দুর্গামণির টানে যুবক গুয়ারাম চলে যেত হরিনাথপুরের কদবেলতলায়। বাঁধের ধারে দুর্গামণিদের ঘরে গিয়ে সে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। দুর্গামণির বাবা-দাদা ওকে কত গায়ে চিমটি কাটা কথা বলত। তবু হুঁশ ছিল না গুয়ারামের। কী কথায় তার দাদা একদিন মারতে গিয়েছিল ওকে। সেদিন মুখ নিচু করে পাড়া থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল গুয়ারাম। যাওয়ার সময় বলে গেল, আর কুনোদিন কদবেলতলা ধাওড়ার মুক দেখবো না।
কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা সে রাখতে পারেনি। বাঁধের ক্ষ্যাপা জল যেমন বাঁধ ভেঙে দেয় তেমনি ভেসে গিয়েছে তার প্রতিশ্রুতি। তিন দিনের মাথায় আবার ফিরে এসেছে গুয়ারাম, সরকারি টিউকলের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে বলেছে, জান ইখানে, দেহটা কি না এসে থাকতি পারে? জানো, দুর্গা, কাল রাতভর তুমার জন্যি ঘুমোতে পারিনি। আর সে কী কষ্ট, চোখ বুজলেই তুমার মুখ, আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না–তাই তুমার কাচে পেলিয়ে এলাম।
-দাদা দেকলে তুমাকে আবার অপমান করবে। দুর্গামণির অসহায় চাহনি।
–অপমান করলেও আমার কিছু করার নেই। পীরিতির হাঁড়িকাঠে যে একবার গলা দিয়েছে সে কি রেহাই পায় গো?
-এতই যদি সোহাগ-দরদ তাহলে আমারে লিয়ে চলো। আমার আর ভালো লাগচে না।
শেষ পর্যন্ত বিয়ের ফুল ফুটেছিল দুর্গামণির। চুনারাম এসে তার বাপের সাথে কথা বলে দিনক্ষণ সব ঠিক করে যায়। বিয়ে চুকে যাওয়ার পরে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে গুয়ারাম। বছরখানিক সে দুর্গামণিকে ঘুমাতে দেয়নি, শরীর জুড়িয়েছে বিছানায়। দুর্গামণিও প্রথম বর্ষার নদীর মতো শুষে নিয়েছে তাপ-উত্তাপ। সেই বাপের ছেলে রঘুনাথ, তার কাছে বেশি কিছু সংযম আশা করে না দুর্গামণি।
খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকতে সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়।
রঘুনাথের বিছানার পাশে চুপচাপ বসে থাকে দুর্গামণি। গো-ধরা ছেলেটাকে বোঝাবে কার সাধ্যি।
দুর্গামণি কমলার প্রসঙ্গ তুলতে গেলেই রঘুনাথ তাকে থামিয়ে দেয়, কানের কাচে ঘ্যানঘ্যানর করো না তো, আর ভাল লাগে না। যাও গে, শুয়ে পড়ো।
-ঘুম আসে না রে বাপ, তুর চিন্তায় মরি। আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল দুর্গামণি। ফোঁপানী এক সময় কান্নায় বদলে যায়। সেই কান্নার ধ্বনি বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। রঘুনাথ দু’হাতে ভর দিয়ে বিরক্তিতে উঠে বসে বিছানায়। দুর্গামণির মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা জ্বালাপোড়া করে ওঠে। দুর্গামণির কান্না যেন শুঁয়োপোকা হয়ে ঢুকে যাচ্ছে তার কানের গহ্বরে। শরীর ঝাঁকিয়ে রঘুনাথ চিৎকার করে ওঠে, তুমি আমার ভালো চাও না, কুনোদিনও ভালো চাও না। তার চেয়ে এট্টা কাজ করো,আমারে বিষডিবা এনে দাও। আমি খেয়ে মরি। আমি না মরা অব্দি তুমাদের কারোর শান্তি হবে না। বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল রঘুনাথ।
-যাস নে বাপ, ফিরে আয়। দুর্গামণির আকুল কণ্ঠস্বর বুড়িগাঙের জলে গড়িয়ে গেল।
.
১৪.
সকালবেলায় মেঘের গোমড়া মুখ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল দুলু কাহারের। কাজে না গেলে মনটা উশখুশ করে হরসময়। লালগোলা ট্রেন তাকে যেন ডাকে। চেনা গাছপালা মাঠঘাট নদী বিল সবাই যেন হাত উঁচিয়ে ডাকে। এক নিঃসীম শূন্যতা খাঁ-খাঁ করে বুকের ভেতর। ঘরে মন না ধরলে দুলু সময় কাটাতে চলে যায় পণ্ডিত বিলে। ওখানে বালিহাঁসের দল এসেছে ডিম পাড়তে। উলের বলের চেয়েও ছোট ছোট পাখিগুলো ভারি অদ্ভুত কায়দায় সাঁতার কাটে। ডুব আর সাঁতার এই হল পাখিগুলোর এগিয়ে যাওয়ার নিয়ম। ওরা ডিম পাড়ে নলখাগড়া অথবা শোলার বনে। একটা দুটো ডিম নয়, সব মিলিয়ে ছটা-সাতটা।
পাখির ডিম নয়, যেন পাখিগুলোকেই ভালোবাসে দুলু। তবে এই বিলের ধারে দাঁড়ালে আগের মতো তার এখন আর মন খারাপ করে না। ডান হাতটা কাটা যাওয়ার পর তার ভাগ্যটা বুঝি কেউ কেটে দিয়েছে ধার ব্লেডে এলোমেলো। পাল কোম্পানি কাটা হাতের কোনো ক্ষতিপূরণ দিল না। অথচ দুর্ঘটনার সময় তারা চাপে পড়ে কথা দিয়েছিলেন, সবরকম আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবেন। দুলু শক্তিনগর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছে। সামান্য কটা টাকার জন্য পালবুড়ার কাছে গিয়েছিল। পালবুড়া মুখের উপর বলেছিলেন, যা দেবার সব দিয়েছি, আর আমার দ্বারা হবে না। একটা অকম্ম মানুষকে সারাজীবন ধরে পোষা কি সম্ভব? যা হবার হয়েছে, এবার আমায় মাফ করো।
হাত তুলে দিলেন পালবুড়া ফলে খালি হাতে ফিরে আসতে হল দুলুকে। বাঁশঝাড়ের কাছে এসে দুলু নিজের দুঃখ না সামলাতে পেরে কাঁদল। একটা হাত না থাকলে মানুষ কি বেকম্মা হয়ে যায়? ভুলে যেতে হয় সেই অসহায় মানুষটাকে? এসব হিসাব দুলুর মাথায় ঢোকে না। মানোয়ারা তার দ্বিতীয় আঘাত।
সবাই তাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছে, সে আসেনি। অথচ এই মানোয়ারা একদিন গমকলে না এলে ভাত হজম হত না তার। ঠোঁট উল্টে বলত, বেছানায় শুয়ে আমি আটাচাকির ঘ্যাড়ঘ্যাড় শব্দ শুনি। গায়ে আটা লাগলে মনে হয় সুগন্ধি পাউডার মেখেচি।
কথা শুনে মন ভরে যেত দুলুর। হা করে গিলত মানোয়ারার কথাগুলো। মনের ভেতর শিহরণের ঝড় বয়ে যেত। মানোয়ারা যা পারে অন্যমেয়ে তা বুঝি কোনোদিনও পারবে না। অথচ এই মানোয়ারা দুলুর হাত ধরে কাতর গলায় বলেছিল, আমাকে ভুলে যাবে না তো? ভুলে গেলে তুমি আমার মরামুখ দেখবে।
