বেলা বাড়তেই রঘুনাথ শুনতে পেল ঢিলি পা হড়কে বাঁধ থেকে পড়ে যায়নি। সে আত্মহত্যা করার জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল বুড়িগাঙে। সেই সময় ঝারির সঙ্গে মিলিত হবার আশায় বাঁধে এসেছিল লুলারাম। একদিন ঝারির সান্নিধ্য না পেলে তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। আর ঝারিও বড়ো খিটখিটে হয়ে ওঠে, সে তখন কারোর কথা সহ্য করতে পারে না।
ঝারি আর লুলারামের মেলামেশাটা এখন বাচ্চা-বুড়ো সবাই জানে। নূপুর বুঝতে শিখেছে সব, আড়ালে সে চোখের জল ফেলে। ঝারিকে তার ভালো লাগে না। ঝারির জন্য তাদের সংসারটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে যাচ্ছে। অথচ পাড়ার মধ্যে মাথা উঁচু করে ঘোরে বউটা। ওর ভেতর লজ্জা-শরমের কোনো শেকড় নেই। দু-কান কাটার লাজ-লজ্জা বুঝি থাকতে নেই।
শীতটা ধাওড়াপাড়ায় বড়ো কষ্টের।
বেলা ছোট হলে মানুষের মন যে ছোট হবে এমন সহজ সমীকরণ কোথাও লেখা নেই। কদিন থেকে গুয়ারামের জন্য মনটা বড়ো ছটফট করছে চুনারামের। শুধু মনে হচ্ছে যদি প্রাণপাখিটা হঠাৎ করে উড়ে যায় তাহলে ছেলের হাতের জল সে আর পাবে না। সবার ভাগ্যে কি এমন সুখ লেখা থাকে? সুখ হল সেই সরলা খিরিষগাছের ফল যা দিয়ে চারা হয়, জ্বালন হয়–ছাই ওড়া দুপুরে যার মর্ম বোঝা আর খা-খা শ্মশানে গিয়ে বুক চাপড়ে কাদা একই কথা। সুখের কোনো আকার নেই, আকৃতি নেই, সুখ হল জলের মতো মদের মত, নেশা হবে পিপাসা মিটবে। বড়োজোর খিরিষের আঠার মতো জড়িয়ে থাকবে কিছুক্ষণ।
ছেলের জন্য মন খারাপ চুনারামের আজকের নয়, বহু পুরনো অভ্যাস। এই ছেলের জন্য সে বাবুদের ঘরের কাজ ছেড়ে চলে এসেছিল গায়ে। লাজবতীও থাকতে পারত না তাকে ছেড়ে। প্রায়ই মুখ ভার করে বলত, তুমার সাথে আমারেও লিয়ে চলো। ইখানে একা থাকতি কি ভালো লাগে গো? মন ধরে না, খাঁ-খাঁ করে চারপাশ। আমি হেঁপসে মরি!
লাজবতীর টানে নয়, শুধুমাত্র ছেলের টানে বাবুবাড়ির কাজ ছেড়ে চলে এসেছিল চুনারাম। এখন মাজা পড়া শরীর, পাকা চুল, চোখে ছানি তবু ছেলেটাকে দেখার জন্য মনটা অকবগিয়ে ওঠে! রাতকালে এই চিন্তা আরও গাঢ় হয়। বিদেশ বিভূঁইয়ে ছেলেটা কেমন আছে কে জানে। যত দিন যাচ্ছে তত যেন চিন্তাটা ছোবল মারছে মনের ভেতর।
ভূষণীবুড়ি সেদিন ঘুরতে ঘুরতে তাদের দোর অবধি এসেছিল, একথা-সেকথার পরে বলল, ফাঁকা ঘরে হেঁপসে উঠেচি গো! ছেলে নেই, বউমা নেই, একা একা কী ভাবে যে সময় কাটে বলা দায়। মনে হয় দম এটকে মরে যাব।
ভূষণীবুড়ির কথাগুলো শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল চুনারামের। এ সময় বুড়িগাঙের জল স্থিতু হয়ে দম নেয়। আকাশের নীল বুকের ভেতর শুষে নিয়ে সাদা কালো নীল মিশিয়ে বিচিত্র এক আলপনা আঁকে জলের উপর। কদমগাছের ফাঁক দিয়ে কী অদ্ভুত কায়দায় গড়িয়ে নামে রোদ। সেই চুয়ানো রোদ গায়ে লেগে ঘাস হয় গর্ভবতী। নাকছাবির মতো ফুল আসে ঘাসের বুকে। বাসি চারাগুলো শিশির পান করে কিশোরীর টাইট শরীরের মতো টনটনিয়ে ওঠে। এত সুখ তবু সুখের মধ্যে লুকিয়ে থাকা উঁইপোকার মতো অসুখ কুরে কুরে খায় চিন্তার হাজার ফসলি জমি। শীতকালটা চুনারামের কাছে বা বেশি ভয়ের সময়। ক’দিন ধরে যা শীত পড়েছে তাতে হাড় কাঁপে ঠকঠকিয়ে। আমড়াগাছের পাতাগুলো সব ঝরে গেল। কার শোকে ন্যাড়া হয়ে গেল নিমগাছ।
এই শীতের সময় চুনারাম বরফের মাছের মতো প্যাটপেটিয়ে চেয়ে থাকে, মৃত্যুভয় তার লোমকূপে এসে বাসা বাঁধে। গেল সালে ধাওড়াপাড়ার চারজন বুড়া সাফ হয় শীতের কামড়ে। বয়স হলে শীত বুঝি কাউকে ক্ষমা করে না। যমরাজকে আয়ুর দক্ষিণ-দুয়ারে নিয়ে এসে দাঁড় করায়।
এ সময় গুয়ারামও কাছে নেই তাহলে মনের জোর শতগুণ বেড়ে যেত চুনারামের। রঘুনাথের উপর ভরসা নেই চুনারামের, নাতিটা গায়েগতরে বাড়ল কিন্তু তার বিচারবুদ্ধি বড়ো কম। কাঁচা বয়সের ভাবনা পাকা আতার মত, হালকা চাপ দিলেই পেটের ভেতরের মাল-মশলা সব কিছু দেখিয়ে দেয়।
এই শীতটা কাটবে কি? মোটা সুতোর চাদরটা গায়ে জড়িয়ে চুনারাম বাঁধের গোড়ায় এসে দাঁড়াল। প্রায় বছর দশেক আগে কেনা চাদরটা এখন জরাজীর্ণ, সুতোর ফুপি বেরিয়ে ঠান-বুড়িদের মতো দশা। রঙ জ্বলে গিয়ে এখন আর আগের চেহারা মনে পড়ে না। সকালের রোদ এসে ঢলিয়ে পড়ছে গায়ে। একটু আরামবোধ হচ্ছে চুনারামের। বেড়ার উল্টো পিঠে খেলা করছে বনিপাখির দল। ক্যাচর-ম্যাচর শব্দে উঠোন যেন হাটতলা। ধসে পড়া কাঁথ দেওয়ালের মাটি বর্ষায় ধুয়ে-গলে প্রায় সমতল। একটা তেল চকচকে ছাগলছানা তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে রোদে। ধসা দেওয়ালের উপর ছাগল নাচলে গৃহস্বামীর অমঙ্গল হয়। চুনারাম রাগের ঘোরে ছাগলছানাটা তাড়াতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল মুনিরামের চোখে।
দেখা মাত্র যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মুনিরাম, কাশতে কাশতে উঠে এল সে বেড়ার ধারে, কুথায় যেচিস রে, টুকে আয় না, কতা বলি।
অনেক বুড়িয়ে গেছে মুনিরাম, অসুখ ওর বয়সটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও বিশ বছর। শরীরে জোর নেই, চোখ ঢুকেছে গর্তে। কথা বলার সময় শ্বাসকষ্টের রুগির মতো ফ্যাসফেসে শব্দ হয়। চোখের তারা ছিটকে আসার উপক্রম।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড়াতে বাধ্য হল চুনারাম। পিঠাপিঠি দুই ভাই, অথচ দেখা হয় না কতকাল। পণ্ডিত বিলের পাড়ে মুনিরামকে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছিল মোকামপাড়ার লোকেরা। সিদ কাটতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সে। জামগাছে বেঁধে কী মার-ই না মারল ওকে। সেদিন ভাইয়ের জন্য কষ্ট হয়েছিল চুনারামের। মনে মনে ভেবেছিল এমন ভাইয়ের সঙ্গে যতদিন বাঁচবে যোগাযোগ রাখবে না। প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি। মুনিরামই রাতের বেলায় এসে তার পা ধরে কেঁদে কেটে বলল, দাদারে, তুর মুকে চুনকালি লেপে দিয়েছি। আমারে ক্ষেমা করে দে। যতদিন বাঁচব, আমি আর সিঁদকাঠি ছোঁব না। আর চুরিচামারি নয়, ইবার থিকে আমি বড়ো দানে হাত মারব। মোকামপাড়ার লোকগুলোকে দেখিয়ে দিব–ওরা আমার গায়ে হাত তুলে হেলেসাপকে খরিসসাপ বানিয়ে দিল। আগে ওদের ক্ষতি হত, ইবার থেকে ওদের সব্বোনাশ হবে।
