মানোয়ারার মিষ্টি হাসি বিষাদে মিলিয়ে যেত ঠোঁট থেকে। ভরা বুকে ছায়া পড়ত শোকের। গায়ে টাইট হয়ে বসে থাকত ঘটিহাতা ব্লাউজ। ছাপা শাড়িটা মানোয়ারাকে চোখের পলকে বানিয়ে দিত পরী। আটাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত সে, তার কথা আর ফুরোত না। দুলু ওর হাতে টাকা ধরিয়ে দিলে খুশিতে উথলে উঠে মানোয়ারা বলত, আজ চাল না কিনে এট্টা আতরের শিশি ঘরে নিয়ে যাবো। চাল তো খাওয়ার জিনিস, আর আতর হল মনের জিনিস।
দুলুর হাত কাটা যাওয়ার পর মানোয়ারা আর আটাকলে আসে না। দুলু যখন সদরে ভর্তি ছিল, সেখানেও সে যায় নি। অথচ দুল ভাবত আজ নিশ্চয়ই মানোয়ারা আসবে। মুখোমুখি বসে দু-দণ্ড কথা বলে চলে যাবে। মানোয়ারা আসে না। শুধু হতাশা আসে দুলুর মনের বাগানে। ওপরওয়ালা সাজা দিলে তার কি দোষ? সে তো পণ্ডিতবিলের ঢেউ। যে দিকে হাওয়া, সেদিকে তো ঢেউ গড়াবে।
পণ্ডিতবিলের পাড়ে এখন দুলুর সাথে দেখা হলেও কথা বলে না মানোয়ারা। মুখ ধাপিয়ে চলে যায় শামুক-শঙ্কায়। দুলু ডাকলেও সাড়া দেয় না সে। অথচ সে নিজেও বুঝতে পারে না তার কোথায় সমস্যা।
মানোয়ারার আব্বা চাঁদ মহম্মদ মসজিদে কাজ করত। তবু সংসার চালাতে হিমসিম খেত সে। প্রায়ই কাঁধে লম্বা ভিক্ষার ঝুলি ঝুলিয়ে ইনসাল্লা বলে সে বেরিয়ে যেত ঘর থেকে। দেহতত্ত্ব, ঠার-ঠোকর গান গেয়ে সে খুশি করার চেষ্টা করত গ্রামবাসীদের। রূপকাশ্রয়ী গান ভালো লাগত না অনেকের। মেয়েরা গালে টুসকি ফেলে লাজুক স্বরে বলত, ও চাচা, তুমার ফকিরি গান থামাও এবার। দু-চারটে ফাজিল-ফুক্কুড়ি গানের চচ্চড়ি শুনাও। মন ভরে যাক।
হাওয়া বদলাচ্ছে। এখন দরগা, মাজার কিংবা পীরবাবার মেলায় ফকিরি গানের চল কমেছে। এখন ছেলে-বুড়া, ছুঁড়া-ছুঁড়ি সবাই টংটংয়ে গান শুনতে চায়। তাদের বাধ ভাঙা আগ্রহ। গানে মন না ভরলে দান দেবে না দর্শক সাধারণ। তাই পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে চাঁদ মহম্মদ গান ধরে,
ও রসের লাগর, যেওনি গো যেওনি
অমন করে চুমা খেলে শরীল যে ভরলোনি।
ভরা শরীলে বাঁধ ভেঙেছে যৌবন হলো কৈ-মাছ
এসো ভোমর, ডাকি তুমারে মধু খেয়ে লড়াও গাছ।
গাছ লড়াও গো, লড়াও গো,
মধু ঝরাও গো, ঝরাও গো!
এ আদি খেলা, সারা বেলা
চকমকি আর শোলা গো-ও-ও-ও।
শরিফ মেলায় ফকিরি গানের মজলিস বসে সারা রাত। সেই আসরে চাঁদ মহম্মদ হাজির হয় দলবল নিয়ে। ফকিরি গানের পাশাপাশি রঙগানের ফোয়ারা ছোটে। তার বুড়া কণ্ঠা পেরে ওঠে না। শুধু কবি মনটা গর্জায়। চাঁদ মহম্মদ গুনগুনিয়ে ওঠে নতুন গানের কলি ঠোঁটে তুলে,
মক্কা-মদিনা পীরের থান
কেউ কি রুখেছে চাঁদের গান?
এ গানে দেহ কাঁপে, মন কাঁপে, কাঁপে বুকের ধ্বনি
এ গানে প্রেম-মহব্বত, যুগের হাওয়া, উপড়ে নেয় চোখের মণি।
আম্মা ছোট, বিবি বড়ো আব্বাজান হলো চাকর
সিটি মারে লেংড়া রাখাল দেখলে মেয়ে ডাগর।
ঘরের মেয়ে মেম সেজেছে, তুমার আবার ভয় কী
বগলকাটা বেলাউজ, লাল লিপিস্টিক ইংরিজিতে কয় কি?
দোল খাওয়া স্বর্ণলতার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে মানোয়ারা চলে যাচ্ছে বিলের পাড় ধরে ঘরের দিকে। দুলুর বুক ভেঙে যায় টিকটিকি কামড়ানো ডানা ভাঙা মথের মতো। এই মানোয়ারা কখনোই তার চেনা মানোয়ারা নয়। সেই সহজ সরল মানোয়ারাকে তার পাড়ার সাদাত ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে টাকার লোভ দেখিয়ে পুরে দিয়েছে স্থায়ী খাঁচায়। পাখি এখন সাদাতের দানা খায়, সে এখন কারোর কথা শুনবে না।
দুলু তবু আশা ছাড়েনি, একদিন কালীগঞ্জ বাজারে সে মানোয়ারার হাত ধরল জোর করে। টানতে টানতে নিয়ে গেল মাছবাজারের পেছনে, ওদিকে লোকজন কম, শান্তিতে কথা বলা যাবে। মানোয়ারার চোখে কোনো অনুশোচনার বুদবুদ ছিল না, বরং সে তৃপ্ত, পলিপড়া মাটির চেয়েও সুখী। দুলু তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, তুমি যে বলতে আমার সাথে সাদী না হলে মরে যাবে–এ সব কি মিছে কথা? বলো? চুপ করে থেকো না। আজ তুমাকে বলতেই হবে।
আগে হাত ছাড়ো তারপর যা বলার বলব। ঝ্যানঝ্যান করে উঠল মানোয়ারার গলা, তখন তোমার দু-হাত ছিল, এখন ডান হাতটাই কাটা। এক হাত নিয়ে যে নিজেকে পুষতে পারে না, ভিখ মেঙ্গে খায়–সে আবার আমারে পুষবে কি করে? ঘৃণা, বিতৃষ্ণা থিকথিকিয়ে ওঠে মানোয়ারার চোখে, খবরদার তুমি আমাকে আর কুনোদিন ছোঁবে না। শুনে রাখো এখন আমি সাদাতের বেগম হয়েচি। সে আমারে সুখ দেয়, সব দেয়। তুমি আর আমাদের মাঝখানে এসে কাবাবের হাড্ডি হয়ো না। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঠমকে-চমকে চলে গেল মানোয়ারা। ওর শরীর থেকে গড়িয়ে নামা আতরের সুবাসটা বাতাস মাতিয়ে রাখল বেশ কিছু সময়।
দুলু আর কিছু ভাবতে পারল না, মাথার চুল চেপে বসে পড়ল মুথাঘাস ভর্তি মাঠটাতে। হুড়হাড়, দুড়দাড় করে ধসে পড়ছে বিশ্বাসের পাড়। এ দুনিয়ায় ভালোবাসা, প্রেম-মহব্বত বলে কোনো জিনিস নেই দুলুর কাছে। তার এই শুকনো জীবনের কি দাম আছে?
ললাট ওস্তাদের সঙ্গে সেই সময় তার বাঁধের আড়ায় দেখা হল।
সব শুনে ললাট ওস্তাদ মুখ দিয়ে সমবেদনার চুক চুক শব্দ করে মড়ার খুলির ভেতর চোলাই ঢেলে এগিয়ে দিলেন দুলুর দিকে, খা বেটা খা। খেয়ে বাঁচ। এ এমন কারণবারি যা খেলে বুকের ভরা বস্তা সরে যাবে। বড়ো হালকা হয়ে যাবি বাপ। নারী হলো গিয়ে প্রকৃতি, মা। জগৎ-জননী। মহাশক্তি। কালী তারা ব্রহ্মময়ী। তারা ছলনাময়ী, আবার স্নেহময়ী। তারা অসুরনাশিনী, আবার বিপরীত বিহারে কামিনী। তুই ভুলে যা বেটা। তুই সাধক, তুই পূজক। তুই চাঁদ, তুই-ই সূর্য। তুই তার গলায় নর মুণ্ডমালা। যা আজ তোর বাগদীক্ষা হয়ে গেল। আজ পূর্ণিমা। শুধু জপ কর–শব্দ ব্রহ্মা, শব্দ ব্ৰহ্ম।
