ললাট ওস্তাদ নিজেও দুলে দুলে সুরা পান করলেন। তারপর ডান হাত উর্ধ্বে তুলে ঝংকার দিয়ে গান ধরলেন, ডুব দে মন কালী বলে/হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে।
সুর সাঁতার কেটে গেল তার ছোট্ট দাওয়ায়। সুরা পান শেষ করে গাঁজার কষ্কে সাজল ললাট ওস্তাদ, অবশেষে শিবটান দিয়ে বলল, আজ থিকে আমি ললাট ওস্তাদ নই, ললাট গুরুজী। গুহ্য তত্ত্বকথা আমি যথাসময়ে দেব। নারীর পিছু টান আর তোর ভেতরে থাকবে না। জয় মা তারা। নে টান দে।
গাঁজার কলকেটা দুলর দিকে বাড়িয়ে দিলেন ললাট ওস্তাদ, দমে দমে বুকটা ভরিয়ে নে। ভরা বুকে কেউ আর ঢুকতে সাহস পাবেনি। তুই শিমুলতুলার মতো শুধু উড়বি আর উড়বি।
গাঁজার কল্কেয় টান দিয়ে মেজাজটা হালকা হলেও পেটের চিন্তাটা তাকে কোণঠাসা করে দেয়। পালবুড়া তাকে আর কাজে নেবে না। যার ডান হাত নেই, তাকে দিয়ে আর কী কাজ হবে?
দুল ভয়ে ভয়ে ললাট ওস্তাদের পায়ের কাছে বসল, গুরুজী, এট্টা কথা ছিল। অভয় দিলে বলি।
–গুরু পিতা সমান। তার কাছে তোর ভয় না পেলেও চলবে।–তুলে তাকালেন ললাট ওস্তাদ।
ঢোক গিলে দুলু বলল, আমার ডান হাতটা ওপরওয়ালা নিয়ে নিয়েছে। এখুন আমি বাঁচব কি নিয়ে, খাবো কি? ঘরে যে বুড়া বাপ–তারে কি খাওয়াবো?
জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। ললাট ওস্তাদ মুখ ফাঁক করে বললেন, হাত গিয়েছে, তোর গলার সুর তো যায়নি। কাল থিকে তুই টেরেনে-টেরেনে ভিখ মাঙবি। বাউল, শ্যামা সঙ্গীত, রসগান, টুসু ভাদু সব গাইবি। তোর উপর আমার আশীর্বাদ রইল। গুরু আশীর্বাদ বৃথা যাবে না। আগে আমি এ পথের পথিক ছিলাম। বাদ্যযন্ত্র, একতারা, ঘুঙুর সব আচে। তুই লিয়ে যা। আমি তোরে সব দিলাম।
ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম সেরে আখড়া থেকে বেরিয়ে এল সদ্য দীক্ষিত দুলু। বেঁচে থাকার সুতীব্র ইচ্ছাটা তার ভেতরে শেকড় চারিয়ে দিল গোপনে।
দুল এখন লালগোলা ট্রেনে একতারা বাজিয়ে, পায়ে জোড়া ঘুঙুর বেঁধে সবধরনের গান গায়, হালকা গানের গভীরে মাঝে মাঝে শুশুকের শ্বাস নেওয়ার মতো ভেসে আসে বাউলগানের কলি, চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করব কি’ কিংবা গোলেমালে গোলেমালে পীরিত করো না, পীরিতি কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়ে না’…..ইত্যাদি গানের তালে তালে তার পুরো শরীর দোলে, এমন কী কাঁধের কাছ থেকে কাটা হাতটা শীর্ণ হয়ে তাল ঠোকে সুরের মায়াবী ইশারায়। গান গাওয়ার সময় দুলুর শরীরে কেউ যেন ভর করে, ললাট ওস্তাদ যেন তার কানে কানে বলেন, দুলুরে, আমার ক্ষ্যাপা বেটা, তোর সুরের জালে পুরো জগৎ মোহিত করে দে। একমাত্র সুরই পারে প্রেমিক হয়ে প্রেমিকার কাছে পৌঁছোতে।
দুলু দরদ দিয়ে গায়, ওরে আমার জীবন গেল, যৌবন গেল … রইল না আর কিছু। সোনার শিকলি গায়ে জড়ালো, সার ছাড়লো না পিছু। দয়াল গুরুজী, এখুন আমি যাবো কুথায়?
মানোয়ারার ছিপছিপে গতর ঈষৎ পৃথুলা হয়েছে সুখের ছোঁয়ায়। সুখ ওর সেগুন কাঠ শরীরে পালিশ এনেছে স্বাচ্ছন্দের। এখনও হাসলে ঝকমকিয়ে ওঠে ওর দাঁতগুলো, গলার সঙ্গে লেপটে থাকা রূপোর হারটা মক্কা-মদিনার লকেট সমেত দোলে। কোঁকড়া চুলের নিবিড় রেশমীভাব এখনও লাউআঁকশির মতো পেঁচিয়ে নেমে আসে জুলফি বরাবর। কপালের সবুজ টিপটা দুই ভ্রূ-র মাঝখানে টিয়াপাখির মতো ওড়ে।
দুলু বাউল সাজলেও মানোয়ারার বুনটিয়া রূপের কাছে হার মানে, কোথা থেকে হাহাকার ছুটে এসে ভরাট করে দেয় প্রেমিক-হৃদয়। ঠোঁট-ঠোঁট চেপে কোনোমতে কান্নার বেগকে সামাল দেয় দুলু। পণ্ডিত বিলের ছায়ায় সে আর মানোয়ারার মুখটাকে দেখতে পায় না, বরং একটা লাল কৈ-ফুল বিলের জলে ফুটে ওঠে বাধ্য যুবতীর মতো। দুলু সেই দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘা নিজে শুকোবার চেষ্টা করে।
ঘা শুকোয় কিন্তু থেকে যায় দাগ।
.
১৫.
টানা বৃষ্টিতে শুধু কদমগাছ নয়, রূপ বদলে গেছে পুরো গ্রামের। সব থেকে বেশি বদল ঘটেছে বুড়িগাঙের। বৃষ্টির জাদুছোঁয়ায় বুড়িগাঙ এখন কিত-কিত খেলা কিশোরী। তার জলের রঙ এখন আর মাঠদিঘির জলের মতো কাচবরণ নয়, মাটিগোলা।
কালও হালকা কুয়াশার চাদর সাহেবমাঠ থেকে উঠে এসে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। আর মাঝের গাঁয়ের আলিঘাস আর চাপ-ঘাসের শরীরে জড়িয়ে গিয়েছিল শিশির। জলাখেতের ধারে কচুগাছগুলো সারা অঙ্গে সবুজ জড়িয়ে ছটফট করছিল পূর্ণতার জন্য। এ সময় কচুগাছের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ মিশে থাকে। এই গন্ধটা একবারে কচুগাছের শরীর নিঃসৃত, এই সুবাসের সঙ্গে আর কারোর বুঝি মিল নেই। রঘুনাথ হাঁস খোঁজার তাগিদে কালীগঞ্জ বাজারে গিয়েছিল সেই সাত সকালে। অনেক বেলাঅবধি বসে থেকেও হাঁসের খোঁজ সে পেল না। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। আর ঠিক তখনি দুলু এসে তার ঘাড়ের ওপর হাত রাখল, কি রে, এখানে বসে জু নিচ্চিস-ঘর যাবি নে?
দুলুকে এ সময় দেখে রঘুনাথও কিছুটা অবাক চোখে তাকাল, তুমি এ সময়? কোথা থেকে এলে গো? আজ বুঝি দেবগ্রাম যাওনি?
নিষ্প্রভ হাসল দুলু, না, আজ আর যাওয়া হল না ভাইরে। বাপটার শরীর খারাপ। তারে হাসাপতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলাম। এখুন যাই, তার জন্যি খাবারের ববস্থা করতি হবে।
