মনসা পুজোয় জ্যাবজ্যাবে করে তেল মেখেছে সুফল ওঝা। নারকেল তেলমাখা তার ধাতে সয় না। জ্ঞানপড়ার পর থেকেই সরষের তেল মাথায় মাখছে সুফল ওঝা। সরষের তেল নাকি মাথা ঠাণ্ডা রাখে, ঘুম ভালো হয়। যদিও কাল সারা রাত ঘুমাতে পারে নি সে। কমলার ঘটনাটা তাকে বেশ দুঃখ দিয়েছে। মেয়েটা মুখের উপর অমনভাবে বলে দেবে স্বপ্নেও সে আশা করেনি। কমলা দীপ্তকঠে বলল, বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে রঘুকেই করব। রঘু ছাড়া আমি আর কাউকে আমার স্বামী হিসাবে ভাবতে পারি না।
কমলা অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছে না হলে অমন কথা সে বলে কিভাবে? তার লঘু-গুরু জ্ঞান নেই। সে প্রায় উন্মাদ।
সুফল ওঝা হতবাক দৃষ্টি মেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল অপলক। কমলা জ্ঞান দেবার ঢঙে বলেছিল, তুমি তোমার কাজ নিয়ে থাকতে পার বাবা। আমার জন্য ভেবো না, আমি পালাবার মেয়ে নই। যদি পালাবার ইচ্ছে থাকত তাহলে একবছর আগেই পালিয়ে যেতাম।
-কমলা তুই চুপ কর। চমকে উঠেছিল সুফল ওঝা, যত বড়ো মুখ নয়, তত বড়ো কথা তুই বলিস কি করে?
ঝাঁপান গানের সুর যতবার শোনা যায় ততবার যেন পুরনো হয় না। ভিড়টা জমে উঠেছে। সাপখেলাকে উদ্দেশ্য করে। ভিকনাথ রঘুনাথকে দেখতে পেয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, শোন রঘু, তুর সাথে কথা আচে। রঘুনাথ পাকুড়গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল, কী কথা?
চারপাশে সতর্ক চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভিকনাথ বলল, সামনে তুর বেপদ নাচচে। সাবধানে থাকবি। কমলার সঙ্গে দেখা-শোনা কম করবি।
-কেনে কি হয়েচে?
–সে অনেক কথা, পরে বলব। ভিকনাথ চোরের মতো ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
.
প্রীতি ম্যাচে এবার মানিকডিহি খেলতে যাবে দেবগ্রামে। সূর্যাক্ষ সন্ধেবেলায় এসে হড়বড়িয়ে বলে গেল, রঘু, তোকে ব্যাকে খেলতে হবে, তৈরি থাকিস। রঘুনাথ চোখ কপালে তুলে বলল, আমার দ্বারা খেলাফেলা হবে নি বলে দিলাম। তুই অন্য কাউকে দেখ সূর্য। বাবা ঘরে নাই। আমার কাল থেকে মাঠে আখ কাটতে যাবার কথা।
চুনারাম এই বয়সেও মাঠে যায় জনখাটতে। সে না খাটলে সংসার অচল। দুর্গা মাঠে জনখাটতে যাবে বলে অস্থির। চুনাম তাকে যেতে দেয় না। গলায় জোর খাটিয়ে বলে, তুমি ঘরের বউ, ঘরে থাকবা। আরে আমরা কি মরে গেচি, এ্যাঁ?
রঘুনাথ ঠিক করেছে সেও মুনিষখাটতে মাঠে যাবে। ভিকনাথ তাকে সাথে করে নিয়ে যাবে। ধার করে আখঝোড়ার হেঁসো কিনেছে সে। জনখেটে শোধ দেবে হেঁসোর পয়সা।
রঘুনাথের এই সিদ্ধান্তে চুনারাম খুশি হলেও খুশি হয়নি দুর্গামণি। এই বয়স থেকে ছেলেটা খাটতে যাবে–এটা মন থেকে কিছুতেই মানতে পারছে না সে। গুয়ারাম ঘরে থাকলে রঘুনাথ ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে খেত, এমনকী চুনারামকেও এই বয়সে জনখাটতে মাঠে পাঠাত না সে।
সূর্যাক্ষ হতাশ হয়ে বলল, তুই যে খাটতে যাবি শেষ পর্যন্ত পারবি তো? তোকে দেখে তো মনে হয় ফুলবাবু।
সূর্যাক্ষ রঘুনাথের হাত চেপে ধরে বলল, তোকে যে করেই হোক কালকের দিনটা উদ্ধার করে দিতেই হবে। তুই না গেলে আমাদের গ্রাম গো-হারা হেরে যাবে। তুই কি চাস আমরা হেরে যাই?
রঘুনাথ ইতস্তত করে বলল, ঠিক আছে আমি যাবো। কখুন যেতে হবে বল? তবে এটাই শেষ। গরিব মানুষের পেটের খেলাটাই আসল খেলা, আর সব খেলা ছেলেখেলা।
স্রিয়মান হেসে সূর্যাক্ষ বলল, তোর কথাই মেনে নিলাম। এবারটা চ। আর তোকে যাওয়ার জন্য বলব না। কাল বারোটার বাসে আমরা যাব। তুই বারোটার সময় বাঁধের উপর থাকিস। আমি তোকে সাইকেলে করে স্ট্যান্ড অবধি নিয়ে যাব। ফুটবল খেলার শখ ছোট থেকেই রঘুনাথের। গুয়ারাম মেলা থেকে তাকে একটা লাল রঙের রবারের বল কিনে দিয়েছিল। বলটা এত ছোট যে পা দিয়ে মারতে গেলে লাগত। এর চেয়ে বাতাবীলেবু পেটানো ঢের ভালো। পাকুড়তলায় মাঝেমধ্যে বাতাবীলেবু ম্যাচ হত। কাঁচা বাতাবীলেবু হাওয়ায় পড়ে গেলে গোরু-ছাগলেও খায় না। সেই বাতাবীলেবু নিয়ে বাঁধের উপর পেটা-পেটি খেলা। এই খেলা কি বল খেলার কোনো নিয়ম মানে? তবু রঘুনাথের মজা লাগত খেলতে।
মানিকডিহির মাঠে প্রথম সে ম্যাচ খেলতে নামে। সেদিনও সূর্যাক্ষ তাকে জোর করে নামায়। পরে রঘুনাথ ভেবেছে-কাজটা তার উচিত হয়নি। গায়ে শুধু জোর থাকলে খেলা হয় না। খেলার কায়দা-কানুন জানা দরকার। গোয়াড় গোবিন্দরা বরবাদ করে দেয় খেলার মাধুর্য। রঘুনাথ এবার মাঠে নামলে নিজেকে সামলে নিয়ে নামবে যাতে লোক না হাসে।
সারারাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারল না রঘুনাথ, চোখ বুজলেই খেলার শব্দ, ফুটবলের ধুপধাপ আওয়াজ, দর্শকদের চিৎকার চেঁচামেচি তার কানে উড়ে এল। তার উশখুসানি দেখে দুর্গামণি বিচলিত হয়ে বলল, রাত বাড়ছে, ইবার শুয়ে পড় বাপ। কাল আবার তুকে মুনিষ খাটতে যেতে হবে।
মুনিষ খাটতে যাওয়া নয় তো যুদ্ধ করতে যাওয়া। ছেলের জন্য ভিজে ভাত, পেঁয়াজ আর আলুচচ্চড়ি রেখে দিয়েছে দুর্গামণি। ভরপেট ছেলেকে না খাইয়ে পাঠালে ভিমরি লেগে পড়ে যেতে পারে। মেহনতের কাজে খাদ্য-খাবারই আসল কথা। এই শিক্ষাটা দুর্গামণি তার বাপ-মার কাছ থেকে পেয়েছে। এখন বদলে যাচ্ছে সময় তবু খিদের স্বভাব পাল্টায়নি। এই পেট হল মহাশত্রু। একে সামলে রাখতে পারলে দুনিয়ার সব কাজ মোটামুটি চলে যায়।
