মুনিরাম সিঁদেল চোর থেকে হয়ে গেল ডাকাত দলের সর্দার। তার কালো ঘোড়াটা বাঁধা থাকত বাঁশতলায়। বাঁধের উপর সে বিনা কারণে ঘোড়া ছোটাত। এক শ্বাসে চলে যেত মানিকডিহির গাঙপাড়। অন্য শাসে ফিরে আসত হলদিপোঁতা ধাওড়া।
মুনিরামের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না চুনারাম। হাজার হোক ভাই বলে কথা। বয়স বাড়লে সম্পর্কে কেমন ছাতা ধরে। অনেক সম্পর্ক আবার নতুন করে ট্যাক গজায়। মুনিরাম ক’ বছর আগেও কথা বলত না টাকার দেমাকে। নিজেকে ভাবত শেরশাহ। গায়ে কুঠ ফোটার পর মাটির ঢেলা থেকে তার মন হয়ে গিয়েছে লতলতে কাদা। এখন সাত চড়ে রা কাড়ে না সে। দিনের বেশির ভাগ সময় ঈশ্বরচিন্তা করে কাটিয়ে দেয়। হাত-পায়ের ঘাগুলোয় শুলোনী উঠলে সে কোঁকায়। ঢিলি তখন তার সেবা যত্ন করে। লুলারাম বিরক্ত হয়। মনে মনে ভাবে মানুষটা কেন মরছে না। এত লোকের বাপ মরছে, তার কেন বাপ মরছে না।
পণ্ডিতবিলের পাড়ে কুঁড়েঘর বেঁধে দিয়েছিল লুলারাম, বাপকে হাত ধরে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল সে। ফেরার সময় বলেছিল, কী করবো বলল, গাঁয়ের মানুষের রায়, আমাকে তো মাথা পেতে নিতে হবে। তুমার অসুকটা তো ভালো নয়। কার মুকে চাপা দেব বলো। যতদিন পেরেছি, লুকিয়ে তুমাকে ঘরে রেখেচি। আর পারলাম না। ইবার থেকে বিলধারেই থাকো। বিলের ঠাণ্ডা বাতাস তুমার শরীলটাকে ঠাণ্ডা করে দিবে। আমি সাতদিন অন্তর এসে তুমারে দেখে যাবো।
চোখের জল সেদিন আটকাতে পারেনি মুনিরাম। এই ছেলেকে হাতে ধরে চুরি বিদ্যার গুপ্তমন্ত্র শিখিয়েছে সে। সে তো শুধু জন্মদাতা বাপ নয়, একাধারে গুরু। দীর্ঘশ্বাস বুকে ঠেলে ওঠার আগেই বিলপাড় থেকে সটকে গিয়েছে লুলারাম।
অসুখ আর রুগী বয়ে বেড়ানো ঝক্কির কাজ। তাছাড়া মুনিরাম ঘরে থাকলে ঢিলিকে খারাপ নজরে দেখতে পারে না লুলারাম। মুনিরামের জন্য ঝারি রাতকালে ঘরে আসতে পারে না। ওর ঘুম খরগোসের চেয়েও পাতলা। খুট করে পায়ের শব্দ পেলে কে-কে বলে চেঁচিয়ে ওঠে। আর তার চেঁচানি শুনে পাড়ার কুকুরগুলো ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
সেদিন লুলারামের ঘর থেকে গভীর রাতে বেরনোর সময় ধরা পড়ে গেল ঝারি। নূপুরই তার পথ আটকে দাঁড়াল। ধিক্কারে বাতাস কাঁপিয়ে বলল, তোমার সাহস তো কম নয়! বাঁধধার ছেড়ে এবার ঘরে ঢুকেছ, দাঁড়াও দাদুকে আর তোমার বরকে সব বলে দেব।
ঝারি তার হাত ধরে ক্ষমা চাইল কাকুতি-মিনতি করে।
বাবার চাপে পড়ে নূপুর তাকে ক্ষমা করে দিলেও মন থেকে ক্ষমা করতে পারেনি আজও।
মুনিরামের মুখোমুখি দাঁড়ালে চুনারাম আজও কেমন অপ্রস্তুত বোধ করে। মুনিরামের আঙুলে জড়ানো ন্যাকড়াগুলো পুঁজ রক্তে ভরে আছে। ওগুলোর দিকে তাকালে চুনারামের গা ঘিনঘিনিয়ে ওঠে, তার মনে হয় সে-ও বুঝি অচিরে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হবে। লুলারাম তার বাপকে বিলের ধার থেকে ফিরিয়ে এনে ভুল কাজ করেছে। কিন্তু এছাড়া লুলারামের সেদিন কিছু করার ছিল না। থানা থেকে বড়োবাবু লোক পাঠালেন। লুলারামকে জেলে যেতে হবে অন্তত বছর খানিকের জন্য। সে জেলে গেলে মেয়ে দুটোকে দেখবে কে? ঢিলির উপর তার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। কবে সে ঘর ছেড়ে চলে যাবে একথা আগাম কেউ বলতে অক্ষম। অতএব ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সেই মুনিরাম। বছর চারেকের মাথায় মুনিরামকে ফিরিয়ে এনেছিল লুলারাম। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সে বলেছিল, বাবা ঘরে চলো। আমার টেইম এয়েছে, আমাকে জেলে যেতে হবে। জেলে না গেলে বড়োবাবু আমাকে ছাড়বে না। মাঝ রাস্তায় জিপ থামিয়ে বলবে দৌড়ো। তারপর গুলি করে দেবে। বলবে পেলুতে যাচ্ছিলাম তাই গুলি ছুঁড়ে মেরে দিয়েছে। আইন সব ওদের হাতে। আমি জলে নেমে মগরমাছের সঙ্গে লড়াই করে কি পারব? আমি তো চুনোপুঁটি।
সেই যে ফিরে এল মুনিরাম, আর সে বিলমুখো হয়নি। একলা ঘরে মন বসত না তার, খেতে বসে চোখের জল ভাতের থালায় পড়ত। সাতদিন ছাড়া আসব বলে লুলারাম আসত মাসে একবার। হাত পুড়িয়ে সেদ্ধভাত খেতেই কালঘাম ছুটে যেত মুনিরামের। বউটা সাত তাড়াতাড়ি চলে গেল! সত্যবতী থাকলে তার কপালে এত দুর্ভোগ হত না। রাঁধাবাড়ার কাজটা সামলে দিত বউ। আর কিছু না হোক দুটো কথা বলে তো বাঁচা যেত শান্তিতে। একলা থাকার জ্বালা অনেক। বুকের পাঁজরে শিলপাথর কেউ চাপিয়ে দেয়। লুলারাম জেলে যাবার পর স্বাভাবিক হয়ে গেল ঢিলি। পাড়ার লোকে আড়ালে আবডালে বলল, বউটা ইবার শ্বাস ছেড়ে বাঁচল। ঘরের মানুষ যদি পরের ঘরে নজর দেয় তাহলে তার নজরে পাপ বাসা বাঁধে। সে মানুষের কুনোদিন কুনো উন্নতি হয় না। ঘরের লক্ষ্মী কানলে বাইরে লক্ষ্মী কি সুখ পায় না সুখে থাকে?
চৌপায়ার এক কোণায় বসে চুনারাম শুধালো, তা কেমুন আছিস?
–কেমুন আচি তা তো তুই নিজের চোকে দেখতে পাচ্ছিস। মুনিরাম ঘেয়ো হাতের দিকে তাকিয়ে কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল।
-মনে হচ্চে আগের চেয়েও ভালো।
–ওই ভালো! অন্ধের কিবা রাত কিবা দিন। কুনো মতে বেঁচে আছি। ঢোক গিলে মুনিরাম বলল, সাত সকালে তুই কুথায় যাচ্ছিস? আমারে সাথে করে নিয়ে যাবি? এখুন একা বেরতে ভয় পাই। সব সময় মনে হয় আমার পেছনে বুঝি যম হাঁটচে।
-ও তোর মনের ভুল। চুনারাম জোর দিয়ে বলল, বয়স হলে মরার চিন্তে মনটাকে কাকের মতন ছিঁড়ে খায়। আমারও কদিন থিকে মন কু’ গাইছে। জানি না এ শীতটা পার হবে কিনা!
