গোলপোস্টের পেছনে হাত ধরে হুড়হুড় করে টেনে নিয়ে গেল দুলু। ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে চাপা গলায় সে বলল, শোন তোর কাকিকে দেখলাম পলাশী স্টেশনের বেঞ্চির নীচে শুয়ে থাকতে। চেহারা পুরো ধসে গিয়েছে। প্রথমে দেখে চিনতে পারিনি। পরে চিনতে পেরে তার কাছে যেতেই সে আমাকে দেখে প্রাণ বাঁচানোর দৌড় লাগাল। আমি তাকে হয়ত ধরতে পারতাম কিন্তু গাড়ি ছেড়ে দেবে বলে আমি আর ঝুঁকি নিইনি।
রঘুনাথের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না দুলুর কথাগুলো। ঢিলির সঙ্গে যদি তার দেখা হয়ে থাকে তাহলে সে কেন ছেড়ে এল হাবা-গোবা, পাগল-ছিটেল মেয়েমানুষটাকে। বড়ো অবিবেচকের কাজ করেছে দুলু।
কথাগুলো শোনার পরে মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল রঘুনাথের। সে যে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। বারবার তার কাকার কথা মনে পড়ছিল। লুলারাম দুলুর হাত ধরে কতবার বলেছে, তোরে আমি খুশ করে দিব যদি তুই তোর বৌদির খবর এনে দিস। আমি তো গাঁ ছেড়ে বেরুতে পারিনে, কত যে কাজের ঝামেলা!
ভাবতে গিয়ে রঘুর মাথার ভেতরটা ডানা ভাঙা পাখির মতো কাতরে উঠল, উঃ, কী শুনলাম গো! এসব শোনা তো আমার পাপ..।
-পাপ নয় রে, এসব হল গিয়ে কর্মফল। চল রঘু পলাশী থেকে ঘুরে আসি।
রঘুনাথ আবেগে ভাসল না, আমার কাছে নগদ কুনো পয়সা নেই। পলাশী যেতে গেলে হেঁটে যেতে হবে আমাকে।
দুলু অর্থপূর্ণ চোখে সাদাতের দিকে তাকাল, সাদাত ভাই, তোমার কাছে কিছু টাকা থাকলে উধার দাও। কাল সকালে ঘুরোন দিয়ে দিব।
সাদাত বলল, কালই যে ঘুরোন দিতে হবে এমন নয়। তুমি সুবিধা মতো দিও। আমি আমার বিবির মুখে তোমার অনেক সুখ্যাতি শুনেছি।
সাদাতের বাঁশ-চাটাইয়ের ব্যবসা সারা দুর্গাপুর-আসানসোল জুড়ে। যেখানে খনি, সেখানকার ধস ঠেকাতে দরকার হয় চাটাইয়ের। বিনা চাটাইয়ে ধস নামে মাটির। খনির বাঁধ দেওয়া জল হুসহুসিয়ে ঢুকে আসে অন্য খনিতে। তখন সমূহ বিপদ। এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে শুধু চাই চাটাই। মোকামপাড়ায় কারিগর আছে চাটাই তৈরি করার। সেই চাটাই বান্ডিল বেঁধে লোড করা হয় লরিতে। চাটাই ভর্তি লরি রওনা দেয় আসানসোল-দুর্গাপুরের দিকে। আগে ফোনে কথা বলে নেয় মহাজনরা। চাটাই পৌঁছে দিলে নগদ টাকা। তখন খালি লরি নিয়ে ফিরে আসতে হয় সাদাতকে। সাদাত খনি অঞ্চল থেকে কয়লা অথবা কয়লার গুঁড়ো নিয়ে আসে ট্রাকে ভরে। তাতে যা লাভ হয় লরির ভাড়া পুষিয়ে গিয়েও লাভের মুখ দেখা যায়। মোকামপাড়ায় বসে সাদাতের এই ব্যবসা অনেকেরই মাথার মধ্যে ঢোকে না তবে যতদিন যাচ্ছে ততই ফুলে-ফেঁপে উঠছে সে। মোকামপাড়ায় একমাত্র সাদাতেরই পাকা দালান। সারা মোকামপাড়া ঘুরে এলে একমাত্র ওরই আছে একশ দশ সি.সি-র মোটর সাইকেল।
মানোয়ারাকে সাদাত পয়সার টোপ দিয়ে পণ্ডিত বিলের মাছের মতো ডাঙায় তুলেছে খেলিয়ে। মানোয়ারা এখন তার পোষা বেড়াল, সারাদিন মিউমিউ করে আদরের কথা বলে। স্বামী গরবে ইদানীং তার পা পড়ছে না। এমনকী নিজের জন্মদাতা আব্বাজানকেও মানোয়ারা খুব বেশি পাত্তা দেয় না। চাঁদ মহম্মদ মেয়ের এই পরিবর্তন নিজের চোখে দেখছে, কষ্টে বুক ভেঙে গেলেও তার কিছু করার নেই। আসলে রক্তের দোষ যাবে কোথায়? নুরি বেগম ডানা কাটা পরীর মতো দেখতে ছিল, সে-ও তো কাঁচা বয়সে ভুল করে অন্যের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালাল। এখন নুরি বেগমের তেজ কমেছে, রূপ চটা ওঠা ফুটোফাটা মাটির মতো, এখন বহু কষ্টে দিন কাটছে তার। তার দুর্দশার ফিরিস্তি মাঝেমধ্যেই কানে আসে চাঁদ মহম্মদের। তখন বউটার জন্য এই বয়সে মনটা মাখা ময়দার চেয়েও নরম হয়ে যায়। মনে হয় বহরমপুর থেকে ফিরিয়ে আনবে নুরি বেগমকে। কোরানে ক্ষমার কথা বলেছে বারবার। চাঁদ মহম্মদ ধর্ম ছুঁয়ে শ্বাস নিচ্ছে এখনও। নুরি বেগমের বিচ্ছেদ এখনও তার মনে গোস্তকাটা ধার চাকু ঢুকিয়ে দেয়। তখন ছটফট করে পুরো বদন। সেই পুরনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে। মসজিদের নামাজ সেরে ফিরছে চাঁদ মহম্মদ। মনোয়ারা আব্দার ধরেছে সিমাই খাবে। দুধ-সিমাইয়ের পায়েস মেয়েটার ভীষণ প্রিয়। রফিকের দোকান খুলিয়ে সিমাই আর গুড়া দুধের ঠোঙা নিয়ে ঘর ফিরছে চাঁদ মহম্মদ। তিন-সাড়ে তিন বছরের মেয়েটাকে দুধের বোঁটা ধরিয়ে দিয়ে এককেতে হয়ে শুয়ে আছে কাঁথাকানির ভেতর নুরি বেগম। যেন সে কোন নারী নয়, আসমানের স্ত্রী, যেন সে কোনো হরী-পরী নয়, খুশির বাতাসে নুয়ে যাওয়া ফুলের গাছ, মাতৃত্বের সুগন্ধে ম-ম করছে ঘর। চাঁদ মহম্মদ সেই সুখের বাতাসকে বুক ভরে নিয়ে সারাদিনের রসদ খুঁজে নিচ্ছে নিজের জন্য।
সেই চোখের মণি মানোয়ারা এখন স্বামীর সুখের ঘর পেয়ে ভুলতে বসেছে বাপকে। চাঁদ মহম্মদের দুঃখ হলেও বুক চেপে থাকে সে। নিজের ঘর ছাড়া সে এখন ভুল করেও সাদাতের ঘরের দিকে তাকায় না। মানোয়ারাও পথে-ঘাটে বাপকে দেখলে মুখ নিচু করে চলে যায়, যেন সে চাঁদ মহম্মদকে চেনে না, চাঁদ মহম্মদ তার আব্বা নয়, তার কোনো আম্মাজান নেই বাপজান নেই, সে যেন আকাশ থেকে ঠিকরে পড়া তারা।
চাঁদ মহম্মদ এসব লক্ষ্য করে হায় আল্লা রসুলতান্না বলে দীর্ঘশ্বাস উগলে দেয় বাতাসে।
তুর ভালো হোক বিটি, তুর ভালো হোক। চাঁদ মহম্মদের ঠোঁট এমনকী চোখের তারা কেঁপে ওঠে ঝনঝনানো কাঁসার থালার মতো। ঝাপসা চোখে সে সুখের পৃথিবীটাকে দেখে জটিল কুয়াশায় ঢাকা।
