-তুমার বাবার কি হয়েছে?
-তার কি রোগ জ্বালার শেষ আচে? বয়স হলে যা হয়। হাজার রোগের ফ্যাঁকড়া বেরয়। দুলু মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল, আল্লা-রহিম, হরি যিশু কুথায় গেলে তুমরা?/একা আমি, একা সে …. করে দিও না গুমরা। দুলু বিড়বিড়িয়ে উঠে মুখ নামিয়ে আনল সহসা, রঘুনাথের দিকে তাকিয়ে সে বলল, চা খাবি? তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারা সকাল কিছু খাসনি? রঘুনাথ ইতস্তত গলায় বলল, ভিজে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি, তবে চা খাইনি বহুক্ষণ হল। আসলে কী জানো চা খেতে মন হয়নি। তুমি যখন বললে তখন চলো–দুজনে মিলে চা খেয়ে আসি।
পাশাপাশি হেঁটে ওরা চায়ের দোকানে এসে ঢুকল। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে জল ফুটছিল টগবগিয়ে। সামনের কাঠের তাকে সাজানো আছে বিস্কুটের বোয়ামগুলো। গোল, চৌকো, রঙিন, ভূসভূসিয়া….. কত রকমের বিস্কুট। দুটো চৌকো বিস্কুট দিতে বলে দুলু ঘনিষ্ঠ গলায় শুধোলদা, বল, কালীগঞ্জ বাজারে কি করতে এয়েচিস?
মনসা পুজোয় হাঁস বলি দেবে। মা মানসিক করেছিল আমার জন্য। রঘুনাথ কথা শেষ করতেই দুলু কেমন বিষণ্ণ চোখে তাকাল, মা-রতন পরম রতন, বুঝবি না রে এখুনি/ফুল বোঝে তার আসলি রূপ পাপড়ি ঝরে যখুনি। দুলু টেনে টেনে আবেশী গলায় বলল, ছোটবেলায় মা মরল, এখুন তার মুখটাই মনে পড়ে না। সব ঝাপসা ঠেকেরে, হাতড়ে হাতড়ে আমি তার মুখটা জড়ো করার চেষ্টা করি। হয় না, সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। আমার গুরুজী ললাট ওস্তাদ বলে-মা হল–জগৎমণি, জগৎজননী,/মা হলো চাঁদ-সূর্য শৌর্য বীর্য স্নেহের খনি চোখের মণি/জগৎ জননী। মা হল মা। এর কুনো বদল খুঁজে পাওয়া যাবে না।
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে রঘুনাথ জিজ্ঞেস করল, দুলুকাকা, হাঁস কুথায় পাবো বলতো?
ভ্রূ কুঁচকে দুলু বলল, এ নিয়ে অত ভাবনা কেনে? কাল রোববার। দেবগ্রামের হাটে চল আমার সঙ্গে। তোরে আমি দেখে-শুনে হাঁস কিনে দেব।
দেবগ্রামের গোরুর হাটে অনেক বেপারী হাঁস-মুরগির ঝাঁকা নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। ঝাঁকার মুখে লাগানো থাকে দড়ির ফাঁসজালি। অল্প একটু টান দিলেই ছড়ানো গোলমুখ বন্ধ হয়ে হাতের মুঠোয় চলে আসে। দিনভর হাঁসের প্যাঁক-প্যাঁক ডাক, বেপারী গলা ফাটানো চিৎকারে ভরিয়ে রাখে দেবগ্রামের গো-হাটের বাতাস। হাট নয়তো যেন রোববারের মেলা। বাসে যেতে যেতে রঘুনাথ কত দিন যে দেখেছে এমন দৃশ্য। গোরুর লেজ মুচড়ে দিয়ে বেপারী আর ক্রেতা ছুটছে গোরুর পেছন পেছন। গোরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার এ এক অভিনব আয়োজন। চা-বিস্কুটের দাম মিটিয়ে দুলু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, বেলা হল এবার তাহলে গাঁয়ের দিকে যাওয়া যাক। তা বাঁধে বাঁধে যাবি, না পাড়া ঘুরে যাবি?
রঘুনাথ হাসল, পাড়া ঘুরে যাওয়াই ভালো। কত কি দেখা যায়। দুলু পিন ফোটানো বেলুনের মতো চুপসে গেল হঠাৎ। মানোয়ারার পরিবর্তনটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মন থেকে। লোক মুখে সে খবর পেয়েছে মানোয়ারের বাপ চাঁদ মহম্মদ মোটা টাকা নিয়ে মেয়েটাকে বেচে দিয়েছে সাদাতের কাছে। চাঁদ মহম্মদের টাকার লোভ ছিল এ নিয়ে দুলুর মনে কোনো সন্দেহ নেই। টাকার জন্য সে গান গায়, দেহতত্ত্ব চর্চা ছেড়ে চুটকা গানে মনভরায়। তার কাছে আল্লা রসুল করিম হরি যিশু ভগবানের চাইতে টাকার শক্তি ঢের বেশি মনে হয়। সে এখন মসজিদের দেখভালের কাজে যায় না, ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে মৌজ করে, মেয়ের গতরখাটা পয়সায় পেট ভরায়। সুখপাখিটা ওর শরীরে এখন বাসা বেঁধেছে। এমন কী নড়ে-চড়ে দানা খেতে চায় না।
কী যুগ পড়ল! মানুষ এত তাড়াতাড়ি চোখ উল্টে নেয় কী ভাবে? তাহলে কি মানুষের চোখের পর্দা খাটো হয়ে আসছে দিনে দিনে? বেইমান, অকৃতজ্ঞ, স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে মানুষ জাত। দুলুর সরল চোখের তারা বালি ঢুকে যাওয়ার মতো করকরিয়ে ওঠে, মনে মনে হাঁপিয়ে উঠে চোখ রগড়ে নিয়ে সে দূরের দিকে তাকায়।
রোদ ঝলমল করছে চারপাশে। বড়ো তেঁতুলগাছটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির ডাক অনবরত। পাখির মতো সুরেলা গলায় কথা বলত মানোয়ারা, আটাকলে খদ্দের না থাকলে দুলু মন দিয়ে কথা গিলত মানোয়ারার। পালবুড়া রেগে যেত ওর মুখোমুখি বসে থাকার ধরন দেখে, টিপ্পনি ছুঁড়ে দিত বুড়োটা, আমার আটাচাকিকে, তোরা দেখছি রাধাকৃষ্ণের কদমতলা বানিয়ে ছাড়বি। তা বাপ, যা করো করো আমার বদনাম যেন না হয়। সেদিক পানে এট্টু খেয়াল রেখো।
মানোয়ারা আটাচাকিতে ঢুকলে চট করে আর ঘর যাওয়ায় মন করত না। দুলু কিছু বললে সে ঠোঁট ওল্টাত অভিমানে, গোলাপী গালে টুসকি ফেলে বলত, আমারে খেদিয়ে দিচ্চো, আমি যাবো না যাও। দেখি তুমি কি করতে পারো? অন্ধকারে মুখঢাকা গাছের মতো চুপচাপ বসে থাকত মানোয়ারা, দুলু তাকে ছুঁয়ে দিলে সে জলোচ্ছাস হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত দুলুর গেঞ্জি পরা ঘামগন্ধ ভরা বুকের উপর। আঠা লাগানো সিনেমার ছবির মতো সেঁটে থাকত সে, বিপরীত উষ্ণতায় দুলু টের পেত জীবনের মহার্ঘ্য সুঘ্রাণ। ছাপা শাড়িতে শরীর মুড়িয়ে মানোয়ারা শাহাজাদীর চোখে তাকাত, তুমারে ছাড়া আমি বাঁচব না গো, আমাকে খেদিয়ে দিলে আমি তুমার ঘরের ছিমুতে ঘুরঘুর করব। আল্লা কসম, আমি তুমার জন্য আমার এই বদন চোখের নিমেষে কুরবানি দিতে পারি। আর শুনো আমারে এড়িয়ে গেলে তুমি আমাকে জ্যাঁতা কুনোদিন পাবে না। বিলের জলে আমার দেহ দেকবে কৈ ফুল হয়ে ভাসচে।
