পাশ ফিরে শুয়ে রঘুনাথ অন্ধকারে মায়ের দিকে তাকাল, কাল আমি খাটতে যেতে পারবো নি মা। কাল আমার বল খেলা আচে দেবগ্রাম। সূর্য আমায় সেখানে নিয়ে যাবে।
-সূর্য হল গিয়ে বড়ো লোকের ব্যাটা। তার সাথে কি তুর পাল্লা দেওয়া উচিত হবে? দুর্গামণির কণ্ঠস্বরে ভয় আর বিস্ময় ঘোঁট পাকিয়ে গেল।
রঘুনাথ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল। সূর্য আমার বন্ধু। ওর কথা রাখব নি তো কার কথা রাখব?
–কতা রাখতে গিয়ে তিনটে মানুষের পেটের কতা ভুলে যাবি তা হয় না। দুর্গামণি অন্ধকার চিরে তীক্ষ্ম চোখে তাকাল, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। বল খেলে কি হবে? বল কি তুকে ভাত দিবে?
দুর্গামণির কথাগুলো মন থেকে মেনে নিতে পারল না রঘুনাথ, অথচ মায়ের মুখের উপর তার প্রতিবাদ করা সাজে না। তাই সে গলার স্বর মোলায়েম করে বলল, একদিন কাজে না গেলে যদি হাঁড়ি ঠনঠনায় তাহলে অমন সনসারে হাঁড়ি আঁখায় চড়িয়ে লাভ কি?
-গরিবের কিসে লাভ কিসে ক্ষতি তা যদি বুঝতে পারতাম বাপ? বড়ো জটিল হিসাব। এত বছর ধরে হাঁড়ি ঠেলে মাথা সব গুলিয়ে যায়। দুর্গামণির বুক ছুঁয়ে আক্ষেপের নিঃশ্বাস গড়িয়ে পড়ল।
অভাব ধাওড়াপাড়ায় কার নেই? তবু চরম অভাবের মধ্যে মানুষগুলো শ্বাস নেয়, বুড়িগাঙের জলে ডুব দিয়ে ভাতের প্রতীক্ষায় পাড়ে উঠে আসে। ওদের কাছে যে দিনটা যায় সেদিনটা ভালো। যে দিনটা আসছে, সেইদিনটা চিন্তার।
অনেক রাতে ঘুমালেও ঠিক ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল রঘুনাথের। কুসুমআলোয় শরীরের স্ফূর্তি ভাবটা শিশির চুবানো ঘাসের চেয়েও চনমনে হয়ে ওঠে। এ সময় কমলার কথা রোজ মনে পড়ে তার। অনেকদিন কমলার সঙ্গে দেখা হয়নি তার। সুফল ওঝা জোর করে মেয়েটাকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কমলার একদম যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কাশীনাথ তাকে জোর করে দিয়ে এল মামার ঘরে। দূরত্ব অনেক সময় মনের দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়। সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতো ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে দেয়। কমলাকে দূরে পাঠিয়ে দিয়ে সুফল ওঝা বেশ সুখেই আছে। কলাবতীও চিন্তামুক্ত। কাশীনাথ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ইদানীং নিচু ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের সে দায়িত্ব নিয়ে পড়াচ্ছে। মাস গেলে যা পাবে তাতে ওর হাত খরচ চলে যাবে। তা ছাড়া মাস্টার ডাকটা শুনতে তার মন্দ লাগে না। এই সম্মান টিউশনির অর্থমূল্যের চাইতেও বেশি মূল্যবান।
বেলা বারোটায় বাস ছেড়ে গেল মিষ্টির দোকানের সামনে থেকে। অন্যদিনের তুলনায় আজ বাসে ঠাসা ভিড়। গাঁয়ের ছেলেরা দেবগ্রামে খেলতে যাচ্ছে এটা কি কম গর্বের কথা।
পাশাপাশি সিট পেয়েছে সূর্য আর রঘুনাথ। বাইরের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে ওরা। কামারী পেরিয়ে যেতেই সূর্যাক্ষ বলল, আজ তোর মনে আনন্দ নেই। কেন কি হয়েছে রে?
-না কিছু হয়নি তো! রঘুনাথ এড়িয়ে যেতে চাইলে সূর্যাক্ষ তার চোখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, কী ভাবছিস তুই?
রঘুনাথ বলল, আসার সময় কাকার সাথে দেখা হল। কত রোগা হয়ে গিয়েছে। আসলে কাকি চলে যাওয়ার পর কাকার মনের অবস্থা ঠিক নেই। সারাদিন খালি মানসিক করে বেড়াচ্চে। ঠাকুরদেবতার থানে মাথা ঠুকচে।
-তোর কাকিকে নিশ্চয় তোর কাকা ভীষণ ভালোবাসত।
রঘুনাথ ঘাড় নাড়াতেই সূর্যাক্ষ বলল, আমার মন বলছে সে যদি বেঁচে থাকে নিশ্চয়ই একদিন ফিরে আসবে।
-আমারও মন তাই বলচে।
এ সময় ঢ্যাঁড়শ গাছে ফুল আসে। ফুলগুলো ঘিয়ে রঙের ভেলভেটের মতো, ভেতরে লাল রঙের ছিটে দেওয়া। বর্ষার জল পেয়ে বাঘহাতা ঘাসগুলো কিশোরী মেয়ের শরীরের বাড়কেও হারিয়ে দিচ্ছে।
দেবগ্রাম আসতেই বাসটা ব্রেক কষে ঝাঁকুনি দিয়ে থামল। জনা কুড়ি লোক নেমে এল বাস থেকে। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল গলা চড়িয়ে। ওদের আলোচনার মধ্যে উঠে আসছিল ফুটবল। মোটা মতোন হোমড়া-চোমড়া একজন গলা উঁচিয়ে বললেন, যদি তোমরা আজ জিততে পারো তাহলে আমি খুশি হয়ে তোমাদের একটা খাসী এনে দেব। যদি না জিততে পারো তাহলে ফেরার পথে শুধু চা-সিঙ্গাড়া।
দেবগ্রামের বলখেলার মাঠ স্টেশন থেকে বেশি দূরের পথ নয়। এখান থেকে রেল গাড়ির ঝমঝম শব্দ শোনা যায়। হুইশেল ভেসে আসে বাতাস বিদীর্ণ করে। বলখেলার মাঠটা সবুজ ঘাসে গা মুড়িয়ে অলস শরীরে শুয়ে আছে। একটু পরে তার ঘুম ভাঙিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হবে। বাঁশি বেজে উঠবে রেফারির। বল ব্যাক-ভলি করে গোলে ঢুকিয়ে দেবে সেন্টার-ফরোয়ার্ড। তখন ব্যাকে যে খেলে তার কিছু করার থাকবে না।
গোলকিপার আর ব্যাকের দায়িত্ব যে প্রচুর এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে রঘুনাথ মানিকডিহির মাঠে। সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বিস্মৃত হয়নি সে। অবশ্য এর কৃতিত্ব সূর্যাক্ষর। ও পাশে না থাকলে ম্যাচটা মনে হয় হাতছাড়া হয়ে যেত।
আজ ড্রেস পরে মাঠে নামতে গিয়ে একবার মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল রঘুনাথের। এসময় আখের আলসে ছাড়িয়ে মাঠ থেকে তার ফেরার কথা। ঘর ফিরতে রোদ ঝিমিয়ে যাবে। তারপর এক সময় কালচে হয়ে যাবে বুড়িগাঙের ঘোলাজল। বুড়িগাঙে ডুব দিয়ে এলে ভাত বেড়ে দেবে মা। সঙ্গে শাক ভাজা আর পাতলা ডাল। কোনো কোনো দিন শুধু শাক ভাজা, ডাল জোটে না, কোনোদিন আবার শুধু ডাল, শাক সেঁতলাবার মতো তেলও জোটে না।
