ভয়ে হিম হয়ে গেল ভিকনাথের শরীর, কথা জড়িয়ে গেল তার, না, মানে, ইয়ে…
-থাক আর তোকে তোতলাতে হবে না। আমি তোর মনের ভাব বুঝে গিয়েচি। সুফল ওঝা কঠোর চোখে তাকাল, কত ধানে কত চাল হয় সে হিসেব আমার সব জানা আছে। যার গাল টিপলে এখনও দুধের ঘেরান যায়নি, সে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। মুখের হাজার দোষ, বুঝলি কি না?
ভিকনাথ অনুগত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল, সে আমি বুঝেচি ওস্তাদ। তবে তুমার পায়ে ধরি–তুমি আমার কেসটা ভুলে যেও না। ঝারিকে ঘরে ফিরিয়ে দাও। আমার ভাঙা সনসার জুড়ে দাও। দোহাই তুমার।
ভিকনাথের আকুতি দীর্ঘশ্বাস বাতাসকে বেদনাবিধুর করে তোলে, তার মজাটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সুফল ওঝা।
০৪. ঝাঁপান উৎসব
১৬.
ঝাঁপান উৎসবে তিনদিন আগে সুফল ওঝা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, এবছর মনে হচ্ছে মায়ের কাছে খালি ঝাঁপি নিয়ে যেতে হবে। ফি-বছর এসময় দু-চারটে জাতসাপ আমার ঝাঁপিতে থাকেই থাকে। এবছর মনে হচ্ছে মায়ের কাছে খালি হাতে যেতে হবে।
ভিকনাথ তার মন রাখার জন্য বলেছিল, অত চিন্তা করো না। মায়ের বাহন মা-ই জুটিয়ে নেবে। তবে যদি শরীল সাথ দেয় তাহলে চলো বিলের ধার দিয়ে ঘুরে আসি। ওদিকের ঝোপ ঝাড়ে তেনারা ঘোরাফেরা করে লোকমুখে খবর পেয়েছি। তা ছাড়া ফি-বছর ওখানেই তো তুমি মনসা পুজার ধরা সাপগুলো ছেড়ে আসো।
-তা ঠিক, তবে তাদের কি এখন পাব?
-পাই না পাই চলো না ঘুরে আসি। ভিকনাথ বোঝাল, জায়গাটা নির্জন। বিলের ঠাণ্ডা বাতাসে সাপগুলা আরাম করে থাকে ওখানে।
কথাটা মনে ধরেছিল সুফলের, ভিকনাথকে সে মুখের উপর মানা করতে পারেনি। মানুষটা বোকা হলেও সরলতা হারিয়ে ফেলেনি। এই সরলতাই ভিকনাথের সম্পদ। ওর সরল চাহনিতে ওর বড়ো বড়ো চোখদুটো কাঠটগর ফুলের মতো ফুটে থাকে সব সময়। এই সারল্য ওর খাটুনিভরা চেহারাতে ধরা পড়ে।
পণ্ডিতবিলের পাড় ধরে পায়ে চলার পথ। ভিকনাথ তার লম্বা রোগা শরীর দুলিয়ে বাঁক কাঁধে পথ হাঁটে। তাকে পেশাদার বেদের মতো দেখায়। বাঁকের দুদিকে দোল খায় শূন্য সাপঝাঁপি, যা যত্ন করে গোবর মাটি দিয়ে লেপা। ভিকনাথের পরনে ময়লা ধুতি, খালি গা। মাথায় ফেট্টি দিয়ে বাঁধা লাল গামছা। কিছু দূর এসে মোচ নাচিয়ে সে সুফল ওঝাকে শুধোল, ওস্তাদ, আমার মন বলচে আজ খালি হাতে ফিরতে হবে না। এদিকটায় কুনো ওঝা-গুণিনের পা পড়েনি।
খাড়া পথ ঠেঙিয়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে এল ভিকনাথ। কাঁধের বাঁকটা নামিয়ে ঘাড় মুছে নিয়ে সে পিছন ঘুরে তাকাল। সুফল ওঝা গামছা পেতে পা থেবড়ে বসেছে মাটিতে। এক মুঠো মাটি খামচে তুলে নিয়ে সে গন্ধ শুঁকে দেখছে বারবার। বিড়বিড়ান মন্ত্রের ধ্বনি কানে আসছিল ভিকনাথের।
এই ফাঁকে শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে দাঁড়িয়েছে সুফল ওঝা। ছোট করে কাটা গোঁফ নাচিয়ে নিঃশব্দে সে ঝোপ-ঝাড়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাল। ভিকনাথের কথাটাই ঠিক। এখানে কারোর পায়ের ছাপ পড়েনি। যদি তেনারা থাকে এখানে নিশ্চয়ই শান্তিতে আছে। গত বছর মনসা পুজোর পরে এখানেই চারটে খরিস সাপ ছেড়ে গিয়েছিল সুফল ওঝা। গেল সালে ঝাঁপান পার্টি মা মনসার গুণগান কম করেনি। সুফল ওঝাও পিছিয়ে ছিল না এসব ব্যাপারে। সে হেলে-দুলে গাইছিল, ডালা খুললে কালো মালা নাচেরে, নাচেরে/ও মালা কেমড়ে দিলে কেউ কি তখুন বাঁচে রে? বাঁচে রে?/ওরে অষ্টোনাগ ষোলবোড়া বত্রিশ চিতের বাহার রে/মা মনসার ভোগে লাগে, কাঁচা দুধ, পোষা হাঁসের মানসো রে। গানের তালে তালে মাথা হেলায় দশ জন মানুষ। ওরা সব দোহারকি। ওরা না হলে ঝাঁপান গান জমবে না। গানের তালে তালে চলতে থাকে সাপের খেলা। সুফল ওঝা হাঁটু নাচায়, কখনও গামছা বাঁধা হাত এগিয়ে দেয় সাপের ছোবলের এলাকায়। একাজে ঝুঁকি অনেক, চোট খেলে বাঁচার আশা কম। তখন কী সাপে কামড়াইলো বাছারে আমার মা বলিয়া ডাকিতে দিল না আর…! বলে কান্নাকাটি করলেও সে আর ফিরবে না। একবার দংশালে বিষ চারিয়ে যাবে রক্তে, মুখে গাঁজরা উঠে নীল হয়ে যাবে শরীর। মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে শ্মশানঘাটে।
খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে সুফল ওঝা মাটি ঝুরো ঝুরো করে উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ার দিকে। মাটি যে দিকে উড়ে যাবে, সেদিকেই তাদের দেখা পাওয়া যাবে। ঘাস মাটির গন্ধ শুঁকে পথ চিনে কটা মানুষ যেতে পারে। শুধুমাত্র ময়ূরভঞ্জের জানগুরু এ কাজটা করতে পারে। সব বিদ্যা দিলেও গুরুমারা বিদ্যা কেউ দিতে চায় না। সুফল ওঝা কাকুতি-মিনতি করেও জানগুরুর কাছ থেকে এটা আদায় করতে সক্ষম হল না। তবে জানগুরু তাকে অভয় দিয়ে বলেছিল, এক পাতে কি সব খাবি? পাত বদলা। তারপর ভাবব তুই হজমাতে পারবি কিনা। শোন বেটা, সবার পেটে কি ঘি সহ্য হয় রে?
সুফল ওঝা মুখ ঝুঁকিয়ে ফিরে এসেছিল দেশ-গাঁয়ে। মনে তার ইচ্ছে ছিল, সে আর একবার ময়ুরভঞ্জ যাবে। ওটা তার কাছে দেবস্থান। গুরুস্থান। ময়ূরভঞ্জের জনগুরু না থাকলে তাকে আজ হয়ত মাঠে-ঘাটে মুনিষের কাজ করে বেড়াতে হত। গাঁয়ে-গঞ্জে এত সম্মান কি তখন তার থাকত? আজ ঝাড়ফুঁক করে দুটো কাঁচা পয়সার মুখ দেখে সে। মাটির বাড়িখানা তার সবাই টেরিয়ে-টেরিয়ে দেখে। খড়ের মোটা ছাউনি ঘরের গরম ভাবটাকে পুরো শুষে নিয়েছে। মাটির ঘর হলেও তা দোতলা। কড়ি-বর্গা, জানলা-দরজা সব নিম আর কাঁঠালকাঠের। বাড়ির সামনের শিউলি গাছটায় সমবচ্ছর ফুল ধরে, বিশেষ করে সন্ধের পর থেকে কেউ যেন দামি আরশিশির ছিপি খুলে দেয়, হুড়মুড়িয়ে সুগন্ধ নাকে এসে আরামের সুড়সুড়ি দিয়ে পালায়। বেড়ার ধারে আকন্দগাছের সারি, ফলার মতো বড়ো বড়ো পাতাগুলোয় চুন বোলানো, মন ভরে যায়। সুফল ওঝার সব চাইতে ভালো লাগে ঘরের পেছনের কদবেল গাছটা। ওর তেল চকচকে ক্ষুদে-ক্ষুদে পাতাগুলো মেয়েদের কপালের কালচে-সবুজ টিপের মতো, সকালের রোদ বাড়লে পাতাগুলো যুবতী মেয়ের ভরাট নিটোল মুখের মতো চমকায়। তখন হাঁ হয়ে যায় সুফল ওঝার চোখ, সদ্য বেরনো বাঁশকোড়ার মতো হকচকিয়ে ওঠে চোখ। উঠোনের এক পাশে গোরু বাঁধা, পাতনাগুলো সুখের খনি, গোরুগুলো ঘাস-খড় কুচনো চিবাতে চিবাতে অনুগত ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ে। সকালে ওই নীরিহ গোরুগুলো বালতি ভরা দুধ দেয়। আউসের মুড়ি দিয়ে জামবাটিতে দুধ সহযোগে খেতে ভীষণ ভালো লাগে সুফল ওঝার।
