ফি হপ্তার আটা বিক্রির টাকাটা লুকিয়ে রাখে সবুজ। ইস্কুলে গিয়ে মিঠে বরফ কিনে খায়। মন হলে বেলডাঙার তিলের খাজা গুড়ের নাড়ু কত কি! হাতে যতক্ষণ পয়সা আছে ততক্ষণ সে রাজা। পয়সা ফুরোলে মন বিমর্ষ। তখন মনের ভেতর আবোল-তাবোল চিন্তা উঁকি মারে। সেই চিন্তাগুলো সুঁচলো কুশগাছের মতো মনটাকে খোঁচায়। তখন ক্লাসের মেয়েগুলোকে নিয়ে ভাবনা শুরু করে সে। সকালবেলায় সে সব ভাবনার কথা ফলাও করে বন্ধুদের বলবেই বলবে নাহলে ওর ভাত হজম হবে না।
কিচেনের সামনে দৌড়ে এসে রঘুনাথকে ধরে ফেলল সবুজ। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তোর সাথে খুব দরকারি কথা আছে। আমি ভাবলাম–তোদের পাড়ার আমি জামাই হবো। দেখ না ভাই–চোখে লাগার মতো যদি কোনো মেয়ে থাকে?
রঘুনাথ হাসবে না কাঁদবে বুঝে পেল না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, তাকে অবাক করে দিয়ে সবুজ বলল, আমি শুভর মতো ভালোছেলে জীবনে আর হবো না। আমার যা হবার হয়ে গিয়েছে। দ্যাখ না রঘু, আমার জন্য যদি কোনো ব্যবস্থা হয়। বিশ্বেস কর–আমি কোনো পণ নেব না। কথা দিচ্ছি–বুড়োমাতলায় গিয়ে বিয়ে করব। তোরা সব সাক্ষী দিবি। কি রে দিবি তো?
রঘুনাথ অনেকক্ষণ পরে গলা ফাড়িয়ে হাসল। শুভ ব্যাপারটাকে হাল্কা করার জন্য বলল, পাগলের কথা বাদ দে তো! পাগলে কী না বলে–ওসব কথা মনে রাখতে নেই।
সবুজ মননক্ষুণ্ণ হয়, সত্যি কথাকে তোরা কেন গুরুত্ব দিস না বল তো। জানিস আমার দাদু পনের বছরে বিয়ে করেছিল। তার পরের বছর আমার বাবা হয়। বলতে কি আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল ওদের!
ঘরে যাওয়ার জন্য তাড়া ছিল রঘুনাথের, এতটা রাস্তা ফাঁকা বাঁধের ওপর দিয়ে একা যাওয়া মুখের কথা নয়। সাঁঝ নেমে এলে পথঘাট সব শুনশান হয়ে পড়ে, চরসুজাপুর-দোয়েমের রাস্তাটা একলা শুয়ে থাকে আঁধার বুকে জড়িয়ে। দশ দিনও হয়নি সুজাপুরের ঘোষেদের লোকটার সাইকেল কেড়ে নিয়েছিল কারা যেন এই বাঁধের গোড়ায়। শুধু সাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে তারা শান্ত হয়নি, মানুষটার মাথা ফাটিয়ে দিয়ে সর্বস্ব নিয়ে পালিয়ে গেল। গাঁয়ে-ঘরে এসব ঘটনা এখন আকছার ঘটছে।
রঘুনাথ ব্যস্ততার সঙ্গে বলল, বেলা মরে গেল, এখুন আমি যাই।
শুভ মন খারাপ করা চোখে তাকাল। তুই চলে গেলে ভাল্ লাগে না। আবার কবে আসবি রঘু?
সময় পেলেই চলে আসব। রঘুনাথ ওদের কাছ থেকে দ্রুত আলাদা হতে চাইছিল তখনই হাসপাতালের স্টাফ অরূপবাবু কোঁচা দুলিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভদ্রলোক গায়ে পড়া নন তবে যেচে কথা বলার স্বভাব, এই যে তোমরা তিনজনে মিলে কী পরিকল্পনা করছো? আচ্ছা সামনে তোমাদের পরীক্ষা না? এখন গুলতানি দেওয়া কি উচিত? মনে রেখো-ছাত্ৰনাং অধ্যয়নং তপঃ।
শুভ তার বিরক্তি নিজের ভেতর লুকাতে চাইল। সবুজ উশখুশিয়ে উঠে ঘাসের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। রঘুনাথ এসবের ধার ধারে না। লেখাপড়া তার ধাতে নেই ফলে লেখাপড়ার চর্চা হলে তার মাথায় কিছু ঢোকে না, লেখাপড়া সংক্রান্ত আলোচনাগুলো আকাশের পাখির মতো তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়, নিজেকে সে তখন খুব অসহায় বোধ করে এবং হীনমন্যতায় ভোগে। দ্রুত আঁধার নেমে আসা চরাচরে আলোর স্বল্পতা তার চিন্তা উদ্বেগকে আরো ক্ষিপ্র করে তোলে, সে অস্থির হয়ে বেরসিকের মতো বলে, আমি যাই রে, বড্ড দেরি হয়ে গেল!
-এই যে তুমি, আমি তোমাকে বলছি–এই ভর সন্ধেবেলা তুমি কোথায় যেতে চাইছ? অরূপবাবুর টানা টানা, বিকৃত-স্বরের কথাগুলো মোটেও সুখ দিল না ওদের, শুভ মাথা তুলে সাহস করে বলল, কাকু ওর নাম রঘুনাথ। শেরপুর ধাওড়াপাড়ায় থাকে। ও সকালে ডাকাত দেখতে এসেছিল। এখন ঘরে ফিরে যাচ্ছে।
-ওঃ, দ্যাটস গুড! অরূপবাবু চশমা নাকের উপর ঝুলিয়ে তাকালেন, কি নাম বললে যেন?
-রঘুনাথ। সবুজ ঠোঁট টিপে হাসতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল, অরূপবাবুকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। মানুষটার বিকৃত স্বভাব। চিবিয়ে কথা বলার প্রবণতা তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। মানুষের মন বোঝার ক্ষমতা বুঝি অরূপবাবু হারিয়ে ফেলেছেন।
রঘুনাথ ওদের সম্মতির তোয়াক্কা না করে হনহনিয়ে হেঁটে গেল হাসপাতালের গেট পর্যন্ত। তাকে চলে যেতে দেখে এক ছুটে শুভও পৌঁছে গেল হাসপাতালের গেটে। রঘুনাথ শুভর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, আবার আসব রে। ইবার আসলে হাতে সময় নিয়ে আসবখন। তেমন দরকার হলে তোদের ঘরে থেকে যাব।
-এবার যখন আসবি, বাঁশি নিয়ে আসবি। রাতেরবেলায় বাঁশি শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। শুভ রাস্তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। রঘুনাথ অন্ধকারে দেবদারু গাছের মতো শিরদাঁড়া সোজা করে হেঁটে যাচ্ছে। তার স্বাভাবিক গতিতে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে লেবু চিপকানো দুধের মতো।
এক একদিন কুয়াশার দল বুড়িগাঙের জলের উপর ভেসে বেড়ায় মাছের গুঁড়ি গুঁড়ি ডিমের মতো, হাওয়া এলে ওরা চঞ্চল হয়ে ওঠে, বাতাসে ভাসতে ভাসতে মজাসে চলে যায় বহু দূরে, ওরা জানে রোদ উঠলে ওদের আর কেরামতি সাজবে না।
খুব ভোরে ওঠা দুর্গামণির স্বভাব। উঠোন ঝাঁটাতে গিয়ে তার হঠাৎ নজরে পড়ল ঢিলির উঁচু হওয়া পেটখানা। ঢিলির যে এই উন্নতি হয়েছে ঘুণাক্ষরেও জানত না দুর্গামণি। ফলে সকালবেলায় ঢিলিকে দেখে সে অবাক না হয়ে পারল না।
