অবনী অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তুমি কী ভাবছ, আমি জানি। ভাবছ–আমি খুব বোকা তাই না?
বুক শুকিয়ে গেল লুলারামের, না, না নয়।
-বউটাকে মারতে গিয়েচিলে কেন, ওর দোষ কি? অবনীর চোখে ক্রুর হাসি খেলে গেল।
লুলারাম কাঁপতে কাঁপতে বলল, যার গায়ে ছ্যাঁকা লাগে সে বোঝে। তুমাকে কি আমি বলে বোঝাতে পারব? তুমি যখুন দেখে ফেলেছো, তুমাকে আসল কথাটা বলি। আমার বউয়ের পেটে যে সন্তান এয়েচে-সেটি আমার লয়।
-তার মানে? আঁতকে উঠল অবনী।
অন্ধকারে মেঘ ডাকার শব্দ ভেসে এল।
.
গোরুর গাড়িতে চেপে ঘর ফিরছিল ঢিলি। চেনা পথ-ঘাট সব যেন বদলে গিয়েছে কেমন করে। নূপুর আর ঢিলি মুখোমুখি বসে আছে ছৌয়ের ভেতর। হাঁ করে নূপুর দেখছিল তার মাকে। ক’ মাসেই যেন পুরো শরীরটা বদলে গিয়েছে মায়ের। আগের চাইতে অনেক রোগা দেখাচ্ছে তাকে।
গত সাত দিনে নূপুরের কত ইচ্ছে ছিল হাসপাতালে আসার, লুলারাম তার ইচ্ছেটাকে থেঁতলে দিয়েছে। ধমক দিয়ে বলেছে–ঘরে থাক। ওখানে কেনে মরতে যাবি? সব খপর তো রঘুর মুখে পাচ্ছিস!
অন্যের মুখে ঝাল খেলে কি নিজের মুখে ঝাল লাগে? নাকি তা ভালো দেখায়? লুলারাম বলেছিল, তুদের সেই আগের মা আর নেই! এখুন যারে দেখবি সে হল তুর মায়ের কঙ্কাল।
কঙ্কাল হোক, যাই হোক মা তো মা-ই। একথা লুলারামকে বোঝাবে কে?
রঘুনাথ সব শুনে নূপুরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, কাকার কথা বাদ দে তো। ওর কথা যত গায়ে না মাখবি তত ভালো।
নূপুর বড়ো হয়েছে। বুঝতে শিখেছে আগুন-জলের মর্ম।
ঢিলি চেয়ে আছে তার দিকে, মুখে কোনো কথা নেই।
রঘুনাথ বলেছিল গোরুর গাড়ির পেছনে পা ঝুলিয়ে বসে সে ধাওড়াপাড়া অবধি আসবে কিন্তু শুভর জন্য তা আর হল না। অবনী রঘুনাথকে চিনতে পেরে ঘর পর্যন্ত নিয়ে গেল। ওখানেই শুভর সঙ্গে অনেক সময় ধরে কথা হল তার। শুভ বেশি কথা বলে না তবু ওর মনে কোনো গুমোটভাব নেই। শরৎকালের সাদা মেঘের মতো ফুরফুরে তুলো তুলো মন। এই মেঘের দিকে তাকালে মন ভালো হতে বাধ্য। সেদিন শুভর সঙ্গে টিকেদারবাবুর ছেলে সবুজও ছিল। ওরা দুজন মানিকজোড় এখনও গুলতি হাতে নিয়ম করে বাঁশঝাড়ে যায় ডাহুক মারতে। ডাহুকের দেখা না পেলেও ওদের কোনো দুঃখ নেই। ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা ওদের পেয়ে বসেছে।
সেদিন রঘুনাথ ওদের সঙ্গী হল। শুভর হাত থেকে গুলতি নিয়ে সে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই শুইয়ে দিল একটা ডাহুকপাখি আর মাঠঘুঘু। পাখি দুটোকে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে দেখে বেজায় মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল শুভর। সবুজ তার হাত ধরে আনন্দ করে বলেছিল, আজ ফিস্ট হবে। রঘুকে আমরা আজ যেতে দেবো না। আজ রাতে ও আমাদের সঙ্গে থাকবে।
অতসী দিদিমণি যত্ন নিয়ে রেঁধে দিয়েছিলেন ডাহুকপাখির মাংস। যদিও পরিমাণে অল্প মাংস কিন্তু স্বাদে ছিল অতুলনীয়। ঘুঘুর মাংসটা আলাদাভাবে আলাদা কায়দায় রাঁধলেন তিনি। নিজে মাংস খান না অথচ তাঁর মাংস রান্নার প্রশংসা না করে পারা যাবে না।
শুভ বলেছিল, পিসি তুমি এত সুন্দর মাংস রেঁধেছ যে জিভের জল আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। কোনো কথা শুনব না, আজ তোমাকে আমাদের সঙ্গে খেতে হবে।
অতসী দিদিমণি মিষ্টি হেসে বললেন, মাংস আমি জ্ঞানপাড়ার পর থেকে কোনোদিনও খাইনি। তোরা বড় হ। চাকরি কর। তারপর মিষ্টি আনবি, আমি খাব।
-সে তো অনেক দিনের ব্যাপার। সবুজ বিস্মিত স্বরে বলল, পিসি, আমরা কি চাকরি পাব কোনোদিন? আমার তো মনে হয় না আমরা কোনোদিন চাকরি পাব।
পিসি কিছু বলার আগে রঘুনাথ ভরসার গলায় বলল, কেন চাকরি পাবি না, নিশ্চয়ই পাবি। আমাদের শেরপুর গাঁয়ের দু’জন ছেলে পাশ করে মাস্টুর হয়েছে। ওরা মাস গেলে কড়কড়ে নোট গুণে নেয়।
অতসী দিদিমণি মন দিয়ে শুনলেন কথাগুলো, মন দিয়ে পড়লে নিশ্চয়ই তোরা চাকরি পাবি। শুভ তো পড়াশোনায় বেশ ভালো তবে ওদের ঘরের পরিবেশটা ভালো নয়। আমি তো ওকে বলেছি–এখানে এসে পড়তে। আমার ঘর তো ফাঁকা থাকে।
সে রাতে আর ঘরে ফিরতে পারেনি রঘুনাথ। লুলারাম গিয়ে খবর দিয়েছিল দুর্গামণিকে। দুর্গামণি কপালে ভাঁজ ফেলে চুনারামের মুখের দিকে তাকাল, চুনারাম তাকে ভরসা দিয়ে বলল, ছেলে নিয়ে অত ভেবো না বউমা। তুমার এই ছেলের কেউ কোনোদিন ক্ষতি করতে পারবে না। ওর গলায় আমি শুয়োরের হাড়ের তাবিজ বানিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছি। হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর দয়া আচে ওর উপর।
ভোর-ভোর ঘরে ফিরে এল রঘুনাথ।
সে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই দুর্গামণি উদ্বেগ নিয়ে বলল, জানিস বাপ, কাল এট্টা চরম বিপদ ঘটে যেত।
-কী হয়েচে মা? রঘুনাথের তর সইছিল না।
পাশে দাঁড়ানো চুনারাম দাঁতন করা থামিয়ে বলল, কী আর হবে। যত সব ছোটলুকের মরণ।
-তুমি থাম তো বাবা। দুর্গামণি ধমক দিয়ে চুনারামকে নীরব করে দিতে চাইল।
চুনারাম চুপ করে গেলেও তার ভেতরে কথার খই ফুটছিল। নিজেকে সংযত করে সে দুর্গামণির মুখের দিকে তাকাল। গলা নামিয়ে দুর্গামণি ভয়ার্তস্বরে বলল, কাল রাতে ছোটবউ পেলিয়ে গিয়েছিল আবার। আঁধারে পা হড়কে গিয়ে সে ছিটকে গিয়েছিল বুড়িগাঙে। ভাগ্যিস লুলারাম তখন কি কাজে বাঁধের ধারে ছিল। সে-ই লোক ডেকে ছোটবউকে বাঁচায়। বড়ো ভাগ্য ভালো যে ছোটবউয়ের কুনো ক্ষতি হয়নি।
