গোরুর গাড়ির চড়া পড়া পথটা সোজা চলে গিয়েছে গ্রামের ভিতর। সেই পথের পাশ ঘেঁষে কঞ্চির বেড়া। বেড়ার উল্টোদিকে সিঁদুর পড়লে তোলা যাবে এমন ঝকঝকে তকতকে নিকোনো উঠোন।
উৎসাহ আর আগ্রহ চাপতে অক্ষম হল দুর্গামণি, হাতের নারকেল ঝাঁটা মাঝ উঠোনে ফেলে সে এগিয়ে গেল ঢিলির কাছে। ঢিলিও তাকে দেখতে পেয়ে বেড়ার কাছে মুখ উঁচিয়ে দাঁড়াল, হা দিদি গো, কৎদিন পরে আমি তুমারে দেখলাম।
দুর্গামণির উৎসুক্য হারিয়ে গেল। সে শুধু চোখ ভরে দেখতে লাগল ঢিলির বদলে যাওয়া শরীরের গড়ন। এক সময় উৎসাহ চেপে না রাখতে পেরে শুধালো, তুর কি হয়েচে রে ঢিলি, এতদিন কুথায় ছিলিস? ঢিলি হালকা ভাবে হাসল, কুথায় আর যাবো দিদি, মরতে গেছিলাম। তখুন মাথার আমার ঠিক ছিল না। কে যে কখন আমারে বিষ ঢেলে দিল টের পেলাম না। হা দিদি, আমার এমুন পুকাড়ে ভাগ্য যে চিটেধানেও বীজতলায় ফলন হলো। সেই জ্বালায় তুমার দেওর মরচে। আমারে গলা টিপে মারতে চাইল দু-তিনবার। দু-তিনবারই মা শীতলাবুড়ি আমাকে বেঁচিয়ে দিল। নইলে কবে আমি মরে ভূত হয়ে যেতাম! তুমার সাথে আর দেখাই হত না।
-চুপ কর মুখপুড়ী, অমন কতা আর বলিস নে! চাপা গলায় সতর্ক করল দুর্গামণি।
ঢিলি হাসল না, শুধু শরীর ঝাঁকিয়ে কেমন অবজ্ঞার হাসি হেসে উঠল, কেনে চুপ করব দিদি, কিসের জন্যি? তুমার দেওর আমারে দুনিয়া থিকে সরিয়ে দিতে চায়। ও আমাকে মারবে তারপর দম লিবে। তবে আমিও বুনো-ঘরের ঝি। ওর মনোবাসনা আমি পূর্ণ হতে দিব না।
-চুপ কর, শান্ত হ। দুর্গামণি বড়ো দিদির মতো তাকে বোঝাল, যে এসেছে সে তো তুর সন্তান। অন্যকে সাজা দিতে গিয়ে পেটেরটাকে সরিয়ে দিবি নে। শরীরের ফুল আর গাছের ফুলের মধ্যে শুধু এইটুকুন ফারাক থাকে।
ঢিলি কথা বলতে পারল না, ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল থরথরিয়ে। দুর্গামণির মুখের দিকে তাকিয়ে সে কেঁদে উঠল ঝাঁকুনি দিয়ে, আমি মরব দিদি, মরব। আমি না মরলে ওর হাড়ে বাতাস লাগবে নি যে! ঢিলি চোখ মুছে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
দুর্গামণি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, লক্ষ্মী বুন আমার, মাথা গরম করিস নে।
ভিকনাথের বউটারে আমি বুঝিয়ে বলব, সে যেন কদিন বাপের ঘর থিকে ঘুরে আসে।
–সে ঢেমনী তুমার কথা শুনবে নি। ঢিলি জোর গলায় বলল, লেড়ি কুত্তির লেজ কি কখনো সোজা হয় গো। যতই সোজা করো–সেই লেজ আবার যেই কে সেই।
–তবু চিষ্টা করতে দুষ কুথায়?
ঢিলি পানসে হেসে বলল, না, দোষের কিছু নাই। তবে কি জান দিদি, মেয়ে দুটো আমার পর হয়ে গেল! যেদিন শুনেচে আমার ছানাপুনা হবে সেদিন থিকে কথা বলে না। ওরা আমাকে ঘেন্না করে। নূপুরটা তো মুখের উপর বলে দিল, অমন মায়ের মুখ দেখাও পাপ।
–এসব লিয়ে ভাববিনে। নিজের রক্ত কুনোদিন পর হয় না।
–সে আমি জানি গো তবু মনটা কেমুন কেমুন করে।
দুর্গামণি আন্তরিকতার সঙ্গে বলল, আগড় খুলে ভেতরে আয়। কদিন মুখোমুখি বসে তুর সাথে কথা বলিনি
-যাব না দিদি, মেলা কাজ আচে। পরে আসবখন। হাওয়া যেমন যায় ঢিলি তেমনই চলে গেল।
.
১৯.
সংসারের ঝামেলায় ঢিলির কথা ভুলে গিয়েছিল দুর্গামণি, হঠাৎ পাড়া ঘুরে এসে রঘুনাথ দ্বিধার সঙ্গে বলল, জানো মা, কাকিরে আবার পাওয়া যাচ্চে না। কাকারে দেখলাম মুকামপাড়ার দিকে যেতে। আমার সাথে চোখাচোখি হল কিন্তুক কথা বলল না।
–তার কি মাথার ঠিক আছে বাপ? দুর্গামণি সহজভাবে বলল, ওই মানুষটার মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল দশা। ও বলে এখুনো ঘুরচে-ফিরছে। অন্য কেউ হলে নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যেত।
-কাকা নিজের দোষে নিজে পাগল হয়েচে। কথাগুলো রঘুনাথ ফস করে বলে ফেলল।
অসহিষ্ণু চোখে তাকাল দুর্গামণি, তার চোখে মুখে বিরক্তির ঝাঁঝ ফুটে উঠল, তুই অতোটুকুন ছেলে, তুই কি বুঝিস মানুষের দুঃখ-জ্বালা। হট করে কারোর সম্বন্ধে কুনো কিছু বলা উচিত লয়। সব দিক বেচার-বিবেচনা করে কথা বলতে হয়। নাহলে লুকে তুরে বুকা ভাববে।
এতটা কড়া উত্তর মায়ের কাছ থেকে আশা করেনি রঘুনাথ, জবাব শুনে সে নিষ্প্রভ চোখে তাকাল, কাকি নাকি আর কুনোদিন ভালো হবে না? এসব কথা সত্যি, মা?
–আমি জানি নে যা। দুর্গামণি মুখ ঝামাটা দিয়ে উঠল, ছোট মুকে বড়ো কতা বললে খারাপ শোনায়। তুই আর এসব নিয়ে কুনোদিন কিছু বলবি নে।
রঘুনাথের বুকের ভেতরটায় বুঝি পাখি উড়ছিল, সে ছটফটিয়ে বলল, কাকি যে কুথায় গেল কে জানে।
দুর্গামণি রঘুনাথকে বুঝিয়ে বলল, তুর কাকি যেখানেই থাকুক তার দেখা আমরা ঠিক পাবই পাব। এ অবস্থায় সে বেশি দূর যাবে না। যাওয়া তার পক্ষে সম্ভবও নয়।
রঘুনাথ চলে যাওয়ার পর ঢিলির চিন্তায় দুর্গামণির মনটা অস্থির হয়ে উঠল। বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটা প্রশ্ন তার মনে উঁকি দিয়ে গেল–ঢিলিটা গেল কুথায়? তিন দিন ধরে বুনটা যাবে কুথায়?
.
তিন দিন নয় সাত দিনের মাথায় ঢিলিকে দেখে জ্ঞান হারাল নূপুর। টিপটিপ বৃষ্টিতে সকাল থেকে মেঘে ছেয়েছিল আকাশ। কাপড়চোপড় শুকানো দায়। একটু রোদ উঠলে আবার শুরু হয় বৃষ্টি। কখনো ঝিরঝিরে, কখনো মোটা দানার বৃষ্টি। আধ শুকনো কাপড় তুলতে এখন নূপুরকে ছুটে আসতে হয় বাইরে। কার এত সময় আছে হাতে যে বারবার ছুটে আসবে।
মাটির ঘরের দোতলা ছাদটা প্রায়ই ফাঁকাই পড়ে থাকে লুলারামের। বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা সামনের জায়গাটা। ফাঁক ফাঁক বেড়ার মতো। হাওয়া-বাতাস খেলে বেড়ায় সেই ফাঁক-ফোকর দিয়ে।
