রঘুনাথ হাসতে গিয়েও হাসল না, হালকাভাবে মুখ মুছে নিয়ে সে দুলুর মুখের দিকে পুলিশ-নজরে তাকাল, কী হলো দুলুকাকা, মনে হতিচে চোট খেয়েছো। আরে ছাড়ো ওসব কথা। আমার দাদু বলে নিজে বাঁচলে বাপের নাম। কার জন্যি ভাববা তুমি। খবরদার, কারোর জন্যি ভেবো না। ভেবে ভেবে দিমাগ তুমার বরবাদ হবে, আসল কাজের কাজ কিছু হবে না।
–এসব বলা সহজ, করে দেখানো কঠিন রে! দুলু বাতাস ভরাল দীর্ঘশ্বাসে, আমার মনের অবস্থা ভালো নেই, গলা দিয়ে গান বেরুচ্চে না। কার জন্যি গাইব। যার জন্যি গাইতাম–সে এখন অন্যের খাঁচায় বুলি বলচে। আমাকে আর চেনেই না।
–সেই মহারানী কে শুনি, কী তার নাম? রঘুনাথ উৎসাহী হল।
–তার কথা না শোনাই ভালো। তার কথা বলতে গেলে আমার জিভ উল্টায় না।
তবু বলি সে মোকামপাড়ার মেয়ে। চাঁদ মহম্মদের বিটি, মানোয়ারা। দুলু দ্বিধাহীন ভাবে কথাগুলো বলে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাল।
রঘুনাথ বিজ্ঞ স্বরে বলল, দুলুক, এট্টা কথা বলি যদি কিছু মনে না করো।
-হ্যাঁ হ্যাঁ বল। উৎসাহিত হল দুল।
–তুমি মানোয়ারার এট্টা পুতুল বানিয়ে এই বিলের জলে ভাসিয়ে দাও। দেখবা সব হিসাব চুকে বুকে যাবে। তুমার আর কুনো কষ্টই হবে না।
বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায় বহু দূর। মেঘের মিছিল যেন ঘোড়ায় চেপে মেঘপাহাড়ের দিকে চলে যাচ্ছে টগবগিয়ে। দৌড়ে বেড়ানো মেঘগুলো চোখ ড্যামা ড্যামা করে দেখছে পাগলা ঘোড়ার কক্সরত। খিরিষগাছের তলায় দাঁড়ালে কোমল স্তর মেঘের তুলোর শরীর দেখা যায়। এ যেন বড় হয়ে যাওয়া কোন যুবতীর গোপন রূপবাহার।
রঘুনাথ উদাস হয়ে দেখছিল মেঘেদের ঘরবাড়ি। দুলু থুতনি চুলকাতে চুলকাতে বলল, আজ যাই। আবার হাসপাতালে যেতে হবে ভাত নিয়ে। ঘরে কেউ নেই। আমাকেই এক হাতে সব করতে হবে।
-তুমার অসুবিধা হলে বলো। আমিও তুমার সাথে চলে যাব।
-না, না। তার আর দরকার হবে নি। তবে সাবধানে চলা-ফেরা করবি। গাঁয়ে তোর শত্তরের অভাব নেই। দুলুর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।
রঘুনাথ হাসতে হাসতে বলল, সে আমি জানি। তবে কেউ আমার কুনো ক্ষতি করতে পারবে নি। আমার ক্ষতি করতে এলে তার নিজেরই ক্ষতি হয়ে যাবে।
–তুই এত মনের জোর কুথা থেকে পাস? দুলু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
রঘুনাথ ভেবে নিয়ে বলল, আমার শক্তি আমার মা। জানতো আমার মায়ের নাম দুর্গা। দুর্গার দশ হাত। দশ হাতে দশ রকমের অস্ত্র। এছাড়া কপোতাক্ষবাবু, অমল মাস্টার–ওদের আমার ভালো লাগে।
রঘুনাথের কথা শুনে দুলু সশব্দে হাসতে গিয়েও থেমে গেল, অমল মাস্টারের কথা আর বলিস নে। সেদিন আমি না থাকলে এই ভরা বিলে ডুবে সে মরে যেত।
-কেন কি হয়েছিল?
–কি হয়েছিল তা আমি কি জানি। জলকাজ সারতে এসে দেখি–এট্টা মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে বিলে। কোনো কিছু না ভেবেই ঝেঁপিয়ে পড়লাম। এক হাতে সাঁতরে গিয়ে তারে কোনোমতে বাঁচালাম। শেষে দেখি কিনা হাইস্কুলের ছোকরা মাস্টর। কী সব ভূত নেই, মন্ত্র নেই, বাণ মারা নেই, সভা করে ফিরছিল। কারা তাকে বিলের জলে ঠেলে ফেলে দিয়ে পেলিয়ে গেছে। দুলু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, তবে আমি না থাকলে সেদিন মাস্টুরের দফারফা হয়ে যেত। তাও যা জল খেয়েছিল তা বের করতে আমাদের বাপ-বেটার ঘাম ছুটে যায়।
–এ সব কথা তো জানতাম না। রঘুনাথ অবাক হয়ে বলল।
-সব কথা কি সবার জানা সম্ভব? তুই থাকিস ধাওড়া পাড়ায়, আমি থাকি মোকামপাড়ায়। কথার কি পাখির মতোন ডানা আচে যে উড়ে যাবে?
–তা ঠিক। রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল, তারপর কি হলো, মাস্টুরকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বুঝি?
–তোর কি মাথা খারাপ না পেট খারাপ? হাসপাতালে নিয়ে গেলে আমি যে ফেঁসে যেতাম। দুলু মাথা নাড়ল, জলে ডোবা কেস, পুলিশ কেস। শেষে পুলিশ বলবে আমিই ঠেলা মেরে ফেলে দিয়েচি–তখুন?
-মাস্টার ভালো মানুষ, ও কেনে তুমার নামে মিছে কথা বলবে?
–আমার গুরুজী বলে কালো চুলের ভালো করতে নেই। কালো চুলের ভালো করলে হাড়ে হাড়ে ঠকতে হয়। দুপুর ঠোঁটে সরল হাসির ঢেউ খেলে গেল। রঘুনাথ বলল, মাস্টরকে আমি কতো বুঝিয়েছি, তবু মাস্টার বুঝবে না। মাস্টুরের ধারণা মন্ত্র পড়ে সাপের বিষ নামে না। ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই। একথা গাঁয়ের মানুষকে বোঝালে বুঝবে কেনে? যারা এসব ভাঙিয়ে করে খাচ্ছে তাদের যে বিপদ। তারা কেনে মাস্টুরকে ছেড়ে কথা বলবে? গাঁয়ে থাকতে হলে গাঁয়ের মানুষের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলাতে হবে। নাহলে সাঁঝের আঁধারে বিলের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে এ তো জানা কথা।
–ছোকরা মাস্টুরটার মাথা খারাপ। জিন-পরী নেই একথা বললে মোকামপাড়ার কেউ কি মানবে? কেউ মানবে না। সব ক্ষেপে যাবে। দুলু চুপ করে গেল। রঘুনাথ ঝাঁঝালো গলায় বলল, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ালে জান তো যেতেই পারে। সেই আগের গাঁ কি আর আচে গো? তলায় তলায় গাঁ যে অনেক বদলে গিয়েচে।
-হ্যাঁ, তা ঠিক। মেঘে মেঘে বেলা অনেক গড়ে গিয়েছে। দুলু কপালে ভাঁজ ফেলে রঘুনাথের দিকে তাকাল।
একটাই পথ মোকামপাড়া সটান চলে এসেছে পণ্ডিত বিলে। পথের ডান দিকে জল, বাঁ দিকে হাড়মটমটি, কচা আর আঁশশেওড়ার ঝোপ। সেখানে ক্যাচকেচি পাখি থপর থপর করে হাঁটে, সারাটা দিন ওদের কাজিয়ার কোনো কামাই নেই, জীবনটা বুঝি ওদের লড়াই-ঝগড়া করে কেটে গেল। ক্যাচকেচি পাখিগুলোর তবু মিলের কোনো শেষ নেই। গাঁয়ের অনেক মানুষ ওদের সাতভায়া পাখি বলে। সাত ভাই কার অভিশাপে পাখির রূপ নিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
