সাদাত পলাশী গেল না, সে কালীগঞ্জের বাস ধরে গাঁয়ে ফিরে গেল। কথা হল সে ধাওড়াপাড়ায় গিয়ে লুলারামকে খবর দেবে। লুলারাম যেন গোরুরগাড়ি নিয়ে হাজির থাকে কালীগঞ্জে। কালীগঞ্জ থেকে শেরপুর ধাওড়া কম পথ নয়। অতটা হাঁটা পথ ঢিলিকে নিয়ে ফেরা মুখের কথা হবে না। তাছাড়া ঢিলির শরীরের অবস্থার কথা কারোরই সঠিকভাবে জানা নেই। এখন তার হাঁটাচলার ক্ষমতা আছে কিনা সেটাও দুলু স্পষ্টভাবে বলতে পারল না। একটা মানুষ প্রাণের ভয়ে দৌড়ে পালাল মানে সে যে পুরোপুরি সুস্থ এমন নয়।
পলাশী নামতেই অন্ধকার ছেয়ে এল চারদিকে। দুলু উশখুশিয়ে বলল, চল, এখন আমরা চা খেয়ে স্টেশনপানে চলে যাই। এখন কুনো ট্রেন নেই। ট্রেন আসবে সেই দশটার সময়।
ফাঁকা প্লাটফর্মে দু-একটা নেড়িকুকুর এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। টিমটিম করে জ্বলছিল স্টেশনের বাতিগুলো। দু’চারজন লোক ছাড়া পুরো প্লাটফর্ম এখন ফাঁকা ফুটবল খেলার মাঠ। গাছতলায় অন্ধকার শুয়ে আছে কল্পনার ডাইনিবুড়ির মতো। মাথার উপর খেলে বেড়াচ্ছে ফর্সা মেঘ। হাওয়ায় মিশে আছে মৃদু মৃদু শীতের কামড়।
দুলু, সূর্য আর রঘুনাথ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিল স্টেশনের শেষপ্রান্তে। আর একটু হাঁটলেই শুরু হবে ধানমাঠ। আশে-পাশের ঘর গেরস্থালির আলোগুলো অন্ধকারের সঙ্গে যুঝছে।
কাউকে দেখতে না পেয়ে রঘুনাথ মন বেজার করে বলল, মনে হচ্ছে কাকি ভয়ে কুথাও চলে গিয়েছে। ও মনে হয় আর ঘর ফিরবেনি। যদি ঘরে ফেরার ইচ্ছে হত তাহলে কি অমনধারা পেলিয়ে-পেলিয়ে বেড়াত?
দুলু নিরাশ গলায় বলল, ওই শেডের নীচে তাকে দেখেছিলাম। আমাকে দেখে চিনতে পেরে দে দৌড়..। যেন আমি খুব রাগী দারোগা। ওকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছি।
সূর্য বিচক্ষণের মতো বলল, নারে এসব কথা সঠিক নাও হতে পারে। আমার মনে হয় কাকিমা ভীষণ অসুস্থ। কোথাও ঠিক মাথা গুঁজে পড়ে আছে। আড়ালে থাকলে লোকে কম জ্বালাতন করবে সেইজন্য।
-আমি এতদিন ধরে লালগোলা টেরেনে যাতায়াত করচি, কোনোদিন ওর সাথে দেখা হয়নি। আজ জানলা দিয়ে ছেপ ফেলতে গিয়ে দেখি চেনা মানুষ! দুলু শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, জানিস রঘু, তখন তোর কাকার মুখটা মনে পড়ে গেল। মানুষটা দেখা হলেই আমাকে বলত-দেখিস তো দুলু, তোর বৌদির সাথে যদি দেখা হয় তারে সাথে করে ধরে আনিস। সব খরচাপাতি আমি তুরে দিয়ে দেব।
সূর্যর কথাই শেষ পর্যন্ত ঠিক হল।
চা-দোকানের পেছনে চট মুড়িয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়েছিল ঢিলি। রঘুনাথই তাকে প্রথম দেখে। দুলুকে বলতেই সে হেসে উঠল, দুর তোর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। যা দেখছিলাম সেটা তো মালের বস্তা।
-না গো, দেখো কেমুন এট্টু-এট্টু নড়চে!
-তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। বস্তাকে ভাবছিস তোর কাকিমা! ঠিক আচে চল কাছে গিয়ে দেখি। সন্দেহ মেটাতে দুলুই লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল সামনে। বস্তা ভেবে ঠেলা মারতেই ঝাঁকিয়ে উঠেছিল ঢিলি, ছোঁবে না গো, ছোঁবে না! আমার গায়ে কুঠ ফুটেচে। যে ছোঁবে তারও কুষ্ঠ হবে।
ঢিলির কণ্ঠস্বর চিনে নিতে কোনো অসুবিধা হয়নি রঘুনাথের। তাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কালীগঞ্জ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতেই যা ঝামেলা।
ধাওড়াপাড়ার লোকজন নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল লুলারাম। সে গোরুর গাড়ি জোগাড় করতে পারেনি তাড়াহুড়োতে, সেইজন্য চারপায়া এনেছে ঢিলিকে নিয়ে যাবে বলে। দড়ির খাটিয়ায় ঢিলি যাতে না পড়ে যায় সেইজন্য গোরু বাঁধার দড়ি এনেছে সঙ্গে। বেশি ছটফট করলে তাকে বেঁধে দেবে চৌ-পায়ায়। পাগলদের কোনো বিশ্বাস নেই। যেন কুলে এসে নৌকো না ডুবে যায় সেইজন্য এই বাড়তি সতর্কতা।
কালীগঞ্জে পৌঁছে চোখ রগড়ে নিয়ে ঢিলি সশব্দে ভেঙে পড়ল কান্নায়। লুলারাম এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরতেই ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল সেই হাত। ধিক্কার জানিয়ে বলল, খবরদার তুমি আমাকে ছোঁবে না। যদি ছুঁতে হয় আমাকে নয়, ভিকনাথের বউকে গিয়ে ছোঁও। তুমার ধ্যাসটোমো আমি সব ধরে ফেলেছি। তুমি আর আমার চোকে ধুলো ছিটোতে পারবে না।
ঢিলি হাত ছাড়িয়ে দিলেও তার শরীরের উত্তাপে ছ্যাঁকা খেল লুলারাম। ঢিলি জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে। ওকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
লুলারাম ভয় পেয়ে রঘুনাথকে বলল, তুর কাকির গা জ্বরে পুড়ে যাচ্চে। ওরে ধর। নইলে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে বিপদ হবে।
লুলারামের ভীতু চোখের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ ঢিলির দিকে এগিয়ে গেল। ঢিলি গর্জন করে উঠল, খবরদার আমাকে ছুঁবিনে। যদি ছোঁস তো তুর হাত আমি মুচড়ে ভেঙে দেব।
কাকি চুপ করো। মাথা গরম করো না।
–চুপ করব? কেনে চুপ করব? আগুন উগলানো চোখে তাকাল ঢিলি, এই পাপীটাকে কে এখানে আসতে বলেচে? আমি তো বেশ ছিলাম। ও এসে আমাকে তাতিয়ে দিল।
-তুমার গায়ে ধুম জ্বর। তুমি চুপ করো কাকি। রঘুনাথের কথায় কি ছিল শান্ত হয়ে গেল ঢিলি, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, আমি বাঁচতে চাইনে রে, আমাকে মরতে দে। এতদিন ঘরের বাইরে ছিলাম–বেশ ছিলাম। শুধু মেয়েদুটার জন্যি আমার কষ্ট হত। ওরা ছাড়া এ দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই।
ঢিলিকে দেখামাত্রই হাসপাতালে ভর্তি করে নিলেন বড়ো ডাক্তার। আউটডোরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিল পাড়ার সবাই। রোগী দেখে এসে ডাক্তারবাবু কথা বলবেন। লুলারামের ভেতরে মাকুর মতো সক্রিয় ছিল চাপা উত্তেজনা।
