ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এলেন। হাতের ইশারায় লুলারামকে কাছে ডেকে নিলেন তিনি, তারপর চাপা গলায় বললেন, রোগী আপনার কে হয়? তবে সুখবর আছে। রোগী মা হতে চলেছে।
মাথায় বাজ পড়লেও মানুষের মুখ এত পুড়ে যায় না, লুলারাম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল সিমেন্ট বাঁধানো মেঝেতে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় কুলকুল করে ঘেমে গেল সে। ঢিলি আবার পোয়াতী হয়েছে কথাটা ভাবতে গিয়ে ঝ্যানঝেনিয়ে উঠল তার সারা শরীর। ঘেন্না এসে চার ঠোকরানো মাছের মতো ঠুকরে গেল তার মনের জমি। এ কু-কাজ কে করল, এ তো তার কাজ নয়। বছরের উপর হতে চলল ঢিলির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পাশে শোওয়া তো দুরের কথা ঢিলি তাকে ছুঁতেও দেয় না কোনোদিন। হাত ধরলে ঢিলি গাল দিয়ে ভূত ভাগায়, যাও না ঝারির কাচে, আমার কাচে মরতে কেনে এয়েচো! আমি তো তুমার কাছে এখুন কাঠের পুতুল!
কে, কে দায়ী এই দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য? কার পাতা ফাঁদে জড়িয়ে গেল ঢিলি। তবে কি রেল স্টেশন, ফাঁকা বাঁধ নাকি…। আর কিছু ভাবার ক্ষমতা ছিল না লুলারামের। বাঁ হাতে সজোরে কপাল টিপে সে রঘুনাথকে ডাকল।
রঘুনাথ সামনে আসতেই লুলারাম বলল, তোরা গাঁয়ে ফিরে যা, আমি রাতভর এখানেই থাকব।
-থাকবে তো খাবে কুথায়?
রঘুনাথের প্রশ্নে বিরক্ত হলো লুলারাম, এক রাত না খেলে মানুষ মরে না। যা তোরা যা। আমাকে একা থাকতে দে।
মাথায় আকাশ নিয়ে লুলারাম দাঁড়িয়ে থাকল অন্ধকারে।
.
১৭.
সাতদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে গেল ঢিলির।
এই সাত দিন দুবেলা ভাত নিয়ে হাসপাতালে যেত রঘুনাথ। হাসপাতালের খাবার ঢিলির মুখ দিয়ে নামতে চাইত না। নূপুর ভাত-তরকারি রেঁধে বেঁধে দিত গামছায়। সেই খাবার পৌঁছে দিয়ে বাইরের সিমেন্টের বেঞ্চিটাতে চুপচাপ বসে থাকত রঘুনাথ। লুলারাম প্রথম দিন ছাড়া দ্বিতীয় দিন থেকে হাসপাতালে আর আসত না। মাচা কুমড়োর মতো মুখ ঝুলিয়ে সে কী যেন ভাবত সবসময়। চিন্তার রেখাগুলো গাঢ় হয়ে ফুটে উঠত সারামুখে। মাঝেমধ্যে মুখ দিয়ে হুস করে শব্দ তুলে পাগলের মতো বলত, আমার সব্বোনাশ হয়ে গেল! মা শীতলাবুড়ি–একী করলে গো তুমি।
প্রথম রাতে হাসপাতালে থাকার গোপন উদ্দেশ্যটা ধরে ফেলে অবনী। তার সেদিন নাইট-ডিউটি ছিল। ফিমেল ওয়ার্ডে রোগীর চাপ না থাকায় অতসী দিদিমণি চেয়ারে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি চতুর লুলারাম। সে আউট ডোরের বারান্দা থেকে পা টিপে টিপে চলে এসেছিল ফিমেল ওয়ার্ডে। আজ রাত হোক ঢিলির জীবনে শেষ রাত। ও যতদিন বাঁচবে ততদিন জ্বালিয়ে মারবে লুলারামকে। বউটাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শেষ করে দেওয়া যেত কিন্তু তাতে ঝামেলা বাড়ত বই কমত না। গাঁয়ের মানুষের সন্দেহবাতিক মন। ওরা হাজার প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের ঔৎসুক্যের আর শেষ নেই। ঢিলি পরের ছানা পেটে নিয়ে ঘুরছে। পাগল হলেও ওর চেহারার বাঁধুনী ফুরিয়ে যায়নি। একনজর দেখলে চোখ ফেরানো যায় না, কেননা ওর দিঘির মতো চোখ দুটো সব সময় ছলছলানো আর টানাটানা। থলথলে বুকের সৌন্দর্য অনেকটাই দৃশ্যমান কারণে-অকারণে। পেট কুঁচকে গেলেও গভীর নাভি পথচলতি মানুষের মনে কামের ভাবটা বাড়িয়ে দেয়। বারুদবাতি যে কোনো সময় জ্বলে উঠে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্যের পাপের বোঝা লুলারাম কেন বইতে যাবে বরং তার পাপের ভাগীদার হোক সবাই। ঘুমন্ত ঢিলির কণ্ঠনালী সজোরে টিপে ধরতেই ঘুম ভেঙে যায় ঢিলির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সজোরে লাথ ছুঁড়ে দেয় লুলারামের অণ্ডকোষে। কাঠব্যাঙের মতো তখনই ঠিকরে পড়ে লুলারাম। তার পতনের শব্দে ঘুম চোখে ছুটে আসে অবনী। অতসী দিদিমণি ভাবেন- রুগি বুঝি ঘুমের ঘোরে পড়ে গিয়েছে খাট থেকে। দৌড়ে এসে তিনি দেখেন অন্য কাণ্ড।
অবনী রক্তচোখে ধমকাচ্ছে লুলারামকে, তোমাকে মেয়েদের ঘরে কে আসতে বলেছে শুনি? জানো, ডাক্তারবাবুর কানে কথাটা গেলে কালই তোমার রুগিকে ডিসচার্জ করে দেবে। একবার নাম কেটে গেলে ফিরে আর ভর্তি হবে না মনে রেখো।
অতসী দিদিমণি রাগে ফুঁসছিলেন, এদের আর বুঝিয়ে পারা যাবে না, যত সব অশিক্ষিতের দল। ছিঃ ছিঃ কী কাণ্ড দেখো! এত রাতে মেয়েদের ওয়ার্ডে লুকিয়ে চলে এসেছে। যতসব চরিত্রহীন কারবার।
গলায় হাত বোলাতে-বোলাতে ভয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ঢিলি। তার মুখে কথা নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই শুধু দু’চোখের কোণ ছাপিয়ে জলের ধারা নামছিল অনর্গল। সে জানে–উপর দিকে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়বে। সেটা কারোর জন্য মঙ্গল হবে না। ঢিলি স্পষ্ট বুঝে গিয়েছে লুলারাম তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তার ফিরে আসা লুলারাম সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।
অতসী দিদিমণি এগিয়ে গিয়ে শুয়ে থাকা ঢিলির কপালে হাত রাখল, তুমি কাঁদ কেন, তোমার কি হয়েছে?
–দিদিমণি গো, আমি আর বাঁচতে চাইনে। ঢিলি ঠোঁট মুখ কুঁচকে কেঁদে উঠল।
-এ্যায়, কেঁদো না, কেঁদো না বলছি। অতসী দিদিমণির কপট ধমকে ঢিলি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকাবার চেষ্টা করল প্রাণপণ, কিন্তু পারল না বরং ঝাঁকুনি দেওয়া কান্নায় কাহিল হয়ে সে নেতিয়ে শুয়ে রইল বিছানায়। অবনী লুলারামের হাত ধরে নিয়ে গেল বাইরে, দিলে তো আজ সবার ঘুম চটকে? পারো বটে ভায়া। তোমার সাহস দেখে আমার বুক এখনও কাঁপছে। লুলারাম ধকধকানো চোখে তাকাল, অবনীর কথাগুলো সঠিক বোধগম্য হল না তার। অবনী কি গলা টিপে ধরার দৃশ্যটা দেখেছে? যদি দেখে থাকে তাহলে অতসী দিদিমণির কাছে সে কেন ঘটনাটা ফাঁস করে দিল না। কেন সে বাঁচাল তাকে? লুলারাম গোঁফ চুলকে সংশয়ের চোখে অবনীর দিকে তাকাল।
