-আমি তো যেতে চাই তবু সে যে আমাকে নিচ্ছে না। নিলে বাঁচি। আর পচা শরীলটাকে ঘষটাতে হয় না। কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে গেল মুনিরাম। চুনারাম বলল, আমাদের চলে যাওয়াই ভালো। আমরা আর কুনো কাজে লাগব না। এখন আমরা হলাম গিয়ে আখের আলসে। গোরও খাবে না, আর ঘর ছাওয়াও যাবে না। শুধু আগুন ধরালে চোখের পলকে ছাই হয়ে বাতাসে উড়বে।
উত্তরের হাওয়া এসে হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ল মুনিরামের গায়ের উপর, শীতে গা-কাঁটা দিয়ে উঠল তার, গায়ের ছেঁড়াখোঁড়া কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে সে কেমন করুণ চোখে তাকাল, ঘন্টি বেজে গিয়েছে, ইবার ছুটি হবে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি-সে গটমট করে আসছে। তবে যেতে আমার দুঃখু নেই। শান্তিতে যেতে পারলে বুকের বিদনাটা কমত।
-তুর আবার অশান্তি কুথায়? ধার চাকুর মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল চুনারাম। মুনিরাম গলা খাদে নামিয়ে বলল, অশান্তি আচে রে, অশান্তি আচে। বলেই সে কাছে সরে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল, বউমা তুকে কিছু বলে নাই?
-না তো!
-সারা ধাওড়াপাড়া জানে অথচ তুর ঘরের বউটা জানে না। কেমন বিকৃত স্বরে মুনিরাম বলল, আমার ঘরের বউটা এট্টা কাণ্ড করে বসেচে। পালিয়ে গিয়ে সে আবার ফিরে এল কিন্তু পেটে করে ছেলে নিয়ে এল। আমার ঘরের লুলাটা মানবে না। সে গরধপটা বলছে–ওটা তার সন্তান লয়। এ সন্তানের জিম্মা নিতে পারব নি।
-হায় কপাল, এ কী কাণ্ড! চুনারাম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, কী শুনালিরে, এ সব না শুনলে বুঝি ভালো হোত!
-এক দিন না একদিন তো তোকে শুনতেই হোত। তুই ঘরের বড়ো। তোকে তো শুনতেই হবে। বড় গাছে যে ঝড় লাগে বেশি। মুনিরাম অস্থিরতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমি এখুন কি করি বলতো? আমার যেতে কাটে, আসতে কাটে। আমি ফাটা বাঁশের ফাঁকে এটকে আচি। তুই আমাকে বাঁচা। না হলে আমি পাগল হয়ে যাব।
-তুই চুপচাপ থাক।
–তার মানে?
-বুবা হয়ে যা, কুনো কথা বলবি নে। মনে রাখিস বুবার শত্রু নেই। চুনারাম অনেক ভেবে বলল, বউমানুষ আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরলে অমন তো হবেই। সবই ভাগ্যের লিখন। তুই আমি কি করব বল?
নূপুর লাল চা নিয়ে এসেছে দুটো কাচের গ্লাসে। সঙ্গে বাটি ভর্তি আউস-চালের মুড়ি। সকালবেলার রোদ ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঁড়শগাছের পাতায় গা এলিয়ে দিয়েছে পরম তৃপ্তিতে, ঢ্যাঁড়শের ছড়ানো পাতা সেই রোদ্দুর গায়ে মেখে সুখী নজর মেলে দেখছে চারপাশ। এ সময় সুখী সাতভায়া পাখির দল বাঁশবাগানে হুটোটি খেলে বেড়ায়, যেন পুরো বাঁশবনটা ওদের, ওখানে বনকুয়ারও প্রবেশ নিষেধ। চুনারাম মুখ তুলে দেখল দলবদ্ধ পাখিগুলো যেন গায়ে ছাই মেখে থপর থপর করে হাঁটছে শুকনো বাঁশ পাতার উপর, অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে চতুর্দিকে, আর সেই শব্দের মাধুর্যে এই বয়সেও বাল্যবেলায় ফিরে যাচ্ছে চুনারাম। সাতভায়া পাখিগুলোকে সে ষাট বছর আগে যেমন দেখেছিল পাখিগুলো যেন আজও তেমন আছে। ওদের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাহলে একটা পাখির গড় আয়ু কত? পাখিরা কি বৃদ্ধ হয় না, ওদের যৌবন কি তার মতো হারিয়ে যায় না?
সাতসকালে মাথাটা কেমন গুমগুমিয়ে উঠল চুনারামের। কাল রাতে জব্বর শীত পড়েছিল। দুর্গামণি জলঢালা ভাত খেতে দিলে মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে সে বলেছিল, বউমা, এখুন শীত পড়ছে। এখুন আর জল ঢালা ভাত দিয়ো না। শীতে জীবন বড়ো কাহিল গো!
বিছানা বলতে ছেঁড়া কাথা আর একটা লোমওঠা কম্বল। বাবুরাই দিয়েছিল গায়ে দেওয়ার জন্য। তালাই-মাদুর শ্রী হারিয়ে ঘাটে যাওয়ার অপেক্ষায়। ছারপোকাগুলো আর বসবাসের জায়গা পায়নি, বেছে নিয়েছে ছেঁড়া কাঁথা আর জীর্ণ মাদুর-তালাইয়ের আশ্রয়। বুড়ো বয়সের জোড়াতালি দেওয়া ঘুম ওরাই বরবাদ করে দেয়। রক্ত চুষে ওরা পেট ভরানোর পরেই ঘুমের দেবী বিছানায় এসে বিশ্রাম নেয়। তখন রাত গড়িয়ে গিয়ে বয়স বাড়ায় শরীরে। পানবরজের পাশ থেকে ভেসে আসে শেয়ালের ডাক, শিমুলগাছের ছড়ানো ডালপালার ভেতর থেকে উড়ে যায় হুতোম পেঁচা, ইঁদুরগুলো তখন ভয়ে মরে, ঠকঠকিয়ে কাঁপে জান বাঁচানোর তাগিদে।
মুনিরাম চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে এক খাবলা মুড়ি মুখের ভেতর ছুঁড়ে দেয়, ফোকলা মাড়ি দিয়ে চাপ দিয়ে পিষে দিতে চায় মুড়ির ফোলানো শরীর, মুখের লালায় পিছলে যায় আউস-চালের মুড়ি। শেষে মিইয়ে গিয়ে মিনমিনে স্বর হয়ে বেরয় মুনিরামের কণ্ঠ থেকে, গুয়ারামের কিছু খপর পেলি?
চুনারামের দুর্বল জায়গায় বুঝি পিন ফোঁটাল মুখিরাম, নিঃস্ব চোখে তাকিয়ে বুড়োটা বলল, ছেলেটার খপর বহুৎ দিন হলো পাইনি রে। ছেলেটা পরের দোরে খাটতে যাক এ আমি চাইনি! কিন্তু আজকালকার ছেলেপুলে কথা শুনল না, জেদ দেখিয়ে গেল! ইখানে আমি চিন্তায়-চিন্তায় আধখানা!
চিন্তা তো হবারই কথা! মুনিরাম কোড়ক লাগা মুরগির মতো গা ঝাড়া দিয়ে বলল, দুব্বো ঘাস যতই সোন্দর হোক সবাই তারে মাড়িয়ে চলে। কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না। বুড়োলুকদের এই মনোভাব আমি কুনোদিন মন থিকে মেনে নিতে পারিনি। চাইলে যখুন দেবে না তখন না বলে নিতে দুষ কুথায়। না বলে নিলে চুরি করা হয়। যারা মানুষ ঠকায় তাহলে তারাও তো চোর। আমি লুলারে বলেছি-দুব্বোঘাস হোস নে বাপ, বাঘহাতা ঘাসের মতো বাঁচ। যতদিন বাঁচবি, মাথা উঁচা করে বাঁচবি। কারো কাচে ছোট হবি নে। বুনো বলে যারা আমাদের ঘেন্না করে তাদের মুখে তুই ছেপ দে।
