ছেলেটা তার সামনে আসতেই রঘুনাথ তার মত বদলে বলল, যা এটা নিয়ে গিয়ে শেরপুরের ভেতরটায় রেখে আয়। এই জিনিস মার বেদীর সমুখে থাকুক এ আমি চাইনে।
ছেলেটা সাইকেল ঠেলতে-ঠেলতে চলে যাচ্ছে শেরপুরের দিকে।
এখন চতুর্দিকে ঢ্যাঁড়শ ফুলের চেয়েও নরম রোদ উঠেছে। বৃষ্টি ধোওয়া রোদের আভিজাত্যই আলাদা। এই রোদ মানুষের মন খারাপ সারিয়ে দেয়। আর কিছুক্ষণ পরেই পুজোয় বসবে চুনারাম। এ পাড়ায় ব্রাহ্মণ আনে না বাইরে থেকে। আনার ইচ্ছে থাকলেও ব্রাহ্মণরাই আসতে চায় না। সংস্কারের বেড়াটা তখন কাঁটার ঝোপের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়ায় উভয়ের মাঝখানে। তাই এ পাড়ার কেউ বহুযুগ ধরে বামুনের দ্বারস্থ হয় না। তারা নিজেরাই নিজের হিত-কামনায় পুরোহিত।
দূর থেকে রঘুনাথ দেখল বৃদ্ধ চুনারাম খালি গায়ে তার সোডায় কাঁচা ধুতিটা পরে হেঁটে আসছে। তার হাতে একটা ভেড়ার লোমের আসন, সদ্যস্নান সারায় তার পাকা চুলগুলো চকচক করছে রোদ-হাওয়ায়। পুরোহিত বেশে চুনারামকে মানাচ্ছে মন্দ নয়। আজ যে পরব, আজ যে শ্রীশ্রী মনসা মায়ের পুজো একথা শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও বলে দিচ্ছে বারবার।
দুধের যেমন মাখন, ফুলের যেমন সুবাস, তেমনি মনসা পুজোয় ঝাঁপান না হলে মানায় না। ঝাঁপান নিয়ে সুফল ওঝার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ। ভিকনাথ তার পেছন-পেছন ঘুরছে সকাল থেকে। শুধু আজ নয়, বেশ কয়েক মাস হল তার মাথায় নেশা চেপেছে–তাকে মন্ত্রবিদ্যা শিখতে হবেই হবে।
ভিকনাথ তার সঙ্গ নেওয়ায় সুফল ওঝার লাভ ছাড়া লোকসান হয়নি। ভারি থলিটা এখন তাকে আর বয়ে বেড়াতে হয় না। ভিকনাথ বড়ো অনুগত। সুফল ওঝার হাত থেকে থলিটা কেড়ে সে নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেয়। ওস্তাদের মন না পেলে মন্ত্র পাবে না সে।
সুফল ওঝা ভিকনাথকে বলেছে, মন্ত্র তো শুধু মুখের বুলি। সেই বুলিতে শক্তি আর ভক্তি মিশালে তবে গিয়ে মন্ত্র হয়। শক্তি আমি দেব। শুধু ভক্তিটা তোর ভেতর থেকে তৈরি হবে। আর তা যদি না হয় আমি তোর গায়ে মন্ত্র খোদাই করে দিলেও কোনো লাভ হবে না। মনসা মায়ের পাঁচালি হয়ে যাবে তা।
কথাটা শোনার পরে বিমর্ষ হয়ে গিয়েছে ভিকনাথ। তার মন্ত্র শেখার একমাত্র উদ্দেশ্য হল ঝারিকে টাইট দেওয়া। বউটাকে উচিত শিক্ষা না দিলে সে যে ডানা মেলে প্রজাপতির মতো উড়ছে। লুলারামের সঙ্গে তার ঢলাঢলি এখন বড় চোখে লাগছে ভিকনাথের। পাড়ার লোকে দোষ দিচ্ছে তাকে। অনেকে আবার মুখের উপর বলছে, বউ সামলাতে পারো না তো বিয়ে করেছিলে কেনে? অমন বেবুশ্যে বউ থাকার চাইতে না থাকাই ভালো।
কথাগুলো কানে গেলে ঝিমিয়ে যায় ভিকনাথ। সে তখন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কথাগুলো সাপের মতো ছোবল মারে বুকে। দশ লোকে যা বলে তা মিছে কথা নয়। এক মুখকে চাপা দিলেও দশটা মুখ তো চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। কলঙ্ক আর কুৎসা বর্ষায় বুড়িগাঙের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়। ভিকনাথ মনে মনে ভেবেছে–অগ্নিবাণ মেরে সে শেষ করে দেবে লুলারামকে। ওর পুরো সংসার ছারখার হয়ে যাবে। ওর বউ পাগল হয়ে উদোম শরীরে ঘুরবে। ওর মেয়েদুটো দেবগ্রামে গিয়ে শরীর বেচে খাবে। ওর বুড়া বাপটার কুষ্ঠ রোগে পাপের পোকা কিলবিলিয়ে নড়বে।
সুফল ওঝাকে সব বলেছে ভিকনাথ। সব শুনে গম্ভীর হয়ে গিয়েছে সুফল ওঝা। ভিকনাথ তার পা-দুটো আঁকড়ে ধরে বলেছে, ওস্তাদ, তুমার এই পা দুটা আমার ভরসা। মনে আমি কিছু লুকিয়ে রাখতে পারি নে। আমার মন পাকাটির চেয়েও পলকা। চাপ দিলে পুট-পুট করে ভেঙে যায়। ও হারামীটাকে তুমি জানে মেরে দাও বাণ মেরে। আমি সারাজীবন তুমার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। ওর জন্য আমি রাতে ভালো ঘুমাতে পারি না। ওই হারামীর ছা-আমার সোন্দর বউটাকে ছিনিয়ে নিল।
–সব হবে, শান্ত হও। সুফল ওঝা বিড়ি ধরিয়ে চৈতন্যবকের মতো ঘাড় নাড়ে। ভিকনাথ তবু শান্ত হয় না, মেনিমুখো বেড়ালের মতো তাকায়, তুমি আমারে শান্ত হতে বলচো কিন্তুক আমি কী করে শান্ত হই বলো তো! আমার মাথায় বোলতা কেমড়ে দিয়েছে। তার যন্তনায় আমি জ্বলে মরচি। লুলারাম পয়সা করে আমার সনসারটা ভেঙ্গে দিলো। ঝারি এখন আমার কাছে শুতে চায় না। ওর এখন বড়োলোক হবার মন হয়েছে। তাই বুকে কিল মেরে বোবা হয়ে পড়ে আচি। চোকে সর্ষের ফুল দেখচি।
অত ভাবিস নে। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভিকনাথের ঘাড়ের উপর হাত রাখল সুফল ওঝা, আমি তো আছি, আমি তো মরে যাইনি। তোকে এট্টা কাজ করতে হবে। গুয়ার ব্যাটাটাকে এট্টু টাইট দিতে পারবি? ও কমলার পেছনে লেগেছে। মেয়েটাকে এট্টু বাইরে বেরতে দেয় না। সব সময় চামটুলির মতো জড়িয়ে আচে।
-কী করতে হবে বলো? খুশি না হলেও ভিকনাথ মন রাখার জন্য বলল, ঠিক আছে, কাজটা কি বুঝিয়ে বলো। যদি আমার দ্বারা হয় তাহলে ঠিক করে দেব।
সুফল ওঝা গা ঝাড়া দিয়ে বলল, কাজ সামান্যই। মেরে ওর পা দুটো উল্টে দিতে হবে। পারবি?
চোখ-মুখ শুকিয়ে ভিকনাথ বলল, ওর গায়ে হাত তুলতে আমি পারবানি। ওর বাপ গুয়া আমাকে অক্ত দিয়েছিল। ধাওড়া পাড়ার কেউ তখন পাশে দাঁড়ায়নি।
ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস কর। সুফল ওঝা মাথা চুলকে কপট হাসল, তবে লুলারাম ওই ঝাড়েরই বাঁশ। লুলারাম তোর সব্বেনাশ করেছে। তুই তার সব্বোনাশ করতে চাস। গুয়ার ব্যাটাটা কমলার মন বিষিয়ে দিয়েছে। আমিও ওর মন ছ্যারাবেরা করে দেব। সহজে ছাড়ব না আমি। এমন বাণ মারব যে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরবে।
