-তোবা, তোবা। অমন কথা কয়ো না। আমার কলিজা ফাটি যাবে। দুলু শক্ত হাতের বেড়ে পেঁচিয়ে ধরত মানোয়ারার শরীর, গুড়কলের মেসিনের মতো পিষে বের করে আনতে চাইত মনের রসতৃপ্তি, চুমায় চুমায় ভরিয়ে দিত মানোয়ারার সংরক্ষিত ওষ্ঠযুগল। মানোয়ারার চোখ বুজে যেত অপার্থিব আনন্দে, ঠোঁট ফাঁক করে বিড়বিড় করে বলত, আমারে মেরে ফেল। প্রেম-পীরিতে এত জ্বালা আগে জানতামনি। সেই মানোয়ারা এখন খাঁচা ভেঙে উড়ে যাওয়া বনটিয়া, তাকে দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না। সে এখন সাদাতের বাগানে শিস দেয়, হাসে, খেলে, ঘুরে বেড়ায়। তার চেহারায় ছায়া পড়ে নুরি বেগমের, নুরি বেগম তার মা।
রূপসী নুরি চাঁদ মহম্মদের অভাবকে মানিয়ে নিতে পারল না শেষ পর্যন্ত। চাঁদ মহম্মদ আজান দিতে ভোরবেলায় মসজিদে চলে গেলে নুরি দু’হাত উর্ধ্বে প্রসারিত করে দোয়া মাঙত আল্লাতালার। বিড়বিড় করে বলত, আমারে আজাদ করে দাও রহিম। আমার ঘরের মানুষটা দোজকের কীট। ও আমার জীবন-যৌবন ছারখার করে দেবে। আমি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবো রসুল। দোয়া করো। আমার জান বাঁচাও।
দশ বছর ঘর করার পর নুরি বেগম পালিয়ে গেল আতিফের সঙ্গে। আতিফের বহরমপুরে কাঁচা মালের ব্যবসা। কাঁচা ব্যবসায় কাঁচা টাকা। তার কাছে নুরি বেগম খরিদ করা বাঁদী।
যতদিন রূপের জৌলুষ ছিল ততদিন কোনো সমস্যা হল না খাওয়া পরার। রূপ ঢলতেই কদর ঢলে গেল ভিন্ন দিকে। আতিফের দু-চোখের বিষ এখন নুরি বেগম। একদিন ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল আতিফ। তার কাঁচা-পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ভর্ৎসনা করে বলল, আর আমাকে জ্বালাচ্চো কেনে, ইবার ঘাড় থিকে নামো। ঢের হল, আর পারচি নে। ইবার আমারে ছেড়ে অন্য কাউকে দেখো। তা যদি না হয়, চাঁদের ঘরে ফিরে যাও। সে তুমাকে তো তালাক দেয়নি। শুনেছি সে নাকি এখন দয়ার সাগর। মসজিদ ঝাডপুছ করে। সাঁঝের বেলায় ফকিরি গান গায় মসজিদের চাতালে বসে। আর কিছু না হোক তুমার বুড়া বয়সে টেইম পাশ হয়ে যাবে।
নুরি বেগম আতিফের পা ধরে কাকুতি-মিনতি করে অঝোর ধারায় কাঁদল, ওগো, তুমার দুটা পায়ে ধরি, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। তার চেয়ে ফলিডল এনে দাও আমি খেয়ে মরি।
-ছিঃ ছিঃ, একী কথা! যে মোল্লার দাড়ি আছে, তার কি কুনো গুনাহ করা সাজে? তুমার জন্যি আমি কেনে দোজকের মাটি খরিদ করে রাখব? হাঁড়িচাচা পাখির মতো লালচে দাড়িতে হাত বুলিয়ে সে সজোরে ঝটকা দিয়ে পা’টা ছিনিয়ে নেয় নুরি বেগমের দখল থেকে। ঝড়ের গতিতে ঘর ছাড়ার আগে সে শাসিয়ে যায়, আর এক ঘণ্টা সময় দিলাম ঘর ছেড়ে চলে যাবে। নাহলে কেটে বস্তায় পুরে ভাগীরথীর জলে ভেসিয়ে দেব। তুমার মতন পাপী মেয়েমানুষের মানসো শ্যাল-কুকুরকে খাওয়ানোও পাপ।
নুরি বেগমের আর অপমান সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। কাঁপতে কাঁপতে রোদ মাথায় সে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। শেষে দশ ঘাটের জল খেয়ে বাস-স্ট্যান্ডের কাছে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। চাচ বেড়ার ঘর, স্যাঁতসেতে, আলো-বাতাস ঢোকে না। সেখানে মুটে বদনার সে দাসী হয়ে বেঁচে আছে।
নুরি বেগমের কথা মাঝেমধ্যে কানে আসে মানোয়ারার। ময়ূরের পেখম ঝরে গেলে কেউ তার দিকে তাকায় না। বোবা কোকিলকে কে খাঁচায় ভরে পুষবে, দানা খাওয়াবে?
সাদাত তার শরীর নিয়ে জোর করতে চাইলে মানোয়ারা বেঁকে বসে, আগে নিকে হোক, তারপর। অত তাড়াহুড়োর কী আচে মিঞা। গাছের ফল রয়ে-সয়ে খাও। এ তো ঝরে যাওয়ার জিনিস নয়।
সাদাতের বাহুবন্ধনে যাঁতাকলের মটরদানার মতো পিষ্ট হতে থাকে মানোয়ারা খাতুন। তার মুগ্ধ চোখ দেখতে থাকে সাদাতের আবেগ থরো থরো মুখখানা। দুলু কাহারের কথা মনে করে সে আর কষ্টের পুকুরে ঝাঁপ দিতে চায় না। অতীত তার কাছে সবসময় কাঁটার ঝোপ, বর্তমান তার কাছে খুশবুদার বসরাই গোলাপ। পণ্ডিতবিলের পাড়ে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেল দুলু। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা থেতলে গেল আধলা ইটে। কনকন করছিল নখের চারপাশ। রক্তে মাখামাখি হয়ে বুড়ো আঙুলটাকে মনে হচ্ছিল ঢোঁড়াসাপের থেতলে যাওয়া মাথা। রঘুনাথ তার পাশেই ছিল, হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে দুলু বিমূঢ়ভাবে তাকাল, তেমন কুনো চোট লাগেনি, যা লেগেছে তা আমি সামলে নিতে পারব। উবু হয়ে রক্ত মুছে দুলু খাড়া হয়ে দাঁড়াল। মাটিতে ঢুকে যাওয়া আধলা ইটটা হাতে জোর করে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল পণ্ডিত বিলের জলে। খপাৎ করে শব্দ হল জলের, চারদিকে ছিটিয়ে গেল জল ঢেউ তুলে। আর সাথে সাথে মেঘভরা জলবাহী আকাশের নীচ দিয়ে ডানা মেলে উড়ে গেল কয়েকটা মেছোবক আর মাছরাঙা পাখি। বালিহাঁসগুলো কাতর চোখে তাকিয়ে ডুব আর সাঁতারের নিপুণ কৌশলে পৌঁছে গেল নিরাপদ দূরত্বে। তারপর গলা ফাড়িয়ে ডাকতে লাগল ভয়ে।
নিজেকে সামলে নিয়ে দুলু উদভ্রান্ত স্বরে বলল, শোন রঘু, তোকে এট্টা কথা বলি। তুই আমার ভাইপোর মতো, তোরে আমার ভালো লাগে। এ সনসারে মেয়েছেলে থেকে তফাৎ-এ থাকবি। ওরা হল ছুতোর মিস্ত্রির তুরপুনের মতো। তোর কলিজা ফুটা করে সেখানে উইয়ের বাসায় ভরিয়ে দেবে। আর এট্টা কথা। ভালোবাসা আর উইয়ের বাসা-দুটাই বড়ো পলকা জিনিস। ম্যাচিস কাঠির মতো পুটপুট করে ভেঙে যায়। আর তখনই সেই খোখলা দিয়ে বেনেজল ঢুকে তোর চৌদ্দগুষ্টির মুণ্ডু চটকে ছেড়ে দেবে।
