বড়ো আশ্চর্য এই জীবন।
গোলের দিকে ধেয়ে আসা বলটাতে রঘুনাথ রাগের মাথায় লাথি ছুঁড়ে দিল। বল গিয়ে পড়ল ঠিক অন্য গোল পোস্টের পেনাল্টি এলাকার মাঝখানে। বাঘের মতো ওৎ পেতে ছিল সূর্যাক্ষ। বলটা বুক দিয়ে নামিয়ে পায়ে খেলাতে খেলাতে সজোরে কিক মারল গোলের দিকে। হেড দিয়ে বলটাকে মাঠের বাইরে বের করে দিতে চেয়েছিল ব্যাকি, কিন্তু তা হল না, বল কোণ ঘেঁষে রকেট গতিতে ঢুকে গেল গোলের ভেতর। জালে জড়িয়ে গেল বল। মানিকডিহি এগিয়ে গেল এক শূন্য গোলে।
যারা খেলা দেখছিল তাদের চক্ষু চড়কগাছ। এ-ও কি সম্ভব? একজন মানুষের পায়ে কত শক্তি থাকতে পারে? এ ছেলে খেলার মধ্যে থাকলে নাম করবে। একে আটকাবে সাধ্য কার?
খেলা শেষ হতেই সূর্যাক্ষ এসে রঘুনাথকে জড়িয়ে ধরল। সেই নাদুসনুদুস ভুড়িওয়ালা লোকটা এসে বললেন, সাবাস, এর আগে আমি তোমার খেলা দেখিনি। আজ তোমার খেলা দেখে মন ভরে গেল!
ক্লাবের মেম্বার তারক তাকে উসকে দিয়ে বলল, এ ছেলের পা নয় তো একেবারে ইস্পাত দিয়ে গড়া। মানুষের পা হলে এত জোরে শট মারা সম্ভব নয়।
এসব কথা রঘুনাথের কানে ঢুকছিল না কিছুই। সে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কী এমন করেছে সে যার জন্য তাকে এত বাহাদুরী নিতে হবে। আখের আলসে ছাড়াতে না গিয়ে সে বল খেলতে এসেছে। এর বেশি সে আর কিছু ভাবতে চায় না।
দেড় ঘণ্টা সময় মাঠের মধ্যে কী ভাবে কেটে গেল কিছুই টের পায় নি সে। মোটা লোকটা এগিয়ে এসে বললেন, আমাদের গাঁয়ে এমন ছেলে আছে আগে আমি জানতাম না। তোমার কি চাই বলো?
রঘুনাথ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। তার হয়ে কথা বলল সূর্যাক্ষ, পচাদা, ও বড়ো লাজুক ছেলে, মুখ ফুটে কিছু চাইবে না। ম্যাচ খেলতে আসবে বলে ওর আজ মুনিষ খাটতে যাওয়া হয়নি। তুমি যদি ওর একদিনের ‘রোজ’ দিয়ে দাও তাহলে ভীষণ ভালো হয়।
-সে কথা আর বলতে। এই নাও, ধরো একশ টাকা। পচার থলথলে গাল খুশিতে নড়ে উঠল, টাকা দিয়ে এ খেলার কোনো বিচার হবে না। তবে তুমি যদি বলো আমি কেসনগর স্টেডিয়ামে কথা বলব। ওখানে আমার জানাশোনা আছে। আজ যা দেখালে তার সিকিভাগ যদি খেলতে পারো তাহলে স্টেডিয়ামের মাঠ তোমার দখলে চলে আসবে।
কিছু না বুঝে রঘুনাথ সূর্যাক্ষের দিকে সাহায্যের জন্য তাকাল। সূর্যাক্ষ বলল, রঘু গাঁ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। ঘরে ওর মা একা আছে। ওর বাবা মুনিষ খাটতে গিয়েছে রাঢ় দেশে। দাদুটা বুড়ো।
সামান্য হলেও আবেগে ঘা খেলেন নাদুসনুদুস চেহারার লোকটা। কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে সূর্যাক্ষ বলল, রাগ করো না পচাদা, যা সত্যি আমি তাই বললাম। আমাদের দেশের খেলোয়াড়রা সুযোগ পায় না। ওরা যদি সুযোগ পেত তাহলে দুনিয়াকে দেখিয়ে ছেড়ে দিত।
-তা ঠিক। তবে আমাদেরও দোষ আছে। পচার আবেগী কণ্ঠস্বর বাস্তবের মাটিতে ফিরে এল।
রঘুনাথের অনেকক্ষণ থেকে জল তেষ্টা পেয়েছে। সে দূরের টিউবওয়েলটার দিকে চাতক চোখে তাকাতেই সূর্যাক্ষ বলল, চল, আমিও তোর সাথে যাই। আমারও তেষ্টা পেয়েছে খুব।
জল খেয়ে ওরা যখন ফিরে আসছিল তখনই কু-ঝিক ঝিক রেলগাড়ির শব্দ শুনতে পেল। শব্দ যে গান হয়, সেই প্রথম রঘুনাথ বুঝল।
সূর্যাক্ষ বলল, তুই বুঝি এর আগে কোনোদিন ট্রেন দেখিসনি? রঘুনাথ ঘাড় নাড়তেই সূর্যাক্ষ আফসোস করে বলল, আজ আর সময় হবে না, না হলে আজই তোকে ট্রেন দেখিয়ে নিয়ে যেতাম। ছ’টার বাসটা যে করেই হোক ধরতে হবে। শুনেছি-আজ নাকি সাতটার বাস নেই। দেবগ্রাম আসলে ফেরার এই এক ঝামেলা।
অনেকক্ষণ পরে সূর্যাক্ষর কথা বলার ধরন দেখে রঘুনাথের ঠোঁট পিছলে বেরিয়ে এল হাসি, সশব্দে নয়, সে নীরবে হাসল শরীরে কাঁপন তুলে। ভালোলাগার রেশগুলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল তার সত্তায়। সেই রেশগুলো ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল কোষে কোষে।
ক্লাব সেক্রেটারী মদনদা মানিকডিহি জেতাতে ভীষণ খুশি। আবেগী স্বরে সে বলল, আমাদের এই দলটা সর্বকালের সেরা দল। আমার মন বলছে কেসনগর যদি আমাদের সঙ্গে খেলে তাহলে ওদেরও আমরা হারিয়ে দেব।
পচা বললেন, শুধু মুখে বললে হবে না, করে দেখাতে হবে।
তর্ক করতে করতে ওরা রাস্তার এক পাশ ধরে হাঁটছিল। এ সময় দেবগ্রামের পাকা রাস্তায় লোকজন ছড়ানো-ছিটানো ভাবে দেখা যায়। দত্ত মেডিকেলের কাছে আসতেই দুলুর সঙ্গে চোখাচোখি হল রঘুনাথের।
দুলুর বুকে যেন পাথর চাপা ছিল এতক্ষণ। সেই ভার পাথর সরিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল দুলু। কপালের ঘাম তর্জনীতে কেঁচে নিয়ে সে বলল, তোর সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো। যদি না দেখা হত তাহলে আজ নির্ঘাত আমাকে ধাওড়া পাড়ায় যেতে হোত।
দুলুব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মানোয়ারার বর সাদাত। ওর মুখে কোনো কথা নেই, ও শুধু শুনছিল। দুলু খপ করে রঘুনাথের হাত ধরে বলল, এটু আড়ালে চল, তোর সাথে দুটা গোপন কথা আছে।
সাদাত দুলুর ব্যবহারে কেমন ব্যথিত চোখে তাকাল। এ কেমন ভদ্রতা? এমনকী যা মুখ চেনা মানুষের কাছে বলা যায় না। আসলে দুলু সেই কাশিমবাজার থেকে এড়িয়ে চলছে সাদাতকে। সাদাতই তার মানোয়ারাকে ছিনিয়ে নিয়েছে টাকার জোরে। তাছাড়া মানোয়ারার মনে তার উপর কোনো ভালোবাসা ছিল না। মানোয়ারা পালবুড়ার আটা চাকিতে আসত শুধু টাকার জন্য। দুলু টাকা না দিলে তাদের হাঁড়ি চড়ত না।
