মা মনসার প্রিয় নৈবেদ্য হাঁস। কাঁচা দুধ আর কলা। ভেজানো মুগ কলাই। কাঁচা দুধ না হলে মায়ের পুজো হবে না। সেই সঙ্গে চাই-নকুলদানা বাতাসা ফলফলাদি। পাড়ার মেয়েগুলো সাদা ফুল, লাল ফুল তুলে রেখেছে সাজি ভরে। ফুল তোলায় তাদের কী আনন্দ! ওরা যেন শিশির চুবানো ঘাসের চেয়েও ঝকমকে। মায়ের পুজো নিয়ে রঘুনাথের যেন ব্যস্ততার আর শেষ নেই। রঙিন শাড়ি দিয়ে ঘেরা হবে বেদী। তার মাঝখানে মা আলো করে বসে থাকবেন। তার শরীরে শাটিংয়ের ঝলমলে পোশাক। মাথায় শোলার মুকুট। হাতে ফণাধারী সাপ, পায়ের কাছে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকবে মায়ের অনুগত সাপ। অষ্টনাগ, ষোল বোড়া… আরও কতধরনের কত জাতের সাপ। মায়ের মাথায় ছায়া দেবে পঞ্চনাগ। ফি-বছর ঘটপুজো হত, এবার আর ঘটপুজো নয়। প্রতিমার দাম দিয়েছে সুফল ওঝা। এ পুজো সে নিজের ঘরে করতে পারত কিন্তু মনসা পুজোয় ভুল হলে কোনো ক্ষমা নেই। মা প্রচণ্ড রাগী। বদলা না নিয়ে ছাড়বে না। উপায় না দেখে সুফল ওঝা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা বছর মা মনসাকে নিয়ে তার কাজ কারবার। মাকে খুশ না করতে পারলে সে যে দুঃখের সাগরে ডুবে যাবে। ফলে ধাওড়া পাড়ার পুজোয় সুফল ওঝার প্রভাব অনেক। সে সরাসরি না থাকলে দূর থেকে কলকাঠি নাড়ে। তবে এ বছর তার মন ম্যাদামারা। আচারের নুন দেওয়া লেবুর মতো চুপসে গেছে। এর কারণ রঘুনাথ। রঘুনাথ তার মেয়ের সঙ্গে লটঘট করছে। বাপ হয়ে কে মেনে নেবে? ছেলেটার বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার বাসনা। ধাওড়া পাড়ার অনেকেই রঘুনাথের কেসটা জানে, তারাও মনে মনে খুশি নয়। সকাল থেকে মাইক বাজছে জোর কদমে। কালীগঞ্জ বাজার থেকে মাইক ভাড়া করে এনেছে লুলারাম। মাইকের যাবতীয় খরচাপাতি সব তার। লুলারামের মাথার কোনো ঠিক নেই। সব সময় তার মনে অশান্তি লেগে আছে। ঢিলি কোথায় গিয়েছে তার খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি। দুলু কাহারের ঘর গিয়েছিল লুলারাম। তার হাত ধরে বলে এসেছে, তোর বৌদিকে পাওয়া যাচ্চে না। শুনেছি সে নাকি দেবগ্রামের বাসে চেপে কুথায় চলে গিয়েছে। দু-একজন তারে ভিখ মেঙে খেতে দেখেছে। লোকমুখে খবর পাই কিন্তু আনতে গিয়ে দেখি সে সিখানে নেই। তুর কাকি তো আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলচে। আমি আর পারচি নে। হেঁপসে উঠেছি। তুই তো এদিক সেদিক যাস। তোর সাথে দেখা হলে তরে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়। আমার মন বলচে তুর দ্বারা এ কাজ সম্ভব হবে।
গাঁ ছেড়ে এত দীর্ঘসময় ঢিলি কোথাও থাকে না। সে বেঁচে আছে না মরে গেছে এখবর কেউ জানে না। তবে মরে গেলেই বুঝি ভালো হত, লুলারামে গলার কাঁটা নেমে যেত। নূপুর আর নোলক যেভাবে তার দিকে তাকায়–সেই নীরব দৃষ্টি কোনো মতেই সহ্য করতে পারে না লুলারাম। মেয়ে দুটোর চোখে সে অপরাধী হয়ে গেছে। ওরা বড়ো হচ্ছে। ওরা ঝারির ঘটনাটা জানে। সব জানার পরে লুলারামকে তারা ক্ষমা করবে কি ভাবে? নানা কারণে মনে মনে পুড়ে খাক হয়ে গেছে লুলারাম। তবু মনসা পুজোয় মাইক দিতে পেরে সে খুশি। দিন চারেক আগে ঘরে একটা চিতি সাপ বেরিয়েছিল। সামনে মনসা পুজো বলে সাপটাকে মারেনি সে। মা মনসার বাহন পুজোর আগে দেখা দিলে সেই ঘরে দেবীর পুজো আবশ্যক হয়ে পড়ে। লুলারাম ভেবেছিল ঢিলি ফিরে এলে সে পুজোর বন্দোবস্ত করবে। কিন্তু তা আর হয়নি। ঢিলি তার অশান্তিকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাড়ায় সবার চোখে ধীরে ধীরে অপরাধী হয়ে যাচ্ছে সে। এমনকী ঝারিও তাকে ভালো নজরে দেখছে না। সেদিন তো কলতলায় মুখের উপর বলে দিল, কী পাষাণ গো তুমি? যার সঙ্গে এত বছর তুমি ঘর করলে একবার তার খোঁজ নেবে না? সে তুমার বউ। মেয়ে দুটার মুখ চেয়ে তারে খুঁজে আনা তুমার দায়িত্ব।
ঝারির মুখের উপর লুলারাম একটা শব্দও বলতে পারেনি। ভিকনাথের বউটা আগের চেয়েও জেল্লাদারী হয়েছে। সামান্য আটপৌরে শাড়িতে তার রূপ যেন ফেটে বেরায়। মুখের হাসিটারই দাম লাখ টাকা। এ পাড়ায় বউ হয়ে আসার পর সে একদিনও খাটতে যায়নি। ভিকনাথই নিষেধ করে বলেছে, তুমি ঘরের বউ ঘরে থাকবা। আমার হাত-পা যত দিন সচল আছে, তুমারে আমি খাটতে যেতে দেব না। আমি চোখ মুদলে তোমার যা ইচ্ছে তাই করো।
-ছিঃ, কী কথা শোনাও সকাল সকাল! অভিমানে ঝারির মুখ ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে খসখসে ডুমুরের পাতা, যা বলেচো–আর কুনোদিন অমন কতা বলবা না। ওকথা শোনার আগে আমার যেন ছাতি ফেটে যায়।
লুলারামের সুখসঙ্গ ঝারি কোনো দিন ছাড়তে পারবে না, তা বলে সে যে তার ঘরের মানুষটাকে অবজ্ঞা করে তা নয়। ভিকনাথ সক্ষম পুরুষ তবু কী ভাবে যে ঝারি লুলারামের উপর ছিনে-জোঁকের মতো লেপটে গেল তা এখন আর সে মনে করতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে প্রথম এগিয়ে আসে লুলারাম। ঝারির চাইতে সে বয়সে অনেক বড়ো হবে। বয়স্ক হলেও তার যৌন-আচরণে বয়স্কতার কোনো ছাপ নেই বরং সে অনেক বেশি তরুণ, চনমনে প্রাণ-ভ্রমর। লুলারাম দু-হাত ভরে তাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এ পাড়ায় কারোর গলায় সোনার হার নেই শুধু ঝারি ছাড়া। দুটো চোঙা মাইক দুদিকে মুখ করে বেঁধে দিয়েছে রঘুনাথ। বেদীটাকে কে ঘিরে দিয়েছে কমলার কাছ থেকে চেয়ে আনা শাড়িতে। মুখ ফসকে বলার সাথে সাথেই কমলা শাড়ি তিনটে গুছিয়ে ভাঁজ করে রঘুনাথের হাতে দিয়ে দিল, যাক শেষ অবধি আমিও তোমাদের পুজোয় কাজে লেগে গেলাম। শাড়িগুলো যেন ফুটো না হয় সেদিকে খেয়াল রেখো। গত বছর পাড়ার ছেলেরা প্যান্ডেল বাঁধতে গিয়ে আমার একটা শাড়ি ফুটো করে দিয়েছে।
