ভেজা কাপড়ে বাঁধের উপর উঠে এল রঘুনাথ। তার গা-হাত-পা টলছে। বাতাস লাগা বাঁশপাতার মতো মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠছে শরীরটা। একটা শীতভাব এখন ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ভোরের দিকে এই শীতানুভূতি আরো তীব্র হয়।
দুর্গামণির মন খারাপ থাকলে মুখের দোক্তা তেতো লাগে। বিড়ি খেলে তখন মগজের চিন্তাগুলো ফাঁসজাল কাটা টুনটুনি পাখির মতো উড়ে পালায়। মাঠে-ঘাটে খাটতে গেলে বিড়ি না হলে তাদের চলে না। নেশার জিনিস কঠিন কাজে সরল গতি আনে। দুর্গামণির মায়ের মা বিড়ি খেত। তার মা বিড়ি না পেলে সংসারে অশান্তি বাধিয়ে দিত। শুধু শুকনো নেশা নয়–তরল নেশাতেও তার আসক্তি প্রবল। বিশেষ করে ভেলিগুড়ের মদ পেলে সে মাংসের বাটিও ঠেলে দেবে।
নেশা করার ধারাটা দুর্গামণি ধরে রেখেছে। রঘুনাথ বড়ো হওয়ার পর থেকে নেশা করতে তার বাধো বাধো ঠেকে। তবু মন ছটফটালে লম্ফর আগুন থেকে বিড়ি ধরিয়ে সে সুখটান দেয়। পুরুষের মতো ধোয়া ছাড়ে, ধোঁয়া গেলে।
চুলার পাশে গালে হাত দিয়ে তুষজ্বাল ছুঁড়ে দিচ্ছিল দুর্গামণি। আগুনের হলকা চুলার ঝুঁটি ছুঁয়ে দিচ্ছে বারবার। রঘুনাথ দুর্গামণিকে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলেই ধরা পড়ে গেল, কুথায় গেচিলিস, এত রাত হলো যে?
মুখ তুলে রঘুনাথের দিকে তাকাতেই সে চমকে উঠল, কপালের কাছটা ফুলালি কিভাবে?
-বাঁধের ধারে পা পিছলে পড়ে গেলাম। বড্ড লেগেছে। কাদা-জলে সারা গা-গতর ভরে গেল। বুড়িগাঙে তাই ডুব দিয়ে ফিরলাম। রঘুনাথ আসল ঘটনা লুকোবার চেষ্টা করল।
-মিছে কথা কেন বলচিস বাপ? দুর্গামণির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, ভেজা মাটিতে পড়ে গেলে কি কপাল এমন ফোলেরে! তোরে নেশ্চয়ই কেউ মেরেচে। বল, কে মেরেচে তুরে?
-আমাকে মারবে কার ঘাড়ে এত সাহস আচে? রঘুনাথ বুক চিতিয়ে দাঁড়াল, আমার গায়ে হাত তুলার লোক এ গাঁয়ে জন্মায়নি।
তবু মন থেকে সন্দেহ মুছল না দুর্গামণির, এই ছেলেই তার যত চিন্তার গোড়া। ঝিম ধরে বসে থেকে দুর্গামণি তুষ ঠেলে দিচ্ছিল চুলার ভেতর।
কমলা কী চায় সে এখনও বুঝতে পারছে না স্পষ্ট। বয়স্ক মানুষের ঝাপসা দৃষ্টির মতো তার কাছে সব ধোঁয়াশা ঠেকে এখন। ভালোবাসায় শক্তি প্রবল। কিন্তু সেই শক্তি কি কমলার ভেতরে আছে? গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায় অনেকে। কমলা কোন দলে এখনও স্পষ্ট বুঝতে পারে না দুর্গামণি। ফলে ভয় তার মনে তাঁবু গেড়ে আছে।
কলাবতীর সঙ্গে কদিন আগে দেখা করতে গিয়েছিল দুর্গামণি। কিন্তু কলাবতী তার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিল না। এমন কী বসতেও বলল না সকালবেলায়। ওর চেহারায় ফুটে বেরচ্ছিল চাপা রাগ। দুর্গামণি গায়ে পড়ে বলল, দিদি, সবই তো জানো, এখন আমার কী করণীয় বলে দাও।
-আর ন্যাকা সেজো না। ফুঁসে উঠেছিল কলাবতী, ষাঁড় লেলিয়ে দিয়ে আমাকে বলছ গোরু সামলাও? যাও, যাও। আমার কাছে আর নাকে কেঁদো না। আমি তোমার মনের ইচ্ছে সব বুঝে গিয়েচি। আমার মেয়েটার সরল মনের সুযোগ নিয়ে তোমরা জাতে উঠতে চাইছ।
–এ কী বলচো গো দিদি? জাত কি পাকুড়গাছ, যে মন চাইলে উঠে যাব। দুর্গামণি দ্বিধার সঙ্গে বলল, ভুল বুঝো না দিদি। এতে আমার কুনো হাত নাই।
–নেই তো এসেছ কেন? মুখ দেখালে কি ঝামেলা সব মিটে যাবে। কলাবতী ফুঁসছিল, তোমার ছেলের জন্য আমাদের নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ হয়েছে। গাঁয়ে আমি মুখ দেখাতে পারছি না। কী কষ্ট! কলাবতীর ঠোঁট ফুলে উঠল, তারপর সেই ফোলানো ঠোঁট কান্নার রঙে মিশে গেল। হকচকিয়ে দুর্গামণি বলল, কেঁদো না দিদি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমার ঘরের কমলাকে টুকে ডাকো। ওর সাথে দুটা কতা বলে যাই।
-কী আর কথা বলবে, কথা বলার আছেই বা কি! কলাবতী এড়িয়ে যেতে চাইলেও দরজার আড়াল থেকে নিজেকে বের করে আনল কমলা। একটা বড়ো পিড়ি পেতে দিয়ে সে বলল, সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছে, বসো।
বসতে আসিনি, মা। দুটা কথা বলে চলে যাব।
–হ্যাঁ- হ্যাঁ বলো। কী বলতে চাও? কমলার কথা-বার্তায় কোনো জড়তা নেই।
দুর্গামণি কমলার মুখের দিকে অদ্ভুত এক মায়ার দৃষ্টি মেলে তাকাল, তুমাকে এট্টা প্রশ্ন শুধাই মা, তুমি যা করচো তা কি বুঝে-শুনে করচো?
কমলা অবিচলিত দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকাল, নিজের ভালোটা ক্ষ্যাপাও বোঝে। আমি ক্ষ্যাপা পাগলা কোনোটাই নই। মন চেয়েছে তাই মনের ডাকে সায় দিয়েছি।
দুর্গামণি মনে মনে খুশি হলেও তার উচ্ছ্বাস বাইরে সে মেলে ধরে না। কলাবতীকে সে আর দুঃখী দেখতে চাইল না।
মাথা উঁচু করে সে বেরিয়ে এল সুফল ওঝার দাওয়া থেকে।
বিয়ে নিয়ে তার মনেও অনেক টুকরো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিয়ের পরে প্রথামত ঘরের চালে উঠে গিয়েছিল বরবেশী গুয়ারাম। চাল থেকে সে কিছুতেই নিচে নামবে না। দুর্গামণি কাতর হয়ে ছড়া কেটেছে তাকে নামানোর জন্য।
চাল থিকে নামো তুমি
নিড়ান দিয়ে পুষব আমি।
তুমি ভাতার, তুমি সোয়ামী
সুহাগ দিব অঢেল আমি।
যেও না গো যেও না,
মাথার দিব্যি যেও না।
নেশায় আচে গু-গোবর
খেও না গো খেও না।
কত বছর পেরিয়ে গেল তবু ছড়াটা এখনও মাঝেমাঝে ঢেউ দিয়ে যায় দুর্গামণির মনে। আজ আরও বেশি করে মনে পড়ছে কেন না কমলা যদি তার ঘরের বউ হয়ে আসে সে কোনোদিন তার বরের মন ভেজানোর জন্য এমন ছড়া কাটবে না। কমলার কাছে এই পরিবেশ তেল আর জলের মতো, কোনোদিনও মিশ খাবে না।
