিমুল তুলোর চাইতে হালকা করে দিল।
শ্মশান থেকে ফিরে বেদম মদ খেয়েছিল ভিকনাথ। হাঁটা চলার ক্ষমতা ছিল না তার। ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় শীত ভেসে আসছিল বুড়িগাঙ ডিঙিয়ে। ঢিলি মারা যাওয়ার পর থেকে ভিকনাথের মনে এক ফোঁটাও শান্তি নেই। সে ঢিলির মৃত্যু চায়নি, সে চেয়েছিল লুলারাম যেন সুফল ওঝার অগ্নিবাণে জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যায়। পাপীকে শাস্তি দিতে গিয়ে কী কাণ্ড বাঁধিয়ে বসল সুফল ওঝা।
চিতা ধরানোর আগে থেকে গলায় মদ ঢালছিল ভিকনাথ। ঘরে ঝারি তার নেশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নাকিসুরে আহ্লাদ করে সে বলেছে, আমার আর ইখানে থাকতে মন করছে না। তুমি আমারে বাপের ঘরে দিয়ে আসবে চলো।
ঝারি কেন চলে যেতে চায় ভিকনাথের তা অজানা নয়। ঢিলির আত্মহত্যার কারণ ঝারিও হতে পারে। বিশেষ করে নূপুরের কান্নায় সেই ঝাঁঝ পেয়েছে অনেকেই। ঝারির এখন পাড়া থেকে চলে যাওয়া মঙ্গলের। লুলারামের সঙ্গে লতায়-পাতায় সম্পর্কটা এখন ন’মাসের পেটের মতো স্পষ্ট ভাবে দেখা দিয়েছে সবার চোখে। ভিকনাথ ঝিঁঝি কানা। তাই সে দেখেও কিছু দেখতে পায় না। পাগল হয়ে সে এখন সুফল ওঝার পেছন পেছন ঘুরছে। সুফল ওঝাও কম ঘুঘু নয়, তার হাত দিয়ে ছাই গলে না, সে আবার প্রাণভরে মন্ত্র দেবে কি করে?
চিতা নিভিয়ে ফিরে গিয়েছে শ্মশানযাত্রী।
বাবলা গাছে ঠেস দিয়ে নেশার ঘোরে বসেছিল ভিকনাথ। তার কিছু দূরে হাত-পা ছড়িয়ে বালির উপর শুয়ে পড়েছে মদে ক্লান্ত সুফল ওঝা। মাঝেমাঝেই কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল ওর, সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সব ছারখার হয়ে যাবে। এই তো খেল শুরু।
কথাগুলো সহ্য হল না ভিকনাথের। সুফল ওঝার বুজরুকি সে ধরে ফেলেছে। কথায় চিড়ে ভিজে না, কথায় শুধু ছলনা।
সুফল ওঝা জড়ানো গলায় বলল, ঢিলিকে শেষ করে দিলাম, এবার লুলাটাকে দেখব। ওর বড়ো বাড় বেড়েচে। ওর বাড় আমি ভাঙব। তারপর বুড়িগাঙে ডুব দিয়ে দায়মুক্ত হবো।
