মুনিরাম কুঁকুড়ে যাওয়া গলায় বলল, জীবনে চুরি করাটাকে আমি কুনোদিন পাপ বলে ভাবিনি। আমি ভেবেচি-ওটাও একটা ধম্মো। শুধু মুনিষ খেটে, গোরু চরিয়ে, ভিখ মেঙে জীবন বাঁচে না। জীবনের জন্যি পয়সা চাই। চাঁদির জুতো হলো এমন জিনিস যা তুরে বাবু-ভদ্দর লুকদের মধ্যিখানে লিয়ে যাবে। যার পয়সা নেই তার পুড়া কপাল। মনে রাখিস চাঁদির জুতোয় কাঠের পুতুল হাঁ-করে।
–আমি এখুন উঠিরে। চুনারাম এই আলোচনায় হাঁপিয়ে উঠছিল, দলছুট বকের মতো সে যেন পালিয়ে বাঁচতে চাইছে অন্য আকাশে। অভাব তাকে কোনোদিন টেনে নীচে নামায়নি, সে আধপেটা খেয়েছে তবু কোনোদিন বিসর্জন দেয়নি ধর্ম।
কুথায় যাবি সাতসকালে? মুনিরাম অস্থির চোখে তাকাল, আমারে টুকে লিয়ে যাবি? কদিন পাকুড়তলায় যাইনি। ওখানে গেলে পরে আমার মনের জোর বেড়ে যায়। পাকুড়তলার বাতাসে কি আচে জানি নে, আমার মনে হয় আমি আরো ঢেরদিন বাঁচব। চুনারামকে চিন্তিত দেখাল সহসা, তুই অতটা পথ হেঁটে যেতে পারবি? তুর কষ্ট হবে না তো?
কষ্ট হলে আর কি হবে? ঘর যদি বুকে চেপে বসে তাহলে বাইরে গিয়ে বুকের সেই খিল ছাড়াতে হয়। লাঠিতে ভর দিয়ে মুনিরাম বহু কষ্টে উঠে দাঁড়াল।
নোলক এসে তার নড়বড়ে অবস্থা দেখে বলল, দাদু গো, আমি কি তুমার সাথে যাবো?
দরকার হবে নি। মুনিরাম এড়িয়ে যেতে চাইল।
বেড়ার কাছে এসে আগড় খুলল চুনারাম। শীতের রোদ তখনও পথের কাদা সম্পূর্ণভাবে খড়খড়ে শুকনো করে দিতে পারেনি। তখনও ঘাসের ডগায় লেগে আছে শিশিরের ছোঁয়া, বসাকগাছের পাতা ভিজে আছে শিশির জলে, পাতামাছের মতো বাঁশপাতা হাওয়ায় দুলছে টলোমলো যেন সকালবেলায় তারা চুল্লু টেনেছে ভরপেট।
কাল সকালে থানা থেকে লোক এসেছিল লুলারামকে ডাকার জন্য। জিপে নয় সাইকেলে চেপে এসেছিল মুখ চেনা পুলিশটা। লুলারাম তখন ঘুমোচ্ছিল ঘরে। হাঁক ডাকে চোখ রগড়ে বাইরে এসে দেখেছিল খাকি পোশাক পরে মূর্তিমান দাঁড়িয়ে আছে। দাঁত বের করে বলল, তোমাকে বড়বাবু ডেকেছিল। এক্ষুণি চলো।
–পায়খানা-পিসাব করব না?
-না, সে সময় আমার হাতে নেই। কাল সারারাত ডিউটি ছিল। শরীর আর চলছে না। চলো, এক্ষুণি চলল। পুলিশটার তাড়া ছিল। শরীরে ছিল রাত্রি জাগরণের চিহ্ন। পোশাকও ঢিলেঢালা। রাজ্যের অলসতায় ডুবে ছিল তার চোখ দুটো।
লুলারাম চেনা পুলিশটাকে অবজ্ঞা করতে পারল না। থানা-পুলিশ-মামলা বড়ো ঝামেলার। বড়োবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন মানে কেস জটিল। কেস জটিল হবারই কথা। ছোট কুলবেড়িয়ায় ডাকাতি করতে গিয়ে লুলারামের গুরু হাফিজ ধরা পড়ে গেল। সেই গ্যাংয়ে লুলারামও ছিল তবে সে অল্পের জন্য বেঁচে যায়। হাফিজকে গোল করে ঘিরে ফেলে গ্রামবাসী। বকুলতলায় চলে গণধোলাই। কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি। গ্রামবাসীদের পুরনো ক্রোধ হাফিজের জীবনদীপ নিভিয়ে দিল।
প্রথমে শাবল দিয়ে মেরে তার পা দুটো ভেঙে দেয়, তারপর হাঁটুর কাছে চাপ দিয়ে উল্টে দেয়। পরে মাথার ঘিলুতে ঢুকিয়ে দেয় বর্শার ডগা। ফিনকি দেওয়া রক্ত আর থামতে চায় না। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে হাফিস।
টুকে পানি দাও গো, টুকে পানি দাও। তার আর্তস্বর বাতাস বিদীর্ণ করে অনেক দূর পৌঁছে যায়। জলের বদলে সে পায় লাঠির বেধড়ক প্রহার। বকুলতলায় লুটিয়ে পড়ে সে। তার মুখে ধুলো-কাদা ঢুকে গিয়ে বীভৎস দেখায়। তাতেও ক্ষান্ত থাকে না মারমুখী মানুষ। শেষমেষ একটা বড়ো বস্তায় ঢুকিয়ে মুখ বেঁধে তাকে চাপিয়ে দেওয়া হয় গোরুর গাড়িতে। গাড়োয়ানকে নির্দেশ দেওয়া হয় কালীগঞ্জ হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে চলে আসতে।
ভোর ভোর গোরুর গাড়ি পৌঁছেছিল কালীগঞ্জের হাসপাতালে। অবনী তখন ডিউটিতে। ধরাধরি করে নামানো হল হাফিজকে। বোরার মুখ খুলে তাকে শুইয়ে দেওয়া হল আউট-ডোরের বারান্দায়। কল-বুক পড়েই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এলেন ডাক্তারবাবু। ও.টিতে নিয়ে গিয়ে আইডিন লাগানোর সময় পেলেন না তিনি। তার আগে চোয়ালের দু পাশে, নাকের ছিদ্রে রক্ত উগলে প্রাণ ত্যাগ করল হাফিজ।
খবরটা সকালবেলায় কানে গিয়েছিল লুলারামের। বাঁশঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে চোখের জল ফেলল নীরবে। হাফিজ না থাকলে তার এত বাড়বাড়ন্ত হত না। হাফিজ হাতে ধরে তাকে কাজটা শেখায়। কানে মন্ত্র দেয়। আর সতর্ক করে বলে, যে রাতে ঘরের বাইরে পা দিবি–সে রাতে মদের বোতল ছুঁবিনে ভাই। মদ আর মেয়েমানুষ দুটারে এড়িয়ে চলবি। তাহলে দেখবি এ লাইনে সিঁড়ির পর সিঁড়ি। ধনে-মানে তুর জীবন তখন কানায় কানায় ভরে যাবে।
হাফিজ ছিল শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত, খরগোসের চেয়েও চালাক তবু তার এই অন্তিম পরিণতি কোনমতে মন থেকে মেনে নিতে পারে না লুলারাম। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে কাটা খাসীর মেটের মতো নড়ে। শুকিয়ে যায় গলা। গুরুর মৃত্যুতে লুলারাম ভেঙে পড়েছিল পুরোমাত্রায়। একবার চোখের দেখাও দেখতে পেল না হাসপাতালে গিয়ে। ওখানে গেলে তার ঝুঁকি বাড়ত বই কমত না। পুলিশের লোক ঘুরঘুর করছিল সাদা পোশাকে।
কৃষ্ণনগর থেকে ময়নাতদন্ত শেষে ফিরে এসেছিল হাফিজের লাশ। পরের দিন সন্ধেবেলায় হাফিজ ভ্যানে চেপে পৌঁছে গিয়েছিল তার নিজের গ্রাম ছোট-কুলবেড়িয়ায়। তার লাশের উপর আছাড় দিয়ে কাঁদছিল মোতিবিবি। হাফিজের ছোট-ছোট ছেলে দুটো ভ্যালভেলিয়ে দেখছিল, মৃত্যুর কি রূপ সেই ধারণা ওদের মনে স্পষ্টত গড়ে ওঠেনি।
