সেদিন গভীর রাতে মোতিবিবির সাথে গোপনে দেখা করে এসেছিল লুলারাম। নগদ কিছু টাকা আর ডাকাতির কিছু সোনাদানা মোতিবিবির হাতে তুলে দিয়ে কাতর হয়ে বলেছিল, ভাবী যদি কুনোদিন দরকার হয় আমাকে খপর দিও। তুমাদের জন্যি সদা-সর্বদা আমার জান-হাজির থাকবে। হাফিজ ভাইয়ের কাছে এ বান্দার জীবন বাঁধা আচে। টাকা পয়সা সোনাদানা দিয়ে এ ঋণ কুনোদিনও শোধ হবে না।
ডাকাত দেখতে কালীগঞ্জ হাসপাতালে দুপুরবেলায় ছুটে গিয়েছিল রঘু। এর আগে সে কোনোদিন ডাকাত দেখার সুযোগ পায়নি। হাফিজ ডাকাতের নাম জ্ঞানপড়ার পর থেকে সে শুনছে। মানুষটা নাকি কাঁড়া-মোষের মতন দেখতে। মাংসখেগো বাঘের মতো নাকি তার রাগ। তেজে খরিস সাপকে সে হরিয়ে দেবে। এমন মানুষের দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা। বাঁধ ধরে পইপই করে ছুটে গিয়েছিল রঘুনাথ। পাকা রাস্তা ধরে নয়, সে গিয়েছিল থানার পাশ দিয়ে। বড়ো পাকুড়গাছটার পাশ দিয়ে ঢালু পথ সোজা নেমে গিয়েছে কামারপাড়ার দিকে। কামারপাড়া শেষ হলে শুরু হয় হাসপাতালের পাঁচিল।
আউট-ডোরের সামনে বুক চিতিয়ে শুয়েছিল হাফিজ ডাকাত। বুনো মোষের মতো পেশিবহুল চেহারা, ভরাট মুখ, চওড়া কপাল। দুটো পা যেন দুটো ইলেকট্রিক খাম্বা। সেই খাম্বা কেউ ভেঙে দিয়েছে জোর করে। চামড়া ফুটো হয়ে বেরিয়ে আছে সাদা হাড়। জমাট বাঁধা কালচে রক্ত চাপ বেঁধে আছে শ্যামলা মুখে, বোজা চোখ ফুলে একেবারে কমলালেবুর কোয়া, থেতলানো ঠোঁট চিপসে গিয়েছে দাঁতে। সাদা দাঁতে লেগে আছে ঠোঁটের মাংস। রঘুনাথের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। ঘরে গিয়ে কাকাকে সবিস্তারে বলতে হবে। কাকা পথ চেয়ে থাকবে তার। রঘুনাথ বুঝতে পারল হাফিজের সঙ্গে তার কাকার দহরম মহরম ছিল জব্বর। হাফিজ ডাকাতের মৃত্যুতে বেজায় দুঃখ পেয়েছে লুলারাম।
হাসপাতালের ঘাসে ঢাকা মাঠটাতে ডাকাত দেখার ভিড় উপচে পড়ছে। ভেসে আসছে নানা মানুষের হাজার কথা। রঘুনাথের ঝাঁ-ঝাঁ করছিল কান। ভিড় কোনকালেই পছন্দ নয় তার। শুধু মেলার ভিড় তার যা ভালো লাগে।
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে শুভ তার হাত ধরল, কখন এলি?
-এই তো। রঘুনাথ চোখ ছোট করে তাকাল, এমন মরণ চোখে দেখা যায় না। আহা রে, এভাবে কাউকে মারতে হয় বুঝি?
-হাফিজ ডাকাত ভীষণ রাগী ডাকাত। ওকে পুলিশও ধরতে পারত না।
-রাগী হলেও মানুষটার মন ভেষণ ভালো ছিল। রঘুনাথ সহানুভূতির সঙ্গে বলল, জানিস, ও আমার কাকার খুব জানাশোনা।
শুভ কি মনে করে ঠোঁটের উপর তর্জনী চেপে রঘুনাথকে সতর্ক করল, চুপ। ওকথা এখানে বলিস না। বিপদ ঘটে যাবে। চল ফাঁকায় দাঁড়াই।
ফাঁকায় দাঁড়িয়ে এই শীতেও ঘামছিল রঘুনাথ। মনে মনে তার ইচ্ছে ছিল সে বড়ো হয়ে ডাকাত হবে। কেন না ডাকাতদের সবাই ভয় করে। তাছাড়া চোর অপবাদের চাইতে ডাকাত অপবাদ ঢের ভালো।
শুভ বলল, হাফিজ ডাকাত যদি কোনমতে পালিয়ে যেতে পারত তাহলে যারা তাকে ধরেছিল তাদের সে পিঁপড়ের মতো টিপে টিপে মারত।
বুড়ো আঙুল কামড়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেল রঘুনাথ। বারবার করে একটা মানুষের লাশ তার চোখে ভেসে উঠছে। হাফিজ ডাকাতের মুখটা সে কিছুতেই ভুলে যেতে পারছে না।
শুভ বলল, এত বেলায় যখন এসেছিস তখন খেয়ে যাবি। চল মাকে খবরটা দিয়ে আসি।
.
১৮.
হাসপাতালের কোয়ার্টারগুলো ছোট ছোট, মাটি উঁচু করে পথ বানিয়েছে হাসপাতালের কর্মীরা। বর্ষায় জল জমে যায় এসব পথে, তখন যাতায়াতের অসুবিধা। বড়ো একটা আমগাছ ছাড়া তেমন কোনো গাছ নজরে পড়ে না রঘুনাথের। কোণের দিকের ঘরটার সামনে মস্ত একটা আমড়াগাছ প্রায় ন্যাড়া শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কদিন পরে কচি কচি পাতা গজাবে গাছের ডালে। বেশ রূপবান হয়ে উঠবে গাছটা। রঘুনাথকে দেখে সরস্বতী নরম করে হাসল, কখন এলি রঘু? আয়। বস।
–আমি ডাকত দেখতে এসেছিলাম। শুভর সাথে দেখা হতেই ও ধরে আনল।
বেশ ভালো তো। সরস্বতী বলল, খেয়ে-দেয়ে বিকেলে যাবি। শুভ তোর কথা খুব বলে। আর বলবে না কেন? তুই কত ভালো ছেলে বল তো?
মনে মনে হাসল রঘুনাথ। সে কত ভালো ছেলে তা সে নিজেই জানে। তার সহজ সরল মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরিণত মন। কমলাকে দেখলে সেই মনটা হঠাৎ যুবক হয়ে ওঠে। কমলা তবু গাল ফুলিয়ে বলে, তোমার কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই, তুমি বোকার হদ্দ।
শুভদের একটাই ঘর। একটা কমা কাঠের খাট পাতা, অবনী বছর তিনেক আগে কালীপুজোর সময় কিনে ছিল খাটটা। সেই খাটের উপর তালাই যত্ন নিয়ে বিছিয়ে দিয়েছে সরস্বতী। অত বড়ো খাটে অবনী আর শুভ ছাড়া কেউ ঘুমায় না। সরস্বতী খাটে ঘুমালে ঘুম আসে না। সারারাত শুধু বিড়বিড় করে। তারপর একসময় বিরক্ত হয়ে নেমে আসে খাট থেকে। নীচে বিছানা পেতে ঘুমায়। আর ঘুমানোর সাথে সাথে নাক ডাকে। তার নাক ডাকার শব্দে বিরক্ত হয় অবনী, আটা কল চলচে। বাপরে বাপ, কী শব্দ!
দুপুরবেলায় পালপুকুর থেকে গা ধুয়ে এল শুভ আর রঘুনাথ। ডুব সাঁতারে পালপুকুরের অন্য পাড় ছুঁয়ে দিল রঘুনাথ। তাই দেখে শুভর আর বিস্ময় ধরে না, বাপরে, কী দম তোর বুকে পোরা! তোর সাথে কেউ ডুব সাঁতারে পারবে-ই না।
শুভ সাঁতার জানে কিন্তু সেই জানাটা যথেষ্ট নয়। তবে সবুজ বলে, সাঁতার আর সাইকেল চড়া জীবনে কেউ ভোলে না। একবার শিখলে মরার আগের দিন পর্যন্ত মনে থাকে।
