রঘুনাথ তাকে অভয় দিয়ে বলেছে, তুমার ভয় নেই। যেমন শাড়ি তেমনই ফেরত দিয়ে যাবো। আমার উপর তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো। রঘুনাথের কথা শুনে কমলা দাঁত দেখিয়ে হেসেছে, তোমাকে বিশ্বাস করবে না তো কি আকাশের তারাকে বিশ্বাস করব? তুমি আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে। বলেই সে হাত চেপে ধরেছিল রঘুনাথের, যাকে মন দিয়েছি তাকে তিনটে শাড়ি দিলে কী হয়? তুমি জানো না, তুমি আমার কোথায় আছো!
শাড়িগুলো লাগাতে গিয়ে বারবার করে এসব কথা মনে পড়ছিল রঘুনাথের।
মাইকে মা মনসার পাঁচালি বাজছে। এ বারের পুজো গেল বারের পুজোকেও ছাপিয়ে গেল। একটা পুজোকে কেন্দ্র করে পাড়ার সব মানুষের এমন প্রাণঢালা যোগদান এর আগে দেখা যায়নি।
রঘুনাথ অশ্বত্থতলা থেকে ঘরে এসেছিল কী যেন কাজে। তাকে দেখে দুর্গামণি বলল, বুড়িগাঙ থেকে ডুব দিয়ে আয়। আজ আর তুকে খেতি দেব না। আজ তুর উপোস।
উপোসে থাকা কষ্টের। তবু রঘুনাথ মায়ের মুখের উপর না বলতে পারে না। কত কষ্ট করে দুর্গামণি হাঁস কেনার টাকা জোগাড় করেছে তা নিজের চোখে দেখেছে রঘুনাথ। গ্রামের কেউ সামান্য কটা টাকা উধার দিতে চায় নি। বর্ষা বাদলের দিনে নগদ টাকা কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। টাকার বদলে চাল গম অনেকেই ধার দিতে চায়। সব সময় চাল-গম দিয়ে কি সংসারের সব চাহিদা মেটে?
মন খারাপ করে খুঁটিবাঁশে হেলান দিয়ে বসেছিল দুর্গামণি। অতগুলো টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে ভাবছিল সে। রঘুনাথের মানসিকটা যে করেই হোক এ বছর শোধ করতে হবে। ছেলেটার অসুখ মা মানসার দয়ায় ভালো হয়েছে। মুখ রেখেছে মা মনসা। দেবী আসছে। তার সেবা যত্ন না করলে সংসারের উন্নতি হবে না। মা মনসাই তো তার ভরসা, আঁধার রাতের বাতি।
তার মন খারাপ দেখে চুনারাম আগ বাড়িয়ে বলেছিল, কী হয়েছে বউমা? মুখ বেজার করে বসে আচো যে।
-রঘুর মানসিকটা এ বছর মনে হয় শোধ হবে না। উত্তর দিয়েছিল দুর্গামণি, হাঁস বলি দিব বলেছিলাম। কিন্তুক হাঁস যে কিনব তার টাকা কুথায়?
ওঃ, এই কথা। চুনারাম ফোকলা হেসে বলেছিল, কত টাকা লাগবে তুমার? যেন খাজানার সন্ধান পেয়েছে চুনারাম, সেই ভাঙাচোরা মুখের দিকে তাকিয়েছিল দুর্গামণি। মানুষটা বলে কি, মাথা খারাপ হয়ে গেল না তো? দুর্গামণির ভাবনা ওলোট-পালোট হয়ে গেল। যে মানুষটার বিড়ি খাওয়ার পয়সা জোটে না সে দেবে টাকা? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুর্গামণির মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে গেল।
তাকে চমকে দিয়ে ঈষৎ কুঁজো গতর সামান্য সোজা করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল চুনারাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল হাতে একটা বাঁশের পাপ নিয়ে। সেই শুকিয়ে যাওয়া বাঁশের পাঁপটা রঘুনাথের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চুনারাম বলল, এটা আমার লক্ষ্মীর ভাঁড়ার। যা দা নিয়ে আয়। দেকি এর ভিতরে কতো মাল-কড়ি জমেছে। চোখ বিস্ফারিত করে তাকাল দুর্গামণি। সে অপলক তাকিয়ে ছিল তরলাবাশের শক্ত-পোক্ত মোটা পাঁপটার দিকে।
রঘুনাথ দায়ের খোঁজে চলে গিয়েছে ঘরের দিকে। চুনারাম একটা বিড়ি ধরিয়ে তরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, তুমি চিন্তে করবে না বউমা। তুমার হাঁস কেনার টাকা হয়ে যাবেন। দু-সাল থিকে ইতে আমি টাকা ভরচি। উঠিয়ে দেখো, কত্তো ভারি। এ পয়সা আমার বহু কষ্টের পয়সা। পেট কেটে এসব আমি জমিয়েচি। এ টাকা আমি গুয়ারেও দিইনি। কিন্তু নাতির কতা, তুমার কতা আলাদা। তুমাদের দুজনার জন্যি আমি আমার সব দিয়ে দিতে রাজি আছি।
দুর্গামণি স্বপ্নাবিষ্টের চোখে তাকাল। মানুষটাকে চিনতে তার ভুল হয়েছিল। মনে মনে অনুতপ্ত হল সে। মানুষ চেনা অত সহজ নয়, মাটি চেনার চেয়েও কঠিন।
গ্রামসমাজে খুঁটিবাঁশে পয়সা জমানোর রেওয়াজ বহু পুরনো। দুর্গামণির বাবাও পয়সা জমাত খুটিবাঁশে। খুঁটিবাঁশে জমালে সেই পয়সা নয়-ছয় বা চুরি চামারী হবার সুযোগ খুব কম থাকে। খুঁটিবাঁশের মাঝখানে পয়সা ফেলবার জন্য ছিদ্র থাকে। সে ছিদ্র বড়ো সূক্ষ্ম। পয়সা ঢুকবে কিন্তু কোনোভাবে বের করানো যাবে না। দিনে দিনে ভরে উঠবে বাঁশের পাঁপ। পাঁপ ভরে গেলে একমাত্র ছিদ্রটাই হবে পয়সা বার করার উপায়। আর ঘরের খুঁটি কাটলে ঘর দাঁড়িয়ে থাকবে কীভাবে? অর্থাৎ কাটা খুঁটি বদলাতে হবে সাথে-সাথে। নাহলে ঘর মুখ থুবড়ে পড়বে মাটিতে। চুনারাম অতশত ঝামেলাবাজির ধার ধারে না, খুঁটি বাঁশ নয়, সে পাপ বাঁশেই পয়সা জমাতে ভালোবাসে।
দুর্গামণি অবাক হওয়া চোখে তাকিয়ে আছে সেই পাঁপ বাঁশটার দিকে। চালে গোঁজা দা-টা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চুনারামের সামনে দাঁড়াল রঘুনাথ, দাদু, এই নাও। কাটো- ফাড়ো যা খুশি করো–
-তুই থাকতে আমি কেনে দা-এ হাত দিব? চুনারাম কৌতুক হাসি ছড়িয়ে দিল পুরো মুখে।
দাদুর কথা কোনোদিনও ফেলতে পারে না রঘুনাথ, সে হাত বাড়িয়ে বাঁশের পাঁপটা নিয়ে দায়ের আঘাতে দু-ফাঁক করে দিল চোখের নিমেষে। ঝনঝন শব্দে পয়সা এবং ভাঁজ করা টাকা লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়, যেন টাকা নয়, পয়সা নয় এও যেন নক্ষত্রপতন।
দুর্গামণির ইতস্তত ভাবটি বেড়ে গেল। চুনারাম তা লক্ষ্য করে বলল, পয়সাগুলা বুঝে নাও। লক্ষ্মী চঞ্চলা, এদিক-ওদিক হতে দিও না।
উবু হয়ে পয়সা কুড়াচ্ছিল দুর্গামণি। রঘুনাথ আনন্দের সঙ্গে বলল, মা, কত হল ইবার গুণে ফেলো।
