রঘুনাথ হাসল। জলে নামলে তার চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল হয়ে ওঠে। আবার ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হয়। তবে সময় লাগে।
পাশাপাশি খেতে বসে শুভ দেখল হাঁসের ডিমের ঝোল রেঁধেছে তার মা। ঝোলটার এত সুন্দর রঙ যা দেখলে জল চলে আসে জিভে। শুভ আড়চোখে দেখে নিল পাঁচটা ডিম ঝোলে ভাসছে পৃথিবীর বড়ো মোতির আকার নিয়ে। হিসাব মতে চারটে ডিম হলে ওদের সবার হয়ে যাবে। একটা অতিরিক্ত ডিম কিসের জন্য রাঁধল মা। এই প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে গেল শুভর ভেতর। হঠাৎ সে দেখল একটা আস্ত ডিম খুন্তি দিয়ে দু’ভাগ করে তার মা সাজিয়ে দিচ্ছে দু-জনের পাতে। কাটা ডিমের সুঘ্রাণটাই আলাদা, কারোর সঙ্গে মেলে না। এই গন্ধটাই বিশেষ পছন্দ শুভর। তাছাড়া ডিম খেতে তার ভালো লাগে। ভালো লাগার একটাই কারণ–ডিমে কোনো কাঁটা নেই।
বিকেলের আলো গড়িয়ে নামছিল পৃথিবীতে। শীতের বেলা চওড়া উঠোন নয়, হাতের তালুর মতো। শুভর ইচ্ছা ছিল আজও চামগুলতি নিয়ে বাঁশঝাড়ে যাওয়ার। রাজি হল না রঘুনাথ।
চোখ দুটো কুঁচকে সে বলল, এক একজন মানুষ থাকে যাদের দেখলে পরে মাথাটা কুদরীলতার মতো ভক্তিতে নুয়ে আসে। আমার মনে হয় হাফিজ ডাকাতও সেরকম মানুষ। আমার কাকা ভালোমানুষের সঙ্গে মিশেছিল। সে যে ভুল করেনি–এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। শুভ মুখটা আকাশের দিকে উঠিয়ে অদ্ভুত গলায় বলল, তোর কাকাকে আমি দেখিনি। তবে তার কথা শুনে শুনে আমি তার ভক্ত হয়ে গিয়েচি। একদিন আমাকে নিয়ে যাস, আমি তোর কাকার সঙ্গে আলাপ করে আসব।
রঘুনাথ নীরবে শুভর মুখের দিকে তাকাল, কবে যাবি বল? তুই গেলে আমি তীর-ধনুক নিয়ে মাঠে যাবো গুড়ুল পাখি আর খরগোস মারতে।
কথাটা শুনে ভালো লাগল শুভর। গুরুত্ব সবাই পেতে চায়। গুরুত্বহীন মানুষের কোনো মূল্য নেই এ পৃথিবীতে। রঘুনাথের কথাগুলো তার মনে কদমফুলের পাপড়ির মতো জায়গা করে নিল নিজস্ব ক্ষমতায়।
বিকেলের রোদ সব ঋতুতেই মিঠে।
হাসপাতালের মাঠের মাঝখান দিয়ে পায়ের চড়া ফেলা পথ, পদপিষ্ট ঘাস উঠে গিয়ে শিরদাঁড়ার হাড়ের মতো সরু। শুভ আর রঘুনাথ পাশাপাশি হাঁটছিল, ওদের পায়ে ব্যস্ততা কেন না রোদ ঢলার আগে রঘুনাথকে পৌঁছাতে হবে হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। দুপুরে না যাওয়ার জন্য শুধু মা নয়, কাকাও চিন্তা করবে। যত তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায় ততই মঙ্গল।
শুভ সহজে ছাড়ার ছেলে নয়। রঘুনাথ তার চেয়ে বয়সে বড় হলেও ওরা দুটিতে বন্ধুর মতো মিশছে। সম্পর্কের জড়তা কেটে গিয়ে ওরা এখন একে অপরের কাছাকাছি।
হাসপাতালের কিচেনটা দূর থেকে দেখতে পেল রঘুনাথ। কাকিমা ভর্তি থাকার সময় কতবার সে এখানে এসেছে। শুভ আর সবুজ কোয়ার্টার থেকে চলে এসেছে গল্প করার টানে। ওদের গল্পের কোনো মাথা মুণ্ড নেই, ওদের কথাগুলো যেন স্বর্ণলতার মূল, যা ফুরোয় না, যার শেষ নেই শুরু নেই–আদি অনন্ত।
রঘুনাথ হাঁ করে শোনে ওদের কথা।
সবুজ অকপটে বলে, মেয়ে দেখলে বুক এখনও ঢিসঢিস করে। মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে তার বায়স্কোপ দেখার আনন্দ হয়। তার যদি বিয়ে হয়ে যেত তাহলে সে আর বেশি দূর পড়ত না। কয়লার ব্যবসা করত। দুপুরবেলায় ফিরে এসে বউয়ের বাড়া ভাত খেত।
সবুজের কথা শুনে হা-হা করে হাসল শুভ, তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস। তোর বাবা যদি এমন কথা শোনে তাহলে মারতে মারতে ঘর থেকে বের করে দেবে।
সবুজ দুঃখী হল না, বরং খুশি হল আরও, ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলে আমি বেঁচে যাই। আমার বাবাকে তো চিনিস না–কী জিনিস। বাঁধের এপারে পুঁতে দিলে গাছের ওপারে গিয়ে গাছ বেরবে। মাথায় যদি পেরেক ঢুকিয়ে দিস তাহলে স্ক্রু হয়ে বেরিয়ে আসবে।
সবুজের কথা মিথ্যে নয়। টিকেদারবাবুর উপস্থিত বুদ্ধির কাছে এ হাসপাতালের সবাই বুঝি শিশু। এমন কী ডাক্তারবাবুও মানুষটাকে মান্য করে কথা বলেন। সমস্যায় পড়লে ডেকে আনেন টিকেদারবাবুকে।
সবুজের বিয়ে করার ইচ্ছেটা ক্লাস টেন-এ ওঠার পরে প্রবল হয়েছে। মেয়েদের সৌন্দর্য তাকে বানের জলের মতো টানে। মনে মনে সে পাগল হয়ে ওঠে। এটা বানানো নয়, একেবারে রক্তজাত। এর মধ্যে দু-চারজনকে প্রেম নিবেদন করে সে বকা খেয়েছে। সবাই তাকে ক্ষমা করে দিলেও মাধুরী তাকে ক্ষমা করেনি। এক ক্লাস নীচে পড়া মাধুরীর মানসম্মান জ্ঞান যথেষ্ট। সে ফালতু কথা পছন্দ করে না। সবুজকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, বাড়াবাড়ি করবি নে তাহলে তোর বাবাকে আমি সব বলে দেব। পিঠের চামড়া যদি ফাটাতে না চাস তাহলে মুখটাতে গামছা গুঁজে রাখ। তোর মুখ ড্রেনের চেয়েও নোংরা।
কী করে নোংরা হয়, আমি যে দু-বেলা দাঁত মাজি। সবুজের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
যাওয়ার সময় সবুজের সঙ্গে দেখা হল না রঘুনাথের, সে পালদের গমকলে গিয়েছে থলি ভর্তি গম নিয়ে। শুভ জানে–একবার গম ভাঙাতে গেলে সবুজ সারা সপ্তাহের হাতখরচ উঠিয়ে নেবে। চাকিতে আটা বেচে দেয় সবুজ। দশ কেজি গমের আটা দশ কেজি হবার কথা। সেই দশ কেজির মধ্যে থেকে দেড় কেজি আটা বিক্রি করে দিলে ঘরে কার বোঝার সাধ্যি আছে। যদি কেউ সন্দেহ করে তাকে অন্যভাবে বোঝানো যাবে। সেসব কাজে সবুজ ভীষণ পারদর্শী। নাটুকে গলায় বলবে, নতুন চাকির আটা, একটু তো কম হবে। যাঁতাই তো কত আটা খেয়ে নেয়। মেশিন না খেলে মানুষ খাবে কি করে?
