মাথা নেড়ে পয়সা গোণা শুরু করল দুর্গামণি। সব শেষে গা ঝাড়া দিয়ে সে বলল, সব মিলিয়ে একশ সতেরো টাকা হয়েছে। আমার হাঁস কিনতে অত টাকা লাগবেনি।
-না লাগুক, ও পয়সা তুমার কাছে রাখো বউমা। চুনারাম ভারি গলায় বলল, আমার কাছে থাকলি পরে সব খরচা হয়ে যাবে। তুমি মেয়েমানুষ। তুমাদের চাপা হাত।
পাঁপ-চেরা পয়সায় হাঁস কিনেছে রঘুনাথ। মানসিক শোধ করতে পারলে দুর্গামণিরও খুশি ধরবে না।
পরবের দিনে তার মোটা ঠোঁট দুটো স্ফুরিত হল আনন্দে।
অশ্বত্থ তলায় সাইকেল নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিল কাশীনাথ। কমলার শাড়ি দিয়ে ঘেরা হয়েছে মনসা মায়ের মণ্ডপ। এই দৃশ্য দেখতে গেলে তার চোখের ভেতরটায় কে যেন ছুঁড়ে দেয় কচার রস। করকরিয়ে ওঠে কাশীনাথের চোখ দুটো, এ শাড়ি কোথায় পেলি তোরা, এ তো আমার বোনের শাড়ি।
পাশে দাঁড়ানো রোগা ছেলেটা মিনমিনে স্বরে বলল, তুমার বোনের শাড়ি কিনা জানি না তবে এ শাড়ি রঘুদা চেয়ে এনেচে গাঁ থেকে। পুজো হয়ে গেলে ফের ঘুরিয়ে দিয়ে আসবে।
–এ কী মামার বাড়ি নাকি? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা– কাশীনাথ ছুটে গেল পাকুড়তলায়। দস্যু হাতে সে পটাপট ছিঁড়ে ফেলল সেলাই।
লম্বা ছেলেটা এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে চাইলে কাশীনাথ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। একটা মোক্ষম খিস্তি দিয়ে বলল, হিম্মোত থাকলে তোর মায়ের পরনের শাড়ি খুলে নিয়ে এসে পুজো কর। পরের ধনে পোদ্দারী করে কি লাভ?
দাঁড়াও রঘুদাকে ডাকচি।
–ডাক গে যা তোর বাপকে। কার ঘাড়ে কটা মাথা সব আমার জানা আছে। ঠুকরে আস্ফালন করে উঠল কাশীনাথ।
রঘুনাথকে ডাকতে হল না তার আগেই অশ্বত্থতলায় পৌঁছে গেল সে। কাশীনাথকে মণ্ডপের শাড়ি খুলতে দেখে তার মাথায় বুঝি কাঁকড়া বিছে কামড়ে দিল। হুঙ্কার ছেড়ে দূর থেকে সে বলল, খবরদার কাশীদা, মণ্ডপের গায়ে হাত দিও না। বহু কষ্ট করে সুতো দিয়ে জুড়েচি।
–তুই জুড়েছিস তো আমার কী?
-কী মানে? এটা দশজনের পুজো।
—কমলার শাড়ি কোথায় পেলি? নিঃশ্বাস তেতে উঠল কাশীনাথের।
–তুমার বুন দিয়েছে। পুজা শেষ হলে দিয়ে আসব।
–না, এক্ষুনি আমি শাড়ি খুলে নেব।
–মনসাবুড়িকে তুমি অগ্রাহ্য করতে পারো না।
কাশীনাথ রঘুনাথের নিষেধ না শুনেই পড়পড় করে টানতে লাগল শাড়ি। চারধার ঘেরা মণ্ডপটা ফাঁকা হয়ে গেলে চোখের নিমেষে। সরে গেল আলো-ছায়া পরিবেশ।
নিমেষে মাথায় রক্ত উঠে গেল রঘুনাথের। সে ছুটে গিয়ে বেড়া থেকে উপড়ে আনল খুঁটিবাঁশ। তারপর কাশীনাথকে পেটাতে লাগল সজোরে। কাশীনাথ এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনটে-চারটে ঘা ওর পিঠে পড়তেই বাপরে বলে মাটি নিল কাশীনাথ। অশ্বত্থতলার ধুলো ওর মুখের ফাঁক দিয়ে ঢুকে গেল এক মুঠো। প্রাগৈতিহাসিক পশুর মতো কাতরাচ্ছে কাশীনাথ।
অশ্বত্থগাছের ফাঁক ফোকর দিয়ে মেঘেদের ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছিল, চলমান মেঘের ছায়া ভাসছিল বুড়িগাঙের জলে, সারিবদ্ধ আখক্ষেতে বাতাস আছড়ে পড়ে শব্দ তুলছিল গণ্ডগোলের। মনে হচ্ছিল কোনো জনবল বাজার এলাকায় হঠাৎ হামলাকারী আর প্রতিরোধকারীর তুমুল বিবাদ বেধেছে, আর সেই বিবাদের জেরে উৎপন্ন হল্লা স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে লোকালয়ে ছিটকে যাচ্ছে।
বাঁশের আঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে গোঙাচ্ছিল কাশীনাথ।
তার গায়ে যে রঘুনাথ হাত তুলতে পারে–এটা স্বপ্নেও ভাবেনি। অপমান কুরেকুরে খাচ্ছিল তাকে। এভাবে পড়ে পড়ে মার খেলে মৃত্যু অনিবার্য-এই ভেবে মাটিতে দু’হাতের ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল কাশীনাথ। মুখের ধুলো থুঃ শব্দে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সে গ্রামের দিকে দৌড়তে লাগল প্রাণপণে।
পুটুস আর অ্যাশশেওড়ার ঝোপে ছেয়েছিল বাঁধের উল্টো দিকের এলাকাটা। দিনের বেলায় ব্রাত্য থাকে ওই জায়গা, সাধারণত অশৌচ হাঁড়িকুড়ি, গ্রামের নোংরা-আবর্জনা সব ডাঁই হয়ে থাকে ওখানেই। কাশীনাথ টলোমলো শরীর নিয়ে নোংরা মাড়িয়ে ছুটছে। ডগর কাঁসি ঢোল চড়বড়ি বাজনা থামিয়ে পাড়ার ছেলেগুলো রে-রে শব্দ মুখে তুলে পিছু নিয়েছে ওর। মুহূর্তে উৎসবের পাখিটা বিষণ্ণ হয়ে নেমে এল পথের ধুলোয়।
রঘুনাথ বাঁশের মাচায় গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসল। খরানীকালের মুথাঘাসের মতো নিষ্প্রভ হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। আজ এ কী করল সে? কাশীনাথকে ওভাবে বাঁশ-পেটা করা তার উচিত হয়নি। একথা নিশ্চয়ই কেউ না কেউ সুফল ওঝার কানে তুলবে। গ্রামের বাতাস গুজবের জীবাণুর ধারক এবং বাহক। কমলা শুনলে কী ভাববে তাকে নিয়ে?
রঘুনাথের ভেতরের ঘুমন্ত অসুরটা এভাবেই মাঝেমাঝে জেগে ওঠে, তাকে তখন থামানো যায় না, সংযমের বেড়ায় আটকে রাখা অসম্ভব। এই বুনো রাগ আর জেদ তার সর্বনাশ না করে ছাড়বে না।
কাশীনাথের সাইকেলটার দিকে নজর গেল রঘুনাথের। কোনো সহানুভূতি নয় রাগ এসে বাঘহাতা ঘাসের মতো দখল নিল মনের জমি। রঘুনাথ গা ঝাড়া দিয়ে এগিয়ে গেল সাইকেলটার কাছে। কাশীনাথ তাকে জানে মারতে চেয়েছিল বাঁধের ধারে। অন্ধ একগুঁয়ে রাগ রঘুনাথের ভেতরটা ফোপরা করে দিচ্ছে। ভাঙা, চিড় খাওয়া সম্পর্ক বেলের আঠায় জোড়ে না। তাকে জোড়া লাগানোর কথা ভাবাও ভুল।
রঘুনাথ এগিয়ে গিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে বাঁধের দিকে চলে গেল। এমন পাপী মানুষের কোনো জিনিস ছুঁয়ে থাকাও পাপ। রঘুনাথ হাত উঁচিয়ে সেই লম্বা কালো ছেলেটাকে ডাকল।
