দুলু মুখ ঘুরিয়ে বলল, বেলা অনেক হল, এবার আমি যাই। তুই যদি কাল দেবগ্রামে যাস তাহলে পরে আমার সাথে দেখা করিস। আমি সাড়ে সাতটার বাসে যাবেন। তোর মন হলে চলে আসিস। তাহলে দুজনে মিলে দরদাম করে হাঁসটা কিনতে পারব।
রঘুনাথ আর দেরি না করে বিলধারের পথটায় উঠে এল। এ পথটায় ছায়া আছে গাছের। বৃষ্টি-বাদলা দিনের রোদ কখনও সখনও চাঁদি গরম করে দেয়। গুমোট ভাবটা অসহ্য লাগতেই রঘুনাথ বুকের কাছে হাতটা নিয়ে এল। ঘামে জবজব করছিল হলদেটে গেঞ্জিটা।
আজ অশ্বত্থতলায় শ্রী শ্রী মনসা দেবীর পুজোর সভা আছে। সেখানে পাড়ার সবাই জড়ো হবে। পুজোর খরচ, কে কত চাঁদা দেবে, কে কি কাজ করবে এসবই দশ জনের হাজিরাতে ঠিক করে দেবে চুনারাম। দশের কাজ দশে মিলে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো। একার কোনো মত বারোয়ারি কাজে খাটবে না।
ফি-বছর মনসা মায়ের পুজোয় সুফল ওঝার একটা বড়ো দান থাকে। কোনো বছর ফল-প্ৰসাদ, কোনো বছর মাইকের দাম সে দিয়ে দেয়। ওর দলবল এসে পাকুড়তলায় ঝাঁপান গায়, মনসামঙ্গলের গান করে। পাড়ার ছেলে বুড়ো বউ-ঝিরা সেই গান কত ভক্তি সহকারে শোনে। বেহুলার দুঃখে তারাও চোখের জলে বুক ভাসায়। আহারে, বাসর ঘরে যার সোয়ামী মরল তার জন্য কি দুঃখ হবে না কারোর?
এ বছর নাগপঞ্চমী পুজো পূর্ণিমার ব্রতোপবাস এর ঠিক পাঁচ দিন পরে পড়েছে। ওই দিন গাঙ ধারে মেলা বসবে ওঝা গুণিনদের। বর্ধমান মুর্শিদাবাদ এমন কি বীরভূমের ওস্তাদ গুণিন আসবে সেই মেলায়। তারা খালি হাতে আসা পছন্দ করে না, তাদের সঙ্গে মাদুলি-তাবিজ-এর মতো থাকবে সাপঝাঁপি। সেই সব ঝাঁপিতে মাথা নিচু করে চুপচাপ পড়ে থাকবে বিষধর সাপ। এমন হরেকরকমের সাপ দেখার মওকা বছরে মাত্র একদিনই আসে। আর এই দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকে সুফল ওঝা। কত গুণী মানুষের পায়ের ধুলোয় ভরে উঠবে গাঙের ধার। উৎসবের ক’দিন দুলু যাবে না দেবগ্রাম। ললাট ওস্তাদের সঙ্গে সে আসবে এই অভিনব মেলায়। এখানে কবির গানের সঙ্গে লড়াই জমে দেহশক্তির। যে জিতবে সে হবে মেলার সেরা। যার সাপ ফণা তুলবে বেশি, সে হবে সাপেদের ওস্তাদ। এভাবেই দশটা শাখায় নাম উঠিয়েছে সুফল ওঝা। ফলে তার বিরামের কোনো প্রশ্ন নেই। সব কিছু একবার ঠিকঠাক বুঝে নিলে যে কোনো কাজই সহজ হয়ে ওঠে, গলানো ভাতের চেয়েও সহজ এবং সরল।
সুফল ওঝার এ কয়দিন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। সে মেলা কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য। তার কথাতেই অনেকে মাথা হেঁট করে। অশ্বত্থতলার সভা শেষ হয় বিনা বিবাদে। চুনারাম খুশি খুশি মুখ করে বলল, ধাওড়াপাড়ায় পুজা হবেনি, এ তো হতে পারে না। তা বাপু, তুমরা যে সব এগিয়ে এলে, ব্যবস্থা করলে এতে আমার মন ভরে গেছে। মা মনসা আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করে। তারে আমাদের খুশ রাখা দরকার। মা খুশ তো, বেটা খুশ। বেটা খুশ হলে আর ভাবনা কী। সমবছর আমাদের ভালো যাবে। মা মনসার রোষ থিকে আমরা সবাই বাঁচব গো। পাকুড়তলায় মাটি দিয়ে পুজোর বেদী বানিয়েছে ধাওড়াপাড়ার উঠতি বয়সের ছেলে ছোকরা। তাদের অনেক দিনের ইচ্ছে এবছর কালীগঞ্জ হরিনাথপুরের মতো প্যাণ্ডেল বেঁধে পুজো হোক। পুজোয় দিনভর বাজুক মাইক।
দেবগ্রামের হাট থেকে মনসামঙ্গলের ক্যাসেট কিনে এনেছে দুলু। চিকচিকিতে মোড়ানো সেই ক্যাসেটটা দুল রঘুনাথের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এর দাম তাদের দিতে হবে না। এটা মনসাপুজোয় আমার চাঁদা। দেবগ্রাম গোরুর হাটে ক্যাসেটটা বাজছিল। গানগুলো শুনে মনটা ভরে গেল। তাই ভাবলাম-এটা তোদের জন্যি লিয়ে যাই। দুলু তার কাটা হাত নাড়িয়ে শরীর দুলিয়ে হাসল, পুজোর সময় আসবখন। তখন এসে ক্যাসেটের গানগুলো সব শুনে যাবে। আহা, কি গান! মনসা মঙ্গলের সুর কানে ঢুকলে মন জুড়িয়ে যায়। এসব গানের মূল্য আলাদা। তোদের ওই ফোচকামো গানের মতো নয়।
দুলু চলে যাওয়ার পর বেদী তৈরি করার কাজে লেগে গেল রঘুনাথরা। ঝুড়ি ঝুড়ি বুড়িগাঙের মাটি এনে তৈরি হল বেদী। মনসা পুজোর পরেই ভাদ্রমাস চলে আসবে। শুরু হবে কম পুজোর তোড়জোড়। ধাওড়াপাড়ার বউ-ঝিউড়িরা মেতে উঠবে করম পুজোর আয়োজনে। সে সময় ভাদুগান আর করমগানে নড়ে উঠবে মেয়েদের ঠোঁট। কটা দিন সারা পাড়া ঘিরে উৎসবের আয়োজন। রঘুনাথের এসব উৎসব অনুষ্ঠান পরব মেলাখেলা ভালো লাগে। কটা দিন অন্যরকম মনে হয় তার। অভাবী জীবনে এইটুকু সুখ-আনন্দ লটারি পাওয়ার চেয়েও মনোমুগ্ধকর। মাসকলাই হাতে নিয়ে মেয়েরা সুর করে গাইবে, কলাইরে, তুরে আমরা কী করে ভুলাইরে, ক্ষেতেরে, জমিরে ফুলুক শুধু মাসকলাইরে, ঘরে-বাইরে শুধু সুখের কলাইরে, ও মাটি তুর ভুখ কি ভরে রে, ফুল আসুক গোছ গোছা, ঘরদোর সব ঝাড়াপুছা, দেশ দুনিয়ায় ফুল ফুল ফুলুনী, শরীল হেলিয়া দুলিয়া কলাইদানা ঝাড়ুনী, কলাইরে কলাইরে, খেতিবাড়িতে সুখের সাথে ঢলাইরে ঢলাইরে, রক্ষা কর ধরিত্রী মাতা, অঢেল কলাই ফলাইরে ফলাইরে।
পরবে শুধু মানুষ নয়, সুখী হয়ে ওঠে মাঠঘাট পশুপাখি গাছপালা। পরব এলে বদলে যায় রোদের রঙ।
বসন্তপুর ধাওড়া থেকে টেপ নিয়ে এসেছে শ্রীকান্ত। সে ভূষণীবুড়ির নাতজামাই। পুজার কদিন সে ভূষণীবুড়ির ঘরে থাকবে। দুপুরে পাত পেড়ে খিচুড়ি খাবে পাকুড়তলায়। রাতে দুর্গামণি তাকে নেমন্তন্ন করেছে খাওয়ার জন্য।
