এত সুখ তার কপালে লেখা সে কি আগে জানত? এই মন্ত্রই তাকে সব জানিয়েছে, চিনিয়েছে। আর দশটা মানুষের থেকে আলাদা করে দিয়েছে তাকে। দশ গাঁয়ের মানুষ তাকে এখন এক ডাকে চেনে। এই সম্মান সে হারাতে চায় না কোনোমতে। হাইস্কুলের ছোকরা মাস্টার তাকে হেনস্থা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ওর মতন দশটা মানুষ গাঁয়ে থাকলে না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে তাকে। সুফল ওঝা তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। পথের কাঁটাকে পথেই খতম করে দিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু ভাগ্যের জোরে মাস্টার বেঁচে যায়। সেদিন যদি হাতকাটা দুলু গিয়ে না পৌঁছাত তাহলে সাঁতার না জানা মাস্টার বর্ষার বিলে বিষ দেওয়া মাছের মতো ভেসে উঠত। কাক-পক্ষীতেও টের পেত না-এর পেছনে কার হাত আছে।
আজ ডাঙাবনের ঝোপের মধ্যে বসে সুফল ওঝা কপাল কুঁচকে রোদের দিকে তাকাল। রোদ বাড়লে তেজ কমে আসে সাপের। ওদের ঘরসংসার তখন গরমগুহা। আইঢাই করে সংবেদী শরীর। উইটিপি থেকে বেরিয়ে এসে ওরা জলের ধারে ঘুরে বেড়ায়। ব্যাঙ শামুক মাছ যা পায় খায়। না খেলে পেট বাঁচবে কি করে? যাই দেবে অঙ্গে, তাই যাবে সঙ্গে।
বিল ধারের সাপগুলো ফণাধারী, ওদের চোটপাট মন্দ নয়, খর চোখ, তড়িৎ গতি, হিংস্র ভাবনা। ঠিক খেলিয়ে না ধরলে সমূহ বিপদ। সাপের চোখে চোখ রেখে সুফল ওঝার বেঁচে থাকা। চোখ সরে গেলে বিপদ। ঝাঁ-করে নেমে আসবে খাঁড়ার কোপের চেয়েও হিংস্র ছোবল। তখন মৃত্যু অবধারিত।
ঝোপঝাড় চিরে সুফল ওঝা এগিয়ে গেল উইটিপিগুলোর দিকে। বর্ষায় অমন নিরাপদ আশ্রয় আর কী হতে পারে? ওখানেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে পারে খরিস সাপের বংশ।
সুফল ওঝার নির্দেশে বাঁক নামিয়ে উইটিপি খুঁড়তে লেগে গিয়েছিল ভিকনাথ। ওর কালো শরীর চুঁইয়ে ঘাম আর মাটির মিশ্রণ নামছিল সরসরিয়ে, তবু ওর কোনো ক্লান্তি নেই। একমাত্র সুফল ওঝাই পারবে মন্ত্রের সাহায্যে ঝারিকে সংসারে ফিরিয়ে দিতে এটা তার বদ্ধমূল ধারণা। সুফল ওঝা সব পারে শুধু মরা মানুষ জ্যান্ত করতে পারে না। মাটি খোঁড়ার ঝোঁকে মাথায় বাঁধা লাল গামছা খসে পড়ে মাটিতে। গামছাটা তুলে নিয়ে ভিকনাথ রগড়ে রগড়ে মুখ মুছল, তারপর শূন্য দৃষ্টিতে উইটিপির দিকে তাকাল, ওস্তাদ, আর কত দূর খুঁড়তে হবে গো? হাতের ডানা দুটো যে ব্যথা করছে।
-কারোর ডানা ভাঙতে গেলে নিজের ডানা তো এট্টু ব্যথা করেই। সুফল ওঝা ছাঁটা গোফ নাচিয়ে হাসল, সাপধরার কাজ ভাত রাঁধার মতো সহজ কাজ নয়। এ কাজে কখন থামতে হবে তা আগাম কেউ জানে না।
উইটিপি খুঁড়ে পাকা খরিস বের করে আনতে গায়ের গেঞ্জি ভিজে সপসপে হয়ে গেল সুফল ওঝার। সাপটার ফোঁসফোঁসানীতে ভয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে ভিকনাথ। চোখের সামনে বিষদাঁত ভাঙা নয়, এমন সাপ সে কি এর আগে দেখেছে? মনে করতে পারল না ভিকনাথ। ভয়ে ঘাম ফুটে বেরল তার শরীরে। লাল গামছায় মুখ মুছে সে সুফল ওঝার চোখের দিকে তাকাল, ওস্তাদ, এটাকে কুথায় রাখবো, ঝোলায় না ঝাঁপিতে।
সুফল ওঝার ঠোঁটে গর্বের চিলতে হাসি, বিষদাঁত না ভাঙা অব্দি ও ঝোলায় থাকবে। যতক্ষণ না বিষদাঁত ভাঙচি, ততক্ষণ ওর জেদ-গোঁ কোনোটাই কমবে নি। কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল সুফল ওঝা, অতীত দিনে হারিয়ে গিয়ে সে আবার উড়ুলমাছের মতো ভেসে উঠল, আজ আমার কেন জানি না বাসুর কথা মনে পড়ছে।
কুন বাসুগো ওস্তাদ?
হরিনাথপুরের বাসুদেব। যে বাসুদেব বেলডাঙার রেল-ইস্টিশানে কাজ করত। ওই যে গাড়ি আসার সময় কিংবা টিকিট দেওয়ার সময় হলে ঘন্টা বাজাত–সেই বাসুদেব। বছর তিনেক আগের ঘটনা। সাপের বিষ বের করতে গিয়ে আঙুলটা সাপের মুখের ভেতর ঢুকে যায়। পাকা সাপটা কামড়ে দেয় ওকে। একেবারে বুড়ো আঙুলে। কত চেষ্টা করলাম। দশ গাঁয়ের গুণিন এলো। তবু মানুষটা বাঁচল নি। ভ্যানে চাপিয়ে বাসুরে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হল তখন ওর শরীরে জান নেই। প্রাণ পাখি উড়ে গেছে বহুক্ষণ। সুফলের অশ্রুপ্লাবিত মুখ। বাসুদেবের জন্য তার অন্তরটা কেঁদে উঠল অসময়ে। মানুষটার টাকা-পয়সা জমিজমার অভাব ছিল না। বেলডাঙায় তার নামে রেল কোয়ার্টার ছিল। তবু ফি-মাসে ঘর আসত দেখভালের জন্য।
বাসুদেব বৌ বাচ্চা নিয়ে কোয়ার্টারে থাকত। ওর বউয়ের পাকা ঘরে থাকার ভীষণ সখ। সেই চাকুরিয়া বাসুদেবের একটাই নেশা-মনসা পুজোয় সাপের খেলা দেখানো।
ফি-বছর আসত সে। সে-বছর এসে সে আর ফিরে গেল না। দৈবের লিখন কে খাবে?
ডাঙা ঝোপের সাপটার বিষ দাঁত ভাঙল না সুফল ওঝা। একা থাকলে এসব কাজ করা ঝক্কির। আনকোরা লোক দিয়ে এসব ঝুঁকির কাজ হয় না। বিপদ-আপদ ঘটে গেলে সে ঠেকা দিতে অক্ষম। লম্বা কাপড়ের থলিতে সাপটা ঢুকিয়ে নিজের কাছে রাখল সে। তখনো ফোঁস-ফোঁসানী থামেনি সাপটার। এ অবস্থায় ভিকনাথের হাতে সাপটা তুলে দেওয়া উচিত হবে না। হিতে বিপরীত হয়ে গেলে বিপদ।
মান গেল জান গেল তুর কাছে মা বিনতি/সাত সাগরের জল দিয়েছি মান রাখিস এই মিনতি। অশখলায় ডান পা নড়িয়ে হলদে খরিসের খেলা দেখাচ্ছিল সুফল ওঝা, ওর ধূর্ত চোখে যেন সাপের চোখটায় বসানো। একটু অন্যমনস্ক হলেই নিমেষে বিষ ঢেলে দেবে ফণা তোলা সাপ। ভিড় বাড়ছিল রোদ বাড়ার সাথে সাথে। আজ মনসা পুজোয় নতুন জামা আর ধুতি পরেছে সুফল ওঝা। ওর কপালে সিঁদুরের লম্বা তিলক আঁকা। সাপুড়ে নয়, কাঁপালিকদের মতো দেখাচ্ছিল ওকে।
